📄 কোনটি ভালো? ব্যাপক লাভ না কি সীমিত লাভ
ফিক্বহবিদরা এ কথাটি খুবই সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ব্যাপক লাভ তথা যা অন্য পর্যন্ত পৌঁছায় তা অনেক ভালো ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে।
এ জন্য তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন: সর্বোৎकृष्ट ইবাদাত হলো যার ফায়েদা বেশি। কারণ, কুর'আন ও হাদীসে মানুষের স্বার্থ নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকা এমনকি তাদেরকে নিরন্তর লাভবান করা ও তাদের প্রয়োজনাদি পূরণ করার চেষ্টা চালানোর বিশেষ ফযীলত সংক্রান্ত বহু বাণী রয়েছে। যার কিয়দংশ নিচে দেয়া হলো। আবুদ্দারদা' থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ .
"এক জন আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব এক জন ইবাদাতকারীর উপর যেমন চাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের উপর"। (আবু দাউদ ৩৬৪১ স্বা'হী'হুল-জামি' ৪২১২)
নবী একদা আলী বিন আবূ ত্বালিব কে বললেন:
لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ .
"তোমার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা যদি একটি লোককেও হিদায়াত দেন তা হলে তা তোমার জন্য সর্বোত্তম অনেকগুলো লাল উট পাওয়ার চেয়েও”। (মুসলিম ৩৪)
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল ইরশাদ করেন:
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُوْرِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُوْرِهِمْ شَيْئًا .
“যে ব্যক্তি কাউকে হিদায়াতের দিকে ডাকলো তার ততটুকু সাওয়াব হবে যতটুকু সাওয়াব হবে তার অনুসারীদের। তবে তাদের সাওয়াব থেকে এতটুকুও কম করা হবে না”। (মুসলিম ২৬৭৪)
এক জন ব্যক্তিগত ইবাদাতকারী যখন মারা যায় তখন তার আমলটুকু বন্ধ হয়ে যায়। অপর দিকে এক জন ব্যাপক লাভজনক ব্যক্তি মারা গেলেও তার আমল কখনোই বন্ধ হয় না।
আল্লাহ্ তা'আলা নবীগণকে পাঠিয়েছেন মানুষের প্রতি দয়া, তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো উপরন্তু তাদের ইহপরকালের কল্যাণ করার জন্য। তাদেরকে কখনো মানুষ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজ ঘরে একাকী বসে থাকার জন্য পাঠানো হয়নি। এ জন্যই নবী ওদেরকে নিন্দা করেছেন যারা মানুষের সাথে না মিশে একাকী ইবাদাত করতে চায়। (বুখারী ৪৭৭৬ মুসলিম ৫)
এ ব্যাখ্যা কেবল সামগ্রিক দৃষ্টিকোণে। এর মানে এ নয় যে, সকল ব্যাপক লাভজনক আমল সকল ব্যক্তিগত আমলের চেয়ে সর্বোৎकृष्ट। বরং নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি মূলতঃ ব্যক্তিগত আমল। তারপরও সেগুলো অবশ্যই ইসলামের মৌলিক কাজ ও স্তম্ভই বটে।
এ জন্যই কোন কোন আলিম বলেছেন: “সর্বোত্তম ইবাদাত হলো সময়ের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বদা আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা”। (মাদারিজুস-সালিকীন: ১/৮৫-৮৭)
📄 অন্যের ফায়েদা করা নবী ও রাসূলদের বৈশিষ্ট্য
ব্যাপক লাভ নবী ও রাসূলগণের একমাত্র পথ। এমনকি তা তাঁদের পথে চলা ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের একান্ত কর্মও বটে। তাঁরা সর্বদা মানুষেরই ফায়দা কামনা করেন। মানুষকে আল্লাহ্ তা'আলার পথ দেখান। এমনকি তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। আর তা একমাত্র তাওহীদের দা'ওয়াতের মাধ্যমেই হয়ে থাকে যা ব্যতিরেকে দুনিয়া ও আখিরাতের কোন সুখ ও সম্মানই কামনা করা যায় না।
নবী ও রাসূলগণের মানুষের কল্যাণ করা শুধু আখিরাতের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা দুনিয়ার ব্যাপারেও।
* ইউসুফ একদা মিশর সরকারের ধন-ভাণ্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ ﴾ [يوسف: ٥٥] .
"ইউসুফ বললো: আমাকে এ দেশের ধন-ভাণ্ডারের দায়িত্ব দিন। আমি নিশ্চয়ই এর উত্তম রক্ষক ও এ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী”। (ইউসুফ: ৫৫).
