📄 কামনার সমালোচনা
ন যখন যা চায়, তা-ই পেতে চাওয়ার নাম ‘হাওয়া’ বা কামনা। সে- চাওয়া যদি বৈধ হয়, তা হলে তো সমালোচনার কিছু নেই। তবে তারপরও খুব বেশি নিজের কামনার পিছে ছোটা যাবে না। কামনার অনুসরণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে অবশ্যই সমালোচনা করতে হবে। আর যদি অবৈধ বা অনুমতিহীন কিছু হয় তখন তো নিন্দা করতেই হবে। আবার অনুমতি থাকলেই লাগামহীনভাবে তাতে জড়িয়ে পড়া যাবে না।
মনের একটা অংশ বুদ্ধিদত্ত। এর গুণ প্রজ্ঞা; দোষ অজ্ঞতা। এর কিছু অংশে থাকে রাগ। এর গুণ তেজ; আর দোষ কাপুরুষতা। এর কিছু অংশে আছে লিপ্সা। এর গুণ সংযম; আর দোষ লাগামহীন লালসা।
বিপদের মুখে ধৈর্য ধরা মনের একটা বিশাল গুণ। এর মাধ্যমেই মানুষ ভালোখারাপ সহয করে। যার ধৈর্য নেই, কামনার উপর লাগাম নেই, সে কাতারের সামনে না থেকে চলে গেছে পেছনে। সে যেন প্রজাকে বানিয়েছে তার নেতা। যা থেকে সে মনে করে উপকার পাবে সেটা তার ক্ষতি করে। যা থেকে সে মনে করে সুখ পাবে সেটা তাকে দুঃখ দেয়।
বিবেক আছে বলেই মানুষ পশুপাখি থেকে আলাদা। বিবেকের কাজ খায়েশের পিছু পিছ্ যাওয়া থেকে বারণ করা। আপনি যদি বিবেককে পায়ে ঠেলে খায়েশের গোলামি করেন, আপনি তখন জন্তু-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট হবেন। শিকারি কুকুর আর রাস্তাঘাটে ঘোরাঘুরি করা কুকুর দেখলে বিষয়টা বুঝবেন। শিকারি কুকুরের আলাদা সম্মান আছে। দাম আছে। কারণ, ইচ্ছার উপর লাগাম টানার ক্ষমতা আছে তারা। শাস্তির ভয় কিংবা মনিবের কৃতজ্ঞতারূপ তারা মনিবের শিকার নিজের কাছে নিরাপদে রাখে।
নাবিকহীন জাহাজ যেমন স্রোতের টানে উদ্দেশ্যহীন ভেসে যায়, খায়েশ ঠিক সেরকম মানুষের স্বভাবকে ইচ্ছেমতো নাছারা। সদানবদার মানুষ হিসেবে বলুন তো: খায়েশের লজ একে একবার চালুর জন্য কত খারাপ ফল, উপায়ে এ যে খারাপ পরিণام হচ্ছে সে কি সহজ? নাকি শুরুতেই খায়েশ চেপে ধরার কষ্ট সহজ?
খায়েশের অনুসরণ সবচেয়ে প্রকট পরিণাম হচ্ছে মানুষ সেই খারাপ কাজটি করতে একসময় আর কোনো মজা পায় না। কিন্তু অভ্যাসগত করে যায়। নিজেকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে পারে না। এ ধরনের খারাপ কিছুতে অভ্যস্ত হলে তা আসক্তিতে রূপ নেয়। মদপান কিংবা অবাধ যৌনসম্পর্কে যারা আসক্ত তাদের অবস্থা এমনই।
খায়েশের মুখে লাগাম আটবেন কীভাবে? এর খারাপ দিকগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। নিজেকে নিয়ে ভাবলে পুরে বুঝবেন, খায়েশের গোলামির জন্য আপনার জন্ম হয়নি। ৬৯ আপনার চেয়ে বেশি খায়েশ আপনি আপনার চেয়ে সহজভাবে বেশি করে। জানোয়ারদের কামনা লাগামহীন। কিন্তু ওদের হৃদয় আসে না।
মানুষের পিপাসা যখন কমে যায়, বার্ধক্য পৌঁছায় তখন তার উপলব্ধি হয় কামনার পেছনে ছোটার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি।
যেসব কামনা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে সেগুলো নিন্দিত। বিবেকবুদ্ধি এগুলোকে মন্দ বলে জানে। অন্যায়াদি আত্ম-উন্নয়নের ইচ্ছেগুলো প্রশংসিত।
📄 বিবেকের চোখ, কামনার চোখ
পা ঁক, কামনার পেছনে ছোটার সময় মানুষ আগাপিছ্ চিন্তা করে না। সে কিন্তু ঠিকই জানে এই কাজে যন্ত্রণা বেশি। অন্যান্য আরও অনেক তৃপ্তি থেকে বঞ্চনা তো আছেই। কামনার প্রলোভনে এসব চিন্তা তখন মাথা থেকে হারিয়ে যায়। সে পশুর স্তরে নেমে যায়। পশুদের তো তবু সাফাই আছে। পরিণামের খেয়াল না করলেও চলে তাদের। চিন্তাশীল মানুষের সেই সুযোগ কোথায়?
