📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 অতিরিক্ত ভয়, মৃত্যু ভয়

📄 অতিরিক্ত ভয়, মৃত্যু ভয়


অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মাঝে ভয় হয়। অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনার জন্য আগেভাগে যে প্রস্তুতি নিয়ে রাখে সে-ই তো বুদ্ধিমান মানুষ। যা ঘটা অনিবার্য তা নিয়ে অহেতুক চিন্তা তারা করে না। কারণ, এ ধরণের চিন্তায় কোনো ফায়দা নেই।
অনেক ধার্মিকদের মনে আল্লাহর ভয় খুব বেড়ে গিয়েছিল। এতটাই যে আল্লাহর কাছে দু'আ করতে হয়েছে তা কমিয়ে দেওয়ার জন্য। ভয় ব্যাপারটা চাবুকের মতো। একটা উটকে যদি লাগাতার চাবুকপেটা করতেই থাকেন, ওটা তা হলে মানসিক অশান্তিতে থাকবে। সময়ে সময়ে অলসতা দেখা দিলে তখন চাবুক করতে চাবুক ওঠাতে হয়।
সুফিয়ান আস-সাওরী১ সঙ্গে একবার এক যুবক কথা বলছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি আল্লাহকে একদম পুরোপুরি ভয় করতে চাও?”
“হ্যাঁ!”
“বোকা! তুমি যদি তাঁকে একদম পুরোপুরি ভয় করো তা হলে ফার্দ (ফরজ) কাজও ঠিকঠাকভাবে আদায় করতে পারবে না!!”১

অতিরিক্ত ভয়
বুদ্ধিমান লোক কখনো অশেষ ভোগা নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পাবে না। কারণ, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অসুবিধাবশত তো হবেই। যা ঘটবে তা নিয়ে ভয় করতে শুধু কষ্টই বাড়ে।
মৃত্যুভয় আর এ নিয়ে দুশ্চিন্তা— এ দুটো মন থেকে তাড়ানো সহজ নয়। তবে যা করলে কিছুটা সহজ হতে পারে তার কিছু উপায় বাতলে দিচ্ছি। মৃত্যু তো হবেই। ভয় করে কোনো লাভ হবে না। ভয় করলে শুধু ভয়ই বাড়ে। কেউ যখন মৃত্যুর কথা ভাবে তখন সেটা তার মনের আবেগাকে ভীষণ আলোড়িত করে। এজন্য মনের ভেতর এর ছবি চিন্তা করা যাবে না। ঘৃণা করলেও মরলে তো একবারেই মরবেন, বারবার না। তাই অহেতুক এর চিন্তা বাদ দিলে সহজ হবে।
দেখুন, আল্লাহ চাইলেই এটা আপনার জন্য সহজ করে দিতে পারেন। তাছাড়া মৃত্যু চেয়ে বড় মৃত্যুভয় প্রায় যা হবে তা আরও বেশি রক্ত হিম করে দেয়। মৃত্যু আমাদের চিরকালীন নিবাসের সদর দরজা। এজন্য শুধু ভয়ের জন্য মৃত্যুভয় না, মৃত্যুর জন্য কাজ করা উচিত আমাদের।
এই সবুজ-শ্যামল দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবলে অনেকের আফসোস হয়। সত্যি কথা বলতে এই দুনিয়া কোনো তৃপ্তির জায়গা না। বরং এটা ছেড়ে যাওয়াতেই আনন্দ তৃপ্তি। এটা পাওয়ার জন্য কারও কান্না দেওয়া ঠিক না। বুদ্ধিমান মানুষ দুনিয়া ছেড়ে যেতে কেন কষ্ট পায় জানেন? আর এটা দিন সে ভালো ভালো কাজ করে যেতে পারল না বলে। আমাদের আগেকার সলফেকাও শুধু একারণেই মৃত্যুভয় করে পেতেন।
মৃত্যুশয্যায় সাহাবি মু‘আয ইবনু জাবাল ﷺ বলেছিলেন, আল্লাহ, আপনি জানেন আমি এই দুনিয়ায় থাকতে ভালোবাসি না। এর প্রবহমান নদীর সৌন্দর্য কিংবা গাছগাছালির অরণ্যের টানে বেশিদিন বাঁচার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। বরং এই ভালোবাসা ছিল দাবাদাবের দিনগুলোতে সিয়াম পালন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘যিবাদের কাজগুলো সেবে যেতো। আপনার স্মরণে ‘আলিমদের মাজলিসগুলোতে শরীক হতাম।