যার ফলে প্রচুর কল্যাণ ও লাভ হয়েছিলো এবং দীর্ঘ অনেকগুলো বছরের টানা দুর্ভিক্ষের ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া গিয়েছিলো।
* মূসা যখন মাদইয়ান এলাকার কুয়ার নিকট পৌঁছালেন তখন তিনি সেখানে অনেকগুলো মানুষকে নিজেদের পশুগুলোকে পানি পান করাতে দেখেছেন। এ দিকে তাদের পেছনে ছিলো অসহায় দু'টি মেয়ে। তারা নিজেদের ছাগলগুলোকে পানি পান করাতে পারছিলো না। তাই তিনি কুয়ার মুখ থেকে পাথরটি উঠিয়ে তাদের ছাগলগুলোকে পানি পান করিয়ে দেন।
* এ দিকে আমাদের প্রিয় নবী মু'হাম্মাদ এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِيْنُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ .
"আল্লাহ্ তা'আলার কসম! তা হতেই পারে না। আপনাকে আল্লাহ্ তা'আলা কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ, আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন। মানুষের দায়ের বোঝা বহন করেন। দরিদ্রদের কামাইয়ের ব্যবস্থা করেন। মানুষের মেহমানদারি করেন এমনকি তাদের সকল বিপদাপদ লাঘবের অধিকারটুকুও আপনি আদায় করেন"। (বুখারী ৩)
আর তাঁদের দেখানো সঠিক পথেই চলেছেন সাহাবী ও সর্ব যুগের নেককারগণ:
* আবূ বকর আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা ও গরীবদেরকে সহযোগিতা করতেন। এ জন্য যখন তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দেয়ার ইচ্ছা করলো তখন মূর্তিপূজারী ইবনুদ্দাগিনাহ্ তাঁকে বললো:
إِنَّ مِثْلَكَ لَا يَخْرُجُ ، وَلَا يُخْرَجُ ، فَإِنَّكَ تَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ وَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ .
"আরে, আপনার মতো ব্যক্তি এখান থেকে বের হতে পারেন না কিংবা আপনাকে এখান থেকে বের করে দেয়া যেতে পারে না। কারণ, আপনি দরিদ্রদের কামাইয়ের ব্যবস্থা করেন। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন। মানুষের দায়ের বোঝা বহন করেন। মানুষের মেহমানদারি করেন এমনকি তাদের সকল বিপদাপদ লাঘবের অধিকারটুকুও আপনি আদায় করেন”। (বুখারী ২১৭৫)
* 'উমর বিধবাদের খবরাখবর নিতেন। এমনকি তাদের জন্য রাতের অন্ধকারে পানির ব্যবস্থা করতেন।
* 'আলি বিন্ 'হুসাইন (রাহিমাহুল্লাহ) রাতের অন্ধকারে দরিদ্রদের ঘরে ঘরে রুটি পৌঁছিয়ে দিতেন। যখন তিনি মারা যান তখন তা বন্ধ হয়ে গেলো।
ইবনু ইসহাক্ব (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন: মদীনার কিছু সংখ্যক লোক খুব ভালোভাবেই জীবন যাপন করছিলো। তারা জানতো না তাদের খাদ্যদ্রব্য কোথা থেকে আসছে। যখন 'আলী বিন 'হুসাইন (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত্যু বরণ করলেন তখন তারা আর সে জিনিসগুলো পেতো না যা ইতিপূর্বে তাদের নিকট রাতের অন্ধকারে আসতো। (সিয়ারু আ'লামিন-নুবালা': ৪/৩৯৩)
এভাবেই এ উম্মতের নেককার লোকেরা যখনই মানুষের কোন ফায়েদা করার সুযোগ পেতেন তখনই তাঁরা তা করতে পেরে অত্যন্ত খুশি হতেন। এমনকি তাঁরা তাঁদের সে দিনকে সর্বোত্তম দিন বলেও মনে করতেন।
* সুফইয়ান সাউরী (রাহিমাহুল্লাহ) যখন তাঁর ঘরের দরজায় কোন ভিক্ষুককে দেখতেন তখন তিনি নিজ মন খুলে বলতেন:
مَرْحَبًا بِمَنْ جَاءَ يَغْسِلُ ذُنُوبِي .
"ওই ব্যক্তিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ যে আমার গুনাহগুলোকে ধুয়ে দিতে এসেছে"।
* ফুযাইল বিন 'ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ্) বলতেন:
نِعْمَ السَّائِلُوْنَ، يَحْمِلُوْنَ أَزْوَادَنَا إِلَى الْآخِرَةِ، بِغَيْرِ أُجْرَةٍ حَتَّى يَضَعُوْهَا فِي الْمِيزَانِ .
"ভিক্ষুকরা যে কতোই না ভালো! তারা আমাদের খাদ্যসামগ্রী আখিরাতের দিকে বিনা খরচে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। তারা শেষ পর্যন্ত তা আমাদের পাল্লায় রাখবে"।