📄 মিথ্যা
খায়েশ মানুষকে ফযেক্বীর দিকে ডাকে, তার মধ্যে এটা সবচেয়ে খারাপ। নেতা হওয়ার জন্য, লোকজনের উপর হড়ি ঘোরানোর জন্য মানুষ খবর দিতে, শিক্ষক হতে পছন্দ করে। সে ভালো করে জানে বক্তার মর্যাদা শ্রোতার চেয়ে বেশি।
এই অসুখের চিকিৎসা করতে হলে মিথ্যাবাদীর জন্য আল্লাহর শাস্তিটা ভালো করে জানতে হবে। লাগাতার মিথ্যা কথা বলে গেলে নিশ্চিত থাকুন একদিন না একদিন মানুষের সামনে সেই মুখোশ খুলে পড়বেই। এরপর তার মুখে এমন চুনকালি পড়বে যা মোছার আর কোনো উপায় থাকবে না। তার কলঙ্ক শুধু বাড়বেই। তার উপর মানুষের এমন অশ্রদ্ধা জন্মাবে যে, পরে আর কখনো সত্য কথা বললেও লোকে তাকে বিশ্বাস করবে না। মিথ্যা বলার কারণে তার উপর মানুষের আস্থা নাই হয়ে যাবে।
নবিজি ﷺ বলেছেন, “একটা লোক মিথ্যা বলতে থাকে। এভাবে বলতে বলতে এমন অবস্থা হয় যে আল্লাহর কাছে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে নাম লেখায়।”[১]
ইবনু মাস‘উদ ﷺ বলেছেন, “ধোঁকাবাজি আর মিথ্যা ছাড়া একজন বিশ্বাসী মুসলিমের সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য স্বভাবজাত।”[২]
টিকাঃ
[১] মুসলিম, কিতাবুল-বির্রু ওয়াল-সিলাহ (ধার্মিকতা, ভালো আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা), হাদীস নং ৫০৫১।
[২] আয-যিম্মা ১/২১৫, আল-ইতহাফ ৭/৫১৮। বর্ণনাটির রাফ' হওয়াকে দুর্বল বলেছেন আল-বায়হাক্বী। আদ-দারাকুতনীর মতে এটা মাওকুফ হওয়া বেশি সঠিক। [মাওকুফ: যে হাদীসের বর্ণনা শুধুমাত্র সাহাবি পর্যন্ত গিয়া থেমে গেছে। —সম্পাদক]
📄 হিংসা তাড়ানোর উপায়
আ মিনা পেলে নাই, কিন্তু অন্যের কাছে এটা থাকতে পারবে না—এমন চিন্তার আরেক নাম হিংসা। অন্যের চোখে আমি আলাদা হব, অন্য কেউ আমার সমান হতে পারবে না—এ ধরনের অসুস্থ চিন্তা থেকে এই রোগের উৎপত্তি। এই রোগে পড়লে অন্য কাউকে ভালো অবস্থানে যেতে দেখলে হিংসুকের মনে জ্বালা শুরু হয়। অন্য কেউ তার সমান হয়ে যাচ্ছে, আলাদা মর্যাদা পাচ্ছে—এটা তার সহ্য হয় না। যে-মুহূর্তে সেই লোকের নেয়ামতটা চলে যায়, তার জ্বালাও তখন বিলকুল দূর হয়ে যায়।
মনের ভেতর এক ফোঁটাও হিংসা নেই এমন মানুষ বিরল। তবে মনে হিংসা থাকলেই পাপ হয় না। পাপ হয় যখন কেউ চায় অন্যের নেয়ামতটা চলে যাক।
হিংসার কারণে ঘুমে সমস্যা হয়, খাওয়া-দাওয়া কমে যায়, চেহারা মলিন হয়ে যায়, মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে পড়ে, বিষণ্ণতা লেগে থাকে। ১২০ বছর বয়সী এক বুড়ো যাযাবরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনার এত বছর বাঁচার রহস্য কী?” তিনি বলেছিলেন, “হিংসা করা ছেড়ে দিয়েছি। তাই এত বছর বেঁচেছি।”
আরেকটা জিনিস জেনে রাখুন। মানুষ কিন্তু শুধু দুনিয়াবি বিষয়আশয় নিয়ে একে অপরকে হিংসা করে। আপনি কিন্তু কখনো দেখেননি যে যে কেউ রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ছে বলে বা নিয়মিত সিয়াম পালন করছে বলে তাদেরকে কেউ হিংসা করছে। ‘আলিমদের জ্ঞানের কারণেও কেউ তাদের হিংসা করে না; হিংসা করে তাদের খ্যাতির কারণে।
(ইসনাদ) সাহাবি পর্যন্ত গিয়া থেমে গেছে। —সম্পাদক]
হিংসার রোগ যদি বাসা বেঁধে ফেলে, তখন কী করবেন?