মৃত্যুর সময়ে শয়তানের টোপ
মৃত্যু সময়টা খুব যন্ত্রণাদায়ক। প্রচণ্ড কষ্টের। একদিকে ভালোবাসার সব জিনিস, প্রিয় মানুষ ছেড়ে যাওয়ার ব্যথা, অন্যদিকে মৃত্যুর বিভীষিকা, সম্পদের মায়া। শয়তান তাই এই সুযোগটার পূর্ণ ‘সদ্ব্যবহার’ করে।
সে কানপড়া দিতে শুরু করে: ‘কী অবস্থা তোমারা! কেন মারা যাচ্ছ? খুব কষ্ট লাগছে? তোমার স্ত্রী-সন্তান ছেড়ে কোথাকার কোন মাটির নিচে জায়গা হবে তোমার!’
এগুলো বলে বলে সে মানুষকে তার প্রভুর প্রতি বিদ্বেষী করার টোপ ফেলো। আল্লাহর নির্ধারিত নিয়তির প্রতি ঘৃণা জাগাতে চায়। তাকে দিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা বলায়। কিংবা উইল করার সময় দেখা যায় তাকে দিয়ে অন্যায় পক্ষপাত করাচ্ছে। নশ্বরদের একজনের চেয়ে অন্যকে হিস্সার চেয়ে বেশি দিয়ে দিচ্ছে। এরকম আরও বহু বেইনসাফি কাজ করায়। এজন্য শয়তানের এই টোপ এড়ানোর উপায়, নিজেদের শুদ্ধ করার পন্থা জানা খুব খুব জরুরি।
আবূ আল-উদ্দুর  বলেছেন নবিজি ﷺ একটা দু‘আ প্রায়ই করতেন: أَعُوْذُ بِكَ أَنْ يَتَخَبَّطَنِي الشَّيْطَانُ عِنْدَ الْمَوْتِ আ‘উযু বিকা আন ইয়াতাখাব্বাত্বানিশ্-শাইতানু ‘ইন্দাল-মাওত। (আল্লাহ) আপনার কাছে আমি মৃত্যুর সময় শয়তানের ধোঁকা থেকে আশ্রয় চাই।
অগ্রিম সেই সময়ে শয়তান তার অনুচরদের বলে, “এই মরণের সময় যদি ওকে ভুল পথে নিতে না পারো, তা হলে আর জীবনেও পারবে না!”
কঠিন এই পরীক্ষায় উত্তরানোর উপায় হচ্ছে সুস্থ অবস্থায় আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন থাকুন। তা হলে কঠিন সময়ে আল্লাহ ‘নিজে’ আপনাকে হেফাজত করবেন। আপনার চিন্তাভাবনায় যদি সব সময় আল্লাহকে স্থান দেন, তা হলে তিনি আপনার অপ্রত্যাশিত আজেবাজে কাজে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করবেন। এই প্রসঙ্গেই নবিজি ﷺ বলেছেন, আল্লাহকে স্মরণ রাখো। তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহকে স্মরণ রাখো, তোমার সামনে তাকে খুঁজে পাবে। ভালো সময়ে যদি তাঁকে চেনো, তা হলে তোমার কষ্টের সময়েও তিনি তোমাকে চিনবেন।১/
ইউনূস নবির কাহিনিতে আপনার অনেকের মনে থাকার কথা। আল্লাহর শাস্তি ধারুক তার উপর। দুঃসহনীয় কষ্ট থেকে শুধু ভালো কাজের বদৌলতে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রসঙ্গে ক্বুর‘আনে আল্লাহ বলেছেন, “সে যদি আল্লাহর গুণগানকারী দাস না হতো, তা হলে কিয়ামতোর দিন পর্যন্ত ওভাবে (মাছের) পেট থেকে যেত। [আল-সাফফাত, ৩৭:১৪৬-১৪৪]
অন্যাদিকে ফিরআউন যখন অথৈ পানিতে ডুবে মরছিল, কোনো ভালো কাজ তার ঝুলিতে ছিল না। যার বিনিময়ে সে উদ্ধার পেতে পারতো। তাকে তখন বলা হয়েছিল:
“এখন বিশ্বাস করলে! অথচ আগে মুখ ফিরিয়ে ছিলে! তখন তো ছিল দুষ্কৃতকারী!” [হূদ, ১০:৫১]
