📄 মোযদালেফা
মোযদালেফা হচ্ছে মিনা এবং আরাফাতের মধ্যে অবস্থিত একটি জায়গার নাম।
হাজীরা আরাফাহ থেকে ৯ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার পর, এখানেই রাত্রি যাপন করেন। মূলত: মোযদালেফা হচ্ছে আরাফাগামী মাজেমাইন নামক দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ পথ মাদীক এবং মোহাস্সার উপত্যকার মাঝামাঝি অবস্থিত ৪ হাজার ৩শত ৭০ মিটার দীর্ঘ একটি স্থানের নাম।
মোযদালেফার নাককরণের ব্যাপারে অনেকগুলো মতভেদ আছে। সেগুলো হচ্ছে (১) এযদেলাফ থেকে মোযদালেফা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এযদেলাফ অর্থ হচ্ছে নিকটবর্তী হওয়া। মোযদালেফায় সকল হাজী একত্রিত হয় বলে একে অপরের নিকটবর্তী হয়। তাই একে মোযদালেফা বলা হয়। (২) মোযদালেফায় অবস্থানের মাধ্যমে হাজীরা আল্লাহর নিকটবর্তী হয় বলে একে মোযদালেফা বলা হয়। (৩) এযদেলাফ অর্থ হচ্ছে মিলিত বা জমা হওয়া। লোকেরা সেখানে মিলিত ও জমা হয়। তাই একে মোযদালেফা বলা হয়। (৪) আল্লাহর কুদরতে এখানে হযরত আদম (আ) এবং হাওয়া মিলিত হয়েছেন বলে একে মোযদালেফা বলা হয়। (৫) এখানে হাজীরা মাগরিব এবং এশার নামায এক সাথে মিলিয়ে পড়ে বলে একে মোযদালেফা বলা হয়।
মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব। হযরত ইবনে উমরের মতে গোটা মোযদালেফাই মাশআরুল হারাম। তাই এর যে কোন জায়গায় রাত্রি যাপন করা যাবে। অন্যান্য আলেমদের মতেও মোযদালেফার সর্বত্র রাত্রি যাপন করা যাবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 'মোযদালেফার সর্বত্র অকুফের স্থান।' তবে তাঁরা মাশাআরুল হারাম বলতে মোযদালেফার মধ্যবর্তী স্থান 'কোযাহ' পাহাড়কে বুঝান। তাঁরা এই জায়গায় হাজীদের অবস্থান ও রাত্রি যাপন, আল্লাহর জেকর ও শোকর এবং এবাদত করাকে মোস্তাহাব বলেছেন। বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) রাত্রে এখানেই অবস্থান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুকরণে এই জায়গায় অবস্থান উত্তম। মোযদালেফার বর্তমান মসজিদের স্থানে ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সা) দোআ ও জিকরে ব্যস্ত ছিলেন এবং সুর্যোদয়ের আগে আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। অনেকের মতে, গোটা মোযদালেফাই মাশআরুল হারাম।
আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেছেন- فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ - (بقره : ۱۹۸)
অর্থ: 'তোমরা যখন আরাফাত থেকে ফিরে আস তখন মাশআরুল হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ কর এবং তিনি যেভাবে তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন সেভাবে তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর।' মাশআরুল হারাম অর্থ এবাদতের সম্মানিত নির্দশনের স্থান।
মুসলিম শরীফে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোযদালেফায় এসে এশার সময় মাগরেবের এবং এশার নামাযকে একই আযান ও দু' একামত সহকারে আদায় করেছেন।