দেখুন, মানুষ হিসেবে আপনার অবস্থান অনেক সম্মানিত। উঁচু অভিজাত আপনার মর্যাদা। সমঝদার মানুষ কখনো পশুদের স্তরে নামে না। নামতে পারে না। কারণ, বিবেক কাজের ফলাফল নিয়ে ভাবে। সে দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও কল্যাণকামী ডাক্তারের মতো পরামর্শ দেয়।
কামনা অনেকটা বেখেয়াল বালকের মতো।। অথবা অসুস্থ লোভী ব্যক্তির মতো। কামনা তো বাঁধনা ধরবেই। আপনার বিবেক যদি সেটাকে ঠিক না ভাবে তা হলে তার সঙ্গেই সলা-পরামর্শ করুন। এই বিবেক জ্ঞানী। উপদেশের বেলায় আঞ্চলিক। বিবেক যা বলে তাতে ধৈর্য ধরুন। আপনি তো ভালো করেই, এর শ্রেষ্ঠতা জানেন। কামনার উপর মনের শাসনকে প্রাধান্য দিতে আর কি কিছুর প্রয়োজন আছে?
মনের সিদ্ধান্ত ঠিক আছে কিনা সে ব্যাপারে যদি আরও প্রমাণ লাগে তা হলে ভাবুন তো একবার: খায়েশের পিছু ছুটলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে? মানুষের সামনে আপনার কলঙ্কের হাঁড়ি ভেঙে যাবে। কুৎসা ছড়াবে। ভালো ভালো আমল ছুটে যাবে আপনার। খেয়ালখুশির জিদ্দগি চাগিয়ে অপমান- অপদস্থ আর দুর্ভোগের শিকার হওয়া ছাড়া আর কী জুটবে কপালে?
আচ্ছা, খায়েশটা পূরণ করলে কী পাবেন? না হয় কিছু একটা পেলেনই; তারপর? ক্ষণিক তৃপ্তিভোগটা চলে যাওয়ার পর কী অবস্থা হবে তখন? এই অপরাধবোধের জ্বালা নিয়ে ভাবলে পরে বুঝবেন যা পেয়েছেন তার দ্বিগুণ খুইয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে একটা কবিতা বলি:
কত ভোগ সুখের মরিচিকার দিকে ডেকেছে কিন্তু দিয়েছে কেবল দুঃখ আর কষ্ট কামনার কত ছোবল ধর্ম আর গুণের আচ্ছাদন সরিয়ে মানুষকে উলঙ্গ করে ছেড়েছে
খেয়ালখুশি মতো কাজ করলে অপদস্থ হবেনই। কামনার গারদে বন্দি জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছু পাওয়ার আশা করে লাভ নেই। কিন্তু একবার যদি একে পায়ে ঠেলে চলতে পারেন তা হলে সেই জীবন হবে মর্যাদার, গর্বের। নিজেকে মনে হবে ভুবনজয়ী।
কখনো কি খেয়াল করেছেন, ভীষণ ধার্মিক কারও সান্নিধ্য পেলে প্রবল শ্রদ্ধায় মানুষ তার হাতে চুমু খায় কেন? ওরকম খাঁটি মানুষকে দেখলে মানুষ বোঝে, কামনার সামনে তারা যেরকম হাত-পা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছিল, এরা সেরকম নন। নিজেদের খেয়ালখুশিকে পিছে ফেলার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী তারা।
📄 প্রেমের ভূত
পে ম যে কত মানুষকে ধ্বংস করেছে, তার খবর কে জানে! কারও শরীর, কারও ধর্ম, কারও-বা দুটোই প্রেমনদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। যাহুল-হাওয়া (খায়েশের সমালোচনা) বইতে প্রেমের ভূত তাড়ানোর বেশ কিছু প্রতিরোধকের কথা বলেছি। তার কিছু কিছু এখানেও বলেছি।
এই রোগ তাড়ানোর প্রথম ওষুধ হচ্ছে চোখ নামিয়ে রাখুন। এটাই মোক্ষম দাওয়াই। নাহলে অন্য অনেকের মতো আপনাকে এই রোগে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে।
