📄 হোদায়বিয়া
হোদায়বিয়ার বর্তমান নাম হচ্ছে শোমাইসী। খাত্তাবী বলেছেন, হোদায়বিয়াকে হোদায়বিয়া বলার কারণ হচ্ছে সেখানে হাদবা নামক গাছ ছিল। হোদায়বিয়া থেকে সামান্য আগে মক্কার দিকে হুদুদে হারামের পিলার বসানো আছে। ঐ পিলার থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব হচ্ছে ২১ কিলোমিটার। হোদায়বিয়া হারাম এলাকার ভেতর না বাইরে, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে সহীহ মত অনুযায়ী এর অর্ধেক হারাম এলাকার ভেতর আর বাকী অর্ধেক হারাম এলাকার বাইরে।
হোদায়বিয়ায় একটি পুরাতন মসজিদ ছিল। কথিত আছে যে, মসজিদটি হোদায়বিয়ার বাইআত যে গাছের নীচে হয়েছিল সেখানেই নির্মিত হয়েছিল অথবা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) শিবির স্থাপন করেছিলেন সেখানে নির্মিত হয়েছিল। তারপর সেখানকার মসজিদটি ভেঙ্গে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাও ভেঙ্গে ফেলা হয়।
হোদায়বিয়া হচ্ছে সেই স্থান যেখানে ৬ষ্ঠ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে মক্কায় উমরার উদ্দেশ্যে আসার পথে অবতরণ করেন। কেননা, মক্কার কাফেররা তাঁকে উমরাহ আদায় করতে বাধা দেয়। সেখানে গাছের নীচে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে যে বাইআত গ্রহণ করেন তাকে বাইআতে রিদওয়ান বলে। আল্লাহ কুরআনে ঐ বাইআত ও গাছের কথা উল্লেখ করে বলেছেন: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا .
অর্থ: আল্লাহ মোমেনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছটির নীচে আপনার (নবীর) কাছে বাইআত গ্রহণ করছিল। আল্লাহ তাদের অন্তরের খবর জানেন। তারপর তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাদেরকে দ্রুত বিজয় দান করেন।' (আল-ফাতহ-২৮)
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এক রাত্রে স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি এবং তাঁর সাথীরা নিরাপদে মাথার চুল খাট করে এবং মুণ্ডন করে বাইতুল্লায় ঢুকেছেন। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে উমরাহ করা। তিনি মদীনা থেকে উমরার জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে এহরাম পরে বের হন এবং সাথে দমের পশু নিয়ে রওনা হন। যুদ্ধ করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন উসফান পৌঁছেন তখন, মুসলমানদের গুপ্তচর বিসার বিন সুফিয়ান কাবী রাসূলুল্লাহ (সা) কে খবর দেন যে, মক্কার কোরাইশরা জু-তওয়ায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে এবং খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কোরাউল গামীমে অশ্বারোহী বাহিনীকে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা যে কোন মূল্যে আপনাকে মক্কা প্রবেশে বাধা দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ খবর পেয়ে মক্কার রাস্তা পরিবর্তন করে হোদায়বিয়ায় উপস্থিত হন। সানিয়াতুল মেরারে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর উট বসে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তাকে মক্কায় আবরাহার হস্তীবাহিনীকে আটককারী শক্তিই আটক করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) পরে হোদায়বিয়ায় অবতরণের নির্দেশ দেন। সেখানে কোন পানি ছিল না। পুরাতন একটি কূপে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি তীর নিক্ষেপ করেন। ফলে, এতে পানি নির্গত হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সকল সাথী-সঙ্গী এবং উটের পানির চাহিদা পূর্ণ হয়। কোরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দূত বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে হযরত উসমানকে মধ্যস্থতার জন্য মক্কায় পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে তার ফিরতে দেরী হওয়ায় গুজব রটে যে, মক্কার কাফেরগণ তাঁকে হত্যা করেছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহর হাতে উসমান হত্যার প্রতিশোধের জন্যে মৃত্যুর আইআত গ্রহণ করেন। পরে হযরত উসমান নির্বিঘ্নে ফিরে আসেন।
