📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ওয়াদী সারেফ : উম্মুল মোমেনীন হযরত মায়মুনার বিয়ে ও কবর

📄 ওয়াদী সারেফ : উম্মুল মোমেনীন হযরত মায়মুনার বিয়ে ও কবর


মসজিদে হারাম থেকে সারেফ উপত্যকার (ওয়াদী সারেফ) দূরত্ব হচ্ছে ৬ মাইল। কারো কারো মতে, ৭ মাইল, ৯ মাইল এবং ১২ মাইল। এই উপত্যকাটি ওয়াদী ফাতেমা এবং মক্কার মাঝে অবস্থিত অর্থাৎ এটি জমুম (ওয়াদী ফাতেমা) ও তানঈমের মাঝে অবস্থিত। এর বর্তমান নাম হচ্ছে حَى النوارية বা নাওয়ারিয়া এলাকা। এলাকাটি উত্তর মক্কার প্রবেশদ্বারে হিজরাহ সড়কের উপর এবং সড়কটি বর্তমানে এক্সপ্রেস রোড হিসাবে পরিচিত।
এই উপত্যকায় হযরত মায়মুনা বিনতে হারেস হেলালীর সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিয়ে হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) ৬ষ্ঠ হিজরীতে, হোদায়বিয়ার সন্ধির পর উমরাহ না করে ফিরে যান এবং পরের বছর ৭ই হিজরীর জিলকদ মাসে মক্কায় কাজা উমরাহ আদায়ের সময় সারেফ উপত্যকায় হযরত মায়মুনার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর নাম ছিল বোররাহ। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নাম রাখেন মায়মুনা। হযরত মায়মুনা (রা) নিজেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য ওয়াকফ করেন। কাতাদাহ উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর শানেই নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়-
وامْرَأَةً مُّؤْمِنَةٌ إِنْ وَهَبَتْ نَفْسَهَا لِلنَّبِيِّ - অর্থ : 'একজন মোমেন মহিলা যখন নিজেকে নবীর জন্য দান করল।'
উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে ৫শ' দেরহাম দেনমোহরের বিনিময়ে বিয়ে করেন। ইবনে সাইয়েদুন নাস তাঁর সীরাত গ্রন্থে লিখেছেন, মায়মুনা (রা) সওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ফলে, মায়মুনা সওয়ারী থেকে নেমে নিজেকে রাসূলুল্লাহ এর খেদমতে পেশ করে বলেন, উট এবং উটের পিঠের সওয়ারীকে রাসূলুল্লাহর জন্য ওয়াকফ করলাম।
ইবনে সা’দ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
اَلْاَخَوَاتُ الْمُؤْمِنَاتُ مَيْمُوْنَةُ وَأُمُّ الْفَضْلِ وَأَسْمَاءُ -
অর্থঃ মায়মুনা, উম্মে ফজল এবং আসমা হচ্ছে মোমেন বোন। হযরত আয়েশা (রা) তাঁর সম্পর্কে বলেন, মায়মুনা আমাদের মধ্যে বেশী খোদাভীরু ও আত্মীয়তার হক আদায়কারিণী। তাঁর বক্তব্যটি হচ্ছে এই যে,
اَمَا اِنَّهَا كَانَتْ اَتْقَانَا لِلَّهِ وَاَوْصَلَنَا لِلرَّحِمِ -
রাসূলুল্লাহ (সা) কাজা উমরাহ আদায়ের জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে আসার সময় সারেফ উপত্যকায় হযরত মায়মুনার সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। উমরাহ শেষে মদীনা ফেরার পথে তিনি সারেফ উপত্যকায় অবতরণ করেন এবং হযরত মায়মুনা (রা) এর সাথে বাসর যাপন করেন। পরে, হযরত মায়মুনা (রা) একই জায়গায় ইতিকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। সেই জায়গাটি রাস্তার পাশেই অবস্থিত।
সারেফ উপত্যকায় তাঁর কবরের উপর একটি গম্বুজ এবং পার্শ্বে একটি মসজিদ ছিল। পরবর্তীতে গম্বুজটি ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং মসজিদ অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু ১৩৭২ হিজরীতে সেই মসজিদটিও ভেঙ্গে দেওয়া হয়।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 হেরা গুহা

📄 হেরা গুহা


হেরা গুহা যে পাহাড়ে অবস্থিত সে পাহাড়টির নাম হচ্ছে হেরা পাহাড় কিংবা নূর পাহাড়। এটি মক্কার উত্তর দিকে অবস্থিত। নগর অভিধান প্রণেতা ইয়াকুব হামাভী লিখেছেন, মসজিদে হারাম থেকে এর দূরত্ব ৩ মাইল। বর্তমানে আবাদী হেরা পাহাড়কেও ছাড়িয়ে গেছে। মসজিদে হারাম থেকে নূর পাহাড়ের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। এটি একটি খাড়া পাহাড়। এর উচ্চতা হচ্ছে ২শ’ মিটার এবং এর চূড়ায় পৌঁছতে প্রায় আধ ঘন্টা সময় লাগে।
গুহাটি পাহাড়ের চূড়া থেকে ৪০ মিটার দূরে। মানুষ গুহায় পৌঁছার জন্য চূড়া থেকে নীচের দিকে যায়। পাহাড়ে উঠা ও গুহায় নামার জন্য কোন সুষ্ঠু সিঁড়ি নেই। পাহাড়ের গায়ে চড়ে উঠানামা করতে হয়। বর্তমানে, পথ হারানো থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে পথের দুই পার্শ্বে সাদা পিলার বসানো হয়েছে। গর্ভের প্রবেশ পথ উত্তরমুখী। এর উচ্চতা হচ্ছে মধ্যম আকৃতির মানুষের উচ্চতার সমান। এতে একসাথে ৫ জন লোক বসতে পারে।
এই গুহার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহ এতে নবী করীম (সা) এর উপর ওহী নাযিল করেছেন। নবুওয়াত লাভের পূর্বে, রাসূলুল্লাহ (সা) এই গর্তে বসে সাধনা করেছেন এবং একাধারে অনেকদিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করতেন। বুখারী শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী সেখানেই, হযরত জিবরাইল (আ) সর্বপ্রথম ওহী নিয়ে হাজির হন।
সেই গুহাটি থেকে আগে কা'বা শরীফ পরিষ্কার দেখা যেত। কিন্তু মক্কা শহরে আজকাল সুউচ্চ ইমারত নির্মাণের কারণে, সেখান থেকে কা'বা দৃষ্টিগোচর হয় না। হেরা পাহাড় মক্কার সর্বোচ্চ পাহাড়। মক্কা শহরের চতুর্দিক থেকে হেরা পাহাড়ের উঁচু শৃঙ্গটি দৃষ্টিগোচর হয়। হযরত জিবরাইল (আ) তাঁর কাছে এসে প্রথমে বলেন, পড়। তিনি বলেন, আমি নিরক্ষর, পড়তে পারি না। জিবরাইল তাঁকে জোরে জড়িয়ে ধরে দ্বিতীয়বারও সেই একই কথা বললে নবী করীম (সা) একই উত্তর দেন। জিবরাইল পুনরায় তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। ৩য় বার জিবরাইল সূরা আ'লাকের প্রথম ৫টি আয়াত পড়ে শুনান। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ও ঐ আয়াতগুলো সাথে সাথে পড়েন। সেই আয়াতগুলো হচ্ছে: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ - خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ - اقْرَأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ - عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ .
অর্থ: 'পড় (হে নবী)! তোমার রবের নাম সহকারে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে জমাট রক্তের এক পিন্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়, তোমার রব অনুগ্রহশীল, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা মানুষ জানত না।'
হেরা পাহাড় মানুষের হেদায়াতের প্রথম আলো বিতরণকারী পাহাড় হিসেবে মুসলমানদের অন্তরে সম্মানের আসন গেঁড়ে আছে। তাই এর অপর নাম হচ্ছে 'নূর পাহাড়' বা আলোর পাহাড়।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 সাওর গুহা

📄 সাওর গুহা


এই গুহাটি সাওর পাহাড়ে মসজিদে হারামের ৬ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এটি হেরা পাহাড় থেকে বড় পাহাড় এবং মসজিদে হারাম থেকে অপেক্ষাকৃত দূরে। সাওর বিন মানাতের নামানুসারে এটিক নামকরণ করা হয়েছে। এই পাহাড়ে উঠতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগে। ৩টি সংযুক্ত পাহাড়ের সমষ্টিকে সাওর পাহাড় বলা হয় এবং দুই পাহাড় অতিক্রম করার পর ৩য় পাহাড়ে ঐ গুহাটি অবস্থিত। পাহাড়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৫৪টি উঁচু নীচু মোড় আছে। পাহাড়ে আরোহণকারী ব্যক্তি ঐ সকল মোড় দিয়ে একবার উপরে উঠে, আবার নীচে নামে। এইভাবে তাকে চূড়ায় অবস্থিত গুহায় পৌঁছতে হয়। পাহাড়ের চূড়ায় গর্তটি একটি ছোট নৌকার মত দেখায় এবং এর পিঠ হচ্ছে উপরের দিকে। এর সামনে ও পেছনে দুটো ছিদ্র আছে। গুহাটি মাটি থেকে ৫শ' মিটার উপরে।
গুহার দৈর্ঘ্য ১৮ বিঘত এবং সংকীর্ণ মুখের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৫ বিঘত। যমীন থেকে এর মুখের উচ্চতা ১ বিঘত এবং অন্য দুই দিক থেকে উচ্চতা হচ্ছে এক বিঘতের দুই তৃতীয়াংশ। এর প্রবেশমুখের ২য় দরজার প্রশস্ততা হচ্ছে ১৫ বিঘত। এই গুহার মধ্যেই কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়:
ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الْغَارِ - (التوبه : ٤٠)
অর্থ: 'তারা দু'জন যখন সেই গর্তে ছিল, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল।'
ঐ গুহায় রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর প্রিয় সাথী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) আশ্রয় নিয়েছিলেন। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবু বকরকে নিয়ে ৩ দিন ঐ পাহাড়ের গর্তটিতে আত্মগোপন করেন। উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের ব্যাপারে কোরাইশ কাফেরদের তল্লাশী থেমে যাবে। তাঁদের খাবার ছিল খেজুর। হযরত আবু বকরের মেয়ে আসমা (রা) মক্কা থেকে তাঁদের জন্য রাত্রে খাবার নিয়ে আসতেন। কোরাইশরা তাঁদের দু'জনকে তালাশ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাওর গুহায় গিয়ে পৌঁছে এবং গুহার মুখে মাকড়সার জাল দেখে ফিরে আসে। কেননা, কেউ ভেতরে ঢুকলে গুহার মুখে মাকড়সার জাল থাকতে পারে না। আল্লাহর কত অসীম কুদরত যে সামান্য মাকড়সার জাল দিয়ে তিনি তাঁর নবী, দীন ও শরীয়তের হেফাজত করেন।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, আল্লাহ দুটো বন্য কবুতরকে আদেশ করেছেন তারা যেন গর্তের প্রতিরক্ষার কাজ করে। সে অনুযায়ী কবুতর দুটো মাকড়সার জাল ও গাছের মাঝখানে বসে থেকে গুহার হেফাজত করে। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি কতই না তাৎপর্যপূর্ণ!
وَاللَّهُ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ - (الفاتح - 8)
অর্থ: 'আল্লাহর জন্যই আসমান এবং যমীনের সৈন্য-সামন্ত নিয়োজিত।'
কাফেরগণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর পেছনে পেছনে গুহা পর্যন্ত গেল। কিন্তু গুহার মুখে মাকড়সার জাল দেখে তারা সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেল। এইভাবে, আল্লাহ তাঁর বান্দাহদ্বয়কে হেফাজত করেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ কুরআনে বলেন:
فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا - (التوبه : ٤٠ )
অর্থ: আল্লাহ তাঁর (নবীর) উপর প্রশান্তি নাযিল করেন এবং অদৃশ্য সেনা দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেন।' হযরত আবু বকর বলেন, তারা পা উঠালেই আমাদেরকে দেখতে পাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন: পেরেশান হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মিনা

📄 মিনা


মিনা হজ্জ এবং মক্কার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান। হাজীদের ৮ই জিলহজ্জ জোহর থেকে ৯ই জিলহজ্জ ফজর পর্যন্ত ৫ ওয়াক্ত নামায মিনায় আদায় করা সুন্নত এবং সেখানে ৮ তারিখ সন্ধ্যা থেকে ৯ তারিখের ফজর পর্যন্ত রাত্রি যাপন করাও সকল মাজহাবের দৃষ্টিতে সুন্নত। মিনায় ৮ তারিখে অবস্থান করাকে يَوْمُ التَّرْوِيَةِ বলে। আগে পানির স্বল্পতার কারণে এই দিবসে হাজীরা মিনা থেকে পানি সংগ্রহ করতেন এবং আরাফাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন। تَرْوِيَةِ মানে পানির প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বিদায় হজ্জের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) ৮ তারিখ সকালে মক্কা থেকে রওনা দিয়ে জোহরের সময় মিনায় পৌঁছেন। তিনি মিনায় 'গারে মোরসালাত' নামক গুহায় রাত্রিযাপন করেন। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (সা) থেকে বর্ণিত। ঐ গুহায় সূরা 'আল-মোরসালাত' নাযিল হয়। ৯ তারিখ সকালে হাজীরা আরাফাতের ময়দানে চলে যায় এবং সেখানে দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান এবং মোযদালেফায় রাত্রি যাপন করার পর ১০ই জিলহজ্জ পুনরায় মিনায় ফিরে আসে ও জামরায় পাথর মারে এবং পশু কুরবানী করে। কুরবানীর দিনসহ আইয়ামে তাশরীক তথা ১২ কিংবা ১৩ই জিলহজ্জ পর্যন্ত মিনায় থাকার পর হাজীরা মক্কায় ফিরে আসে। তাসরীক অর্থ গোশত শুকানো। ঐ দিনগুলোতে কোরবানীর গোশত শুকানো হত বলে তাকে আইয়ামে তাশরীক বলা হয়।
মক্কার দিক থেকে মিনার সীমানা হচ্ছে জামরাতুল আকাবা এবং মোযদালেফার দিক থেকে হচ্ছে মোহাস্সার উপত্যকা। মক্কা থেকে মিনার দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ৬ কিলোমিটার। মিনার দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার। মিনাতেই সূরা কাওসার নাযিল হয় এবং হজ্জের দিনগুলোর মধ্যেই তিনি উক্ত সূরার নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কুরবানীর আদেশ দেন।
অভিধানে বলা হয়েছে (মিনা( منی শব্দটি আরবী الى )ইলা) শব্দের আঙ্গিকে গঠিত। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে প্রবাহিত করা। মিনায় অধিক সংখ্যক কুরবানীর পশুর রক্ত প্রবাহিত হওয়ায় একে মিনা বলে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, জিবরাইল (আ) হযরত আদম (আ) থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় বলেছিলেন, হে আদম! আপনি আশা করুন। তখন আদম (আ) বলেন, আমি বেহেশতের প্রত্যাশা পোষণ করি। হযরত আদম (আ) এর প্রত্যাশা থেকে মিনা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

