📄 হজ্জের তাৎপর্য, শ্রেষ্ঠ এবাদত, ফজীলেত, হুকুম ও নিয়মাবলী, মীকাত, হজ্জের ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাত, হজ্জের নিষিদ্ধ কাজ, বদলী হজ্জ, উমরাহ, একটি স্বপ্ন, হজ্জের জরুরী মাসআলাহ
তাবরানী হযরত আবদুল্লাহ বিন জারাদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
حُجُّوا فَإِنَّ الْحَجَّ يَغْسِلُ الذُّنُوبَ كَمَا يَغْسِلُ الْمَاءُ الدَّرَنَ .
অর্থঃ তোমরা হজ্জ আদায় কর। কেননা, পানি যেমন ময়লা পরিষ্কার করে, হজ্জও তেমনি গুনাহ পরিষ্কার করে। হযরত জাবের থেকে বর্ণিত হাদীসে হজ্বে মাবরুর বা কবুল হজ্জ কি এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রশ্ন করা হয়। অর্থাৎ, বির্র কি? তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, খানা খাওয়ানো এবং ভাল কথা বলা। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, খানা খাওয়ানো এবং বেশী বেশী সালাম দেয়া। অভাবী মানুষকে খানা খাওয়ানো, সর্বদা ভাল কথা বলা এবং মানুষকে সালাম দেয়া আদর্শ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য যা কবুল হজ্জের লক্ষণ।
নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে খোযায়মা এবং ইবনে হিববান হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হাজী এবং উমরাহ আদায়কারী লোকেরা আল্লাহর প্রতিনিধি। তারা দোয়া করলে আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেন এবং ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেন। হাদীসটি হচ্ছে-
الْحُجَّاجُ وَالْعُمَّارُ وَفَدُ اللَّهِ إِنْ دَعَوْهُ أَجَابَهُمْ وَإِنِ اسْتَغْفَرُوهُ غَفَرَ لَهُمْ .
তাবারানী হযরত আবুজর (রা) থেকে বর্ণনা করেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হযরত দাউদ (আ) আল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, হে আমার মাবুদ! যে বান্দাহরা তোমার ঘর যিয়ারত করে তাদের জন্য তোমার কাছে কি রয়েছে? আল্লাহ উত্তরে বলেন, যার যিয়ারত করা হল তার উপর প্রত্যেক যিয়ারতকারীর অধিকার রয়েছে। হে দাউদ, আমার উপর তাদের অধিকার হচ্ছে, আমি তাদেরকে দুনিয়ায় করুণা দান করবো এবং তাদের সাথে সাক্ষাতের দিন ক্ষমা করে দেবো। হাদীসটি হচ্ছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ دَاوُدَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ قَالَ : إِلهِي مَا لِعِبَادِكَ عَلَيْكَ إِذَاهُمْ زَارُوكَ فِي بَيْتِكَ ؟ قَالَ لِكُلِّ زَائِرٍ حَقٌّ عَلَى الْمَزُورِ حَقًّا يَا دَاوُدُ لَهُمْ عَلَيَّ أَنْ أَعَافِيْهِمْ فِي الدُّنْيَا وَاغْفِرَ لَهُمْ إِذَا لَقِيتُهُمْ .
তাবারানী সাহল বিন সাদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন:
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا رَاحَ مُسْلِمُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مُجَاهِداً أَوْ حَاجًا مُهلاً أَوْ مُلبِيًّا إِلَّا غَرَبَتِ الشَّمْسُ بِذُنُوبِهِ وَخَرَجَ مِنْهَا -
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, কোন মুসলমান যদি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ কিংবা তাকবীর ও তালবিয়াসহ হজ্জ করার উদ্দেশ্যে বের হয়, তাহলে, সূর্য ডুবার সাথে সাথে তাদের গুনাহ মাফ হয়ে যায় এবং তারা নিষ্পাপ হয়ে যায়।
হাকেম আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন:
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْحَاجِّ وَلِمَنِ اسْتَغْفَرَ لَهُ الْحَاجُّ .
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) দোয়া করেছেন, হে আল্লাহ! হাজীর গুনাহ মাফ কর এবং হাজী যাদের জন্য ক্ষমা চায় তাদের গুনাহও মাফ কর।'
উপরোল্লেখিত রেওয়ায়েতসমূহ দ্বারা হজ্জ এবং উমরাহর ফজীলত কত বেশী তা বুঝা গেল। হযরত আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, 'রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন আমল উত্তম? তিনি জবাবে বলেন, 'তালবিয়া পাঠ করে হজ্জ করা এবং কুরবানী করা।' (তিরমিযী) হজ্জ উপলক্ষে এই দু'টো কাজই করা লাগে। এছাড়াও হজ্জ সম্পর্কে ফাকেহী হাসান বসরী থেকে একটি চমৎকার বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আরশের নীচের ধনভাণ্ডারসমূহের মধ্যে তিনটি বিষয় হচ্ছে নিম্নরূপঃ
(১) কোন ব্যক্তির কাছে যদি ১ লাখ পরিমাণ মুদ্রা থাকে তবুও সে হজ্জ করতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আরশের নীচের একজন আহবানকারী এই আহবান করে যে, এই বছর অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ হজ্জ করার সৌভাগ্য দান করেছেন।
(২) কারো নিকট যদি ১ লাখ পরিমাণ মুদ্রা থাকে, তথাপি সে উমরাহ করার তৌফিক লাভ করবে না যে পর্যন্ত না আরশের নীচের একজন আহবানকারী এই বলে আহবান করবে যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে উমরাহ করার সৌভাগ্য দান করেছেন।
(৩) মোশরেকরা ১ লাখ তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে চাইলেও সেই ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারবে না যে পর্যন্ত না আরশের নীচের একজন আহবানকারী এই মর্মে আহবান করবে যে, অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ শাহাদাতের মর্যাদা দান করেছেন।
এই বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বয়ং আসমান থেকে আল্লাহর একজন প্রতিনিধি হজ্জ এবং উমরাহর ঘোষণা দিয়ে থাকেন। আসমান থেকে যে জিনিসের ঘোষণা দেয়া হয় সে বিষয়টি কত মহান এবং কতইনা তাৎপর্যপূর্ণ।
হজ্জ কবুল হওয়ার জন্য হালাল অর্থ জরুরী
হালাল ও বৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ ছাড়া হজ্জ করলে সে হজ্জ হয় না। এ প্রসঙ্গে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَض قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَرَجَ الْحَاجُّ حَاجًا بِنَفْقَةٍ طَيِّبَةٍ وَوَضَعَ رِجْلَهُ فِي الْغَرْزِ فَنَادَى : لَبَّيْكَ نَادَاهُ مُنَادٍ مِّنَ السَّمَاءِ : لَبَّيْكَ وَسْعَدَيْكَ ، زَادَكَ حِلالٌ وَرَاحِلَتُكَ حلالٌ وَحَجَكَ مَبْرُورُ غَيْرُ مَازُورُ ، وَإِذَا خَرَجَ بِالنَّفْقَةِ الْخَبِيثَةِ فَوَضَعَ رجُلَهُ فِي الْغَرْزِ فَنَادَى : لَبَّيْكَ اللَّهمَّ لَبَّيْكَ ، نَادَاهُ مُنَادٍ مِّنَ السَّمَاءِ لَا لبَّيْكَ وَلَا سَعَدَيْكَ ، زَادَكَ حَرَامٌ وَ نَفْقَتُكَ حَرَامٌ وَ حَجَّةٌ مَازُورٌ غَيْرُ مبرور -
অর্থ: 'আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন। যখন কোন ব্যক্তি হালাল অর্থ দ্বারা হজ্জ করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে সওয়ারীর আসনে পা রাখে এবং প্রভু হে, আমি হাজির এ কথা বলে, তখন আসমান থেকে একজন আহ্বানকরী তার উদ্দেশ্যে আওয়াজ দিয়ে বলে: আমিও হাজির, তোমার কল্যাণ হোক। তোমার পথের সম্বল হালাল, সওয়ারী হালাল, তোমার হজ্জ কবুল এবং তোমার আর কোন গুনাহ অবশিষ্ট নেই। আর যদি হাজী হারাম অর্থ দ্বারা হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হয় এবং সওয়ারীতে আরোহণ করে এবং প্রভু হে আমি হাজির- একথা বলে, অর্থাৎ লাব্বাইকা বলে, তখন আসমান থেকে একজন আহ্বানকারী এর জবাবে বলে, তোমার জন্য আমি হাজির নেই, তোমার কোন কল্যাণ নেই, তোমার পথের খরচ হারাম, সম্বল হারাম, তোমার হজ্জ কবুল নয় এবং তা গুনাহমুক্ত নয়।' (তাবারানী)
অন্য এক হাদীসে এসেছে-
عَنْ جَابِرٍ رض قَالَ قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ لَحْمَ نَبَتَ مِنَ السُّحْتِ وَكُلُّ لَحْمِ نَبَتَ مِنَ السُّحْتِ كَانَتِ النَّارُ أولى به - (احمد والدارمي والبيهقي في شعب الايمان)
অর্থ: জাবের (রা) থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন: হারাম অর্থ দ্বারা যে শরীরের রক্ত-মাংস গঠিত হয়েছে সে শরীর বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম অর্থ দ্বারা গঠিত রক্ত-মাংসের শরীরের জন্য দোজখই উত্তম।
আরেক হাদীসে এসেছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ قَالَ : لَا يَكْسِبُ عَبْدٌ مَالَ حَرَامٍ فَيَتَصَدَّقُ مِنْهُ فَيُقْبَلُ مِنْهُ وَلَا يُنْفِقُ مِنْهُ فَيُبَارَكَ لَهُ فِيهِ وَلَا يَتْرُكُهُ خَلْفَ ظَهْرِهِ إِلَّا كَانَ زَادَهُ إِلَى النَّارِ إِنَّ اللهَ لَا يَمْحُو - السَّيِّئَ بِالسَّيِّئ وَلَكِنْ يَمْحُو السَّيِّءَ بِالْحَسَنِ إِنَّ الْخَبِيثَ لَا يَمْحُو الخَبِيثَ .
অর্থ: আবদুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন, কোন ব্যক্তি হারাম মাল উপার্জন করে তা দান করলে তা কবুল হয় না। সে মাল খরচ করলে তাতে বরকত হয় না এবং মৃত্যুর পর তা রেখে গেলে তা তার জন্য দোযখের সম্বল হবে। আল্লাহ খারাপ জিনিসের বিনিময়ে খারাপ জিনিস দূর করেন না। কিন্তু ভালর বিনিময়ে মন্দ দূর করেন। নিকৃষ্ট ও মন্দ জিনিস অন্য মন্দ ও নিকৃষ্ট জিনিসকে দূর করতে পারে না। (মুসনাদ আহমদ)
আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত এক লম্বা হাদীসের শেষাংশে এসেছে,
قَالَ قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... ثُمَّ ذَكَرَ الرَجُلَ الَّذِي يُطِيْلُ السَّفَرَ أَشْعَتَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَارَبَّ يَارَبَّ وَ مَطْعَمُهُ حَرَامُ وَمَشْرَبُهُ حَرَامُ وَمَلْبَسُهُ حَرَامُ وَغُذَّى بِالْحَرَامِ فَأَنِّي يُسْتَجَابُ لِذَالِكَ (مسلم)
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন...। তারপর তিনি দীর্ঘপথ সফরকারী এলোমেলো চুল ও ধূলা-মলিন ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলেন, (সাধারণতঃ মুসাফিরের দোয়া কবুল হয়) সেই ব্যক্তি আকাশের দিকে দু'হাত তুলে দোয়া করে, হে রব! হে রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম দ্বারা তার শরীর গঠিত হয়েছে। কি করে তার দোয়া কবুল হবে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হারাম অর্থসম্পদ বলতে কি বুঝায়? বহু উপায়ে হারাম অর্থ উপার্জন করা যায়। মিথ্যা বলে আয় করা কিংবা ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থও হারাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন الرَّأْشِي وَالْمُرْتَشِي فِي النَّارِ অর্থঃ ঘুষখোর ও ঘুষদাতা দোযখে যাবে। সুদ হারাম। সুদের গুনাহ ৭০ ভাগে বিভক্ত। এর সর্ববৃহৎ গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করা আর ছোট গুনাহ হচ্ছে, নিজ মায়ের সাথে যেনা করা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةً قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهُ الرِّبَا سَبْعُوْنَ جُزْءًا أَيْسَرُهَا أَنْ يَنْكِحَ الرَّجُلُ أُمَّهُ (ابن ماجة، بيهقى شعب الايمان)
অর্থ: সুদের গুনাহের ৭০ ভাগের ক্ষুদ্রতম অংশ হচ্ছে নিজ মায়ের সাথে যেনা করা। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন,
فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوا فَاء ذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهَ وَرَسُولِهِ .
অর্থঃ যদি তোমরা সুদ থেকে বিরত না হও, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ কর। (সূরা বাকারা-২৭৯)
কাউকে ঠকানোর মাধ্যমে, ধোঁকা ও ফাঁকিবাজীর মাধ্যমে কিংবা জোর জবরদস্তি ও জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে অবৈধভাবে মাল কামাই করা যায়। অন্যের অধিকার হরণ করা, মাপে কম দেয়া, ভেজাল মিশানো, মওজুদ্দারী করা, সম্পদের যাকাত আদায় না করা, চুরি, ডাকাতি করা, কারো জমীনের উপর নিজের জমীনের আল ঠেলে নেয়া ইত্যদি উপায়ে অর্জিত অর্থ হারাম ও অবৈধ। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ ভোগ করে হজ্জ কেন, অন্য কোন এবাদতও কবুল হবে না বলে রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীসে পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন। তাই হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জন করা খুবই জরুরী।
হালাল রোজগারের জন্য দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইসলাম সম্মত না হলে, বৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করা প্রায় অসম্ভব। ইসলামী অর্থনীতির অবর্তমানে, হালাল রোজগারের সুযোগ থাকে সীমিত, ইসলামের প্রতিটি হুকুম একটা আরেকটার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। একটাকে ছাড়া আরেকটা চলতে পারে না। ইসলামকে একটা গাছের সাথে তুলনা করলে, হজ্জ এবং অন্যান্য সকল হুকুম তার শাখা-প্রশাখা মাত্র। তাই শুধুমাত্র একটি শাখাকে পৃথকভাবে পরিশুদ্ধ করে পারা যাবে না। সেজন্য পূর্ণাঙ্গ ইসলাম কায়েম করার জন্য ব্যাপক দাওয়াত ও তাবলীগ এবং জেহাদ ও সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া জরুরী। তাহলে হজ্জ, নামায, রোযা, যাকাত ও অন্যান্য সকল এবাদত সুষ্ঠুভাবে আদায় হবে ও আল্লাহর কাছে কবুল হবে। হজ্জ ও অন্যান্য এবাদত কবুল হওয়ার এটাই হচ্ছে সরস রাস্তা।
হজ্জের হুকুম ও নিয়মাবলী
সেই ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরজ যার বাড়ী থেকে কাবা শরীফ পর্যন্ত আসা যাওয়ার ব্যয়ভার এবং ঐ সময়ের পরিবারের ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা রয়েছে। সেই ব্যক্তিকে অবশ্যই বালেগ, আকেল, মুসলমান হতে হবে। মহিলার জন্য মোহরেম পুরুষ সাথে আসা এবং তার ব্যয়ভার বহন করা শর্ত। এক কথায় আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল ব্যক্তির উপরই হজ্জ ফরজ। হজ্জের কারণে যদি অভাব দেখা দেয় কিংবা ঋণ করে চলতে হয়, সে ব্যক্তির জন্য হজ্জ ফরজ নয়। ভিক্ষা করে হজ্জ করা কিংবা হজ্জে এসে ভিক্ষা করা জায়েয নেই। তবে হজ্জের সফরে ব্যবসা করা জায়েয আছে।
জিলহজ্জের ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত প্রধানতঃ হজ্জের চূড়ান্ত ও প্রধান প্রধান হুকুমগুলো পালন করতে হয়।
হজ্জ তিন প্রকার। ১. এফরাদ ২. তামাতু এবং ৩. কেরান। এফরাদ হচ্ছে শুধু হজ্জের এহরাম বাঁধা এবং উমরাহর নিয়ত না করা। তামাত্তু হচ্ছে, হজ্জের মাসে উমরাহ করা। হজ্জের মাস হচ্ছে শাওয়াল, জুলকাদাহ ও জুলহিজ্জার প্রথম ১০দিন। অর্থাৎ হজ্জের আগে উমরাহর কাজ সেরে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জের পূর্বে পুনরায় হজ্জের এহরাম বাঁধা। কেরান হচ্ছে, হজ্জ এবং উমরাহর নিয়ত একই সাথে করা। তবে উমরাহর কাজ শেষ করা সত্ত্বেও এহরাম না খোলা এবং একই এহরামে হজ্জ করা। তামাতু এবং কেরান হজ্জে কুরবানী জরুরী। তবে এফরাদ হজ্জে কুরবানী নেই। হজ্জের কোন ওয়াজিব ভঙ্গ হলে কাফফারা দিতে হয়। তামাতু এবং কেরান হজ্জের কুরবানী দ্বারা ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাধারণ যে কুরবানী ওয়াজিব তা আদায় হয়ে যায়। পৃথকভাবে সেজন্য কুরবানী দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
মীকাতের বর্ণনা
মীকাতের বাইরে অবস্থানকারী হাজী এবং উমরাহ আদায়কারীকে মীকাতে প্রবেশের আগেই হজ্জ বা উমরাহর এহরাম বাঁধতে হবে। এহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করা জায়েয হবে না।
মীকাত ৫টি। মদীনাবাসী এবং সেই পথে আগমনকারীদের মীকাত হচ্ছে 'জুল হোলায়ফাহ'। এর বর্তমান নাম হচ্ছে 'আবইয়ারে আলী'। এটি মদিনা থেকে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মক্কা থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সিরিয়াবাসী এবং ঐ রাস্তা দিয়ে আগমনকারীদের জন্য মীকাত হচ্ছে জোহফা। এর বর্তমান নাম হচ্ছে 'রাবেগ'। মক্কা থেকে এর দূরত্ব হচ্ছে, ১৪৮ কিলোমিটার। মূলতঃ জোহফা রাবেগের পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম। নাজদবাসী এবং ঐ পথে আগমনকারীদের মীকাত হল কারনুল মানাযেল। এর বর্তমান নাম হচ্ছে 'আস সায়লুল কবীর'। এটি মক্কা থেকে ৯৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইয়েমেনবাসী এবং ঐ পথে আগমনকারীদের মীকাত হচ্ছে 'ইয়ালামলাম' পাহাড়। সামুদ্রিক পথে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোর হাজীদের এটাই হচ্ছে মীকাত। এর বর্তমান নাম হচ্ছে সা'দীয়াহ। এটি মক্কা থেকে ৫৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তবে স্থল ও বিমানপথে আগমনকারী বাংলাদেশী এবং এশিয়ান দেশগুলোর হাজীদের মীকাত হচ্ছে 'আস-সায়লুল কবীর'। কেননা, এই স্থান বরাবরই তাদের বিমান ও যানবাহন আগমন করে। 'জাতে এরক' হচ্ছে ইরাকবাসীদের মীকাত। এটি মক্কা থেকে উত্তর-পূর্বদিকে ৯৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এর বর্তমান নাম হচ্ছে, দারীবাহ।
মীকাতের ভেতর অবস্থানকারী লোকেরা নিজেদের অবস্থান থেকেই এহরাম বাঁধবে। তাদের মীকাতের বাইরে যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। হুদুদে হারামের ভেতর অবস্থানকারী লোকদের উমরাহর জন্য হুদুদের বাইরে যেতে হবে কিন্তু হজ্জের জন্য তার প্রয়োজন নেই। বরং সবাই হুদুদের ভেতর নিজ অবস্থান স্থল থেকেই হজ্জের জন্য এহরাম বাঁধবে। মীকাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন-
هُنَّ لَهُنَّ وَلِمَنْ أَتَى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِ أَهْلِهِنَّ مِمَّنْ أَرَادَ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ .
অর্থঃ ঐ মীকাতগুলো ঐ এলাকাবাসী এবং যারা ঐ পথ দিয়ে হজ্জ কিংবা উমরাহ করতে আসবে তাদের জন্য নির্ধারিত। (বোখারী-মুসলিম)
হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব
হজ্জের তিনটি ফরজ আছে। (১) এহরাম পরা। (২) অকুফে আরাফাহ এবং (৩) তওয়াফে এফাদাহ বা ফেরত তওয়াফ অর্থাৎ আরাফাহ, মোযদালেফা এবং মিনা থেকে বিভিন্ন হুকুমগুলো পালন করার পর মসজিদে হারামে ফিরে এসে কা'বা শরীফের তওয়াফ করা। এটাকে তওয়াফে যেয়ারতও বলে। এই তিনটির কোনটি বাদ গেলে হজ্জ হবে না এবং পরবর্তীতে পুনরায় হজ্জ করতে হবে।
হজ্জের ৬টি ওয়াজিব আছে। সেগুলো হচ্ছেঃ (১) অকুফে মোযদালেফা (২) জামরায় পাথর নিক্ষেপ করা। (৩) তামাতু এবং কেরান হজ্জকারীদের কুরবানী করা। (৪) মাথার চুল কাটা। চুল ছোট করা কিংবা মাথা মুণ্ডন করা। মাথা মুণ্ডন করা উত্তম। (৫) সাফা মারওয়ায় সাঈ করা। (৬) বিদায়ী তওয়াফ ওয়াজিব কিনা এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। হানাফী মাজহাবে তা সুন্নাত এবং হাম্বলী মাজহাবে ওয়াজিব।
জামরায় পাথর নিক্ষেপের নিয়ম হচ্ছে, অকুফে মোযদালেফার পর মিনায় এসে প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ই জিলহজ্জ সূর্য হেলার পূর্ব পর্যন্ত জামরাতুল আকাবায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। পরের ২ দিন অর্থাৎ ১১ এবং ১২ই জিলহজ্জ সূর্য হেলে যাওয়ার পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত ৩টি জামরাতেই ৭টি করে দৈনিক ২১টি কংকর মারতে হয়। ১ম, ২য় এবং ৩য় জামরায় ধারাবাহিকভাবে কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। ১২ই জিলহজ্জ পর্যন্ত মিনায় থেকে মক্কায় চলে আসা যায়। তবে মিনায় ১৩ তারিখ পর্যন্তই থাকার নিয়ম। যারা ১৩ই জিলহজ্জে মিনায় থাকবে তাদেরকে সেই দিন তিন জামরায় উল্লিখিত নিয়মে কংকর নিক্ষেপ করতে হবে।
হজ্জের সুন্নত
হজ্জের সুন্নতগুলো নিম্নরূপ (১) মীকাতের বাইরে থেকে আগত লোকদের তওয়াফে কুদুম করা। (২) হাজারে আসওয়াদ থেকে তওয়াফ শুরু করা। (৩) তওয়াফ কুদুম, উমরাহ এবং হজ্জের তওয়াফে রমল করা অর্থাৎ প্রথম তিন চক্করে জোরে হাঁটা। (৪) সাফা-মারওয়ার দুই সবুজ চিহ্নের (বাতির) মাঝে জোরে হাঁটা (৫) আরাফাত এবং মিনায় খোতবা দান (৬) ৮ই জিলহজ্জ জোহর থেকে ৯ই জিলহজ্জ ফজর পর্যন্ত ৫ ওয়াক্ত নামায মিনায় পড়া। (৭) অকুফে আরাফার জন্য গোসল করা (৮) সূর্যোদয়ের একটু আগে মোযদালেফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা করা। (৯) মিনায় রাত্রি যাপন করা। অবশ্য হাম্বলী মাজহাবে মিনায় রাত্রি যাপন ওয়াজিব।
হজ্জের নিষিদ্ধ কাজসমূহ
এহরাম বাঁধার পর নিম্নোক্ত কাজগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যায়। (১) সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা। (২) সেলাই করা জুতা ও কাপড় পরা। তবে স্ত্রী লোকদের জন্য সেলাই করা কাপড়-চোপড় পরা নিষিদ্ধ নয়। (৩) পুরুষের মাথা ঢাকা, তবে মহিলারা অ-মোহরেম পুরুষের সামনে মুখ ঢেকে রাখবে। (৪) শরীরের চুলকাটা (৫) নখকাটা (৬) যৌন আচরণ (৭) অশ্লীল কথাবার্তা বলা ও ঝগড়া বিবাদ করা (৮) শিকার করা (৯) পোকা মাকড়, কীট-পতঙ্গ, মশা মাছি ও উকুন মারা। (১০) ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেয়া।
বদলী হজ্জ
হজ্জ ফরজ হওয়ার পর হজ্জ না করে কেউ যদি মারা যায়, কিংবা স্বাস্থ্যগত কারণে যদি হজ্জ আদায় করা সম্ভব না হয় তাহলে অন্যের দ্বারা হজ্জ করানো যেতে পারে। বদলী হজ্জের জন্য যার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে, তাকে সকল খরচ বহন করতে হবে। বদলী হজ্জ আদায়কারী ব্যক্তি একজন সাধারণ হাজীর ন্যায় হজ্জের সকল হুকুম আহকাম পালন করবেন। ফরজ হজ্জ অনাদায়কারী ব্যক্তিকে দিয়ে বদলী হজ্জ করানো নিষিদ্ধ। সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল হজ্জ আদায় করা জায়েয কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। তা নাজায়েয হওয়াটাই বেশী যুক্তিসঙ্গত। এক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে, এবাদতে কোন প্রতিনিধিত্ব চলে না।
উমরাহ
উমরাহর সওয়াব অনেক বেশী। হানাফী মাযহাব ব্যতীত কোন কোন মাযহাবে জীবনে একবার উমরাহ করা ওয়াজিব। হানাফী মাযহাবে তা সুন্নত। উমরাহর জন্য প্রথমে এহরাম পরতে হয় এবং উমরাহর নিয়ত করতে হয়। তারপর তওয়াফ এবং সাঈ করতে হয়। এরপর মাথার চুল ছাঁটা কিংবা মুণ্ডন করতে হয়। এহরাম বাঁধার পূর্বে গোসল করে নেয়া উত্তম এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা ভাল। তারপর হুদুদে হারামের বাইরে থেকে কিংবা মীকাত থেকে এহরাম বাঁধতে হবে। এহরামের জন্য সেলাইবিহীন দু'টো কাপড় দরকার। একটি লুঙ্গি এবং অপরটি চাদর হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এহরামের পূর্বে দুই রাকআত নামায পড়া উত্তম। এহরামের পর নিম্নোক্ত তালবিয়াহ পড়তে হবে। তালবিয়া হচ্ছে- لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَأَشَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنَّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكُ لأَشَرِيكَ لَكَ .
অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার দরবারে হাজির, আমি তোমার দরবারে হাজির। তোমার কোন অংশীদার নেই। তোমার দরবাবে আমি উপস্থিত। সকল প্রশংসা ও নেয়ামতের মালিক তুমিই। শাসন ও রাজত্ব একমাত্র তোমারই। তোমার কোন অংশীদার নেই।
তারপর তওয়াফ এবং সাঈ করে মাথার চুল কাটতে হবে। তওয়াফের পর দু'রাকাত নামায মাকামে ইবরাহীমের পেছনে বা কাছে পড়তে হবে। মাথার চুল কাটার পর একজন ব্যক্তি উমরাহ থেকে হালাল হয়ে যায়।
হজ্জ এবং উমরাহকে সুষ্ঠুভাবে আদায় করার মাধ্যমেই মক্কার ফজীলত, তাৎপর্য এবং বৈশিষ্ট্য অনুধাবন সম্ভব হবে। মূলতঃ এই হজ্জ এবং উমরাহর জন্যই এই কা'বা এবং মসজিদে হারামের অস্তিত্ব। তাই উমরাহ এবং হজ্জের মত এত মহান এবাদতগুলোকে সুন্দর করে আদায় করে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য সর্বাধিক এখলাস এবং আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করা দরকার। এবাদত যত বড় এবং মহানই হউক না কেন, এখলাস, নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতা ব্যতীত তার কোন মূল্য নেই। তাই হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ অর্থাৎ সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।'
একটি স্বপ্ন:
আলী বিন মোয়াফফাক বলেন: আমি এক বছর হজ্জে গিয়ে ই জিলহজ্জ দিবাগত রাত্রে মিনার মসজিদে খায়ফে অবস্থান করলাম। আমি স্বপ্নে দেখলাম দু'জন ফেরেশতা আকাশ থেকে সবুজ পোশাক পরিহিত অবস্থায় অবতরণ করলেন। তাদের একজন আরেকজনকে আবদুল্লাহ বলে ডাক দিলেন। অপরজন লাব্বাইক 'আমি হাজির' বলে জওয়াব দিলেন। প্রথম ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন; তুমি জান, এ বছর কত লোক আমাদের প্রতিপালকের হজ্ব করেছে? দ্বিতীয়জন বলেন; আমি জানিনা। প্রথমজন বলেন; এবার ৬লাখ লোক হজ্জ্ব করেছে। এখন তুমি বলতে পার, তাদের মধ্যে কতজনের হজ্জ্ব কবুল হয়েছে? ২য়জন বলেন; আমার জানা নেই। প্রথমজন বলেন; তাদের মধ্যে মাত্র ৬ জনের হজ্জ্ব কবুল হয়েছে। একথা বলার পর উভয় ফেরেশতা উপরে উঠে আমার দৃষ্টির আগোচরে চলে গেলেন। আমি ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় জাগ্রত হলাম। এক কঠিন দুঃখ আমাকে চেপে বসল। আমি নিজের কথা চিন্তা করে মনে মনে বললাম; যখন ৬ জনেরই হজ্ব কবুল হয়েছে, তখন আমি তাদের মধ্যে কোথায়?
যখন আমি আরাফাত থেকে ফিরে এসে মোযদালেফায় মাশআ'রে হারামের কাছে রাত যাপন করলাম, তখন এ চিন্তায় বিভোর ছিলাম যে, এত বিপুল সংখ্যক লোকের মধ্যে মাত্র এই কয়জনেরই হজ্জ্ব কবুল হল; চিন্তার মধ্যেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি স্বপ্নে দেখলাম, সে দু'জন ফেরেশতা পূর্বের আকৃতিতে পুনরায় অবতরণ করলেন এবং একে অপরের সাথে পূর্বের মত কথাবার্তা বললেন। ১ম ফেরেশতা বলেন; তুমি জান আজকের রাত আমার রব কি আদেশ দিয়েছেন? ২য় ফেরেশতা বলেন, না, আমি জানিনা। প্রথম ফেরেশতা বলেন; আল্লাহ ছয়জনের প্রত্যেককে ১লাখ করে দিয়েছেন অর্থাৎ ৬ জনের দোয়ায় কিংবা সুপারিশে ৬ লাখ লোকের হজ্জ্ব কবুল করবেন। ইবনে মোয়াফফাক বলেন, এরপর যখন আমার চোখ খুলল তখন, যেন আমার আনন্দের সীমা রইলনা।১
হজ্জ্বে আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ। তা যেন কবুল হয় সে জন্য প্রত্যেককে আন্তরিক হতে হবে।
হজ্জের কিছু জরুরী মাসআলাহ
১ম প্রশ্ন: তওয়াফ ও সাঈ'তে কি দোআ' পড়া দরকার? উত্তর: সাঈ'র শুরুতে রাসূলুল্লাহ (সা) পড়েছেন:
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ . রাসূলুল্লাহর (সা) অনুকরণে আমাদেরও তাই পড়া সুন্নাত। এছাড়া তওয়াফ এবং সাঈ'তে বেশী বেশী করে আল্লাহর জিকর বা স্মরণ করা দরকার। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
إِنَّمَا جُعِلَ الطَّوافُ بِالْبَيْتِ وَالسَّعْيُ بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ وَرَمْى الْجَمَارَ لِإِقَامَةِ ذِكْرِ اللَّهِ . "তাওয়াফ, সাফা ও মারওয়ায় সাঈ'এবং পাথর নিক্ষেপের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে আল্লাহর জিকর প্রতিষ্ঠার জন্য।” (আহমদ, আবু দাউদ)
এই হাদীসের মর্মানুযায়ী, তাওয়াফ, সাঈ' এবং মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় বেশী বেশী করে দোআ' তাসবীহ (সোবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার), গুনাহ মাফ চাওয়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, তাওবাহ করা দরকার। কেননা, এগুলো সবই জিকরের অন্তর্ভুক্ত।
২য় প্রশ্ন: নফল হজ্জ, ওমরাহ, তওয়াফ ও নামাযসহ দান-সদকার সওয়াব কি কোন মুর্দার রুহের জন্য উপহার দেয়া যায়?
উত্তর: এই ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মতে তওয়াফসহ যে কোন নফল এবাদতের সওয়াব অন্য যে কোন জীবিত কিংবা মৃত মুসলমানের জন্য উপহার দেয়া জায়েয। এতে সেই মুসলমানের কল্যাণ হবে। শারীরিক এবাদত যেমন, নামায, তওয়াফ; আর্থিক এবাদত যেমন, দান-সদকাহ অথবা শারীরিক ও আর্থিক এবাদত যেমন কোরবানী ইত্যাদি অন্য যে কোন নফল এবাদতের সওয়াব কোন মুসলমানের জন্য উপহার হিসেবে পেশ করা যেতে পারে।
অন্য এক দল আলেমের মতে, দান-সদকা ও কোরবানী ছাড়া নফল নামায, রোজা, হজ্জ, তাওয়াফ, ওমরাহ ইত্যাদির সওয়াব অন্যের জন্য উপহার দেয়ার সমর্থনে হাদীসে উল্লেখ নেই। শুধু দোআ করার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ঐ সকল এবাদত নিজের জন্য করে অপরের জন্য শুধু দোআ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তাঁরা নিম্নোক্ত হাদীসটিকে দলীল হিসেবে পেশ করেন:
إِذَا مَاتَ ابْنُ أَدَمَ انْقَطَعَ عَمَلُهُ الأَمِنْ ثَلاثَ : صَدْقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُولَهُ -
'মানুষ যখন মরে যায় তখন তার সকল আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাত্র তিনটি জিনিসের সওয়াব অব্যাহত থাকে, ১. সদকাহ জারিয়াহ ২. উপকারী জ্ঞান এবং ৩. নেক সন্তান, যে মাতা-পিতার জন্য দোআ করে।' (মুসলিম)
এই হাদীসে সদকাহ জরিয়াহ এবং উপকারী জ্ঞানের পর শুধু নেক সন্তানের দোআর সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি অন্য কিছুর সুযোগ থাকত তাহলে, তা এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা হত।
৩য় প্রশ্নঃ বিদায়ী তওয়াফের হুকুম কি? মীকাতের ভেতরে লোকদের জন্য বিদায়ী তওয়াফ লাগবে কি?
উত্তর: বিদায়ী তওয়াফ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
مَنْ حَجَّ هَذَا الْبَيْتَ فَلْيَكُنْ آخِرُ عَهْدِهِ بِالْبَيْتِ بِالطَّوافِ .
'যে আল্লাহর ঘর কা'বায় হজ্জ আদায় করে তার সর্বশেষ কাজ হচ্ছে বিদায়ী তওয়াফ করা।'
এই কারণে একদল আলেম বিদায়ী তওয়াফকে ওয়াজিব বলেন। আবার অন্য একদল আলেম বিদায়ী তওয়াফকে সুন্নাত বলেন। তাদের দৃষ্টিতে, হাদীসের এই আদেশ ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাত।
মীকাতের ভেতর বসবাসকারীদের জন্য বিদায়ী তওয়াফ লাগবে কিনা এ নিয়েও মতভেদ আছে। হানাফী মাজহাবের মতে, মীকাতের ভেতর যেমন, জিদ্দা, জমুম, বাহরা, হাদ্দা ইত্যাদি এলাকার লোকদের জন্য বিদায়ী তওয়াফের জরুরত নেই। তারা মক্কাবাসীদের মত। মক্কাবাসীর জন্য বিদায়ী তওয়াফ নেই।
মালেকী মাজহাবের মতে, মীকাতের ভেতরের লোকদের জন্য বিদায়ী তওয়াফ জরুরী নয়। তাদের মতে, বিদায়ী তওয়াফ সুন্নাত, ওয়াজিব নয় তাই বিদায়ী তওয়াফ না করলে দম দিতে হবে না।
অপরদিকে, শাফেঈ ও হাম্বলী মাজহাবে হারাম সীমানার বাইরের লোক এবং মীকাতের ভেতরের অধিবাসীদের জন্য বিদায়ী তওয়াফ ওয়াজিব।
৪র্থ প্রশ্ন: মক্কা এবং মীকাতের ভেতরে, লোকেরা তামাতু হজ্জ করতে পারবে কিনা? হজ্জের মাসে ওমরাহ করলে হজ্জ করা বাধ্যতামূলক হবে কি?
উত্তর: হজ্জের মাসে অর্থাৎ ১লা শাওয়াল থেকে ৯ই জিলহজ্জ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ওমরাহ করে হালাল হয়ে গেলে এবং পরে হজ্জ করলে সেই হজ্জ হচ্ছে তামাতু হজ্জ। এটা নিয়ে মতভেদ আছে। একদল আলেম বলেন তারা তামাতু হজ্জ করতে পারবেনা। তাদের দলীল হচ্ছে কোরআনের এই আয়াত:
ذالِكَ لِمَنْ لَمْ يَكُنْ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ .
'যারা মসজিদে হারাম তথা হারাম সীমানার অধিবাসী নয়'। হারাম সীমানার অধিবাসী হলে তামাতু হজ্জ করতে পারবেনা, বাইরের অধিবাসী হলে পারবে।
কিন্তু হাম্বলী মাজহাবসহ অন্যান্য মাজহাবের মতে মক্কা এবং মীকাতের ভেতরের বাসিন্দাদের জন্য তামাতু হজ্জ জায়েয। কেননা, বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অধিকাংশ লোক ওমরাহ করেছেন এবং তামাতু হজ্জ আদায় করেছেন।
হজ্জের মাসে ওমরাহ করলে হজ্জ বাধ্যতামূলক হবে না। ইচ্ছা করলে হজ্জ করতে পারবে, আর ইচ্ছা না করলে হজ্জ করা জরুরী হবে না, ওমরাহ পৃথক এবাদত হিসেবে গণ্য হবে। তবে হজ্জ করলে তা তামাতু হবে।
৫ম প্রশ্নঃ মিনায় ২য় দিন থেকে জামরায় কংকর মারার সময়সীমা হচ্ছে, দুপুরে সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কিন্তু প্রচণ্ড ভীড়ের কারণে কিংবা নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অন্য লোকদের জন্য কি রাত্রে কংকর নিক্ষেপ করা জায়েয আছে?
উত্তর: জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। জামরার গায়েই কংকর নিক্ষেপ জরুরী নয়। বরং জামরার গোড়ায় কূপের মত যে হাউজ তৈরি করা আছে সেখানে কংকর পড়লেও চলবে। কংকর নিক্ষেপ না করলে দম দেয়া ওয়াজিব। ১ম দিন সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করা জায়েয। সাধারণতঃ ২য় দিন থেকে দুপুরে সূর্য হেলে যাওয়ার পর কংকর নিক্ষেপ করা হয়। এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলেন-
إِنِّي رَمَيْتُ بَعْدَ مَا أَمْسَيْتُ فَقَالَ لَهُ إِرْمِ وَلَا حَرَجَ .
'আমি সন্ধ্যার পর কংকর নিক্ষেপ করেছি। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলেন, কংকর নিক্ষেপ কর, তাতে কোন অসুবিধে নেই।’ এই হাদীসে কংকর নিক্ষেপের নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, করো তাতে কোন অসুবিধে নেই। সন্ধায় কংকর মারায় অসুবিধে না হলে অন্য সময়ে নিক্ষেপ করার মধ্যেও কোন অসুবিধে না হওয়ারই কথা। এমনকি আরবীতে সন্ধ্যা বলতে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত বুঝায়। তাই দুপুর রাত পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করা যাবে। হযরত আয়েশার হাদীসে-
كُنَّا نَتَحَيَّنُ وَقْتَ الظَّهِرْ لِرَمْيِ الْجَمْرَاتِ .
