📄 দুনিয়াবি পদের লোভ
মানুষের মন অন্যের উপর কর্তৃত্ব করতে ভালোবাসে। এজন্য আদেশ-নিষেধ দেওয়ার ক্ষমতা পেতে মানুষ নেতৃত্বকে হাতে নিতে চায়। নেতৃত্ব কর্তৃত্ব দরকার হলেও তাতে ঝুঁকি অনেক। নিয়নম ত্রুটি হোক হচ্ছে ক্ষমতালাভের পর অপসারিত হওয়া। আর সবচেয়ে মারাত্মক হলো শাসনকার্যে বেইমানি। আর মাঝামাঝি অবস্থা হলো দায়িত্বশীল লোক যদি আন্তরিক না হয় তা হলে অযথা তার সময় নষ্ট।
নেতৃত্ব কর্তৃত্বের মোহ যদি থাকে তা হলে কিছু বাস্তব কথা শুনুন। না পাওয়া পর্যন্ত এই ক্ষমতাকে খুব বিশাল কিছু মনে হয়। কিন্তু একবার হাতে পেলে তার আবেদন ম্লান হয়ে যায়। আরও বড় কিছুর জন্য মন তখন উৎসুক করে।
একটা জিনিস না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার যে মজা, পাওয়ার পর কিন্তু সেটা আর থাকে না। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা অবৈধ হলে পরে সেই মজা না থাকলেও পাপটা কিন্তু রয়ে যায়। তাছাড়া নিজের জীবনের ঝুঁকি আর ধর্ম পালনের সমস্যার বিষয়গুলো তো আছেই। এসব ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করলে দেখবেন নেতৃত্ব কর্তৃত্বের মোহ কেটে যাচ্ছে।
মানুষের নেতা হতে চাওয়াটা যে কী ভয়ংকর একটা ব্যাপার সেটা নবিজি ﷺ মুখ থেকে শুনুন, “পদজন কিংবা এর বেশি লোকের নেতা যে-ই হবে, বিচার দিনে গলায় হাত বাঁধা অবস্থায় তাকে আল্লাহর সামনে হাজিরা দিতে হবে। তার ন্যায়নিষ্ঠা তাকে বাঁচাবে। নইলে তার অত্যাচার তাকে নাশ করে দেবে। এর [নেতৃত্বের] শুরু হয় নিন্দা দিয়ে। মাঝে থাকে অপমান। আর শেষ হয় বিচারদিনে অপমান দিয়ে।”[১]
শাসকত্বের ব্যাপারে نبي ﷺ আরও মারাত্মক কথা বলেছেন: “শাসকত্বের দুর্ভাগ্য! সেনাপতিত্বের দুর্ভাগ্য! কর্তৃত্বশীলদের দুর্ভাগ্য! কিয়ামতের দিন কিছু লোক আফসোস করে বলবে, দায়িত্ব পাওয়ার বদলে মহাকাশের কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে তাদের কপল যদি ঝুলত; আর তারা মহাকাש ও পৃথিবীর মাঝে দুলত।”[২]
সাহাবি আবু যার একবার নবিজিকে ﷺ বলেছিলেন, “আল্লাহর রাসুল, আমাকে কোনো কিছুর দায়িত্ব দেবেন না?” নবিজি ﷺ তখন তাঁর কাঁধে চাপড় মেরে বললেন, “আবু যার! তুমি যে অনেক দুর্বল। দায়িত্ব এক ধরনের আমানত। যারা বৈধভাবে দায়িত্ব পাবে এবং তার উপর অর্পিত বাধ্যবাধকতা পালন করবে তারা ছাড়া বিচারদিনে বাকি সবার জন্য এটা হবে চরম অপমানের কারণ।”[৩]
অন্য আরেক বর্ণনায় দেখা যায় নবিজি ﷺ বলছেন, “আবু যার, আমার জন্য যা ভালোবাসো, তোমার জন্যও তা-ই ভালোবাসো। তোমরা দুজন হলে তুমি আগবাড়িয়ে নেতা হতে চেয়ো না। এতিমের সম্পদের জিম্মাদার হোয়ো না।”[৪]
টিকাঃ
[১] আত-তাবরানি, আল-কবির ৮/২৩৪, আল-আওসাত ৪/২৫৭, ইবনু ‘আসাকির ৫/৫৪২, আযযাহাবি ১/২২৬।
[২] আল-হায়সামি তার মাজমা‘উয-যাওয়ায়িদ গ্রন্থে বলেছেন (৫/২০৪): আহমাদ ও আত-তাবরানি বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনাসূত্রে আছেন যাহির ইবনু আবু মালিক। ইবনু হিব্বান ও অন্যান্যরা তাকে সওয়ারন করেছেন। এছাড়া এই বর্ণনাসূত্রের বাকি সবাই নির্ভরযোগ্য।
[৩] আহমাদ ২/৩৩২, আল-বায়হাকি ১০/৯৭, ইবনু ‘আসাকির ৬/১৭১।
[৪] মুসলিম ১৮২৩। [৪] মুসলিমের বর্ণনায় আছে: “আবু যার, তুমি তো দুর্বল। আমি নিজের জন্য যা ভালোবাসো তোমার জন্যও তা-ই ভালোবাসো। দুজন হলে তাদের নেতা হয়ো না। এতিমের সম্পদের দায়িত্ব নিয়ো না।”