দুনিয়াবিমুখ মনীষী ‘আব্দুস-সামাদ মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, “মালিক। এই মুহূর্তটির জন্যই আপনাকে দয়া করে রেখেছিলাম। সুস্বাস্থ্যের সময় যে বেখবর থাকবে, অসুস্থ সময়ে তাকে পাওয়া দেওয়া হবে না।”
বর্ণিত আছে কোনো এক সাহাবি এক বৃদ্ধ লোককে ভিক্ষা করতে দেখে বলেছিলেন, “যুবক বয়সে আল্লাহর হুকুমে ব্যাপারে সে বেখবর ছিল। এজন্য আজ বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাকে উপেক্ষা করছেন!”
মৃত্যুযন্ত্রণার কঠিন সময়টা পার করতে নিজেকে উৎসাহ দিয়ে যান। এই যন্ত্রণা শিগগিরই এর অবসান ঘটবে। এরপর পূর্ণ শান্তি। নবিজি ﷺ বলেছেন, “আজকের পর থেকে তোমার বাবার আর কোনো যন্ত্রণা ছুঁতে পারবে না!”১/
আবূ বাকর ইবনু ‘আইয়াশ মৃত্যুর সময়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছেন, “আশিটি রমাদান যার জন্য সিয়াম পালন করেছি, আজ এই সময়ে আমি কি তাঁর কাছে প্রত্যাশা রাখব না!”
আল-মু‘তামির ইবনু সুলাইমান বলেছেন, “[মৃত্যুর সময়] আমার বাবা আমাকে বলেছেন, ‘বাবা, আমাকে এরকম কিছু হাদীস শোনাও যেথাানে আল্লাহর হাড়ের কথা আছে। আমি চাই যখন আল্লাহর সাথে দেখা হবে তখন যেন ভালো আশা নিয়ে দেখা করতে পারি।’
একজন বিশ্বাসী তাই ভয়কে রেটিয়ে বিদায় করবে। ঠিক যেমন একজন উচ্চপদস্থ মরহুম দমি পথি পাতি দিতে তার উচ্চ শোধায়: তোমার জন্য সুসংবাদ!
কাল তুমি দেখতে পাবে ঘন অরণ্য আর পর্বত
নবিজি ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ বলেছেন, “আমার দাস আমাকে যেমন ভাবে তেমনি।”১/
জাবির  বলেছেন, “আল্লাহর রাসুল ﷺ মৃত্যুর দিন দিন আগে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ প্রতি সুধারণা না রেখে মৃত্যুবরণ করো না!”২/
আল-ফুযাইল ইবনু ‘ইযাদ বলেছেন, “এমনিতে তো ভয় আশার চেয়ে ভালো। কিন্তু মৃত্যুর সময় আশা রাখাটা ভালো।”
তিনি ঠিকই বলেছেন। ভয় অলস মানুষকে চাবুকের মতো তাড়া করে ফেরে। উট কাহিল হয়ে পড়লে আমরাও কিছুটা ছাড় দিতে হবে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে মৃত্যুর সময় খালীফাহ ‘উমার ইবনু ‘আবদুল-আযীযের ভয় কেন অত ভীষণ ছিল, তা হলে বলব, দায়িত্বের প্রতি পরম নিষ্ঠা থেকে তার মনে এই ভয় এসেছিল। মনের গভীরে মানুষের অধিকার পূরণে সারাক্ষণ একটা তাগাদা ছিল তার। তিনি বলতেন, “এই নেতৃত্বে আমার বড় ভয়!” তিনি তার কথাকাজকে সহ ছিলেন।
ইবনু ‘আব্বাস তাকে যখন বললেন, “আমীরুল-মু‘মিনীন, সুখবর নিন। আপনাকে নেতৃত্বের ভার দেওয়া হয়েছিল। আপনি তা ঠিকঠাক পালন করেছেন। শহীদ হিসেবেও মৃত্যুবরণ করবেন।”
তিনি তখন তাকে বলেছিলেন, “ইবনু ‘আব্বাস! আল্লাহর সামনে এই সাক্ষী দেবেন তো?”৩/

