📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা 📄 হোনাইন

📄 হোনাইন


নগর অভিধানের লেখক ইয়াকুত হামাওয়ী লিখেছেন, হোনাইন শব্দ 'হানান' শব্দ থেকে এসেছে। এর নামকরণ করা হয়েছে হোনাইন বিন কানিয়া বিন মাহলাইল এর নামানুসারে। তাঁর মতে সম্ভবতঃ হোনাইন আমালিকা সম্প্রদায়ের লোক ছিল। পবিত্র কুরআন মজীদে এই 'হোনাইন' এর উল্লেখ এসেছে।
এই স্থানটি মক্কা থেকে কাছে। কেউ বলেছেন, এটি তয়েফের দিকে একটি উপত্যকার নাম। আবার কেউ বলেছেন, এটি জুল-মাজায উপত্যকার পাশে অবস্থিত। ওয়াকেদী বলেছেন, মক্কা থেকে এর দূরত্ব হচ্ছে তিন রাত্রির পথ। কারো কারো মতে এটি মক্কা থেকে ১০-১৯ মাইল দূরত্বে অবস্থিত।
সহীহ আল-আখবারের লেখক বলেছেন, হোনাইনের সঠিক অবস্থান জানার ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করতে করতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। বর্তমান যুগের বই পুস্তক থেকে জানা যায়, কেউ কেউ বলেছেন যে, এটি বর্তমানে শারায়ে' উপত্যকা নামে পরিচিত এবং মক্কা থেকে ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। এটিই বেশী ঠিক বলে মনে হয়। এটা যদি হুবহু হোনাইন নাও হয়ে থাকে তবে, হোনাইন যে এর দক্ষিণে নিকটবর্তী উপত্যকায় অবস্থিত তা অনেকটা নিঃসন্দেহ। কারণ, তাহলে সেটি জুলমাজায উপত্যকার নিকটবর্তী হয়। ঐ ময়দানেই হোনাইন যুদ্ধ সংঘঠিত হয় এবং মুসলমানরা সেখান থেকে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসে।
হোনাইন যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের পর জানতে পারলেন যে, হাওয়াযেন গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং গোত্র প্রধান মালেক বিন আওফ যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। নসর, জসম এবং সাকীফ গোত্র তাদের সাথে যোগ দেয় ও সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাহিনীর দিকে এগুতে থাকে এবং ময়দানে দৃঢ়ভাবে টিকে থাকার জন্য নিজেদের অর্থ-সম্পদ এবং নারী-শিশুদেরকে সাথে নিয়ে আসে যাতে করে কেউ ভেগে না যায়।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধের ঘোষণা দেন এবং মদীনা থেকে আগত ১০ হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাথে মক্কার আরো ২ হাজার নওমুসলিম যোগ দেয়। মুসলমানরা অতীতের যে কোন যুদ্ধের সৈন্য সংখ্যা থেকে এই সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব বোধ করে। ৮ই হিজরীর ১০ শাওয়ালের ভোরে মুসলমানরা ময়দানে হোনাইনে উপস্থিত হয়।
হাওয়াযেন গোত্র ছিল দক্ষ তীরন্দাজ। তারা মুসলমানদের আগেই হোনাইন উপত্যকার পাহাড় ও গিরিপথসমূহে অবস্থান নেয় এবং মুসলমানদের উপর একযোগে আক্রমণ শুরু করে। অতর্কিত আক্রমণের ফলে মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে ছুটাছুটি করতে থাকে এবং উহুদ যুদ্ধের মত পর্যুদস্ত অবস্থার শিকার হয়। ঐ কঠিন মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পার্শ্বে অল্প কিছু সংখ্যক সাহাবী উপস্থিত ছিলেন এবং হযরত আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর খচ্চরের লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) নির্ভিক চিত্তে দাঁড়িয়ে নিম্নের কাব্যাংশ আবৃত্তি করেন।
أَنَا النَّبِيُّ لا كَذِبُ أَنَابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ .
অর্থ : 'আমি মিথ্যা কোন নবী নই এবং আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।'
আল্লাহ মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের অহংকারের কারণে তাদেরকে প্রয়োজনমত শাস্তি দান শেষ করে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন করে মুসলমানদের পক্ষে এনে দেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর প্রশান্তি নাযিল করেন। মুসলমানরা যখন ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হে আব্বাস, মুসলমানদেরকে একত্রিত হওয়ার আহবান জানান। হযরত আব্বাসের আওয়ায বুলন্দ ছিল। তাঁর আওয়ায শুনে মুসলমানরা রাসূলুল্লাহর (সা) পার্শ্বে জড় হল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী মোশরেকদের একটি দলের উপর রাসূলুল্লাহ (সা) বালু নিক্ষেপ করায় তারা রাসূলুল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। মুসলমানরা যখন পুনরায় পূর্ণ উদ্যোগে লড়াই শুরু করল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু পাথরের টুকরা কাফেরদের মুখের দিকে নিক্ষেপ করার পর থেকে তারা পরাজিত হতে থাকল। অবশেষে হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা বন্দী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট আসতে লাগল। আল্লাহ ঐ যুদ্ধে ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করেন।
এই যুদ্ধের ফলে, গোটা আরবে ইসলাম বিরোধী শক্তির মূলোৎপাটন হয়। হোনাইন যুদ্ধের কয়েদী এবং মালে গনীমত নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) জো'রানায় অবস্থান করেন। হোনাইনের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে অনেক যুদ্ধবন্দী, ৬ হাজার উট, ২৪ হাজার দুম্বা, ৪০ হাজারের বেশী ভেড়া-বকরী এবং ৪ হাজার রৌপ্য মুদ্রা মালে গনীমত হস্তগত হয়। এটা ছিল মুসলমানদের সবচেয়ে বড় মালে গনীমত। রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধের ময়দানে কোন সহকারী নারী, শিশু, এবং দাস-দাসী হত্যার জন্য নিষেধ করেন। হোনাইনের নিহত একজন মহিলার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। এই যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেন,
لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حَنَيْنٍ إِذَاعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلُو كَثُرَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُّدْبِرِينَ ثُمَّ أَنْزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعَذَبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ - (سورة توبه : ٢٦-٢٥)
অর্থ: 'আল্লাহ তোমাদেরকে হোনাইনসহ আরো বহু স্থানে সাহায্য করেছেন। যখন তোমরা সংখ্যাধিক্যের গর্ব-অহংকার বোধ করছিলে, তখন সংখ্যা বেশী থাকার কারণেও কোন লাভ হয়নি। বরং যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বে তা তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে এসেছিল এবং তোমরা পশ্চাদপসরণ শুরু করেছিলে। তারপর আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মোমেনদের উপর রহমত নাযিল করেন এবং এমন সৈন্য পাঠান যা তোমরা দেখতে পাওনি। তিনি কাফেরদেরকে শাস্তি দেন। আর এটাই হচ্ছে কাফেরদের প্রতিদান।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা 📄 জো’রানা : রাসূলুল্লাহর (সা) উমরাহ

📄 জো’রানা : রাসূলুল্লাহর (সা) উমরাহ


