📄 রাগ
রাগ জিনিসটা মানুষের স্বাভাবিক বিষয়। এটা আছে বলেই নানা ক্ষতি থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারে। কেউ তার ক্ষতি করলে প্রতিশোধ নিতে পারে। তবে রাগটা খুব বেশি হয়ে গেলে সমস্যা। অতিরিক্ত রাগ মানুষের বিবেকবোধকে নষ্ট করে ফেলে। সে তাল হারিয়ে ফেলে। তার জীবনযাপন হয় অসহ্যতা। দেখা যায়, সে তখন এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যার পরিণাম নিজেকেই ভোগ করতে হচ্ছে; যার উপর রাগ করা হয়েছে তাকে না।
রাগ একধরনের উত্তাপ। কোনো কিছু যখন কাউকে রাগের উস্কানি দেয় তখন তা গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিशोध নেওয়ার জন্য কামনার রক্তকে টগবগিয়ে ফুটিয়ে দেয়। কখনো এর কারণে জ্বরও হতে পারে।
রাগের মূল কারণ, সাধারণত অহংকার। কারণ, কোনো মানুষ কখনো এমন কারও ওপর রাগ করতে পারে না যার অবস্থান তার চেয়ে উঁচুতো।
এই রোগের ওষুধ হচ্ছে যেভাবে আছেন সেই অবস্থা বদলাবেন। যদি কথা বলতে থাকেন তা হলে চুপ হয়ে যাবেন। দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়বেন। বসে থাকলে শুয়ে যাবেন। এভাবে অবস্থান বদলে ফেললে মাথা ঠান্ডা হবে।
রাগের মুহূর্তে যদি ঐ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে পারেন এবং যার উপর রাগ তার থেকে দূরে সরে যেতে পারেন, তা হলে তো আরও ভালো হয়। এর সাথে রাগ দমনের ফযিলত নিয়ে তাবলেও কাজ দেবে। যারা রাগ দমন করতে পারে আল্লাহ নিজ তাদের তারিফ করেছেন। দেখুন আল্লাহ কী বলেছেন,
যারা তাদের রাগ দমন করে, মানুষকে ক্ষমা করে—আল্লাহ এ ধরনের সৎকর্মশীলদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। [আলি ইমরান, ৩:১৩৪]
হতে পারে হয়তো আপনার কোনো পাপের কারণে এরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এগুলো সবই তো আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যলিপি। এসব মাথায় রাখলে রাগ-ক্রোধ সংবরণ আপনার জন্য সহজ হবে।
রাগ নিয়ে নবিজীর বাণীও আচরণ
রাগ নিয়ে নবিজীর অনেক হাদীস আছে। আবু হুরায়রাহ্ বলেছেন: এক লোক নবিজীর কাছে এসে বলল, “আমাকে উপদেশ দিন” তিনি বললেন, “রাগ করো না।” লোকটা বারবার তাঁকে উপদেশ দেওয়ার অনুরোধ করতে লাগল। আর নবিজীও বারবার একই উত্তর দিলেন, “রেগে যেয়ো না।”১
অপর এক সময়ে নবিজী বলেছেন, শক্তি খাটিয়ে যে মানুষে পরাস্ত করে সে শক্তিশালী না। রাগের সময়ে যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে-ই শক্তিশালী।২
বুখারী মুসলিম থেকে আরেকটি হাদীস; সুলাইমান ইবনু সার্দ বলেছেন, “একদিন নবিজী সাথে বসে আছি হঠাৎ দেখি দুজন লোক একে অপরকে অভিশাপ দিচ্ছে। একজনের চেহারা তো রাগে ফুলোফুলি লাল হয়ে গেছে। গলার রগগুলোও ফুলে গেছে। এই অবস্থা দেখে নবিজী বললেন, “আমি একটা কথা জানি। সে যদি এটা বলে তা হলে তার ভেতরের জিনিসটা চলে যাবে। সে যদি বলে, আ‘উযু বিল্লাহি মিনা-শ শাইত্বানির-রাজীম (আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই),৩ তা হলে তার রাগ চলে যাবে।”
কেউ একজন তাদের বলল, “নবিজী তোমাদেরকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন।” এটা শুনে ঐ লোক বলল, “আমি কি পাগল?”