তীব্র কষ্ট
অসুস্থ রোগীর যদি কষ্ট খুব বাড়ে, তা হলে সেটা পুরস্কার সাওয়াব হিসেবে দেখা উচিত। আমাদের আলেমগণ সৎ লোকদের অসুস্থ লোকের কষ্টের তীব্রতাকে পছন্দ করতেন। কারণ, এটা পাপ মুছে দেয়।
বর্লিত আবু ইবরাহিম বলেছেন, "মৃত্যুর সময়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণাকে তারা পছন্দ করতেন।"
'উমার ইবনু ‘আবদুল-’আযীয বলেছিলেন, “আমি চাই না মৃত্যুর ভীষণ কষ্ট আমার কমে যাক। একজন মুসলিমের পাপ মোচনের এটাই তো শেষ সুযোগ।”

তাওবাহ
যতক্ষণ হুঁশ থাকে অসুস্থ রোগীকে ততক্ষণ তাওবাহ করে যেতে হবে। তা হলে সে আল্লাহর কাছে পরিশুদ্ধ অবস্থায় যেতে পারবে। ওসিয়াতনামাও লিখে যেতে হবে। স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানকে আল্লাহর ভরসায় রেখে যেতে হবে। কারণ, যারা ধার্মিক আল্লাহ তাদের সহায়তা করেন। হেফাজত করেন।

আশা রাখা
মৃত্যুপথযাত্রীকে শয়তান যদি খুব বেশি জ্বালাতন করে, মরে গেলে কী হবে কী হবে এসব মনে করিয়ে তাকে উদ্ব্যক্ত করতে থাকে, তা হলে তার জেনে রাখা উচিত জাহাজের সফরকারীরা নেমে গেলে জাহাজ পরিত্যক্ত হয়। মানুষ না। শারী‘আহ বলেছে মৃত্যুর পর একজন বিশ্বাসী চিরআনন্দে বসবাস করবে। কাজেই যার বিশ্বাস ঈমান পোক্ত তার তো ভয় পাওয়ার কথা না। তার গন্তব্য তো ভালো জায়গায়। এখন যদি ঈমান শক্ত না থাকে তা হলে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার অবশ্যই অনেক কারণ আছে।
নবিজি ﷺ বলেছেন,
“মুসলিমদের আত্মা তো পাখির মতো। যতক্ষণ না আল্লাহ ওটাকে কোনো মুসলিমের শরীরে ফেরত পাঠান ততক্ষণ জামাতের গাছে তা ঝুলে থাকে!”২
মৃত্যু নিয়ে এগুলো কথার মূল কারণ ছিল আমরা যেন মৃত্যুকে ভয় করতে গিয়ে টালমাটাল হয়ে না পড়ি। তা না হলে শরীর নিঃশেষ হয়ে যাবে। আবার একেবারে ভয়ডরহীন হলেও চলবে না। মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে যেতে হবে।

