📄 পরিবার, কাজের লোক
পরিবারের লোকজন যদি দেখে টাকাপয়সায় মর্যাদায় আপনি তাদের ছাড়িয়ে গেছেন, তারা তখন আপনাকে হিংসের করতে পারে। কিন্তু তাদের সাথে যেহেতু সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না, সেজন্য তাদেরকে কৌশলে সামলাতে হবে। বিষয়টা বেশ জটিল নিঃসন্দেহে। তারা আপনার ব্যাপারে যা জানে না, সেটা তাদেরকে না জানতে দিয়ে ভালো সহৃদয় আচরণ করবেন।
পরিবারের কাউকে অন্যের চেয়ে প্রাধান্য দিলে সবচেয়ে খারাপ ভুলটা করবেন। যদি কোনো কারণে করতে হয়, তা হলে সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন অন্যদের থেকে তা গোপন রাখতো। না হলে এর কারণে অন্যরা তাকে ঘৃণা করবে।
দাসদাসী (কাজের লোকেরা) সত্যি বলতে তাদের মনিব মালিক। খানাপিনার দায়িত্ব তারাই দেখে। এজন্য তাদের সাথে আপনাকে সদয় হতে হবে যাতে তাদের হাতে আপনি মারা না পড়েন [খাবার বা পানিতে বিষ মেশানোর ফলে]। বিষুর জামহুর বলেছেন, আমরা আমাদের লোকদের রাজা। আর আমাদের রাজা আমাদের কাজের লোকেরা। তাদের ব্যাপারে পুরোপুরি সতর্ক হওয়া সম্ভব না। এজন্য ওদের সঙ্গে জ্ঞানবুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করি।
একজন রাজাকে ওদের সাথে মর্যাদা রেখে চলতে হবে। কোমল আচরণ করতে হবে। যারা তার খানাপিনার দায়িত্বে তাদের সাথে আরও বেশি কোমল হতে হবে।
আপনার কাজের লোক দাসদাসী যদি চতুর হয়, তাহলে আপনার কাছ থেকে কোনো কিছু লুকিয়ে ধোঁকা দিতে পারে। আবার বোকা-সোকা হলে তাদের থেকে কোনো উপকারই পাবেন না। কারণ, তারা বুঝবেই না আপনি কী চান। সেজন্য তা পূরণও করতে পারবে না।
সঠিক উপায় হচ্ছে বোকা-সোকা লোক ঘরের ভেতর রাখবেন। আর চালাকচতুর লোককে বাইরের কাজে রাখবেন। তাহলে আপনার সব ধরনের চাহিদা নিরাপদে পূরণ হবে।
সতর্ক থাকা
তরুণ বয়সী কাজের ছেলেকে ঘরের ভেতরের কাজে রাখলে খুব ভুল করবেন। বিশেষ করে দেখতে-শুনতে যদি ভালো হয় তাহলে তো বিপদ আরও বেশি। ঘরে মেয়েরা থাকলে তারা এই ছেলের প্রতি দুর্বল না হলেও সে তাদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আবার সাবালক ছেলেকে দাসীদের মাঝে ছেড়ে দিলে অন্য বিপদ। শারীরিক চাহিদার তীব্রতা আর এ বয়সের উদ্বুদ্ধ মন অবৈধ শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর মতো ভয়াবহ হারামকেও ভুলিয়ে দেয়।
সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করে এগুলোর প্রতিকার করতে হবে। খারাপ কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না।
📄 মানুষের সাথে মেলামেশা
মানুষের প্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি নানামুখী। সবার সাথে মিলেমিশে চলা কঠিন। বুদ্ধিমান মানুষের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে নিজেকে আলাদা রাখা। নিজেকে নিজের হাওয়ায় রাখা। এতেই স্বস্তি, প্রশান্তি।