রাগ নিয়ে নবিজীর আরও একটি অমৃতবাণী: কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রেগে গেলে সে যেন বসে যায়। তারপরও যদি রাগ না যায় তা হলে সে যেন শুয়ে পড়ে।”১
আল-আশআযী বলেছেন, “কেউ যখন দাঁড়িয়ে থাকে সে তখন কিছু একটা করার বসার মতো অবস্থায় থাকে। কিন্তু বসে পড়লে তার থেকে এ ধরনের আশঙ্কা কম থাকে।”
নবিজীর আরেকটি কথা: রেগে গেলে চুপ হয়ে যাও।”২
আল-আহনাক বলেছেন, “রাগের মাথায় অর্ধেক প্রকৃতির শয়তান মেজাজকে বসে রাখতে দেয় না।"
অতিরিক্ত ক্রোধ
রাগে মাথায় রক্ত চড়ে গেলে যদি নিজেকে ঠান্ডা না করেন, তা হলে সে নিজের ক্ষতি করবেন। নয় যার উপর রাগ করেছেন তার। আর পরে দেখা যাবে ঠিকই সেটা নিয়ে মাথা কুটেছেন।
রাগের মাথায় কত লোক কত মানুষকে মেরে ফেলেছে! গায়ে হাত তুলেছে! বাচ্চাকাচ্চাকে মেরে হাত-পা পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে! পরে জীবনভর এগুলো নিয়ে হায় হায় করেছে। কেউ কেউ তো নিজেরই বারোটা বাজিয়েছে!
এক লোক রাগের মাথায় এত জোরে গলা টিপে চিৎকার করেছে যে মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে সাথে সাথেই মারা গিয়েছে। আরেক লোক মেজাজ হারিয়ে অন্য লোকে ঘুষি মেরে নিজেই নিজের আঙুল ভেঙে ফেলেছে। যাকে ঘুষি মেরেছিল তার কিচ্ছুই হয়নি।
এই রোগ থেকে বাঁচতে চাইলে প্রথমে কল্পনা করুন রেগে গেলে আপনার চেহারার কী হাল হয়, আর শান্ত থাকলে কেমন থাকে। তখন বুঝবেন রাগ একধরনের পাগলামি। লাগামহীন অবস্থা। কোনোভাবেই যদি মনকে রাগে আনা সম্ভব না হয়, তা হলে নিজেকে নিচে শার্ট দিন: ঠিক আছে অবস্থান বদল করার পর যা করার করার (অর্থাৎ দাঁড়িয়ে থাকলে বসে) তখন দেখা যাবে যা করতে যাচ্ছিলেন সেটা যে কী খারাপ একটা ব্যাপার হতো তা বুঝতে পারবেন। আর সেটা করতে পারবেন না।
রাগ চেপে রাখার ফজিলত
আমাদের আগেকার সহলুকেরা যখন রেগে যেতেন তখন অন্যকে ক্ষমা করে দিতেন। রাগ দমন করে এর ফযিলত নিতেন।
তাদের কেউ কেউ ভাবতেন তাদের নিজেদের পাপের কারণে তাদের মনে রাগ ফিরে আসছে। কেউ কেউ ভাবতেন এটা দিয়ে মহান আল্লাহ তাদের যাচাই করছেন। অন্যারা ভাবতেন যেসব কারণে মনে হিংসা জন্মায় তারা হয়তো সেসব কারণে সেবে যাচ্ছেন।
কুর‘আনের আগে আল্লাহ যেসব এপ্রীগ্রন্থ পাঠিয়েছিলেন, তার কোনো কোনোটায়ে আল্লাহ বলেছেন, আদমসন্তান, রাগের সময় আমাকে স্মরণ করো। তা হল তোমাদের পাপ করার সময় আমি তোমাদের স্মরণ রাখব। আমি সেসব ফেরেশতা দিয়ে ধ্বংস করি, তাদের দিয়ে তোমাদেরকে ধ্বংস করব না। কেউ যদি তোমাদের উপর অবিচার করে, তা হলে আমার সমর্থন নিয়ে তুই থাকো। কারণ, তোমাদের ব্যক্তিগত বিজয়ের চেয়ে আমার সমর্থন ভালো।
মাদরিক বলেছেন, “রাগের মাথায় আমি কখনো এমন কোনো কথা বলিনি, পরে শান্ত অবস্থায় যেটা নিয়ে আফসোস করতে হয়েছে!”