টিকাঃ
১। তিনি ইসলামের অন্যতম মহান এক ইমাম। তাকে হাদীস শাস্ত্রের গুরু নাম এক নামে চিনত সবাই। অসীম জ্ঞানের ও অসাধারণ দখল ছিল। ইমাম মালিক-সহ আরও অনেকের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি ৭৭৮ সালে মারা যান।
১/ আবূ দাউদ ১১২৪-১২৫৬। আন-নাসাই (১/২৭০) আবু ‘আযারের মুক্ত দাস-সূত্রে আব্দুল-উদ্দুর থেকে বলেছেন, নবিজি ﷺ এই বলে দু‘আ করতেন, “আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ভূমিকম্প থেকে মরা থেকে, ডুবে মরা থেকে, আগুনে পুড়ে মরা থেকে, জরাজীর্ণ হয়ে মরা থেকে আশ্রয় চাই। মৃত্যুর সময় শয়তানের ফন্দি থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। জিহ্বাতন্দ্র অবস্থায় গালিয়ে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই। বিষের হুলে মরে যাওয়া থেকেও আশ্রয় চাই!”
আল-খাওয়াযী বলেছেন, “মৃত্যুর সময় শয়তানের ধোঁকা তিনি একারণে আশ্রয় চাইতেন, যাতে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় শয়তান তাকে পাকড়াও করতে না পারে। তাওয়াহ করা থেকে বাধা দিতে না পারে। নিজের কাজকর্ম সংশোধন করতে বাধা দিতে না পারে। আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ না করতে পারে। মৃত্যুকে ঘৃণা করতে না পারে। এই দুনিয়ার জন্য আফসোস না করায়। নবির বরকতের পথযাত্রায় তিনি আল্লাহর বিধিতে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়তেন। তার শেষ পরিণতি হতে অসন্তপ্ত। আল্লাহর উপর নাখোশ অবস্থায় তিনি তাঁর সামনে দাঁড়াবেন।
“ভয় মৃত্যু সময় শয়তান সবতোজে কঠিন চাপটা চল। সে তার অনুচরদের বলে, ‘ধরো! একে! আজ যদি না পারো আর কখনো একে ধরতে পারবে না।”
“আমরা আল্লাহর কাছে শয়তানের খারাপি থেকে আশ্রয় চাই। তাঁর কাছে মৃত্যুর সময় করুণা চাই। শুভপরিণতি চাই।”
১/ আবূ তিরমিযী ১২৬১। হাদীসটি তার মতে হাসান সহীহ। আরও বর্ণনা করেছেন আহমদ ১/৩০৭-৩০৮। আল-বায়হাকী, শু‘আব-উল-ইমান এর আল-আসমা‘ ওয়াস-সিফাত পৃষ্ঠা ৭৬। আরও দেখুন দুরাবুল-মানসুর ১/৬৬। তাফসীর ইবনু কাসীর ৭/২১।
১/ ইবনু মাজাহ ১৫২৫।
১/ বুখারি, মুসলিম
২/ মুসলিম
৩/ আবূ সঠিক দিকনির্দেশিত খালীফাহ ‘উমার ইবনু ‘আব্দুল-আযীয যখন মৃত্যুমুখে হয়, মৃত্যুশয্যায় ইবনু ‘আব্বাস তখন তার ঘরে এলেন। তাকে বললেন, “সুখবর নিন আমীরুল-মু‘মিনীন। লোকজন যখন অবিশ্বাস করছিল আপনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অন্যরা যখন নবিজিকে ﷺ ছেড়ে গিয়েছিল আপনি তখন তার পাশে থেকে লড়াই করেছেন। আপনার উপর খুশি থেকে তিনি মারা গেছেন। আপনার খিলাফতের সময় লোকেরা হিম্মত করেনি। শহীদ হিসেবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছেন আপনি।”
তিনি বলতেন, “যা বলবেন আবার বলুন তো!”
আমি আবার বললাম।
তিনি বললেন, “একমাত্র সত্য উপাস্য আল্লাহর কসম, পৃথিবীর সোনাকপুর সব যদি থাকত, তার বিনিময়ে আমি বিচারদিনের বিভীষিকা থেকে নিস্তার পেতে চাইতাম।” [মুসনাদ আহমাদ ১/৪৪, আল-বায়হাকী, ইসরাহ্ ‘আসাদ্দুল-কাফ্‌র]
২ বুখারি, আত-তারীখুল-কাবীর ৫/৩০৬, আল-মুনযিরী ১/৭৬, আত-তাবরানী, আল-কাবীর ১৯/৬৪১

📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 খুশি

📄 খুশি


হঠাৎ খুশি ঝকায় রক্তের উচ্ছ্বসিত হতে হয়। সেটা শরীরের ক্ষতি করতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে, যদি সেটাকে প্রশমিত না করা হয়। খুশির কোনো কারণ, পেলে সেদিকে ধীরে ধীরে যাওয়া উচিত। ইউসুফ (‘আলাইহিস-সালাম) নবির সাথে যখন তার ভাইদের দেখা হলো, সে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবা আছে?” তিনি তখন তার সাথে গদগদি করছিলেন, যাতে হঠাৎ আনন্দের সংবাদে সে চমকে না যায়।
খুশিটাও মাপমতো হতে হবে। ঠিক দুঃখের মতো। সীমাহীন খুশি খাম-খেয়ালিপনায় ডুবে থাকার আলামত। জ্ঞানবুদ্ধিওয়ালা মানুষের জন্য সীমাহীন উল্লাস অযৌক্তিক। আনন্দের জিনিস মনে উল্লাস করে বটে, কিন্তু যখন তার গন্তব্যের কথা মনে পড়ে, দিনশেষে কোথায় যাত্রা ফুরোবে সে কথা মাথায় আসে, তখন তার উল্লাস রং হারায়। খুশির খামখেয়ালীপনা মারাত্মক বেড়ে গেলে মানুষ মহোল্লাসে মাতে। বেপরোয়া হয়ে যায়। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন,
“আল্লাহ উল্লাসকারীদের ভালোবাসেন না।” [কাসাস, ২৮:৭৬]
এই অসুখ থেকে মুক্তি পেতে অতীত পাপ আর ভবিষ্যৎ বিপদাপদ নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন।
আল-হাসান আল-বাসরী বলেছেন, “মৃত্যু এই দুনিয়ার গোমর ফাঁসি করে দিয়েছে। জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জন্য এটা আর কোনো খুশির উপকরণ বাকি রাখেনি।”১

টিকাঃ
১ আহমাদ ইবনু হান্বাল, আয-যুহদ, পৃষ্ঠা ৮৬। ইবরাহিম ইবনু ‘ঈসা আল-যাশকারী সূত্রে।

📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 আলসেমি

📄 আলসেমি


বেকার বসে থাকা, আরাম ভালো লাগা আর পরে থাকা কাজটার কঠিনতার চিন্তা থেকে আলস্য বাসা বাঁধে। আনাস ইবনু মালিক বলেছেন, নবিজি ﷺ হামেশা দু‘আ করতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ
আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা মিনাল-হাযমি, ওয়াল-হুজনি, ওয়াল-’আজমি ওয়াল-কাসাল।
আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কষ্ট, দুশ্চিন্তা, বুড়ো বয়স আর অলসতা থেকে আশ্রয় চাই।১
সক্রিয় বিশ্বাসীদের ব্যাপারে নবিজি ﷺ বলেছেন,
“দুর্বল মু’মিনের চেয়ে শক্তিশালী মু’মিন আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।”২
সব সময় যাতে ফায়দা হবে তাতে লেগে থাকুন। আল্লাহর সাহায্য চান। হাল ছেড়ে বসে থাকবেন না। মুসিবাতে পড়ে গেলে বলবেন না ‘যদি ওটা করতাম তা হলে এটা হতো না’ বরং বলুন, ‘আল্লাহ এটাই ভাগ্যলিপিতে লিখে রেখেছিলেন। তিনি যা চান তা-ই হয়। ‘যদি’ শব্দটা শয়তানের দিকে যাওয়ার রাস্তা খুলে দেয়।
ইবনু মাস‘ঊদ  বলেছেন, “দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কাজ না করে যে অলস বসে থাকে তাকে আমি প্রচণ্ড ঘৃণা করি।”১ তিনি আরও বলেছেন, “দুনিয়ার শেষ সময়ে কিছু লোকের সেরা কাজ হবে বসে বসে অন্যের নিন্দা করা। এসব লোকের আকার নাম কুঁড়ো।”
ইবনু ‘আব্বাস  বলেছেন, “টিলেমি অলসতাকে বিয়ে করেছে। আর তারা জন্ম দিয়েছে দারিদ্রিক।”
মালিক ইবনু দীনার বলেছেন, “প্রত্যেক ভালো কাজের আগে বিপত্তি থাকে। যে তা সহ্য করবে সে আরাম পাবে। ভয় পেলে ফিরে আসতে হবে।”
সুফয়ান আস-সাওরী বলেছেন, “লোকজন দুর্ভাগামী ঘোড়ায় চড়ে ছেড়ে দিয়েছে। আমরা এখন বসে আছি অলস উটের পিঠে।”

