📄 ওয়াদী মোহাস্সার : আবরাহা বাদশাহর ধংসস্থল
মোহাস্সার উপত্যকা হচ্ছে মিনা এবং মোযদালেফার মাঝে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ৫৪৫ হাত দীর্ঘ একটি স্থানের নাম। এই জায়গায় আবরাহা বাহিনীর উপর আল্লাহর গযব নেমে আসে এবং তারা পুরো ধ্বংস হয়। মোহাস্সার শব্দের অর্থ হচ্ছে অচল ও অক্ষম হওয়া। হস্তিবাহিনীর হাতীগুলো সামনে চলতে অক্ষম হওয়ার কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে মোহস্সার।
খৃস্টানরা এই জায়গায় অকুফ করত বা অবস্থান করত। তাই হাজীদের সেই জায়গা দ্রুত পার হওয়া এবং খৃস্টানদের বিরোধিতা করা জরুরী। মুসলিম এবং আবু দাউদ শরীফে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে। নবী করীম (সা) যখন মোযদালেফা হতে মিনার দিকে রওনা হন তখন মোহাস্সার উপত্যকায় চলার গতি দ্রুত করে দেন।
ইমাম নওয়ী বলেছেন, আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংসলীলা এই স্থানেই সংঘটিত হয়েছিল। যে সকল জায়গায় আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে, সে সকল জায়গা তাড়াতাড়ি অতিক্রম করা রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিয়ম ছিল।
📄 ওয়াদী মোহাস্ছব
অনেকে মুহাস্সার এবং মোহাচ্ছাব এই দু'টো উপত্যকাকে এক মনে করেন। আসলে এদু'টো এক নয়, ভিন্ন দু'টো উপত্যকা। মোহাচ্ছাব উপত্যকা হচ্ছে সাবেক বাতহা এবং বর্তমান মায়াবদা এলাকা। এখানে মসজিদে এজাবাহ অবস্থিত।
মোহাচ্ছাব শব্দের অর্থ হচ্ছে, জমাকৃত পাথরের টুকরার স্থান। বন্যার পানিতে উপরোল্লিখিত স্থানে পাথরের টুকরা জমা হওয়ায় একে মোহাচ্ছাব বলা হয়। মোহাচ্ছাব হচ্ছে সেই স্থান, মিনা থেকে মক্কা ফেরার সময় যেখানে অবতরণ করা মোস্তাহাব। এই স্থানটি আবতাহ নামক জায়গায় দুই পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। এর বর্তমান নাম হচ্ছে মাআ'বদাহ।' মিনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ (সা) এই জায়গায় অবতরণ করেন। মসজিদে হারামের বাবুস সালাম থেকে মোহাচ্ছাবের দূরত্ব হচ্ছে ৩ কিলোমিটার। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে মাগরিবের নামায পড়েছেন। বর্তমানে সেখানে একটি সুন্দর মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এই মসজিদটির নাম হচ্ছে মসজিদে এজাবাহ। এতে ১ টি সুন্দর মিনারা আছে।
📄 হোদায়বিয়া
হোদায়বিয়ার বর্তমান নাম হচ্ছে শোমাইসী। খাত্তাবী বলেছেন, হোদায়বিয়াকে হোদায়বিয়া বলার কারণ হচ্ছে সেখানে হাদবা নামক গাছ ছিল। হোদায়বিয়া থেকে সামান্য আগে মক্কার দিকে হুদুদে হারামের পিলার বসানো আছে। ঐ পিলার থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব হচ্ছে ২১ কিলোমিটার। হোদায়বিয়া হারাম এলাকার ভেতর না বাইরে, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে সহীহ মত অনুযায়ী এর অর্ধেক হারাম এলাকার ভেতর আর বাকী অর্ধেক হারাম এলাকার বাইরে।
হোদায়বিয়ায় একটি পুরাতন মসজিদ ছিল। কথিত আছে যে, মসজিদটি হোদায়বিয়ার বাইআত যে গাছের নীচে হয়েছিল সেখানেই নির্মিত হয়েছিল অথবা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) শিবির স্থাপন করেছিলেন সেখানে নির্মিত হয়েছিল। তারপর সেখানকার মসজিদটি ভেঙ্গে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাও ভেঙ্গে ফেলা হয়।
হোদায়বিয়া হচ্ছে সেই স্থান যেখানে ৬ষ্ঠ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে মক্কায় উমরার উদ্দেশ্যে আসার পথে অবতরণ করেন। কেননা, মক্কার কাফেররা তাঁকে উমরাহ আদায় করতে বাধা দেয়। সেখানে গাছের নীচে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে যে বাইআত গ্রহণ করেন তাকে বাইআতে রিদওয়ান বলে। আল্লাহ কুরআনে ঐ বাইআত ও গাছের কথা উল্লেখ করে বলেছেন: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا .
অর্থ: আল্লাহ মোমেনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছটির নীচে আপনার (নবীর) কাছে বাইআত গ্রহণ করছিল। আল্লাহ তাদের অন্তরের খবর জানেন। তারপর তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাদেরকে দ্রুত বিজয় দান করেন।' (আল-ফাতহ-২৮)
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এক রাত্রে স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি এবং তাঁর সাথীরা নিরাপদে মাথার চুল খাট করে এবং মুণ্ডন করে বাইতুল্লায় ঢুকেছেন। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে উমরাহ করা। তিনি মদীনা থেকে উমরার জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে এহরাম পরে বের হন এবং সাথে দমের পশু নিয়ে রওনা হন। যুদ্ধ করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন উসফান পৌঁছেন তখন, মুসলমানদের গুপ্তচর বিসার বিন সুফিয়ান কাবী রাসূলুল্লাহ (সা) কে খবর দেন যে, মক্কার কোরাইশরা জু-তওয়ায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে এবং খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কোরাউল গামীমে অশ্বারোহী বাহিনীকে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা যে কোন মূল্যে আপনাকে মক্কা প্রবেশে বাধা দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ খবর পেয়ে মক্কার রাস্তা পরিবর্তন করে হোদায়বিয়ায় উপস্থিত হন। সানিয়াতুল মেরারে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর উট বসে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তাকে মক্কায় আবরাহার হস্তীবাহিনীকে আটককারী শক্তিই আটক করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) পরে হোদায়বিয়ায় অবতরণের নির্দেশ দেন। সেখানে কোন পানি ছিল না। পুরাতন একটি কূপে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি তীর নিক্ষেপ করেন। ফলে, এতে পানি নির্গত হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সকল সাথী-সঙ্গী এবং উটের পানির চাহিদা পূর্ণ হয়। কোরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দূত বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে হযরত উসমানকে মধ্যস্থতার জন্য মক্কায় পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে তার ফিরতে দেরী হওয়ায় গুজব রটে যে, মক্কার কাফেরগণ তাঁকে হত্যা করেছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহর হাতে উসমান হত্যার প্রতিশোধের জন্যে মৃত্যুর আইআত গ্রহণ করেন। পরে হযরত উসমান নির্বিঘ্নে ফিরে আসেন।
সবশেষে মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে ১০ বছরের একটি সন্ধি চুক্তি হয়। চুক্তির বাহ্যিক শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ছিল। কিন্তু এর অভ্যন্তরে প্রকাশ্য বিজয় লুকিয়ে ছিল। এই সন্ধিই পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) সহ সবাই হোদায়বিয়ায় চুল খাট করে কিংবা মুণ্ডন করে এহরামমুক্ত হন এবং মদীনা ফেরত যান। চুক্তি অনুাযায়ী পরের বছর তিনি ও তাঁর সাথীরা কাজা ওমরাহ আদায় করেন। হোদায়বিয়ার পশ্চিমে শেষপ্রান্তে বর্তমানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে, তাতে সুন্দর মিনারাও রয়েছে।
📄 ওয়াদী ফাতেমা : মক্কা বিজয়ের সময় মুসলিম বাহিনীর অবতরণস্থল
এটি মক্কা বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর অবতরণ স্থল। খোজাআ গোত্রের ফাতেমা নামক মহিলার নামানুসারে এ উপত্যকার নামকরণ করা হয় ওয়াদী ফাতেমা বা ফাতেমা উপত্যকা। তিনি খুব সাহসী মহিলা ছিলেন। তিনি উপত্যকার অধিবাসীদের জানমাল লুটপাট থেকে রক্ষার জন্য বীরত্বের পরিচয় দেন। ওয়াদী ফাতেমা মক্কার উত্তরে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এর সাবেক নাম হচ্ছে মাররুজ জাহরান (مَرّ الظَّهران)। এই উপত্যকায় বহু ঝর্ণা ও খেজুর বাগান ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এতে অসংখ্য কূপ খনন করে পানি উঠানোর কারণে ঝর্ণাগুলো শুকিয়ে গেছে। ঐ উপত্যকা থেকে পাইপের মাধ্যমে জেদ্দা সহ অন্যান্য জায়গায় পানি সরবরাহ করেন। এখন এই উপত্যকাবাসীদেরই অন্য স্থান থেকে পানি আনতে হয়। এই উপত্যকা আজকে পুরো আবাদ এবং এখানে আধুনিক জীবন যাত্রার সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। এই উপত্যকায় বর্তমানে অনেকগুলো গ্রাম আছে। তার মধ্যে জমুম হচ্ছে বেশী প্রসিদ্ধ। এ ছাড়াও এতে, আবু উরওয়া, আবু শোয়াইব, খায়ক আইনে শামস, সান্ত এবং বারাবার গ্রাম উল্লেখযোগ্য।