তবে চলতে ফিরতে মানুষজনের সাথে যেহেতু মিশতে হয়, সেক্ষেত্রে সদয়ভাবে সেটা করতে হবে। কোমল আচরণ করতে হবে। নিজের অধিকার ভুলে তাদের অধিকার ঠিক রাখতে হবে। নির্বোধ লোককদের সাথে ধৈর্য ধরতে হবে। অন্যায়কারীদের ক্ষমা করতে হবে। অহংকারী লোককদেরকে মজলিসের ভালো আসনে জায়গা করে দিতে হবে। তাদের ভালোবাসা পাওয়ার সেরা উপায় ক্ষমা আর দান। তাছাড়া তাদেরকে চালানো দুষ্কর। অনুচরের মাধ্যমে আপনি তাদেরকে অধীনে রাখতে পারবেনা। হাদিসে উল্লেখ আছে, “লোকদের সাথে সুবুয়েসুরে চলা এক প্রকারের দান।”
সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা
'আলিমকে অনেক সময়ে একদম সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে হয়। তাদের সাথে উঠাবসা করার বেলায় খুব সতর্ক থাকতে হবে। তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য 'আলিমদের মতো না। কেউ কোনো একটা নিয়ে খুশি তো অন্যজন সেটা নিয়েই অসুখি। আবার কাউকে কাউকে শুদ্ধের দিলে সে রেগে যায়। তারা সবিকটাকে ভুল মনে করে। নিজে জানে না, তারপরও 'আলিমরা যা বলে তা তারা তা মেনে নেয় না।
আপনি 'আলিম হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যতটা সম্ভব ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলবেন। খুব বেশি মেলামেশা অসম্মান নিয়ে আসবে। তাদের চোখে আপনি ছোট্ট হয়ে যাবেন। আপনার জ্ঞানের অবমূল্যায়ন করবে তারা।
পাপী লোকেরা 'আলিমকে হাসতে দেখে বা তার বিষয়াদির কথা শুনলে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা নেয় [তারা ভাবে এই লোকও দুনিয়াবি সুখ খুঁজছে, পরকালীন না]। এজন্য এদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবেন। বনি ইসরাঈলের সময়ে এসব সাধারণ মানুষরাই ছিল নবিদের হত্যাকারী।
সামাজিক যোগাযোগের খাতিরে কথাবার্তা বলতে গেলে খুব বেশি কথা বলবেন না। এমনভাবে কথা বলতে যাবেন না, যাতে তারা ক্ষমতা নিতে পারে। বা তাদের সাথে যেসব বিষয়ে কথা বলা আপনার জন্য শোভন না সেসব বিষয়ে কথা বলবে না। এভাবে চললে তাদের থেকে নিরাপদে থাকতে পারবেন।
📄 নিখাদ চরিত্র
সুঠীন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: ছোট বয়স থেকেই সত্যের প্রতি অনুরাগ, সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা, যুবক বয়সেই বিচক্ষণ মাথা। সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “আমি অবশ্যই ইবরাহীমকে আগে দিকনির্দেশ দিয়েছিলাম” [আম্বিয়া, ২১:৫১]
নিখাদ চরিত্র অর্জন করতে হলে আপনার ভেতরে এমন কিছু থাকতে হবে যেটা বড় বড় স্বপ্নকে বাস্তব করতে পারবে। নীচু কাজ থেকে বিরত থাকতে পারবে। ছোট বয়সে খেলাধুলা করে এমন অনেক বাচ্চাকে দেখা যায় তারা অন্যান্য বাচ্চাদের নেতা হতে পছন্দ করে। সে যখন বড় হবে এ ধরনের ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো এমনিতেই তার মাঝে মজ্জিত হয়ে যাবে। আল্লাহা করা শিখতে হবে না। লাজুক-স্বভাব হবে তার পোশাক, তাকে এজন্য বাধ্য করা লাগবে না। অন্য অনুশাসনেই তার মধ্যে প্রভাব পড়বে। ঠিক যেমন শানপাথর স্টিলে কাজে লাগে, লোহায় কোনো কাজ করে না।