দেখুন, আল্লাহ সবকিছু আগে থেকে নির্ধারিত করে রেখেছেন। সেটার রদবদল করা অসম্ভব। তিনি জার-মায়াকা জীবিকা বণ্টনকারী। তিনি সৃষ্টিকুলক প্রজ্ঞাবান। সবকিছুই তাঁর হাতে। তিনিই দেন। তিনিই নেন। মহাকাש এবং এর মাঝে যা কিছু আছে সব তাঁরই সৃষ্টি। তো আপনার মনে যদি অন্যকে নিয়ে হিংসা হয়, তা হলে বিষয়টা এমন দাঁড়াচ্ছে যে, আপনি খোদ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নাক গলাচ্ছেন।
এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, “তোমাকে যে হিংসা করে তাকে জিজ্ঞেস করো, ‘তুমি কি জানো কার বিরুদ্ধাচরণ করছ তুমি? যিনি আমাকে এই নি‘আমাত দিয়েছেন তুমি তার বিরুদ্ধাচরণ করছ!’”
“তিনি আমাকে যা দিয়েছেন তুমি তাতে সন্তুষ্ট না। আমার উপর তোমার হিংসার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আল্লাহ আমার নি‘আমাত একের পর এক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তোমার মুখের উপর তোমার আয়রোজগারের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।”
তাছাড়া আপনি যাকে নিয়ে হিংসা করছেন সে কি আপনার ভাগ থেকে কিছু নিয়েছে? তারপরও আপনি যে চাচ্ছেন তাঁর অনুগ্রহ কেড়ে নেওয়া হোক এটা কি অবিচার না?
যাকে হিংসা করছেন তার অবস্থা আরেকবার ভালো করে দেখুন। সে যদি দুনিয়াবি কিছু পেয়ে থাকে তা হলে তো হিংসা না করে তার জন্য দুঃখ করা উচিত। কারণ, সে যা পেয়েছে সেটা তার ক্ষতির কারণ, হতে পারে। দুনিয়াবি জিনিসের সাথে ঝামেলা পাল্লা দিয়ে বাড়ে।
আল-মুতানাব্বি বলেছেন, “ছেলেটা তার জীবনের, তার প্রয়োজনের কথা বলেছে। অথচ জীবিকার বাড়তি অংশটা তো শুধুই ঝামেলা।”
ধনী তার টাকাপয়সা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। যার অনেকগুলো দাসী আছে, তাদের নিয়ে তার সব সময় দুশ্চিন্তা হয়। অনেক খেয়াল রাখতে হয়। শাসক ভয় করে কখন না জানি তাকে উৎখাত করা হয়। কত অনুগ্রহের ভিড়ে কত যে বিষণ্ণতা! ওসব অনুগ্রহ সামান্য কদিনের। ওগুলোব পিছে পিছে তুফানের মতো ধেয়ে আসে দুর্ভাগ্য। যার আছে সে আতঙ্ক থাকে—এই বুঝি শেষ হয়ে গেল, কিংবা সে নিজেই তা ফেলে দিল।
আপনি যাকে যে-কারণে হিংসা করছেন, তার অনুগ্রহটাকে যত বড় করে দেখছেন, তার কাছে তা মোটেও অত বড় বা দামি কিছু না। মানুষের একটা স্বভাব কী জানেন? তারা ভাবে কেউ বড় কোনো পদে আছে মানে তারা অনেক সুখী। কিন্তু মানুষ আসলে জানে না, কেউ যখন খুব করে কিছু চায়, আর একসময় যখন তা পায়, আগের সেই আকর্ষণ আর রেসিদিন টেকে না। তখন এরচেও দামি কিছু চাই তার। অথচ হিংসুক ব্যক্তি স্বভাবদোষে উল্টো ভেবে মাথা কুটে মরছে।
অন্যের হিংসায় জলপোড়ে মারাটি আপনার জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাস্তি। যাকে হিংসা করছেন তারও সাধ্য নেই যে এর চেয়ে জ্বালাময় কোনো শাস্তি আপনাকে দেবে।
এত কিছুর পরও যদি হিংসারোগ না যায়, তা হলে যার উপর এত হিংসা, তার সাফল্য অর্জনের জন্য নিজেই মাঠে নেমে পড়ুন।
ন্যায়নিষ্ঠ পূর্বসূরিদের একজন বলেছিলেন, “আমি তো এমনকি হিংসুকের উদ্দেশ্যেও ভয় পাই। প্রতিশোধী ধনী বলে যে তাকে হিংসা করে, দেখা যায় তার মতো ধনী হতে সে তখন ব্যবসা করার জন্য সফর করছে। কারও জ্ঞানের কারণে কেউ যদি অন্যকে হিংসা করে, তা হলে দেখা যাবে সারা রাত জেগে সে পড়াশোনা করছে। তবে আজকাল মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, তারা আলসেমিকে বড় ভালোবাসে। এরপর কেউ যখন উঁচু অবস্থানে পৌঁছায় তখন তাকে নিয়ে অন্যায় সমালোচনা করে।”
আবু-রাদি কী সুন্দর বলেছেন,
...আমি সেই সফেদ সুন্দর পবিত্র খোঁজা। সবার চোখ আমার ‘পর যখন তারা ঘুমিয়ে থাকে আমি তখন রাত কাটাই উঁচু থেকে আরও উঁচুতে উঠতে যদি না অপর আমায় সম্মান করত শত্রুরা কখনো আমায় নামাতে চাইত না
এতকিছু বলার পরও, যাকে হিংসা করছেন তার অনুরাগ মর্যাদা অর্জন করতে যদি পরিশ্রম করতে না পারেন, তা হলে অন্তত সেই লোকের নামে কুৎসা রটনা আর সমালোচনা করা থেকে মুহূর্তাকে বক্ষ রাখার জিহাদে নামুন। মনের হিংসা মনেই চেপে রাখুন।
হিংসার সমালোচনা
হিংসার নিন্দা করে অনেক হাদিস আছে। নবিজি ﷺ বলেছেন, “তোমাদের আগেকার জাতির অসুখ তোমাদের দিকে চুপিসারে ধেয়ে আসছে। অসুখ দুটো হলো হিংসা আর ঘৃণা। ঘৃণা হলো ক্ষুর। এই ক্ষুর চুল কাটে না। ধর্মকে কামিয়ে ফেলে। যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, একে অপরকে ভালো না বাসা পর্যন্ত তোমরা মুমিন হতে পারবে না। “যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে সেটা বলব? নিজেদের মধ্যে সালাম ছড়িয়ে দাও। ১”
“উমার ইবনু মাইমুন”২ বলেছেন,
“মুসা (আ.) এক ব্যক্তিকে আল্লাহর ‘আরশের কাছে দেখে ঈর্ষা করলেন। ঐ ব্যক্তির এরূপ মর্যাদা কিসের, জিজ্ঞেস করলে তাকে জানানো হলো, আল্লাহ অন্যান্য মানুষের যে-আমিষ দিয়েছেন তা দিয়ে সে হিংসা করে না। দুর্ধর্ষ গুজব রটিয়ে বেড়ায় না। বাবা-মাকে অবমাননা করে না।”
