📄 নিজের দোষ শনাক্ত করা
মানুষ নিজেকে নিজে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষের খুঁত কি আর চোখে পড়ে? তবে কিছু কিছু লোক তাদের আত্মশুদ্ধির সংগ্রামে এতটাই দৃঢ়চেতা, তারা নিজেদেরকেই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবেন। যেকারণে তারা নিজেদের দোষ ত্রুটি দেখতে পান।
ইয়াস ইবনু মু’আওয়াইয়াহ বলেছেন, “যে নিজে তার দোষ জানে না সে বোকা।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনার দোষ কী?” তিনি বললেন, “বেশি কথা বলা।”
তবে ইবনু মু’আওয়াইয়াহ মতো নিজে নিজের খুঁত খুঁজে পাওয়াটা বেশ বিরল। মানুষ সাধারণত তাদের নিজেদের খুঁত গোপন করে রাখে। তবে অনেকেই আছেন যারা নিজেদের ভুলত্রুটি সম্পর্কে সজাগ। বুদ্ধিমান মানুষ নিজের সমস্যা নিজেই ধরতে পারেন। তবে গুপ্ত খুঁতগুলো ভয়ংকর। এগুলো শরীরের ভেতরে ভেতরে গোপনে বাসা-বাঁধা অসুখের মতো। ডাক্তার এগুলো ধরতে পারে না। সেজন্য ওষুধও দিতে পারে না। রোগের কোনো লক্ষণই যে তারা খুঁজে পান না, ওষুধ দেবেন কীভাবে? তাছাড়া মানুষের নিজের প্রতি ভালোবাসাও তার ভুলগুলোকেই ভুল হিসেবে দেখায় না।
একজন কবি লিখেছেন,
তুষ্টি চোখ ভুল দেখে না ভুল দেখে রুষ্ট চোখ
দুজন লোক হেঁটে হেঁটে আলাপ করছিলেন। যাবার সময় একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার ভুলত্রুটির কথা বলুন তো ভাই।” অন্যজন জবাবে বললেন, “আমাকে বাদে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করুন। আমি আপনাকে সর্বদাই চোখে দেখেছি।”
জিজ্ঞেস করতে পারেন, খুঁত যদি গোপন থাকে, আর মানুষ সেটাকে খুঁত হিসেবে না-ই দেখে, তা হলে শনাক্ত করব কীভাবে? এর সাতটি উপায় আছে।
প্রথম উপায়: নিজের বন্ধুবান্ধব বা চেনাজানাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানীগুণী ও বিচক্ষণ লোককে নিজের দোষগুণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। তাকে জানান এটা আপনার জানার জন্যই। এরপর সে যখন আপনাকে একে একে তার দোষত্রুটিগুলো বলবে, তখন তাতে মন কালো করা যাবে না। কষ্ট পাওয়া যাবে না। তা নাহলে সে আপনার ভুলত্রুটি বলা বন্ধ করে দেবে। তাকে বলে দিতে হবে, “তুমি যদি আমার কিছু গুণও তা হলে ভাবো তুমি ধোঁকাবাজ।”
দ্বিতীয় উপায়: প্রতিবেশী, ভাইবেরাদার, যাদের সাথে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয় তাদের থেকে নিজের নিজের দোষ জেনে নিন।
তৃতীয় উপায়: নিজের ব্যাপারে শত্রুদের মনোভাব জানাটাও বেশ কাজের হবে। শত্রু সব সময় আপনার ছিদ্র খোঁজে। এগুলো আমলে নিলে বন্ধুর চেয়ে বরং শত্রুর থেকেই বেশি লাভবান হবেন। শত্রু খুঁজে খুঁজে দোষ বের করবে। আর বন্ধুরা তা লুকিয়ে রাখে।
চতুর্থ উপায়: নিজেকে অন্যের চোখে দেখুন। সেই চোখে যেটা ভালো লাগছে সেটা রেখে দেবেন। আর যেটা ভালো লাগছে না সেটা ছেড়ে দেবেন।
পঞ্চম উপায়: ভালো ও মন্দ চরিত্রের ফল আর পরিণাম নিয়ে ভাবুন। তা হলে ভালো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ফলে যে-ভালো ফল আসে সেটা যেমন জানবেন, তেমনি খারাপ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিণাম কী হবে সেটাও তার ধারণা হবে। নিজের ব্যাপারে এটি ভাবনা বেশ শক্তিশালী।