সে যখন বুদ্ধিব বিবেচনার বয়সে পৌঁছাবে, আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ জানবে, কেন তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা বুঝবে, কুর'আনের বাণী, তার শেষ গন্তব্য সবকিছুর মর্ম নিয়ে ভাববে, তখন সে পরকাল অর্জনের কোমর বেঁধে নামবে। জ্ঞান তার সামনে সবকিছুর বাস্তবতা মেলে ধরবে। সে বুঝবে যা তাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে আসে সেটাই সবথেকে দামি। সেই দামি জিনিসটা হচ্ছে জ্ঞান আর সে অনুযায়ী কাজ। শরীরে যতটুকু কুঁজোয় তার সবটুকু নিংড়ে সে তা অর্জনের চেষ্টা করবে। নিয়াতকে তাজা করে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
আপনি কখনো কখনো দেখবেন কেউ জ্ঞানের শুধু একটি অংশে নিজেকে আটকে রেখেছেন। এই যেমন কেউ সারাজীবন শুধু ব্যাকরণ পড়ছেন। কেউ হাদিস-শাস্ত্র।
কিন্তু এই লোকটি জানে সব ধরনের জ্ঞানই গুরুত্বপূর্ণ। সে জানে সব ধরনের জ্ঞান এই সীমিত আয়ুর জীবনে অর্জন করা অসম্ভব। সেজন্য যেখান থেকে যতটুকু তার উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজন, সে তা কুঁড়িয়ে নেয়। তার জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করে।
সময় থেকে মুনাফা বের করে নেয়। কারণ, সে শঙ্কায় থাকে কখন এ সময় ফুরিয়ে যায়। অনর্থকারি অনর্থক কাজে একটা ক্ষণও নষ্ট করে না সে। এমনকি খাওয়া-দাওয়া ঘুমে সময়টারও ফায়দা নেয়। কারণ, সময় খুব খুব কম। এক কবি বলেছেন,
দ্রুত তোমার লক্ষ্য হাসিল করো তোমার বয়স এক সফর ছাড়া আর কী! ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মতো দৌড়াও, প্রথম হও ওগুলো তোমাকে ধার দেওয়া হয়েছে, একদিন ফেরত দিতে হবে। সময়ের প্রতিটা সেকেন্ড কল্যাণকর কাজ দিয়ে রাঙিয়ে নিতে সে সদাসংগ্রামে রত। সে তার খায়েশের বশে রাখে আচরণ ঠিক করার জন্য। সে শুধু উপকারী জ্ঞান শেখে।
তার মনটা ব্যক্ত থাকে খায়েশের মুখে লাগام পরাতে। তার শরীরের প্রতিটি কণা আল্লাহর প্রতি সমর্পিত। আল্লাহ যা দিয়েছেন তা নিয়ে সে খুশি। অন্যের কাছে হাত পাতে না। নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে অন্যের কাছে ভিক্ষা করে না। এজন্য সে তাদের চেয়েও ভালো। সে আত্মনির্ভরশীল। সে নাসিহাহ-সদুপদেশ ছড়িয়ে দিয়ে অন্যের খারাপ স্বভাব দূর করে।
মানুষের সাথে ইনসাফ ও ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করে সে। তার মর্যাদার কারণে সে নিজেকে আরও উঁচুতে তোলার সাধনায় মগ্ন। কেউ উপদেশ চাইলে সে সাদরে উপদেশ দেয়। নিজেকে সংশোধন-সাধনার কারণে সে বাকিদের চেয়ে আলাদা। অন্যভাবেও জানার জন্ম তার [ভালো কাজের] মালপত্র গুছিয়ে সে প্রস্তুত। প্রতিটি সেকেন্ডের সদব্যবহার করে সে। রসদের জোগান রেখে নিজেকে শক্তিশালী করে। সে জানে এই সফর অনেক লম্বা। সে তার জ্ঞান পরিবর্ধন সংগ্রামে রত। যাতে মৃত্যুর পর তার পদচিহ্ন রয়ে যায়।
