📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মিনা

📄 মিনা


মিনা হজ্জ এবং মক্কার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান। হাজীদের ৮ই জিলহজ্জ জোহর থেকে ৯ই জিলহজ্জ ফজর পর্যন্ত ৫ ওয়াক্ত নামায মিনায় আদায় করা সুন্নত এবং সেখানে ৮ তারিখ সন্ধ্যা থেকে ৯ তারিখের ফজর পর্যন্ত রাত্রি যাপন করাও সকল মাজহাবের দৃষ্টিতে সুন্নত। মিনায় ৮ তারিখে অবস্থান করাকে يَوْمُ التَّرْوِيَةِ বলে। আগে পানির স্বল্পতার কারণে এই দিবসে হাজীরা মিনা থেকে পানি সংগ্রহ করতেন এবং আরাফাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন। تَرْوِيَةِ মানে পানির প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বিদায় হজ্জের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) ৮ তারিখ সকালে মক্কা থেকে রওনা দিয়ে জোহরের সময় মিনায় পৌঁছেন। তিনি মিনায় 'গারে মোরসালাত' নামক গুহায় রাত্রিযাপন করেন। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (সা) থেকে বর্ণিত। ঐ গুহায় সূরা 'আল-মোরসালাত' নাযিল হয়। ৯ তারিখ সকালে হাজীরা আরাফাতের ময়দানে চলে যায় এবং সেখানে দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান এবং মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করার পর ১০ই জিলহজ্জ পুনরায় মিনায় ফিরে আসে ও জামরায় পাথর মারে এবং পশু কুরবানী করে। কুরবানীর দিনসহ আইয়ামে তাশরীক তথা ১২ কিংবা ১৩ই জিলহজ্জ পর্যন্ত মিনায় থাকার পর হাজীরা মক্কায় ফিরে আসে। তাসরীক অর্থ গোশত শুকানো। ঐ দিনগুলোতে কোরবানীর গোশত শুকানো হত বলে তাকে আইয়ামে তাশরীক বলা হয়।
মক্কার দিক থেকে মিনার সীমানা হচ্ছে জামরাতুল আকাবা এবং মোযদালেফার দিক থেকে হচ্ছে মোহাস্সার উপত্যকা। মক্কা থেকে মিনার দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ৬ কিলোমিটার। মিনার দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার। মিনাতেই সূরা কাওসার নাযিল হয় এবং হজ্জের দিনগুলোর মধ্যেই তিনি উক্ত সূরার নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কুরবানীর আদেশ দেন।
অভিধানে বলা হয়েছে (মিনা( منی শব্দটি আরবী الى )ইলা) শব্দের আঙ্গিকে গঠিত। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে প্রবাহিত করা। মিনায় অধিক সংখ্যক কুরবানীর পশুর রক্ত প্রবাহিত হওয়ায় একে মিনা বলে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, জিবরাইল (আ) হযরত আদম (আ) থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় বলেছিলেন, হে আদম! আপনি আশা করুন। তখন আদম (আ) বলেন, আমি বেহেশতের প্রত্যাশা পোষণ করি। হযরত আদম (আ) এর প্রত্যাশা থেকে মিনা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

রাত্রি যাপন:
মিনায় হাজীদের ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ কিংবা ১৩ই জিলহজ্জের রাত্রি যাপন করা হানাফী মাজহাবে সুন্নত এবং অন্যান্য মাজহাবে ওয়াজিব। আবদুর রহমান বিন ফররুখ বলেন, আমি ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমরা বেচা-কেনা করি আমরা কি কেউ মিনায় রাত্রি যাপন না করে মক্কায় আমাদের মালের কাছে রাত্রি যাপন করতে পারি? তখন ইবনে উমর বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তো মিনাতেই রাত্রি যাপন করেন। (আবু দাউদ ও বায়হাকী)।
মিনায় রাত্রি যাপনের অর্থ হল, রাতের বেশীর ভাগ অংশ মিনায় কাটানো। ইমাম মালেকের দৃষ্টিতে প্রতি রাতের রাত্রি যাপন ত্যাগ করার মোকাবিলায় একটি করে দম দিতে হবে। সে অনুযায়ী তিন রাত যাপন না করলে তিনটি দম দিতে হবে। শাফেঈ এবং হাম্বলী মাজহাবের মশহুর মতামত হচ্ছে, এক রাত যাপন না করলে এক মুদ খাবার, ২ রাত যাপন না করলে দুই মুদ খাবার কাফফারা দিতে হবে। তৃতীয় রাত যাপন না করলে দম দিতে হবে।
ফেকাহবিদদের মধ্যে ওজরের কারণে মিনায় রাত্রি যাপন না করার ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। যেমন, হাজীদের পানি পান করানো এবং পশুর রাখালের ওজর গ্রহণযোগ্য। তারা রাত্রি যাপন না করলে কোন কাফফারা দিতে হবে না।
হযরত ইবনে উমর বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস (রা) তাশরীকের দিনসমূহে মক্কায় রাত্রি যাপনের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অনুমতি চান যেন তিনি হাজীদের পানি পান করাতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে অনুমতি দেন। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত আ'সেম বিন আ'দী থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) রাখালদেরকে মিনায় রাত্রি যাপন থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজা, আবু দাউদ এবং ইবনে হিব্বান)। ৮ তারিখ, গারে মোরসালাতের রাত্রিযাপন ব্যতীত বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কেরামসহ মসজিদে খায়েফের বর্তমান স্থানেই আইয়ামে তাশরীকে অবস্থান করেন ও রাত্রি যাপন করেন।

মিনায় রাসূলুল্লাহ (সা) এর খোতবা:
রাসূলুল্লাহ (সা) মিনায় দু'টো খোতবা দিয়েছেন। কুরবানীর দিন এবং পরের দিন ১১ই জিলহজ্জ এই খোতবা দু'টো দেন। কারো কারো মতে, তিনি ১০ এবং ১২ই জিলহজ্জ খোতবা দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর মিনায় ২য় খোতবার ব্যাপারে সারা বিনতে নাবহান থেকে বর্ণিত আছে, আমরা বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, তোমরা কি জান আজ কোন দিন? শ্রোতারা বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই তা ভাল জানেন। তিনি বলেন, আজ হচ্ছে আইয়ামে তাশরীকের মাঝের দিন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি জান এটি কোন শহর? শ্রোতারা বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই তা ভাল জানেন। তখন তিনি উত্তরে বলেন, এটি মাশআরুল হারাম বা সম্মানিত নিদর্শনের স্থান। তিনি আরো বলেন, জানিনা, এই বছরের পর তোমাদের সাথে আর আমার এখানে সাক্ষাত হবে কিনা। তবে জেনে রাখ, তোমাদের রক্ত, সম্পদ এবং ইজ্জত আজকের এই পবিত্র দিন এবং স্থানের মতই সম্মানিত, যে পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রতিপালক রবের সাথে গিয়ে সাক্ষাত কর এবং তিনি তোমাদের কাজ কর্ম সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ না করেন। জেনে রাখ, তোমাদের নিকটবর্তীরা যেন দূরবর্তীদের কাছে এই বাণীসমূহ পৌঁছায়। আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়েছি?
মদীনায় ফিরে আসার কয়েকদিন পরই তিনি ইন্তিকাল করেন। এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এই খোতবা আইয়ামে তাশরীকের ১ম দিকে নয়, মাঝামাঝি সময়ে দান করা হয়েছিল। এই জন্যই ইমাম শাফেঈ এবং আহমদ বলেছেন, ১২ই জিলহজ্জ তারিখে ঐ খোতবা দেয়া হয়েছে।
আহমদ, আবু দাউদ এবং ইবনে মাজাহ হযরত ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ৮ই জিলহজ্জ তারওইয়া (تروية) দিবসে জোহরের নামায থেকে ৯ই জিলহজ্জ আরাফাহ দিবসের ফজরের নামায অর্থাৎ ৫ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় পড়েন।

জামরাহ:
মিনায় তিন জামরায় কংকর মারতে হয়। মসজিদে খায়েফের দিক থেকে মক্কার দিকে আসার সময় প্রথমে জামরাহ সোগরা বা ছোট জামরাহ পড়ে। ছোট জামরাহ এবং জামরাহ আকাবার মাঝে জামরাহ ওস্তা অবস্থিত। এরপরই হচ্ছে জামরাহ আকাবা। জামরাহ আকাবা অন্য দুটো জামরাহর তুলনায় মক্কার বেশী নিকটবর্তী। প্রথম জামরাহ থেকে মেঝো জামরাহর দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ১৫৬ মিটার এবং মেঝো জামরাহ থেকে জামরাহ আকাবার দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ১১৭ মিটার। মিনায় অবস্থানের সময় ঐ সকল জামরার প্রত্যেকটিতে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করতে হয়।
ছোট ও মেঝো জামরার চারদিকে গোলাকার বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে এবং বৃত্তের মাঝখানে উঁচু স্তম্ভ তৈরী করা হয়েছে। এটিই কংকর নিক্ষেপের স্থান। বড় জামরাহ বৃত্তাকার। সেখানেও একটি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রায় ৩ মিটার উঁচু।
তিনটা স্তম্ভের উপর চার তলা ছাদ তৈরি করা হয়েছে এবং স্তম্ভগুলোর মাথা চার তলা পর্যন্ত উঁচু করা হয়েছে যাতে করে চার তলায় উঠেও পাথর নিক্ষেপ করা যায়।
নীচতলার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বরাবর উপর তলার দৈর্ঘ্য-প্রস্থও সমান করা হয়েছে। একই সময়, হাজীরা নীচ ও উপরতলা থেকে কংকর মারার সুবিধে লাভ করায়, কংকর নিক্ষেপের সময় ভিড়ের প্রচণ্ডতা হ্রাস পেয়েছে। অবশ্য উপরতলাকে একটি চওড়া ওভার ব্রীজের মত মনে হয় এবং এর উপরে কোন ছাদ না থাকায় গরমের সময় হাজীরা রোদে কষ্ট পায়। নীচতলা সবটুকুই চার তলার ছাদের ছায়া-ঘেরা।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, জামরায় কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে, বান্দাহ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং তাঁর আনুগত্য করলে শয়তান ব্যথিত হয়। এজন্য জামরায় জুতা বা তীর নিক্ষেপের কোন প্রয়োজন নেই। অনেকেই এই সুন্নত বিরোধী কাজকে সওয়াবের কাজ মনে করে ভুল করে বসে। রাসূলুল্লাহ (সা) মিনা, মোযদালেফা এবং আরাফাতকে ডানে ও মক্কাকে বাঁয়ে রেখে জামরাহ আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করেছেন এবং প্রত্যেকবার আল্লাহু আকবার বলেছেন।

জামরায় কংকর নিক্ষেপের তাৎপর্য:
মুসীরুল গারামে ইবনে জাওযী থেকে বর্ণিত আছে, যখন হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা শরীফ নির্মাণ শেষ করেন তখন জিবরাইল (আ) এসে তাঁকে তওয়াফের পদ্ধতি শিক্ষা দেন। তারপর তাঁকে জামরাতুল আকাবায় নিয়ে আসেন। তখন শয়তান হাজির হয়। জিবরাইল (আ) ৭টি পাথরের টুকরা হাতে নেন এবং ইবরাহীম (আ)-কে দেন। জিবরাইল (আ) ইবরাহীম (আ)-কে তাকবীরসহ কংকর নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। অতঃপর তাঁরা দু'জনেই সূর্যাস্ত পর্যন্ত কংকর মারেন এবং তাকবীর বলেন। তারপর তাঁরা মেঝো জামরাহর কাছে আসেন। সেখানেও শয়তান হাজির হয়। তাঁরা দু'জনে জামরাহ আকাবার অনুরূপ করেন। তারপর ছোট জামরাহর কাছে এলে সেখানেও শয়তান হাজির হয়। ফলে তাঁরা দু'জনেই শয়তানের প্রতি পাথরের টুকরা নিক্ষেপ করেন এবং তাকবীর বলেন। হযরত ইবরাহীম (আ) এর অনুসরণে শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আল্লাহর এবাদত করাই হচ্ছে কংকর নিক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। সালেম বিন আবু জা'দ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, যখন ইবরাহীম (আ) হজ্জের হুকুম পালন করার জন্য আসেন তখন জামরাহ আ'কাবার কাছে শয়তান এসে হাজির হয়। তিনি তার প্রতি ৭টি পাথর খণ্ড নিক্ষেপ করায় সে মাটিতে কুপোকাত হয়ে পড়ে। তারপর মেঝো জামরায় শয়তান হাজির হলে সেখানেও তাকে কংকর মেরে চিতপটাং করে দেন। অনুরূপভাবে, ছোট জামরায় পুনরায় শয়তান আবির্ভূত হলে সেখানেও শয়তানকে কংকর মেরে কাবু এবং ধরাশায়ী করে ফেলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, শয়তানকে কংকর মেরে মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ কর। (বায়হাকী)
কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে আল্লাহর গোলামীর বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করা হয় এবং ধোঁকাবাজ শয়তানের প্রলোভনে পড়ে মানুষ যে সকল গুনাহ ও অন্যায় কাজ করে তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে শয়তানকে নিরাশ করে দিয়ে বুঝানো হয় যে, আমরা অতীতে তোর আনুগত্য করলেও ভবিষ্যতে আর তা না করার অঙ্গীকার করছি।