ষষ্ঠ উপায়: শারি’আর পাল্লায় নিজের সব কাজগুলোকে মাপুন। আত্মজিজ্ঞাসাসম্পন্ন মানুষদের থেকে আপনার বিভিন্ন কার্যকলাপের ব্যাপারে মন্তব্য নিন। সুচিন্তাদের পাল্লায় ওজন করুন। তা হলেই খারাপ আর ভালোর পার্থক্য চোখে পড়বে আপনার।
সপ্তম উপায়: যারা তাদের জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করেছেন সেসব মানুষের কাহিনি পড়ুন। তারপর তাদের কাজের সাথে নিজের কাজকর্মের তুলনা করুন। এতে করে খারাপ কাজ তো পরের কথা, নিজের ছোটখাটো অসংগতিগুলোকেই ভুল মনে হবে।
📄 আমাকে দিয়ে হবে না
মনের ভেতর এ ধরনের চিন্তা যদি আপনার জন্মগত হয়, তা হলে এর কোনো প্রতিকার নেই। যদি আশপাশের মানুষের সাথে থেকে থেকে এ ধরনের চিন্তা মনে ঠাঁই দিয়ে থাকেন, কিংবা একটা ভাবতে ভাবতে একসময় নিজেকে এভাবেই ধরে নেন, তা হলে এর অসুখ সারানোর অনেক উপায় আছে। এই যেমন:
* হীনমন্য লোকদের এড়িয়ে চলুন * তাদের ঘৃণা করুন * উদ্যামী লোকদের সাথে থাকুন * হীনমন্যতার পরিণাম, এ ধরনের লোকদের পরিণতি নিয়ে ভাবুন * কর্মঠ, উদ্যামী লোকদের সফলতা নিয়ে ভাবুন
আব্দুস-সামাদ বলেছেন, “কঠোর পরিশ্রমের জন্য পরিচিত একজন লোক যখন মারা গেলেন, লোকজন তখন বলাবলি করছিল, ‘লোকটা আজকে মরেছে, কিন্তু চিরকাল বেঁচে থাকবে।’ এ কথাটা আমাকে জাগিয়ে দিয়েছে।”
দেখুন উদ্যামী লোকেরা আপনার মতোই। মাটির উপাদান থেকে তাদের সৃষ্টি। তারাও মানুষ। নিষ্কর্ম লোকদের সাথে তাদের মূল ফারাক তারা আরামপ্রিয় নন। অলসতা তাদের পায়ে শেকল পরিয়ে বসিয়ে রাখেনি। হীনমন্য লোক ঘরে বসে থাকে। আর কর্মঠ লোকেরা কাজে নেমে পড়ে। ক্ষুদ্রচিন্তার এসব মানুষও যদি গা মারা দিয়ে বাহিরে পা ফেলে তা হলে সফলতার অবস্থানে তারাও একদিন পৌঁছে যাবে।
এক কবি বলেছেন, “কারও কোনো বৈশিষ্ট্য ভালো লাগলে তা অনুকরণ করুন। সেটা আপনারও হবে। দয়া ভালো আচরণের মতো বৈশিষ্ট্যগুলোর সংস্পর্শে এলে যে কেউ তা পেতে পারেন। এগুলোর মাঝে কোনো পর্দা নেই।”
আগেকার ধার্মিক লোকদের জীবনই পড়লে, তাদের সম্পর্কে জানতে দেখবেন, বেশিরভাগ আইনজ্ঞ, ‘আলিম-বিজ্ঞান ছিলেন দাস। সমাজে তারা ছিলেন দুর্বল। ছোটখাটো কাজ করে জীবন চালাতেন। কিন্তু উঁচু স্বপ্ন তাদেরকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
নিজেকে যারা অকেজো মনে করেন—এমন মনোভাবের পরিত্রাণ নিয়ে ভাবলে বুঝবেন অলসতা আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু এই শত্রুকে আলসেমিকে আপনি লাই দিচ্ছেন। আরাম আলসেমিকে আপনি করে নিয়েছেন। দুঃখ দুর্দশা তো পিছু নেবেই, সেই সাথে সুযোগ হারানোর আফসোস, মানুষের অশ্রদ্ধা অপমানের জ্বালাও তার চেয়ে কম হবে না।
অন্যদিকে, কর্মকুশল লোকেরা অন্যদের থেকে সম্মান পায়। পরকালের আগে দুনিয়াতেই তাদের মর্যাদা আকাশ ছোঁয়া। মুছে যায় তাদের কষ্টের তিক্ততা। যে কষ্ট সহ্য করে তাকে দেখলে মনে হয় সে যেন কখনো আরাম করতে জানে না। আর যে আরাম করে তাকে দেখলে মনে হয় সে যেন কখনো কষ্ট সহ্য করার কথা চিন্তাও করতে পারে না।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজ থেকে অন্যান্য ইবন মালিক বর্ণনা করেছেন,