সে দুনিয়ামুখি। সারাদিন চলা জন্মটা খুব না হলেওই না, শুধু যতটুকু দিয়েই পেট ভরে সে। অনুমোদিত বৈধ কিছু থেকে যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নেয়, তা হলে সেটা শুধু তার ঔটের শক্তি বাড়ানোর জন্ম। যাতে সেটা তাকে বহন করে নিতে দুর্বল না হয়।
সে তার প্রভু অনুগ্রহ থাকেও একসময় প্রতিটি নিঃশ্বাসে তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। তাঁর তার থ্রেল অনুগ্রহ হয় তখন। আল্লাহর ভাবনা এত ভালো লাগে, লোকজনদের সাথে থাকলে দেহ তাদের সাথে থাকলেও মন পড়ে থাকে আল্লাহর কাছে।
এসৰ মানুষেরা পৃথিবীতে আল্লাহর সব থেকে প্রিয় মানুষ। অনুসারিরা তাদের সুবাস তাদের কথামালা বুক ভরে টেনে নেয়। কবরে দাফনের পরেও তাদের সতবাদিতার সৌরভ ছড়াতে থাকে। তাদের কবরে আছে সম্মান। সেটা বলে দেয় তাদের প্রত্যেকের মর্যাদা।
তাদের কাজগুলো শুনলে অনুসারীদের মধ্যে বৈশ্বত্বি বাড়ে। বিচারাদিনে ধার্মিকেরা হবে মহাবিশ্বের নক্ষত্র। তারা হবেন যে সূর্য বা চাঁদের মতো।
আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অনুকরণের সামর্থ্য দিন। তাদের মতো মর্যাদা দিন। তাদের নৈতিকতার চাদরে আমাদের অলস্কৃত করুন। তিনি সব সব শোনেন।
তিনি তার দাসদের সবচ কাছে।
আল্লাহর শান্তি ও আশিস বর্ষিত হোক শেষ নবি মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ওপর।
📄 লেখকের জীবনী
আবুল-ফারাজ জামালুদ্দিন ইবনু ‘আলী ইবনুল-জাওযীর জন্ম ৫০৮ বা ৫১০ হিজরি সনে। ইংরেজি সালের হিসেবে সেটা ১১১৩ সালের দিকে। আমাদের কাছে তিনি ইবনুল-জাওযী নামেই পরিচিত। খালীফাহ আবু বকর আস-সিদ্দীকের ছেলে মুহাম্মাদের বংশধর তিনি। জন্ম ইরাকের বাগদাদে। তিনি ছিলেন হানবালী মাযহাবের অনুসারী।[১]
পড়াশোনার প্রথম পাঠ শাইখ ইবনু নাসিরের কাছে। কিশোর বয়সে তার খালা তাকে উনার কাছে নিয়ে যান। ইসলামের নানা বিষয়ে তার কাছেই হাতেখড়ি। দিন-প্রচারে তখন থেকেই দুর্বার আকর্ষণ খুঁজে পান এই মহতি মনীষী। ছোটো ছোটো খুতবা দিতে শুরু করেন এখানে ওখানে।
মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। এরপর ফুকুর কাছে বেড়ে ওঠেন। তার আত্মীয়স্বজনেরা ছিলেন তামা ব্যবসায়ী। এজন্য কখনো কখনো হাদিসের মজলিসে তার নাম লিখতেন ‘আবদুর-রাহমান ইবনু ‘আলী আস-সাফফার’। সাফফার মানে ভাস্কর।
আয-যাহাবী বলেছেন, ১১৩০ সালের দিকে তিনি প্রথম হাদিসের মজলিসে হাদিস শেখানো শুরু করেন।[২]
অল্প বয়সেই ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। অবসরের সময় মানুষের সাথে অযথা সময় নষ্ট করতেন না। খাধারের উস্ন সন্দেহজনক উপার্জন থেকে হলো খেতেন না। কেবল সালাতের সময় ঘর থেকে বের হোন। সময়বাপীদের সাথে খেলতে যেতেন না একেবারেই। চোয়ালবদ্ধ সংকল্পের অধিকারী, উচ্চাকাঙ্খী এক মানুষ ছিলেন ইবনুল-জাওযী। সারাটা জীবন বিনিযোগ করেছেন জ্ঞান অন্বেষণ, প্রচার আর লিখনিতে।[১]
তার শিক্ষকেরা
