📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১. মসজিদে আবু বকর ২. মসজিদে খালেদ বিন ওয়ালিদ ৩. মসজিদে আর রায়াহ ৪. মসজিদে জিন ৫. মসজিদে বায়আহ ৬. মসজিদে মিনা ৭. মসজিদে খায়ফ ৮. মসজিদে কাওসার ৯. মসজিদে কাবস ১০. মসজিদে নামেরা ১১. মসজিদে আয়েশা।

📄 ১. মসজিদে আবু বকর ২. মসজিদে খালেদ বিন ওয়ালিদ ৩. মসজিদে আর রায়াহ ৪. মসজিদে জিন ৫. মসজিদে বায়আহ ৬. মসজিদে মিনা ৭. মসজিদে খায়ফ ৮. মসজিদে কাওসার ৯. মসজিদে কাবস ১০. মসজিদে নামেরা ১১. মসজিদে আয়েশা।


১. মসজিদে আবু বকর: এটি মেসফালায় অবস্থিত। কথিত আছে যে, এখানে হযরত আবু বকরের বাড়ি ছিল এবং এখান থেকে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। বর্তমানে মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
২. মসজিদে খালিদ বিন ওয়ালিদ: এই মসজিদটি শোবেকা গলিতে অবস্থিত। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের ঝাণ্ডা এখানেই দাঁড় করানো হয়েছিল। সেদিন তাঁর বাহিনী মক্কার নিম্নভূমির দিক থেকে আগমন করে এখানে অবস্থান করে। বর্তমানে এখানে একটি সুন্দর মসজিদ নির্মিত হয়েছে যা আধুনিক স্থাপত্য ও নির্মাণ কৌশলের স্বাক্ষরবহন করে। মসজিদে একটি মিনারা আছে।
৩. মসজিদ আর-রায়াহ: মোয়াল্লাহ থেকে মোদ্দাআর দিকে যেতে এই মসজিদটি জোদারিয়ায় অবস্থিত। মসজিদের আগে একটি সরু গলি এসে প্রধান সড়কের সাথে মিশেছে। এই গলিতে যোবাইর বিন মোতয়েমের কূপটি বর্তমানে অব্যবহৃত। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) এর ঝাণ্ডা এখানে দাঁড় করানো হয়েছিল। এতে একটি মিনারা আছে। এর অদূরেই মসজিদে জিন অবস্থিত। এটি জিন মসজিদ থেকে দক্ষিণে অবস্থিত। মসজিদের কাছেই রয়েছে মোআল্লা কবরস্থানের প্রবেশপথ।
১৩৬১হিজরীতে, এই মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করা হয়। মসজিদের ভিত্তিমূল খননের সময় দু'টো পাথর আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো দ্বারা প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, এটি আসলেই মসজিদ আর-রায়াহ। একটি পাথরে ৮৯৮ হিজরী এবং অন্যটিতে ১ হাজার হিজরী লেখা আছে। শেখ তাহের কুর্দী বলেন, মসজিদ পুনঃনির্মণের সময় পাথর দু'টোকে আমরা দেয়ালে দেখেছি।
আযরাকী লিখেছেন, কুসাই বিন কিলাব প্রথমে কূপটি খনন করেন। পরে মাটিচাপা পড়ে গেলে যোবাইর বিন মোতয়েম কূপটি পুনঃখনন করেন।
৪. মসজিদে জিন : মসজিদে জিন মোয়াল্লাহ কবরস্থানের পার্শ্বে অবস্থিত। বর্তমানে খুব সুন্দর ও মজবুত করে সেখানে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। জিনদের কুরআন শুনার রাত্রে, রাসূলুল্লাহ (সা) যে জায়গায় দাগ এঁকেছিলেন, বর্তমান মসজিদটি সেখানে অবস্থিত। এতে সুন্দর একটি মিনারা রয়েছে।
মক্কায় জিনেরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অন্ততঃ ৬ বার এসেছে বলে সহীহ হাদীস থেকে জানা যায়।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, আজ রাতে জিনদের সাথে সাক্ষাতের জন্য আমার সঙ্গে কে যাবে। ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। মক্কার উচ্চভূমিতে এক জায়গায় রাসূলুল্লাহ (সা) রেখা টেনে আমাকে বললেন, এই রেখা অতিক্রম করে সামনে যাবে না। তারপর তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং কুরআন পড়া শুরু করলেন। আমি দূরে দাঁড়িয়েই সেখানে বহুসংখ্যক লোককে উপস্থিত দেখতে পেলাম। তারা সকলেই রাসূলুল্লাহ (সা) কে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাঝে তারা আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ইবনে মাসউদ আরেক রাতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে জিনের সাক্ষাতের জন্য গেলেন। হুজুনে রাসূলুল্লাহ (সা) জিনের একটি মামলার বিচার করে দিলেন। জিনেরা মূলতঃ ইসলাম শেখার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাত করতে আসত।