এক লোককে, যে পৃথিবীতে সবর ও ধৈর্য সুখ ভোগ করেছে, বিচারদিনে তাকে জাহান্নামে চাবানো হবে। তারপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, ‘আদম সন্তান, জীবনে কখনো ভালো কিছু দেখেছ? কখনো কোনো সুখ পেয়েছ?’ সে বলবে, ‘আল্লাহর কসম, না। কক্ষনো না’।"
এরপর যারা আতিথ্যে এজনকে, যে পৃথিবীতে সবশেষে কষ্টের জীবন পার করেছে, বিচারদিনে তাকে এনে জান্নাতে অবস্থান করানো হবে। এরপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, ‘আদম-সন্তান, জীবনে কখনো কষ্ট দেখেছ? কখনো দুর্দশায় ছিলে?’ সে বলবে, ‘আল্লাহর কসম, না। কক্ষনো না!’
এই হাদিসের মানে হচ্ছে, কষ্টযাতনা পরিব্যাপ্তি একদিন তো ফুরাবেই! থাকবে শুধু স্বস্তি। অন্যদিকে আরাম আয়েশ শেষ হয়ে যাবে। থাকবে শুধু অনুশোচনা। জীবন তো একটা মৌসুমের মতো। মৃত্যু ধেয়ে আসছে। ফসল এখনই ঘরে তুলতে হবে। এসব চিন্তার ছিটকেছিটকি কুঁড়ে লোকের গা ঝাঁড়া দিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট।
📄 মনের উপর লাগাম
প্রকৃতিকভাবে মানুষের স্বভাব আচরণ ভালো। অসুস্থবিসুস্থ ভুলত্রুটি এগুলো বাইরে থেকে আসে। প্রত্যেক শিশু ফিতরাহ—মানে ভালো আচার-স্বভাব নিয়ে জন্মায়।
শৃঙ্খলার বিষয়টা বুদ্ধিজগতে কাজ করে। এজন্য গাধার বেলায় এটা কাজ করে না। বনের পশুকে বাচ্চা বয়স থেকে যতই দেখভাল করা হোক, বড় হয়ে এটা শিকার করা ছাড়বে না।
প্রত্যেক মানুষের তিন ধরনের সামর্থ্য আছে: * ধার্মিক * কামনা বাসনাগত * বদরাগি
আল্লাহ যদি আপনাকে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে থাকেন, তা হলে আপনার দায়িত্ব দিকটা উন্নত করুন। ভাষার কারণেই প্রাণীজগতের উপর আপনার শ্রেষ্ঠত্ব। ফেরেশতাদের সাথে অভিন্ন এক গুণ এটা। বাকি দুটো সামর্থ্যের উপর এক আধিপত্য করতে দিন। যাতে এটা হয়ে ওঠে সওয়ারী। শরীর হলো ঘোড়া। ঘোড়ায় চড়ার কারণে সওয়ারি ওটার লাগাম ধরে রাখে। যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যায়। চাইলে জবাইই করতে পারে। সেরকম ধার্মিক দিকটাকেও বাকি দুটোকে চড়িয়েও দিতে দিন। প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে। অপ্রয়োজনে ছাড়তে হবে। যে তা করতে পারে সে-ই ‘মানুষ’ খেতাব পাওয়ার উপযুক্ত।
প্লেটো বলেছিলেন,
যার ‘ভাগাও সদ্বা’ বাকি সব সত্তার চেয়ে শক্তিশালী, সে-ই প্রকৃত মানুষ। কামনা লাগাম ছাড়া হলে সে পশু হয়ে যায়। ওখানে বাঁধ না পড়লে জীবন হয় অসংযত। সে তার কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। সে তখন পশুর চেয়েও অধম হয়। কারণ, লাগামহীন জীবন পশুর স্বভাব। এরকমটা করে সে তার মনুষ্য-স্বভাবের বিরোধিতা করেছে।
যখন রাগ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন মানুষের চরিত্র বন্য জানোয়ারের মতো হয়।
একারণে তাকে তার মনটাকে পোষ মানাতে হবে। আর সেজন্য কামুক চিন্তাগুলোও তাড়াতে হবে। রাগকে বশ করতে হবে। ধার্মিক সামর্থ্যের অনুসরণ করতে হবে। যাতে সে ফেরেশতাদের মতো হয়। কামনা আর রাগের গোলাম না হয়।
কীভাবে মনে লাগাম পরাবেন?