নিজের শিক্ষকদের নিয়ে ‘মাশখায়াতু ইবনুল-জাওযী’ নামে বই লিখেছেন তিনি। সেখানে তার অনেক শিক্ষকের কথা বলেছেন। হাদিস-শাস্ত্রে তার উস্তায ছিলেন ইবনু নাসির। কুর'আন ও আদব বিষয়ে সিবতূল-ফিয়াত ও ইবনুল- জাওয়ালীকী। আদ-দিনাওয়াওরি এবং আল-মুতাওয়াক্কিলি থেকে সর্বশেষ হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন তিনি।[২]
তার ছাত্ররা
তার কাছে থেকে যারা বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে আছেন তার ছেলে বিখ্যাত ‘আলিম মুফতিউ-দিন ইউসুফ আল-মুতা‘সিম বিল্লাহ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এছাড়া আছেন তার বড় ছেলে ‘আলী আল-নাসিহ, তার নাতি দা‘ঈ শামসুদ-দিন ইউসুফ ফরগালী আল-হানফী —মির‘আহ-যামান একটি বই আছে তার। এছাড়া আছেন আল-হাফিম ‘আবদুল-গানী, শাইখ মুওয়াফফাকুদ্-দিন ইবনু কুদামা, ইবনুদ-দুবায়সী, ইবনুল-নাজ্জার এবং আবদ- দিয়া।[৩]
তার ছেলেমেয়ে
বেশিভাগ জীবনী-লেখকেরা বলেছেন তার ছেলে ছিল তিনজন।
* বড় ছেলের নাম আবু বকর ‘আবদুল-‘আযীয’। তিনি হাম্বালী মাযহাবের ফাকীহ ছিলেন। ফাকীহ মানে ইসলামী আইনজ্ঞ। আবুল-ওরাক্ব, ইবনু নাসির, আল-আরমাউতসহ বাবার অনেক শিক্ষকের কাছে তিনি পড়াশোনা করেছেন। একটা সময় তিনি বর্তমান ইরাকের মসুল নগরীতে দীনের প্রচার-প্রসারের কাজ করেছেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন সময় নানা বিষয়ে ফাতওয়া দিতেন। স্থানীয় লোকজনের কাছে তার বেশ কদর ছিল। লোকে বলাবলি করে, আল-যাহরাউয়ী পরিবারের লোকজন তাকে হিংসা করতো। এরা চক্রান্ত করে কাউকে দিয়ে তার পানির মধ্যে বিষ মিশিয়ে তাকে মেরে ফেলো। সেই বিষের ক্রিয়াতেই ১১৬০ সালে তার মৃত্যু হয়।১ বাবা ইবনুল-জাওযী তখনো বেঁচে।
* মেঝো ছেলের নাম আবুল-কাসিম বাদ্রুদ্দীন ‘আলী আন-নাসিহা’। তার ব্যাপারে বলার মতো তেমন কিছু নেই।
* ছোট ছেলের নাম আবু মুহাম্মাদ ইউসুফ মুহিউদ-দীন।২ জন্ম ১১৮৮ সালে। ছেলেদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে মেধাবী ছিলেন। একাধারে তিনি ছিলেন ‘আলিম, দা’ঈ, খাতিব। বাবার মৃত্যুর পর বাবার জায়গায় তিনি ফাতওয়া দিতে শুরু করেন। আর তাতে ছাড়েও যান সবাইকে।৩ সমকালীন ‘আলিমরা তার নামডাকের কারণে তার সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতে আসতেন। একসময় তাকে দেওয়া হয় বাগদাদের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব। পরে খালিফাদের চিঠি বিভিন্ন অঞ্চলের রাজাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার নতুন দায়িত্ব পান। ১২৪৬ সালে খালিফাহ আল- মুসতা‘সিমের প্রতিদ্বন্দ্বে তিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর অল্প সেই কলমময়। হানাক্ব খান বাগদাদ দখল করে পুরো শহর ধ্বংস করে ফেলল। অসাধারণ এই ‘আলিমকে জেলে বন্দী করল অত্যাচারী হালাক্ব খান। জেলবন্দী অবস্থাতেই ১২৫৮ সালে তাকে হত্যা করা হয়। তার তিন ছেলে জামালুদ্-দীন, শারাকুদ্-দীন ও তাজুদ-দীনকেও একসাথে মেরে ফেলা ওরা। অসংখ্য বইপত্রও লিখেছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাজি‘আনিনুল-আবরারি ফি তাফক্বিফুল-ক্বাতলুন-‘আলীযি ও মাযহাবুল-আহমাদ ফি মাযহাবুল আহমাদা। মেঝা ভাই আবুল-কাসিমের মতো অবাছা ছিলেন না তিনি। বাবাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন।