ক্যানসারের মতো প্রেমজীবাণু সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই যদি প্রতিকার করা যায় তা হলে ফায়দা পাবেন। কিন্তু একবার যদি সেটা গভীর প্রণয়ে রূপ নেয়, তা হলে এই চিকিৎসা কাজে আসার সম্ভাবনা খুব কম।
আকস্মিকত কিছু দূর দিকে অসতর্ক চোখ পড়ে গেলে প্রেম জন্মায় না। কিন্তু বারবার যদি তাকাতেই থাকেন, আপনার মনের লোভ আর যৌবনের আকর্ষণ হাত ধরে টেনে আপনাকে প্রেমে পড়াবে।
তাই বাঁচতে চাইলে ক্যানসার হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নিন। যা কিছু যত উপায়ে প্রেমের উস্কাণি দেবে তাতে বাধা দিন। যেহেতু দৃষ্টি সবার আগে যায়, তাই চোখ নামিয়ে রেখে প্রথম বাঁধটা তৈরি করতে হবে। এজন্য ধৈর্য ধরে সহ্য করতে হবে কিছুদিন। আত্মনিয়ন্ত্রণ আর মনের শক্তি সেরা ওষুধ। এই ওষুধে সাহায্য পাবেন আল্লাহকে ভয় করলে। কুর্কীর্তির কথা জানাজানি হলে যে লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতিতে পড়বেন সেটা কল্পনা করলেও গাছে দেবে। যার প্রতি প্রেম জেগেছে তার ভেতরের দৌলতক্রুর কথা ও স্মরণ রাখুন। ইবনু মাস’উদ বলেছেন, “কারও যদি কোনো নারীকে ভালো লাগে, তা হলে সে যেন তার মৃতের কথা মাথায় রাখে।”
যদি বিয়ের সামর্থ্য থাকে এবং বিয়ে করা যদি বৈধ হয়, তা হলে কারও প্রতি প্রেম জাগলে বিয়ে করতে পারলে ভালো। বিয়ে করলে এই রোগের তীব্রতা কমবে। আরও বেশ কিছু উপায় আছে:
* একাধিক বিয়ে * উপপত্নী * লম্বা দূরত্বের সফর * ভালোবাসার মানুষ থেকে পাওয়া ধোঁকার কথা মনে করা * ধার্মিকতা দুনিয়াবিমুখতা (যুহদ) বিষয়ক বই * মৃত্যুর কথা স্মরণ * রোগী ও কবরস্থান দেখতে যাওয়া
যা চাচ্ছেন তা পাওয়ার পর যে একটা অনীহা চলে আসবে সেটা নিয়ে ভাবুন। জীবিত মানুষের সদাপরিবর্তিত মনের কথা ও মাথায় রাখুন। অন্যদের থেকেও সাহায্য নিতে পারেন। কখনো কখনো অন্যরাও আপনাকে ধ্বংসের তীর থেকে উঠে আসতে সাহায্য করতে পারেন।
মনে রাখবেন, মাত্র একটি ভুলের কারণে প্রথম পুরুষ নারী আদম হাওয়াকে জান্নাত ছেড়ে নশ্বর পৃথিবীতে নেমে আসতে হয়েছিল। আল্লাহ তাদের দুজনের উপর শাস্তি বর্থন করেন।
টিকাঃ
[১] ক্রীতদাসী উপপত্নী রাখা নিয়ে সন্দেহ দূর করতে দেখুন: ডা. শামসুল আরেফীন, দক্ষিণ হস্ত মালিকাানা, 'ডালস্ স্টাডিজ', ঢাকা: মাকতাবাতুল আখয়ার, ২০১৭। —সম্পাদক
📄 শারাহ তাড়ানো
যখন যা মন চায় তা-ই খাওয়াকে সাধারণত শারাহ্ বলে। এটা যে মানুষের কত ক্ষতির দিকে টেনে নিয়ে যায় তার অনেক নজির আছে। খাওয়ার এই খাসলত থেকে এর উৎপত্তি।
আল-হারিস ইবনু কিলাহ্১ বলেছেন, “একবার খেয়েছে। তার উপর আবার খাচ্ছে। এভাবেই বন্য পশুরা নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনে।” অন্যরা বলেছেন, “ক্ষুধার্ত যদি মৃত্যুর কারণ, জিজ্ঞেস করা হয়, তারা বলবে অতিভোজন।”