ইবনু ‘আওন কখনো রাগতেন না। কেউ তাকে রাগিয়ে দিলে বলতেন, “বারাকাল্লাহু ফীক (আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক)!”
শাস্তি দেওয়ার আগে মাথা ঠান্ডা করে নেওয়া
কারও কাজকর্ম যদি শান্তিযোগ্য অপরাধও হয়, তবুও মাথা গরম অবস্থায় শাস্তি দেবেন না। মাথা ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তা নাহলে যতটুকু অপরাধ ততটুকু না দিয়ে আপনার রাগের মাত্রা যত বেশি তত বড় শাস্তি দিয়ে দেবেন হয়তো।
একবার ‘উমার ইবনু ‘আবদুল-‘আযীযের সামনে এক লোককে আনা হলো, তার উপর তিনি বেশ রেগে ছিলেন। তিনি তাকে বললেন, “তোমার উপর রেগে না থাকলে আমি তোমাকে ঠিকই মারতাম।” এরপর তিনি তাকে চলে যেতে দেন।
টিকাঃ
১। বুখারী ৬/৬৬৭
২। বুখারী ৬/৬৪, মুসলিম ২০৯৪
৩। বুখারী ৬/৬৫০, মুসলিম ২০৯১
১। আবূ দাউদ, আল-আদাব ৪/৪৮২, আহমাদ ৫/৩৪২, শারহুস-সুন্নাহ ৮/১৮২, মাআরিফুল-আযমায়ান ১৯৯/৩। হাদীসটির ব্যাপারে আল-বান্না বলেছেন, “তিনি তাকে প্রথমে বসতে বলেছেন। পরে শুয়ে পড়তে বলেছেন। রাগ অবস্থায় সে এটা না করলে পরে তার কাজ নিয়ে নিজেকে পস্তাতে হবে। কারণ, যে শুয়ে পড়বে তার পক্ষে কিছু একটা করা বা দাঁড়ানো কাউকে আঘাত করা কঠিন হবে।
২। মুসনাদ আহমাদ ১/৩২৫
📄 অহংকার
'অহংকার' মানে নিজেকে নিয়ে বড়াই আর অন্যকে তাচ্ছিল্য করা। বংশমর্যাদা, সম্পদে, জ্ঞানে বা 'ইবাদাতে কেউ নিজের চেয়ে কম হলে, নিজেকে তখন তাদের চেয়ে বড় ভাবা থেকে অহংকারের শুরু। অহংকারের আলামত হচ্ছে যাদের উপর নিজেকে বড় ভাবেন তাদেরকে দেখে নাক সিটকানো, আফসোস করা, দর্প করা এবং অন্যরা যেন আপনার গুণকীর্তন করে তা ভালোবাসা।
এর উপশমের দুটো উপায় আছে: * সংক্ষিপ্ত * বিস্তারিত
সংক্ষিপ্ত উপায়টা আবার দু ধরনের: * তাত্ত্বিক * ব্যবহারিক
তাত্ত্বিকভাবে উপশম হয় অহংকারের খারাপ দিক নিয়ে বইপত্র পড়ে, এর নিকৃষ্টতার যৌক্তিক প্রমাণ জেনে। আর ব্যবহারিক উপশম হলো বিনয়ী লোকদের সাথে থেকে থেকে, তাদের জীবনকাহিনি শুনে শুনে।
বিস্তারিত উপায়টা হচ্ছে নিজের কমতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা। নিজের টাকাপয়সা সম্পদ নিয়ে আপনার মনে যদি খুব অহংকার থাকে, তা হলে শুনুন:
মনের অহংকার খারাপ শিগগিরই এটা আপনার কাছ থেকে চলে যাবে। কোনো জিনিস থেকে আপনার থাকার মানেই গৌরব। তার প্রতি নির্ভরতা মোটেও গৌরবের কিছু না।
নিজের জ্ঞানের ভার দেখে মনে যদি খুব বড়াই হয়, তা হলে শুনুন: আপনার আগে আপনার চেয়েও জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তারা এই পথের অগ্রপথিক। আর তাছাড়া জ্ঞান তো বরং মানুষকে অহংকার করতে নিষেধ করে। এটা নিজেই তো হচ্ছে আপনার এই ধ্যানলতের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। আর বড়াইটা যদি হয় আমল নিয়ে, তা হলে বলর নিজের আমলকে পূর্ণতার চোখে দেখা খারাপ স্বভাব।
মনে অহংকার