‘আমরা দুপুরেই কংকর নিক্ষেপের সময় ঠিক করেছি।’ কংকর নিক্ষেপের শুরুর উত্তম সময় দুপুর থেকে বলা হয়েছে। শেষ সময়ের কথা বলা হয়নি। এই সময় উত্তম, কিন্তু ওয়াজিব নয়। তাই আতা বিন আবী রেবাহ ও তাউস মধ্যরাত পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করাকে জায়েয বলেছেন। ক্রমবর্ধমান হাজীর সংখ্যার কারণে মধ্যরাত পর্যন্ত কংকর মারার প্রয়োজনও দেখা দিয়েছে। হযরত আয়েশার হাদীস অনুযায়ী দুপুরকে উত্তম সময় বিবেচনা করলে ভীড়সহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আইয়ামে তাশরীকে যে কোন সময় কংকর নিক্ষেপ করা জায়েয।২
এমনকি ওজরের কারণে ১ম দিনের কংকর ২য় দিন, ২য় দিনের কংকর ৩য় দিন সকল দিনের কংকরগুলি আইয়ামে তাশারিকের সর্বশেষ দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করা যায়। তবে শর্ত হলো, শেষ দিন ধারাবাহিকভাবে সেগুলো নিক্ষেপ করতে হবে।
৬ষ্ঠ প্রশ্ন : ১০ই জিলহজ্জ ১ জন হাজী যদি ওয়াজিব কাজগুলো ক্রমধারা রক্ষা করে আদায় না করে তাহলে কি দম দিতে হবে?
উত্তর : রাসূলুল্লাহ (সা) ১০ই জিলহজ্জ ক্রমানুসারে ৫টি কাজ করেছিলেন। সেগুলো হচ্ছে ১. জামরা আকবায় কংকর নিক্ষেপ করা ২. কোরবানী করা ৩. মাথা মুণ্ডন কিংবা চুল ছোট করা ৪. কা'বা শরীফের তাওয়াফ করা এবং ৫. সাফা-মারওয়ায় সাঈ' করা।
হানাফী মাজহাবে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব, আর হাম্বলী মাজহাবসহ অন্যান্য মাজহাবে সুন্নাত। তাদের দলীল হচ্ছে, সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে যা কিছু সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি জবাব দিয়েছিলেন- افْعَلْ وَلَا حَرَجَ ‘কর এবং কোন অসুবিধে নেই’। এর দ্বারা বুঝা যায়, ধারাবাহিকতা রক্ষা করা উত্তম এবং সুন্নাত। ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব নয়।
৭ম প্রশ্ন: তওয়াফে যেয়ারতের আগে কি হজ্জের সাঈ' করা যায়?
উত্তর: হজ্জে এফরাদ ও কেরানে তওয়াফে যেয়ারতের আগে হজ্জের সাঈ' করা জায়েয আছে। ভীড়ের আশংকা কিংবা অন্য কোন কারণেই সাধারণতঃ তা অগ্রিম করার চিন্তা করা হয়। নচেত, তওয়াফে যেয়ারতের পরেই তা করা উত্তম। বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সাথে কেরান হজ্জ আদায়কারীরা তওয়াফে কুদুমের পর অগ্রিম ঐ সাঈ' করেছিলেন।
অপরদিকে, তামাতু হজ্জকারীর জন্য রয়েছে ২টি সাঈ'। একটি ওমরাহ এবং অপরটি হজ্জের জন্য। তওয়াফে যেয়ারতের পরই হজ্জের সাঈ' করা উত্তম। কেননা, সাঈ' তওয়াফের অধীন। কিন্তু কেউ যদি উপরোল্লিখিত কারণে হজ্জের সাঈ' অগ্রিম করে তাহলে তা জায়েয। এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন:
سَعَيْتُ قَبْلَ أَنْ أَطُوفَ . قَالَ لَا حَرَجَ .
'আমি তওয়াফের (যেয়ারত) আগে সাঈ' করেছি।' রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, 'তাতে কোন অসুবিধে নেই।'
৮ম প্রশ্ন: মীকাতের বাইরের লোকেরা যেমন- বাংলাদেশের লোকেরা কি জিদ্দায় পৌঁছার পর জিদ্দা থেকে ওমরাহ কিংবা হজ্জের এহরাম পরতে পারবে?
উত্তর: জিদ্দা মীকাতের ভেতর। তাই মীকাতের বাইরের কোন লোক জিদ্দায় পৌঁছে এহরাম করলে জায়েয হবে না। শুধু জিদ্দাবাসীরাই জিদ্দা থেকে এহরাম করবেন। আর কেউ যদি হজ্জ ও ওমরাহর নিয়ত ছাড়া, চাকুরী, ব্যবসা কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে জিদ্দা আসে, তাহলে তারা ওমরাহ কিংবা হজ্জ করতে চাইলে জিদ্দা থেকে এহরাম করতে পারবে। হজ্জ এবং ওমরার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে আগত কোন লোক জিদ্দা থেকে এহরাম করলে তা জায়েয হবে না। তাকে পুনরায় মূল মীকাতে ফিরে যেতে হবে এবং সেখান থেকে এহরাম পরে আসতে হবে। সেটা না করতে পারলে মক্কায় একটি দম দিতে হবে এবং গরীব লোকদের মধ্যে ঐ দম বা কোরবানীর গোস্ত বিলি করতে হবে।
অনেকে জিদ্দায় নেমে মদীনায় যান এবং সেখানকার মীকাত থেকে এহরাম বেঁধে মক্কায় আসেন। সেটাও ঠিক নয়। কেননা তিনি তার মূল মীকাত এহরাম ছাড়া আগেই লংঘন করে জিদ্দায় প্রবেশ করেছেন। তাই তাকে তার মূল মীকাতেই ফিরে যেতে হবে।
৯ম প্রশ্ন: মিনায় কি পুরো রাত্র যাপন করা জরুরী?
উত্তর: মিনায় পুরো রাত যাপন করা উত্তম। তবে রাত্রের অধিকাংশ সময় মিনায় কাটালে এবং পরে মিনা ত্যাগ করে মক্কা চলে আসলে তাতে মিনায় রাত্রি যাপনের হুকুম আদায় হয়ে যায়। অর্থাৎ অর্ধেক রাত্রির চাইতে কিছু বেশী কাটালেই রাত্রি যাপন সম্পন্ন হয়ে যাবে।
১০ম প্রশ্ন: স্ত্রীলোকের হায়েজ অবস্থায় কি তওয়াফ ও সাঈ' করা যায়?
উত্তর: হায়েজ অবস্থায় তওয়াফ করা জায়েয নেই। হায়েজ থেকে পাক হলে তওয়াফ আদায় করতে হবে। সেটা ওমরার তওয়াফ কিংবা হজ্জের তওয়াফ যাই হোকনা কেন। পক্ষান্তরে, মাসিক অবস্থায় সাফা-মারওয়ায় সাঈ' করা জায়েয আছে। মসজিদে হারামে প্রবেশ ও অবস্থান করা জায়েয নেই। তবে সাফা-মারওয়ায় প্রবেশ ও অবস্থান উভয়টাই জায়েয। কেননা, সাফা-মারওয়া মসজিদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
১১শ প্রশ্ন: কবুল হজ্জের লক্ষণ কি?
উত্তর: কবুল হজ্জের শর্ত হচ্ছে, হজ্জের জন্য ব্যয়িত অর্থ হালাল হতে হবে, হজ্জের ফরজ, ওযাজিবগুলো ঠিকমত পালন করতে হবে, হজ্জে যৌন তৎপরতা বন্ধ, গুনাহর কাজ না করা এবং কারুর সাথে ঝগড়া-বিবাদ করা যাবেনা। পুরো সময় আল্লাহর স্মরণ ও জিকরের মধ্যে কাটাতে হবে। এই সকল শর্ত পূরণের পর হজ্জ শেষে যদি হাজীর মধ্যে ফরজ-ওয়াজিব পালনের আগ্রহ জাগে, সাবেক ত্রুটি-বিচ্যুতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, হারাম ও গুনাহর কাজ থেকে বিরত থাকে, তাকওয়া-পরহেজগারী বাড়ে, নফল ও সুন্নাতের প্রতি আগ্রহী হয় তাহলে, বুঝা যাবে তার খালেস তাওবাহ কবুল হয়েছে এবং হজ্জ আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়েছে। কবুল হজ্জের বিনিময় হচ্ছে বেহেশত।
টিকাঃ
১. এহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ইমাম গাজ্জালী।
২. সাপ্তাহিক আল মুসলিমুন ৫/৬ ১৯৯২, জেদ্দা, সৌদী আরব।
📄 হজ্জের যে সকল ভুল থেকে সতর্ক থাকা দরকার
হজ্জের পূর্বের ভুল
১. হারাম অর্থ সম্পদ দিয়ে হজ্জ করা : আল্লাহ নিজে পাক-পবিত্র। তিনি পবিত্রতা ছাড়া এবাদত কবুল করেন না। তাই বান্দার সর্বাধিক পবিত্র সম্পদ ব্যয় করে হজ্জে আসা দরকার।
২. বুড়া হওয়া পর্যন্ত হজ্জ না করা : শারীরিক ও আর্থিক সচ্ছলতা আসা মাত্রই হজ্জ করা প্রয়োজন। বৃদ্ধ হয়ে গেলে প্রচণ্ড ভীড় কিংবা গরম ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় হজ্জের বহু হুকুম পালন করা সম্ভব হয় না। হজ্জের জন্য শক্তি প্রয়োজন। তাই শক্তি থাকা অবস্থায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হজ্জ করা উচিত।
৩. লোক দেখানোর মনোভাব : কোন কোন ধনী ব্যক্তি মনে করেন যে, হজ্জ না করলে মানুষ খারাপ বলবে। তাই তিনি হজ্জ করেন। অথচ হজ্জ করতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
৪. মোহরম ব্যক্তি ছাড়া মহিলাদের হজ্জ করা : যাদের সাথে বিয়ে হারাম তারা মোহরম আত্মীয়। এরপর যে কোন একজনের সাথে মহিলাদের হজ্জে আসতে হবে। অন্য কারো সাথে নয়।
এহরাম সম্পর্কিত ভুল
১. হাজীরা মীকাত থেকে এহরাম বেঁধে হজ্জ ও ওমরাহর নিয়ত করবেন। এটাই উত্তম পদ্ধতি। মীকাতের আগে, এমনকি দেশ থেকে বের হওয়ার সময়ও এহরাম পরা যায় ও নিয়ত করা যায়। তবে জেদ্দা এসে এহরাম পরে নিয়ত করা চলবে না। কেউ এরূপ করলে তার জন্য প্রথম হুকুম হল, আবার মীকাতে ফিরে যাওয়া এবং এহরাম পরে নিয়ত করা। ২য় হুকুম হল, মীকাতে ফিরে না গেলে একটা দম দেয়া। কেননা জিদ্দা মীকাতের ভিতরে। এহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করা যাবে না।
২. এহরামের কাপড় ময়লা বা নাপাক হলে তা বদল করা যায় ও ধোয়া যায়। তখন আরেক সেট এহরামের কাপড় পরতে হবে। সেলাইযুক্ত কাপড় পরা যাবে না।
৩. এহরামের সময় প্রথমেই ডান বগলের নীচ দিয়ে এহরামের কাপড় রেখে ডান কাঁধ খোলা রাখা এবং বাম কাঁধের উপর এহরামের কাপড়ের দু'মাথা রাখা ভুল। এটা শুধু তওয়াফে কুদুমে করতে হয়, তওয়াফের আগে নয়।
৪. এহরাম বাঁধার জন্য বিশেষ কোন নামায পড়ার প্রয়োজন নেই। অনেকেই দু'রাকাত নামায পড়ে এহরামের কাপড় পরে ও হজ্জ-ওমরার নিয়ত করে। এক্ষেত্রে আবুল আব্বাস শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া অগ্রাধিকারযোগ্য কথা বলেছেন। তিনি বলেন: এহরামের জন্য বিশেষ কোন নামায পড়ার বিধান নেই। নবী (সা) থেকে অনুরূপ কিছু বর্ণিত বা প্রমাণিত নেই। গোসল করে এহরামের কাপড় পরাই যথেষ্ট। তবে, তখন যদি কোন ফরজ নামাযের সময় উপস্থিত হয়, তাহলে, ফরয নামায শেষ করে এহরামের নিয়ত করা উত্তম।
৫. ৮ তারিখ তারওইয়া দিবসে অনেকে ঘর থেকে এহরাম না পরে মসজিদে হারামে এসে এহরাম পরে মক্কা থেকে মিনা রওনা করে। এটা ভুল; ঘর থেকেই এহরাম পরে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা করতে হবে। এটাই সুন্নত তরীকা। বিদায় হজ্জের সময় নবী করীম (সা)-এর নির্দেশে যে সকল সাহাবী তামাত্তু হজ্জ করেছিলেন, অর্থাৎ ওমরাহ করে এহরাম খুলে ফেলেছিলেন, তাঁরা নিজের স্থান থেকেই ৮ তারিখে পুনরায় হজ্জের এহরাম পরেছেন। তাঁরা এহরাম পরার জন্য মসজিদে হারামে যাননি।
যদি কেউ মনে করে যে, ওমরাহর এহরাম ধোয়া ছাড়া তা দিয়ে হজ্জের এহরাম পরা যাবে না- তাহলে সেটা হবে ভুল। এহরামের কাপড় নতুন হতে হবে কিংবা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে- এটা জরুরী নয়। তবে পরিষ্কার হলে উত্তম হবে।
৬. এহরামের কাপড়ে সুগন্ধি লাগানো: এটা নিষিদ্ধ। এরূপ করলে তা ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
৭. মহিলাদের জন্য এহরামের কাপড় নির্দিষ্ট করা: এটা ঠিক নয়। তারা যেকোন কাপড় পরতে পারে।
৮. এহরাম অবস্থায় বেহুদা ও অশ্লীল কথা-বার্তা বলা: এ সময় কেবল তালবিয়া, যিকির, তাসবীহ-তাহলীল করতে হবে।
তালবিয়া সংক্রান্ত ভুল
১. এহরাম বাঁধার সময় শব্দ করে তালবিয়া পাঠ না করা। নবী করীম (সা) বলেন: "আমার কাছে জিবরীল এসেছিল। তিনি আমাকে বললেন, আমি যেন আমার সাহাবীদেরকে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠের নির্দেশ দেই। ১ তালবিয়া হচ্ছে: 'লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নে'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।'
হাজীরা দলে দলে অতিক্রম করে, অথচ তাদের মুখে জোরে তালবিয়া শব্দ উচ্চারিত হয় না। ফলে হজ্জের মধ্যে আল্লাহর যিক্র-আযকারের দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয় না। পুরুষদের ব্যক্তিগতভাবে সশব্দে তালবিয়া পাঠ সুন্নাত। মহিলাদের শব্দ করে তালবিয়া পাঠ করার দরকার নেই।
২. সামষ্টিক সুরে অনেকের একসাথে মিলে তালবিয়া পাঠ ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম থেকে অনুরূপ আমলের বর্ণনা নেই। বরং হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত : 'আমরা বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে ছিলাম। আমাদের মধ্যে কেউ তাকবীর, কেউ তাহলীল অর্থাৎ লাইলাহা ইল্লাল্লাহু এবং কেউ তালবিয়া পাঠ করতেন। ১ এটাই বিশুদ্ধ পদ্ধতি। ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেই শব্দ করে উপরোক্ত পদ্ধতিতে আল্লাহর যিক্র-আযকার করবে।
মসজিদে হারামে প্রবেশের সময় ভুল
১. মসজিদে হারামে প্রবেশের জন্য বিশেষ কোন দরজার আলাদা কোন গুরুত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই। সব দরজাই সমান। যারা মনে করেন, ওমরাহর জন্য বাবে ওমরাহ কিংবা বাবুস সালাম দিয়ে প্রবেশ করা উত্তম- এটা তাদের ভুল ধারণা। মসজিদে হারামে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করে মসজিদে প্রবেশের দু'আ পড়তে হবে। اَلصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُولِ اللهِ، اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ -
২. কা'বা শরীফ দেখলে পড়ার জন্য বিশেষ কোন দু'আ নেই। নবী (সা) থেকে এরূপ বিশেষ কোন দু'আর বর্ণনা নেই।
৩. একজন ফেকাহবিদের কথার কারণে কেউ কেউ বলেন যে, মসজিদে হারামে ঢুকলে প্রথমে তওয়াফ করতে হবে, এটা সুন্নত। এ কথার মধ্যে মতভেদ আছে। এক মত অনুযায়ী, মসজিদে হারামে প্রবেশ করলে অন্যান্য মসজিদের মতই ২ রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسُ حَتَّى يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ .
'তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে সে যেন দু'রাকাত নামায পড়ার আগে না বসে।' (বোখারী)
তাহিয়্যাতুল মসজিদ মসজিদে হারামসহ সকল মসজিদের জন্য সমান।
উল্লিখিত ফেকাহবিদ যা বলেছেন, তাঁর কথার অর্থ হল : কেউ যদি মসজিদে হারামে ওমরাহ, হজ্জ কিংবা নফল তওয়াফের জন্য প্রবেশ করে তওয়াফ করে, তাহলে তার দু'রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায না পড়লেও চলবে। কিন্তু কেউ যদি তওয়াফ ছাড়া নামাযের জামাতের জন্য অপেক্ষা, ওলামায়ে কেরামের বক্তৃতা শোনা কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে প্রবেশ করে, তাহলে তাকে দু'রাকাত নামায পড়তে হবে। অন্য মত অনুযায়ী, আগে তওয়াফই করতে হবে। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) মক্কায় পৌঁছে প্রথমে ওজু করেন, তারপর তওয়াফ করেন। (বোখারী)
তওয়াফের ভুল
১. তওয়াফ সহ যে কোন এবাদতের জন্য নিয়ত করতে হয়। নিয়তের স্থান হল অন্তর, মুখ নয়। তাই মুখে নিয়তের উচ্চারণ অর্থহীন কাজ। মনে মনে এরাদা করলেই নিয়তের কাজ শেষ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম কেউ মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেননি এবং হাদীসে কোথাও মুখে নিয়ত উচ্চারণের কথা উল্লেখ হয়নি। নিয়ত বা মনের সম্পর্ক সরাসরি আল্লাহর সাথে। তাই মুখে এর উচ্চারণের কোন প্রয়োজন নেই। তওয়াফের সময় মুখে একথা বলার দরকার নেই যে,
نَوَيْتُ أَنْ أَطُوفَ سَبْعَةَ أَشْوَاطِ الْعُمْرَةِ أَوْ لِلْحَجِّ .
'আমি ওমরাহ কিংবা হজ্জের জন্য সাত চক্কর তওয়াফের নিয়ত করলাম।'
২. হাজারে আসওয়াদে চুম দেয়া কিংবা স্পর্শ করা এবং রোকনে ইয়ামানী স্পর্শ করার সময় কঠোর ভীড় করা ও ঠেলাঠেলি কিংবা ধাক্কাধাক্কি করা ঠিক নয়। স্বাভাবিকভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্পর্শ বা চুমু দিতে পারলে দেবে, নচেত নয়। কোন সময় কোন মহিলার সাথেও ভীড় হতে পারে। মহিলার সাথে শরীর লাগার পর মনে কামভাব সৃষ্টি হলে পবিত্র বাইতুল্লাহয় তার কতবড় গুনাহ তা কি চিন্তা করার বিষয় নয়? ভীড় করে হাজারে আসওয়াদ কিংবা রোকেন ইয়ামানী স্পর্শ করা নাযায়েয। ঠেলা-ধাক্কার পর অন্য কারো বকাবকি শুনতে হলে তখন রাগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু তওয়াফকারীর উচিত প্রশান্ত মনে এবাদত করা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "বায়তুল্লাহর তওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ এবং জামরায় কংকর নিক্ষেপকে আল্লাহর স্মরণ তথা যিক্রের জন্য বিধান করা হয়েছে।”১ ঠেলা-ধাক্কা-কামভাব কিংবা রাগ সৃষ্টির মাধ্যমে সে উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
৩. রোকনে ইয়ামানী হাতে স্পর্শ করার নিয়ম আছে। কিন্তু হাজরে আসওয়াদের মত এর প্রতি ইশারা করার নিয়ম নেই। রোকনে ইয়ামানীতে হাতে ইশারা করার ব্যাপারে বর্ণিত ফাকেহীর হাদীসটির সনদ দুর্বল। হাতে স্পর্শ করার সুযোগ না পেলে এমনিতেই চলে যেতে হবে। ইশারা করার দরকার নেই।
৪. কেউ কেউ মনে করেন, হাজারে আসওয়াদকে চুমু না দিলে কিংবা হাতে স্পর্শ না করলে তওয়াফ শুদ্ধ হবে না। এটা ভুল ধারণা। হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়া কিংবা হাতে স্পর্শ করা সুন্নত। ওয়াজিব নয়। এ দুটোর কোনটা করতে না পারলে হাতে ইশারা করলেই চলবে। ভীড়ের মধ্যে ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে চুমুর চাইতে হাতে ইশারা করা উত্তম। ভীড়ের সময় মহানবী (সা)ও এভাবেই কাজ করেছেন। ভীড় করে অন্য ভাইকে কষ্ট দেয়া গুনাহ। মহানবীর আদর্শই উত্তম আদর্শ।
৫. রোকনে ইয়ামানীকে চুমু দেয়া ভুল। নবী (সা) রোকনে ইয়ামানীকে চুমু দেননি। তিনি তাকে হাতে স্পর্শ করেছেন মাত্র। রোকনে ইয়ামানীতে চুমুদানের বিষয়ে ঐ অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীসগুলো দুর্বল।
ডান হাতে স্পর্শ করতে হবে, বাম হাতে নয়। অনেকে বাম হাতে স্পর্শ করে। বাম হাতকে এস্তেঞ্জা ও নাকের ময়লা দূর করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ডান হাতকে সম্মান ও মর্যাদার কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই ডান হাত থাকতে বাম হাত দিয়ে রোকনে ইয়ামানী কিংবা হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করা ঠিক নয়।
৬. অনেকে হাজারে আসওয়াদে চুমু দেয়াকে কিংবা একে এবং রোকনে ইয়ামানী স্পর্শ করাকে বরকতের কাজ মনে করেন, এবাদত মনে করেন না। অথচ, এটা মূল উদ্দেশ্যের বিরোধী। হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়া কিংবা একে ও রোকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ ঘটানো। মহানবী (সা) হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময় তাকবীর বলে সে উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাই আমীরুল মোমেনীন হযরত ওমর ফারুক (রা) হাজারে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বলেন: আল্লাহর কসম, আমি জানি তুমি একটা পাথর, যার উপকার-অপকার করার শক্তি নেই। আমি যদি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তোমাকে চুমু দিতে না দেখতাম তাহলে, আমি তোমাকে কখনও চুমু দিতাম না। ১
এ বক্তব্য দ্বারা এ ব্যাপারে ইসলামের আকীদা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এগুলোকে স্পর্শ করার মাধ্যমে আল্লাহর যিক্র ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ এবং মহানবী (সা) এর অনুসরণই উদ্দেশ্য।
একই ধরনের ভুল মদীনায় নবী করীম (সা)-এর কবর মোবারকের জালি ও বেষ্টনী ধরেও করতে দেখা যায়। লোকেরা এগুলোকে বরকতের কাজ মনে করে। অথচ, এগুলো নিষিদ্ধ ও গর্হিত কাজ। এসব কাজ থেকে দূরে থাকা দরকার।
৭. তওয়াফের প্রথম তিন চক্করে মক্কায় প্রথম আগমনকারী ব্যক্তি ওমরাহ কিংবা তওয়াফে কুদুমে রমল করবেন অর্থাৎ দ্রুত হাঁটবেন। অন্য চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন। কিন্তু অনেকে ৭ চক্করেই রমল করেন। এটা ভুল। নারীদের জন্য রমল নেই।
৮. প্রত্যেক চক্করে বিশেষ কিছু দু'আ নির্দিষ্ট করা ভুল। নবী করীম (সা) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম থেকে অনুরূপ কোন বর্ণনা নেই। তিনি সাধারণতঃ হাজারে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নোক্ত দু'আ পড়তেন:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
অনেক তওয়াফকারী নির্দিষ্ট দু'আ সম্বলিত বই খুলে দু'আ পড়ে। অনেকে আরবী না জানার কারণে আরবী দু'আয় কি বলা হচ্ছে, তা বুঝতে পারে না। তাই যে যে ভাষা বুঝে সে ভাষায় দু'আ করা সঙ্গত। কেননা, দু'আর উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর যিক্র ও স্মরণ।
৯. অনেক তওয়াফকারী হাতীমে কাবা থেকে তওয়াফ শুরু করে। ভীড়ের সময় ভীড় এড়ানোর উদ্দেশ্যে তা করা হয়। এর দ্বারা আল্লাহর ঘরের পূর্ণ তওয়াফ হয় না। কেননা হাতীমের অংশবিশেষ অসম্পূর্ণ কাবা। আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন: 'তারা যেন আল্লাহর প্রাচীন ঘরের তওয়াফ করে।' (সূরা হজ্জ-২৯)। হাতীমের ভেতর দিয়ে তওয়াফ করলে আল্লাহর পূর্ণ ঘরের তওয়াফ হয় না, বরং ঘরের অংশবিশেষের তওয়াফ হয়।
১০. তওয়াফের সময় কা'বা শরীফকে বাঁয়ে রাখতে হবে। কেউ স্ত্রীলোকদেরকে সাথে নিয়ে তওয়াফ করে। তখন অন্য সাথীর হাতে হাত ধরে মহিলাদেরকে হেফাজত করে। সে কারণে কা'বাকে পেছনে রেখে ঘুরতে থাকে। অন্য সাথী কা'বার দিকে মুখ ফিরিয়ে তওয়াফ করে। ওলামায়ে কেরামের মতে, তওয়াফ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হল কা'বাকে বাঁয়ে রাখা। কা'বাকে ডানে, সামনে কিংবা পেছনে রেখে তওয়াফ করলে তওয়াফ বিশুদ্ধ হবে না। ভীড় বেশী হলে কেউ কেউ ভীড়ের সাথে খাপ খাইয়ে কাবাকে বামে না রেখে অন্য দিকে রাখে। এটা ভুল।
১১. তওয়াফে জোরে জোরে দু'আ পড়া ভুল। কোন সময় মোআল্লেম জোরে দু'আ পড়েন, অন্যরা তাকে অনুসরণ করেন। জোরে জোরে দু'আ পড়লে তা অন্যের জন্য বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর হয়, অন্যের দু'আয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, মন থেকে বিনয় দূর হয়ে যায় এবং আল্লাহর ঘরের ভীতি চলে যায়। এক রাতে নবী করীম (সা) সাহাবায়ে কেরামকে মসজিদে জোরে কেরাত পড়তে দেখে বললেন: তোমরা প্রত্যেকেই আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি জানাচ্ছ। তাই জোরে কেরাত পড়ার প্রয়োজন নেই। তোমরা একে অপরকে কষ্ট দিওনা। ১ তওয়াফ সহ সকল এবাদত নবী করীম (সা)-এর অনুসরণে করার জন্য আল্লাহর তওফীক কামনা করা দরকার।
১২. কেউ কেউ বাবে কা'বা বা কা'বা শরীফের দরজা থেকে তওয়াফ শুরু করে, হাজারে আসওয়াদ থেকে নয়। অথচ নবী করীম (সা) হাজারে আসওয়াদ থেকে তওয়াফ শুরু করতেন। তিনি বলেছেন: لِتَاخُذُوا عَنِّى مَنَاسِكَكُمْ 'তোমাদের উচিত, আমার নিকট থেকে হজ্জ সংক্রান্ত মাসলাগুলো শেখা। ২ হাজারে আসওয়াদ বরাবর স্থান থেকে তওয়াফ শুরু না করলে সে তওয়াফ অসমাপ্ত থাকবে।
১৩. তওয়াফ শেষে দু'রাকাত নামায মাকামে ইবরাহীমের পেছনে পড়াকে যারা জরুরী মনে করেন, তারা ভুল করেন। ফলে দেখা যায়, ভীড়ের সময়ও ঐ জায়গায় নামায পড়ার কারণে তওয়াফকারীরা স্থানের সংকীর্ণতার সম্মুখীন হন। এতে করে তওয়াফকারীদের কষ্ট দেয়া হয়। দু'রাকাত নামায মসজিদে হারামের যে কোন স্থানে পড়লেই হয়ে যায়। বেশ দূরে গিয়েও মাকামে ইবরাহীমকে কা'বা ও নিজের মধ্যে আড়াল করে পড়লে সুন্নত আদায় হয়ে যায়। মাকামে ইবরাহীমের জন্য বিশেষ কোন দু'আ নেই। অনেকে বই খুলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সেখানে দু'আ পড়ে। এখানে শুধু দু'রাকাত নামায পড়াই সুন্নত। তাছাড়া নামায শেষ করে পরে আলাদা দু'আ করার চাইতে নামাযের সাজদায় এবং শেষ বৈঠকে দুরূদের পর দু'আ করাই নবী করীম (সা)-এর সুন্নত পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (সা) সাজদায় দু'আ করার বিষয়ে বলেছেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَاكْثِرُوا الدُّعَاءَ.
'সাজদার অবস্থায় বান্দাহ আল্লাহর সবচাইতে নিকটে অবস্থান করে। তাই তোমরা সাজদায় বেশী বেশী দু'আ কর।' (মুসলিম)
তাশাহহুদের উল্লেখের পর দু'আর বিষয়ে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) নবী করীম (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীস বর্ণনা করেন: ثُمَّ يَتَخَيَّرُ مِنَ الدُّعَاء مَاشَاء তারপর যে দু'আ করতে ইচ্ছা করে তা-ই করতে পারে।'১
১৪. বরকতের নিয়তে কাবার দেয়াল, গেলাফে কাবা কিংবা মাকামে ইবরাহীমকে স্পর্শ করা। এটা ঈমানের জন্য ক্ষতিকর এবং তাওহীদের পরিপন্থী। এগুলো স্পর্শ করা যায়। কিন্তু বরকতের নিয়তে নয়। বরকত আল্লাহর কাছে, এগুলোর মধ্যে নয়।
সাফা-মারওয়ায় সাঈর মধ্যকার ভুল
১. সাঈর সময় সাফা ও মারওয়ায় উঠে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করে বলা, আমি ৭ বার সাঈর নিয়ত করলাম। এটা শুধু মনে মনে না করে মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে একটু আগে ও বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
২. সাফা পাহাড়ে উঠে দু'হাত তুলে কেবলামুখী হয়ে দু'আ করা নবী (সা)-এর সুন্নত। তাই বলে নামাযের মত দুই হাত তোলা বা ইশারা করা ঠিক নয়। সাফায় হাত তুলে নবী করীম (সা)-এর অনুরূপ দু'আ করতে হবে এবং তিনি যেরূপ যিক্র ও দু'আ পড়েছেন সেগুলো পড়তে হবে।
৩. দুই সবুজ চিহ্নের মধ্যে জোরে না হাঁটা বরং স্বাভাবিকভাবে হাঁটা। এটা রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নতের পরিপন্থী। তিনি এ দু'টো সবুজ চিহ্নের মধ্যে দ্রুত হাঁটতেন। সাফা থেকে মারওয়ায় এবং মারওয়া থেকে সাফায় সাঈর সময় এখানে জোরে হাঁটতে হবে। কেউ কেউ তাড়াতাড়ি সাঈ শেষ করার জন্য পুরো সাঈতে দ্রুত হাঁটেন। এটা ঠিক নয়।
৪. বহু লোক যখনই সাফা কিংবা মারওয়ায় পৌঁছে তখন প্রত্যেক বার নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে: إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ 'নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া পাহাড় আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন।' (সূরা বাকারা-১৫৮)
এটা মহানবীর সুন্নতের বরখেলাফ। তিনি প্রথম সাঈর শুরুতে সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী হয়ে ঐ আয়াতটি পাঠ করে বলতেন: 'আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন, আমিও সেভাবে সাঈ শুরু করবো।' (মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়) অর্থাৎ আয়াতে আল্লাহ প্রথমে সাফা পাহাড়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তাই তিনিও প্রথমে সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করেন। তিনি প্রত্যেকবার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছে ঐ আয়াত পড়েননি।
৫. সাঈর জন্য বিশেষ কোন দু'আ নির্দিষ্ট নেই। যে কোন দু'আ ও যিক্র বা কোরআন পাঠ করা যেতে পারে। দু'আ যে কোন ভাষায় হতে পারে। আরবী ভাষায় জরুরী নয়। তবে আরবীতে নবী করীম (সা) থেকে বর্ণিত, দু'আ উত্তম। নবী করীম (সা) বলেছেন : বায়তুল্লাহর তওয়াফ, সাফা মারওয়ার সাঈ, ও জামরায় কংকর নিক্ষেপ আল্লাহর যিক্র ও স্মরণের জন্য বিধান করা হয়েছে।১ অর্থ না বুঝে দু'আ করা ভুল। কেননা, আল্লাহর কাছে কি চাওয়া হচ্ছে তা না বুঝা বেদনাদায়ক। বরং তা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কি?
৬. সাফা থেকে মারওয়া হয়ে পুনরায় সাফায় ফিরে আসাকে যারা এক সাঈ মনে করেন, তারা ভুল করেন। নবী করীম (সা) সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত এক সাঈ এবং মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত আরেক সাঈ বিবেচনা করতেন। এভাবে মোট ৭ সাঈ করতে হবে। কিন্তু যারা সাফা থেকে মারওয়া হয়ে আবার সাফা পর্যন্ত সাঈ করেন, তাদের ৭ বারের জায়গায় ১৪ বার সাঈ হয়। এটা নিঃসন্দেহে ভুল।
৭. অসুস্থ ও দুর্বল লোক ছাড়া কেউ যেন গাড়ীতে সাঈ না করে। সুস্থ ও সবলরা হেঁটে হেঁটে সাঈ করবেন।
চুল কাটা সংক্রান্ত ভুল
১. ওমরাহ বা হজ্জ শেষে পুরুষের পুরো মাথার চুল ছোট কিংবা মুণ্ডন করতে হবে। মহিলা হলে চুলের শেষ মাথা থেকে আঙ্গুলের মাথা পরিমাণ কাটতে হবে। আল্লাহ তাই বলেছেন مُحَلَّقِينَ رَؤُوسَكُمْ وَمُقَصَرِينَ মাথার চুল মণ্ডন কিংবা ছোট করা অবস্থায়।' (সূরা আল-ফাতহ-২৭)। চুল মুণ্ডন করা উত্তম। নবী (সা) তাদের জন্য দ্বিগুণ দু'আ করেছেন। চুল ছোটকারীদের জন্য একবার দু'আ করেছেন।
কেউ কেউ মাথার চুল সামান্য কাটেন। অর্থাৎ পুরো মাথার চুল কাটেন না। দু'তিন জায়গা থেকে একটু একটু কাটেন। এটা জায়েয কিনা- এ বিষয়ে মতভেদ আছে।
২. কেউ কেউ ঘরে গিয়ে কাপড়-চোপড় বদল করে চুল কাটেন। এটাও ভুল, নবী করীম (সা) চুল কেটে হালাল হতে বলেছেন। فَلْيَقَصِّرْ ثُمَّ لِيَحْلِلْ 'প্রথমে চুল কাট, তারপর হালাল হও।' (বোখারী, হজ্জ অধ্যায়; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়)
৩. কেউ কেউ মক্কার হারাম সীমানার বাইরে গিয়ে চুল কাটে। এগুলো সবই ভুল। হারাম সীমানার ভেতর চুল কাটতে হবে, বাইরে নয়।
মিনায় যে ভুলগুলো হয়
১. মিনায় যাওয়ার সময় কিংবা মিনাতে উঁচু স্বরে তালবিয়া পড়ার নিয়ম সত্ত্বেও হাজীরা জোরে তালবিয়া পড়ে না। এটা সুন্নতের খেলাফ। সুন্নত হল, কষ্ট অনুভব না করা পর্যন্ত জোরে জোরে তালবিয়া পাঠ করতে হবে। জেনে রাখতে হবে যে, এ তালবিয়া যে সকল নষ্ট পাথরও শুনবে, হাশরের দিন আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দেবে।
২. ৮ তারিখ মিনায় অবস্থান ও রাত্রি যাপন সুন্নত। তা সত্বেও অনেকে ৯ তারিখে সরাসরি আরাফাতের ময়দানে চলে যান। এটা জায়েয হলেও উত্তম নয়। উত্তম হল, মহানবীর পদ্ধতিতে তারওইয়া দিবসে মিনায় অবস্থান করা।
আরাফাতের ময়দানে যে সকল ভুল হয়
১. আরাফাতে যাওয়ার পথে কিংবা আরাফাত ময়দানে জোরে তালবিয়া পাঠ না করা। বর্ণিত আছে, নবী (সা) ১০ তারিখে জামরাহ আকাবার কংকর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতেন।১
২. কেউ কেউ আরাফাহ সীমান্তের বাইরে অবস্থান করে এবং সূর্যাস্তের পর সেখান থেকে প্রস্থান করে। তাদের হজ্জ হবে না। মহানবী (সা) বলেছেন: الْحَجُّ عَرَفَةُ 'আরাফায় অবস্থানই হজ্জ।' আরাফাত ময়দানের ৪ সীমানায় বোর্ড লাগানো আছে। তাই তা না বুঝার কোন কারণ নেই।
৩. আরাফাতের দিবসের শেষাংশে জাবালে রহমত নামে পরিচিত পাহাড়ের দিকে ফিরে দু'আ করা ভুল। কেবলামুখী হয়ে দু'আ করা উচিত। নবী করীম (সা) পাহাড়ের পেছনে কেবলামুখী হয়ে দু'আ করার সময় পাহাড়টি তাঁর ও কেবলার মাঝখানে অবস্থিত ছিল। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি পাহাড়ের দিকে ফিরে দু'আ করেছেন। বরং তিনি কেবলামুখী হয়েই দু'আ করেন।
নবী করীম (সা) যে জায়গায় দাঁড়িয়ে দু'আ করেছেন, সে জায়গায় গিয়ে দু'আ করা জরুরী নয়। তিনি বলেছেন: 'আমি এখানে অবস্থান করলাম। কিন্তু আরাফাহ সবটাই অবস্থানের স্থল।'১ অনেকে বহু কষ্ট কর সে জায়গায় পৌঁছার চেষ্টা করে। অথচ এর দরকার নেই।
৪. আরাফাত দিবসে জাবালে রহমতে উঠার কোন প্রয়োজন নেই। বহু লোক সেখানে উঠে এবং অবস্থান করে। অনেকের ধারণা, এ পাহাড়ে হযরত আদম (আ)-এর উপর রহমত নাযিল হয়েছে। তাই এটি একটি পবিত্র পাহাড়। আসলে এগুলো সব ভুল ধারণা। এটা অন্যান্য পাহাড়ের মতই একটি সাধারণ পাহাড়। এর কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই। কেউ কেউ ঐ পাহাড়ের গাছে কাপড়ের টুকরা ঝুলায়। এগুলো সবই বেদআত। এ পাহাড়ের নামকরণেরও কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই আরবী কিতাবে এটাকে جبل عرفة 'আরাফার পাহাড়' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জাবালে রহমত হিসেবে নয়।
৫. আরাফাতের গাছসমূহের পাতা ও ডাল ভাঙ্গা জায়েয। এটা হারাম সীমানার বাইরে। তবে বিনা প্রয়োজনে তা করা যাবে না। সরকার আরাফাতের আবহাওয়া শীতল করার জন্য যে গাছ লাগিয়েছে তা নষ্ট করা জায়েয নেই।
৬. কেউ কেউ মসজিদে নামেরায় ইমামের সাথে জামা'আতে নামায পড়াকে জরুরী মনে করেন। এজন্য তারা কষ্ট করে দূরের তাঁবু থেকে মসজিদে আসে। এর কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, নবী করীম (সা) বলেছেন, আমি এখানে অকুফ করলাম, কিন্তু আরাফাত সবটাই অকুফের স্থান। ২ মসজিদে নামেরা ছাড়াই আরাফাতের যে কোন স্থানে নামায পড়লেই চলবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : جُعِلَتْ لِي الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا 'আমার জন্য মাটিকে মসজিদ ও পবিত্র করে দেয়া হয়েছে।'৩
৭. সময়ের অসদ্ব্যবহার করা: বেহুদা গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা ও আলাপ-আলোচনা দ্বারা আরাফাতের পবিত্র দিনের সময় নষ্ট হয়। কেউ কেউ নিন্দা ও গীবতে নিয়োজিত হন। এগুলোর কোনটাই হজ্জের জন্য উপকারী নয়। বরং হজ্জের শিক্ষা বিরোধী। আরাফাহ দিবস হচ্ছে এবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম বিশেষ দিন। হজ্জের দিনগুলোতে গুনাহ ও মন্দ কাজ অধিক ঘৃণিত। আল্লাহ বলেছেন:
فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ . 'হজ্জের মাসসমূহে যে লোক হজ্জ পালন করবে তার পক্ষে স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন গুনাহর কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ করা নাজায়েয।' (সূরা বাকারা-১৯৭)