কেবল দুটো বেলায় হিংসা ‘বৈধ’।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, “কেবল দুই লোকের বেলায় হিংসা করলে তা ‘বৈধ’ আল্লাহ যাকে কুরআন এর নেয়ামত দিয়েছেন। দিনরাতে সে কুরআন তিলাওয়াত করে আর সালাত আদায় করে। আর আল্লাহ যাকে টাকাপয়সা দিয়েছেন—দিবানিশি যে সঠিক খাতে তা ব্যয় করে।”৩
টিকাঃ
১/ আহমদ ১/১৬৫, ১৬৭, আল-বায়হাকী ১০/২৬২, আল-বাগাউই, শারহুস সুন্নাহ ১২/২৫৯, আবু-তিরমিযী ২৫১০।
২/ আত-তাকরিব বইতে আল-হাকিম বলেছেন, তার পুরো নাম উমার ইবনু সা’দ ইবনু রাওয়াহ আল-বালখি আবু ‘আলী আল-কুফি। তিনি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। তাকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সপ্তম পর্যায়ের বর্ণনাকারী। তিরমিযী তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন।
৩/ বুখারি ২/২৫৪, ২/৭৮, ১২৬। মুসলিম পৃষ্ঠা ৫৫৯।
📄 আক্রোশ
কা`ব ও কথায় কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে সেটার যে এতটা অংশ মনে থেকে যায়, তা-ই আক্রোশ। কারও ভালো কাজের সুখ্যাতি যেমন মন ধরে রাখে, তেমনি অন্যের খারাপ কাজের দুস্মৃতিও মন তার গভীরে রেখে দেয়।
‘‘আব্দুল্লাহ তার বাবা সাহাবি কা'ব বরে কাছে শুনেছেন। তিনি তাবুকের লড়াইয়ে আল্লাহর রাসূলের ﷺ সাথে অংশগ্রহণ করেননি। তবে পরে তার আন্তরিক অনুশোচনা আল্লাহ কবুল করে নিয়েছিলেন। আর সেটা জানিয়ে কুরআনে আয়াতও নাজিল হয়েছিল। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছেন, “আমি মসজিদে ঢুকলাম। অন্যান্যরা নবিজির ﷺ সাথে ছিলেন। তালহাহ ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ দৌড়ে আমার কাছে এলেন। করমর্দন করে আমাকে অভিবাদন জানালেন। আল্লাহর কসম, মুহাজিরদের মাঝে কেবল তিনিই আমার সাথে এমনটা করেছিলেন।” “আব্দুল্লাহ বলেছেন, “বাবা কখনো তালহার এই কাজটা ভোলেননি।”১
কেউ আপনার সাথে ভালো কাজ করলে তার কথা চিরদিন আপনার মনে থাকে। আবার কেউ যদি অবিচার করে তা হলে সেটাও মনে দাগ রেখে যায়। তবে ভালো হয় যদি এসব কালি মন থেকে মুছে ফেলতে পারেন। ক্ষমা করে দিলে মনে আর কোনো বিদ্বেষের ছিটেফোঁটা থাকবে না।
ক্ষমা করার দুটো ধাপ আছে। প্রথমে আপনি ক্ষমা করার পুরস্কার জানেন। দ্বিতীয়ত, আপনাকে যে আল্লাহ অন্যায় না করিয়ে বরং অন্যের অন্যায় ক্ষমা করার মতো অবস্থায় রেখেছেন, সেজন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। [কারণ, আজ যদি আপনি ভুল করতেন, আর আপনার প্রতি এমন বিদ্বেষ রাখা হতো, তা হলে ব্যাপারটা কেমন হতো?] যা আছে তা-ই নিয়ে খুশি থেকে আপনি ক্ষমা করার মহৎ গুণ অর্জন পারবেন। অন্যের বিরুদ্ধে মনে যত ক্ষোভ আছে তা ফেলে দিলে এই অর্জন সহজে হবে।