সবশেষে মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে ১০ বছরের একটি সন্ধি চুক্তি হয়। চুক্তির বাহ্যিক শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ছিল। কিন্তু এর অভ্যন্তরে প্রকাশ্য বিজয় লুকিয়ে ছিল। এই সন্ধিই পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) সহ সবাই হোদায়বিয়ায় চুল খাট করে কিংবা মুণ্ডন করে এহরামমুক্ত হন এবং মদীনা ফেরত যান। চুক্তি অনুাযায়ী পরের বছর তিনি ও তাঁর সাথীরা কাজা ওমরাহ আদায় করেন। হোদায়বিয়ার পশ্চিমে শেষপ্রান্তে বর্তমানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে, তাতে সুন্দর মিনারাও রয়েছে।
📄 ওয়াদী ফাতেমা : মক্কা বিজয়ের সময় মুসলিম বাহিনীর অবতরণস্থল
এটি মক্কা বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর অবতরণ স্থল। খোজাআ গোত্রের ফাতেমা নামক মহিলার নামানুসারে এ উপত্যকার নামকরণ করা হয় ওয়াদী ফাতেমা বা ফাতেমা উপত্যকা। তিনি খুব সাহসী মহিলা ছিলেন। তিনি উপত্যকার অধিবাসীদের জানমাল লুটপাট থেকে রক্ষার জন্য বীরত্বের পরিচয় দেন। ওয়াদী ফাতেমা মক্কার উত্তরে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এর সাবেক নাম হচ্ছে মাররুজ জাহরান (مَرّ الظَّهران)। এই উপত্যকায় বহু ঝর্ণা ও খেজুর বাগান ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এতে অসংখ্য কূপ খনন করে পানি উঠানোর কারণে ঝর্ণাগুলো শুকিয়ে গেছে। ঐ উপত্যকা থেকে পাইপের মাধ্যমে জেদ্দা সহ অন্যান্য জায়গায় পানি সরবরাহ করেন। এখন এই উপত্যকাবাসীদেরই অন্য স্থান থেকে পানি আনতে হয়। এই উপত্যকা আজকে পুরো আবাদ এবং এখানে আধুনিক জীবন যাত্রার সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। এই উপত্যকায় বর্তমানে অনেকগুলো গ্রাম আছে। তার মধ্যে জমুম হচ্ছে বেশী প্রসিদ্ধ। এ ছাড়াও এতে, আবু উরওয়া, আবু শোয়াইব, খায়ক আইনে শামস, সান্ত এবং বারাবার গ্রাম উল্লেখযোগ্য।
এই উপত্যকায় মক্কা বিজয়ের সময় মদীনা থেকে আগত মুসলিম বাহিনী অবতরণ করে রাত্রি যাপন করে। রাসূলুল্লাহ (সা) সহ সবাই এখানে নামায পড়েন এবং এখানেই আবু সুফিয়ান (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং মুসলমান হন। রাসূলুল্লাহ (সা) এখানেই আবু সুফিয়ানের সম্মানে ঘোষণা করেন যে, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।
বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) এই উপত্যকা দিয়েই মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। এই উপত্যকার উপরিভাগে, হাদা বা হাদআ নামক একটি জায়গা আছে। এখানেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর ৬ জন সাহাবীর সাথে লেহইয়ান এবং হোজাইল গোত্রের লোকেরা লড়াই করে। এই যুদ্ধকে ইসলামের ইতিহাসে اصحَاب الرَّجِیْع বা রাজীই যুদ্ধ বলা হয়।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, উহুদ যুদ্ধের পর আ'দল এবং কারা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে অনুরোধ করে যে, তাদের মধ্যে অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারা বলে, আমাদের সাথে আপনার সাহাবাদের একটি দলকে পাঠান যেন তারা আমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেন, কুরআন পড়ান এবং ইসলামের আইন-কানুন বাতান। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের আহবানে (১) মোরশেদ বিন মোরশেদ গানওয়ী, (২) খালেদ বিন বোকাইর লীচি (৩) আসেম বিন সাবেত বিন আবুল আকলাহ (৪) খোবাইব বিন আ'দী, (৫) যায়েদ বিন দাসেনা এবং (৬) আবদুল্লাহ বিন তারেক (রা) কে তাদের সাথে পাঠান এবং মোরশেদ বিন মোরশেদকে তাদের আমীর করেন।