আল-হাসান বলেছেন, সামুরাহকে একবার বলা হলো তার ছেলে সারারাত ধরে ঘুমোতে পারছে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন সে কি খুব বেশি খেয়েছে। তারা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তিনি তখন বললেন, “ও যদি মারা যায়, তা হলে আমি ওর জানাযার সালাত পড়ব না।”
এক লোক আরেক লোককে নিন্দা করে বলেছিল, “আপনার বাবা মারা গিয়েছেন বেশি খেয়ে খেয়ে। আর মা মারা গিয়েছেন বেশি পান করে করে।”
‘উকবাহ আর-রাসিবিী একবার আল-হাসানের বাড়িতে গিয়েছিলেন। হাসান তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। ‘উকবাহকে দেখে তার সাথে খেতে বসতে বললেন। তিনি জানালেন তার পেট ভরা। শুনে আল-হাসান বললেন, “সুবহান আল্লাহ্! কোনো মুসলিম কি পেট ভরা পর্যন্ত খেতে পারে!?”
অতিভোজন
পাচঁক, বিবেকবান লোক বাঁচার জন্য খায়। আর বেয়েশিয়া লোক খাওয়ার জন্য বাঁচে। বেশি খেয়ে খেয়ে অনেক মানুষ কম বয়সে মারা গিয়েছেন। লাক্বতুল-মানাফি’ বইতে ভরপেট খাওয়ার নানা সমস্যা আমি তুলে ধরেছি। এত বেশি খাবেন না যাতে নিজেরই ক্ষতি হয়। ‘মনের গুণ’ আর ‘কামনার সমালোচনা’ অধ্যায়ে যা বলেছি, সেটা মানলেই নিজেকে নানা পাপ আর ক্ষয়ক্ষতি থেকে দূরে রাখতে পারবেন।
অত্যাধিক দৈহিক মিলন
শারাহ্ হতে পারে বেশি দৈহিক মিলনের বেলাতেও। আল-নাক্বত বইতে এ ব্যাপারেও বলেছি কেউ যদি খুব বেশি সহবাস করে, তা হলে তার শুক্রাণু গ্রন্থি একসময় খালি হয়ে যায়। তাতে অনুপযোগী জিনিস ঢুকে পড়ে। আর এতে করে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড আর লিভারের মতো শরীরের প্রধান প্রধান অঙ্গগুলো কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। একসময় দৈহিক মিলনের চাহিদা মারাত্মকভাবে কমে যায়। দ্রুত ক্ষয় হয়।
সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা কিংবা বিয়ে-বহির্ভূত দৈহিক মিলনের শর্তে ঠেকানো সহবাসের মূল উদ্দেশ্য হওয়াও উচিত। কিন্তু সেটা যদি ভোগ আর তৃপ্তির জন্য কারও অভ্যাস হয়ে যায়, তা হলে বাস্তবে সে আসলে পশুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
সম্পদ স্তূপ করা
সম্পদ স্তূপ করা বিষয়টাও এক ধরনের শারাহ্। দরকারের চেয়ে বেশি টাকাপয়সা জমানোকে বলে ‘টাকা পাগলামি’। শুধু টাকার জন্য টাকার পেছনে ছুটবেন না। নিজেকে, নিজের ছেলেমেয়েদের ভালোলাগে ও ভালো থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আয় করার পর অন্যদেরকে দান করবেন। এটা খুব প্রশংসনীয় কাজ। বিবেকবান মানুষ হিসেবে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আয় করার পর, অথবা আর বাড়তি টাকা কামানোর ধান্দায় দেশ-বিদেশে ঘুরে ঘুরে মূল্যবান সময় স্বাস্থ্য নষ্ট করবেন না। এক কবি খুব সুন্দর করে বলেছেন:
টাকা স্তূপ করার জন্য যে দিন কাটায়
দারিদ্রের আশঙ্কায়, সে যা করল সেটাই দারিদ্র।