ইবনুল-জাওযীর জীবনীকারদের মধ্যে একজন ছিলেন তার নাতি আবুল-মুযাফ্ফির। তিনি বলেছেন তার বেশ কয়েকজন কন্যা ছিল। তারা হলেন রাফি‘আ, শারাকুন-নিসা’, যায়নাব, জাওহারাহা, সিত্তুল-‘উলামা আস-সুগরা এবং সিত্তুল-‘উলামা আল-কুবরা’৬।
দ্বীন প্রচারক হিসেবে তার অনন্যতা
আয়-যাহাবি তার দা‘ওয়াহ-কার্যক্রম নিয়ে চমৎকার কিছু কথা বলেছেন: মানুষকে দীনের বিষয়-আশাগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। তার মতো করে খুব কম মানুষই কথা বলতে পারতেন। কখনো তিনি মনোমুগ্ধকর কবিতা আবৃত্তি করতেন, কখনো-বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরলসিধা কথাগুলো দিয়ে সাজাতেন নাসীহার পঞ্জিগুলো। সুন্দর শব্দচয়নে মানুষের মনকে নাড়িয়ে দিতে পারতেন। এর অজস্র উদাহরণ আছে তার সোনালি জীবনে। তার আগে এমন কেউ ছিল না; তার পরেও না। যতভাবে মানুষকে নাসীহাহ দেওয়া যায় তিনি ছিলেন তার জীবন্ত প্রমাণ। তার পোশাক-আশাক ছিল দৃষ্টিসুখকর। গলার স্বর শুনে কান আরাম পেত। তার কথা মানুষের মনে প্রভাব ফেলত। জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল সুন্দর।৭ আমার বিশ্বাস তার মতো অন্য কেউ আর হবে না।৮
ইবনু রাজাব বলেছেন, তার নাসীহার বৈঠকগুলো ছিল একেবারেই অন্যরকম। আগে কেউ এমনটা শোনেনি। অনেক ফায়দা হতো এসবররররররররর মজলিসে। বেখেয়ালি মানুষের টনক নড়ত। বেখবর মানুষ জানতে পারত। অপরাধীরা অনুশোচনা করত। আর বদ্ধহৃদয়পূজারীরা মুসলিম হতো।৯
‘আল-আয়উল ইবনুল-মিসরিয়্যাহ’ বইতে শাইখুল-ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যাহ বলেছেন, বিভিন্ন শাস্ত্রে শাইখ আবুল-ফাররাজের দক্ষতা ছিল দেখার মতো। এসব বিষয়ে তিনি প্রচুর বই লিখেছেন। শুনে দেখেছি তার বইয়ের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরে অবশ্য আমি তার অন্যান্য কাজেও সন্ধান পেয়েছি।১০
তার কিছু বইপত্রের কথা উল্লেখ করার পর আম-যাহাবী অন্য এক জায়গায় বলেছেন, “উনি যা লিখেছেন তা আর কেউ লেখেননি বলে আমি জানি না।”১১ সুধী শিক্ষক ‘আবদুল-হামিদ আল-‘আলূহী তার বিভিন্ন কাজ নিয়ে একটা বই লিখেছেন। ১৯৬৫ সালে এটি বাগদাদে প্রকাশিত হয়। এই বইতে তিনি তার বইগুলোর প্রকাশিত-অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধান চালিয়েছেন। সবগুলোকে তিনি বর্ণমালাক্রম বিন্যাস অনুযায়ী সাজিয়েছেন। যারা তার বইগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চান তারা এই বইটি দেখতে পারেন। এখানে উল্লেখ করা বেশিরভাগ বই-ই ছাপা হয়েছে।
ইমাম ইবনুল-জাওযী রাহিমাহুল্লাহ প্রায় ৩০০ বই রচনা করেছেন। হাপরা বইগুলো হলো যার মধ্যে আছে:
* তালাফকি খুসম যাহিলিল-আসার ফি মুযতাসারিদ-সিয়ারী ওয়াল-আকবার১। [একটি অংশ ছাপা হয়েছে]
* আল-আসফিয়া’ ওয়া আকাবরাহমা’২ [প্রকাশিত]