📄 কিপটামি খাসলত
টাকা পয়সা সঞ্চয় করাটা কৃপণতা না। কেউ তার নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা বা প্রয়োজনে কিছু আত্মীয়স্বজনের জন্য জমিয়ে রাখতে পারে। এটাকে হিসেবি স্বভাব বলা। এটা দোষের না। আবার কেউ কেউ সম্পদ সঞ্চয় করে নিজেকে শক্তিশালী অবস্থায় রাখতে পারেন। এতেও সমস্যা নেই। আসলে কৃপণ হলো সেই লোক যে তার সম্পদ থেকে ফরজ অংশটি দেয় না। ইবনু ‘উমার বলেছেন, “যে যাকাত দেয় সে কৃপণ না।” দান করলে নিজের তেমন কোনো সমস্যা হবে না—বলতে গেলে কিছুই হবে না—তারপরও যে-লোক অন্যের উপকারে টাকা ঢালে না তারাই কৃপণ।
কিপটামি স্বভাবকে নবিজি ﷺ রোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন: “কৃপণতার চেয়ে বড় রোগ আর কী আছে!”[১]
আবু মুহাম্মাদ আর-রামাহরমুঝি বলেছেন, কৃপণ স্বভাব রোগের মতো মানুষের ক্ষতি করে। রোগ যেমন তার শরীরকে দুর্বল করে দেয়, চাহিদাাকে মিটিয়ে দেয়, রং পরিবর্তন করে দেয়, কৃপণ স্বভাব তার সম্মান ছিনিয়ে নেয়। তার জন্য নিয়ে আসে দুর্নাম ও নিন্দা।
জ্ঞানী লোকেরা বলেছেন, “দানশীল মানুষই স্বাধীন, কারণ, সে তার টাকার মালিকা কিন্তু কৃপণ লোক স্বাধীন মানুষ তকমা পাওয়ার যোগ্য না। কারণ, টাকা তার মালিকা।”
এই বদস্বভাব যেন আমাদের খাসলতে পরিণত না হয় সেজনা নবিজি ﷺ সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কৃপণ হওয়া থেকে সতর্ক হও। তোমাদের আগে বহু লোককে এটা বিনাশ করে দিয়েছে। এটা তাদেরকে করেছে আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে না। তারা যাখেন। তাদেরকে করেছে কৃপণ হও। তারা হয়েছে। বলেছে চরিত্রহীন কাজে জড়িয়ে যাও। তারা জড়িয়েছিল।”[১]
তিনি আরও বলেছেন, “বিশ্বাসীদের মধ্যে দুটো স্বভাব মিশতে পারে না: কৃপণতা আর অনৈতিকতা।”[২]
আল-খাত্তাবী বলেছেন, “কৃপণ কথাটার চেয়ে অর্থলোভী শব্দটা বেশি সুনির্দিষ্ট। কৃপণ হলো একটা ধারণা। আর অর্থলোভী হলো একটা জাত।”
কেউ কেউ বলেছেন, “কৃপণের মানে টাকা জমা করে রাখা। আর অর্থলোভিভার মানে টাকার সাথে সাথে সংকোচও উঁচিয়ে রাখা।”
বিশ্র আল-হাফি বলেছেন, “কৃপণ লোকের সাথে দেখাসাক্ষাৎ বিশ্বাসী লোকদের মনে যন্ত্রণার কারণ।”
একটু ভাবলে এই অশুভ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। দেখুন, গরিব লোকেরাও আপনার ভাই। সম্পদের বলে আল্লাহ আপনাকে অন্যদের উপর রেখেছেন। যাকিদদেরকে মুখাপেক্ষী করেছেন। সুতরাং এসব গরিবদুখি মানুষদের অর্থসহায়তা করে আপনার উচিত আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা। এই সম্পদের মালিক তো তিনিই আপনাকে বানিয়েছেন।
দান করলে অন্যরা আপনার অনুগত থাকে। কৃপণ হলে খারাপ লোকেরা আপনার মর্যাদা নষ্ট করে ফেলবে। নিশ্চিত থাকুন যা আছে শিগগিরিই বাজেভাবে আপনার হাত থেকে চলে যাবে। তাই ও আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে আপনিই ওকে ছেড়ে দিন (টাকাপয়সা আপনার হাত থেকে চলে যাওয়ার আগে নিজেই সেটা দান করে দিন)।
টিকাঃ
[১] আল-মুসতাদরাক ৬/২৩৯, ৪/১৯৬-১৯৭, আল-আনওয়ারুল-মুহাম্মদ ২১৯, মুসয়াবাক ‘আbdউর- রাযযাক ২৩০৫, তাফসীর তাবারানী ১০/১৩০৪, আহমাদ ৬/৮০৮-৮০৯। বর্ণনাকারী জাবির ইবনু ‘আব্দুল্লাহ।