কত মানুষের কথা শুনেছি দেখেছি, হাড়কিপটে; বুড়ো হওয়ার পরও পয়সার ধান্দায় দেশবিদেশের বাণিজ্যসফর করছে। তারা অবশ্য দাবি করে মুনাফা অর্জনের জন্য তাদের এসব সফর। কিন্তু ওগুলো করতে করতেই একদিন তাদের মৃত্যু আসে। অথচ অনেক চাওয়াও তখনো অপূর্ণ।
এই রোগ সারানোর জন্য প্রথমে টাকা সংগ্রহের উদ্দেশ্য বুঝুন। অর্থ উপার্জন আর নিজের সবচেয়ে মূল্যবান দুই সম্পদ স্বাস্থ্য ও সময়—এগুলোর লাভ-ক্ষতির মাঝে তাল ঠিক রাখুন। নিজের বিবেকের সাথে সলাপরামর্শ করলে বিষয়টা বুঝে যাবেন। কিন্তু সম্পদের স্তূপ করার নেশা যদি পেয়ে বসে, তা হলে লোভের মরুভূমিতে ধ্বংস হয়ে যাবে সে। তখন তার একমাত্র উত্তরসূরি হবে পাহাড় আর বাসেরপিটা।
অপচয়
সুন্দর সুন্দর শিল্প—এই যেমন ঘর-বাড়ি সাজানো, দামি ঘোড়া [আমাদের সময়ে গাড়ি], জাঁকজমক পোশাক—এরকম আরও অনেক কিছুতেও শারাহ্ হতে পারে। এখানেও অসুখের বীজ সেই আবেশ।
এর চিকিৎসার জন্য কিছু বিষয় জানাচ্ছি। উপার্জন হালাল হলেও পাই পাই করে হিসেবে দিতে হবে। অপচয় হারাম, কাজেই সাবধান হতে হবে। অহংকার করে যে তার পোশাক মাটিতে হেঁচড়ে হেঁচড়ে চলে আল্লাহ্ তার দিকে ফিরেও তাকাবেন না।
একজন মু’মিন বিশ্বাসীকে আল্লাহ্ সবকিছুর জন্য পুরস্কার দেবেন। কিন্তু বাড়িঘর বানানোর জন্য কিছু নেই। আপনি যদি বুদ্ধিমান হন, তা হলে নিশ্চয়ই আপনি চিন্তা করবেন আপনার শেষ গন্তব্য কোথায়, কতদিন আর এই পৃথিবীতে আছেন আপনি। তখন দেখবেন যে-পোশাক পরে আছেন আর যে-বাড়িতে মাথা গুঁজেছেন তাতে সত্যিই সুখ খুঁজে পাচ্ছেন না।
বর্ণিত আছে নূহ্ নবি খুব দুর্বল একটা বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছেন ৯৫০ বছর। আমাদের নবি শাক্বাতুন কাদামাটির তৈরি বাড়িতে। খালীফাহ্ ‘উমার ইবনুল-খাত্তাবেরা পোশাকে ১২টা তালি ছিল। কেন তারা এভাবে থাকতেন? কারণ, তারা খুব ভালো করে বুঝে নিয়েছিলেন, এই দুনিয়া হচ্ছে সেতু। সেতুকে কখনো ঘর হিসেবে নিতে নেই।
আপনি যদি এসব বিষয়ে সচেতন না হন তা হলে শারাহ্ রোগে পড়বেন। এই রোগ সারাতে চাইলে পড়াশোনা করুন। বিজ্ঞ 'আলিমদের জীবনী নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন।
টিকাঃ
১। আবর অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন তিনি। তা’ইফ অঞ্চলের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিও ছিলেন তিনি। পারস্য অঞ্চলে সুবার সফর করেন। সেখান থেকেই চিকিৎসা-বিদ্যা শেখেন। ইসলাম আবির্ভাবের আগে তার জন্ম। খালিদশাহ মু’আইয়াহর সময় পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা তা নিয়ে 'আলিমগণ একমত নন। কেউ আবু হুবেইরাহ তায়ফীর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। তার জানাযায় তারা ছিলো। কিসরা আনূশারুয়ানের সাথে কথোপকথন নিয়ে তিনি 'চিকিৎসা কথন' নামে একটি বই লিখেছিলেন। সূত্র: আয-যারকালি, আল-আযলিম, ২/১৭৯।