সেদিন বেশী বেশী দু'আ যিক্র ও কোরআন তেলাওয়াত করা দরকার। একঘেঁয়েমী লাগলে হাজী সাহেবানের সাথে শরীয়ত ও দীনের উপকারী আলোচনা করতে হবে। যাতে করে তাদের মধ্যে আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশার দরজা উন্মুক্ত হয়। দিনের শেষাংশে আল্লাহর কাছে কেবলামুখী হয়ে করুণভাবে কান্নাকাটি করা উচিত। বারবার দু'আ করা দরকার এবং কোরআন ও হাদীসে উল্লেখিত দু'আগুলোর পুনরাবৃত্তি উত্তম। কেননা, ঐ সময় দু'আ কবুলের সম্ভাবনা বেশী।
মোযদালেফার ভুলসমূহ
১. আরাফাত থেকে সূর্যাস্তের পূর্বে মোযদালেফার উদ্দেশ্যে রওনা করা কিংবা আরাফাহ সীমানা অতিক্রম করা। এটা নবী (সা)-এর বিরোধিতা। কেননা, জাবের (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে মহানবী (সা) সূর্যাস্তের আগে আরাফাহ ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন।১
২. আরাফাত থেকে মোযদালেফায় আসার সময় বেশী তাড়াহুড়া করা ঠিক নয়। ধীরে সুস্থে আসতে হবে। নবী করীম (সা) বিদায় হজ্জের নিজ উষ্ট্রী কোসওয়ার লাগাম এমনভাবে টেনে ধরতেন যে উষ্ট্রীর মাথা তাঁর আসনে সাথে এসে লেগে যেত। এরপর তিনি নিজ হাত মোবারকে ইশারা দিয়ে বলতেন: أَيُّهَا النَّاسُ السَّكِينَةَ السَّكِينَةُ 'হে লোকেরা, প্রশান্তির সাথে চল।'
৩. মোযদালেফা সীমান্তে পৌঁছার আগেই মোযদালেফার বাইরে অকুফ করা ভুল। পায়ে হেঁটে হজ্জকারীরা ক্লান্ত হয়ে গেলে তাড়াহুড়া করে এরূপ করে। সেখান থেকে পরের দিন সকালে মিনায় পৌছে। এর ফলে, তাদের মোযদালেফায় অবস্থান বিশুদ্ধ হয়নি। অথচ, অকুফে মোযদালেফা ওয়াজিব।
৪. কেউ কেউ মোযদালেফায় পৌঁছার আগেই মাগরিব ও এশার নামায রাস্তায় পড়ে নেয়। এটা সুন্নতের খেলাপ। নবী করীম (সা) আরাফাত থেকে মোযদালেফা পৌছার সময় রাস্তায় অবতরণ করে পেশাব করেন এবং ওজু করেন। উসামা বিন যায়েদ ছিল তাঁর সওয়ারের সাথী। উসামা বলল : হে আল্লাহর রাসূল, নামায। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : নামায সামনে গিয়ে পড়বো। ১ তিনি মোযদালেফায় পৌঁছে এশার সময়ে মাগরিব ও এশা এক সাথে আদায় করেছেন।
কোন কারণে যদি মোযদালেফা পৌঁছতে এত দেরী হয় যে, এশার নামাযের সময় চলে যাচ্ছে, তখন এশার সময়ের মধ্যে মাগরিব ও এশা একসাথে আদায় করতে হবে। নামায আদায় না করলে কবীরা গুনাহ হবে। কেননা, নামাযের সময়ে নামায না পড়া হারাম কাজ। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا -
'নিশ্চয় মোমেনদের জন্য নামাযের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট।' (সূরা নিসা-১০৩)
কেউ যদি মনে করে যে, সুন্নতের অনুসরণের লক্ষ্যেই মোযদালেফা পৌছার পর নামায পড়বে, যদিও এশার সময় চলে যায়। এই সুন্নতের পরিপন্থী কথা। নবী (সা) মাগরিবকে বিলম্বে পড়লেও এশাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পড়েছেন।
৫. কেউ কেউ মোযদালেফায় ফজরের সময়ের আগেই ফজরের আজান দিয়ে নামায শুরু করে এবং তাড়াতাড়ি করে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এটা হারাম। নামাযের সময় পরিবর্তনের অধিকার কারো নেই। বরং এটা হবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমালংঘন। এটা ঠিক যে, ফজরের নামায ১ম ওয়াক্তে পড়ে রওনা দেয়ার চেষ্টা করা ভাল। নবী (সা)ও সেদিন ১ম ওয়াক্তে ফজর পড়েছেন। স্মরণ রাখতে হবে, ভোরের আলো উজ্জ্বল হওয়ার পর মোযদালেফার সীমানা অতিক্রম করে মিনায় পৌঁছা উত্তম। ফজরের পর মোযদালেফার মসজিদের (মাশ'আরে হারামে) কাছে অবস্থান করে দু'আ করা ভাল।
৬. মোযদালেফার রাত্রে যারা রাত্রি জাগরণ করেন তারা মহানবী (সা)-এর সুন্নতের বিরোধিতা করেন। জাবের (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা) মাগরিব ও এশা পড়ার পর ঘুমিয়ে পড়েন এবং ফজরের সময় উঠে ফজরের নামায পড়েন। ১ সে রাতে তিনি তাহাজ্জুদ কিংবা অন্য কোন তাসবীহ ও যিক্র করেননি।
৭. কিছু কিছু হাজী সাহেবান সূর্যোদয়ের পরও মোযদালেফায় অবস্থান করেন এবং সেখানে এশরাকের/চাশতের নামায পড়েন। তারপর মিনায় আসেন। এটা নবী (সা)-এর সুন্নতের খেলাফ। নবী করীম (সা) সূর্যোদয়ের আগে যখন খুব পরিষ্কার হয়ে গেল তখন মোযদালেফা ত্যাগ করেছেন।
৮. মোযদালেফায় (অকুফের) অবস্থানের পরিবর্তে শুধুমাত্র অতিক্রম করা ঠিক নয়। বরং সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত অবস্থান জরুরী। নবী করীম (সা) কেবলমাত্র অসুস্থ, দুর্বল ও ওজরগ্রস্ত লোকদেরকে রাত্রে মোযদালেফা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, দুর্বল শ্রেণীর লোকদের কি পরিমাণ সময় মোযদালেফায় অবস্থান করতে হবে? হযরত আসমা বিনতে আবী বাক্স (রা) চাঁদ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত মোযদালেফায় অবস্থান করেছেন। ২ তারপর তিনি মিনা চলে যান। নবী করীম (সা) দুর্বলদেরকে রাত্রে মোযদালেফা ত্যাগের অনুমতি দিলেও সময়ের সীমারেখা উল্লেখ করেননি। হযরত আসমার মত একজন সাহাবীর কার্যক্রম নবী করীম (সা)-এর অনুমতির উত্তম ব্যাখ্যা হতে পারে। অর্থাৎ অসুস্থ, দুর্বল ও ওজরগ্রস্ত লোকেরা ১০ই জিলহজ্জ রাত্রে চাঁদ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত মোযদালেফায় অবস্থান করবেন। সে সময়টি রাতের ভাগ হবে। কেননা, ৩০ দিনে ১ মাস। ১ম ১০ দিন চাঁদ রাত্রের ভাগ সময় আকাশে দেখা যাবে। আর ভাগ সময় দেখা যাবে না।
জামরায় কংকর নিক্ষেপের ভুল
১. মিনার জামরায় নিক্ষেপের জন্য কেবলমাত্র মোযদালেফা থেকে কংকর সংগ্রহ করা ভুল। নবী করীম (সা) থেকে অনুরূপ কিছু বর্ণিত নেই। যে কোন জায়গা থেকেই কংকর সংগ্রহ করা যায়।
২. কংকর ধুয়ে ও পরিষ্কার করে নিক্ষেপ করা ঠিক নয়। কেউ পেশাব করে থাকতে পারে এ আশংকায় তা ধোয়া বেদআত। নবী (সা) এরূপ করেননি এবং এর কোন দরকারও নেই।
৩. অনেকেই জামরাকে শয়তান এবং শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করছে বলে ধারণা করে। তাই কেউ কেউ খুব রাগ ও গোস্বা সহকারে কংকর নিক্ষেপ করে যেন শয়তান তার সামনে বাঁধা। এটা ভুল ধারণা। শয়তান তো জামরার ইট দিয়ে তৈরী নয়। বরং জামরায় কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর যিক্র ও স্মরণ, নবী করীম (সা)-এর অনুসরণ এবং এবাদত করা। পক্ষান্তরে, যারা রাগ-গোস্বা ও কঠিন আবেগ সহকারে কংকর নিক্ষেপ করে, তারা লোকদেরকে অনেক কষ্ট দেয়। ফলে উপস্থিত অন্যান্য লোকেরা তার কাছে পোকা-মাকড়ের মত এবং সে তাদের কোন পরোয়া করে না। সে যেন ক্ষ্যাপা উটের মত উন্মত্ত। কেউ কেউ কংকর নিক্ষেপের সময় নিচের দু'আ পড়ে যা পড়া ঠিক নয় :
اللَّهُمَّ غَضَابًا عَلَى الشَّيْطَانِ وَرِضًا لِلرَّحْمَنِ -
'হে আল্লাহ, শয়তানের প্রতি অসন্তোষ এবং মেহেরবান দয়াবান আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে।' বরং কংকর নিক্ষেপের সময় মহানবী (সা)-এর অনুসরণে তাকবীর 'আল্লাহু আকবার' বলবে।
জামরাকে শয়তান বিবেচনার ভ্রান্ত ধারণার প্রেক্ষিতে অধিকতর প্রতিশোধের জন্য বড় পাথর নিক্ষেপ করে। বেশী অপমান করার উদ্দেশ্যে জুতা, স্যান্ডেল, কাঠ ও অন্যান্য জিনিস নিক্ষেপ করে। অথচ, এগুলো নিক্ষেপ করা নাজায়েয। বিশুদ্ধ আকীদা অনুযায়ী কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ, আল্লাহ্র এবাদত এবং নবী করীম (সা)-এর সুন্নতের অনুসরণ।
৪. লোকেরা জামরার স্তম্ভকে লক্ষ্য করে কংকর নিক্ষেপ করে। কিন্তু নিয়ম হল, স্তম্ভের গোড়ায় যে পাকা হাউজ আছে তাতে কংকর নিক্ষেপ করা। স্তম্ভগুলো হচ্ছে কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে তৈরি হাউজের চিহ্ন। কংকর নিক্ষেপ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হল, তা হাউজে পড়তে হবে। স্তম্ভ থেকে হাউজে পড়লে চলবে। কিন্তু যদি ছিঁটকে অন্যদিকে চলে যায় এবং হাউজে না পড়ে তাহলে কংকর নিক্ষেপ শুদ্ধ হবে না। হাউজে নিক্ষেপের পর তা হাউজ থেকে অন্যদিকে চলে গেলে কোন অসুবিধা নেই। অর্থাৎ হাউজেই কংকর নিক্ষেপ করতে হবে, স্তম্ভ পড়ুক বা নাই পড়ুক।১
৫. শক্তিবান লোকদের দৈহিক ক্ষমতা থাকা সত্বেও নিজে কংকর না মেরে অন্যকে কংকর মারার দায়িত্ব অর্পণ নিঃসন্দেহে বিরাট ভুল। কেননা, কংকর নিক্ষেপ হজ্জের অন্যতম নিদর্শন ও হুকুম। আল্লাহ বলেন:
وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ . 'আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও ওমরাহ সম্পন্ন কর।' (সূরা বাকারা-১৯৬)।
এ আয়াতে হজ্জ সম্পন্ন করার অর্থ হল, হজ্জের সকল হুকুম সম্পন্ন করা এবং সেটা নিজেকেই করতে হবে। নিজে অক্ষম হলে অন্য কাউকে দিয়ে নিক্ষেপ করানো যাবে না। কেউ কেউ বলেন, প্রচন্ড ভীড়ের কারণে কংকর নিক্ষেপ কষ্টকর হওয়ায় এ ওজরের কারণে অন্যকে দিয়ে তা নিক্ষেপ করানো হয়। এ প্রশ্নের জবাব হল, ১ম দিকে ভীড় হলে পরে ভীড় কমলে অথবা রাত্রে কংকর নিক্ষেপ করা যায়। তাই ভীড়ের অজুহাতে কংকর নিক্ষেপ থেকে বিরত থাকা যাবে না।
মহিলারা পুরুষদের তুলনায় দুর্বল এবং পুরুষদের কামনা-বাসনার বস্তু। মহিলারা পুরুষদের ফেতনার কারণ। যদি পুরুষদের সাথে কংকর নিক্ষেপে কোন সমস্যা হয়, তাহলে তারা যেন রাত্রে কংকর মারে।
নবী করীম (সা) নিজ স্ত্রী সাওদা বিনতে যামআ সহ অন্যান্য দুর্বলদেরকে জামরায় কংকর নিক্ষেপ থেকে অব্যাহতি দেননি। যদিও তারা এই অধিকারের যোগ্য ছিলেন। বরং তিনি তাদেরকে শেষ রাত্রে মোযদালেফা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছিলেন যেন তারা পুরুষদের আগেই মিনায় পৌঁছে জামরায় কংকর নিক্ষেপ করতে পারে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নারী হওয়া সত্বেও নবী করীম (সা) তাদেরকে কংকর নিক্ষেপ থেকে অব্যাহতি দেননি।
সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের ছোট শিশুদের পক্ষ থেকে কংকর নিক্ষেপ করেছেন। সত্যিকার ওজর ছাড়া অন্যকে কংকরের প্রতিনিধিত্ব দেয়া যাবে না। অর্থাৎ এবাদতের ক্ষেত্রে কোন অবহেলা করা যাবে না।