কেমনভাবে নিজের এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় বদলে যেতে মনের উপর লাগام পরানো যায়। কৃষ্ণপশুত্ব হয়ে না। নরমভাবে। সাথে থাকতে হবে আশা আর ভয়ের সম্মিলন। এই লাগام শক্ত থাকবে যদি,
* ভালো বন্ধুবান্ধব, সঙ্গীরা সাথে থাকে * খারাপ মানুষদের সঙ্গ ছেড়ে দেন * কুরআন বুঝে পড়েন * উপকারী গল্প-কাহিনী পড়েন * জামাত-জাহান্নামের কথা ভাবেন এবং * জ্ঞানীগুণী দুনিয়াবিমুখ মানুষের জীবনী পড়েন।
আগেকার সময়ের ধার্মিকদের কেউ কেউ যখন মজাদার কোনো খাবার পেতে চাইতেন, তখন তারা নিজের সাথে পণ করতেন: আজকে রাতে যদি তারা তাহাজ্জুদ পড়েন, তা হলে এই মজার খাবার খেয়ে নিজে নিজেকে পুরস্কার দেবেন।
একসময় যা মন চাইত তা-ই খেতেন সুফিয়ান আস-সাউরী। পরে সকালে ঘুম থেকে উঠে বলতেন, “কষ্টল লোকটি তার বাচ্চাকে খাইয়েছে!” মনের উপর যতক্ষণ না ‘আলিমিনা লাগাম পরাতে পারতেন, ততক্ষণ না একে একে বশ মানাতে পারতেন, ততক্ষণ তারা কোমলভাবে একে সামলাতেন।
মালিক ইবনু দীনারের এক প্রতিবেশী বলেছেন, “এক রাতে আমি শুনি তিনি বলছেন, ‘তোমার তো এরকমই হওয়া উচিত!’ পরের দিন আমি তাকে বললাম, ‘আপনার বাসায় তো কেউ ছিল না। আপনি এ কথাটা কাকে বললেন?’"
তিনি বললেন, “আমার মন কিছু রুটি খেতে চেয়েছিল। খুব পীড়াপীড়ি করছিল। তিনদিন নিজেকে ধরে রেখেছিলাম। পরের দিন একটা শুকনো রুটি পেয়েছিলাম। খেতে গিয়ে মনে হলো, ‘দাঁড়াও, দেখি নরম পাই কিনা!’ মন বলল, ‘আমি এতেই খুশি!’ তখন আমি বললাম, ‘এমনই তো হওয়া উচিত তোমার!”