তারা উল্লেখিত কওমের প্রতিনিধিদলের সাথে হাদার শুরুতেই রাজী-ই নামক স্থানে পৌঁছন। এটি হোজাইল গোত্রের নিবাস। তখন কওমের প্রতিনিধি দলটি বিশ্বাসঘাতকতা করে হোজাইল গোত্রের সাহায্য প্রার্থনা করে। সাথে সাথে হোজাইল গোত্রের লোকেরা তলোয়ার নিয়ে বের হয়। তারা ৬ জন সাহাবীকে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানিয়ে বলে, আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি করবো না। কিন্তু মোরশেদ, খালেদ এবং আসেম বলেন, মোশরেকদের প্রতিশ্রুতির কোন অর্থ নেই। তাই তাঁরা লড়াই করে শহীদ হন। পরে মোশরেকরা আসেমের মাথা নিতে আসলে মৌমাছি এসে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। রাত্রে এক অভাবিত বন্যা এসে আসেমের লাশ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিনি জীবদ্দশায় আল্লাহর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, কোন মোশরেক যেন তাঁর শরীর স্পর্শ করতে না পারে। হযরত উমর বলেন, আসেম মান্নত করেছিলেন যেন তাকে কোন মোশরেক স্পর্শ না করে। আল্লাহ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শরীরকে মোশরেকদের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেন।
পক্ষান্তরে, যায়েদ বিন দাসেনা, খোবাইব বিন আদী এবং আবদুল্লাহ বিন তারেক মোশরেকদের হাতে বন্দী হন। কিন্তু ওয়াদী ফাতিমায় এসে আবদুল্লাহ বিন তারেক নিজের হাতের রশি খুলে তলোয়ার হাতে নেন এবং মোশারেকদের সাথে লড়াই শুরু করেন। পরে গাদ্দার কওম তাঁকে পাথর মেরে শহীদ করে দেয়। তাঁকে ওয়াদী ফাতিমায় দাফন করা হয়।
এ দিকে হযরত খোবাইব (রা) কে হোজাইর বিন আবি আহাব তামীমী এবং যায়েদকে সাফওয়ান বিন উমাইয়া ক্রয় করে। সবশেষে, হযরত যায়েদ এবং খোবাইবকে মক্কার তানইমে হত্যা ও শূলবিদ্ধ করে শহীদ করা হয়।
📄 হোনাইন
নগর অভিধানের লেখক ইয়াকুত হামাওয়ী লিখেছেন, হোনাইন শব্দ 'হানান' শব্দ থেকে এসেছে। এর নামকরণ করা হয়েছে হোনাইন বিন কানিয়া বিন মাহলাইল এর নামানুসারে। তাঁর মতে সম্ভবতঃ হোনাইন আমালিকা সম্প্রদায়ের লোক ছিল। পবিত্র কুরআন মজীদে এই 'হোনাইন' এর উল্লেখ এসেছে।
এই স্থানটি মক্কা থেকে কাছে। কেউ বলেছেন, এটি তয়েফের দিকে একটি উপত্যকার নাম। আবার কেউ বলেছেন, এটি জুল-মাজায উপত্যকার পাশে অবস্থিত। ওয়াকেদী বলেছেন, মক্কা থেকে এর দূরত্ব হচ্ছে তিন রাত্রির পথ। কারো কারো মতে এটি মক্কা থেকে ১০-১৯ মাইল দূরত্বে অবস্থিত।
সহীহ আল-আখবারের লেখক বলেছেন, হোনাইনের সঠিক অবস্থান জানার ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করতে করতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। বর্তমান যুগের বই পুস্তক থেকে জানা যায়, কেউ কেউ বলেছেন যে, এটি বর্তমানে শারায়ে' উপত্যকা নামে পরিচিত এবং মক্কা থেকে ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। এটিই বেশী ঠিক বলে মনে হয়। এটা যদি হুবহু হোনাইন নাও হয়ে থাকে তবে, হোনাইন যে এর দক্ষিণে নিকটবর্তী উপত্যকায় অবস্থিত তা অনেকটা নিঃসন্দেহ। কারণ, তাহলে সেটি জুলমাজায উপত্যকার নিকটবর্তী হয়। ঐ ময়দানেই হোনাইন যুদ্ধ সংঘঠিত হয় এবং মুসলমানরা সেখান থেকে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসে।