৫. মসজিদে বাইআহ: আ'কাবা হচ্ছে, মক্কার দিকে মিনার পশ্চিম সীমান্তের নাম। মক্কার দিক থেকে মিনার শুরু এই আকাবা থেকেই। মসজিদে বাইআহ, আকাবা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে মক্কার দিকে অবস্থিত। এই মসজিদটি দুই পাহাড়ের মাঝখানে ঢালু এলাকায় বিদ্যমান। বর্তমান মসজিদের স্থানেই মদীনাবাসী আনসাররা রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে পরপর দু'বার বাইআত গ্রহণ করেন। এটাকে ইসলামের পরিভাষায় আকাবার ১ম ও ২য় শপথ বলা হয়। মসজিদে একটি মিনারা রয়েছে।
হযরত উমর ফারুক (রা) আ'কাবার পরে রাত্রি যাপন না করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, তোমরা মিনায় রাত্রি যাপন কর। (ইবনে আবি শায়বা, বায়হাকী)। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আকাবা হচ্ছে মিনার সর্বশেষ সীমা। বড় জামরাহও আকাবায় অবস্থিত। এজন্য এটাকে জামারাতুল আকাবা বলে।
রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্জ মওসূমে মিনার দিকে মক্কার বাইরে থেকে আগত লোকদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে বের হন। আকাবায় পৌঁছার পর তিনি মদীনার খাযরাজ বংশের একটি প্রতিনিধিদলের সাক্ষাত পান। তিনি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং কুরআন পাঠ করে শুনান। তারা মদীনায় ইহুদীদের প্রতিবেশী ছিল। তারা ইহুদীদের মুখে একজন নতুন নবীর আগমনের অপেক্ষার কথা শুনতে পেয়েছিল এবং একথাও শুনেছিল যে, সেই শেষ নবী আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াত কবুল করে বলল, আমরা আমাদের গোত্রের অবশিষ্ট লোকদের কাছেও আপনার এই দাওয়াত পেশ করবো। তাঁরা মদীনায় গিয়ে নতুন নবীর দাওয়াত পেশ করল এবং তা গোটা মদীনায় ছড়িয়ে পড়ল।
পরের বছর হজ্জ মওসূমে ১২জন মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে আকাবায় সাক্ষাত করে তাঁর কাছে বাইআত গ্রহণ করেন। তাঁরা তাওহীদ-বিশ্বাস, চুরি, জেনা এবং সন্তান হত্যা না করা ও নেক কাজে আনুগত্যের শপথ করল। মদীনা ফিরে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে হযরত মোসআব বিন উমায়েরকে পাঠান এবং তাদেরকে কুরআন, ইসলাম ও দ্বীন শিক্ষাদানের নির্দেশ দেন। তিনি মদীনায় কারী বলে পরিচিতি লাভ করেন এবং আসআ'দ বিন যোরারার ঘরে অবস্থান করেন। তিনি তাদের নামাযের ইমামতিও করতেন।
মদীনায় আউস-খাযরাজ গোত্রে ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। আউস গোত্রের বনি আবদুল আশহাল শাখাদ্বয়ের সর্দার হযরত সাদ বিন মোয়া'জ এবং উসাউদ বিন হোদাইরও ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে বনি আবদুল আশহাল গোত্রের আর কেউ ইসলাম গ্রহণ করা থেকে দূরে রইল না।