এমনকি দুই নামাযের মাঝখানে কোন সুন্নাত পড়েননি এবং কোন নফল এবাদতও করেননি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মোযদালেফায় সুন্নাতও নফল ত্যাগ করাই হচ্ছে সুন্নাত। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) এগুলো আদায় করেননি। তবে বিতরের নামায আদায় করতে হবে। যাই হোক, এরপর তিনি রাত্রের খানা খেয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে মোযদালেফায় ঘুমানো সুন্নাহ। এর মাধ্যমে শরীরের দাবী পূরণ করে তিনি উম্মাহর জন্য বিশেষ শিক্ষা রেখে গেছেন। তিনি সোবহে সাদেকের আগে উঠেছেন এবং সোবহে সাদেকের অন্ধকার দূর হওয়ার আগেই আজান ও একামত সহকারে ফজরের নামায পড়েছেন। একেবারে প্রথম ওয়াক্তে নামায পড়ার উদ্দেশ্য হল, পরে যেন দোয়া ও তাসবীহ-তাহলীলের সময় বেশী পাওয়া যায়। তারপর তিনি কোসওয়া নামক উষ্ট্রীর পিঠে চড়ে মাশআরে হারামে আসেন এবং কেবলামুখী হয়ে তাকবীর তাহলীল পাঠ করেন এবং আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করেন। তিনি ফদল বিন আব্বাস (রা)-কে মোযদালেফা থেকে কংকর সংগ্রহ করে দেয়ার জন্য বলেন। সে অনুযায়ী ফদল (রা) ১ম দিন জামরাহ আকাবায় নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য কংকর এনে দেন।
সূর্য উঠার একটু আগে আকাশ যখন বেশ ফর্সা হয়ে উঠল তখন তিনি মোযদালেফা থেকে রওনা দেন এবং মোহাম্সার উপত্যকায় এসে একটু জোরে চলেন। তিনি মোযদালেফা থেকে যে রাস্তায় মিনায় আসেন তার বর্তমান নাম হচ্ছে 'সোকুল আরব'। এর আগে তিনি মিনা থেকে আরাফাতে যাওয়ার সময় দব নামক রাস্তা দিয়ে যান, রাসূলুল্লাহর (সা) অভ্যাস ছিল এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। এরপর তিনি বড় জামরাহমুখী রাস্তা দিয়ে বড় জামরাহর কাছে অবস্থিত গাছের নিকট অবতরণ করেন এবং সূর্যোদয়ের কিছু পর বড় জামরায় ৭টি পাথর টুকরো নিক্ষেপ করেন। প্রত্যেক বার কংকর নিক্ষেপের সাথে তিনি তাকবীর বলেন এবং পরে জবেহখানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তিনিসহ সাহাবায়ে কেরামের জন্য আনীত ১শ' উটের মধ্যে তিনি নিজ হাতে ৬৩টি জবেহ করেন এবং বাকীগুলো হযরত আলী (রা) কে জবেহ করার নির্দেশ দেন। পরে তিনি কোরবানীর গোশত খান।
জাহেলিয়াতের সময় লোকেরা সূর্যোদয়ের পর মোযদালেফা থেকে রওনা হত এবং বলত সাবির পাহাড়ে আলো এসেছে, আমরা যেন রওনা হই। রাসূলুল্লাহ (সা) জাহেলিয়াতের রীতি-নীতির বিরোধিতা করে সূর্যোদয়ের সামান্য আগে, মোযদালেফা থেকে মিনা রওনা হন।
জাহেলিয়াতের সময় আরাফাত থেকে মোযদালেফায় আগমনকারী লোকদের উদ্দেশ্যে আগুন জ্বালানো হত যেন তারা ঠিকমত পৌঁছতে পারে এবং পথ না হারায়। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোযদালেফায় আসার সময় সেখানে আগুন জ্বলছিল। তিনি সেই আগুনের পার্শ্বে অবতরণ করেন। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবু বকর, উমর এবং উসমান (রা) এর সময়ও মোযদালেফায় আগুন জ্বালানো হত।
'অকুফে মোযদালেফা'র ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। হযরত উমরের মতে- ৯ই জিলহজ্জ দিবাগত রাত সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সময়ই হচ্ছে অকুফে মোযদালেফার সময়। আমর বিন মায়মুন থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমর (রা) মোযদালেফায় আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামায পড়েছেন, তারপর অকুফ করেছেন এবং বলেছেন, মোশরেকগণ সূর্যোদয়ের আগে মোযদালেফা ত্যাগ করত না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের এই কাজের বিরোধিতা করেন এবং সূর্যোদয়ের আগেই মোযদালেফা থেকে রওনা দেন। (আহমদ ও আবু দাউদ)