আপনার মন যদি জানে আপনি সিরিয়াস তা হলে সেও সিরিয়াস আর কর্তব্য হবে। আর মন যদি জানে আপনি অলস, তা হলে সে আপনার মনিব বনে যাবে।
এক কবি বলেছেন,
ঘোড়সওয়ার তার ঘোড়ার স্বভাব ভালো করেই জানে তাই সে তাকে বারবার কাহিল করে। যে দেখায়
মনের উপর লাগাম চড়ানোর আরও কিছু উপায় হচ্ছে প্রতিটি কথায় কাজে অবহেলার অপরাধের জন্য এক কাঠগড়ায় দণ্ড করান। লাগام পরানো হয়ে গেলে তখন ঠিকই সেই কষ্ট ব্যথা সে সয়ে নেবে।
সাবিদ আল-বুনানী বলেছেন, “বিশ বছর ধরে আমি [সালাত আদায় করে] রাতকে সহ্য করেছি। এর পরের বিশ বছরের রাতে আনন্দ করেছি।”
আবু মা'বীদ বলেছেন, “চোখের পানি ঝরানোতে ঝরানোতে আমি আমার প্রভুর দিকে নিজেকে চালিয়ে দিয়েছি। একসময় সে খুশি মনে সেখানে পৌঁছেছি।”
তাছাড়া নিজের মনের অধিকারও ভুলে যাবেন না। শৃঙ্খলাবিরোধী কিছু না হলে মনের বাসনার বিরুদ্ধে যাবেন না। সাধারণভাবে যদি একে এর লক্ষ্য থেকে বাঁধা দেওয়া হয়, তা হলে অন্তর অন্ধ হয়ে যাবে। দুশ্চিন্তার বিস্ফোরণ ঘটবে। নিজেকে জেলখানায় বন্দী মনে হবে।
মনে রাখুন, সুবহান আল্লাহর কাছে ‘ইবাদতের মর্যাদা’র চেয়ে আপনার মর্যাদা অনেক বড়। এজন্যই সফরকারীদের জন্য তিনি সিয়াম ভাঙার অনুমতি দিয়েছেন। জ্ঞানীয়া এটা বেশ ভালো করেই বোঝেন।
📄 সন্তান শাসন
কাঁচা বয়সের শাসন সেরা শাসন। ছেলেমেয়েদের যদি নিজেদের উপর ছেড়ে দেন, আর তখন ওরাও যদি একবার আজেবাজে স্বভাব নিয়ে বড় হয়, তখন ওদের ঠিক করা খুব কঠিন হবে।
এক কবি বলেছেন, বাড়ন্ত শাখাকে চাইলে সোজা করলে সোজা হবে কিন্তু কাণ্ডকে সোজা করা যায় না সন্তানকে ধীরে ধীরে শাসন করলে তা কাজ দেয় বয়স হয়ে গেলে তা আর কাজে দেয় না
শৃঙ্খলার জন্য লেগে থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ নীতি। বিশেষ করে বাচ্চাদের বেলায়। ওদের ভালো স্বভাবটা এভাবে অভ্যাসে পরিণত হয়।
অন্য এক কবি বলেছেন, বাচ্চাকে নিয়মানুবর্তিতা শেখানোকে হেলা করবেন না যদিও সে কঠোর ব্যাপারে নালিশ করে
দেখুন, ডাক্তাররা যখন রোগীর চিকিৎসা করেন, তারা তখন তার বয়স, সে কোথায় থাকে, সময় এসব বিবেচনা করে। এরপর ওষুধ দেয়। সেরকম বাচ্চাদের শেখানোর বিষয়টাও তাদের উপযোগী হতে হবে। সেটা কাজে লাগছে কি না তা অল্প বয়স থেকেই বোঝা যায়। চালাক ছেলেমেয়েরা উপদেশে সাড়া দেয়। কিন্তু যারা সাড়া দেয় না, উপদেশে তাদের কোনো কাজে লাগে না। ঠিক যেমন খেলোধুলা চর্বি করলেই কোনো উচ্চলক বুদ্ধিমান হয়ে যায় না।
এক লোক একবার সুফিয়ান আস-সাওরীকে বলেছিলেন, “সালাত আদায় করে না বলে আমি আমার ছেলেমেয়েকে মারি।”
তিনি বললেন, “আপনি বরং ওদেরকে [সাওয়াবের] সুখবর দিন।”