আকাবার প্রথম শপথের কারণে, মদীনায় মুসলমানদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হতে লাগল। পরের বছর হযরত মোস'আব বিন উমায়ের, হজ্জ মওসূমে মদীনা থেকে মক্কায় ফিরে আসেন। তাঁর সাথে মদীনার মোশরেকদের সঙ্গে অনেক মুসলমানও হজ্জে আসেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে আকাবার নিকট সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দেন। হজ্জ সেরে রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহত হওয়ার পর তাঁরা পূর্বনির্ধারিত স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাত করেন। মোট ৭৫ জনের মধ্যে দুইজন ছিলেন স্ত্রীলোক। রাসূলুল্লাহ (সা) এর আপন চাচা আব্বাস (তখন তিনি অমুসলমান)-কে সাথে নিয়ে আকাবায় উপস্থিত হন। তিনি তাদের কাছে কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং ইসলামের প্রতি উৎসাহ দেন। তিনি তাঁদের কাছ থেকে এই বাইআত নিলেন যে, তাঁরা নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে যেসব বিপদ-মুসীবত থেকে রক্ষা করেন অনুরূপ রাসূলুল্লাহ (সা) কেও হেফাজত করবেন। তাঁরা একথার উপর মজবুত বাইআত গ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের মধ্যে ১২ জন প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। ৯ জন খাযরাজ এবং তিনজন আউস গোত্র থেকে।
৬. মসজিদে মিনা: ছোট ও মধ্যম জামরাহর মাঝখানে, আরাফাতের দিকে যাওয়ার সময় হাতের ডানে মসজিদে মিনা অবস্থিত। এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সা) এশরাকের নামায পড়েছেন বলে জানা যায়। এই মসজিদটির অপর নাম হচ্ছে মসজিদে মানহার। মসজিদটি বর্তমানে নেই।
৭. মসজিদে খায়ফ: মসজিদে খায়ফ মিনার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এবং আরাফাতে যাওয়ার সময় হাতের ডানে পড়ে। এই মসজিদটি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা) মিনায় অবস্থানের জায়গায় নির্মিত হয়েছে। তিনি এই জায়গায় মিনায় অবস্থানকালীন নামাযগুলো পড়েছেন। বর্তমানে সেখানে বিরাট এয়ারকন্ডিশন-যুক্ত মসজিদ এবং পার্শ্বে অজুর স্থান ও টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এতে চারটি সুন্দর মিনারও তৈরী করা হয়েছে।
এই মসজিদের ফজীলত সম্পর্কে তাবরানীতে হযরত আবু হুরাইরা (রা) এর বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে তোমরা সফর করোনা, সেই তিন মসজিদ হচ্ছে, মসজিদে খায়ফ, মসজিদের হারাম এবং আমার মসজিদ। এই হাদীসটি তাবরানী ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেনি। অন্যান্য হাদীসে মসজিদে খায়ফের কথা উল্লেখ নেই।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, এই মসজিদে ৭০ জন নবী নামায পড়েছেন। এর মধ্যে হযরত মুসা (সা) ও রয়েছেন। আমার মনে হচ্ছে আমি যেন তাঁর দিকে দেখছি এবং তাঁর শরীরে দু'টো আবা এবং উটের উপর দুটো গদি রয়েছে। বর্তমান মসজিদের আয়তন হচ্ছে ২৪ হাজার বর্গমিটার। এতে একসাথে ১ লাখ ৪৫ হাজার মুসল্লীর নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের পাশেই রয়েছে বাদশাহ আঃ আযীয কল্যাণ সংস্থার বিল্ডিং। হজ্জের সময় এই সংস্থা গরীব হাজীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করে।
৮. মসজিদে কাউসার : এই মসজিদটি মিনার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। এখানে সুরা কাউসার নাযিল হয় এবং সে অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা) কুরবানীর নির্দেশ দেন। কেননা, তাতে কুরবানী করার নির্দেশ রয়েছে। মসজিদের কাছে একটি কূপও ছিল। কিন্তু মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে এর কোন চিহ্ন নেই।
৯. মসজিদে কাবস : এই মসজিদটি জামরাহ আকাবার উত্তর দিকে ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত। মক্কা থেকে আরাফাত যাওয়ার সময় বাম দিকে যে সাবীর পাহাড়, তার ঢালুতে এটি অবস্থিত।
কেউ কেউ বলেন, এই মসজিদের স্থানে হযরত ইবরাহীম (আ) এর জন্য ইসমাঈলকে জবেহ করার পরিবর্তে একটি দুম্বা নাযিল হয়েছিল। আসলে এসব কথার কোন প্রমাণ নেই। বর্তমানে মসজিদটি নেই।
মসজিদের পার্শ্বেই বিরাট একটি পাথর আছে। কেউ কেউ বলেন, হযরত ইবরাহীম (আ) এর উপর দুম্বাটি জবেহ করেন। এর সপক্ষে প্রমাণ পেশ করে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেও ইবরাহীম (আ) এর জবেহর স্থানে জবেহ করেছেন। অর্থাৎ সেই পাথরটির উপর জবেহ করেছেন। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে পশু জবেহ করেননি, বরং তিনি দুই জামরাহর মাঝখানে জবেহ করেছেন।
১০. মসজিদে নামেরাহ: এটিকে মসজিদে ইবরাহীমও বলা হয়। এটি আরাফাহ এবং উরানাহ উপত্যকার মাঝে অবস্থিত। এর পূর্ব অংশ আরাফাহ এবং পশ্চিম অংশ উরানা উপত্যকা। এটিকে মসজিদে উরানা বলে। রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাহ দিবসে সূর্য হেলার আগে নামেরা উপত্যকায় অবস্থান করেন। সূর্য হেলার পর তিনি আরাফাহর ভেতর যান এবং জোহর ও আসর একসাথে পড়েন এবং নামাযের আগে খোতবা দেন। বর্তমানে এটিকে বিরাট মসজিদ হিসাবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এতে এয়ারকন্ডিশন রয়েছে। এতে ৬০ মিটার উঁচু সুন্দর ৬টি মিনারা ও ১৪ মিটার উঁচু ৩টি গোলাকার গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার লোক এক সাথে নামায পড়তে পারে।
হজ্জ মন্ত্রণালয়, মসজিদটিকে পূর্বের তুলনায় ৫গুণ বড় করে সম্প্রসারণ করেছে। এতে বিশেষ নকশা ও কারুকার্য করা হয়। এর বর্তমান আয়তন হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার। মসজিদে ১ হাজার টয়লেট ও বিরাট অজুর জায়গা রয়েছে।
মসজিদের বাইরে পূর্বদিকে ১০ হাজার মিটার জায়গার উপর শেড নির্মাণ করা হয়েছে। শেডে ও অনেক মুসল্লীর নামায পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের সাথেই রয়েছে বাদশাহ আবদুল আযীয কল্যাণ সংস্থার ভবন। আরাফাতের দিন এই ভবনের হল রুমে, গরীব হাজীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। মসজিদের ভেতর সর্বাধুনিক দু'টো পূর্ণাঙ্গ বেতার নেটওয়ার্ক আছে। কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে এগুলোর মাধ্যমে হজ্জের দিন মসজিদের নামায ও খোতবা রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। ১৪০৯ হিজরীতে, আরব ও মুসলিম বিশ্বের রেডিও টেলিভিশন কর্মীরা আরাফাতসহ পবিত্র স্থানসমূহ থেকে হজ্জের জীবন্ত বর্ণনা পেশ করে। বাংলাদেশসহ দূর-দূরান্তের মুসলিম দেশগুলোতে আরাফাতের ময়দান থেকে হজ্জের দৃশ্য দেখানো হয়।
১১. তানঈম: মসজিদে আয়েশা: তানঈম হচ্ছে হারাম এলাকার শেষ সীমানা এবং এর চাইতে নিকটবর্তী সীমানা অন্য কোনটি নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জের সময় আবদুর রহমান বিন আবু বকরকে এখান থেকেই হযরত আয়িশা (রা) কে উমরাহ করানোর নির্দেশ দেন।
এখানে একটি মসজিদ আছে। একে মসজিদে আয়িশা বলে। বহুবার ঐ মসজিদটিকে ভেঙ্গে গড়া হয়। সম্প্রতি এটাকে অতিসুন্দর বৃহদাকার এক মসজিদ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি একটি সর্বাধুনিক সুন্দর ডিজাইনের মসজিদ। উমরাহর এহরাম বাঁধার লোকজনের অজু-গোসল-এস্তেনজার জন্য পানি এবং টয়লেটের সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর বর্তমান আয়তন হচ্ছে ৬ হাজার বর্গমিটার। তাতে এক সাথে ১২ হাজার মুসল্লী নামায পড়তে পারে। এতে ৫৫০টি টয়লেট এবং অজুর জন্য ৭শত স্বয়ংক্রিয় কল লাগানো হয়েছে। মসজিদটিতে দু'টো সর্বাধুনিক ডিজাইনের মিনার তৈরী করা হয়েছে এবং মহিলাদের নামায ও টয়লেটের পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে। এহরামের জন্য জো'রানার পর মসজিদে আয়েশাই হচ্ছে উত্তম, জো'রানা হচ্ছে সর্বোত্তম।
আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে যোবায়ের (রা) কা'বা শরীফ নির্মাণ শেষে এই মসজিদটির সংস্কার করেন এবং এতে কাবাতী কাপড়ের গেলাফ লাগান। তারপর তিনি আহবান করেন যে, আমার প্রতি খলিফা হিসাবে যাদের আনুগত্য রয়েছে তারা যেন তানঈমে আমার সাথে উমরাহর এহরাম করার জন্য যায় এবং যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন উট কুরবানী করে। যাদের এই সামর্থ্য নেই, তারা যেন ভেড়া জবেহ করে। যাদের এতটুকু সামর্থ্যও নেই তারা নিজেদের সাধ্যমত দান- সদাকাহ করবে। তাঁর আহবানে সবাই পায়ে হেঁটে তানঈমে যান এবং সেখান থেকে উমরাহর এহরাম বাঁধেন। তাঁরা আল্লাহর শোকরিয়া স্বরূপ এই উমরাহ করেন। ঐ দিনের চাইতে বেশী দাস মুক্তি, উট ও ভেড়া-বকরী জবেহ এবং সদকা অন্য কোন দিন হতে দেখা যায়নি। সে দিন ইবনে যোবায়ের (রা) একশ'টি উট জবেহ করেছেন।
আযরাকী ইবনে খায়সাম থেকে আরো উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আতা বিন আবি রেবাহ, মুজাহিদ এবং আবদুল্লাহ বিন কাসীরুদ্দায়ী ২৯ শে রমযানের রাত্রিতে তানঈমে গিয়ে এহরাম বেঁধে আসতেন।
ইমাম শাফেঈ (রা) বলেন, জোরানা থেকে এহরাম বাঁধা উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই সেখান থেকে এহরাম বেঁধেছেন। তারপর উত্তম হচ্ছে, তানঈম থেকে এহরাম বাঁধা। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) আয়েশাকে সেখান থেকে এহরাম বাঁধার নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর হচ্ছে হোদায়বিয়া। কেননা, রাসূলুল্লাহ (স) সেখান দিয়ে হারামে ঢুকতে চেয়েছেন এবং পরে সেখানেই হালাল হয়ে যান।
তানঈমে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দু'জন বড় সাহাবী শহীদ হন। তাঁরা হচ্ছেন, যায়েদ বিন দাসেনা এবং খোবাইব বিন আদী। ঐ দু'জন সাহাবী "আসহাবুর রাজীই" এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁদের ৬ জনের ৪ জনকেই শহীদ করা হয়েছে। হোজাইল গোত্র তাদের দু'জনকে মক্কার কোরাইশদের কাছে তাদের গোত্রের আটক লোকদের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। ইবনে ইসহাক বলেন, যায়েদ বিন দাসেনাকে সাফওয়ান বিন উমাইয়া, তার পিতা উমাইয়া বিন খালাফের হত্যার প্রতিশোধের জন্য কিনে নেয়।
সাফওয়ান বিন উমাইয়া নিজ গোলাম নিসতাসকে নির্দেশ দিল যায়েদ বিন দাসেনাকে হত্যার জন্য হারাম এলাকার বাইরে তানঈমে নিয়ে যেতে। সেখানে মক্কার কোরাইশদের একটি দল একত্রিত হল। এদের মধ্যে আবু সুফিয়ান বিন হারবও ছিল। যায়েদকে হত্যার আগে আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করল, হে যায়েদ, তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তোমার স্থানে যদি এখন আমাদের হাতে মুহাম্মাদ থাকত তাহলে তুমি নিজ পরিবারে বাস করা অবস্থায় তাকে হত্যা করা কি পছন্দ করতে? যায়েদ উত্তরে বলেন: আল্লাহর কসম! হযরত মুহাম্মাদ (সা) বর্তমানে যে অবস্থায় আছেন সে অবস্থায় আমি আমার নিজ পরিবারে বাস করার সময়ে তাঁর গায়ে একটা কাঁটা লাগুক সেটাও পছন্দ করবো না। তারপর আবু সুফিয়ান বলল, আমি কাউকে মুহাম্মদকে তার সাহাবীরা যেরূপ ভালবাসে তার চাইতে বেশী ভালবাসতে দেখিনি। তারপর নিসতাস তাঁকে সেখানে হত্যা করে।
ইবনে ইসহাক বলেন, খোবাইবকে হোজাইর বিন আবি আহাব তামীমী ক্রয় করে এবং তানঈমে শুলবিদ্ধ করে হত্যার জন্য নিয়ে আসে। তাঁকে সেখানে শহীদ করা হয়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00