আবূ সালামাহ বর্ণনা করেছেন: ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আওমর একদিন ইবনু ‘উমারের কাছে গেলেন। তিনি তখন মারওয়াতে ছিলেন। সেখান থেকে নেমে তারা কথা বললেন। কথাবার্তা শেষ করে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আওমর যখন চলে গেলেন ইবনু ‘উমার তখন বসে পড়লেন। তার চোখ সজল হয়ে পড়ল। কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, “কাঁদছেন যে?” “একটু আগে উনি আমাকে বললেন তিনি নিধিজিকে *الله* কে ভালোবাসেন, ‘মনের ভেতর বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকলেও আল্লাহ তাকে মুখের উপর জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলেন।’” ১
ইয়াস ইবনু সালামাহ *রহ.* বলেছেন যে তার বাবা বলেছেন, আল্লাহর রাসূল *সা.* বলেছেন, “একজন লোক নিজেকে নিয়ে এত বড়াই করবে যে তার নাম অহংকারীদের খাতায় উঠবে। এরপর তাদের যে-পরিণতি হবে তারও তা-ই হবে। ২
ইবনু মাস’উদ *রহ.* বলেছেন:
মনের অহংকার খারাপ আল্লাহর রাসূল *সা.* বলেছেন, “যার মনে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” একজন জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু মানুষ তো তার পোশাকআশাক সুন্দর দেখতে পছন্দ করে। জুতোজোড়াও সুন্দর দেখতে পছন্দ করে।” তিনি বললেন, “আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। অহংকার মানে সত্যকে ছুঁড়ে ফেলা। লোকজনদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।” ১
নিচের হাদীসটি আবু হুরায়রাহও আবূ সা’ঈদ দুজনই বলেছেন: আল্লাহর রাসূল *সা.* বলেছেন, “দর্প আমার পোশাক। মর্যাদা আমার নিম্নবস্ত্র। এ দুটোর কোনো একটা নিয়ে কেউ যদি আমার সাথে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করে, তা হলে আমি তাকে উচিত শাস্তি দেব। ২
আল-খাত্তাবি এই হাদীসের ব্যাপারে মন্তব্য করে বলেছেন, এর মানে গৌরব আর বড়ত্ব আল্লাহর দুটো বিষয়বস্তু। এদুটো শুধুই তাঁর। কারও কোনো অংশ নেই এতে। কোনো সৃষ্টির মাঝে এদুটো থাকতে পারে না। কারণ, তাদের বৈশিষ্ট্য বিনয় আর অবনত থাকা। আল্লাহ এখানে পোশাক আর নিম্নবস্ত্রকে উদাহরণ হিসেবে বলেছেন। কেউ তার পোশাক ও নিম্নবস্ত্র অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে না। তেমনি আল্লাহও তার গৌরব ও বড়ত্ব অন্যের সাথে ভাগাভাগি করেন না। আল্লাহ ভালো জানেন।
“বিন্দু পরিমাণ অহংকার”—এর হাদীস নিয়ে আল-খাত্তাবি বলেছেন, “মনে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকলেও কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না”—এই কথার দুটো অর্থ হতে পারে। ১. এখানে অহংকার বলতে অবিশ্বাস বা কুফরের অহংকার বোঝানো হচ্ছে, এবং ২. আল্লাহ যাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন তিনি তাদের মন থেকে অহংকার উধাও করে দেন।
‘মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা’—এর মানে তাদেরকে নিচু চোখে দেখা। নাক সিটকানো।
আল-হাসান বলেছেন, আপনারা জানেন, লোকজন কাউকে নিয়ে মাত্রাতিক্ত প্রশংসা করে। তাকে বলে আরে আপনি তো এই আপনি সেই লোক। তখন আত্মতৃপ্তিতে ফুলে ঢোল হয়ে বসে থাকে। নির্বোধ লোকেরা মনে করে সে আসলেও ওরকম। আবার কেউ কেউ [অহংকারের কারণে] মাত্রাধিকভাবে হাঁটে না। দারিদ্র্য চালে হাঁটে।
টিকাঃ