ইমাম আবু হানীফাসহ অন্যান্য আলেমদের মতে, সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সময়ই হচ্ছে অকুফে মোযদালেফার সময়। কেউ যদি বিনা ওজরে ঐ সময়ে অকুফ না করে, তাহলে তাকে দম দিতে হবে। যে কেউ ঐ সময় মোযদালেফায় থাকলে তার অকুফ হয়ে যাবে। চাই সে মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করুক বা নাই করুক। ঐ সময়ের অকুফে মোযদালেফা ওয়াজিব। মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করা সুন্নাত।
ইমাম শাফেঈ এবং আহমদের মতে, অর্ধরাত্রির পর যে কোন সময়ে অকুফ করলে তা আদায় হবে এবং মাঝরাতের আগে কেউ মোযদালেফা ত্যাগ করলে তাকে দম দিতে হবে। তবে ইমাম মালেকের মতে, কেউ মোজদালেফায় মাগরেব ও এশার নামায আদায় করার পর রাত্রির খাওয়া শেষে মোযদালেফা ত্যাগ করলে তা জায়েয হবে। মালেকী মাজহাবে, পানি পান করানোকারী ব্যক্তি এবং রাখাল ছাড়া অন্যদের জন্য মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) এই দুই শ্রেণীর লোকদের অনুমতি দিয়েছিলেন।
ইমাম আহমদ ও শাফেঈর মতে মাঝরাতের পর থেকে অকুফে মোযদালেফা ওয়াজিব। কেউ মাঝ রাতের পর কিছু সময় অকুফ করলে তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। অপরদিকে হানাফী মাযহাবে মোযদালেফায় রাত্রি যাপন সুন্নাতে মোয়াক্কাদাহ এবং সোবহে সাদেকের পর সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত অকুফ ওয়াজিব।
যাদের ওজর রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে মোযদালেফায় রাত্রি যাপন কিংবা সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অকুফ করার জন্য নির্দেশ দেননি। তাঁর কাছে রাখাল ও হাজীদেরকে পানি পান করানোকারী ব্যক্তিরা এসে অনুমতি চাওয়ায় তিনি তাদেরকে মোযদালেফা থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে, শিশু ও নারীদেরকেও মোযদালেফা ত্যাগের অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা), আমাদের আবদুল মোত্তালিব বংশের কিছু সংখ্যক ছোট বালককে রাত্রে মোযদালেফা থেকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমাদের গায়ে স্নেহ করে হালকা থাপড় দিয়ে বললেন, হে আমার সন্তানরা! সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত তোমরা জামরায় কংকর নিক্ষেপ করোনা।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মোযদালেফায় পৌঁছার পর সাওদা বিনতে যামআ' লোকদের ভীড়ের আগে মিনায় পৌঁছার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনি ধীর গতি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি লোকের ভীড়ের আগেই রওনা দেন।
আমরা সকাল পর্যন্ত মোযদালেফায় থাকার পর, পরে রওনা দেই। হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত উম্মে সালমাকে মোযদালেফার রাতে সোবহে সাদেকের আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাথে রাত্রি যাপনের পালা ছিল। উম্মুল মোমেনীন উম্মে হাবীবা বিনতে আবি সুফিয়ান থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে মোযদালেফার রাত্রে রাত অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। যোবায়েরের স্ত্রী আসমা বিনতে আবী বকর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি রাতে জামরায় কংকর নিক্ষেপ করেছেন। তিনি আরো বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে এরূপই করতাম। তালহা বিন যোবায়ের এবং আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) দুর্বল লোক এবং নারী ও শিশুদেরকে রাত্রেই মোযদালেফা থেকে মিনায় পাঠিয়ে দিতেন।
