📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 পয়সা ওড়ানো

📄 পয়সা ওড়ানো


খায়েশের হুকুম মেনে মানুষ যেসব খারাপ কাজ করে তার মধ্যে অপচয় বা পয়সা ওড়ানো অন্যতম। বিবেক খাটলে মানুষ পয়সা ওড়াতে পারত না। এক্ষেত্রে সেরা শৃঙ্খলা হলো আল্লাহর শৃঙ্খলা। সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “অপব্যয় করে অপচয় কোরো না।” [আল-ইসরা’ ১৭:২৬]
আপনাকে হয়তো পুরো মাসের জীবিকা এক দিনেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি তা অপচয় করে উড়িয়ে দেন, তা হলে বাকি মাস ঝুঁকে ঝুঁকে চলতে হবে। যদি হিসাব করে চলেন, তা হলে বাকি মাস আরামে থাকবেন।
অপচয় অসুখের চিকিৎসার জন্য নিজের খামখেয়ালীপনার পরিণাম নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। ভবিষ্যৎ প্রয়োজন ও দারিদ্র্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। এতে করে আপনার পয়সা ওড়ানোর খায়েশে লাগাম পড়বে।

📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 আয়-ব্যয়ের ব্যাখ্যা

📄 আয়-ব্যয়ের ব্যাখ্যা


বুদ্ধিমান মানুষের আয় তার ন্যূনতম প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়। বিপদে যেন কাজে লাগে এজন্য তারা কিছু টাকা সঞ্চয়ও করে। হতে পারে কখনো হয়তো কামাই রোজগারের জন্য কোনো সমস্যার কারণে কাজ করতে পারছেন না। এই সঞ্চয় তখন খুব কাজে আসবে। সন্তান হলে টাকা লাগবে। আরেকটি বিয়ে করতে চাইলে টাকা লাগবে। চাকরিবাখর প্রয়োজন হলেও টাকার দরকার। আবার সন্তানের যদি টাকাপয়সার প্রয়োজন হয়, তা হলেও তো টাকা চাই। তাই জীবিকা যথেষ্ট কি না সেটা খেয়াল রাখবেন।
মোদ্দাকথা ব্যয়ের চেয়ে আপনার আয় বেশি হতে হবে। তা হলে কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে টাকা সঞ্চয় হবে না। তখন বিপদে পড়লে কুলকিনারা খুঁজে পাবেন না। পরিণামের কথা চিন্তা করে বলে বিবেক কিন্তু আপনাকে এই উপদেশই দেয়। কিন্তু খায়েশের চিন্তা শুধু আজকের জীবন নিয়ে। কাল কী হবে সেটা নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা নেই।
আব্দুদ্-দার্দা’ বলেছেন, “গভীর বুঝদার মানুষ ভবিষ্যৎ জীবনের ভাবনা আগে থেকে ভেবে রাখে।”[১]

টিকাঃ
[১] প্রাজ্ঞতা বর্ণনাকারী থেকে মাওকুফ হিসেবে বর্ণিত। [মাওকুফ: যে হাদীসের বর্ণনা শুধুমাত্র সাহাবি পর্যন্ত গিয়া থেমে গেছে। —সম্পাদক]

📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 মিথ্যা

📄 মিথ্যা


খায়েশ মানুষকে ফযেক্বীর দিকে ডাকে, তার মধ্যে এটা সবচেয়ে খারাপ। নেতা হওয়ার জন্য, লোকজনের উপর হড়ি ঘোরানোর জন্য মানুষ খবর দিতে, শিক্ষক হতে পছন্দ করে। সে ভালো করে জানে বক্তার মর্যাদা শ্রোতার চেয়ে বেশি।
এই অসুখের চিকিৎসা করতে হলে মিথ্যাবাদীর জন্য আল্লাহর শাস্তিটা ভালো করে জানতে হবে। লাগাতার মিথ্যা কথা বলে গেলে নিশ্চিত থাকুন একদিন না একদিন মানুষের সামনে সেই মুখোশ খুলে পড়বেই। এরপর তার মুখে এমন চুনকালি পড়বে যা মোছার আর কোনো উপায় থাকবে না। তার কলঙ্ক শুধু বাড়বেই। তার উপর মানুষের এমন অশ্রদ্ধা জন্মাবে যে, পরে আর কখনো সত্য কথা বললেও লোকে তাকে বিশ্বাস করবে না। মিথ্যা বলার কারণে তার উপর মানুষের আস্থা নাই হয়ে যাবে।
নবিজি ﷺ বলেছেন, “একটা লোক মিথ্যা বলতে থাকে। এভাবে বলতে বলতে এমন অবস্থা হয় যে আল্লাহর কাছে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে নাম লেখায়।”[১]
ইবনু মাস‘উদ ﷺ বলেছেন, “ধোঁকাবাজি আর মিথ্যা ছাড়া একজন বিশ্বাসী মুসলিমের সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য স্বভাবজাত।”[২]

টিকাঃ
[১] মুসলিম, কিতাবুল-বির্রু ওয়াল-সিলাহ (ধার্মিকতা, ভালো আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা), হাদীস নং ৫০৫১।
[২] আয-যিম্মা ১/২১৫, আল-ইতহাফ ৭/৫১৮। বর্ণনাটির রাফ' হওয়াকে দুর্বল বলেছেন আল-বায়হাক্বী। আদ-দারা‌কুতনীর মতে এটা মাওকুফ হওয়া বেশি সঠিক। [মাওকুফ: যে হাদীসের বর্ণনা শুধুমাত্র সাহাবি পর্যন্ত গিয়া থেমে গেছে। —সম্পাদক]

📘 মনের ওপর লাগাম > 📄 হিংসা তাড়ানোর উপায়

📄 হিংসা তাড়ানোর উপায়


আ মিনা পেলে নাই, কিন্তু অন্যের কাছে এটা থাকতে পারবে না—এমন চিন্তার আরেক নাম হিংসা। অন্যের চোখে আমি আলাদা হব, অন্য কেউ আমার সমান হতে পারবে না—এ ধরনের অসুস্থ চিন্তা থেকে এই রোগের উৎপত্তি। এই রোগে পড়লে অন্য কাউকে ভালো অবস্থানে যেতে দেখলে হিংসুকের মনে জ্বালা শুরু হয়। অন্য কেউ তার সমান হয়ে যাচ্ছে, আলাদা মর্যাদা পাচ্ছে—এটা তার সহ্য হয় না। যে-মুহূর্তে সেই লোকের নেয়ামতটা চলে যায়, তার জ্বালাও তখন বিলকুল দূর হয়ে যায়।
মনের ভেতর এক ফোঁটাও হিংসা নেই এমন মানুষ বিরল। তবে মনে হিংসা থাকলেই পাপ হয় না। পাপ হয় যখন কেউ চায় অন্যের নেয়ামতটা চলে যাক।
হিংসার কারণে ঘুমে সমস্যা হয়, খাওয়া-দাওয়া কমে যায়, চেহারা মলিন হয়ে যায়, মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে পড়ে, বিষণ্ণতা লেগে থাকে। ১২০ বছর বয়সী এক বুড়ো যাযাবরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনার এত বছর বাঁচার রহস্য কী?” তিনি বলেছিলেন, “হিংসা করা ছেড়ে দিয়েছি। তাই এত বছর বেঁচেছি।”
আরেকটা জিনিস জেনে রাখুন। মানুষ কিন্তু শুধু দুনিয়াবি বিষয়আশয় নিয়ে একে অপরকে হিংসা করে। আপনি কিন্তু কখনো দেখেননি যে যে কেউ রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ছে বলে বা নিয়মিত সিয়াম পালন করছে বলে তাদেরকে কেউ হিংসা করছে। ‘আলিমদের জ্ঞানের কারণেও কেউ তাদের হিংসা করে না; হিংসা করে তাদের খ্যাতির কারণে।
(ইসনাদ) সাহাবি পর্যন্ত গিয়া থেমে গেছে। —সম্পাদক]
হিংসার রোগ যদি বাসা বেঁধে ফেলে, তখন কী করবেন?
দেখুন, আল্লাহ সবকিছু আগে থেকে নির্ধারিত করে রেখেছেন। সেটার রদবদল করা অসম্ভব। তিনি জার-মায়াকা জীবিকা বণ্টনকারী। তিনি সৃষ্টিকুলক প্রজ্ঞাবান। সবকিছুই তাঁর হাতে। তিনিই দেন। তিনিই নেন। মহাকাש এবং এর মাঝে যা কিছু আছে সব তাঁরই সৃষ্টি। তো আপনার মনে যদি অন্যকে নিয়ে হিংসা হয়, তা হলে বিষয়টা এমন দাঁড়াচ্ছে যে, আপনি খোদ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নাক গলাচ্ছেন।
এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, “তোমাকে যে হিংসা করে তাকে জিজ্ঞেস করো, ‘তুমি কি জানো কার বিরুদ্ধাচরণ করছ তুমি? যিনি আমাকে এই নি‘আমাত দিয়েছেন তুমি তার বিরুদ্ধাচরণ করছ!’”
“তিনি আমাকে যা দিয়েছেন তুমি তাতে সন্তুষ্ট না। আমার উপর তোমার হিংসার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আল্লাহ আমার নি‘আমাত একের পর এক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তোমার মুখের উপর তোমার আয়রোজগারের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।”
তাছাড়া আপনি যাকে নিয়ে হিংসা করছেন সে কি আপনার ভাগ থেকে কিছু নিয়েছে? তারপরও আপনি যে চাচ্ছেন তাঁর অনুগ্রহ কেড়ে নেওয়া হোক এটা কি অবিচার না?
যাকে হিংসা করছেন তার অবস্থা আরেকবার ভালো করে দেখুন। সে যদি দুনিয়াবি কিছু পেয়ে থাকে তা হলে তো হিংসা না করে তার জন্য দুঃখ করা উচিত। কারণ, সে যা পেয়েছে সেটা তার ক্ষতির কারণ, হতে পারে। দুনিয়াবি জিনিসের সাথে ঝামেলা পাল্লা দিয়ে বাড়ে।
আল-মুতানাব্বি বলেছেন, “ছেলেটা তার জীবনের, তার প্রয়োজনের কথা বলেছে। অথচ জীবিকার বাড়তি অংশটা তো শুধুই ঝামেলা।”
ধনী তার টাকাপয়সা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। যার অনেকগুলো দাসী আছে, তাদের নিয়ে তার সব সময় দুশ্চিন্তা হয়। অনেক খেয়াল রাখতে হয়। শাসক ভয় করে কখন না জানি তাকে উৎখাত করা হয়। কত অনুগ্রহের ভিড়ে কত যে বিষণ্ণতা! ওসব অনুগ্রহ সামান্য কদিনের। ওগুলোব পিছে পিছে তুফানের মতো ধেয়ে আসে দুর্ভাগ্য। যার আছে সে আতঙ্ক থাকে—এই বুঝি শেষ হয়ে গেল, কিংবা সে নিজেই তা ফেলে দিল।
আপনি যাকে যে-কারণে হিংসা করছেন, তার অনুগ্রহটাকে যত বড় করে দেখছেন, তার কাছে তা মোটেও অত বড় বা দামি কিছু না। মানুষের একটা স্বভাব কী জানেন? তারা ভাবে কেউ বড় কোনো পদে আছে মানে তারা অনেক সুখী। কিন্তু মানুষ আসলে জানে না, কেউ যখন খুব করে কিছু চায়, আর একসময় যখন তা পায়, আগের সেই আকর্ষণ আর রেসিদিন টেকে না। তখন এরচেও দামি কিছু চাই তার। অথচ হিংসুক ব্যক্তি স্বভাবদোষে উল্টো ভেবে মাথা কুটে মরছে।
অন্যের হিংসায় জলপোড়ে মারাটি আপনার জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাস্তি। যাকে হিংসা করছেন তারও সাধ্য নেই যে এর চেয়ে জ্বালাময় কোনো শাস্তি আপনাকে দেবে।
এত কিছুর পরও যদি হিংসারোগ না যায়, তা হলে যার উপর এত হিংসা, তার সাফল্য অর্জনের জন্য নিজেই মাঠে নেমে পড়ুন।
ন্যায়নিষ্ঠ পূর্বসূরিদের একজন বলেছিলেন, “আমি তো এমনকি হিংসুকের উদ্দেশ্যেও ভয় পাই। প্রতিশোধী ধনী বলে যে তাকে হিংসা করে, দেখা যায় তার মতো ধনী হতে সে তখন ব্যবসা করার জন্য সফর করছে। কারও জ্ঞানের কারণে কেউ যদি অন্যকে হিংসা করে, তা হলে দেখা যাবে সারা রাত জেগে সে পড়াশোনা করছে। তবে আজকাল মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, তারা আলসেমিকে বড় ভালোবাসে। এরপর কেউ যখন উঁচু অবস্থানে পৌঁছায় তখন তাকে নিয়ে অন্যায় সমালোচনা করে।”
আবু-রাদি কী সুন্দর বলেছেন,
...আমি সেই সফেদ সুন্দর পবিত্র খোঁজা। সবার চোখ আমার ‘পর যখন তারা ঘুমিয়ে থাকে আমি তখন রাত কাটাই উঁচু থেকে আরও উঁচুতে উঠতে যদি না অপর আমায় সম্মান করত শত্রুরা কখনো আমায় নামাতে চাইত না
এতকিছু বলার পরও, যাকে হিংসা করছেন তার অনুরাগ মর্যাদা অর্জন করতে যদি পরিশ্রম করতে না পারেন, তা হলে অন্তত সেই লোকের নামে কুৎসা রটনা আর সমালোচনা করা থেকে মুহূর্তাকে বক্ষ রাখার জিহাদে নামুন। মনের হিংসা মনেই চেপে রাখুন।

হিংসার সমালোচনা
হিংসার নিন্দা করে অনেক হাদিস আছে। নবিজি ﷺ বলেছেন, “তোমাদের আগেকার জাতির অসুখ তোমাদের দিকে চুপিসারে ধেয়ে আসছে। অসুখ দুটো হলো হিংসা আর ঘৃণা। ঘৃণা হলো ক্ষুর। এই ক্ষুর চুল কাটে না। ধর্মকে কামিয়ে ফেলে। যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, একে অপরকে ভালো না বাসা পর্যন্ত তোমরা মুমিন হতে পারবে না। “যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে সেটা বলব? নিজেদের মধ্যে সালাম ছড়িয়ে দাও। ১”
“উমার ইবনু মাইমুন”২ বলেছেন,
“মুসা (আ.) এক ব্যক্তিকে আল্লাহর ‘আরশের কাছে দেখে ঈর্ষা করলেন। ঐ ব্যক্তির এরূপ মর্যাদা কিসের, জিজ্ঞেস করলে তাকে জানানো হলো, আল্লাহ অন্যান্য মানুষের যে-আমিষ দিয়েছেন তা দিয়ে সে হিংসা করে না। দুর্ধর্ষ গুজব রটিয়ে বেড়ায় না। বাবা-মাকে অবমাননা করে না।”
কেবল দুটো বেলায় হিংসা ‘বৈধ’।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, “কেবল দুই লোকের বেলায় হিংসা করলে তা ‘বৈধ’ আল্লাহ যাকে কুরআন এর নেয়ামত দিয়েছেন। দিনরাতে সে কুরআন তিলাওয়াত করে আর সালাত আদায় করে। আর আল্লাহ যাকে টাকাপয়সা দিয়েছেন—দিবানিশি যে সঠিক খাতে তা ব্যয় করে।”৩

টিকাঃ
১/ আহমদ ১/১৬৫, ১৬৭, আল-বায়হাকী ১০/২৬২, আল-বাগাউই, শারহুস সুন্নাহ ১২/২৫৯, আবু-তিরমিযী ২৫১০।
২/ আত-তাকরিব বইতে আল-হাকিম বলেছেন, তার পুরো নাম উমার ইবনু সা’দ ইবনু রাওয়াহ আল-বালখি আবু ‘আলী আল-কুফি। তিনি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। তাকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সপ্তম পর্যায়ের বর্ণনাকারী। তিরমিযী তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন।
৩/ বুখারি ২/২৫৪, ২/৭৮, ১২৬। মুসলিম পৃষ্ঠা ৫৫৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00