১। আল-বাখছী ১/১১১। আল-হাসামী বলেছেন, এর বর্ণনাকারীরা বুখারী মুসলিমের হাদিসেও আছেন। তিনি এটা মাজমা‘উয-যাওয়াইদ বইয়ে (১/৯৭) আহমাদ ও আত-তাবারানিকে আল-কবিরে উল্লেখ করেছেন。
২। আত-তিরমিযী ২০০০, আল-বাগাওয়ী, শারহুস-সুন্নাহ ১২/১৭১। আদ-দারামী ২/৭৬। বর্ণনাতে ‘উমার ইবনু রাশিদ আছেন। তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী।
১। মুসলিম, কিতাবুল-বিরর ওয়াল-সিলাহ (ধার্মিকতা, ভালো আচরণ ও আত্মীয়তার সাথে সম্পর্ক রাখা) হাদীস নং ১৬৬।
২। মুসলিম (২/১০৫)
📄 হামবড়া ভাব
নিজের প্রেমে অন্ধ হওয়া থেকে হামবড়া ভাব তৈরি হয়। কেউ যখন কারও প্রেমে পাগল হয়, তার দোষত্রুটি আর তখন চোখে পড়ে না। সেগুলোকে দোষ বলে মনে হয় না। বরং প্রেমিক সেগুলোকে নিখুঁত হিসাবেই দেখে।
হামবড়া ভাবের পরিণাম হলো যে-জিনিসটার কারণে তার মধ্যে এমন চিন্তা এসেছে একসময় সে সেটাকেই তীব্র ঘৃণা করতে শুরু করবে। কারণ, কোনো জিনিস নিয়ে কেউ যখন নিজেকে খুব 'হনু' ভাবা শুরু করে, সে বিষয়ে সে আর তখন এগোতে পারে না। বরং সে তখন অন্যের ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে।
আপনাকে যদি এই অসুখে পেয়ে বসে তা হলে নিজের ভুলের ব্যাপারে সজাগ হোন। অসুখ কেটে যাবে। এ ব্যাপারে আগেও কথা বলেছি। অন্যের কাছে নিজের ভুলত্রুটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করুন। এই রোগে আগে যারা ভুগেছে তাদের পরিণতির কথা চিন্তা করুন।
কোনো ‘আলিম বা বিদ্বান ব্যক্তির মধ্যে যদি নিজের জ্ঞান নিয়ে গরিমা থাকে তা হলে তিনি আগেকার জমানার ‘আলিমদের জীবনী পড়বেন। নিজের দুনিয়ামুখিতা নিয়ে কারও মধ্যে যদি 'হনু' ভাব আসে তা হলে হলে যাওয়া সময়ের অন্যান্য দুনিয়াবিষয়ক জীবনী পড়বেন। তা হলে দেখা যাবে তার মধ্য থেকে হামবড়া ভাব চলে গেছে।
আমি বুঝি না, মানুষের মাঝে কীভাবে নিজেকে নিয়ে গরিমা ভাব চলে আসে? ইমাম আহমাদ দশ লাখ হাদীস মুখস্থ জানতেন। কাহমাস ইবনুল-হাসান দিনে তিনবার কুর'আন আগাগোড়া পড়ে শেষ করতেন। সালমান আত-তায়ামী চল্লিশ বছর ধরে এক দুপুরে ‘ইশা’ আর ফাজর আদায় করেছেন। কেউ বলতে পারবে না তারা কখনো এ-গুলো নিয়ে একদিনও দেমাগ দেখিয়েছেন।
এসব মানুষের জীবনের সাথে নিজেকে তুলনা করলে দেখা যাবে তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতো যার হাতে আছে মাত্র এক টাকা। অথচ এটা নিয়েই সে গদগদ। সে জানেই না যে পৃথিবীতে এমন বহু বহু মানুষ আছেন যাদের কাছে আছে লাখ লাখ টাকা।
ইবরাহীম আল-খাওয়াস বলেছেন, “আত্মগরিমা নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত হওয়ার ব্যাপারে অন্তরায়।”
অন্য এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, “আত্মগরিমা মানুষের বোধবুদ্ধির অন্যতম শত্রু। নানা আসরে নিজের গরিমা দেখাতে থাকলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
📄 লোক-দেখানি কাজকারবার
আল্লাহকে যে সত্যি সত্যি চেনে সে তার সব কাজে তাঁর প্রতি আন্তরিকতা বজায় রেখে করবে। স্রষ্টার ব্যাপারে মানুষের যখন জ্ঞানের ঘাটতি থাকে, আল্লাহকে যেভাবে মর্যাদা দেওয়া উচিত সেভাবে যখন দেয় না, মানুষ যখন ভেতরে ভেতরে অন্য মানুষের প্রশংসা চায়, অন্যের মুখে নিজের তারিফ শুনতে চায়, তখন রিয়া’ (লোক-দেখানি স্বভাব) জন্ম নেয়।