[১] আহমাদ ২/১৮০, ১৯৬, আবু দাউদ ১৬৯৪। ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমারের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় নবিজি ﷺ বলেছেন, “অর্থলোভী হওয়া থেকে সতর্ক থাকো। তোমাদের আগে বহু লোককে এটা বিনাশ করে দিয়েছে। এটা তাদের বদলে কৃপণ হতে। তারা হয়েছে। এটা তাদেরকে করেছে আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে না। তারা রাখেনি। বলেছে চরিত্রহীন কাজে জড়িয়ে যাও। তারা গেছে।” আল-খাত্তাবী বলেছেন, “কৃপণ কথাটার চেয়ে অর্থলোভী শব্দটা বেশি সুনির্দিষ্ট। কৃপণ হলো একটা ধারণা। আর অর্থলোভী হলো একটা জাত।” কৃপণতার কথাগুলো ব্যক্তিগত ও বিশেষ পরিস্থিতিতে বলা। অন্যদিকে অর্থলোভী শব্দটা সাধারণ অর্থবোধক। এটা অনেকটা লোভী সব মানুষের মতো।
কেউ কেউ বলেছেন কৃপণতা মানে টাকা ধরে রাখা। অর্থলোভিতা মানে টাকাপয়সার সাথে মারাদাওয়াও আটকে রাখা।
এখানে চরিত্রহীন কাজ বলতে মিথ্যা বলাকে বোঝানো হয়েছে। এই শব্দের উৎসের মানের সত্য থেকে সরে আসে। বলা হয়, সে চরিত্রহীন হয়েছে মানে সত্য থেকে সে গেছে।
[২] আত-তিরমিযী ১৯২২। ‘আবু হু’রাইরা, আল-হিলয়া ২/৩৬১। বর্ণনাকারী: আবু সা’ঈদ আল- খুদরী রা.।
📄 পয়সা ওড়ানো
খায়েশের হুকুম মেনে মানুষ যেসব খারাপ কাজ করে তার মধ্যে অপচয় বা পয়সা ওড়ানো অন্যতম। বিবেক খাটলে মানুষ পয়সা ওড়াতে পারত না। এক্ষেত্রে সেরা শৃঙ্খলা হলো আল্লাহর শৃঙ্খলা। সুমহান আল্লাহ বলেছেন, “অপব্যয় করে অপচয় কোরো না।” [আল-ইসরা’ ১৭:২৬]
আপনাকে হয়তো পুরো মাসের জীবিকা এক দিনেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি তা অপচয় করে উড়িয়ে দেন, তা হলে বাকি মাস ঝুঁকে ঝুঁকে চলতে হবে। যদি হিসাব করে চলেন, তা হলে বাকি মাস আরামে থাকবেন।
অপচয় অসুখের চিকিৎসার জন্য নিজের খামখেয়ালীপনার পরিণাম নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। ভবিষ্যৎ প্রয়োজন ও দারিদ্র্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। এতে করে আপনার পয়সা ওড়ানোর খায়েশে লাগাম পড়বে।
📄 আয়-ব্যয়ের ব্যাখ্যা
বুদ্ধিমান মানুষের আয় তার ন্যূনতম প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়। বিপদে যেন কাজে লাগে এজন্য তারা কিছু টাকা সঞ্চয়ও করে। হতে পারে কখনো হয়তো কামাই রোজগারের জন্য কোনো সমস্যার কারণে কাজ করতে পারছেন না। এই সঞ্চয় তখন খুব কাজে আসবে। সন্তান হলে টাকা লাগবে। আরেকটি বিয়ে করতে চাইলে টাকা লাগবে। চাকরিবাখর প্রয়োজন হলেও টাকার দরকার। আবার সন্তানের যদি টাকাপয়সার প্রয়োজন হয়, তা হলেও তো টাকা চাই। তাই জীবিকা যথেষ্ট কি না সেটা খেয়াল রাখবেন।
মোদ্দাকথা ব্যয়ের চেয়ে আপনার আয় বেশি হতে হবে। তা হলে কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে টাকা সঞ্চয় হবে না। তখন বিপদে পড়লে কুলকিনারা খুঁজে পাবেন না। পরিণামের কথা চিন্তা করে বলে বিবেক কিন্তু আপনাকে এই উপদেশই দেয়। কিন্তু খায়েশের চিন্তা শুধু আজকের জীবন নিয়ে। কাল কী হবে সেটা নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা নেই।
আব্দুদ্-দার্দা’ বলেছেন, “গভীর বুঝদার মানুষ ভবিষ্যৎ জীবনের ভাবনা আগে থেকে ভেবে রাখে।”[১]
টিকাঃ
[১] প্রাজ্ঞতা বর্ণনাকারী থেকে মাওকুফ হিসেবে বর্ণিত। [মাওকুফ: যে হাদীসের বর্ণনা শুধুমাত্র সাহাবি পর্যন্ত গিয়া থেমে গেছে। —সম্পাদক]