হোনাইন যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের পর জানতে পারলেন যে, হাওয়াযেন গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং গোত্র প্রধান মালেক বিন আওফ যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। নসর, জসম এবং সাকীফ গোত্র তাদের সাথে যোগ দেয় ও সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাহিনীর দিকে এগুতে থাকে এবং ময়দানে দৃঢ়ভাবে টিকে থাকার জন্য নিজেদের অর্থ-সম্পদ এবং নারী-শিশুদেরকে সাথে নিয়ে আসে যাতে করে কেউ ভেগে না যায়।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধের ঘোষণা দেন এবং মদীনা থেকে আগত ১০ হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাথে মক্কার আরো ২ হাজার নওমুসলিম যোগ দেয়। মুসলমানরা অতীতের যে কোন যুদ্ধের সৈন্য সংখ্যা থেকে এই সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব বোধ করে। ৮ই হিজরীর ১০ শাওয়ালের ভোরে মুসলমানরা ময়দানে হোনাইনে উপস্থিত হয়।
হাওয়াযেন গোত্র ছিল দক্ষ তীরন্দাজ। তারা মুসলমানদের আগেই হোনাইন উপত্যকার পাহাড় ও গিরিপথসমূহে অবস্থান নেয় এবং মুসলমানদের উপর একযোগে আক্রমণ শুরু করে। অতর্কিত আক্রমণের ফলে মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে ছুটাছুটি করতে থাকে এবং উহুদ যুদ্ধের মত পর্যুদস্ত অবস্থার শিকার হয়। ঐ কঠিন মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পার্শ্বে অল্প কিছু সংখ্যক সাহাবী উপস্থিত ছিলেন এবং হযরত আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর খচ্চরের লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) নির্ভিক চিত্তে দাঁড়িয়ে নিম্নের কাব্যাংশ আবৃত্তি করেন।
أَنَا النَّبِيُّ لا كَذِبُ أَنَابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ .
অর্থ : 'আমি মিথ্যা কোন নবী নই এবং আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।'
আল্লাহ মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের অহংকারের কারণে তাদেরকে প্রয়োজনমত শাস্তি দান শেষ করে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন করে মুসলমানদের পক্ষে এনে দেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর প্রশান্তি নাযিল করেন। মুসলমানরা যখন ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হে আব্বাস, মুসলমানদেরকে একত্রিত হওয়ার আহবান জানান। হযরত আব্বাসের আওয়ায বুলন্দ ছিল। তাঁর আওয়ায শুনে মুসলমানরা রাসূলুল্লাহর (সা) পার্শ্বে জড় হল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী মোশরেকদের একটি দলের উপর রাসূলুল্লাহ (সা) বালু নিক্ষেপ করায় তারা রাসূলুল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। মুসলমানরা যখন পুনরায় পূর্ণ উদ্যোগে লড়াই শুরু করল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু পাথরের টুকরা কাফেরদের মুখের দিকে নিক্ষেপ করার পর থেকে তারা পরাজিত হতে থাকল। অবশেষে হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা বন্দী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট আসতে লাগল। আল্লাহ ঐ যুদ্ধে ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করেন।
এই যুদ্ধের ফলে, গোটা আরবে ইসলাম বিরোধী শক্তির মূলোৎপাটন হয়। হোনাইন যুদ্ধের কয়েদী এবং মালে গনীমত নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) জো'রানায় অবস্থান করেন। হোনাইনের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে অনেক যুদ্ধবন্দী, ৬ হাজার উট, ২৪ হাজার দুম্বা, ৪০ হাজারের বেশী ভেড়া-বকরী এবং ৪ হাজার রৌপ্য মুদ্রা মালে গনীমত হস্তগত হয়। এটা ছিল মুসলমানদের সবচেয়ে বড় মালে গনীমত। রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধের ময়দানে কোন সহকারী নারী, শিশু, এবং দাস-দাসী হত্যার জন্য নিষেধ করেন। হোনাইনের নিহত একজন মহিলার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। এই যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেন,
لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حَنَيْنٍ إِذَاعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلُو كَثُرَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُّدْبِرِينَ ثُمَّ أَنْزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعَذَبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ - (سورة توبه : ٢٦-٢٥)
অর্থ: 'আল্লাহ তোমাদেরকে হোনাইনসহ আরো বহু স্থানে সাহায্য করেছেন। যখন তোমরা সংখ্যাধিক্যের গর্ব-অহংকার বোধ করছিলে, তখন সংখ্যা বেশী থাকার কারণেও কোন লাভ হয়নি। বরং যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বে তা তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে এসেছিল এবং তোমরা পশ্চাদপসরণ শুরু করেছিলে। তারপর আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মোমেনদের উপর রহমত নাযিল করেন এবং এমন সৈন্য পাঠান যা তোমরা দেখতে পাওনি। তিনি কাফেরদেরকে শাস্তি দেন। আর এটাই হচ্ছে কাফেরদের প্রতিদান।
📄 জো’রানা : রাসূলুল্লাহর (সা) উমরাহ
মক্কা বিজয়ের পর হোনাইন যুদ্ধ শেষে, রাসূলুল্লাহ (সা) এই স্থান থেকে উমরাহর এহরাম বাঁধেন। এটি পুরাতন তায়েফ রোডের পার্শ্বে, ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। মক্কাবাসীদের রমযানে অনেকে এই জায়গা থেকেই উমরাহর এহরাম বাঁধে। সেখানে বর্তমানে একটি সুন্দর মসজিদ আছে। এটাকে 'মসজিদে রাসূল' বলা হয়। হোনাইন যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (সা) এই জায়গায় হাওয়াযেন ও সাকীফ গোত্রের মালে গনীমত বন্টন করেন এবং ১৫ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে নামায-দোয়া-তাসবীহ আদায় করেন। মসজিদের একটি সুন্দর মিনারা আছে। জোরানা হচ্ছে, কোরাইশ বংশের রাতা বিনতে কাব নামক মহিলার উপাধি। তার সম্পর্কেই কুরআনের নিন্মোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
وَلَا تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ - (سوره نحل : ۹۲)
'তোমরা ঐ মহিলার মত হয়ো না যে পরিশ্রমের পর কাটা সূতো টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে ফেলে।'
রাসূলুল্লাহ (সা) ৮ হিজরীর ১৭ই জিলকদ সেখান থেকে এহরাম পরেন। মক্কার পার্শ্ববর্তী যে সকল এলাকা থেকে লোকেরা উমরাহর এহরাম পরে, জোরানা হচ্ছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মীকাত। কেননা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) সেখান থেকে এহরাম পরেছেন। এটা হচ্ছে ইমাম শাফেঈ, মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের মত।
জোরানায় একটি পুরাতন মিষ্টি পানির কূপ ছিল। কথিত, রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ কূপের পানি পান করেছেন। ঐ পানি খনিজ পানির মত উপকারী। ঐ পানি কিডনী এবং প্রস্রাব যন্ত্রণার জন্য পরীক্ষিত ওষুধ স্বরূপ। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন যে, আব্বাসী খলীফারা এই পানি বাগদাদে নিয়ে ব্যবহার করেছেন।