এই অসুখের প্রকোপ একেকজনের বেলায় একেক রকম। কেউ শুধু অন্যের প্রশংসা চায়। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে মানুষের প্রশংসাও চায়। কেউ-বা আবার লোকের তারিফটুকুই একেবারেই চায় না, কিন্তু যখন লোকজন দেখে সে কোনো ভালো কাজ করছে, সে তখন প্রশংসা পেতে কাজটা আরও ভালোবেসে করে। এক্ষেত্রে ভালো কাজটা যেন মসৃণ ত্বকে ঘায়ের মতো।
এই রোগের সাধারণ ওষুধ হচ্ছে আল্লাহকে খুব ভালো করে জানা। তাঁকে জানলে দেখবেন সব কাজ শুধু তাঁর জন্যই করছেন। অন্য কারও প্রশংসা পেলেন কিনা সে কথা ঘৃণাস্বরেও মাথায় আসবে না। নিজেকে সব সময় বিনম্রভাবে ‘ইবাদাতকারীদের কাতারে দেখতে ইচ্ছে করবে; প্রশংসিতদের সারিতে না। যে আল্লাহকে চেনে সে জানে, পুরস্কার শুধু আন্তরিক কাজের জন্যই পাওয়া যায়। এজন্য সে পশুত্বের ক্ষান্তি থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইবে।
রিয়া’ বা লোক-দেখানি কাজের শাস্তি খুব ভয়াবহ। নিয়াতে গড়বড় থাকলে সেই কাজের কোনো প্রতিদান আল্লাহর কাছে নেই। নবিজি ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক কাজ নিয়ত অনুসারে। মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী পুরস্কার হবে।"
আবু মূসা বলেছেন, একবার এক লোক নবিজির ﷺ কাছে বলল, “আল্লাহর রাসূল, কেউ যদি লড়াইয়ের ময়দানে সাহস, উৎসাহ আর ভণ্ডামির কারণে লড়াই করে, তা হলে এ-গুলোর কোনটাকে আল্লাহর পথে লড়াই করেছে বলে বিবেচনা করা হবে?” তিনি বললেন, “যে আল্লাহর বাণী সুউচ্চ করার জন্য লড়াই করবে, কেবল তারটাই আল্লাহর পথে হয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে।”
নাফিল আশারী একদিন আবূ হুরাইরাহ্ -এর কাছে এসে বললেন, “সাহিব, আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছে শুনেছেন এমন একটা হাদীস বলুন না!” তিনি বললেন, “আল্লাহর রাসূলকে ﷺ আমি বলতে শুনেছি, ‘বিচারদিনের যাদের ব্যাপারে ফায়সালা করা হবে তাদের মধ্যে শহিদেরা প্রথম দিকে থাকবে। তাকে সামনে আনা হবে। আল্লাহ তখন তাকে দেওয়া অনুগ্রহগুলো নিজে থেকে বলতে বলবেন। সে তখন বলা শুরু করবে। এরপর আল্লাহ বলবেন: —(এসব অনুগ্রহের বিনিময়ে) তুমি কী করেছ? —শহিদ হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার পথে লড়াই করেছি। —না। তুমি মিথ্যা কথা বলেছ। লোকে তোমাকে ‘বীর লড়াকু’ বলবে এজন্য তুমি লড়াই করেছ। আর তোমাকে তা লোকেরাও বলেছে। এরপর তার বিরুদ্ধে ফায়সালা হবে। মুখ ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে তাকে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে। এরপর এমন এক লোককে আনা হবে যে জ্ঞান অর্জন করেছে। প্রচার করেছে। কুর'আন তিলাওয়াতও করেছে। তাকে সামনে দাঁড় করানো হবে। আল্লাহ তখন তাকে দেওয়া অনুগ্রহগুলো নিজে থেকে বলতে বলবেন। সে তখন বলা শুরু করবে। এরপর আল্লাহ বলবেন: —(এসব অনুগ্রহের বিনিময়ে) তুমি কী করেছ?