তবে এরচেয়েও মোক্ষম ওষুধ আছে। আপনার যে-ক্ষতি হয়েছে তার কারণ, নিচের যেকোনো একটি:
* নিজের পাপের কারণে * কোনো একটা পাপ মুছে দিতে * আপনার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, বা * ধৈর্য পরীক্ষা করতে
এ চারটা জিনিস মাথায় রাখলে কেউ যত ক্ষতিই করুক, মনে আক্রোশ থাকবে না।
তবে এরচেয়েও অব্যর্থ ওষুধ আছে একটা।
আপনার সাথে যাকিছুই হয়েছে তার সবকিছু মহান আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যলিপি থেকে হয়েছে—এটা বুঝলে মনে আর কখনো কারও প্রতি কোনো বিদ্বেষ ক্ষোভ আক্রোশ থাকতে পারে না।
টিকাঃ
১/ বুখারি ৫/৪, মুসলিম ৫০৭
📄 রাগ
রাগ জিনিসটা মানুষের স্বাভাবিক বিষয়। এটা আছে বলেই নানা ক্ষতি থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারে। কেউ তার ক্ষতি করলে প্রতিশোধ নিতে পারে। তবে রাগটা খুব বেশি হয়ে গেলে সমস্যা। অতিরিক্ত রাগ মানুষের বিবেকবোধকে নষ্ট করে ফেলে। সে তাল হারিয়ে ফেলে। তার জীবনযাপন হয় অসহ্যতা। দেখা যায়, সে তখন এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যার পরিণাম নিজেকেই ভোগ করতে হচ্ছে; যার উপর রাগ করা হয়েছে তাকে না।
রাগ একধরনের উত্তাপ। কোনো কিছু যখন কাউকে রাগের উস্কানি দেয় তখন তা গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিशोध নেওয়ার জন্য কামনার রক্তকে টগবগিয়ে ফুটিয়ে দেয়। কখনো এর কারণে জ্বরও হতে পারে।
রাগের মূল কারণ, সাধারণত অহংকার। কারণ, কোনো মানুষ কখনো এমন কারও ওপর রাগ করতে পারে না যার অবস্থান তার চেয়ে উঁচুতো।
এই রোগের ওষুধ হচ্ছে যেভাবে আছেন সেই অবস্থা বদলাবেন। যদি কথা বলতে থাকেন তা হলে চুপ হয়ে যাবেন। দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়বেন। বসে থাকলে শুয়ে যাবেন। এভাবে অবস্থান বদলে ফেললে মাথা ঠান্ডা হবে।
রাগের মুহূর্তে যদি ঐ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে পারেন এবং যার উপর রাগ তার থেকে দূরে সরে যেতে পারেন, তা হলে তো আরও ভালো হয়। এর সাথে রাগ দমনের ফযিলত নিয়ে তাবলেও কাজ দেবে। যারা রাগ দমন করতে পারে আল্লাহ নিজ তাদের তারিফ করেছেন। দেখুন আল্লাহ কী বলেছেন,
যারা তাদের রাগ দমন করে, মানুষকে ক্ষমা করে—আল্লাহ এ ধরনের সৎকর্মশীলদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। [আলি ইমরান, ৩:১৩৪]
হতে পারে হয়তো আপনার কোনো পাপের কারণে এরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এগুলো সবই তো আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যলিপি। এসব মাথায় রাখলে রাগ-ক্রোধ সংবরণ আপনার জন্য সহজ হবে।
রাগ নিয়ে নবিজীর বাণীও আচরণ
রাগ নিয়ে নবিজীর অনেক হাদীস আছে। আবু হুরায়রাহ্ বলেছেন: এক লোক নবিজীর কাছে এসে বলল, “আমাকে উপদেশ দিন” তিনি বললেন, “রাগ করো না।” লোকটা বারবার তাঁকে উপদেশ দেওয়ার অনুরোধ করতে লাগল। আর নবিজীও বারবার একই উত্তর দিলেন, “রেগে যেয়ো না।”১
অপর এক সময়ে নবিজী বলেছেন, শক্তি খাটিয়ে যে মানুষে পরাস্ত করে সে শক্তিশালী না। রাগের সময়ে যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে-ই শক্তিশালী।২
বুখারী মুসলিম থেকে আরেকটি হাদীস; সুলাইমান ইবনু সার্দ বলেছেন, “একদিন নবিজী সাথে বসে আছি হঠাৎ দেখি দুজন লোক একে অপরকে অভিশাপ দিচ্ছে। একজনের চেহারা তো রাগে ফুলোফুলি লাল হয়ে গেছে। গলার রগগুলোও ফুলে গেছে। এই অবস্থা দেখে নবিজী বললেন, “আমি একটা কথা জানি। সে যদি এটা বলে তা হলে তার ভেতরের জিনিসটা চলে যাবে। সে যদি বলে, আ‘উযু বিল্লাহি মিনা-শ শাইত্বানির-রাজীম (আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই),৩ তা হলে তার রাগ চলে যাবে।”
কেউ একজন তাদের বলল, “নবিজী তোমাদেরকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন।” এটা শুনে ঐ লোক বলল, “আমি কি পাগল?”
রাগ নিয়ে নবিজীর আরও একটি অমৃতবাণী: কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রেগে গেলে সে যেন বসে যায়। তারপরও যদি রাগ না যায় তা হলে সে যেন শুয়ে পড়ে।”১
আল-আশআযী বলেছেন, “কেউ যখন দাঁড়িয়ে থাকে সে তখন কিছু একটা করার বসার মতো অবস্থায় থাকে। কিন্তু বসে পড়লে তার থেকে এ ধরনের আশঙ্কা কম থাকে।”
নবিজীর আরেকটি কথা: রেগে গেলে চুপ হয়ে যাও।”২
আল-আহনাক বলেছেন, “রাগের মাথায় অর্ধেক প্রকৃতির শয়তান মেজাজকে বসে রাখতে দেয় না।"
অতিরিক্ত ক্রোধ
রাগে মাথায় রক্ত চড়ে গেলে যদি নিজেকে ঠান্ডা না করেন, তা হলে সে নিজের ক্ষতি করবেন। নয় যার উপর রাগ করেছেন তার। আর পরে দেখা যাবে ঠিকই সেটা নিয়ে মাথা কুটেছেন।
রাগের মাথায় কত লোক কত মানুষকে মেরে ফেলেছে! গায়ে হাত তুলেছে! বাচ্চাকাচ্চাকে মেরে হাত-পা পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে! পরে জীবনভর এগুলো নিয়ে হায় হায় করেছে। কেউ কেউ তো নিজেরই বারোটা বাজিয়েছে!
এক লোক রাগের মাথায় এত জোরে গলা টিপে চিৎকার করেছে যে মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে সাথে সাথেই মারা গিয়েছে। আরেক লোক মেজাজ হারিয়ে অন্য লোকে ঘুষি মেরে নিজেই নিজের আঙুল ভেঙে ফেলেছে। যাকে ঘুষি মেরেছিল তার কিচ্ছুই হয়নি।
এই রোগ থেকে বাঁচতে চাইলে প্রথমে কল্পনা করুন রেগে গেলে আপনার চেহারার কী হাল হয়, আর শান্ত থাকলে কেমন থাকে। তখন বুঝবেন রাগ একধরনের পাগলামি। লাগামহীন অবস্থা। কোনোভাবেই যদি মনকে রাগে আনা সম্ভব না হয়, তা হলে নিজেকে নিচে শার্ট দিন: ঠিক আছে অবস্থান বদল করার পর যা করার করার (অর্থাৎ দাঁড়িয়ে থাকলে বসে) তখন দেখা যাবে যা করতে যাচ্ছিলেন সেটা যে কী খারাপ একটা ব্যাপার হতো তা বুঝতে পারবেন। আর সেটা করতে পারবেন না।
রাগ চেপে রাখার ফজিলত
আমাদের আগেকার সহলুকেরা যখন রেগে যেতেন তখন অন্যকে ক্ষমা করে দিতেন। রাগ দমন করে এর ফযিলত নিতেন।
তাদের কেউ কেউ ভাবতেন তাদের নিজেদের পাপের কারণে তাদের মনে রাগ ফিরে আসছে। কেউ কেউ ভাবতেন এটা দিয়ে মহান আল্লাহ তাদের যাচাই করছেন। অন্যারা ভাবতেন যেসব কারণে মনে হিংসা জন্মায় তারা হয়তো সেসব কারণে সেবে যাচ্ছেন।
কুর‘আনের আগে আল্লাহ যেসব এপ্রীগ্রন্থ পাঠিয়েছিলেন, তার কোনো কোনোটায়ে আল্লাহ বলেছেন, আদমসন্তান, রাগের সময় আমাকে স্মরণ করো। তা হল তোমাদের পাপ করার সময় আমি তোমাদের স্মরণ রাখব। আমি সেসব ফেরেশতা দিয়ে ধ্বংস করি, তাদের দিয়ে তোমাদেরকে ধ্বংস করব না। কেউ যদি তোমাদের উপর অবিচার করে, তা হলে আমার সমর্থন নিয়ে তুই থাকো। কারণ, তোমাদের ব্যক্তিগত বিজয়ের চেয়ে আমার সমর্থন ভালো।
মাদরিক বলেছেন, “রাগের মাথায় আমি কখনো এমন কোনো কথা বলিনি, পরে শান্ত অবস্থায় যেটা নিয়ে আফসোস করতে হয়েছে!”
ইবনু ‘আওন কখনো রাগতেন না। কেউ তাকে রাগিয়ে দিলে বলতেন, “বারাকাল্লাহু ফীক (আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক)!”
শাস্তি দেওয়ার আগে মাথা ঠান্ডা করে নেওয়া
কারও কাজকর্ম যদি শান্তিযোগ্য অপরাধও হয়, তবুও মাথা গরম অবস্থায় শাস্তি দেবেন না। মাথা ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তা নাহলে যতটুকু অপরাধ ততটুকু না দিয়ে আপনার রাগের মাত্রা যত বেশি তত বড় শাস্তি দিয়ে দেবেন হয়তো।
একবার ‘উমার ইবনু ‘আবদুল-‘আযীযের সামনে এক লোককে আনা হলো, তার উপর তিনি বেশ রেগে ছিলেন। তিনি তাকে বললেন, “তোমার উপর রেগে না থাকলে আমি তোমাকে ঠিকই মারতাম।” এরপর তিনি তাকে চলে যেতে দেন।
টিকাঃ
১। বুখারী ৬/৬৬৭
২। বুখারী ৬/৬৪, মুসলিম ২০৯৪
৩। বুখারী ৬/৬৫০, মুসলিম ২০৯১
১। আবূ দাউদ, আল-আদাব ৪/৪৮২, আহমাদ ৫/৩৪২, শারহুস-সুন্নাহ ৮/১৮২, মাআরিফুল-আযমায়ান ১৯৯/৩। হাদীসটির ব্যাপারে আল-বান্না বলেছেন, “তিনি তাকে প্রথমে বসতে বলেছেন। পরে শুয়ে পড়তে বলেছেন। রাগ অবস্থায় সে এটা না করলে পরে তার কাজ নিয়ে নিজেকে পস্তাতে হবে। কারণ, যে শুয়ে পড়বে তার পক্ষে কিছু একটা করা বা দাঁড়ানো কাউকে আঘাত করা কঠিন হবে।
২। মুসনাদ আহমাদ ১/৩২৫