যুহাইদ আল-যায়ীদ তার ছেলেদের বলতেন, “যে সালাত আদায় করবে আমি তাকে পাঁচটা আখরোট দেব।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম বলতেন, “বাবা! হাদীস শেখো। একটা করে হাদীস শিখলে আমি তোমাকে এক দিরহাম করে দেবো।” তো তারপর তার ছেলে হাদীসের জ্ঞান অন্বেষণে লেগে পড়ে।
আমানাতের দেখভাল
আপনার ছেলেরে আপনার আমানাত। আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে সে যেন অল্প বয়স থেকেই খারাপ বস্তুরব্যাপারে এড়িয়ে চলে। তাকে ভালো ভালো কাজ আচরণ শেখাবেন। বাচ্চাকাচ্চারা শূন্য কলসির মতো। এখন যা দেবেন, তা-ই নেবে। তাকে লাজুক স্বভাব, দানশীলতা ভালোবাসতে শেখাবেন। ছেলে হলে তাকে সাদা পোশাক পরতে বলবেন। রঙচঙা পোশাক পরতে চাইলে বলবেন ওগুলো মেয়েদের পোশাক। মেয়েলি স্বভাবের নিশানা।
ওদেরকে আপনি ধার্মিক মানুষদের কাহিনি শোনাবেন। অর্থহীন কবিতা থেকে দূরে রাখবেন। এগুলো মনের ভেতরে বিষের বীজ রোপণ করে। দানশীলতা সাহসিকতার মতো সদ্গুণকে উদ্দীপিত করে এমন-সব কবিতা পড়াবেন। যাতে তার মধ্যে এসব স্বভাব গড়ে ওঠে। সে সাহসী হয়।
ভুল করলে ওদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন না। বাচ্চার শিক্ষক কখনো যেন তাদের গোপনীয়তা ভুলত্রুটি অন্যদের বলে না বেড়ায়। বাবা-মা হিসাবে আপনি কখনো লোকজনের সামনে বকাঝকা মারধর করবেন না। অতিরিক্ত দাওয়াদাওয়া ঘুম থেকে ওদের খারাপ করবেন। সাধারণ খাবারদাবার, অল্প ঘুমে অভ্যস্ত করাবেন। এটা বেশি স্বাস্থ্যকর।
ছোটাচোটা দৌড়ের মতো শরীরচর্চা করতে বলবেন। অন্যের দিকে পিঠ ফেরানোর মতো ভদ্রতাও থেকে শাসন করবেন। মানুষের সামনে মুখ না ঢেকে ছাই তোলা হাতি দেওয়া থেকে নিষেধ করবেন।
কোনো খারাপ কাজ যদি তার মধ্যে চলে আসে, তা হলে সেটা যাতে কোনোভাবেই তার অভ্যাসে পরিণত না হয় সেজন্যে সাধারণত চেষ্টা করবেন। কোমল আচরণে কাজ না হলে অপ্রাপ্তবয়স্তর শাসন করবেন।
লুকমান তার ছেলেকে বলেছিলেন, “সন্তানকে শাসন করাটা বীজ রোপণে সারের মতো কাজ করে।”
সন্তানের মাঝে যদি দুষ্টা’মী মনোভাব দেখেন তা হলে কোমল আচরণ করুন। ইবনু ‘আব্বাস বলেছেন, “ছেলেদের মধ্যে দুষ্টা’মী-স্বভাব বাচ্চার বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়।”
সন্তানের ভবিষ্যৎ
জ্ঞানী লোকেরা বলতেন, “প্রথম সাত বছর সন্তান আপনার ফুল। পরের সাত বছর আপনার সেবক। চৌদ্দ বছরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার সাথে যদি ভালো থাকেন তা হলে সে হবে আপনার সঙ্গী। তার সাথে দুর্ব্যবহার করলে সে হবে আপনার শত্রু।”
সাবালক হওয়ার পর সন্তানকে মারধোর গালিগালাজ করবেন না। তা হলে তারা নিজেরা নিজেদের ক্ষতি করার জন্য বাবা-মা’র কাছ থেকে দূরে চলে যেতে চাইবে। বিশ বছর সৌদ্ধার পরও কেউ যদি ধার্মিক না হয়, তা হলে তার জন্য ধার্মিকতা সৌদ্ধা খুব কঠিন হবে। সে যাহোক, সবার সাথেই কোমল আচরণ করবেন।