মূলকথা, ওজরগ্রস্ত এবং অসুস্থ ও দুর্বল লোকদেরকেও কিছুক্ষণ অকুফ করার পর রাত্রেই মোযদালেফা থেকে মিনায় পাঠিয়ে দেয়া জায়েয আছে।
অকুফে মোযদালেফার জন্য ৬টি সুন্নাহ আছে। সেগুলো হচ্ছে- (১) অর্ধরাত্রির পর গোসল করা ও পানি না পেলে তায়াম্মুম করা। (২) ফজরের নামায প্রথম ওয়াক্তে পড়া যেন পরে অকুফের সময় বেশী পাওয়া যায়। (৩) মাশআরুল হারামে এসে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা। (৪) হানাফী, শাফেঈ এবং হাম্বলী মাযহাবসহ অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম আমর বিন মায়মুনের বর্ণনা অনুযায়ী সূর্যোদয়ের সামান্য আগে মোযদালেফা ত্যাগ করাকে সুন্নাহ বলেছেন। ইমাম মালেকের মতে, ভোরে আকাশ ফর্সা হওয়ার আগে মোযদালেফা ত্যাগ করা যায়। (৫) ধীরে সুস্থে মোযদালেফা থেকে মিনায় পৌঁছা। শুধুমাত্র মোহাম্সার উপত্যকায় দ্রুত চলতে হবে। ইবনে আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোযদালেফায় এসে ফজল বিন আব্বাসকে নিজের সওয়ারীর পিছনে বসান এবং বলেন, হে লোকেরা, উট ও ঘোড়া দৌড়ানোর মধ্যে কোন নেক নেই। তোমরা ধীর স্থিরভাবে চল। রাসূলুল্লাহ (সা) মিনায় পৌঁছা পর্যন্ত ধীর-স্থির ছিলেন। (আবু দাউদ, বায়হাকী) (৬) মোহাস্সার উপত্যকায় দ্রুত চলা। চাই পায়ে হেঁটে হউক কিংবা সওয়ারী ও গাড়ীর উপরই হউক না কেন সর্বাবস্থায় তা দ্রুত পার হতে হবে। নাসাঈ শরীফে হযরত জাবের থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোহাম্সার উপত্যকা দ্রুত পার হয়েছেন।
মাশআরুল হারামে নির্মিত মসজিদে আগে শুধু একটি মিনারা ছিল। সৌদী আমলে সেখানে একটি সুন্দর মসজিদ নির্মিত হয়। তাতে ২টি মিনারা আছে। মসজিদটির আয়তন হচ্ছে ৫ হাজার ৪শ' বর্গমিটার এবং এতে একসাথে দুই লক্ষ মুসল্লি নামায পড়তে পারে। মোযদালেফায় অকুফের রাত্রির জন্য পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিকটবর্তী পাহাড়ে ৫০ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণকারী একটি ধাতব রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও মসজিদের রিজার্ভারে ২ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। সেখানে বেশ কিছু টয়লেটও তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়াও মোযদালেফায় গাড়ী ও পায়ে চলার জন্য সকল রাস্তা পাকা করা হয়েছে এবং আরাফাতের দিকে মোযদালেফার উপর দিয়ে ৮টি সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও মোযদালেফায় মাঝামাঝি বাদশাহ ফয়সল ওভারব্রীজ তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি হাজীদের সুবিধার্থে এতে, প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ, রিজার্ভার নির্মাণ এবং সুয়েরেজের ব্যবস্থাসহ মোট ২ হাজার টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।
📄 ওয়াদী মোহাস্সার : আবরাহা বাদশাহর ধংসস্থল
মোহাস্সার উপত্যকা হচ্ছে মিনা এবং মোযদালেফার মাঝে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ৫৪৫ হাত দীর্ঘ একটি স্থানের নাম। এই জায়গায় আবরাহা বাহিনীর উপর আল্লাহর গযব নেমে আসে এবং তারা পুরো ধ্বংস হয়। মোহাস্সার শব্দের অর্থ হচ্ছে অচল ও অক্ষম হওয়া। হস্তিবাহিনীর হাতীগুলো সামনে চলতে অক্ষম হওয়ার কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে মোহস্সার।