এই উপত্যকায় মক্কা বিজয়ের সময় মদীনা থেকে আগত মুসলিম বাহিনী অবতরণ করে রাত্রি যাপন করে। রাসূলুল্লাহ (সা) সহ সবাই এখানে নামায পড়েন এবং এখানেই আবু সুফিয়ান (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং মুসলমান হন। রাসূলুল্লাহ (সা) এখানেই আবু সুফিয়ানের সম্মানে ঘোষণা করেন যে, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।
বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) এই উপত্যকা দিয়েই মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। এই উপত্যকার উপরিভাগে, হাদা বা হাদআ নামক একটি জায়গা আছে। এখানেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর ৬ জন সাহাবীর সাথে লেহইয়ান এবং হোজাইল গোত্রের লোকেরা লড়াই করে। এই যুদ্ধকে ইসলামের ইতিহাসে اصحَاب الرَّجِیْع বা রাজীই যুদ্ধ বলা হয়।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, উহুদ যুদ্ধের পর আ'দল এবং কারা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে অনুরোধ করে যে, তাদের মধ্যে অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারা বলে, আমাদের সাথে আপনার সাহাবাদের একটি দলকে পাঠান যেন তারা আমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেন, কুরআন পড়ান এবং ইসলামের আইন-কানুন বাতান। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের আহবানে (১) মোরশেদ বিন মোরশেদ গানওয়ী, (২) খালেদ বিন বোকাইর লীচি (৩) আসেম বিন সাবেত বিন আবুল আকলাহ (৪) খোবাইব বিন আ'দী, (৫) যায়েদ বিন দাসেনা এবং (৬) আবদুল্লাহ বিন তারেক (রা) কে তাদের সাথে পাঠান এবং মোরশেদ বিন মোরশেদকে তাদের আমীর করেন।
তারা উল্লেখিত কওমের প্রতিনিধিদলের সাথে হাদার শুরুতেই রাজী-ই নামক স্থানে পৌঁছন। এটি হোজাইল গোত্রের নিবাস। তখন কওমের প্রতিনিধি দলটি বিশ্বাসঘাতকতা করে হোজাইল গোত্রের সাহায্য প্রার্থনা করে। সাথে সাথে হোজাইল গোত্রের লোকেরা তলোয়ার নিয়ে বের হয়। তারা ৬ জন সাহাবীকে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানিয়ে বলে, আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি করবো না। কিন্তু মোরশেদ, খালেদ এবং আসেম বলেন, মোশরেকদের প্রতিশ্রুতির কোন অর্থ নেই। তাই তাঁরা লড়াই করে শহীদ হন। পরে মোশরেকরা আসেমের মাথা নিতে আসলে মৌমাছি এসে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। রাত্রে এক অভাবিত বন্যা এসে আসেমের লাশ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিনি জীবদ্দশায় আল্লাহর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, কোন মোশরেক যেন তাঁর শরীর স্পর্শ করতে না পারে। হযরত উমর বলেন, আসেম মান্নত করেছিলেন যেন তাকে কোন মোশরেক স্পর্শ না করে। আল্লাহ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শরীরকে মোশরেকদের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেন।
পক্ষান্তরে, যায়েদ বিন দাসেনা, খোবাইব বিন আদী এবং আবদুল্লাহ বিন তারেক মোশরেকদের হাতে বন্দী হন। কিন্তু ওয়াদী ফাতিমায় এসে আবদুল্লাহ বিন তারেক নিজের হাতের রশি খুলে তলোয়ার হাতে নেন এবং মোশারেকদের সাথে লড়াই শুরু করেন। পরে গাদ্দার কওম তাঁকে পাথর মেরে শহীদ করে দেয়। তাঁকে ওয়াদী ফাতিমায় দাফন করা হয়।
এ দিকে হযরত খোবাইব (রা) কে হোজাইর বিন আবি আহাব তামীমী এবং যায়েদকে সাফওয়ান বিন উমাইয়া ক্রয় করে। সবশেষে, হযরত যায়েদ এবং খোবাইবকে মক্কার তানইমে হত্যা ও শূলবিদ্ধ করে শহীদ করা হয়।