রাত্রি যাপন:
মিনায় হাজীদের ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ কিংবা ১৩ই জিলহজ্জের রাত্রি যাপন করা হানাফী মাজহাবে সুন্নত এবং অন্যান্য মাজহাবে ওয়াজিব। আবদুর রহমান বিন ফররুখ বলেন, আমি ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমরা বেচা-কেনা করি আমরা কি কেউ মিনায় রাত্রি যাপন না করে মক্কায় আমাদের মালের কাছে রাত্রি যাপন করতে পারি? তখন ইবনে উমর বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তো মিনাতেই রাত্রি যাপন করেন। (আবু দাউদ ও বায়হাকী)।
মিনায় রাত্রি যাপনের অর্থ হল, রাতের বেশীর ভাগ অংশ মিনায় কাটানো। ইমাম মালেকের দৃষ্টিতে প্রতি রাতের রাত্রি যাপন ত্যাগ করার মোকাবিলায় একটি করে দম দিতে হবে। সে অনুযায়ী তিন রাত যাপন না করলে তিনটি দম দিতে হবে। শাফেঈ এবং হাম্বলী মাজহাবের মশহুর মতামত হচ্ছে, এক রাত যাপন না করলে এক মুদ খাবার, ২ রাত যাপন না করলে দুই মুদ খাবার কাফফারা দিতে হবে। তৃতীয় রাত যাপন না করলে দম দিতে হবে।
ফেকাহবিদদের মধ্যে ওজরের কারণে মিনায় রাত্রি যাপন না করার ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। যেমন, হাজীদের পানি পান করানো এবং পশুর রাখালের ওজর গ্রহণযোগ্য। তারা রাত্রি যাপন না করলে কোন কাফফারা দিতে হবে না।
হযরত ইবনে উমর বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস (রা) তাশরীকের দিনসমূহে মক্কায় রাত্রি যাপনের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অনুমতি চান যেন তিনি হাজীদের পানি পান করাতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে অনুমতি দেন। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত আ'সেম বিন আ'দী থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) রাখালদেরকে মিনায় রাত্রি যাপন থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজা, আবু দাউদ এবং ইবনে হিব্বান)। ৮ তারিখ, গারে মোরসালাতের রাত্রিযাপন ব্যতীত বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কেরামসহ মসজিদে খায়েফের বর্তমান স্থানেই আইয়ামে তাশরীকে অবস্থান করেন ও রাত্রি যাপন করেন।

মিনায় রাসূলুল্লাহ (সা) এর খোতবা:
রাসূলুল্লাহ (সা) মিনায় দু'টো খোতবা দিয়েছেন। কুরবানীর দিন এবং পরের দিন ১১ই জিলহজ্জ এই খোতবা দু'টো দেন। কারো কারো মতে, তিনি ১০ এবং ১২ই জিলহজ্জ খোতবা দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর মিনায় ২য় খোতবার ব্যাপারে সারা বিনতে নাবহান থেকে বর্ণিত আছে, আমরা বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, তোমরা কি জান আজ কোন দিন? শ্রোতারা বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই তা ভাল জানেন। তিনি বলেন, আজ হচ্ছে আইয়ামে তাশরীকের মাঝের দিন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি জান এটি কোন শহর? শ্রোতারা বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই তা ভাল জানেন। তখন তিনি উত্তরে বলেন, এটি মাশআরুল হারাম বা সম্মানিত নিদর্শনের স্থান। তিনি আরো বলেন, জানিনা, এই বছরের পর তোমাদের সাথে আর আমার এখানে সাক্ষাত হবে কিনা। তবে জেনে রাখ, তোমাদের রক্ত, সম্পদ এবং ইজ্জত আজকের এই পবিত্র দিন এবং স্থানের মতই সম্মানিত, যে পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রতিপালক রবের সাথে গিয়ে সাক্ষাত কর এবং তিনি তোমাদের কাজ কর্ম সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ না করেন। জেনে রাখ, তোমাদের নিকটবর্তীরা যেন দূরবর্তীদের কাছে এই বাণীসমূহ পৌঁছায়। আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌছিয়েছি?
মদীনায় ফিরে আসার কয়েকদিন পরই তিনি ইন্তিকাল করেন। এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এই খোতবা আইয়ামে তাশরীকের ১ম দিকে নয়, মাঝামাঝি সময়ে দান করা হয়েছিল। এই জন্যই ইমাম শাফেঈ এবং আহমদ বলেছেন, ১২ই জিলহজ্জ তারিখে ঐ খোতবা দেয়া হয়েছে।
আহমদ, আবু দাউদ এবং ইবনে মাজাহ হযরত ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ৮ই জিলহজ্জ তারওইয়া (تروية) দিবসে জোহরের নামায থেকে ৯ই জিলহজ্জ আরাফাহ দিবসের ফজরের নামায অর্থাৎ ৫ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় পড়েন।

জামরাহ:
মিনায় তিন জামরায় কংকর মারতে হয়। মসজিদে খায়েফের দিক থেকে মক্কার দিকে আসার সময় প্রথমে জামরাহ সোগরা বা ছোট জামরাহ পড়ে। ছোট জামরাহ এবং জামরাহ আকাবার মাঝে জামরাহ ওস্তা অবস্থিত। এরপরই হচ্ছে জামরাহ আকাবা। জামরাহ আকাবা অন্য দুটো জামরাহর তুলনায় মক্কার বেশী নিকটবর্তী। প্রথম জামরাহ থেকে মেঝো জামরাহর দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ১৫৬ মিটার এবং মেঝো জামরাহ থেকে জামরাহ আকাবার দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ১১৭ মিটার। মিনায় অবস্থানের সময় ঐ সকল জামরার প্রত্যেকটিতে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করতে হয়।
ছোট ও মেঝো জামরার চারদিকে গোলাকার বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে এবং বৃত্তের মাঝখানে উঁচু স্তম্ভ তৈরী করা হয়েছে। এটিই কংকর নিক্ষেপের স্থান। বড় জামরাহ বৃত্তাকার। সেখানেও একটি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রায় ৩ মিটার উঁচু।
তিনটা স্তম্ভের উপর চার তলা ছাদ তৈরি করা হয়েছে এবং স্তম্ভগুলোর মাথা চার তলা পর্যন্ত উঁচু করা হয়েছে যাতে করে চার তলায় উঠেও পাথর নিক্ষেপ করা যায়।
নীচতলার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বরাবর উপর তলার দৈর্ঘ্য-প্রস্থও সমান করা হয়েছে। একই সময়, হাজীরা নীচ ও উপরতলা থেকে কংকর মারার সুবিধে লাভ করায়, কংকর নিক্ষেপের সময় ভিড়ের প্রচণ্ডতা হ্রাস পেয়েছে। অবশ্য উপরতলাকে একটি চওড়া ওভার ব্রীজের মত মনে হয় এবং এর উপরে কোন ছাদ না থাকায় গরমের সময় হাজীরা রোদে কষ্ট পায়। নীচতলা সবটুকুই চার তলার ছাদের ছায়া-ঘেরা।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, জামরায় কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে, বান্দাহ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং তাঁর আনুগত্য করলে শয়তান ব্যথিত হয়। এজন্য জামরায় জুতা বা তীর নিক্ষেপের কোন প্রয়োজন নেই। অনেকেই এই সুন্নত বিরোধী কাজকে সওয়াবের কাজ মনে করে ভুল করে বসে। রাসূলুল্লাহ (সা) মিনা, মোযদালেফা এবং আরাফাতকে ডানে ও মক্কাকে বাঁয়ে রেখে জামরাহ আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করেছেন এবং প্রত্যেকবার আল্লাহু আকবার বলেছেন।

জামরায় কংকর নিক্ষেপের তাৎপর্য:
মুসীরুল গারামে ইবনে জাওযী থেকে বর্ণিত আছে, যখন হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা শরীফ নির্মাণ শেষ করেন তখন জিবরাইল (আ) এসে তাঁকে তওয়াফের পদ্ধতি শিক্ষা দেন। তারপর তাঁকে জামরাতুল আকাবায় নিয়ে আসেন। তখন শয়তান হাজির হয়। জিবরাইল (আ) ৭টি পাথরের টুকরা হাতে নেন এবং ইবরাহীম (আ)-কে দেন। জিবরাইল (আ) ইবরাহীম (আ)-কে তাকবীরসহ কংকর নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। অতঃপর তাঁরা দু'জনেই সূর্যাস্ত পর্যন্ত কংকর মারেন এবং তাকবীর বলেন। তারপর তাঁরা মেঝো জামরাহর কাছে আসেন। সেখানেও শয়তান হাজির হয়। তাঁরা দু'জনে জামরাহ আকাবার অনুরূপ করেন। তারপর ছোট জামরাহর কাছে এলে সেখানেও শয়তান হাজির হয়। ফলে তাঁরা দু'জনেই শয়তানের প্রতি পাথরের টুকরা নিক্ষেপ করেন এবং তাকবীর বলেন। হযরত ইবরাহীম (আ) এর অনুসরণে শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আল্লাহর এবাদত করাই হচ্ছে কংকর নিক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। সালেম বিন আবু জা'দ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, যখন ইবরাহীম (আ) হজ্জের হুকুম পালন করার জন্য আসেন তখন জামরাহ আ'কাবার কাছে শয়তান এসে হাজির হয়। তিনি তার প্রতি ৭টি পাথর খণ্ড নিক্ষেপ করায় সে মাটিতে কুপোকাত হয়ে পড়ে। তারপর মেঝো জামরায় শয়তান হাজির হলে সেখানেও তাকে কংকর মেরে চিতপটাং করে দেন। অনুরূপভাবে, ছোট জামরায় পুনরায় শয়তান আবির্ভূত হলে সেখানেও শয়তানকে কংকর মেরে কাবু এবং ধরাশায়ী করে ফেলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, শয়তানকে কংকর মেরে মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ কর। (বায়হাকী)
কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে আল্লাহর গোলামীর বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করা হয় এবং ধোঁকাবাজ শয়তানের প্রলোভনে পড়ে মানুষ যে সকল গুনাহ ও অন্যায় কাজ করে তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে শয়তানকে নিরাশ করে দিয়ে বুঝানো হয় যে, আমরা অতীতে তোর আনুগত্য করলেও ভবিষ্যতে আর তা না করার অঙ্গীকার করছি।

কসাইখানা:
মিনা منحر বা কুরবানীর স্থান। যে কোন জায়গায় কুরবানী করলেই কুরবানী হয়ে যাবে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে জবেহ করছেন। তখন তিনি ইসমাঈলকে স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলায় ইসমাঈল রাজী হলেন এবং জবেহর জন্য মিনায় আসেন। শেষ পর্যন্ত ইবরাহীম (আ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আল্লাহ ইসমাঈল (আ) কে জবেহ না করার হুকুম দেন এবং তার পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানীর নির্দেশ দেন। তখন থেকেই হজ্জের পরের দিন, ১০ই জিলহজ্জ কুরবানীর দিবসে পশু কুরবানীর পদ্ধতি প্রবর্তন হয়।
বর্তমানে মিনায় পশু কুরবানীর স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে যাতে করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা না দেয়। ক্রমবর্ধমান হাজীর কারণেও কসাইখানা সুনির্দিষ্ট স্থানে করা জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে, মোযদালেফার মিনা সীমান্তে দুটো কসাইখানা নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে একটিতে ছাগল, দুম্বা ও ভেড়ার বাজার বসে এবং অন্যটিতে গরু, উট ও অন্যান্য বড় বড় প্রাণীর বাজার বসে। আধুনিক পদ্ধতিতে সেখানকার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়।
মিনায় হাদী (কেরান ও তামাতু হজ্জের কোরবানী), দম, সদকা ও কোরবানী উপলক্ষে অসংখ্য হাজীর লাখ লাখ জবেহকৃত পশুর গোশত পূর্বে জ্বালিয়ে নষ্ট করে দেয়া ছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা ছিল না। ১৪০৩ হিজরীতে, উক্ত গোশতের সদ্ব্যবহারের জন্য, সৌদী সরকার মিনার পূর্ব সীমান্তের পার্শ্বে মোআইসামে একটি আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ করে। মুসলিম বিশ্বের উদ্যোগে গঠিত ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক নিজ খরচে তা পরিচালনা করে এবং গরীব মুসলিম দেশসমূহে উক্ত গোশত পাঠায়। হাজীরা ব্যাংক ও বিক্রয় কেন্দ্রসমূহে টিকেট ক্রয়ের মাধ্যমে অগ্রিম পশু কিনে। তাদের নিজেদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সেখানে পশু কোরবানী হয়। প্রতিনিধি না থাকলেও পশু কোরবানী হয়ে যায়। সাধারণতঃ প্রতিনিধিরা সেখানে কমই গিয়ে থাকে। কসাইখানায় একই সাথে হাজার হাজার ছোট পশু অর্থাৎ ভেড়া, বকরী ও দুম্বা রাখার একটি খোঁয়াড় আছে। কসাইখানাটিতে একসাথে অনেক পশু জবেহ করা যায়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কোল্ড স্টোরেজের মাধ্যমে এগুলো সাময়িক সংরক্ষণ কর হয়।
সৌদী সরকার ১৪১০ হিজরীতে, মোআইসামে আরেকটি আদর্শ কসাইখানা তৈরি করেছে। এটা আগেরটার চাইতেও বৃহত্তর। এতে ৫ লাখ ছোট পশু অর্থাৎ ভেড়া বকরী ও দুম্বা জবেহর ব্যবস্থা আছে। এ সকল গোশতও গরীব মুসলমানদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। এছাড়াও ওয়াদী আন্নারে ২০ হাজার বর্গমিটারের উপর প্রাসঙ্গিক সকল সুযোগ-সুবিধাসহ গরু ও উট জবেহর জন্য সৌদী সরকার আরো কসাইখানা নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এটা নির্মিত হলে, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক মোট ৫টি কসাইখানা থেকে প্রতি বছর ১৫ লাখ পশুর গোশত বিশ্বের গরীব মুসলমানদের জন্য পাঠাতে সক্ষম হবে। তখন মিনায় আর কোন পশুর গোশত নষ্ট হবে না।

মিনা উন্নয়ন প্রকল্প:
মিনায় হাজীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে সংকুলান সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায়, আরাফার দিকে যেতে মিনার ডানদিকের পাহাড়ের উপরিভাগ কেটে সমতল করা হয় এবং এতে হাজীদের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৫ লাখ ঘনমিটার পাহাড়ী এলাকার পাথর কেটে পাহাড়ের উপরের ২০ লাখ বর্গমিটার এলাকা সমতল করা হয়। এতে রাস্তা নির্মাণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, টয়লেট ও বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করা হয়। পাহাড়ের উপরিভাগের দুই সীমান্তে দেয়াল তৈরি করা হয়। পাহাড়ের উপরে আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে হাজীদের জন্য দুটো আবাসিক এলাকা তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
মিনার ভেতর ৯টি সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়াও মিনার তাঁবুতে অগ্নি নির্বাপণের জন্য দমকল বাহিনী সদা প্রস্তুত থাকে। বর্তমানে মিনায় স্থায়ীভাবে আগুন প্রতিরোধক বিকল্প তাঁবু প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়াও নির্দিষ্ট জায়গায় হেলিপোর্ট বানানো হয়েছে যেন হেলিকপ্টার সার্ভিসের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যায়।
১৩৯৫ হিজরীতে, সৌদী সরকার মক্কার পবিত্র স্থানসমূহের উন্নয়নের জন্য মিনা উন্নয়ন প্রকল্প নামক সংস্থাটি কায়েম করে। এই সংস্থা মিনা মোযদালেফাহ, আরাফাহ এবং মিনার সাথে সংশ্লিষ্ট মক্কার অন্যান্য স্থানের উন্নয়নের জন্য এযাবত বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে সুড়ঙ্গ, ওভারব্রীজ, আদর্শ কসাইখানা, পানির বিরাট রিজার্ভার নির্মাণ, আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্দেশ্যে মিনার পাহাড়ের উপরিভাগ সমতলকরণ এবং জামারাহর ওভারব্রীজ সম্প্রসারণ অন্যতম। ভবিষ্যতে ও সংস্থা আরো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা নিচ্ছে।
মিনায় প্রায় বছর তাঁবুতে আগুন লাগে। তাই সৌদী সরকার মিনায় তাঁবুর পরিবর্তে হাজীদের আবাসিক বিল্ডিং তৈরির লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক কিছু বিল্ডিং তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। এই পরিকল্পনা সফল প্রমাণিত হলে গোটা মিনায় বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণ করার সম্ভাবনা আছে।
সৌদী সরকার মিনা, মোযদালেফা ও আরাফাতের উন্নয়নের জন্য একটি মাষ্টার প্ল্যান গ্রহণ করেছে। ঐ পরিকল্পনার লক্ষ্য হল ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৩০ লাখ হাজীদের সুযোগ সুবিধে নিশ্চিত করা। পরিকল্পনায় তিনটি পবিত্র স্থানকে ১০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। সংযোগ সড়কের মাধ্যমে প্রতি জোনের সাথে সুষ্ঠু যোগাযোগ রক্ষা করা হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ৪০% হাজীকে পদব্রজ বিবেচনা ধরে তাদের চলাচলের সুবিধে নিশ্চিত করা হবে। মসজিদে হারাম থেকে মিনা, মোযদালেফা এবং আরাফাত পর্যন্ত আরেকটি প্রধান পায়ে হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে এরকম রাস্তার সংখ্যা হচ্ছে ১টি। অবশিষ্ট হাজীদেরকে গাড়ীর যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করে বর্তমানে ১তলা বাসের পরিবর্তে দোতলা বাস চালু করা হবে। এর ফলে যানজট হ্রাস পাবে।
মিনায় ৩টি প্রধান হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও মিনায় আরও ৩০ হাজার টয়লেট, ৩০ হাজার পানিকেন্দ্র, ৩৩টি ক্লিনিক, ২০টি হাজী 'হারানো প্রাপ্তি' কেন্দ্র, ২৮টি পুলিশ ও ট্রাফিক ফাঁড়ি, ৫৬টি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, ২৫ হাজার টেলিফোন লাইন এবং ৬ হাজার খাবার দোকান প্রতিষ্ঠা করা হবে। জামরায় কংকর নিক্ষেপের সময় ভীড়ে প্রায়ই হাজী মারা যায়। সেই কারণে জামরার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মওজুদ ঘর-বাড়ী ভেঙ্গে জামরা এলাকা সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মিনায় পানি ও বিদ্যুত সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানো হবে।

মোযদালেফা ও আরাফাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা:
মিনার উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে মোযদালেফার উন্নয়ন করা হবে। মোযদালেফায় হাজীদের বিশ্রামের জায়গা ও পায়ে হেঁটে চলা হাজীদের রাস্তা তৈরি করা হবে। এছাড়া গাড়ী পার্কিং এর অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধে নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও পানি, টয়লেট, ক্লিনিক, হাজী হারানো-প্রাপ্তি কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুযোগ বৃদ্ধি হবে।
মিনা ও মোযদালেফার আঙ্গিকে আরাফাতকে ১০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। ৮টি জোন গাড়ীতে আগমনকারী হাজী, একটি পায়ে হেঁটে আসা হাজী এবং অন্যটি সরকারী বিভাগের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট আছে। ২০০৫ খৃঃ, আরাফাতে ২৪,৬০০ টয়লেট, ১৮,৫০০ পানি কেন্দ্র, ৬৫টি ক্লিনিক, ৪টি হাসপাতাল, ২০টি হারানো-প্রাপ্তি হাজী কেন্দ্র, ১০টি প্রধান ট্রাফিক ও নিরাপত্তা পুলিশ কেন্দ্র, ২টি পুলিশ ফাঁড়ি, একটি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, ৩৭০০ খাবার দোকান এবং ২৫০০ টেলিফোন লাইন বসানো হয়েছে। পানি সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য মওজুদ পানি লাইনের সাথে সংযোগ লাইনসহ অতিরিক্ত রিজার্ভার নির্মাণ করা হবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা:
মিনায় সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষ ও অজস্র গাড়ী-ঘোড়া চলাচল ও আবাসিক স্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না হলে, হাজীদের মিনায় অবস্থান অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। সেজন্য 'মিনা উন্নয়ন প্রকল্প' সংস্থা মিনায় সুষ্ঠু যোগাযোগ এবং মক্কার সাথে পরিকল্পিত অবাধ যোগাযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে মিনায় এক বলিষ্ঠ রোড নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্ক মক্কা শহরের ৪টি রিংরোডের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় একদিকে মোযদালেফা এবং আরাফাহ, অন্যদিকে মোআইসাম, আযিযিয়াসহ মক্কার সকল এলাকার মধ্য দিয়ে মসজিদে হারামের সাথে মিনার সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়াও মিনার সাথে জেদ্দা, তায়েফ ও মদীনার সংযোগও স্থাপিত হয়েছে। মিনার রাস্তাগুলো আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানের স্বাক্ষর বহন করে।
হাজীদের তাঁবু নির্মাণের জন্য নির্ধারিত এলাকার আয়তন হচ্ছে, ২৮ লাখ ৪৫ হাজার বর্গমিটার। মিনায় প্রায় ১ লাখ তাঁবু নির্মাণ করা হয়। মিনা রোড নেটওয়ার্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পবিত্র স্থানসমূহে মোট ১শ' কিলোমিটারেরও বেশী রাস্তা পাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ মিনায় গাড়ী চলাচলের জন্য নির্মিত রাস্তার মোট আয়তন হচ্ছে, ২৩ লাখ ২৪ হাজার বর্গমিটার। মিনার ভেতর গাড়ীর রাস্তার মোট আয়তন হচ্ছে ৭ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার। ওভারব্রীজসমূহের মোট আয়তন হচ্ছে, ৩ লাখ ৪৫ হাজার বর্গমিটার। পায়ে চলার পথের আয়তন হচ্ছে, ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার। রাস্তা তৈরির উদ্দেশ্যে মোট ২৮টি সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য হচ্ছে মোট ১৭ কিলোমিটার এবং আয়তন হচ্ছে, ২ লাখ ২৮ হাজার ৩১৮ বর্গমিটার
মিনা রোড নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে ১. প্রধান সড়ক ২. সংযোগ সড়ক-মিনার এপার ওপার ভেদকারী। ৩. পায়ে চলার পথ।
এখন আমরা মিনার প্রধান সড়কগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো:
১. বাদশাহ ফাহাদ সড়ক: এটি মিনার উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত ও পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। এটি মিনার ১নং প্রধান সড়ক হিসেবে বিবেচিত। এটি মোযদালেফার মাশআরুল হারাম- এবাদতের সম্মানিত স্থানের উত্তর পাশ হয়ে মিনার উত্তর পাশ দিয়ে মসজিদে হারামের নিকট শে'বে আমের ও শে'বে আলী পর্যন্ত পৌছেছে। এর দৈর্ঘ্য ৮.৫ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৩১.২০ মিটার। প্রতিদিকে ৩টি করে দুই দিকে গাড়ী চলার জন্য মোট ৬টি ট্র্যাক আছে। এর মাঝে ২মিটার চওড়া আইল্যাণ্ড আছে। এটি মক্কার ৪টি রিং রোডের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। এটি মিনায় 'তরীক বাদশাহ আবদুল আযীয' প্রধান সংযোগ সড়কের ওভারব্রীজের নীচে গিয়ে মিশেছে। পরে সেখান থেকে ২য় সংযোগ সড়ক বাদশাহ খালেদ ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে এবং হাজারুল কাবস এলাকার উপর দিয়ে ৮০০ মিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ হয়ে ময়দানে আদলের ওভারব্রীজের সাথে গিয়ে মিশেছে। অপর দিকে এটা ২য় নেটওয়ার্ক দ্বারা শোয়াইবিন এলাকার সাথে সংযুক্ত হওয়ার ফলে গোটা মিনা ও মক্কার সকল এলাকার সাথে সংযোগ সৃষ্টি করেছে। ময়দানে আ'দল থেকে আযিযিয়া ক্রসিং দিয়ে ফয়সলিয়া হয়ে একটা ওভারব্রীজ দ্বারা ৯৫০ মিটার লম্বা দ্বিমুখী সুড়ঙ্গের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ঐ সুড়ঙ্গ পথটি শে'বে আমের পর্যন্ত গিয়ে মক্কার অভ্যন্তরীণ ২য় রিং রোডের সাথে মিশেছে। সেখান থেকে তা হারামের চারপাশে নির্মিত ১ম রিং রোডের সাথে গিয়ে সংযুক্ত হয়েছে।
২. বাদশাহ আবদুল আযীয সড়ক: এটি মিনার দক্ষিণ পার্শ্বে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা ২য় বৃহত্তম সড়ক। এটি মক্কার বাইরের ৪র্থ রিংরোডের সাথে সংযুক্ত। এটি মিনার ১ম সংযোগ সড়ক তরীক মালেক আবদুল আযীয ও ২য় সংযোগ সড়ক বাদশাহ খালেদ ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে এসে মসজিদে হারামের পার্শ্ববর্তী ২য় ও ১ম রিংরোডের সাথে মিলিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৯.৫ কিলোমিটার এবং প্রশস্ততা হচ্ছে ৩১.২০ মিটার। দুই দিকের প্রতি সড়কে ৩টি করে মোট ৬টি গাড়ীর ট্র্যাক আছে। এই রোডে মোট ৫টি ওভারব্রীজ ও ২টি সুড়ঙ্গ আছে। প্রতিটি সুড়ঙ্গ ১৪ মিটার চওড়া।
এবার আমরা সংযোগ সড়ক সম্পর্কে আলোচনা করবো:
১. তরীক মালেক আবদুল আযীয: এটি মিনার প্রথম ও প্রধান সংযোগ সড়ক হিসেবে বিবেচিত এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে এপার ওপার ভেদকারী। এটি মোযদালেফা ও মিনা থেকে মোআইসাম পর্যন্ত গিয়েছে এবং মক্কা শহরের বাইরের রিং রোড তথা মক্কা ৪র্থ রিং রোডের সাথে গিয়ে মিশেছে। মিনায় এটিকে বাদশাহ আবদুল আযীয অভারব্রীজও বলা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৩১.২০ মিটার। এর প্রতি দিকে ৩টি করে দুই দিকের রাস্তায় মোট ৬টি গাড়ীর ট্র্যাক আছে। এতে ৬টা ওভারব্রীজ আছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১ হাজার ৬৭৫ মিটার। এতে মোট ২টি সুড়ঙ্গ আছে। সুড়ঙ্গগুলো দ্বিমুখী। সুড়ঙ্গের প্রতিদিকের দৈর্ঘ্য ৩৫০ মিটার ও প্রস্থ ১৪ মিটার।
২. বাদশাহ খালেদ ওভারব্রীজ রোড: এটি মিনার ২য় বৃহত্তম সংযোগ সড়ক। এটিও উত্তর-দক্ষিণমুখী এবং মিনার এপার ওপার ভেদকারী। এই রাস্তা তৈরির লক্ষ্য হল, জামরাহ এলাকা থেকে গাড়ীর গতি পরিবর্তন করে তাকে আযিযিয়া এবং মোআইসামের দিকে বের করে দেয়া। এটি দক্ষিণের সাওর পর্বত থেকে উত্তরে মোআইসাম কসাইখানা পর্যন্ত সম্প্রসারিত। এটিও মক্কার বাইরের ৪র্থ রিং রোডের সাথে গিয়ে মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার। প্রতিদিকে ৩টি করে দুইদিকে মোট ৬টি গাড়ীর ট্র্যাক আছে। এতে দুটো ওভারব্রীজ আছে। একটি মিনার ভেতর এবং অন্যটি আযিযিয়ায়। এছাড়াও এতে ৮টি সুড়ঙ্গ আছে।
১নং পায়ে চলার পথ: এবার আমরা পায়ে চলার পথ সম্পর্কে আলোচনা করবো। মিনায় পায়ে চলার পথ ২টা। এই পথ দুটি মোযদালেফা এবং আরাফাতের সাথে গিয়ে মিশেছে। প্রত্যেকটার প্রশস্ততা হচ্ছে, ৩০ মিটার। ১নং ও প্রধান রাস্তাটি আরাফাত থেকে মোযদালেফা এসে এক রাস্তায় পরিণত হয়েছে। একসাথ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি রাস্তা ৩০ মিটার চওড়া এবং মিলিত হওয়ার পর মিনার প্রবেশ মুখে রাস্তাটির প্রশস্ততা দাঁড়িয়েছে ৬০ মিটারে। কিন্তু পড়ে তা সরু হয়ে মিনা উপত্যকার মাঝে ৩০ মিটার প্রশস্ততা নিয়ে জামরাহ পর্যন্ত এসেছে। সেখান থেকে মসজিদে হারামে পৌঁছেছে। মিনা-মোযদালেফা সীমান্ত থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত এর দৈর্ঘ হচ্ছে, ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩ কিলোমিটার মিনার ভেতর এবং অবশিষ্ট ৪ কিলোমিটার জামরাহ থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত। মিনা থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত এটিই হচ্ছে সবচাইতে সংক্ষিপ্ত রাস্তা। এতে গাড়ী চলাচল করেনা। এর ফলে মিনা থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব অর্ধেক কমে গেছে। এই রাস্তা তৈরির আগে মিনা থেকে মসজিদে হারামের দূরত্ব ছিল ৮ কিলোমিটার। কিন্তু এই রাস্তা তৈরির জন্য শে'বে আলী-জিয়াদ সুড়ঙ্গ এবং জিয়াদ-মাহবাসুল জ্বিন সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। তারপর জামরাহ-আযিযিয়া পাহাড় ঘেষে রাস্তা তৈরির ফলে, দূরত্ব অর্ধেক কমে আসে। সুড়ঙ্গের মধ্যকার পথ ছায়াদার। তাই সুড়ঙ্গের বাইরের রাস্তাকে প্রথম পর্যায়ে মাহবাসুল জ্বিন থেকে মিনার শেষ সীমা পর্যন্ত এয়ারকন্ডিশন শেড দ্বারা ছায়াদার বানানো হয় এবং ২য় পর্যায়ে, মোযদালেফা থেকে আরাফাত পর্যন্ত একে এয়ারকন্ডিশন শেড দ্বারা ছায়াদার বানানো হয়। এর ফলে, হাজীরা সূর্যতাপে আক্রান্ত হওয়ার সমস্যা থেকে রক্ষা পায়। এই রাস্তাটি মিনার দুটো এবং মোযদালেফার একটি ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে চলে গিয়েছে এবং ৪টা সুড়ঙ্গ অতিক্রম করেছে।
২নং পায়ে চলার পথ : এটি মিনা উপত্যকার উত্তরাঞ্চল, উত্তরাঞ্চলের শুয়াইবিন এবং মোআইসামের আধুনিক কসাইখানা এলাকার লোকদের জামরায় আসার সুবিধে সৃষ্টি করেছে। এই রাস্তার দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৪ শ' মিটার এবং প্রস্থ ১৫ মিটার। এতে সুড়ঙ্গ সংখ্যা হচ্ছে ৩টি। সুড়ঙ্গগুলোর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৬ মিটার ও প্রস্থ ১২.৫ মিটার।

পানি সেবা:
পানিহীন মিনা উপত্যকায় হজ্জের সময় লক্ষ লক্ষ হাজী ও অন্যান্য মানুষের ভীড় হয়। ১৪০৯ হিজরীতে, সৌদী আরবের বাহির থেকে আগত হাজীর সংখ্যা ৭ লাখ ৭৫ হাজার এবং ভেতর থেকেও প্রায় অনুরূপ পরিমাণ লোক হজ্জে অংশগ্রহণ করে। হাজীদের সেবার জন্য বিরাট সংখ্যক লোকের উপস্থিতিসহ মিনা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। এত বিপুল সংখ্যক হাজীদের জন্য প্রায় সপ্তাহ খানেক যাবত পানির ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য হলেও তা অত্যন্ত জরুরী। তাই মিনা, মোযদালেফা ও আরাফাতে ৩০টি পানির রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে এবং এগুলোতে হজ্জের সময় পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হয়।
এখন আমরা মিনার পানি সরবাহের উদ্দেশ্যে নির্মিত কিছু সংখ্যক পানির রিজার্ভার সম্পর্কে আলোচনা করবো।
১. মোআইসাম রিজার্ভার : এতে ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ধরে। তাই একে 'মিলিয়ন রিজার্ভার'ও বলে। এটা সায়েলের রাস্তা থেকে মিনায় যাওয়ার সময় ডানদিকে মুআইস নামক স্থানে সাগরের স্তর থেকে ৪৪৯ মিটার উপরে অবস্থিত। এর ভিত্তি ও ছাদ কংক্রিটের তৈরী এবং তা তিনদিকে পাহাড় বেষ্টিত। এই রিজার্ভারটি আধুনিক প্রকৌশলের একটি উন্নত উপহার। এর ছাদ তৈরীতে সর্বাধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। ছাদটিকে বাহির থেকে তারের মাধ্যমে ঝুলন্ত পুলের মত মনে হয়। এটাকে ওভারব্রীজ তৈরীর পদ্ধতিতে তৈরী করা হয়েছে। এর সাথে মক্কায় প্রাকৃতিক পানির উৎস হিসাবে সাওলা ও মাদীক থেকে পানি আনার সংযোগ লাইন দেয়া হয়েছে। মিনার শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্পের পাম্প স্টেশন থেকেও এতে পানি আনা হয়। এখান থেকে মক্কা শহরেও পানি সরবরাহ করা হয়।
২. জো'রানা রিজার্ভার : এতে ৬ লাখ ঘনমিটার পানি ধরে। এটি সাগরের স্তর থেকে ৪৪৮ মিটার উপরে তায়েফ-সায়েল রোড থেকে জোরানাগামী রাস্তার পার্শ্বে অবস্থিত এবং তিনদিক থেকে পাহাড় বেষ্টিত। এর ছাদ পাকা স্তম্ভের উপর নির্মিত এবং তার দিয়ে ছাদকে ১৬টি পিরামিডের আকৃতিতে তৈরী করা হয়েছে। রিজার্ভারটির দৈর্ঘ্য ৭৫০ মিটার প্রস্থ ৩৫০ মিটার ও গভীরতা ২৬ মিটার। পাইপ দিয়ে সাওলা, মাদীক ও বনি ওমাইর মাওর উপত্যকা থেকে সরবরাহ লাইন আনা হয়েছে এবং তায়েফ নোমান রাস্তায় অবস্থিত শোয়াইবিয়া লবণমুক্ত মিষ্টিপানি প্রকল্পের লাইনের সাথে এর সংযোগ দেয়া হয়েছে। এই রিজার্ভার থেকে পাইপের মাধ্যমে মিনার আলবাইয়া রিজার্ভার বাদশাহ ফাহাদ সড়কের রিজার্ভারসমূহ এবং সেখান থেকে শোয়াইবিন রিজার্ভারসমূহে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্য আরেক লাইনের মাধ্যমে সেখান থেকে মক্কার মুলকিয়া রিজার্ভারেও ১০ হাজার ঘনমিটার পানি সরবরাহ করা হয়। এই সকল রিজার্ভারের পানি বিশুদ্ধ করার জন্য বিশুদ্ধকরণ ইউনিট কায়েম করা হয়েছে।
৩. দুই নম্বর মোআইসাম রিজার্ভার : এই রিজার্ভারে ৯০ ঘনমিটার পানি ধরে। এটি মিনা যাওয়ার সময় হাতের ডানে মোআইস পাহাড়ের শীর্ষে সাগরের স্তর থেকে ৪৭৫ মিটার উপরে অবস্থিত। ১৪০০ হিজরী থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। পাইপের মাধ্যমে সাওলা ও মাদীক থেকে এতে পানি সরবরাহ করা হয়। এতে দৈনিক ৬ হাজার ঘন মিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়। এতে শোয়াইবিয়া মিষ্টি পানি প্রকল্পের পানি 'রাবওয়া-মিনা' রিজার্ভার থেকে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। এই রিজার্ভারের পানিসহ মিনা-মোযদালেফা এবং আরাফাতের পবিত্র স্থানসমূহের বড় বড় রিজার্ভারের পানি বিশুদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৪. রাজপ্রাসাদ রিজার্ভার: মিনার রাজপ্রসাদে পানি সরবরাহের জন্য এবং তা মসজিদে খায়েফের পশ্চিমে সাগরের স্তর থেকে ৪৪৩ মিটার উপরে অবস্থিত। এতে ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। ১৪০৫ হিজরীতে তা চালু হয়। এইটা থেকে রাজপ্রাসাদ ও মসজিদের খায়ফে পানি সরবরাহ করা হয়।
৫. শোয়াইবিন রিজার্ভার: এটি সাগরের স্তর থেকে ৩৭৬ মিটার উপরে মিনার আশ শোয়াইর আল কবীর এলাকার পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এতে ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। এটির উচ্চতা ৬ মিটার, দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার এবং তা কংক্রিটের তৈরী ও চতুর্ভুজ। পাইপের মাধ্যমে মাদীক থেকে এতে পানি সরবরাহ করা হয়। এর পানিও বিশুদ্ধ করা হয়।
৬. মালকান রিজার্ভার: এটি মোযদালেফা থেকে মিনায় প্রবেশের সময় মিনার পশ্চিম দিকের পাহাড়ের চূড়ায় সাগরের স্তর থেকে ৩৮৬ মিটার উপরে অবস্থিত। ১৪০৭ হিজরীতে ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি ধারণ সম্পন্ন এই রিজার্ভারটি চালু করা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার উচ্চতা ৬ মিটার। আগে মালকান উপত্যকা থেকে এতে পানি সরবরাহ করা হত বলে একে মালকান রিজার্ভার বলা হয়। চওড়া পাইপ দ্বারা শোয়াইবিয়া পানি প্রকল্পের পানি এতে সরবরাহ করা হয়। এর পানি বিশুদ্ধ করা হয়।
৭. বাদশাহ ফাহাদ রাবওয়া মিল রিজার্ভার: এতে ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। এই কসাইখনা দক্ষিণের পাহাড়ের চূড়ায় সাগরে স্তর থেকে ৩৮৮ মিটার উপরে অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার এং উচ্চতা ৬ মিটার। বর্গাকৃতির এই রিজার্ভারটি ১৩৯২ হিজরীতে চালু করা হয়। শোয়াইবিয়া মিষ্টি পানি প্রকল্পের লাইন থেকে এতে পানি আনা হয়। জমুম, নোমান উপত্যকা ও রাহজান উপত্যকা থেকে অপর একটি পাইপ দ্বারা এই রিজার্ভারে পানি আনা হয় আবার এই রিজার্ভার থেকে তিনটি পানি সরবরাহকারী প্রধান লাইনের মাধ্যমে পানি বন্টন করা হয়। ৭০০ মিলিমিটার পাইপের মাধ্যমে আযিযিয়া এলাকায়, ২য় একটি লাইন দ্বারা কওয়াশেক রিজার্ভার এবং ৩য় আরেকটি লাইন দ্বারা মিনার আরেকটি রিজার্ভারে পানি সরবরাহ করা হয়। এতে পানি বিশুদ্ধ করার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট আছে।
৮. বাইআহ রিজার্ভার: এখানে দুটো রিজার্ভার আছে। এই দুটো মিনার শেষ সীমান্তে জামরার কাছে অবস্থিত। প্রতিটিতে ১০ হাজার ঘনমিটার করে দুটোতে মোট ২০ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। নীচু রিজার্ভারটি সাগরের স্তর থেকে ৩৮০ মিটার উপরে এবং উঁচু রিজার্ভারটি ৪১৬ মিটার উপরে অবস্থান করছে। এগুলো বর্গাকৃতির এবং কংক্রিটের তৈরি। প্রতিটার দৈর্ঘ্য ৩৫ মিটার ও উচ্চতা ৬ মিটার। ১৩৯২ হিজরীতে এগুলো চালু করা হয়। সাওলা থেকে জাওয়াফা রিজার্ভারে আগত লাইন থেকে এতে পানি আনা হয়। বর্তমানে রাবওয়া-মিনা রিজার্ভার থেকেও এতে পানি আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৯. মসজিদে খায়ফ রিজার্ভার : এতে দু'টো রিজার্ভার আছে। ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারটিতে ৬ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে এবং বাইরের রিজার্ভারটিতেও আরো ৬ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে।
১০. ২ নং শোয়াইবিন রিজার্ভার : এতে দু'টো রিজার্ভার আছে। প্রতিটিতে তিন হাজার ঘনমিটার করে মোট ৬ হাজার ঘনমিটার পানি ধরে। মিনায় সর্বমোট ১৮টি রিজার্ভার আছে।
মিনায় আগে যখন এ সকল ব্যবস্থা ছিলনা, তখন পানি সমস্যা কত মারাত্মক ছিল তা ভালভাবে বুঝা যায়। বর্তমানে সেখানে পানির কোন সংকট নেই।
গরমের মধ্যে ঠাণ্ডা পানি সরবরাহের জন্য বহু পানির কুলার বসানো হয়েছে। সেগুলো থেকে হাজীরা ঠাণ্ডা পানি পান করে। এ ছাড়াও বাদশাহ ফাহাদ পানি প্রকল্প থেকে হাজীদের উদ্দেশ্যে ঠাণ্ডা পানি বন্টন করা হয়।
১৪০৩ হিজরীতে, মিনায় পানির নেটওয়ার্ক কাজের সমাপ্তি হয় এবং ঐ নেটওয়ার্ক মিনা উপত্যকা, শোআইবিন উপত্যকা, মিনার পাহাড়, জামরাহ এলাকা, মসজিদে খায়ফের পার্শ্ববর্তী পাহাড়, কাবশ ওভারব্রীজসহ বিরাট এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়াও মোআইসামের আধুনিক কসাইখানা এলাকা পর্যন্ত শারায়ে'তে অবস্থিত পানির সংরক্ষণাগার থেকে পাইপ লাইন বসানো হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। পানি নেটওয়ার্কের মধ্যে পানি সরবরাহ লাইন, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বৃষ্টি ও বন্যার পানি নিষ্কাশন পয়ঃনালা, সুয়েরেজ লাইন, পরিচ্ছন্নতা কেন্দ্র, পান করার পানি বিশুদ্ধকরণ এবং হিমায়িতকরণের জন্য ৪টি কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে অন্যতম।
১৪০৩ হিঃ, ১ম দফায় বাদশাহ খালেদ এবং বাদশাহ আবদুল আযীয ওভারব্রীজের মধ্যবর্তী এলাকায় ৫ হাজার টয়লেট এবং ১৪০৪ হিঃ, শোআইবিন এলাকায় আরও কয়েক হাজার টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও পাহাড়ের উপর অতিরিক্ত ১৮০০ টয়লেট তৈরি করা হয়েছে। মোট টয়লেটের সংখ্যা হচ্ছে ১৬ হাজার। অজুর জন্য চুম্বক কল নির্মাণ করায় হাত বাড়ানোর সাথে সাথে পানি পড়া শুরু হয়। হাতে কল ঘুরানোর দরকার হয় না।
হজ্জের সময় মিনায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত বাজার এং হোটেল বসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও খাদ্য এবং পণ্যদ্রব্য সরবরাহ করে থাকে।
তাঁবুতে অগ্নিকান্ড না ঘটার লক্ষ্যে বর্তমানে হাজীদেরকে পৃথক পৃথক রান্না করতে দেয়া হয় না। মোতাওয়েফরা রান্না করে খাওয়ায় এবং হাজীদের থেকে খাবারের মূল্য গ্রহণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00