কসাইখানা:
মিনা منحر বা কুরবানীর স্থান। যে কোন জায়গায় কুরবানী করলেই কুরবানী হয়ে যাবে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে জবেহ করছেন। তখন তিনি ইসমাঈলকে স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলায় ইসমাঈল রাজী হলেন এবং জবেহর জন্য মিনায় আসেন। শেষ পর্যন্ত ইবরাহীম (আ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আল্লাহ ইসমাঈল (আ) কে জবেহ না করার হুকুম দেন এবং তার পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানীর নির্দেশ দেন। তখন থেকেই হজ্জের পরের দিন, ১০ই জিলহজ্জ কুরবানীর দিবসে পশু কুরবানীর পদ্ধতি প্রবর্তন হয়।
বর্তমানে মিনায় পশু কুরবানীর স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে যাতে করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা না দেয়। ক্রমবর্ধমান হাজীর কারণেও কসাইখানা সুনির্দিষ্ট স্থানে করা জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে, মোযদালেফার মিনা সীমান্তে দুটো কসাইখানা নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে একটিতে ছাগল, দুম্বা ও ভেড়ার বাজার বসে এবং অন্যটিতে গরু, উট ও অন্যান্য বড় বড় প্রাণীর বাজার বসে। আধুনিক পদ্ধতিতে সেখানকার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়।
মিনায় হাদী (কেরান ও তামাতু হজ্জের কোরবানী), দম, সদকা ও কোরবানী উপলক্ষে অসংখ্য হাজীর লাখ লাখ জবেহকৃত পশুর গোশত পূর্বে জ্বালিয়ে নষ্ট করে দেয়া ছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা ছিল না। ১৪০৩ হিজরীতে, উক্ত গোশতের সদ্ব্যবহারের জন্য, সৌদী সরকার মিনার পূর্ব সীমান্তের পার্শ্বে মোআইসামে একটি আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ করে। মুসলিম বিশ্বের উদ্যোগে গঠিত ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক নিজ খরচে তা পরিচালনা করে এবং গরীব মুসলিম দেশসমূহে উক্ত গোশত পাঠায়। হাজীরা ব্যাংক ও বিক্রয় কেন্দ্রসমূহে টিকেট ক্রয়ের মাধ্যমে অগ্রিম পশু কিনে। তাদের নিজেদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সেখানে পশু কোরবানী হয়। প্রতিনিধি না থাকলেও পশু কোরবানী হয়ে যায়। সাধারণতঃ প্রতিনিধিরা সেখানে কমই গিয়ে থাকে। কসাইখানায় একই সাথে হাজার হাজার ছোট পশু অর্থাৎ ভেড়া, বকরী ও দুম্বা রাখার একটি খোঁয়াড় আছে। কসাইখানাটিতে একসাথে অনেক পশু জবেহ করা যায়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কোল্ড স্টোরেজের মাধ্যমে এগুলো সাময়িক সংরক্ষণ কর হয়।
সৌদী সরকার ১৪১০ হিজরীতে, মোআইসামে আরেকটি আদর্শ কসাইখানা তৈরি করেছে। এটা আগেরটার চাইতেও বৃহত্তর। এতে ৫ লাখ ছোট পশু অর্থাৎ ভেড়া বকরী ও দুম্বা জবেহর ব্যবস্থা আছে। এ সকল গোশতও গরীব মুসলমানদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। এছাড়াও ওয়াদী আন্নারে ২০ হাজার বর্গমিটারের উপর প্রাসঙ্গিক সকল সুযোগ-সুবিধাসহ গরু ও উট জবেহর জন্য সৌদী সরকার আরো কসাইখানা নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এটা নির্মিত হলে, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক মোট ৫টি কসাইখানা থেকে প্রতি বছর ১৫ লাখ পশুর গোশত বিশ্বের গরীব মুসলমানদের জন্য পাঠাতে সক্ষম হবে। তখন মিনায় আর কোন পশুর গোশত নষ্ট হবে না।

মিনা উন্নয়ন প্রকল্প:
মিনায় হাজীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে সংকুলান সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায়, আরাফার দিকে যেতে মিনার ডানদিকের পাহাড়ের উপরিভাগ কেটে সমতল করা হয় এবং এতে হাজীদের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৫ লাখ ঘনমিটার পাহাড়ী এলাকার পাথর কেটে পাহাড়ের উপরের ২০ লাখ বর্গমিটার এলাকা সমতল করা হয়। এতে রাস্তা নির্মাণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, টয়লেট ও বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করা হয়। পাহাড়ের উপরিভাগের দুই সীমান্তে দেয়াল তৈরি করা হয়। পাহাড়ের উপরে আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে হাজীদের জন্য দুটো আবাসিক এলাকা তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
মিনার ভেতর ৯টি সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়াও মিনার তাঁবুতে অগ্নি নির্বাপণের জন্য দমকল বাহিনী সদা প্রস্তুত থাকে। বর্তমানে মিনায় স্থায়ীভাবে আগুন প্রতিরোধক বিকল্প তাঁবু প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়াও নির্দিষ্ট জায়গায় হেলিপোর্ট বানানো হয়েছে যেন হেলিকপ্টার সার্ভিসের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যায়।
১৩৯৫ হিজরীতে, সৌদী সরকার মক্কার পবিত্র স্থানসমূহের উন্নয়নের জন্য মিনা উন্নয়ন প্রকল্প নামক সংস্থাটি কায়েম করে। এই সংস্থা মিনা মোযদালেফাহ, আরাফাহ এবং মিনার সাথে সংশ্লিষ্ট মক্কার অন্যান্য স্থানের উন্নয়নের জন্য এযাবত বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে সুড়ঙ্গ, ওভারব্রীজ, আদর্শ কসাইখানা, পানির বিরাট রিজার্ভার নির্মাণ, আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্দেশ্যে মিনার পাহাড়ের উপরিভাগ সমতলকরণ এবং জামারাহর ওভারব্রীজ সম্প্রসারণ অন্যতম। ভবিষ্যতে ও সংস্থা আরো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা নিচ্ছে।
মিনায় প্রায় বছর তাঁবুতে আগুন লাগে। তাই সৌদী সরকার মিনায় তাঁবুর পরিবর্তে হাজীদের আবাসিক বিল্ডিং তৈরির লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক কিছু বিল্ডিং তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। এই পরিকল্পনা সফল প্রমাণিত হলে গোটা মিনায় বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণ করার সম্ভাবনা আছে।
সৌদী সরকার মিনা, মোযদালেফা ও আরাফাতের উন্নয়নের জন্য একটি মাষ্টার প্ল্যান গ্রহণ করেছে। ঐ পরিকল্পনার লক্ষ্য হল ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৩০ লাখ হাজীদের সুযোগ সুবিধে নিশ্চিত করা। পরিকল্পনায় তিনটি পবিত্র স্থানকে ১০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। সংযোগ সড়কের মাধ্যমে প্রতি জোনের সাথে সুষ্ঠু যোগাযোগ রক্ষা করা হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ৪০% হাজীকে পদব্রজ বিবেচনা ধরে তাদের চলাচলের সুবিধে নিশ্চিত করা হবে। মসজিদে হারাম থেকে মিনা, মোযদালেফা এবং আরাফাত পর্যন্ত আরেকটি প্রধান পায়ে হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে এরকম রাস্তার সংখ্যা হচ্ছে ১টি। অবশিষ্ট হাজীদেরকে গাড়ীর যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করে বর্তমানে ১তলা বাসের পরিবর্তে দোতলা বাস চালু করা হবে। এর ফলে যানজট হ্রাস পাবে।
মিনায় ৩টি প্রধান হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও মিনায় আরও ৩০ হাজার টয়লেট, ৩০ হাজার পানিকেন্দ্র, ৩৩টি ক্লিনিক, ২০টি হাজী 'হারানো প্রাপ্তি' কেন্দ্র, ২৮টি পুলিশ ও ট্রাফিক ফাঁড়ি, ৫৬টি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, ২৫ হাজার টেলিফোন লাইন এবং ৬ হাজার খাবার দোকান প্রতিষ্ঠা করা হবে। জামরায় কংকর নিক্ষেপের সময় ভীড়ে প্রায়ই হাজী মারা যায়। সেই কারণে জামরার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মওজুদ ঘর-বাড়ী ভেঙ্গে জামরা এলাকা সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মিনায় পানি ও বিদ্যুত সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানো হবে।

মোযদালেফা ও আরাফাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা:
মিনার উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে মোযদালেফার উন্নয়ন করা হবে। মোযদালেফায় হাজীদের বিশ্রামের জায়গা ও পায়ে হেঁটে চলা হাজীদের রাস্তা তৈরি করা হবে। এছাড়া গাড়ী পার্কিং এর অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধে নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও পানি, টয়লেট, ক্লিনিক, হাজী হারানো-প্রাপ্তি কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুযোগ বৃদ্ধি হবে।
মিনা ও মোযদালেফার আঙ্গিকে আরাফাতকে ১০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। ৮টি জোন গাড়ীতে আগমনকারী হাজী, একটি পায়ে হেঁটে আসা হাজী এবং অন্যটি সরকারী বিভাগের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট আছে। ২০০৫ খৃঃ, আরাফাতে ২৪,৬০০ টয়লেট, ১৮,৫০০ পানি কেন্দ্র, ৬৫টি ক্লিনিক, ৪টি হাসপাতাল, ২০টি হারানো-প্রাপ্তি হাজী কেন্দ্র, ১০টি প্রধান ট্রাফিক ও নিরাপত্তা পুলিশ কেন্দ্র, ২টি পুলিশ ফাঁড়ি, একটি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, ৩৭০০ খাবার দোকান এবং ২৫০০ টেলিফোন লাইন বসানো হয়েছে। পানি সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য মওজুদ পানি লাইনের সাথে সংযোগ লাইনসহ অতিরিক্ত রিজার্ভার নির্মাণ করা হবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা:
মিনায় সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষ ও অজস্র গাড়ী-ঘোড়া চলাচল ও আবাসিক স্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না হলে, হাজীদের মিনায় অবস্থান অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। সেজন্য 'মিনা উন্নয়ন প্রকল্প' সংস্থা মিনায় সুষ্ঠু যোগাযোগ এবং মক্কার সাথে পরিকল্পিত অবাধ যোগাযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে মিনায় এক বলিষ্ঠ রোড নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্ক মক্কা শহরের ৪টি রিংরোডের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় একদিকে মোযদালেফা এবং আরাফাহ, অন্যদিকে মোআইসাম, আযিযিয়াসহ মক্কার সকল এলাকার মধ্য দিয়ে মসজিদে হারামের সাথে মিনার সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়াও মিনার সাথে জেদ্দা, তায়েফ ও মদীনার সংযোগও স্থাপিত হয়েছে। মিনার রাস্তাগুলো আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানের স্বাক্ষর বহন করে।
হাজীদের তাঁবু নির্মাণের জন্য নির্ধারিত এলাকার আয়তন হচ্ছে, ২৮ লাখ ৪৫ হাজার বর্গমিটার। মিনায় প্রায় ১ লাখ তাঁবু নির্মাণ করা হয়। মিনা রোড নেটওয়ার্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পবিত্র স্থানসমূহে মোট ১শ' কিলোমিটারেরও বেশী রাস্তা পাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ মিনায় গাড়ী চলাচলের জন্য নির্মিত রাস্তার মোট আয়তন হচ্ছে, ২৩ লাখ ২৪ হাজার বর্গমিটার। মিনার ভেতর গাড়ীর রাস্তার মোট আয়তন হচ্ছে ৭ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার। ওভারব্রীজসমূহের মোট আয়তন হচ্ছে, ৩ লাখ ৪৫ হাজার বর্গমিটার। পায়ে চলার পথের আয়তন হচ্ছে, ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার। রাস্তা তৈরির উদ্দেশ্যে মোট ২৮টি সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য হচ্ছে মোট ১৭ কিলোমিটার এবং আয়তন হচ্ছে, ২ লাখ ২৮ হাজার ৩১৮ বর্গমিটার
মিনা রোড নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে ১. প্রধান সড়ক ২. সংযোগ সড়ক-মিনার এপার ওপার ভেদকারী। ৩. পায়ে চলার পথ।
এখন আমরা মিনার প্রধান সড়কগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো:
১. বাদশাহ ফাহাদ সড়ক: এটি মিনার উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত ও পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। এটি মিনার ১নং প্রধান সড়ক হিসেবে বিবেচিত। এটি মোযদালেফার মাশআরুল হারাম- এবাদতের সম্মানিত স্থানের উত্তর পাশ হয়ে মিনার উত্তর পাশ দিয়ে মসজিদে হারামের নিকট শে'বে আমের ও শে'বে আলী পর্যন্ত পৌছেছে। এর দৈর্ঘ্য ৮.৫ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৩১.২০ মিটার। প্রতিদিকে ৩টি করে দুই দিকে গাড়ী চলার জন্য মোট ৬টি ট্র্যাক আছে। এর মাঝে ২মিটার চওড়া আইল্যাণ্ড আছে। এটি মক্কার ৪টি রিং রোডের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। এটি মিনায় 'তরীক বাদশাহ আবদুল আযীয' প্রধান সংযোগ সড়কের ওভারব্রীজের নীচে গিয়ে মিশেছে। পরে সেখান থেকে ২য় সংযোগ সড়ক বাদশাহ খালেদ ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে এবং হাজারুল কাবস এলাকার উপর দিয়ে ৮০০ মিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ হয়ে ময়দানে আদলের ওভারব্রীজের সাথে গিয়ে মিশেছে। অপর দিকে এটা ২য় নেটওয়ার্ক দ্বারা শোয়াইবিন এলাকার সাথে সংযুক্ত হওয়ার ফলে গোটা মিনা ও মক্কার সকল এলাকার সাথে সংযোগ সৃষ্টি করেছে। ময়দানে আ'দল থেকে আযিযিয়া ক্রসিং দিয়ে ফয়সলিয়া হয়ে একটা ওভারব্রীজ দ্বারা ৯৫০ মিটার লম্বা দ্বিমুখী সুড়ঙ্গের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ঐ সুড়ঙ্গ পথটি শে'বে আমের পর্যন্ত গিয়ে মক্কার অভ্যন্তরীণ ২য় রিং রোডের সাথে মিশেছে। সেখান থেকে তা হারামের চারপাশে নির্মিত ১ম রিং রোডের সাথে গিয়ে সংযুক্ত হয়েছে।
২. বাদশাহ আবদুল আযীয সড়ক: এটি মিনার দক্ষিণ পার্শ্বে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা ২য় বৃহত্তম সড়ক। এটি মক্কার বাইরের ৪র্থ রিংরোডের সাথে সংযুক্ত। এটি মিনার ১ম সংযোগ সড়ক তরীক মালেক আবদুল আযীয ও ২য় সংযোগ সড়ক বাদশাহ খালেদ ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে এসে মসজিদে হারামের পার্শ্ববর্তী ২য় ও ১ম রিংরোডের সাথে মিলিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৯.৫ কিলোমিটার এবং প্রশস্ততা হচ্ছে ৩১.২০ মিটার। দুই দিকের প্রতি সড়কে ৩টি করে মোট ৬টি গাড়ীর ট্র্যাক আছে। এই রোডে মোট ৫টি ওভারব্রীজ ও ২টি সুড়ঙ্গ আছে। প্রতিটি সুড়ঙ্গ ১৪ মিটার চওড়া।
এবার আমরা সংযোগ সড়ক সম্পর্কে আলোচনা করবো:
১. তরীক মালেক আবদুল আযীয: এটি মিনার প্রথম ও প্রধান সংযোগ সড়ক হিসেবে বিবেচিত এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে এপার ওপার ভেদকারী। এটি মোযদালেফা ও মিনা থেকে মোআইসাম পর্যন্ত গিয়েছে এবং মক্কা শহরের বাইরের রিং রোড তথা মক্কা ৪র্থ রিং রোডের সাথে গিয়ে মিশেছে। মিনায় এটিকে বাদশাহ আবদুল আযীয অভারব্রীজও বলা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৩১.২০ মিটার। এর প্রতি দিকে ৩টি করে দুই দিকের রাস্তায় মোট ৬টি গাড়ীর ট্র্যাক আছে। এতে ৬টা ওভারব্রীজ আছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১ হাজার ৬৭৫ মিটার। এতে মোট ২টি সুড়ঙ্গ আছে। সুড়ঙ্গগুলো দ্বিমুখী। সুড়ঙ্গের প্রতিদিকের দৈর্ঘ্য ৩৫০ মিটার ও প্রস্থ ১৪ মিটার।
২. বাদশাহ খালেদ ওভারব্রীজ রোড: এটি মিনার ২য় বৃহত্তম সংযোগ সড়ক। এটিও উত্তর-দক্ষিণমুখী এবং মিনার এপার ওপার ভেদকারী। এই রাস্তা তৈরির লক্ষ্য হল, জামরাহ এলাকা থেকে গাড়ীর গতি পরিবর্তন করে তাকে আযিযিয়া এবং মোআইসামের দিকে বের করে দেয়া। এটি দক্ষিণের সাওর পর্বত থেকে উত্তরে মোআইসাম কসাইখানা পর্যন্ত সম্প্রসারিত। এটিও মক্কার বাইরের ৪র্থ রিং রোডের সাথে গিয়ে মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার। প্রতিদিকে ৩টি করে দুইদিকে মোট ৬টি গাড়ীর ট্র্যাক আছে। এতে দুটো ওভারব্রীজ আছে। একটি মিনার ভেতর এবং অন্যটি আযিযিয়ায়। এছাড়াও এতে ৮টি সুড়ঙ্গ আছে।
১নং পায়ে চলার পথ: এবার আমরা পায়ে চলার পথ সম্পর্কে আলোচনা করবো। মিনায় পায়ে চলার পথ ২টা। এই পথ দুটি মোযদালেফা এবং আরাফাতের সাথে গিয়ে মিশেছে। প্রত্যেকটার প্রশস্ততা হচ্ছে, ৩০ মিটার। ১নং ও প্রধান রাস্তাটি আরাফাত থেকে মোযদালেফা এসে এক রাস্তায় পরিণত হয়েছে। একসাথ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি রাস্তা ৩০ মিটার চওড়া এবং মিলিত হওয়ার পর মিনার প্রবেশ মুখে রাস্তাটির প্রশস্ততা দাঁড়িয়েছে ৬০ মিটারে। কিন্তু পড়ে তা সরু হয়ে মিনা উপত্যকার মাঝে ৩০ মিটার প্রশস্ততা নিয়ে জামরাহ পর্যন্ত এসেছে। সেখান থেকে মসজিদে হারামে পৌঁছেছে। মিনা-মোযদালেফা সীমান্ত থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত এর দৈর্ঘ হচ্ছে, ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩ কিলোমিটার মিনার ভেতর এবং অবশিষ্ট ৪ কিলোমিটার জামরাহ থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত। মিনা থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত এটিই হচ্ছে সবচাইতে সংক্ষিপ্ত রাস্তা। এতে গাড়ী চলাচল করেনা। এর ফলে মিনা থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব অর্ধেক কমে গেছে। এই রাস্তা তৈরির আগে মিনা থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব ছিল ৮ কিলোমিটার। কিন্তু এই রাস্তা তৈরির জন্য শে'বে আলী-জিয়াদ সুড়ঙ্গ এবং জিয়াদ-মাহবাসুল জ্বিন সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। তারপর জামরাহ-আযিযিয়া পাহাড় ঘেষে রাস্তা তৈরির ফলে, দূরত্ব অর্ধেক কমে আসে। সুড়ঙ্গের মধ্যকার পথ ছায়াদার। তাই সুড়ঙ্গের বাইরের রাস্তাকে প্রথম পর্যায়ে মাহবাসুল জ্বিন থেকে মিনার শেষ সীমা পর্যন্ত এয়ারকন্ডিশন শেড দ্বারা ছায়াদার বানানো হয় এবং ২য় পর্যায়ে, মোযদালেফা থেকে আরাফাত পর্যন্ত একে এয়ারকন্ডিশন শেড দ্বারা ছায়াদার বানানো হয়। এর ফলে, হাজীরা সূর্যতাপে আক্রান্ত হওয়ার সমস্যা থেকে রক্ষা পায়। এই রাস্তাটি মিনার দুটো এবং মোযদালেফার একটি ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে চলে গিয়েছে এবং ৪টা সুড়ঙ্গ অতিক্রম করেছে।
২নং পায়ে চলার পথ : এটি মিনা উপত্যকার উত্তরাঞ্চল, উত্তরাঞ্চলের শুয়াইবিন এবং মোআইসামের আধুনিক কসাইখানা এলাকার লোকদের জামরায় আসার সুবিধে সৃষ্টি করেছে। এই রাস্তার দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৪ শ' মিটার এবং প্রস্থ ১৫ মিটার। এতে সুড়ঙ্গ সংখ্যা হচ্ছে ৩টি। সুড়ঙ্গগুলোর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৬ মিটার ও প্রস্থ ১২.৫ মিটার।

পানি সেবা:
পানিহীন মিনা উপত্যকায় হজ্জের সময় লক্ষ লক্ষ হাজী ও অন্যান্য মানুষের ভীড় হয়। ১৪০৯ হিজরীতে, সৌদী আরবের বাহির থেকে আগত হাজীর সংখ্যা ৭ লাখ ৭৫ হাজার এবং ভেতর থেকেও প্রায় অনুরূপ পরিমাণ লোক হজ্জে অংশগ্রহণ করে। হাজীদের সেবার জন্য বিরাট সংখ্যক লোকের উপস্থিতিসহ মিনা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। এত বিপুল সংখ্যক হাজীদের জন্য প্রায় সপ্তাহ খানেক যাবত পানির ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য হলেও তা অত্যন্ত জরুরী। তাই মিনা, মোযদালেফা ও আরাফাতে ৩০টি পানির রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে এবং এগুলোতে হজ্জের সময় পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হয়।
এখন আমরা মিনার পানি সরবাহের উদ্দেশ্যে নির্মিত কিছু সংখ্যক পানির রিজার্ভার সম্পর্কে আলোচনা করবো।
১. মোআইসাম রিজার্ভার : এতে ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ধরে। তাই একে 'মিলিয়ন রিজার্ভার'ও বলে। এটা সায়েলের রাস্তা থেকে মিনায় যাওয়ার সময় ডানদিকে মুআইস নামক স্থানে সাগরের স্তর থেকে ৪৪৯ মিটার উপরে অবস্থিত। এর ভিত্তি ও ছাদ কংক্রিটের তৈরী এবং তা তিনদিকে পাহাড় বেষ্টিত। এই রিজার্ভারটি আধুনিক প্রকৌশলের একটি উন্নত উপহার। এর ছাদ তৈরীতে সর্বাধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। ছাদটিকে বাহির থেকে তারের মাধ্যমে ঝুলন্ত পুলের মত মনে হয়। এটাকে ওভারব্রীজ তৈরীর পদ্ধতিতে তৈরী করা হয়েছে। এর সাথে মক্কায় প্রাকৃতিক পানির উৎস হিসাবে সাওলা ও মাদীক থেকে পানি আনার সংযোগ লাইন দেয়া হয়েছে। মিনার শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্পের পাম্প স্টেশন থেকেও এতে পানি আনা হয়। এখান থেকে মক্কা শহরেও পানি সরবরাহ করা হয়।
২. জো'রানা রিজার্ভার : এতে ৬ লাখ ঘনমিটার পানি ধরে। এটি সাগরের স্তর থেকে ৪৪৮ মিটার উপরে তায়েফ-সায়েল রোড থেকে জোরানাগামী রাস্তার পার্শ্বে অবস্থিত এবং তিনদিক থেকে পাহাড় বেষ্টিত। এর ছাদ পাকা স্তম্ভের উপর নির্মিত এবং তার দিয়ে ছাদকে ১৬টি পিরামিডের আকৃতিতে তৈরী করা হয়েছে। রিজার্ভারটির দৈর্ঘ্য ৭৫০ মিটার প্রস্থ ৩৫০ মিটার ও গভীরতা ২৬ মিটার। পাইপ দিয়ে সাওলা, মাদীক ও বনি ওমাইর মাওর উপত্যকা থেকে সরবরাহ লাইন আনা হয়েছে এবং তায়েফ নোমান রাস্তায় অবস্থিত শোয়াইবিয়া লবণমুক্ত মিষ্টিপানি প্রকল্পের লাইনের সাথে এর সংযোগ দেয়া হয়েছে। এই রিজার্ভার থেকে পাইপের মাধ্যমে মিনার আলবাইয়া রিজার্ভার বাদশাহ ফাহাদ সড়কের রিজার্ভারসমূহ এবং সেখান থেকে শোয়াইবিন রিজার্ভারসমূহে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্য আরেক লাইনের মাধ্যমে সেখান থেকে মক্কার মুলকিয়া রিজার্ভারেও ১০ হাজার ঘনমিটার পানি সরবরাহ করা হয়। এই সকল রিজার্ভারের পানি বিশুদ্ধ করার জন্য বিশুদ্ধকরণ ইউনিট কায়েম করা হয়েছে।
৩. দুই নম্বর মোআইসাম রিজার্ভার : এই রিজার্ভারে ৯০ ঘনমিটার পানি ধরে। এটি মিনা যাওয়ার সময় হাতের ডানে মোআইস পাহাড়ের শীর্ষে সাগরের স্তর থেকে ৪৭৫ মিটার উপরে অবস্থিত। ১৪০০ হিজরী থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। পাইপের মাধ্যমে সাওলা ও মাদীক থেকে এতে পানি সরবরাহ করা হয়। এতে দৈনিক ৬ হাজার ঘন মিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়। এতে শোয়াইবিয়া মিষ্টি পানি প্রকল্পের পানি 'রাবওয়া-মিনা' রিজার্ভার থেকে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। এই রিজার্ভারের পানিসহ মিনা-মোযদালেফা এবং আরাফাতের পবিত্র স্থানসমূহের বড় বড় রিজার্ভারের পানি বিশুদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৪. রাজপ্রাসাদ রিজার্ভার: মিনার রাজপ্রসাদে পানি সরবরাহের জন্য এবং তা মসজিদে খায়েফের পশ্চিমে সাগরের স্তর থেকে ৪৪৩ মিটার উপরে অবস্থিত। এতে ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। ১৪০৫ হিজরীতে তা চালু হয়। এইটা থেকে রাজপ্রাসাদ ও মসজিদের খায়ফে পানি সরবরাহ করা হয়।
৫. শোয়াইবিন রিজার্ভার: এটি সাগরের স্তর থেকে ৩৭৬ মিটার উপরে মিনার আশ শোয়াইর আল কবীর এলাকার পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এতে ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। এটির উচ্চতা ৬ মিটার, দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার এবং তা কংক্রিটের তৈরী ও চতুর্ভুজ। পাইপের মাধ্যমে মাদীক থেকে এতে পানি সরবরাহ করা হয়। এর পানিও বিশুদ্ধ করা হয়।
৬. মালকান রিজার্ভার: এটি মোযদালেফা থেকে মিনায় প্রবেশের সময় মিনার পশ্চিম দিকের পাহাড়ের চূড়ায় সাগরের স্তর থেকে ৩৮৬ মিটার উপরে অবস্থিত। ১৪০৭ হিজরীতে ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণ সম্পন্ন এই রিজার্ভারটি চালু করা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার উচ্চতা ৬ মিটার। আগে মালকান উপত্যকা থেকে এতে পানি সরবরাহ করা হত বলে একে মালকান রিজার্ভার বলা হয়। চওড়া পাইপ দ্বারা শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্পের পানি এতে সরবরাহ করা হয়। এর পানি বিশুদ্ধ করা হয়।
৭. বাদশাহ ফাহাদ রাবওয়া মিল রিজার্ভার: এতে ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। এই কসাইখনা দক্ষিণের পাহাড়ের চূড়ায় সাগরে স্তর থেকে ৩৮৮ মিটার উপরে অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার এং উচ্চতা ৬ মিটার। বর্গাকৃতির এই রিজার্ভারটি ১৩৯২ হিজরীতে চালু করা হয়। শোয়াইবিয়া মিষ্টি পানি প্রকল্পের লাইন থেকে এতে পানি আনা হয়। জমুম, নোমান উপত্যকা ও রাহজান উপত্যকা থেকে অপর একটি পাইপ দ্বারা এই রিজার্ভারে পানি আনা হয় আবার এই রিজার্ভার থেকে তিনটি পানি সরবরাহকারী প্রধান লাইনের মাধ্যমে পানি বন্টন করা হয়। ৭০০ মিলিমিটার পাইপের মাধ্যমে আযিযিয়া এলাকায়, ২য় একটি লাইন দ্বারা কওয়াশেক রিজার্ভার এবং ৩য় আরেকটি লাইন দ্বারা মিনার আরেকটি রিজার্ভারে পানি সরবরাহ করা হয়। এতে পানি বিশুদ্ধ করার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট আছে।
৮. বাইআহ রিজার্ভার: এখানে দুটো রিজার্ভার আছে। এই দুটো মিনার শেষ সীমান্তে জামরার কাছে অবস্থিত। প্রতিটিতে ১০ হাজার ঘনমিটার করে দুটোতে মোট ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। নীচু রিজার্ভারটি সাগরের স্তর থেকে ৩৮০ মিটার উপরে এবং উঁচু রিজার্ভারটি ৪১৬ মিটার উপরে অবস্থান করছে। এগুলো বর্গাকৃতির এবং কংক্রিটের তৈরি। প্রতিটার দৈর্ঘ্য ৩৫ মিটার ও উচ্চতা ৬ মিটার। ১৩৯২ হিজরীতে এগুলো চালু করা হয়। সাওলা থেকে জাওয়াফা রিজার্ভারে আগত লাইন থেকে এতে পানি আনা হয়। বর্তমানে রাবওয়া-মিনা রিজার্ভার থেকেও এতে পানি আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৯. মসজিদে খায়ফ রিজার্ভার : এতে দু'টো রিজার্ভার আছে। ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারটিতে ৬ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে এবং বাইরের রিজার্ভারটিতেও আরো ৬ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে।
১০. ২ নং শোয়াইবিন রিজার্ভার : এতে দু'টো রিজার্ভার আছে। প্রতিটিতে তিন হাজার ঘনমিটার করে মোট ৬ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। মিনায় সর্বমোট ১৮টি রিজার্ভার আছে।
মিনায় আগে যখন এ সকল ব্যবস্থা ছিলনা, তখন পানি সমস্যা কত মারাত্মক ছিল তা ভালভাবে বুঝা যায়। বর্তমানে সেখানে পানির কোন সংকট নেই।
গরমের মধ্যে ঠাণ্ডা পানি সরবরাহের জন্য বহু পানির কুলার বসানো হয়েছে। সেগুলো থেকে হাজীরা ঠাণ্ডা পানি পান করে। এ ছাড়াও বাদশাহ ফাহাদ পানি প্রকল্প থেকে হাজীদের উদ্দেশ্যে ঠাণ্ডা পানি বন্টন করা হয়।
১৪০৩ হিজরীতে, মিনায় পানির নেটওয়ার্ক কাজের সমাপ্তি হয় এবং ঐ নেটওয়ার্ক মিনা উপত্যকা, শোআইবিন উপত্যকা, মিনার পাহাড়, জামরাহ এলাকা, মসজিদে খায়ফের পার্শ্ববর্তী পাহাড়, কাবশ ওভারব্রীজসহ বিরাট এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়াও মোআইসামের আধুনিক কসাইখানা এলাকা পর্যন্ত শারায়ে'তে অবস্থিত পানির সংরক্ষণাগার থেকে পাইপ লাইন বসানো হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। পানি নেটওয়ার্কের মধ্যে পানি সরবরাহ লাইন, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বৃষ্টি ও বন্যার পানি নিষ্কাশন পয়ঃনালা, সুয়েরেজ লাইন, পরিচ্ছন্নতা কেন্দ্র, পান করার পানি বিশুদ্ধকরণ এবং হিমায়িতকরণের জন্য ৪টি কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে অন্যতম।
১৪০৩ হিঃ, ১ম দফায় বাদশাহ খালেদ এবং বাদশাহ আবদুল আযীয ওভারব্রীজের মধ্যবর্তী এলাকায় ৫ হাজার টয়লেট এবং ১৪০৪ হিঃ, শোআইবিন এলাকায় আরও কয়েক হাজার টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও পাহাড়ের উপর অতিরিক্ত ১৮০০ টয়লেট তৈরি করা হয়েছে। মোট টয়লেটের সংখ্যা হচ্ছে ১৬ হাজার। অজুর জন্য চুম্বক কল নির্মাণ করায় হাত বাড়ানোর সাথে সাথে পানি পড়া শুরু হয়। হাতে কল ঘুরানোর দরকার হয় না।
হজ্জের সময় মিনায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত বাজার এং হোটেল বসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও খাদ্য এবং পণ্যদ্রব্য সরবরাহ করে থাকে।
তাঁবুতে অগ্নিকান্ড না ঘটার লক্ষ্যে বর্তমানে হাজীদেরকে পৃথক পৃথক রান্না করতে দেয়া হয় না। মোতাওয়েফরা রান্না করে খাওয়ায় এবং হাজীদের থেকে খাবারের মূল্য গ্রহণ করে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 আরাফাহ

📄 আরাফাহ


আরাফাহ এবং আরাফাত এই দুটো শব্দই আরবীতে প্রচলিত আছে। আরাফাহ বা আরাফাত হচ্ছে, দুই মাইল দৈর্ঘ্য এবং দুই মাইল প্রস্থ বিশিষ্ট একটি বিরাট সমতল ময়দানের নাম। এটি ৩ দিকেই পাহাড় বেষ্টিত ধনুকাকৃতির এবং এর দক্ষিণ পাশ নতুন মক্কা-হাদা-তায়েফ রিং রোডে অবস্থিত। এই রোডের দক্ষিণ পাশেই আবেদীয়া উপত্যকায় নতুন উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয় নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আরাফাতের উত্তর সীমান্তে রয়েছে সাদ পাহাড়। সেখান থেকে আরাফাত সীমান্ত পশ্চিমে আরও এক হাজার মিটার। সেখান থেকে দক্ষিণে নামেরার সাথে গিয়ে আরাফাত সীমান্ত শেষ হয়েছে।
এই ময়দানেই ৯ই জিলহজ্জ হাজীরা অকুফে আরাফাহ করে। অকুফে আরাফাহ হজ্জের অন্যতম ফরজ এবং রোকন।
মক্কার মোয়াল্লা থেকে আরাফাতের মক্কা সংলগ্ন পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব সাড়ে ২১ কিলোমিটার। ঠিক এই পশ্চিম সীমান্তেই, আরাফাতের সীমানা শুরুর স্থানে দু'টো পিলার নির্মাণ করা হয়েছে, অবশিষ্ট তিনদিকের সীমান্তেও পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। আরাফাহ সাগরের স্তর থেকে ৭৫০ ফুট উপরে অবস্থিত। আরাফার সকল অংশই حَلّ অর্থাৎ হারাম এলাকার ) حُدُودُ حَرَم( বাইরে।
হারাম সীমানা যেখানে শেষ, সেখানেই আরাফাতের সীমানা শুরু হয়েছে।
আরাফার পশ্চিমে এবং পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত উপত্যকাটির নাম হচ্ছে ওরানা। এই ওরানা হারাম এলাকার ভেতর অন্তর্ভুক্ত। ওরানার পশ্চিম সীমান্ত হচ্ছে মোযদালেফা। ওরানা বিরাট এক উপত্যকার নাম। পূর্বে মসজিদে নামেরা ওরানার মধ্যে ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগের মসজিদে নামেরার পশ্চিমের অর্ধেক ওরানায় এবং পূর্বের অর্ধেক আরাফাতে অবস্থিত। মসজিদের পশ্চিম দিকে বের হওয়ার কোন দরজা নেই। মসজিদের পূর্বের অর্ধাংশে অবস্থান করলে অকুফে আরাফাহ হয়ে যাবে। আরাফাহর সাথে হারাম সীমান্তের দুটো পিলার আছে। পিলারের পূর্বে আরাফাত এবং পশ্চিমে হারাম এলাকা।
রাসূলুল্লাহ (সা) মসজিদে নামেরায় খোতবা দেয়ার পর জোহর এবং আসরের নামাজ একসাথে পড়েন এবং সূর্য ঢলে যাওয়ার পর তিনি আরাফাতে অকুফ (অবস্থান) করেন।
আরাফাহ সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কুরআন উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন: فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِّنْ عَرَفَاتِ - (بقره : ۱۹۸) অর্থ: 'যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসবে।'
মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ এবং ইমাম আহমদ জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমি এখানে জবেহ করেছি। মিনার সর্বত্রই জবেহ করা যায়। তোমরাও কুরবানী কর। আমি এখানে অকুফ করেছি। আরাফাহর সর্বত্র অকুফের স্থান। মোযদালেফার সর্বত্রই অকুফের স্থান।
আরাফাহর যে কোন জায়গায় ৯ই জিলহজ্জ দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে এবং জেনে বা ন জেনে অবস্থান করলেই অকুফ হয়ে যাবে। হযরত আবদুর রহমান বিন ইয়ামার আদদাইলী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে আরাফাতে উপস্থিত ছিলাম। তখন তাঁর কাছে নাজদ থেকে আগত কিছু লোক প্রশ্ন করল যে, হজ্জ কি? রাসূলুল্লাহ (সা) জবাব দেন হজ্জ হচ্ছে অকুফে আরাফাহ! যে ব্যক্তি মোযদালেফার রাত্রে সোবহে সাদেকের আগ পর্যন্ত আরাফাতে আসবে তার অকুফ হয়ে যাবে এবং হজ্জ শুদ্ধ হবে। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ, হাকেম, বায়হাকী)।
অকুফের সময় হচ্ছে, ৯ই জিলহজ্জ তারিখ সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে মোযদালেফার রাত্রির সোবহে সাদেকের আগ পর্যন্ত। অর্থাৎ ফজরের সময়ের পূর্ব পর্যন্ত। এটাই হানাফী, শাফেঈ, মালেকী মাজহাব এবং অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদার সবাই দুপুরে সূর্য হেলে যাওয়ার পর অকুফ শুরু করেন। ইমাম আহমদের মতে, অকুফে আরাফার সময় হচ্ছে, ৯ই জিলহজ্জের ফজর থেকে মুযদালেফার রাত কুরবানীর দিনের ফজর শুরুর আগ পর্যন্ত। দিন এবং রাত্রের যেকোন সময় আরাফায় অকুফ করলে হজ্জ সহীহ হয়ে যাবে।
কেননা, নাসাঈ, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমদ এবং বায়হাকী মোদাররিস আত-তাঈ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের সাথে মোযদালেফায় ফজরের নামায পড়েছে, আমরা মিনায় রওনা দেয়ার আগ পর্যন্ত অকুফ করেছে এবং ইতিপূর্বে আরাফায় রাত বা দিনে অকুফ করেছে, তার হজ্জ পরিপূর্ণ হয়েছে। তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম আহমদ ব্যতীত অন্যান্য ইমামগণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাজকে তাঁর বক্তব্যের উপর প্রাধান্য দিয়ে বলেছেন, তিনি নিজে সূর্য হেলার পর আরাফাতে অকুফ করেছেন। তাই এটিই অকুফের প্রথম সময়।
কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজ্জ সংক্রান্ত মাসআলা গ্রহণ কর। অকুফের সর্বশেষ ওয়াক্তের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। মতভেদ হচ্ছে, অকুফের ওয়াক্ত শুরুর ব্যাপারে। অকুফে আরাফার পেছনে যে হেকমত কাজ করে তা হচ্ছে, হাজীরা আরাফাতে আল্লাহর ভয় এবং আশা ভরসা নিয়ে হাজির হয়। আল্লাহর কাছে তাদের কবুল কিংবা বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই মহান দিবসে তারা হাশরের বিচার দিনকে স্মরণ করবে। কেননা, এটি হাশরের ময়দানের একটি ছোট নমুনা। হাশরের দিন বহুলোক সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের অধিকারী হবে। মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিদের এই সম্মেলনে মুসলমানরা বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের নমুনা তুলে ধরে এবং তাদের ইমাম বা নেতা তাদের সামনে পারলৌকিক সৌভাগ্য এবং চিরন্তন হেদায়েতের ব্যাপারে বক্তব্য পেশ করেন। এই সবের আলোকে তারা ইচ্ছা করলে দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণের ব্যাপারে আরো অনেক বেশী উপকৃত হতে পারে।

আরাফাতের ফজীলত:
আরাফাতে অবস্থান করা আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়। মুসলিম, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ এবং বায়হাকী থেকে বর্ণিত আছে, হযরত আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন-
'আরাফাতের দিন ছাড়া আর অন্য কোন দিন, এত বেশী বান্দাহকে আল্লাহ দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দেন না। সেদিন আল্লাহ নিকটবর্তী হন, ফেরেশতাদের কাছে গর্ব-অহংকার করেন এবং বলেন, আমার এই বান্দাহগণ কী চায়?
মোয়াত্তা ও হাকেম হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: 'আরাফাতের দিন আল্লাহর রহমত নাজিল এবং বান্দাহর বড় বড় গুনাহসমূহ মাফ হতে দেখে শয়তানকে অন্য কোনদিন এত বেশী ছোট, নাজেহাল, অপমানিত, ঘৃণিত ও রাগান্বিত হতে দেখা যায়নি, তবে অনুরূপ শুধু বদর যুদ্ধের দিন দেখা গিয়েছিল।' প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! বদর যুদ্ধের দিন শয়তান কী দেখে ঐরকম হয়েছিল? রাসূলুল্লাহ (সা) জবাবে বলেন, 'শয়তান দেখেছিল যে জিবরীল (আ) ফেরেশতাদেরকে পরিচালনা করছেন।'
আরাফাতের ফজীলত সম্পর্কে হযরত জাবের (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন; রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
'জিলহাজ্জ মাসের ১ম ১০ দিনের চাইতে আর কোন উত্তম দিন নেই।' তখন একজন লোক জিজ্ঞেস করল: হে রাসূলুল্লাহ! এই দিনগুলো উত্তম, নাকি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে সমপরিমাণ দিন উত্তম? রাসূলুল্লাহ (সা) জবাবে বলেন: আল্লাহর রাস্তায় জেহাদের সমপরিমাণ দিনের চাইতে এগুলোই উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফাতের দিবসের চাইতে উত্তম কোন দিন নেই।
এই দিন আল্লাহ ১ম আসমানে নেমে আসেন এবং আকাশের ফেরেশতাদের কাছে যমিনের অধিবাসীদের সম্পর্কে গর্ব করেন। তিনি বলেন: 'তোমরা আমার বান্দাহদের প্রতি তাকাও, তারা ধূলা-মলিন ও রৌদ্রদগ্ধাবস্থায় দুনিয়ার সকল প্রান্ত থেকে আমার উদ্দেশ্যে ছুটে এসেছে, তারা আমার কাছে রহমত প্রত্যাশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখেনি।' আরাফাত দিবস অপেক্ষা অন্য কোনদিন এত বেশী সংখ্যক লোককে দোজখের আগুন থেকে মুক্তি দিতে দেখা যায় না। (বায়যার, আবু ইয়ালা, ইবনে খোযায়মা ও ইবনে হিব্বান)
তবে ইবনে খোযায়মা আরো একটু বাড়িয়ে বলেছেন, আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বলেন, 'আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি: আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম।' ফেরেশতারা বলবে: তাদের মধ্যে অমুক অমুক ব্যক্তি পাপী রয়েছে। তখন আল্লাহ জবাবে বলবেন, 'আমি তাদেরকে মাফ করে দিলাম।'
ইবনে মাজাহ এবং বায়হাকী আবদুল্লাহ বিন কেনানাহ বিন আব্বাস বিন মেরদাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে আবদুল্লাহর পিতা তাঁর দাদা আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: আরাফাত দিবসের বিকেলে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ উম্মতের ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দোয়া কবুল হল, কিন্তু আল্লাহ বলেন, আমি জালেমকে ক্ষমা করলাম না বরং তার কাছ থেকে মজলুমের অধিকার আদায় করে ছাড়বো। রাসূলুল্লাহ (সা) পুনরায় ফরিয়াদ করলেন, হে রব! আপনি চাইলে মজলুমকে বেহেশত দিতে পারেন এবং জালেমকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু আরাফাতের বিকেলে ঐ দোয়া কবুল হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সা) রাত্রে মোযদালেফায় পৌছে পুনরায় ঐ দোয়া করলেন। এবার তাঁর দোয়া কবুল হল। রাসূলুল্লাহ (সা) মুচকি হাসলেন। তখন হযরত আবু বকর এবং উমর (রা) বলেনঃ হে রাসূলুল্লাহ (সা)! আপনার জন্য আমাদের মাতা-পিতা কোরবান হউক; এই সময়েতো আপনার হাসার কথা নয়। কেন আপনি হাসলেন, আল্লাহই আপনাকে হাসিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ (সা) জবাবে বলেন: আল্লাহর দুশমন ইবলিশ যখন জানতে পারল যে আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন এবং আমার উম্মতের গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন, তখন সে নিজ মাথায় মাটি নিক্ষেপ শুরু করল এবং তার ধ্বংস ও ক্ষতির জন্য আহ্বান জানাল। আমি তার এই কষ্ট ও পেরেশানী দেখে হেসেছি। বায়হাকী বলেছেন এই হাদীসের সমার্থক আরো অনেক হাদীস আছে। সেগুলো তিনি كتاب البعث - এ উল্লেখ করেছেন।
ইবনে মোবারক উত্তম সনদ সহকারে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাতে সূর্যাস্তকালীন সময়ে হযরত বেলাল (রা) কে ডেকে বলেন: হে বেলাল! লোকদেরকে আমার কথা শোনার জন্য চুপ করতে বল। বেলাল লোকদেরকে চুপ করতে বলেন এবং লোকেরা চুপ করে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হে লোকেরা! এই মাত্র আমার কাছে জিবরীল এসে আল্লাহর সালাম পৌঁছে দিয়ে গেল এবং বলল, আল্লাহ আরাফাতবাসী এবং মোযদালেফার মাশআরুল হারামের অবস্থানকারীদের গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তিনি ক্ষমা করার পর তাদের জুলুম উঠিয়ে নিয়েছেন। হযরতন উমর (রা) দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই ক্ষমা কি শুধু আমাদের জন্য সীমিত? রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তরে বলে, এই ক্ষমা তোমাদের জন্য এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা আসবে তাদের সবার জন্য। তখন হযরত উমর (রা) মন্তব্য করেন: আল্লাহর কল্যাণ অনেক বেশী এবং এটা সুখপ্রদ।
বাজ্জার, তাবারানী এবং ইবনে হিব্বান হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন। সেই হাদীসের অংশবিশেষ হল: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আরাফাতের বিকেলে সেখানে তোমাদের অবস্থানের সময় আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন: 'আমার বান্দাহগণ আমার কাছে দুনিয়ার সকল প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে এসেছে, তারা ধূলা-মলিন। তোমাদের গুনাহ যদি বলুকারাশি, অগণিত বৃষ্টির ফোঁটা কিংবা সাগরের অসংখ্য ফেনারাশির মতও হয়, আমি তা মাফ করে দিলাম। তোমরা নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে যাও এবং যাদের জন্য তোমরা দোআ' করেছ তাদের গুনাহও মাফ করে দিলাম।'
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: أَعْظَمُ النَّاسِ ذَنْبًا مَنْ وَقَفَ بِعَرَفَةً فَظَنَّ أَنَّ اللَّهَ لَمْ يَغْفِرْ لَهُ -
অর্থ: সে ব্যক্তি সবচাইতে বড় গুনাহগার যে হজ্জের দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করেও ধারণ করে যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেননি।
এই হচ্ছে, আরাফাতের ক্ষমা দয়া, রহমত ও পুরস্কারের ঘোষণা। এ আরাফাতে গুনাহ মাফ না হলে, আর কোথায় গুনাহ মাফের এত উত্তম জায়গা পাওয়া যাবে? তাই আরাফাতের অবস্থানকে অর্থবহ করে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। আরাফাতের মূল শিক্ষা রাসূলুল্লাহর (সা) বিদায় হজ্জের খোতবার মধ্যে নিহিত।
আরাফাতের দিনে হাজীদের গোসল করা এবং জাবালে রহমতের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো সুন্নত। তবে পাহাড়ে উঠা সুন্নত নয়। পাহাড়ের পেছনে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা, তাকবীর, তাহলীল এবং আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত। বেশী বেশী তালবিয়া পড়া উত্তম। এই দিনে বেশী বেশী তত্তবা ও এস্তেগফার করা দরকার। রাসূলুল্লাহ (সা) জাবালে রহমতকে ডানে রেখে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন।

আরাফাতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিদায় ভাষণ:
রাসূলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জে আরাফাতের ময়দানে যে ভাষণ দেন তা বিশ্বের দিশেহারা মানবতার কল্যাণের জন্য মুক্তিসনদ। মুসলিম, আবু দাউদ এবং ইবনে মাজায় হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে। আরাফাতের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তোমাদের রক্ত ও সম্পদ আজকের এই পবিত্র দিন, মাস এবং শহরের মতই পবিত্র ও নিষিদ্ধ। জেনে রেখ, জাহেলিয়াতের সকল জিনিস আমার পায়ের নীচে এবং এগুলো সবই বাতিল। জাহেলিয়াতের রক্তপণ বাতিল। আমাদের পক্ষ থেকে আমি সর্বপ্রথম ইবনে রবিআ বিন হারেস বিন আবদুল মোত্তালিবের রক্তপণ প্রথা বাতিল ঘোষণা করছি। সে বনি সাদ গোত্রে দুধ পানকারী পোষ্য শিশু ছিল। হোজাইল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। জাহেলিয়াতের সুদকে আমি বাতিল ঘোষণা করছি এবং আমাদের পক্ষ থেকে আমি প্রথম আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের সকল প্রাপ্য সুদকে বাতিল করছি। এগুলো সবই বাতিল। নারীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর জামানতে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নির্দেশ দ্বারা তাদের লজ্জাস্থানকে হালাল করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হচ্ছে, তোমাদের বিছানায় কোন লোককে স্থান না দেয়া। যা তোমরা কখনও পছন্দ করবে না। যদি তারা অনুরূপ করে তাহলে তাদেরকে জখম না করে মেরে শাস্তি দাও। কিন্তু স্মরণ রেখ, তোমাদের উপর তাদের ইনসাফপূর্ণ ভরণ-পোষণের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা যে পর্যন্ত এই দুটো জিনিসের অনুসরণ করবে সে পর্যন্ত গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটো জিনিস হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাত। আমার দায়িত্ব সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করলে কি বলবে? সবাই উত্তর দেয় আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আপনার দায়িত্ব পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং উপদেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠিয়ে বলেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক।

আরাফাতের শিক্ষা:
রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাতের বিদায় হজ্জের ভাষণে প্রধান ৫টা বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। এই বিষয়গুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার না থাকলে আরাফাতে এসে আকাঙ্ক্ষিত ফায়দা লাভ করা যাবে না।
তিনি প্রথমতঃ জানমালের নিরাপত্তার কথা বলেছেন। আমরা কি একে অপরের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে পারছি? কথায় কথায়, মানুষ হত্যা করা, গুলী করা এবং মানুষের ইজ্জত সম্মান ছিনিয়ে নেয়া কি রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই ভাষণ বিরোধী নয়? আমাদের সমাজে বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নেই। চুরি-ডাকাতি-রাহাজানী, নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই হচ্ছে মুসলিম দেশের অবস্থা। অমুসলমান দেশগুলোতেও জান-মালের নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। এ ছাড়াও যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে এই মানবিক নীতিকে আরো বেশী পদদলিত করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়তঃ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, জাহেলিয়াতের সকল বিষয় ও রীতি-নীতি বিলুপ্ত করা হয়েছে। আরাফাত থেকে আমাদের সমাজের দিকে তাকালে আমরা কি সেখানে জাহেলিয়াতের সকল রীতি-নীতি, আইন-কানুন ও পরিবেশ বহাল দেখতে পাইনা? জাহেলিয়াতের মতই আমাদের সমাজে উলঙ্গপনা-বেহায়াপনা, অশ্লীল নাচ-গান, উপন্যাস, মারামারি, হানাহানি, অজ্ঞতা, মূর্খতা, বর্বরতা ইত্যাদি বিরাজ করছে না? বরং আগের জাহেলিয়াত থেকে বর্তমান জাহেলিয়াত আরো বেশী জঘন্য। অশ্লীল ছায়াছবি, পত্র-পত্রিকা, রেডিও টেলিভিশনের অরুচিকর কর্মসূচী ইত্যাদি আগের জাহেলিয়াতকেও হার মানায়।
তৃতীয়তঃ রাসূলুল্লাহ (সা) অনৈসলামী অর্থনীতির প্রধান বাহন সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। ইসলামী রাজনীতি তথা কোরআন ও হাদীসের আইন ছাড়া কোন সমাজে ইসলামী অর্থনীতি কায়েমের স্বপ্ন দেখাও সম্ভব নয়। আমরা কি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র, ব্যাংক বীমা-ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারী ও বেসরকারী খাত থেকে অভিশপ্ত সুদকে দূর করেছি? যদি না করে থাকি তাহলে, আরাফাতে হাজিরা দিয়ে লাভ কি? আরাফাতে হাজিরা দিয়ে আরাফাতের এই শিক্ষা গ্রহণ না করে খালি হাতে আরাফাত থেকে বিদায় নেয়ার সার্থকতা কোথায়?
চতুর্থঃ রাসূলুল্লাহ (সা) নারী-অধিকারের কথা বলেছেন। আমাদের সমাজে নারীরা তাদের উপযুক্ত মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। ইসলাম তাদের যে সকল অধিকার দিয়েছে, আমরা সেগুলো থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখছি। আমরা তাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করি না। ওয়ারিশ হিসেবে তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওনা সম্পত্তি দেইনা এবং আমরা মহিলা আত্মীয়দের খোঁজ-খবর নেই না। তাদের দেন-মোহর আদায়ের ব্যাপারেও আমরা সচেষ্ট নই। এগুলো গুরুতর অন্যায় এবং হারাম কাজ। তাদের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) আদেশ দিয়েছেন।
পঞ্চমতঃ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে কোরআন ও হাদীস আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, এ দুটো অনুসরণ করলে তোমরা গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হবে না। আর এ দু'টোকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে অনুসরণ করলে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ হয়ে যাবে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এবং নাগরিকেরা আল্লাহর কোরআন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসের পরিবর্তে মানব রচিত মতাদর্শ ও মতবাদ অনুসরণ করছে। এগুলো সবই ভুল ও ভ্রান্ত এবং এগুলোর একমাত্র পরিণতি হচ্ছে দুনিয়ায় বিভিন্ন রকম আজাব-গযব এবং পরকালে দোজখের কঠিন শাস্তি। কোরআনে এসেছে: إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ (آل عمران - ১৯) 'নিশ্চয়ই আল্লাহ ইসলামকেই একমাত্র দ্বীন ও জীবন ব্যবস্থা এবং আইন-কানুন হিসেবে মনোনীত করেছেন।'
ইসলাম ছাড়া আর যত মানব রচিত মতবাদ আছে, ইসলামের দৃষ্টিতে সেগুলো হচ্ছে জাহেলিয়াত। আরাফাতে হাজিরাদানকারী একজন হাজীর জীবনে আরাফাতের শিক্ষা হচ্ছে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা এবং মানব রচিত মতবাদ সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে অস্বীকার করা। ইসলামকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ থেকে অন্যান্য জাহেলী মতবাদকে উচ্ছেদ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুসরণে জেহাদের ডাক দিয়ে সবাইকে সংগঠিত করে বাতিলের উৎখাতের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া আরাফাতের অন্যতম শিক্ষা।
বিদায় হজ্জের দিন সর্বশেষ এই আরাফাতের ময়দানেই কোরআন নাযিল হয়। এরপর আর কোরআন নাযিল হয়নি।
আরাফাতের নাযিল হওয়া সর্বশেষ আয়াতটি হচ্ছে:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَاتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيْتُ لَكُمُ الإِسْلامَ دِينًا - (المائدة - ٩)
অর্থ: 'আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, আমার নেয়ামত পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন বা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।' এই আয়াতে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এর অর্থ হল, এতে মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগের প্রয়োজনীয় আইন ও বিধান রয়েছে। তাই একজন মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামষ্টিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম বিরোধী সকল মত ও পথ ত্যাগ করতে হবে এবং মানব রচিত মতাদর্শ গ্রহণ করা থেকে দূরে থাকতে হবে। শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য মানবাধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রদর্শিত ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। ইসলামের বিশ্বব্যাপী এই আদর্শিক আন্দোলনে, একজন হাজী হচ্ছে আল্লাহর একজন বিরাট সৈনিক। উপরোক্ত আয়াতটি যেহেতু আরাফাতে নাযিল হয়েছে, তাই আরাফাতে অবস্থানকারী ও হাজিরাদানকারী হাজীদের এটি ভাল করে বুঝা ও বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব অন্যদের চাইতে বেশী।
আরাফাত থেকে বিদায় নেয়ার পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরাম কেউ দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব এবং দ্বীনের দাওয়াত ও জেহাদ থেকে হাত-পা গুটিয়ে বসেছিলেন না বরং আরো দ্বিগুণ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে তারা দ্বীনী আন্দোলনের কাজ করে গেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবায়ে কেরামের সঠিক অনুসরণের জন্য তাঁদের মতই আমাদের হজ্জ পরবর্তী ভূমিকা গ্রহণ করা জরুরী। হজ্জ করে তারা একথা মনে করেননি যে, আমাদের গুনাহ মাফ হয়ে গেছে, এখন আমরা বিশ্রাম করি এবং এখন আর আমাদের আগের মত দ্বীনের দাওয়াত ও জেহাদ করার দরকার নেই। বিপরীত পক্ষে, তাঁরা মনে করেছেন, আরাফাতে যাওয়ার পর আমাদের উপর আরো কিছু বাড়তি দায়িত্ব এসেছে এবং সেই দায়িত্ব পালনে তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণের মধ্যেই আমাদের মুক্তি নিহিত রয়েছে। তাই অন্যান্য বিষয়গুলোর মত এক্ষেত্রেও আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের মহান হজ্জ ও প্রাসঙ্গিক এবাদতসমূহ সফল করার চেষ্টা করতে হবে।

আরাফাহ দিবসের দোয়া:
মালেক ও বায়হাকী তালহা বিন আবদুল্লাহ বিন কোরাইশ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন- أَفْضَلُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَأَفْضَلُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ (১) قَبْلِي : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ -
অর্থ : আরাফাহ দিবসের দোয়াই উত্তম দোয়া এবং আমি সহ আমার আগের অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম যে উত্তম দোয়াটি পড়েছেন তা হচ্ছে : লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শারীক নেই। ইমাম তিরমিযী দোয়াটি আরো একটু বেশী যোগ করে বর্ণনা করেছেন। لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى (২) كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
অর্থ : রাজত্ব তাঁর প্রশংসাও তাঁর। তিনি সকল কিছুর উপর শক্তিবান।
হযরত আমর বিন শোয়াইব তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যে আরাফাতের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) উপরোক্ত দোয়াটি বেশী করে পড়তেন। হযরত যোবাইর বিন আওয়াম (সা) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে আরাফাতের দিন নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়তে শুনেছি- شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا (৩) بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
অর্থ : আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। ফেরেশতা এবং জ্ঞানীরাও ইনসাফের সাথে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি সম্মানী, শক্তিশালী এবং বিজ্ঞ।
তিনি দোয়াটি পড়ে বলতেন, হে রব, আমিও একথার সাক্ষ্য দিচ্ছি।
হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীরা যে উত্তম দোয়াটি পড়েছেন তা হলো, উপরোক্ত দোয়াটির মত। তবে এর শেষে আরো একটু যোগ করেছেন
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي بَصَرِي نُورًا وَفِي سَمْعِي نُورًا وَفِي قَلْبِي نُورًا (8) اللَّهُمَّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي - اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وسواس الصَّدْرِ وَشَتَاتِ الأَمْرِ وَشَرِّ فِتْنَةَ الْقَبْرِ وَشَرَّ مَا يَلِجُ فِي اللَّيْلِ وَشَرِّ مَا يَلِجُ فِي النَّهَارِ وَشَرِّ مَا تَهِبُّ بِهِ الرِّيَاحُ وَشَرَبُوَائِقَ الدَّهْرِ . (بيهقی)
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমার দৃষ্টিশক্তিতে নূর (আলো) দাও, আমার শ্রবণ শক্তিতে নূর দাও এবং আমার অন্তরে নূর দাও। হে আল্লাহ! আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দাও এবং আমার কাজকে সহজ করে দাও। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আমার অন্তরের ওয়াসওয়াসা, কাজের বিশৃংখলা, কবর আজাব, রাত ও দিনে অনুপ্রবেশকারী মন্দ, অনিষ্টকর বাতাস প্রবাহের ক্ষতি এবং যুগের ধ্বংসাত্মক ক্ষতিসমূহ থেকে পানাহ চাই।
হযরত আলী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাতের ময়দানে নিম্নোক্ত দোয়াটিও বেশী বেশী পড়তেন:
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كَالَّذِي نَقُولُ وَخَيْرًا مِّمَّا نَقُولُ اللَّهُمَّ لَكَ (1) صَلاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي وَإِلَيْكَ مَا بِي وَلَكَ رَبِّ تُرَاثَى اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَوَسْوَةِ الصَّدْرِ وَشْتَاتِ الْأَمْرِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَهِبُّ بِهِ الرِّيحُ - (الترمذي)
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমরা যে রকম পারি সে রকম কিংবা তার চাইতেও শ্রেষ্ঠ সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই প্রাপ্য। হে আল্লাহ! তোমার উদ্দেশ্যেই আমার নামায, কোরবানী, জীবন ও মৃত্যু নিবেদিত; তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন এবং তোমার জন্যই আমার উত্তরাধিকার। হে আল্লাহ! আমি কবর আজাব, মনের ওয়াসওয়াসা এবং কাজের বিশৃংখলা থেকে পানাহ চাই! হে আল্লাহ! আমি বাতাসের প্রবাহের অনিষ্ট হতে আশ্রয় চাই।'
হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন। আল্লাহ বলেন, مَنْ شَغَلَهُ ذِكْرٌ عَنْ مَسْأَلَتِي أَعْطَيْتُهُ أَفْضَلَ مَا أُعْطِيَ السَّائِلِينَ - (৬) (اخرجه ابوذر)
অর্থ: 'আমার জেকরের কারণে যে ব্যক্তি আমার কাছে কিছু চাইতে পারেনি আমি তাকে প্রার্থনাকারীদের চাইতেও উত্তম দান করবো।'
হযরত আলী (রা) বলেন, আরাফাতের যে সুযোগ পেয়েছি তা হাতছাড়া করবো না। কেননা, এই দিনেই যমীনে আল্লাহর বহু বান্দাহ মুক্তি পাবে। আরাফাতের দিনের চাইতে অন্য কোন দিন এত বেশী লোককে আল্লাহ দোজখের আগুন থেকে মুক্ত দেন না। এই জন্য নিম্নের দোয়াটি বেশী বেশী পড়া দরকার।
اللَّهُمَّ أَعْتِقْ رَقَبَتِي مِنَ النَّارِ وَأَوْسِعْ لِي مِنْ الرِّزْقِ الْحَلَالِ (৯) واصْرِفْ عَنِّى فَسَقَةَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ .
অর্থ: হে আল্লাহ! দোজখের আগুন থেকে আমার গর্দানকে মুক্ত কর। আমার জন্য হালাল রিজক প্রশস্ত কর এবং জ্বিন ও মানুষ শয়তানকে আমার থেকে দূরে রাখ। তিনি বলেন, আজকে এটাই হবে আমার স্বাভাবিক দোয়া। (মুসীরুল গারাম)
হযরত ইবনে উমর তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন। তারপর একবার বলতেন- لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ - (৬)
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি একও অদ্বিতীয়, রাজত্ব ও প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য
তারপর তিনবার বলতেন اللَّهُمَّ اهْدِنِي بِالْهُدى وَاعْصِمْنِي بِالتَّقْوى فِي الْآخِرَةِ وَالْأُولى - (۵)
অর্থ: হে আল্লাহ আমাকে সত্য পথ দেখাও এবং তাকওয়া দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতকে হেফাজত কর।
তারপর সূরা ফাতেহা পড়ার পরিমাণ সময় চুপ করে থাকতেন। এরপর আগের মত ঐ দোয়াগুলো পড়তেন। সবশেষে পড়তেন:
(১০) اللَّهُمَّ اجْعَلْ حَجًّا مَّبْرُورًا وَذَنْبًا مَّغْفُورًا হে আল্লাহ হজ্জ কবুল কর এবং গুনাহ মাফ কর।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাতের ময়দানে যে সকল দোয়া পড়েছেন তার মধ্যে একটি হল:
اللَّهُم إِنَّكَ تَسْمَعُ كَلَامِي وَتَرَى مَكَانِي وَتَعْلَمُ سِرِّى وَعَلَانِيَتِي (دد) وَلَا يَخْفَى عَلَيْكَ شَيْءٌ مِّنْ أَمْرِي أَنَا الْبَائِسُ الْفَقِيرُ الْمُسْتَغِيْثُ مُسْتَجِيرُ الْوَجَلُ الْمُشْفِقُ الْمُعْتَرِفُ بِذَنْبِهِ أَسْأَلُكَ مَسَالَةَ الْمِسْكِينِ وَابْتَهِلُ إِلَيْكَ ابْتِهَالَ الْمُذْنِبِ الدَّلِيلِ وَادْعُوكَ دُعَاءَ الْخَائِفِ الضَّرِيرِ مَنْ خَضَعَتْ لَكَ رَقَبَتُهُ وَفَاضَتْ لَكَ عَبْرَتُهُ وَذَلَّ لَكَ خَدُّهُ وَرَغِمَ لَكَ أنْفُهُ اللَّهُم لَا تَجْعَلْنِي بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَكُنْ بِي رَوْفًا رَّحِيمًا يا خَيْرَ الْمَسْقُ لِينَ وَيَا خَيْرَ الْمُعْطِينَ - ( اخرجه ابوذر )
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমার কথা শুনতে পাও; তুমি আমার অবস্থান দেখতে পাও প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবকিছু জান। আমার কোন বিষয় তোমার কাছে গোপন নেই। আমি বিপদগ্রস্ত, দরিদ্র, সাহায্য প্রার্থনাকারী, আশ্রয় প্রার্থী, ভীত-সন্ত্রস্ত, নিজ গুনাহ স্বীকারকারী; তোমার কাছে মিসকীনের ফরিয়াদ জানাই এবং লাঞ্ছিত পাপীর করুণ অনুশোচনা নিবেদন করি, তোমার কাছে ভীত-সন্ত্রস্ত লোকের দোয়া চাই; যার গর্দান তোমার অনুগত, তোমার জন্য যার চোখের পানি ঝরে, যার গণ্ডদেশ বিনীত এবং যার নাক তোমার জন্য ধূলা-মলিন। হে আল্লাহ! তোমার কাছে দোয়া কবুলের ব্যাপারে আমাকে হতভাগ্য করোনা এবং আমার প্রতি তুমি সদয় ও মোহেরবান হও। হে উত্তম প্রার্থনার কেন্দ্র ও সর্বোত্তম দাতা!
হযরত আলী এবং আবদুল্লাহ বিন মাসুদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তারা উভয়ে বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আরাফাতের ময়দানে নিম্নোক্ত দোয়ার চাইতে আর কোন উত্তম কথা ও কাজ নেই। আল্লাহ আরাফাতে সেই ব্যক্তির দিকেই প্রথম লক্ষ্য করবেন যে ব্যক্তি কিবলামুখী হয়ে দোয়ার জন্য দু'হাত তুলে তিনবার তিনবার করে তালবিয়া ও তাকবীর বলবে এবং এই দোয়াটি ১০০ বার পড়বে: لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ ٱلْمُلْكُ وَلَهُ ٱلْحَمْدُ يُحْيِي (৫২) وَيُمِيتُ بِيَدِهِ ٱلْخَيْرَ
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, রাজত্ব তাঁর, প্রশংসাও তাঁর। তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন। তাঁর হাতে সকল কল্যাণের চাবিকাঠি। তারপর এই দোয়াটি ১০০ বার পড়বে: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِٱللَّٰهِ ٱلْعَلِيِّ ٱلْعَظِيمِ أَشْهَدُ أَنَّ ٱللَّٰهَ عَلَىٰ كُلِّ (৫৩) شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ ٱللَّٰهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا .
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন শক্তি নেই। তিনি বড় ও মহান। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ সকল কিছুর উপর শক্তিমান এবং সকল বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী। তারপর তিনবার পড়বে: أَعُوذُ بِٱللَّٰهِ مِنَ ٱلشَّيْطَانِ ٱلرَّحِيمِ أَنَّ ٱللَّٰهَ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ - (৫৪)
অর্থ: আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে পানাহ চাই। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রোতা ও জ্ঞানী। তারপর বিসমিল্লাহ পড়ে তিনবার সূরা ফাতিহা পড়তে হবে এবং শেষে বলবে 'আমীন'। তারপর বিসমিল্লাহসহ সূরা এখলাস (قُلْ هُوَ ٱللَّٰهُ أَحَدٌ) একশ'বার পড়তে হবে। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর একশ'বার নিম্নোক্ত দরূদ পাঠ করতে হবে। صَلَّىٰ ٱللَّٰهُ وَمَلَائِكَتُهُ عَلَى ٱلنَّبِيِّ ٱلْأُمِّيِّ وَعَلَىٰ آلِهِ وَعَلَيْهِ (৫৫) السَّلَامُ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ .
অর্থ: আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নিরক্ষর নবী ও তাঁর বংশধরের উপর দরুদ ও সালাম পাঠায়। নবীর উপর সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত কামনা করি।
তারপর নিজের জন্য দোয়া করবে, নিজের মা-বাপ-আত্মীয় স্বজন এবং সকল মোমেন নর-নারীর জন্য দোয়া করবে। দোয়া থেকে অবসর হওয়ার পর হাদীসের প্রথম অংশে বর্ণিত বাণীটা তিনবার উচ্চারণ করবে (এই জায়গায় নিম্নোক্ত দোয়া ছাড়া কোন উত্তম কথা ও কাজ নেই) তারপর যখন সন্ধ্যা হয়ে আসে আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, হে ফেরেশতারা, দেখ, আমার এই বান্দাহ কিবলামুখী হয়ে আমার তাকবীর, তালবিয়া, তাসবীহ, তাহলীল ও হামদ প্রকাশ করেছে। আমার অতিপ্রিয় সূরাগুলো পাঠ করেছে, এবং আমার নবীর উপর দরূদ পাঠ করেছে। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি তার আমল কবুল করেছি, আমার উপর এর বিনিময় ওয়াজিব করেছি, তার গুনাহ মাফ করে দিয়েছি, তাকে সুফারিশপ্রাপ্ত লোকদের শ্রেণীভুক্ত করেছি এবং যদি তাকে আরাফাতে অবস্থানকারী সুফারিশপ্রাপ্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে তাও হতে পারে।
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, কোন বান্দাহ বা উম্মত যদি আরাফার রাত্রে ১ হাজার বার নিম্নোক্ত ১০টি কালেমা পাঠ করে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ তাকে যা চাবে তাই দেবেন। শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী অথবা বিশেষ পাপী ব্যক্তি ব্যতীত। সেই কালেমাগুলো হচ্ছে-
(১) سُبْحَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ عَرْشُهُ (২) سُبْحَانَ الَّذِي فِي (السَّمَاءِ) الْأَرْضِ مَوْطِنُهُ (৩) سُبْحَانَ الَّذِي فِي الْبَحْرِ سَبِيلُهُ (٤) سُبْحَانَ الَّذِي فِي النَّارِ سُلْطَانُهُ (٥) سُبْحَانَ الَّذِي فِي الْجَنَّةِ رَحْمَتُهُ (٦) سُبْحَانَ الَّذِي فِي الْقَبْرِ قَضَاؤُهُ (۷) سُبْحَانَ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاءَ (۸) سُبْحَانَ الَّذِي وَضَعَ الْأَرْضَ (۹) سُبْحَانَ الَّذِي لَا مَنْجَى وَلَا مَلْجَا مِنْهُ إِلا إِلَيْهِ (۱۰) سُبْحَانَ الَّذِي فِي الْقُرْآنِ وَحْيُهُ .
অর্থ: সেই আল্লাহর জন্য পবিত্রতা ১. যাঁর আসন আসমানে, ২. যাঁর পায়ের স্থান যমীনে, ৩. যাঁর পথ সাগরে, ৪. যাঁর কর্তৃত্ব দোযখে, ৫. যাঁর রহমত বেহেশতে, ৬. যাঁর ফয়সালা কবরে, ৭. যিনি আসমানকে উপরে সৃষ্টি করেছেন, ৮. যিনি যমীনকে নীচে সৃষ্টি করেছেন, ৯. যিনি ছাড়া আর কোন মুক্তি ও আশ্রয়কেন্দ্র নেই, ১০. এবং কোরআনে যাঁর আদেশ রয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, আরাফাতের দোয়া হচ্ছে শ্রেষ্ঠ দোয়া। এজন্য সেখানে কান্নাকাটা করে বেশী বেশী দোয়া ও এস্তেগফার করা দরকার। সেখানে দোয়া কবুল হয় এবং আল্লাহর উত্তম বান্দাহদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যাদের বন্ধু আল্লাহর কোন প্রিয়ভাজন ব্যক্তি নয়, সে নিতান্ত দুর্ভাগা। তবে মোবাহ কোন কাজে ব্যস্ত থাকলে গুনাহ হবে না। উচিত হল নেক ও সওয়াবের কাজ করা।

যোগাযোগ:
বর্তমানে মোযদালেফা-মিনার সাথে আরাফাতের যানবাহন যোগাযোগ এবং পায়ে হেঁটে চলার জন্য ৯টি পাকা রাস্তার সংযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। আরাফাতের ভেতরেও বহু সড়ক তৈরি করা হয়েছে। তাতে যানবাহন চলাচলের যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে।
আরাফাত থেকে মোযদালেফা-মিনাগামী রাস্তাগুলোর মধ্যে ২ টাকে হাজীদের পায়ে চলার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং এগুলোকে গাড়ীর রাস্তা থেকে পৃথক করা হয়েছে। আরাফাতের চারদিকে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রিং রোড তৈরি করা হয়েছে। এতে ৪টা ওভারব্রীজ আছে। দু'টো ওভারব্রীজ পায়ে চলার রাস্তায় আর দুটো গাড়ীর রাস্তায় পড়ে। আরাফাতে বর্তমানে ৪টি সংযোগ সড়ক আছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আরাফাতে ভবিষ্যতে ৩০ লাখ হাজীর প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রধান সড়ক, সংযোগ সড়ক, পায়ে চলার পথ, গাড়ীর রাস্তা, হাজীদের জন্য আঙ্গিনা, সুয়েরেজ এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য বিরাট পরিকল্পনা নিয়েছে।
আরাফাতের উত্তর পার্শ্বে আগমনকারী গাড়ীর জন্য ২ লাখ ৪০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের উপর গাড়ীর পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়াও আরাফাত থেকে মোযদালিফা-মিনা হয়ে মসজিদে হারামে পৌঁছার জন্য মাহবাসূল জিনের সুড়ঙ্গমুখ পর্যন্ত এয়ারকণ্ডিশনযুক্ত শেড নির্মাণ করা হয়েছে, এর মাধ্যমে হাজীদের পায়ে চলার রাস্তাকে ছায়াদার বানানো হয়েছে। গরমকালে, ছায়াদানের জন্য আরাফাতের বহু গাছ লাগানো হয়েছে।

পানি সেবা:
১৪০৯ হিজরীতে, আরাফাত ময়দানে ১৪ লাখ ৭৭ হাজার হাজী ১ লাখ ২৫ হাজার ঘনমিটার পানি ব্যবহার করে। এত বিপুল সংখ্যক লোকের পানির চাহিদা পূরণ করার জন্য সৌদী সরকার আরাফাতে মোট ৪টি পানির রিজার্ভার নির্মাণ করেছে। সেগুলো হচ্ছেঃ
১নং রিজার্ভার: আরাফাতের উত্তরে রিং রোডের উপর আরাফাতের এই প্রধান রিজার্ভারটি ৫০ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণ ক্ষমতার অধিকারী। এটি সাগরের স্তর থেকে ৪০৬ মিটার উপরে এবং এর উচ্চতা হচ্ছে ৮ মিটার। ১৩৯২ হিজরীতে এটি চালু হয়। শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্প সরবরাহ লাইন থেকে চওড়া পাইপের মাধ্যমে এতে পানি আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও এতে জমুম হয়ে নোমান উপতক্যার পানি আনার ব্যবস্থাও রয়েছে। এর পানি বিশুদ্ধ করা হয় এবং মক্কা পানি নেটওয়ার্কে তা সরবরাহ করা হয়।
২নং রিজার্ভার: ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই রিজার্ভারটি দক্ষিণ আরাফাতের রিং রোডে, সাগরের স্তর থেকে ৩৬৫ মিটার উপরে নির্মিত। এর উচ্চতা হচ্ছে ৬ মিটার। ১৪০৮ হিজরীতে তা চালু হয়। জমুম পানি নেটওয়ার্ক এবং শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্প নেটওয়ার্ক থেকে এতে পানি এনে তা বিশুদ্ধ করার পর সরবরাহ করা হয়।
৩নং রিজার্ভার: ১ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই রিজার্ভারটির নাম হচ্ছে শাইর রিজার্ভার। এটি আরাফাতের পূর্ব দিকের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।
৪নং রিজার্ভার: মসজিদে নামেরার ভূগর্ভস্থ ৬টি রিজার্ভারে ১২ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। তা ছাড়াও মাটির উপরে নির্মিত দুটো রিজার্ভারে ২ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে।
আরাফাত থেকে মিনা পর্যন্ত রাস্তার পার্শ্বে মোট ৭৪০টি স্থানে ঠাণ্ডা পানি পান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতি স্থানে টেপ লাগানো আছে। শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্পের সরবরাহ লাইনের পানি এতে সরবরাহ করা হয়। আরাফাত ময়দানেও অনুরূপ ৪ হাজার পানিপান কেন্দ্র আছে। সৌদি সরকার আরাফাতে হাজীদের সুবিধার্থে হাজার হাজার টয়লেট নির্মাণ করেছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মোযদালেফা

📄 মোযদালেফা


মোযদালেফা হচ্ছে মিনা এবং আরাফাতের মধ্যে অবস্থিত একটি জায়গার নাম।
হাজীরা আরাফাহ থেকে ৯ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার পর, এখানেই রাত্রি যাপন করেন। মূলত: মোযদালেফা হচ্ছে আরাফাগামী মাজেমাইন নামক দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ পথ মাদীক এবং মোহাস্সার উপত্যকার মাঝামাঝি অবস্থিত ৪ হাজার ৩শত ৭০ মিটার দীর্ঘ একটি স্থানের নাম।
মোযদালেফার নাককরণের ব্যাপারে অনেকগুলো মতভেদ আছে। সেগুলো হচ্ছে (১) এযদেলাফ থেকে মোযদালেফা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এযদেলাফ অর্থ হচ্ছে নিকটবর্তী হওয়া। মোযদালেফায় সকল হাজী একত্রিত হয় বলে একে অপরের নিকটবর্তী হয়। তাই একে মোযদালেফা বলা হয়। (২) মোযদালেফায় অবস্থানের মাধ্যমে হাজীরা আল্লাহর নিকটবর্তী হয় বলে একে মোযদালেফা বলা হয়। (৩) এযদেলাফ অর্থ হচ্ছে মিলিত বা জমা হওয়া। লোকেরা সেখানে মিলিত ও জমা হয়। তাই একে মোযদালেফা বলা হয়। (৪) আল্লাহর কুদরতে এখানে হযরত আদম (আ) এবং হাওয়া মিলিত হয়েছেন বলে একে মোযদালেফা বলা হয়। (৫) এখানে হাজীরা মাগরিব এবং এশার নামায এক সাথে মিলিয়ে পড়ে বলে একে মোযদালেফা বলা হয়।
মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব। হযরত ইবনে উমরের মতে গোটা মোযদালেফাই মাশআরুল হারাম। তাই এর যে কোন জায়গায় রাত্রি যাপন করা যাবে। অন্যান্য আলেমদের মতেও মোযদালেফার সর্বত্র রাত্রি যাপন করা যাবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 'মোযদালেফার সর্বত্র অকুফের স্থান।' তবে তাঁরা মাশাআরুল হারাম বলতে মোযদালেফার মধ্যবর্তী স্থান 'কোযাহ' পাহাড়কে বুঝান। তাঁরা এই জায়গায় হাজীদের অবস্থান ও রাত্রি যাপন, আল্লাহর জেকর ও শোকর এবং এবাদত করাকে মোস্তাহাব বলেছেন। বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) রাত্রে এখানেই অবস্থান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুকরণে এই জায়গায় অবস্থান উত্তম। মোযদালেফার বর্তমান মসজিদের স্থানে ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সা) দোআ ও জিকরে ব্যস্ত ছিলেন এবং সুর্যোদয়ের আগে আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। অনেকের মতে, গোটা মোযদালেফাই মাশআরুল হারাম।
আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেছেন- فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ - (بقره : ۱۹۸)
অর্থ: 'তোমরা যখন আরাফাত থেকে ফিরে আস তখন মাশআরুল হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ কর এবং তিনি যেভাবে তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন সেভাবে তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর।' মাশআরুল হারাম অর্থ এবাদতের সম্মানিত নির্দশনের স্থান।
মুসলিম শরীফে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোযদালেফায় এসে এশার সময় মাগরেবের এবং এশার নামাযকে একই আযান ও দু' একামত সহকারে আদায় করেছেন।
এমনকি দুই নামাযের মাঝখানে কোন সুন্নাত পড়েননি এবং কোন নফল এবাদতও করেননি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মোযদালেফায় সুন্নাতও নফল ত্যাগ করাই হচ্ছে সুন্নাত। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) এগুলো আদায় করেননি। তবে বিতরের নামায আদায় করতে হবে। যাই হোক, এরপর তিনি রাত্রের খানা খেয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে মোযদালেফায় ঘুমানো সুন্নাহ। এর মাধ্যমে শরীরের দাবী পূরণ করে তিনি উম্মাহর জন্য বিশেষ শিক্ষা রেখে গেছেন। তিনি সোবহে সাদেকের আগে উঠেছেন এবং সোবহে সাদেকের অন্ধকার দূর হওয়ার আগেই আজান ও একামত সহকারে ফজরের নামায পড়েছেন। একেবারে প্রথম ওয়াক্তে নামায পড়ার উদ্দেশ্য হল, পরে যেন দোয়া ও তাসবীহ-তাহলীলের সময় বেশী পাওয়া যায়। তারপর তিনি কোসওয়া নামক উষ্ট্রীর পিঠে চড়ে মাশআরে হারামে আসেন এবং কেবলামুখী হয়ে তাকবীর তাহলীল পাঠ করেন এবং আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করেন। তিনি ফদল বিন আব্বাস (রা)-কে মোযদালেফা থেকে কংকর সংগ্রহ করে দেয়ার জন্য বলেন। সে অনুযায়ী ফদল (রা) ১ম দিন জামরাহ আকাবায় নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য কংকর এনে দেন।
সূর্য উঠার একটু আগে আকাশ যখন বেশ ফর্সা হয়ে উঠল তখন তিনি মোযদালেফা থেকে রওনা দেন এবং মোহাম্সার উপত্যকায় এসে একটু জোরে চলেন। তিনি মোযদালেফা থেকে যে রাস্তায় মিনায় আসেন তার বর্তমান নাম হচ্ছে 'সোকুল আরব'। এর আগে তিনি মিনা থেকে আরাফাতে যাওয়ার সময় দব নামক রাস্তা দিয়ে যান, রাসূলুল্লাহর (সা) অভ্যাস ছিল এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। এরপর তিনি বড় জামরাহমুখী রাস্তা দিয়ে বড় জামরাহর কাছে অবস্থিত গাছের নিকট অবতরণ করেন এবং সূর্যোদয়ের কিছু পর বড় জামরায় ৭টি পাথর টুকরো নিক্ষেপ করেন। প্রত্যেক বার কংকর নিক্ষেপের সাথে তিনি তাকবীর বলেন এবং পরে জবেহখানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তিনিসহ সাহাবায়ে কেরামের জন্য আনীত ১শ' উটের মধ্যে তিনি নিজ হাতে ৬৩টি জবেহ করেন এবং বাকীগুলো হযরত আলী (রা) কে জবেহ করার নির্দেশ দেন। পরে তিনি কোরবানীর গোশত খান।
জাহেলিয়াতের সময় লোকেরা সূর্যোদয়ের পর মোযদালেফা থেকে রওনা হত এবং বলত সাবির পাহাড়ে আলো এসেছে, আমরা যেন রওনা হই। রাসূলুল্লাহ (সা) জাহেলিয়াতের রীতি-নীতির বিরোধিতা করে সূর্যোদয়ের সামান্য আগে, মোযদালেফা থেকে মিনা রওনা হন।
জাহেলিয়াতের সময় আরাফাত থেকে মোযদালেফায় আগমনকারী লোকদের উদ্দেশ্যে আগুন জ্বালানো হত যেন তারা ঠিকমত পৌঁছতে পারে এবং পথ না হারায়। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোযদালেফায় আসার সময় সেখানে আগুন জ্বলছিল। তিনি সেই আগুনের পার্শ্বে অবতরণ করেন। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবু বকর, উমর এবং উসমান (রা) এর সময়ও মোযদালেফায় আগুন জ্বালানো হত।
'অকুফে মোযদালেফা'র ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। হযরত উমরের মতে- ৯ই জিলহজ্জ দিবাগত রাত সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সময়ই হচ্ছে অকুফে মোযদালেফার সময়। আমর বিন মায়মুন থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমর (রা) মোযদালেফায় আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামায পড়েছেন, তারপর অকুফ করেছেন এবং বলেছেন, মোশরেকগণ সূর্যোদয়ের আগে মোযদালেফা ত্যাগ করত না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের এই কাজের বিরোধিতা করেন এবং সূর্যোদয়ের আগেই মোযদালেফা থেকে রওনা দেন। (আহমদ ও আবু দাউদ)
ইমাম আবু হানীফাসহ অন্যান্য আলেমদের মতে, সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সময়ই হচ্ছে অকুফে মোযদালেফার সময়। কেউ যদি বিনা ওজরে ঐ সময়ে অকুফ না করে, তাহলে তাকে দম দিতে হবে। যে কেউ ঐ সময় মোযদালেফায় থাকলে তার অকুফ হয়ে যাবে। চাই সে মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করুক বা নাই করুক। ঐ সময়ের অকুফে মোযদালেফা ওয়াজিব। মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করা সুন্নাত।
ইমাম শাফেঈ এবং আহমদের মতে, অর্ধরাত্রির পর যে কোন সময়ে অকুফ করলে তা আদায় হবে এবং মাঝরাতের আগে কেউ মোযদালেফা ত্যাগ করলে তাকে দম দিতে হবে। তবে ইমাম মালেকের মতে, কেউ মোজদালেফায় মাগরেব ও এশার নামায আদায় করার পর রাত্রির খাওয়া শেষে মোযদালেফা ত্যাগ করলে তা জায়েয হবে। মালেকী মাজহাবে, পানি পান করানোকারী ব্যক্তি এবং রাখাল ছাড়া অন্যদের জন্য মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) এই দুই শ্রেণীর লোকদের অনুমতি দিয়েছিলেন।
ইমাম আহমদ ও শাফেঈর মতে মাঝরাতের পর থেকে অকুফে মোযদালেফা ওয়াজিব। কেউ মাঝ রাতের পর কিছু সময় অকুফ করলে তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। অপরদিকে হানাফী মাযহাবে মোযদালেফায় রাত্রি যাপন সুন্নাতে মোয়াক্কাদাহ এবং সোবহে সাদেকের পর সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত অকুফ ওয়াজিব।
যাদের ওজর রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে মোযদালেফায় রাত্রি যাপন কিংবা সোবহে সাদেক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অকুফ করার জন্য নির্দেশ দেননি। তাঁর কাছে রাখাল ও হাজীদেরকে পানি পান করানোকারী ব্যক্তিরা এসে অনুমতি চাওয়ায় তিনি তাদেরকে মোযদালেফা থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে, শিশু ও নারীদেরকেও মোযদালেফা ত্যাগের অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা), আমাদের আবদুল মোত্তালিব বংশের কিছু সংখ্যক ছোট বালককে রাত্রে মোযদালেফা থেকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমাদের গায়ে স্নেহ করে হালকা থাপড় দিয়ে বললেন, হে আমার সন্তানরা! সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত তোমরা জামরায় কংকর নিক্ষেপ করোনা।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মোযদালেফায় পৌঁছার পর সাওদা বিনতে যামআ' লোকদের ভীড়ের আগে মিনায় পৌঁছার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনি ধীর গতি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি লোকের ভীড়ের আগেই রওনা দেন।
আমরা সকাল পর্যন্ত মোযদালেফায় থাকার পর, পরে রওনা দেই। হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত উম্মে সালমাকে মোযদালেফার রাতে সোবহে সাদেকের আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাথে রাত্রি যাপনের পালা ছিল। উম্মুল মোমেনীন উম্মে হাবীবা বিনতে আবি সুফিয়ান থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে মোযদালেফার রাত্রে রাত অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। যোবায়েরের স্ত্রী আসমা বিনতে আবী বকর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি রাতে জামরায় কংকর নিক্ষেপ করেছেন। তিনি আরো বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে এরূপই করতাম। তালহা বিন যোবায়ের এবং আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) দুর্বল লোক এবং নারী ও শিশুদেরকে রাত্রেই মোযদালেফা থেকে মিনায় পাঠিয়ে দিতেন।
মূলকথা, ওজরগ্রস্ত এবং অসুস্থ ও দুর্বল লোকদেরকেও কিছুক্ষণ অকুফ করার পর রাত্রেই মোযদালেফা থেকে মিনায় পাঠিয়ে দেয়া জায়েয আছে।
অকুফে মোযদালেফার জন্য ৬টি সুন্নাহ আছে। সেগুলো হচ্ছে- (১) অর্ধরাত্রির পর গোসল করা ও পানি না পেলে তায়াম্মুম করা। (২) ফজরের নামায প্রথম ওয়াক্তে পড়া যেন পরে অকুফের সময় বেশী পাওয়া যায়। (৩) মাশআরুল হারামে এসে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা। (৪) হানাফী, শাফেঈ এবং হাম্বলী মাযহাবসহ অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম আমর বিন মায়মুনের বর্ণনা অনুযায়ী সূর্যোদয়ের সামান্য আগে মোযদালেফা ত্যাগ করাকে সুন্নাহ বলেছেন। ইমাম মালেকের মতে, ভোরে আকাশ ফর্সা হওয়ার আগে মোযদালেফা ত্যাগ করা যায়। (৫) ধীরে সুস্থে মোযদালেফা থেকে মিনায় পৌঁছা। শুধুমাত্র মোহাম্সার উপত্যকায় দ্রুত চলতে হবে। ইবনে আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোযদালেফায় এসে ফজল বিন আব্বাসকে নিজের সওয়ারীর পিছনে বসান এবং বলেন, হে লোকেরা, উট ও ঘোড়া দৌড়ানোর মধ্যে কোন নেক নেই। তোমরা ধীর স্থিরভাবে চল। রাসূলুল্লাহ (সা) মিনায় পৌঁছা পর্যন্ত ধীর-স্থির ছিলেন। (আবু দাউদ, বায়হাকী) (৬) মোহাস্সার উপত্যকায় দ্রুত চলা। চাই পায়ে হেঁটে হউক কিংবা সওয়ারী ও গাড়ীর উপরই হউক না কেন সর্বাবস্থায় তা দ্রুত পার হতে হবে। নাসাঈ শরীফে হযরত জাবের থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোহাম্সার উপত্যকা দ্রুত পার হয়েছেন।
মাশআরুল হারামে নির্মিত মসজিদে আগে শুধু একটি মিনারা ছিল। সৌদী আমলে সেখানে একটি সুন্দর মসজিদ নির্মিত হয়। তাতে ২টি মিনারা আছে। মসজিদটির আয়তন হচ্ছে ৫ হাজার ৪শ' বর্গমিটার এবং এতে একসাথে দুই লক্ষ মুসল্লি নামায পড়তে পারে। মোযদালেফায় অকুফের রাত্রির জন্য পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিকটবর্তী পাহাড়ে ৫০ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণকারী একটি ধাতব রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও মসজিদের রিজার্ভারে ২ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। সেখানে বেশ কিছু টয়লেটও তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়াও মোযদালেফায় গাড়ী ও পায়ে চলার জন্য সকল রাস্তা পাকা করা হয়েছে এবং আরাফাতের দিকে মোযদালেফার উপর দিয়ে ৮টি সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও মোযদালেফায় মাঝামাঝি বাদশাহ ফয়সল ওভারব্রীজ তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি হাজীদের সুবিধার্থে এতে, প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ, রিজার্ভার নির্মাণ এবং সুয়েরেজের ব্যবস্থাসহ মোট ২ হাজার টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ওয়াদী মোহাস্‌সার : আবরাহা বাদশাহর ধংসস্থল

📄 ওয়াদী মোহাস্‌সার : আবরাহা বাদশাহর ধংসস্থল


মোহাস্সার উপত্যকা হচ্ছে মিনা এবং মোযদালেফার মাঝে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ৫৪৫ হাত দীর্ঘ একটি স্থানের নাম। এই জায়গায় আবরাহা বাহিনীর উপর আল্লাহর গযব নেমে আসে এবং তারা পুরো ধ্বংস হয়। মোহাস্সার শব্দের অর্থ হচ্ছে অচল ও অক্ষম হওয়া। হস্তিবাহিনীর হাতীগুলো সামনে চলতে অক্ষম হওয়ার কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে মোহস্সার।
খৃস্টানরা এই জায়গায় অকুফ করত বা অবস্থান করত। তাই হাজীদের সেই জায়গা দ্রুত পার হওয়া এবং খৃস্টানদের বিরোধিতা করা জরুরী। মুসলিম এবং আবু দাউদ শরীফে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে। নবী করীম (সা) যখন মোযদালেফা হতে মিনার দিকে রওনা হন তখন মোহাস্সার উপত্যকায় চলার গতি দ্রুত করে দেন।
ইমাম নওয়ী বলেছেন, আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংসলীলা এই স্থানেই সংঘটিত হয়েছিল। যে সকল জায়গায় আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে, সে সকল জায়গা তাড়াতাড়ি অতিক্রম করা রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিয়ম ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00