* মানাকিব ‘উমার ইবনু ‘আবদুল-আযীয’৩ [প্রকাশিত]
* রাওদুল-আওয়ার৪ [প্রকাশিত]
* ওযফুল-‘উক্বদ ফি তারিখুল-‘উক্বদ’৫ [পাণ্ডুলিপি]
* যাদুল-মাসির ফি ইলমুত্ব-তাফসীর’৬ [প্রকাশিত]
* আল-মুনতাজাম ফি তারিখুল-মুলুক্ব ওয়াল-উমাম’৭ [শুধু ৬ খণ্ড প্রকাশিত]
* আয-যাবুল-মাসরুক্ব ফি সিয়াগিল-মুলুক্ব’৮ [পাণ্ডুলিপি]
* আল-হামক্বা ওয়াল-মুগাফফালিন’৯ [প্রকাশিত]
* আল-ওয়াফা ফি ফাদ্বাইলিল-মুসতফা’১০ [প্রকাশিত]
* মানাকিব ‘উমার ইবনুল-খাত্তাব’১১ [প্রকাশিত]
* মানাকিব আহমাদ ইবনু হানবাল’১২ [প্রকাশিত]
* গাইরুল-হাদীস’১৩ [প্রকাশিত]
* আত-জাক্বীকা’১৪ [শুধু প্রথম খণ্ড প্রকাশিত] এগুলো ছাড়াও অন্যান্য আরও অনেক বিষয়েও তিনি বই লিখেছেন। ১২০১ সালের ১২ই রামাদান শুক্রবার ইবনুল-জাওযী মারা যান। বাবা হার্ব কবরস্থানে ইমাম আহমাদ ইবনু হানবালের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
টিকাঃ
[১] সাইদুর-রাউলাহাইন, পৃষ্ঠা ২১, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, পৃষ্ঠা ১৫/২৬
[২] সাইদুর-রাউলাহাইন, পৃষ্ঠা ২১, সাইদা'আলা তাবাকাতুল-হানাবিলা, ১/৪০১, শাজারাতুল-যাহাব, ৪/৩০০
[১] আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ১৫/২৬, সাইদুল-ফাতির, ২৬৮。
[২] সিয়াকুল-আ'লামুন-নুবলা’, ২১/৬৬৬, ৬৬৭。
[৩] সিয়াকুল-আ'লামুন-নুবলা’, ২১/৬৬৭。
১| সহীহ তাবাকাতুল-হানাবিলা, ১/৪৫০, ৪৪১。
২| দেখুন, সিয়াক্বুল-আ‘লামুন-নুবালা’, ২৬/৬৭২, আল-‘ইবার, ৫/২৫৭, দূরাদুল-ইসলাম, ২/১১২, আল-বিদায়াহ ওয়াান-নিহায়াহ, ১৫/১০৬, সাইদুল তাবাকাতুল-হানাবিলা, ২/২২৪৯-২৯১, আল-‘উসজুন-মাসবুক্ব, ৫৬৯, সায়রাতুল-সাদাব, ৫/২৮৬, ২৮৭, ইবনু শাতী: মুশতাসার তাবাকাতুল-হানাবিলা, পৃষ্ঠা ৫৭。
৬| মিরা’আতুল-যামান, ৮/৫০৩, আবু শায়মা: সাইদুল-রাউতালাইনে, ২৯১。
৭| সিয়াক্বুল-আ‘লামুন-নুবালা’, ২১/৬৬৭。
৮| ঐ, ২১/৬৬৪。
৯| সাইদুল তাবাকাতুল-হানাবিলা, ১/৪১০。
১০| ঐ, ১/৪১৫, আত-তালু-মুকালাল, ৭০১。
১১| তাযকিরাতুল-হুফফায, ১৩৪৮。
১| নবিজি ও সাহাবিদের নিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনার সংগ্রহ。
২| বুদ্ধিমান বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন ঘটনা সংগ্রহ。
৩| খলিফাহ ‘উমার ইবনু ‘আবদুল-আযীযের গুণাবলি নিয়ে。
৪| আরও ও আখিরাতের বিবরণ。
৫| তারিখুল-মুলুক্ব ওয়াল-উমাম বইয়ের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ。
৬| তাফসীর শাস্ত্রের ওপর。
৭| নানা জাতি ও বাদশাহদের কাহিনি।
৮| ইতিহাসজুড়ে নানা নেতা ও বাদশাহদের নিয়ে。
৯| বেখেয়ালি নির্বোধ লোকের কাহিনি。
১০| নবিজির গুণাবলি নিয়ে。
১১| ‘উমার ইবনুল-খাত্তাবের গুণাবলি নিয়ে。
১২| ইমাম আহমাদ ইবনু হানবালের গুণাবলি নিয়ে。
১৩| হাদীসশাস্ত্রের গরীব হাদীস বিষয়ে。
১৪| বইটা আল-ক্বাদি আবু যা‘লা রচিত আত-তাজ্বদিক্বুল-ক্বাবির বইয়ের বর্ণনাগুলো যাচাই নিয়ে এবং কীভাবে হাদীসের মান যাচাই ‘আলিমদের দৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছে।