📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 নাখলা

📄 নাখলা


মক্কা ও তায়েফের মাঝে নাখলা উপত্যকা অবস্থিত। মক্কা থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে, পুরাতন তায়েফ রোডে, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এই উপত্যকায় মানুষের বসতি তেমন একটা নেই। বর্তমানে সেখানে অল্প সংখ্যক লোক বাস করে। তবে এতে বর্তমানে কৃষিকাজ হয়। নাখলা অর্থ খেজুর গাছ। বর্তমানের কৃষিকাজ দ্বারা প্রামাণ হয় যে, অতীতে সম্ভবতঃ এখানে খেজুর বাগান ছিল। এই জন্যই হয়তো এর নামকরণ করা হয়েছে নাখলা। এই জায়গাটি মিষ্টি পানির কূপের জন্য প্রসিদ্ধ। নাখলা একটি ঐতিহাসিক স্থান। আল্লাহর অন্যতম সৃষ্টি জিনদের কুরআন শুনার ঘটনা এখানে সংঘটিত হয়েছিল।
সূরা জিনের মধ্যে আল্লাহ বলেছেন যে, একদল জিন রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে কুরআন মজীদ শুনেছে। নবী করীম (সা) এর নবুওয়াত লাভের পূর্বে, উচ্চতর জগতের খবরাখবর জানার জন্য জিনেরা আকাশ লোক হতে কিছু একটা জানাশুনার কোন না কোন একটি সুযোগ পেয়ে যেত। কিন্তু পরে তারা সহসা দেখতে পেল যে, চারদিকে ফেরেশতাদের অত্যন্ত কড়া প্রহরা দাঁড়িয়ে গেছে। আর একই সাথে তাদের উপর অগ্নিপিন্ড বর্ষিত হচ্ছে। কোথাও দাঁড়িয়ে কান লাগিয়ে কিছু একটা শুনে নেয়ার স্থান তারা পাচ্ছে না। পৃথিবীতে এমন কি ঘটে গেল যে, এরকম কঠিন ব্যবস্থাপনা গৃহীত হল! এই প্রশ্নের উত্তর জানার উদ্দেশ্যে জিনদের বিভিন্ন দল চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। বুখারী ও মুসলিম শরীফে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে উকাজ বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে নাখলা নামক স্থানে তিনি ফজরের নামায পড়ান। তখন তথ্যানুসন্ধানী জিনদের একটি দল নাখলা এলাকা অতিক্রম করে যাওয়ার সময় কুরআন পাকের আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়াল এবং মনোযোগ দিয়ে কুরআন শুনল। সম্ভবতঃ এই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াতের প্রথম দিকে সংঘটিত হয়েছিল। সূরা জিনে বহু সংখ্যক কাফের ও মোশরেক জিনের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে যে, কুরআন শুনার পর তারা মুসলমান হল। নবীর আগমনের কারণে আকাশের খবর চুরি বন্ধ হওয়ার ঘটনা দ্বারা মনে হয় যে, এই ঘটনা রাসূলুল্লাহর (সা) এর নবুওয়াতের প্রাথমিক সময়ের ঘটনা। সূরা জিনের প্রথমে এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
সূরায়ে আহকাফের মধ্যেও জিনদের কুরআন শোনার আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হিজরতের তিন বছর পূর্বে, ১০ম হিজরীতে, রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ যান এবং সেখানে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। কিন্তু সেখান থেকে ব্যর্থ ও নির্যাতিত হয়ে মক্কা ফিরে আসার পথে নাখলায় জিনেরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সফরসঙ্গী ছিলেন যায়েদ বিন হারেসা (রা)। ঐ জিনেরা হযরত মুসা (আ) এর অনুসারী ছিল বলে সূরা আহকাফের ২৯-৩২ আয়াতে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। এই দুটো ঘটনা কি পৃথক পৃথক ঘটনা না একই ঘটনা, এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, দুটো পৃথক পৃথক ঘটনা।
জিনদের কুরআন শুনা এবং মুসলমান হওয়ায় ঘটনা দুটো ঐতিহাসিক নাখলায় সংঘটিত হয়। বর্তমানে ঐ এলাকার কবীলা প্রধানের নাখলায় এক বিরাট সুন্দর বাড়ী রয়েছে।
নাখলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে ৮ জন সাহাবীকে সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে ক্ষুধা ও পিপাসায় অধিকতর ধৈর্যধারণকারী আবদুল্লাহ বিন জাহাসকে তোমাদের আমীর নিযুক্ত করলাম। আবদুল্লাহ বিন জাহাস রাসূলুল্লাহ (সা) এর ফুফাতো ভাই ছিলেন। পরে যায়েদ বিন হারেসার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যয়নব বিনতে জাহাশকে রাসূলুল্লাহ (সা) বিয়ে করায় আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর শ্যালকে পরিণত হন। রাসূলুল্লাহ (সা) আবদুল্লাহর হাতে একটি বদ্ধমুখ চিঠি দিয়ে বলেন, দুই দিন সফরের আগে যেন চিঠিটা খোলা না হয়। সাহাবীদের এর কাফেলা আমীরের নির্দেশ অনুযায়ী রওনা হন এবং দুইদিনের রাস্তা অতিক্রম করার পর চিঠি খুলে জানতে পারেন যে, তাঁদেরকে নাখলা যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নাখলায় পৌছে কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করা ছিল তাদের দায়িত্ব।
তারা হঠাৎ করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কোরাইশ কাফেলার সাক্ষাত পান। ফলে, তাঁরা কোরাইশ কাফেলার উপর যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাসে আক্রমণ করে বসেন এবং তাদের একজনকে হত্যা করেন, দুইজনকে আটক করেন এবং একজন ভেগে যেতে সক্ষম হয়। পরে সাহাবাদের ঐ কাফেলা দুইজন বন্দীও গনিমতের মাল নিয়ে মদীনায় হাজির হন এবং নিজেদের তৎপরতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অবগত করেন। তিনি তাঁদের এই কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমি তোমাদেরকে পাঠিয়েছি কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য, আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ করার জন্য পাঠাইনি। এতে করে সাহাবাদের ঐ কাফেলা মনে করল যে, তাঁরা ঐ কাজের জন্য ধ্বংস হয়ে যাবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর আদেশের খেলাপ করায় অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও তাদেরকে নিন্দা করেন। ফলে, তাঁরা আরো বেশী দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।
তাঁরা যখন জানতে পারলেন যে, কোরাইশরা এই ঘটনাকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তখন তাঁদের পেরেশানী আরোও বেড়ে যায়। তখন কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল হয়।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ - قُلْ قِتَالٍ فِيْهِ كَبِيرٌ وَصَدٌّ عَنْ سَبِيلِ الله وَكُفَرَبَه وَالْمَسْجِد الْحَرَامِ وَاخْرَاجُ أَهْلَهُ مَنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ - (سورة بقره : ۲۱۷)
অর্থঃ “হে, রাসূল, আপনাকে তারা পবিত্র মাসে লড়াই করা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। আপনি বলে দিন, লড়াই করা বড় গুনাহ। তবে, আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখা, আল্লাহর সাথে কুফরী করা, মসজিদে হারাম থেকে বিরত থাকা এবং সেখানকার লোকদেরকে বিতাড়িত করা আল্লাহর কাছে অপেক্ষাকৃত আরো বড় গুনাহ। হত্যা থেকে ফেতনা আরো বেশী জঘন্য।
নাখলার এ যুদ্ধই ইসলামের প্রথম যুদ্ধ, সেখানকার বিজয়ই প্রথম বিজয়, সেই মালে-গনিমতই ইসলামের প্রথম মালে-গনিমত এবং আবদুল্লাহ বিন জাহাসই ইসলামের প্রথম মুসলিম সেনাপতি। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও মুসলিম বাহিনীর ঐ কাজকে সমর্থন করেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ওসফান

📄 ওসফান


এ শব্দটি 'ওসমান' শব্দের আঙ্গিকে গঠিত। বিদায় হজ্জে এটি ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) সর্বশেষ অবতরণ স্থল। সেখান থেকে তিনি সরাসরি মক্কায় চলে আসেন। ওসফানে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) আবু বকর সিদ্দিক (রা) কে জিজ্ঞেস করেন, এটি কোন্ উপত্যকা! রাসূলুল্লাহ (সা) জানতেন যে, এটি কোন্ উপত্যকা। তারপরও তিনি এর গুরুত্ব বুঝাবার জন্য প্রশ্ন করেন। আবু বকর (রা) জবাবে বলেন, এটি ওসফান উপত্যকা। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন-
لَقَدْ مَرَّ بِهِ هُودٌ وَصَالِحٌ عَلَى بَكَرَيْنِ أَحْمَرَيْنِ خِطَامُهُمَا اللَّيْفُ يُلَبُّونَ يَحُبُّونَ وَفِي رَوَايَةٍ لَقَدْ مَرَّبِهِ نُوحٍ وَهُودٌ وَأَبْرَاهِيمُ .
অর্থঃ ইতিপূর্বে আল্লাহর নবী হযরত হুদ এবং সালেহ (আ) ও দু'টো যুবক লাল উটের পিঠে আরোহণ করে এ উপত্যকা অতিক্রম করেন। তাদের উটের লাগাম ছিল খেজুর গাছের ছালের তৈরি। তাঁরা তালবিয়া পড়া অবস্থায় হজ্জের উদ্দেশ্যে এ উপত্যকা পাড়ি দিয়ে মক্কা পৌঁছেন। আরেক বর্ণনায় এসেছে, এ উপত্যকা দিয়ে নূহ, হুদ এবং ইবরাহীম (আ) অতিক্রম করেন। রাসূলুল্লাহ সহ মোট ৫জন নবী এ উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করায় উপত্যকাটি একটি বরকতপূর্ণ ঐতিহাসিক উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মক্কা ও জিদ্দা থেকে ওসফান পর্যন্ত বিরাট রাস্তা নির্মিত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00