—আমি জ্ঞান অর্জন করেছি। প্রচার করেছি। আপনার সন্তুষ্টির আশায় কুর'আন তিলাওয়াত করেছি। —না। তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি জ্ঞান অর্জন করেছ যাতে লোকে তোমাকে ‘আলিম (জ্ঞানী) বলে। কুর'আন তিলাওয়াত করেছ যাতে লোকে তোমাকে কারী (তিলাওয়াতকারী) বলে। আর তোমাকে এ-গুলো বলাও হয়েছে। এরপর তার বিরুদ্ধে ফায়সালা হবে। মুখ ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে তাকে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে। এরপর এমন এক লোককে আনা হবে যে আল্লাহ বিশাল বিত্তশালী বানিয়েছিলেন। সব ধরনের সম্পদ দিয়েছিলেন। তাকে সামনে দাঁড় করানো হবে। আল্লাহ তখন তাকে দেওয়া অনুগ্রহগুলো নিজে থেকে বলতে বলবেন। সে তখন বলা শুরু করবে। এরপর আল্লাহ বলবেন: —(এসব অনুগ্রহের বিনিময়ে) তুমি কী করেছ? —আপনি যত যত উপায়ে সম্পদ ব্যয় করলে খুশি হবেন আমি তার সব কারণে টাকাপয়সা ব্যয় করেছি। —না। তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি এসব করেছ যাতে লোকে তোমাকে ‘দানবীর’ বলে তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার বিরুদ্ধে ফায়সালা হবে। মুখ ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে তাকে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে।"
আবূ হুরাইরাহ্ বলেছেন, নবিজি ﷺ তাঁর প্রভুর বরাত দিয়ে বলেছেন আল্লাহ বলেছেন, “সৃষ্টি হিসেবে আমিই সেরা। কাজেই যে আমার পাশে অন্যকে রেখে কোনো ইবাদাতও করবে, আমি সেটা থেকে মুক্ত। সে আমার সাথে যার ভাগ বসিয়েছে তাকে তার সাথেই ফেলে রাখব।” [১]
মাহমূদ ইবনু লুবাইদ বর্ণনা করেছেন, নবিজি ﷺ বলেছেন: “তোমাদের জন্য ছোট শিরক নিয়ে আমার সবচেয়ে ভয় হয়।” তারা বললেন, “আল্লাহর রাসূল, কী সেটা?” “‘রিয়া’। বিচারদিনে সুমহান আল্লাহ মানুষফর্মে যার যার কাজের প্রতিদান দিনে বলবেন, ‘যাদেরকে দেখানোর জন্য কাজ করেছ তাদের কাছে যেয়ে দেখো কোনো পুরস্কার পাও কিনা।” [২]
আবূ হাতিম বলেছেন, কেউ যদি তার ও আল্লাহর মাঝে কিছু নষ্ট করে ফেলে, তা হলে আল্লাহ সেটা নষ্ট করে দেবেন। অন্যের জন্য কাজ করে। এমতাবস্থায় এক জন যদি কেবল আল্লাহর জন্য কাজ করেন, তাহলে বাকিরা এমনিতেই আপনার দিকে ফিরবেন। কিন্তু যদি তা নষ্ট করে দেন তাহলে সবাই আপনাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করবে। [৩]
ইবনু তাওবাহ্ বলেছেন, এক রাতে আমি কারী আবূ বাকর আল-আনসারীকে স্বপ্নে দেখি। তিনি মারা গিয়েছিলেন। দেখলাম তিনি হাতুড়িও আছেন। তাকে বললাম, “আল্লাহ কি করলেন আপনার সাথে?”