৬. কংকর হাত থেকে পড়ে গেলে অন্য যে কংকর পাওয়া যাবে তাই নিক্ষেপ করতে হবে। এমনকি হাউজের নিকটবর্তী এলাকা থেকে তা কুড়িয়ে নিতে ইতস্তত করা ঠিক নয়। অনেকে নিক্ষিপ্ত কংকর থেকে প্রয়োজনে তুলে নিতে ইতস্তত করে।
৭. কংকর ৭টি করে নিক্ষেপ করতে হবে। কেউ যেন ৬টি বা ৫টি নিক্ষেপ না করে। কেউ কষ্টের কারণে এক সাথে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করে। এটা ভুল। ৭ বারে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করতে হবে।
৮. কংকর নিক্ষেপের পর দু'আ না করা ভুল। নবী করীম (সা) ১ম জামরায় কংকর নিক্ষেপ করে একটু সরে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়াতেন এবং দীর্ঘ সময় ব্যাপী দু'আ করতেন। মধ্য জামরায়ও তিনি অনুরূপ করেছেন। কিন্তু জামরা আকবায় কংকর নিক্ষেপের পর তিনি দু'আর জন্য দাঁড়াতেন না। নিজেদের সুযোগমত হাজীরা যেন এ সুযোগ হাতছাড়া না করেন।
এর দ্বারা বুঝা গেল, হজ্জে ৬ জায়গায় দু'আ করা উচিত। সেগুলো হল, সাফা ও মারওয়ায় সাঈর মধ্যে; আরাফাহ, মোযদালেফা এবং ১ম ও মধ্যম জামরাহ। মহানবী (সা) এ সকল স্থানে দু'আ করেছেন।
৯. শরীয়তের নির্ধারিত বৈধ পদ্ধতি ও সংখ্যার বাইরে কংকর নিক্ষেপ করা ভুল। কেউ ৭টার বেশী কংকর নিক্ষেপ করে। কেউ কেউ দিনে একাধিকবার জামরায় কংকর নিক্ষেপ করে। এমনকি হজ্জের সময় ব্যতীতও কেউ কেউ জামরায় কংকর নিক্ষেপ করে। এগুলো সবই ভুল। নবী করীম (সা) যা বলেননি বা যা করেননি তার নাম এবাদত নয়। বরং তা বেদআত ও গুনাহ।
মিনায় যেসব ভুল হয়
১. মিনায় রাত্রি যাপন না করা। মিনায় রাত্রি যাপন ওয়াজিব না সুন্নত- এ বিষয়ে মতভেদ আছে। মহানবী (সা) মিনায় রাত্রি যাপন করেছেন। রাত যাপন না করা কমপক্ষে সুন্নতের পরিপন্থী। সুযোগ থাকলে এ মহান সুন্নতটি ত্যাগ করা উচিত নয়। শুধু ওজরগ্রস্ত লোকেরা এর ব্যতিক্রম। রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালেবকে মক্কায় হাজীদের পানি পান করানোর জন্য এবং ভেড়া-বকরীর রাখালদেরকে মিনার বাইরে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। রোগী কিংবা রোগীর সেবাকারী ব্যক্তি, নার্স ও ডাক্তার ইত্যাদি লোকেরাও একই কারণে মিনার বাইরে থাকতে পারে।
কেউ কেউ রাত্রে মিনায় থাকলেও দিনে মিনায় থাকে না। যদিও ফেকাহবিদগণের মতে তা জায়েয, তবুও রাসূলুল্লাহ (সা) দিনেও মিনায় ছিলেন। মিনায় রাত্রি যাপনের বিষয়ে ফকীহগণ বলেছেন, অর্ধেক রাত্রের বেশী থাকলেও রাত্রি যাপনের হুকুম আদায় হয়ে যাবে। মূলকথা মিনায় থেকে আল্লাহর যিকিরের চেষ্টা করা দরকার।
২. হাদী অর্থাৎ তামাকু ও কেরান হজ্জের জন্য হাজীরা যে কোরবানী দেন অনেকে তাতে কোরবানী শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী বিবেচনা করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) কোরবানীর পশুর জন্য চারটি শর্ত উল্লেখ করেছেন।
الْعَوْرَاءُ البَيِّنُ عَوْرُهَا وَالْمَرِيضَةُ البَيْنُ مَرَضُهَا وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ضَلْعُهَا وَالْهَزِيلَةُ أَوْ الْعَجَفَاءُ الَّتِي لَا تَنْقَى .
অর্থ: ১. প্রকাশ্য কানা ২. প্রকাশ্য রোগা ৩. প্রকাশ্য খোঁড়া ৪. দুর্বল- এ চারটি ত্রুটি থাকলে সে পশু দিয়ে কোরবানী করা যাবে না।
৩. কোরবানীর পশু জবেহ করে তার গোশত খাওয়া এবং ফকীর-মিসকীনকে দেয়া কর্তব্য। আল্লাহ বলেন:
فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ -
'তোমরা এর গোশত খাও এবং অভাবী ও ফকীর মিসকিনকে দান কর।" (সূরা হজ্জ-২৮)
কিন্তু হাজী সাহেবগণ পশু কোরবানী করে গোশত ফেলে দিয়ে আসেন। এটা ঠিক নয়। ভীড় কিংবা দূরত্বের কারণে বহন করে আনতে অসুবিধে হলে কোরবানীর গোশতের সদ্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানকে টাকা দিয়ে দিলে তারা কোরবানী করে তা বিলি করবে। সেটাই উত্তম।
৪. হাজীদের কোরবানী কিংবা দম মক্কার বাইরে দেয়া ঠিক নয়। যদিও তা কোন গরীব মুসলিম দেশেই হোক না কেন। রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় গরীব লোক থাকা সত্ত্বেও মক্কায় হজ্জের কোরবানীর পশু জবেহ করেছেন। তাই ফকীহরা হাজীদের কোরবানীর পশু মক্কায় জবেহ করাকে ওয়াজিব বলেছেন। আল্লাহ শিকারের কাফফারার আদেশ দিয়ে বলেছেন:
يَحْكُمُ ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ "এহরাম অবস্থায় কেউ শিকার করলে... দু'জন ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত লোক এর ফয়সালা করবে এবং বিনিময়ের পশুটি উৎসর্গ হিসেবে কা'বায় পৌঁছতে হবে।" (সূরা মায়েদা-৯৫)
৫. হাজী ছাড়াও যারা ঈদের কোরবানী দেন, তারা যে যেখানে থাকেন সেখানে কোরবানী দেয়া উত্তম। নবী (সা) মদীনায় ছিলেন এবং সেখানেই কোরবানী দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমেই ইসলামের এ মহান নিদর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। যারা থাকেন এক জায়গায় আর কোরবানী দেন আরেক জায়গায় তারা দুটো সওয়াব থেকে বঞ্চিত হন। ১. নিজ হাতে কোরবানীর পশু জবেহ করা সুন্নত। মহানবী (সা) তাই করেছেন। নিজ হাতে জবেহ না করলেও জবেহর সময় উপস্থিত হয়ে স্বচক্ষে দেখতেন। ২. কোরবানীর পশুর গোশত খাওয়া। কেননা, আল্লাহ বলেছেন: 'তোমাদের নিজেরা কোরবানীর পশুর গোশত খাও এবং ফকীর-মিসকীন ও দুঃস্থ লোকদেরও খাওয়াও।'১
রাসূলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জে ১০০টি উট কোরবানী করেন। তিনি নিজ হাতে ৬৩টি জবেহ করেন। অবশিষ্টগুলো জবেহর জন্য হযরত আলী (রা)-কে দায়িত্ব দেন। তিনি সকল উট থেকে এক টুকরা গোশত রান্নার নির্দেশ দেন এবং নিজে সে গোশত ও ঝোল খান। অন্যত্র জবেহ করলে সওয়াবগুলো লাভ করা সম্ভব হবে না।
৬. আইয়ামে তাশরীকে মিনায় অবস্থানকালে বেহুদা গল্প-গুজব, মিথ্যা কথা ও কাজ, তাস খেলা, অতিরিক্ত ঘুমানো- এগুলো ক্ষতিকর কাজ। তাই এখানে অধিক জিকর-ফিকির, তাসবীহ-তাহলীল, তওবা-এস্তেগফার, কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামায এবং ওয়াজ-নসীহত করা ও সময়ের সদ্ব্যবহার প্রয়োজন। যিন্দেগীতে ২য় বার হয়তো মিনায় আসার সুযোগ নাও হতে পারে।
বিদায়ী তওয়াফের ভুল
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : لا يَنْصَرِفْ أَحَدٌ حَتَّى يَكُونَ أَخِرُ عَهْدِهِ بِالْبَيْتِ 'তোমাদের কেউ যেন বায়তুল্লাহর তওয়াফ না করে সর্বশেষ বিদায় না হয়।'১ আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, লোকদের সর্বশেষ বিদায়ী তওয়াফের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঋতুবতী মহিলাদের ব্যাপারে এ হুকুম শিথিল করা হয়েছে। ২ লোকেরা এক্ষেত্রে অনেক ভুল করে।
১. কেউ কেউ বিদায়ী তওয়াফ করে অথচ তখনও তার জামরায় কংকর নিক্ষেপ বাকী আছে। মিনা যেহেতু মক্কার অংশ এবং কংকর নিক্ষেপ হজ্জের অবশিষ্ট কাজ, তাই আল্লাহর ঘর থেকে বিদায় নেয়া সম্পন্ন হয়নি।
২. বিদায়ী তওয়াফ করে মক্কায় অবস্থান করা। ফলে এটা বিদায়ী তওয়াফ বলে গণ্য হবে না। শেষ বিদায়ের মুহূর্তে আবারও তওয়াফ করতে হবে। বিদায়ী তওয়াফের পর যদি রাস্তায় কিছু কেনা-কাটা থাকে কিংবা মাল পরিবহনের জন্য কিছু সময় থাকতে হয়, তাহলে চলে।
৩. বিদায়ী তওয়াফের পর পেছন দিকে হেঁটে মসজিদে হারাম থেকে বের হওয়া বিরাট ভুল। এটা বেদআত। নবী (সা) কিংবা সাহাবা কেরাম তা করেননি। এবং তাদের চাইতে বেশী কেউ কা'বা শরীফের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী ছিলেন না। আল্লাহ হাজী সাহেবনাকে ত্রুটিমুক্ত হজ্জ পালনের তওফিক দিন। আমীন!
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, হজ্জ অধ্যায়; তিরমিযী, হাদীস নং-৮২৯।
১. ফিকহুল এবাদাত; মোহাম্মদ বিন সালেহ ওসাইমিন, দারুল ওয়াতন প্রকাশনী, রিয়াদ; প্রথম প্রকাশ ১৪১৬ হিঃ (১৯৯৬ সন)।
১. বোখারী, কিতাবুল হজ্জ।
১. বোখারী, হজ্জ অধ্যায়; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।
১. বোখারী, হজ্জ অধ্যায়; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।
১. আবু দাউদ, ১৩৩২ নং হাদীস; মুসনাদে আহমদ। ২. মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।
১. বোখারী, ৮৩৫ নং হাদীস, আযান অধ্যায়; মুসলিম ৫৭-৫৮ নং হাদীস, নামায অধ্যায়।
১. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮৮৮, মানাসেক অধ্যায়; তিরমিযী, হজ্জ অধ্যায়-হাদীস নং ৯০২। তিরমিযী এটাকে হাসান-সহীহ বলেছেন।
১. বোখারী, হজ্জ অধ্যায়, হাদীস নং ১৫৪৩, ১৫৪৪; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়, হাদীস নং ১২৮০।
১. মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়, হাদীস নং ১৪৯। ২. মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়। ৩. বোখারী, নামায অধ্যায়; মুসলিম, মসজিদ অধ্যায়।
১. মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।
১. বোখারী, হজ্জ অধ্যায়; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।
১. মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়। ২. বোখারী, হজ্জ অধ্যায়; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।
১. ফিকহুল এবাদাত, মোহাম্মদ বিন সালেহ ওসাইমিন, সৌদি আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য, দারুল ওয়াতন প্রকাশনী, রিয়াদ, ১৪১৬ হিঃ মোতাবেক ১৯৯৫।
১. সূরা হজ্জ-২৮।
১. মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়। ২. বোখারী, হজ্জ অধ্যায়; মুসলিম, হজ্জ অধ্যায়।