খৃস্টানরা এই জায়গায় অকুফ করত বা অবস্থান করত। তাই হাজীদের সেই জায়গা দ্রুত পার হওয়া এবং খৃস্টানদের বিরোধিতা করা জরুরী। মুসলিম এবং আবু দাউদ শরীফে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে। নবী করীম (সা) যখন মোযদালেফা হতে মিনার দিকে রওনা হন তখন মোহাস্সার উপত্যকায় চলার গতি দ্রুত করে দেন।
ইমাম নওয়ী বলেছেন, আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংসলীলা এই স্থানেই সংঘটিত হয়েছিল। যে সকল জায়গায় আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে, সে সকল জায়গা তাড়াতাড়ি অতিক্রম করা রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিয়ম ছিল।
📄 ওয়াদী মোহাস্ছব
অনেকে মুহাস্সার এবং মোহাচ্ছাব এই দু'টো উপত্যকাকে এক মনে করেন। আসলে এদু'টো এক নয়, ভিন্ন দু'টো উপত্যকা। মোহাচ্ছাব উপত্যকা হচ্ছে সাবেক বাতহা এবং বর্তমান মায়াবদা এলাকা। এখানে মসজিদে এজাবাহ অবস্থিত।
মোহাচ্ছাব শব্দের অর্থ হচ্ছে, জমাকৃত পাথরের টুকরার স্থান। বন্যার পানিতে উপরোল্লিখিত স্থানে পাথরের টুকরা জমা হওয়ায় একে মোহাচ্ছাব বলা হয়। মোহাচ্ছাব হচ্ছে সেই স্থান, মিনা থেকে মক্কা ফেরার সময় যেখানে অবতরণ করা মোস্তাহাব। এই স্থানটি আবতাহ নামক জায়গায় দুই পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। এর বর্তমান নাম হচ্ছে মাআ'বদাহ।' মিনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ (সা) এই জায়গায় অবতরণ করেন। মসজিদে হারামের বাবুস সালাম থেকে মোহাচ্ছাবের দূরত্ব হচ্ছে ৩ কিলোমিটার। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে মাগরিবের নামায পড়েছেন। বর্তমানে সেখানে একটি সুন্দর মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এই মসজিদটির নাম হচ্ছে মসজিদে এজাবাহ। এতে ১ টি সুন্দর মিনারা আছে।
📄 হোদায়বিয়া
হোদায়বিয়ার বর্তমান নাম হচ্ছে শোমাইসী। খাত্তাবী বলেছেন, হোদায়বিয়াকে হোদায়বিয়া বলার কারণ হচ্ছে সেখানে হাদবা নামক গাছ ছিল। হোদায়বিয়া থেকে সামান্য আগে মক্কার দিকে হুদুদে হারামের পিলার বসানো আছে। ঐ পিলার থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব হচ্ছে ২১ কিলোমিটার। হোদায়বিয়া হারাম এলাকার ভেতর না বাইরে, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে সহীহ মত অনুযায়ী এর অর্ধেক হারাম এলাকার ভেতর আর বাকী অর্ধেক হারাম এলাকার বাইরে।
হোদায়বিয়ায় একটি পুরাতন মসজিদ ছিল। কথিত আছে যে, মসজিদটি হোদায়বিয়ার বাইআত যে গাছের নীচে হয়েছিল সেখানেই নির্মিত হয়েছিল অথবা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) শিবির স্থাপন করেছিলেন সেখানে নির্মিত হয়েছিল। তারপর সেখানকার মসজিদটি ভেঙ্গে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাও ভেঙ্গে ফেলা হয়।
হোদায়বিয়া হচ্ছে সেই স্থান যেখানে ৬ষ্ঠ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে মক্কায় উমরার উদ্দেশ্যে আসার পথে অবতরণ করেন। কেননা, মক্কার কাফেররা তাঁকে উমরাহ আদায় করতে বাধা দেয়। সেখানে গাছের নীচে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে যে বাইআত গ্রহণ করেন তাকে বাইআতে রিদওয়ান বলে। আল্লাহ কুরআনে ঐ বাইআত ও গাছের কথা উল্লেখ করে বলেছেন: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا .
অর্থ: আল্লাহ মোমেনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছটির নীচে আপনার (নবীর) কাছে বাইআত গ্রহণ করছিল। আল্লাহ তাদের অন্তরের খবর জানেন। তারপর তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাদেরকে দ্রুত বিজয় দান করেন।' (আল-ফাতহ-২৮)
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এক রাত্রে স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি এবং তাঁর সাথীরা নিরাপদে মাথার চুল খাট করে এবং মুণ্ডন করে বাইতুল্লায় ঢুকেছেন। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে উমরাহ করা। তিনি মদীনা থেকে উমরার জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে এহরাম পরে বের হন এবং সাথে দমের পশু নিয়ে রওনা হন। যুদ্ধ করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন উসফান পৌঁছেন তখন, মুসলমানদের গুপ্তচর বিসার বিন সুফিয়ান কাবী রাসূলুল্লাহ (সা) কে খবর দেন যে, মক্কার কোরাইশরা জু-তওয়ায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে এবং খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কোরাউল গামীমে অশ্বারোহী বাহিনীকে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা যে কোন মূল্যে আপনাকে মক্কা প্রবেশে বাধা দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ খবর পেয়ে মক্কার রাস্তা পরিবর্তন করে হোদায়বিয়ায় উপস্থিত হন। সানিয়াতুল মেরারে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর উট বসে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তাকে মক্কায় আবরাহার হস্তীবাহিনীকে আটককারী শক্তিই আটক করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) পরে হোদায়বিয়ায় অবতরণের নির্দেশ দেন। সেখানে কোন পানি ছিল না। পুরাতন একটি কূপে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি তীর নিক্ষেপ করেন। ফলে, এতে পানি নির্গত হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সকল সাথী-সঙ্গী এবং উটের পানির চাহিদা পূর্ণ হয়। কোরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দূত বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে হযরত উসমানকে মধ্যস্থতার জন্য মক্কায় পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে তার ফিরতে দেরী হওয়ায় গুজব রটে যে, মক্কার কাফেরগণ তাঁকে হত্যা করেছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহর হাতে উসমান হত্যার প্রতিশোধের জন্যে মৃত্যুর আইআত গ্রহণ করেন। পরে হযরত উসমান নির্বিঘ্নে ফিরে আসেন।
সবশেষে মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে ১০ বছরের একটি সন্ধি চুক্তি হয়। চুক্তির বাহ্যিক শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ছিল। কিন্তু এর অভ্যন্তরে প্রকাশ্য বিজয় লুকিয়ে ছিল। এই সন্ধিই পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) সহ সবাই হোদায়বিয়ায় চুল খাট করে কিংবা মুণ্ডন করে এহরামমুক্ত হন এবং মদীনা ফেরত যান। চুক্তি অনুাযায়ী পরের বছর তিনি ও তাঁর সাথীরা কাজা ওমরাহ আদায় করেন। হোদায়বিয়ার পশ্চিমে শেষপ্রান্তে বর্তমানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে, তাতে সুন্দর মিনারাও রয়েছে।