“তার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে অনেক ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে!”
“কী বলেন! আপনার রাত জেগে তাহাজ্জুদ, ভালো ভালো কাজ, ক্বুর'আন তিলাওয়াত এগুলোর কী হলো?
“এগুলোর চেয়ে খারাপ কিছু এখন আর আমার জন্য নেই। এগুলোর সব আমি দুনিয়ার জন্য করেছিলাম!”
“তো এখন কী অবস্থা আপনার?”
“সুহ্বান আল্লাহ আমাকে বলেছেন, ‘যারা আমি বছর পেছনে ছেড়ে তাদের শাস্তি দেব না বলে আমার উপর ঠিক করেছি!’”
টিকাঃ
১। বুখারী ১/২, ৮/১৭৫, ৯/২৯১। মুসলিম, কিতাবুল-ইমারাহ্, হাদীস নং ১৯০৭।
২। বুখারী ১/৪৩, ৪/১২৫, ১০৫, ৯/১৬৯। মুসলিম, কিতাবুল-ইমারাহ্, হাদীস নং ১৪৯–১৫০, ১৪১।
১। মুসলিম, কিতাবুল-ইমারাহ্ হাদীস নং ১৯০২。
২। বর্ণনাকারী নাফিছুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে কা’হল আল-আশারী। কিন্তু এটা লেখার ভুল। তার শুদ্ধ নাম নাফিল আল-আশারী। সাহীহ্ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থতে আদ-নাওয়াবী বলেছেন (৪/৫৮), “নাফিছ ইবনু কাহল আল-আশারী আশ-শামী হিসিফের অধিবাসী ছিলেন। তার বাবা সাহাবি ছিলেন। নাফিছ ছিলেন তার গোত্রের প্রধান।”
৩। হাদিসের ব্যাখ্যয় আন-নাওয়াবী বলেছেন, সাধারণতঃ এই হাদিসে স্রেফ আল্লাহর জন্য জিহাদকারী সব ভুলে ভরা হয়েছে। অনুকরণবাদই যারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করবে, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করবে তাদেরও প্রশংসা করা হয়েছে।
[১] মুসলিম, কিতাবুল-যূহুদ, হাদীস নং ৪৬৭। আহ্মাদ ২/৫০২। ইবনু মুযাহিমাহ্ ৯৩। ইবনু মাজাহ্, কিতাবুল-যূহুদ ৪২১।
[২] আহ্মাদ ৫/৪২৮。
[৩] আবু নূ’আইম, আল-হিলয়া ২/২৩১। অন্য একটি বর্ণনা, যার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীগণ হলেন: আবূ হাতিম থেকে মুহাম্মাদ ইবনু মাবারাক, তার থেকে ‘আলী ইবনু ‘আইয়াস, তার থেকে আব্বাস ইবনু হানবাল। সেই বর্ণনায় আবূ হাতিম বলেছেন, “যে আল্লাহ ও তার মাঝে যা আছে তা সংশোধন করে, আল্লাহ তার ও অন্য দাসের মাঝে সংশোধন করে দেন। আর যে যদি আল্লাহ ও তার মাঝে কিছু নষ্ট করে দেয়, তা হলে আল্লাহ তার ও অন্য দাসের মাঝে নষ্ট করে দেন। সবার মন রাখার চেয়ে একরকমের মন দেয়, তা হলে আল্লাহ তার ও অন্য দাসের মাঝে নষ্ট করে দেন। সবার মন রাখার চেয়ে একরকমের মন রাখা সহজ। যদি আপনি আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখেন, তা হলে বাকিরা আপনার দিকে এমনিতেই ফিরবে। আর যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করেন, তা হলে বাকিরাও একসময় ঘৃণা করবে আপনাকে।