অলসতার ওষুধ
আলসেমির ওষুধ হচ্ছে, নিজেকে তাগাদা দিন: বসে থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না। নিশ্চিত হতে হবে। পরে চলে যাওয়া সময় নিয়ে আফসোসদের দহনে পুড়তে হবে নিজেকে। কোনো কর্মঠ লোকের সফলতা যখন চোখে পড়বে তখন এই আফসোস হবে আপনার সবচেয়ে কস্টকর সাজা। জ্ঞানবুদ্ধিওয়ালা মানুষ অলসতার নেতিবাচক পরিণাম নিয়ে ভাবে। বেশিরভাগ সময়ই অলসতার পরিণামে পরে কপাল চাপড়াতে হয়।
যখন দেখবেন আপনার প্রতিবেশী মুনাফা নিয়ে ঘরে ফিরছে আর আপনি বসে বসে অন্ন ধ্বংস করেছেন তখন কি আপনার খারাপ লাগবে না? কিংবা কেউ জ্ঞান অর্জনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে অথচ আপনি কিঞ্চিৎ অলস বসে সময় নষ্ট করেছেন। তখন কি আপনার আফসোস হবে না? এদু’টো কথা একারণেই বললাম যে, আরামে থাকার যে-মজা, ভালো কিছু ছুটে যাওয়া বা ব্যথা তার চেয়ে অনেক বেশি।
আরাম আর আলসেমিতে যে জ্ঞান আহরণ করা যায় না এ ব্যাপারে কোনো সমঝদার মানুষ অমত করবেন না। যে কুঁড়েমির পরিণাম জানে সে তা এড়িয়ে চলবে। কঠোর পরিশ্রমের ফল যে জানে সে তার যাত্রাপথের নানা কষ্ট দাঁত দাঁত চেপে সহ্য করবে। বুঝদার মানুষ জানে অনর্থক তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। এই দুনিয়ায় সে একজন ভাড়াটে শ্রমিক বা ব্যবসায়ীর মতো।
দুনিয়াতে ঠিক কী পরিমাণ সময় থাকি আমরা? কিংবা কবরে? পরকালের অন্তহীন জীবনের তুলনায় এর ব্যক্তি এক মুহূর্তের চেয়ে বেশি কিছু না।
আলসেমি অসুস্থ থেকে উদ্ধার পেতে কর্মঠ উদ্যমী মানুষের জীবনী পড়ুন। তাদের কাজকর্ম নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন। বীজ বপনের মৌসুমে যে ঘরে বসে বসে তা দিয়ে ফসলকাটার মৌসুমে ঘরে ফসল তোলার সুসংযোগ নষ্ট করে তাকে দেখে অবাক লাগে আমার।
ফারকাদ বলেছেন,
কাছেজ নামার আগেই আপনি আরামের পোশাক গায়ে চাপিয়ে নিয়েছেন। শ্রমিকেরা কীভাবে কাজ করে সেটা কি খেয়াল করেছেন? ওরা কমদামি একটা পোশাক গায়ে জড়িয়ে কাজ শুরু করে। কাজ শেষ হলে পরে গোসল করে পরিষ্কার দুটো কাপড় পরে নেয়। আর আপনি কাজ করার আগেই আলসেমির পোশাক মুড়ে শুয়ে আছেন।

টিকাঃ
১ বুখারি ۸/۱۸, মুসলিম পৃষ্ঠা ২০৭۹, ۲۰۸۰, ২০৮۱。
২ মুসলিম, কিতাবুল-কাদর ৬৪।
১ আবূ নু‘আইম, আল-হিলয়াহ্, ১/১৬০। ইয়াহ্ইয়া ইবনু ওয়াসাদ্ সূত্রে।
২। হিলয়াতুল-আওলিয়া’ ৬/৪৭। ইবনু শাওসাব সূত্রে।

📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 নিজের দোষ শনাক্ত করা

📄 নিজের দোষ শনাক্ত করা


মানুষ নিজেকে নিজে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষের খুঁত কি আর চোখে পড়ে? তবে কিছু কিছু লোক তাদের আত্মশুদ্ধির সংগ্রামে এতটাই দৃঢ়চেতা, তারা নিজেদেরকেই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবেন। যেকারণে তারা নিজেদের দোষ ত্রুটি দেখতে পান।
ইয়াস ইবনু মু’আওয়াইয়াহ বলেছেন, “যে নিজে তার দোষ জানে না সে বোকা।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনার দোষ কী?” তিনি বললেন, “বেশি কথা বলা।”
তবে ইবনু মু’আওয়াইয়াহ মতো নিজে নিজের খুঁত খুঁজে পাওয়াটা বেশ বিরল। মানুষ সাধারণত তাদের নিজেদের খুঁত গোপন করে রাখে। তবে অনেকেই আছেন যারা নিজেদের ভুলত্রুটি সম্পর্কে সজাগ। বুদ্ধিমান মানুষ নিজের সমস্যা নিজেই ধরতে পারেন। তবে গুপ্ত খুঁতগুলো ভয়ংকর। এগুলো শরীরের ভেতরে ভেতরে গোপনে বাসা-বাঁধা অসুখের মতো। ডাক্তার এগুলো ধরতে পারে না। সেজন্য ওষুধও দিতে পারে না। রোগের কোনো লক্ষণই যে তারা খুঁজে পান না, ওষুধ দেবেন কীভাবে? তাছাড়া মানুষের নিজের প্রতি ভালোবাসাও তার ভুলগুলোকেই ভুল হিসেবে দেখায় না।
একজন কবি লিখেছেন,
তুষ্টি চোখ ভুল দেখে না ভুল দেখে রুষ্ট চোখ
দুজন লোক হেঁটে হেঁটে আলাপ করছিলেন। যাবার সময় একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার ভুলত্রুটির কথা বলুন তো ভাই।” অন্যজন জবাবে বললেন, “আমাকে বাদে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করুন। আমি আপনাকে সর্বদাই চোখে দেখেছি।”
জিজ্ঞেস করতে পারেন, খুঁত যদি গোপন থাকে, আর মানুষ সেটাকে খুঁত হিসেবে না-ই দেখে, তা হলে শনাক্ত করব কীভাবে? এর সাতটি উপায় আছে।
প্রথম উপায়: নিজের বন্ধুবান্ধব বা চেনাজানাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানীগুণী ও বিচক্ষণ লোককে নিজের দোষগুণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। তাকে জানান এটা আপনার জানার জন্যই। এরপর সে যখন আপনাকে একে একে তার দোষত্রুটিগুলো বলবে, তখন তাতে মন কালো করা যাবে না। কষ্ট পাওয়া যাবে না। তা নাহলে সে আপনার ভুলত্রুটি বলা বন্ধ করে দেবে। তাকে বলে দিতে হবে, “তুমি যদি আমার কিছু গুণও তা হলে ভাবো তুমি ধোঁকাবাজ।”
দ্বিতীয় উপায়: প্রতিবেশী, ভাইবেরাদার, যাদের সাথে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয় তাদের থেকে নিজের নিজের দোষ জেনে নিন।
তৃতীয় উপায়: নিজের ব্যাপারে শত্রুদের মনোভাব জানাটাও বেশ কাজের হবে। শত্রু সব সময় আপনার ছিদ্র খোঁজে। এগুলো আমলে নিলে বন্ধুর চেয়ে বরং শত্রুর থেকেই বেশি লাভবান হবেন। শত্রু খুঁজে খুঁজে দোষ বের করবে। আর বন্ধুরা তা লুকিয়ে রাখে।
চতুর্থ উপায়: নিজেকে অন্যের চোখে দেখুন। সেই চোখে যেটা ভালো লাগছে সেটা রেখে দেবেন। আর যেটা ভালো লাগছে না সেটা ছেড়ে দেবেন।
পঞ্চম উপায়: ভালো ও মন্দ চরিত্রের ফল আর পরিণাম নিয়ে ভাবুন। তা হলে ভালো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ফলে যে-ভালো ফল আসে সেটা যেমন জানবেন, তেমনি খারাপ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিণাম কী হবে সেটাও তার ধারণা হবে। নিজের ব্যাপারে এটি ভাবনা বেশ শক্তিশালী।
ষষ্ঠ উপায়: শারি’আর পাল্লায় নিজের সব কাজগুলোকে মাপুন। আত্মজিজ্ঞাসাসম্পন্ন মানুষদের থেকে আপনার বিভিন্ন কার্যকলাপের ব্যাপারে মন্তব্য নিন। সুচিন্তাদের পাল্লায় ওজন করুন। তা হলেই খারাপ আর ভালোর পার্থক্য চোখে পড়বে আপনার।
সপ্তম উপায়: যারা তাদের জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করেছেন সেসব মানুষের কাহিনি পড়ুন। তারপর তাদের কাজের সাথে নিজের কাজকর্মের তুলনা করুন। এতে করে খারাপ কাজ তো পরের কথা, নিজের ছোটখাটো অসংগতিগুলোকেই ভুল মনে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00