মক্কা বিজয়ের পর হোনাইন যুদ্ধ শেষে, রাসূলুল্লাহ (সা) এই স্থান থেকে উমরাহর এহরাম বাঁধেন। এটি পুরাতন তায়েফ রোডের পার্শ্বে, ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। মক্কাবাসীদের রমযানে অনেকে এই জায়গা থেকেই উমরাহর এহরাম বাঁধে। সেখানে বর্তমানে একটি সুন্দর মসজিদ আছে। এটাকে 'মসজিদে রাসূল' বলা হয়। হোনাইন যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (সা) এই জায়গায় হাওয়াযেন ও সাকীফ গোত্রের মালে গনীমত বন্টন করেন এবং ১৫ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে নামায-দোয়া-তাসবীহ আদায় করেন। মসজিদের একটি সুন্দর মিনারা আছে। জোরানা হচ্ছে, কোরাইশ বংশের রাতা বিনতে কাব নামক মহিলার উপাধি। তার সম্পর্কেই কুরআনের নিন্মোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
وَلَا تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ - (سوره نحل : ۹۲)
'তোমরা ঐ মহিলার মত হয়ো না যে পরিশ্রমের পর কাটা সূতো টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে ফেলে।'
রাসূলুল্লাহ (সা) ৮ হিজরীর ১৭ই জিলকদ সেখান থেকে এহরাম পরেন। মক্কার পার্শ্ববর্তী যে সকল এলাকা থেকে লোকেরা উমরাহর এহরাম পরে, জোরানা হচ্ছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মীকাত। কেননা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) সেখান থেকে এহরাম পরেছেন। এটা হচ্ছে ইমাম শাফেঈ, মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের মত।
জোরানায় একটি পুরাতন মিষ্টি পানির কূপ ছিল। কথিত, রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ কূপের পানি পান করেছেন। ঐ পানি খনিজ পানির মত উপকারী। ঐ পানি কিডনী এবং প্রস্রাব যন্ত্রণার জন্য পরীক্ষিত ওষুধ স্বরূপ। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন যে, আব্বাসী খলীফারা এই পানি বাগদাদে নিয়ে ব্যবহার করেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা 📄 নাখলা

📄 নাখলা


মক্কা ও তায়েফের মাঝে নাখলা উপত্যকা অবস্থিত। মক্কা থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে, পুরাতন তায়েফ রোডে, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এই উপত্যকায় মানুষের বসতি তেমন একটা নেই। বর্তমানে সেখানে অল্প সংখ্যক লোক বাস করে। তবে এতে বর্তমানে কৃষিকাজ হয়। নাখলা অর্থ খেজুর গাছ। বর্তমানের কৃষিকাজ দ্বারা প্রামাণ হয় যে, অতীতে সম্ভবতঃ এখানে খেজুর বাগান ছিল। এই জন্যই হয়তো এর নামকরণ করা হয়েছে নাখলা। এই জায়গাটি মিষ্টি পানির কূপের জন্য প্রসিদ্ধ। নাখলা একটি ঐতিহাসিক স্থান। আল্লাহর অন্যতম সৃষ্টি জিনদের কুরআন শুনার ঘটনা এখানে সংঘটিত হয়েছিল।
সূরা জিনের মধ্যে আল্লাহ বলেছেন যে, একদল জিন রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে কুরআন মজীদ শুনেছে। নবী করীম (সা) এর নবুওয়াত লাভের পূর্বে, উচ্চতর জগতের খবরাখবর জানার জন্য জিনেরা আকাশ লোক হতে কিছু একটা জানাশুনার কোন না কোন একটি সুযোগ পেয়ে যেত। কিন্তু পরে তারা সহসা দেখতে পেল যে, চারদিকে ফেরেশতাদের অত্যন্ত কড়া প্রহরা দাঁড়িয়ে গেছে। আর একই সাথে তাদের উপর অগ্নিপিন্ড বর্ষিত হচ্ছে। কোথাও দাঁড়িয়ে কান লাগিয়ে কিছু একটা শুনে নেয়ার স্থান তারা পাচ্ছে না। পৃথিবীতে এমন কি ঘটে গেল যে, এরকম কঠিন ব্যবস্থাপনা গৃহীত হল! এই প্রশ্নের উত্তর জানার উদ্দেশ্যে জিনদের বিভিন্ন দল চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। বুখারী ও মুসলিম শরীফে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে উকাজ বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে নাখলা নামক স্থানে তিনি ফজরের নামায পড়ান। তখন তথ্যানুসন্ধানী জিনদের একটি দল নাখলা এলাকা অতিক্রম করে যাওয়ার সময় কুরআন পাকের আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়াল এবং মনোযোগ দিয়ে কুরআন শুনল। সম্ভবতঃ এই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াতের প্রথম দিকে সংঘটিত হয়েছিল। সূরা জিনে বহু সংখ্যক কাফের ও মোশরেক জিনের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে যে, কুরআন শুনার পর তারা মুসলমান হল। নবীর আগমনের কারণে আকাশের খবর চুরি বন্ধ হওয়ার ঘটনা দ্বারা মনে হয় যে, এই ঘটনা রাসূলুল্লাহর (সা) এর নবুওয়াতের প্রাথমিক সময়ের ঘটনা। সূরা জিনের প্রথমে এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
সূরায়ে আহকাফের মধ্যেও জিনদের কুরআন শোনার আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হিজরতের তিন বছর পূর্বে, ১০ম হিজরীতে, রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ যান এবং সেখানে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। কিন্তু সেখান থেকে ব্যর্থ ও নির্যাতিত হয়ে মক্কা ফিরে আসার পথে নাখলায় জিনেরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সফরসঙ্গী ছিলেন যায়েদ বিন হারেসা (রা)। ঐ জিনেরা হযরত মুসা (আ) এর অনুসারী ছিল বলে সূরা আহকাফের ২৯-৩২ আয়াতে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। এই দুটো ঘটনা কি পৃথক পৃথক ঘটনা না একই ঘটনা, এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, দুটো পৃথক পৃথক ঘটনা।
জিনদের কুরআন শুনা এবং মুসলমান হওয়ায় ঘটনা দুটো ঐতিহাসিক নাখলায় সংঘটিত হয়। বর্তমানে ঐ এলাকার কবীলা প্রধানের নাখলায় এক বিরাট সুন্দর বাড়ী রয়েছে।
নাখলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে ৮ জন সাহাবীকে সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে ক্ষুধা ও পিপাসায় অধিকতর ধৈর্যধারণকারী আবদুল্লাহ বিন জাহাসকে তোমাদের আমীর নিযুক্ত করলাম। আবদুল্লাহ বিন জাহাস রাসূলুল্লাহ (সা) এর ফুফাতো ভাই ছিলেন। পরে যায়েদ বিন হারেসার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যয়নব বিনতে জাহাশকে রাসূলুল্লাহ (সা) বিয়ে করায় আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর শ্যালকে পরিণত হন। রাসূলুল্লাহ (সা) আবদুল্লাহর হাতে একটি বদ্ধমুখ চিঠি দিয়ে বলেন, দুই দিন সফরের আগে যেন চিঠিটা খোলা না হয়। সাহাবীদের এর কাফেলা আমীরের নির্দেশ অনুযায়ী রওনা হন এবং দুইদিনের রাস্তা অতিক্রম করার পর চিঠি খুলে জানতে পারেন যে, তাঁদেরকে নাখলা যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নাখলায় পৌছে কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করা ছিল তাদের দায়িত্ব।
তারা হঠাৎ করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কোরাইশ কাফেলার সাক্ষাত পান। ফলে, তাঁরা কোরাইশ কাফেলার উপর যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাসে আক্রমণ করে বসেন এবং তাদের একজনকে হত্যা করেন, দুইজনকে আটক করেন এবং একজন ভেগে যেতে সক্ষম হয়। পরে সাহাবাদের ঐ কাফেলা দুইজন বন্দীও গনিমতের মাল নিয়ে মদীনায় হাজির হন এবং নিজেদের তৎপরতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অবগত করেন। তিনি তাঁদের এই কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমি তোমাদেরকে পাঠিয়েছি কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য, আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ করার জন্য পাঠাইনি। এতে করে সাহাবাদের ঐ কাফেলা মনে করল যে, তাঁরা ঐ কাজের জন্য ধ্বংস হয়ে যাবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর আদেশের খেলাপ করায় অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও তাদেরকে নিন্দা করেন। ফলে, তাঁরা আরো বেশী দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।
তাঁরা যখন জানতে পারলেন যে, কোরাইশরা এই ঘটনাকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তখন তাঁদের পেরেশানী আরোও বেড়ে যায়। তখন কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল হয়।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ - قُلْ قِتَالٍ فِيْهِ كَبِيرٌ وَصَدٌّ عَنْ سَبِيلِ الله وَكُفَرَبَه وَالْمَسْجِد الْحَرَامِ وَاخْرَاجُ أَهْلَهُ مَنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ - (سورة بقره : ۲۱۷)
অর্থঃ “হে, রাসূল, আপনাকে তারা পবিত্র মাসে লড়াই করা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। আপনি বলে দিন, লড়াই করা বড় গুনাহ। তবে, আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখা, আল্লাহর সাথে কুফরী করা, মসজিদে হারাম থেকে বিরত থাকা এবং সেখানকার লোকদেরকে বিতাড়িত করা আল্লাহর কাছে অপেক্ষাকৃত আরো বড় গুনাহ। হত্যা থেকে ফেতনা আরো বেশী জঘন্য।
নাখলার এ যুদ্ধই ইসলামের প্রথম যুদ্ধ, সেখানকার বিজয়ই প্রথম বিজয়, সেই মালে-গনিমতই ইসলামের প্রথম মালে-গনিমত এবং আবদুল্লাহ বিন জাহাসই ইসলামের প্রথম মুসলিম সেনাপতি। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও মুসলিম বাহিনীর ঐ কাজকে সমর্থন করেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা 📄 ওসফান

📄 ওসফান


এ শব্দটি 'ওসমান' শব্দের আঙ্গিকে গঠিত। বিদায় হজ্জে এটি ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) সর্বশেষ অবতরণ স্থল। সেখান থেকে তিনি সরাসরি মক্কায় চলে আসেন। ওসফানে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) আবু বকর সিদ্দিক (রা) কে জিজ্ঞেস করেন, এটি কোন্ উপত্যকা! রাসূলুল্লাহ (সা) জানতেন যে, এটি কোন্ উপত্যকা। তারপরও তিনি এর গুরুত্ব বুঝাবার জন্য প্রশ্ন করেন। আবু বকর (রা) জবাবে বলেন, এটি ওসফান উপত্যকা। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন-
لَقَدْ مَرَّ بِهِ هُودٌ وَصَالِحٌ عَلَى بَكَرَيْنِ أَحْمَرَيْنِ خِطَامُهُمَا اللَّيْفُ يُلَبُّونَ يَحُبُّونَ وَفِي رَوَايَةٍ لَقَدْ مَرَّبِهِ نُوحٍ وَهُودٌ وَأَبْرَاهِيمُ .
অর্থঃ ইতিপূর্বে আল্লাহর নবী হযরত হুদ এবং সালেহ (আ) ও দু'টো যুবক লাল উটের পিঠে আরোহণ করে এ উপত্যকা অতিক্রম করেন। তাদের উটের লাগাম ছিল খেজুর গাছের ছালের তৈরি। তাঁরা তালবিয়া পড়া অবস্থায় হজ্জের উদ্দেশ্যে এ উপত্যকা পাড়ি দিয়ে মক্কা পৌঁছেন। আরেক বর্ণনায় এসেছে, এ উপত্যকা দিয়ে নূহ, হুদ এবং ইবরাহীম (আ) অতিক্রম করেন। রাসূলুল্লাহ সহ মোট ৫জন নবী এ উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করায় উপত্যকাটি একটি বরকতপূর্ণ ঐতিহাসিক উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মক্কা ও জিদ্দা থেকে ওসফান পর্যন্ত বিরাট রাস্তা নির্মিত হয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية