📄 দারুল আরকাম বিন আবিল আরকাম
এই ঘরটিকে ইসলামের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলা হয়। হযরত আরকাম (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর একজন প্রখ্যাত সাহাবী। এক বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি ১ম ১০ জন সাহাবীর পরেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ৫২ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
মক্কার সাফা পাহাড়ের ডানপাশে তাঁর একটি ঘর ছিল। মুসলমান হওয়ার পর তিনি ইসলামের জন্য ঐ ঘরটি ওয়াকফ করে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা) কোরাইশদের ভয়ে সেই ঘরে বসে গোপনে লোকদের কাছে ইসলাম প্রচার করতেন। বড় বড় সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই এ ঘরে ইসলাম গ্রহণ করেন। সর্বশেষ হযরত উমরসহ মোট ৪০ জন সাহাবায়ে কেরামের ইসলাম গ্রহণ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা) সেই ঘরে বসেই ইসলামের দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করেন। তারপর প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতী তৎপরতা শুরু হয়।
হযরত আরকামের নাতি আবু জাফর মনসুরের কাছে ঐ ঘরটি বিক্রি করে ফেলেন। এক সময় ঐ ঘরকে 'দারুল খাইযুরান' বলা হত। খলীফা মাহদীর দাসী খাইযুরান সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং লোকেরা তা দেখতে যেত। তাঁর দিকে সম্বোধন করেই হয়তো এটিকে ঐ নতুন নামে অভিহিত করা হত।
মসজিদে হারামের সৌদী সম্প্রসারণের সময় ঐ ঘরটি পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং আমর বিন মারুফ ও নেহী আনিল মোনকার বিভাগের অফিস হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এর একটি অংশে কুরআন ও হাফেজী শিক্ষা চালু করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাও ভেঙ্গে দেয়া হয়। কিন্তু আজ পর্যন্তও তার চিহ্ন রয়েছে।
📄 হযরত আলীর (রা) জন্মস্থান
হযরত আলী (রা) যেই ঘরে জন্মগ্রহণ করেন, সেই ঘরটি নবী করীম (সা) এর জন্মস্থানের নিকটবর্তী জায়গায় শে'বে আলীতে অবস্থিত। এই ঘরের সামনে লেখা ছিল : هٰذَا مَوْلِدُ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ অর্থাৎ, এটি আমীরুল মোমেনীন এর জন্মস্থান। এই ঘরেই হযরত মুহাম্মাদ (সা) এরও প্রতিপালন হয়। উল্লেখ আছে যে, এই ঘরের দেয়ালে একটি পাথর আছে। ঐ পাথরটি নাকি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে কথাবার্তা বলত।
৬০৮ হিজরীতে, আহমদ নাসের লি-দীনিল্লাহ ঐ ঘরটি পুনর্নির্মাণ করেন। সেখানে নিরক্ষরতা দূর করার উদ্দেশ্যে 'মাদরাসাতুন নাজাহ' নামক একটি নৈশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েম করা হয়েছে এবং নতুন করে ঘরটি তৈরী করা হয়েছে। বর্তমানে ঐ ঘরটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। কেননা, শে'বে আলী থেকে জাবালে আবু কোবায়েসের নীচ দিয়ে মিনা অভিমুখী দু'টো সুড়ঙ্গ তৈরি করায় শে'বে আলীর সকল বাড়ী ঘর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। হযরত আলী বিন আবি তালেব প্রথম ৪ জন মুসলমানের একজন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচাতো ভাই, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদের স্বামী এবং হযরত হাসান ও হোসাইনের বাপ ছিলেন। তিনি ইসলামের ৪র্থ খলীফা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাবুক যুদ্ধের সময় তার সম্পর্কে বলেছিলেন,-
أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى إِلَّا أَنَّكَ لَسْتَ بِنَبِيِّ
অর্থ : 'আমার কাছে তোমার মর্যাদা হচ্ছে মূসা (আ) এর কাছে হারুন (আ) এর মত। তবে পার্থক্য হচ্ছে এইটুকু যে, তুমি নবী নও।' তিনি ৪০ হিজরীর ১৭ই রমযান শহীদ হন। তাঁর খেলাফত সাড়ে তিন মাস কম ৫ বছর স্থায়ী ছিল।
আবু সুফিয়ানের (রা) ঘর: খাদীজার ঘরের কাছেই ছিল আবু সুফিয়ানের ঘর। সেখানে বর্তমানে আল-কাব্বান হাসপাতাল অবস্থিত। এর বিপরীতেই মসজিদে হারামের বাবুন্নবী।
হামযার (রা) ঘর: রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা হামযার ঘর ছিল মসজিদে হারামের দক্ষিণে আধা কিলোমিটার দূরে মেসফালায়। সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
আবু জাহেলের বাড়ী: এ বাড়ীটিতে বর্তমানে টয়লেট ও ওজুখানা নির্মাণ করা হয়েছে। সেটি মসজিদে হারামের উত্তর-পূর্বদিকে এবং আবু সুফিয়ানের বাড়ীর কাছে ছিল।
📄 মোআল্লাহ কবরস্থান : অনেক সাহাবীর কবর
মক্কার কবরস্থানের ফজীলত ও মর্যাদা অনেক বেশী। এই কবরস্থানে ৪৫ জন মহিলা ও পুরুষ সাহাবায়ে কেরামসহ আরো অনেক বুজুর্গের কবর রয়েছে।
মক্কার সবচেয়ে বড় কবরস্থান হচ্ছে হুজুনের কাছে মোয়াল্লাহ কবরস্থান। মোয়াআল্লাহ শব্দের অর্থ হচ্ছে উঁচু। এই কবরস্থানটি মক্কার উঁচুদিকে অবস্থিত বলে একে মোয়াল্লাহ বলা হয়। বেশীর ভাগ মত অনুযায়ী, হযরত খাদীজা (রা) এর কবর এখানে অবস্থিত। কারো কারো মতে, তখনকার যুগে মক্কার কবরস্থান অন্যত্র ছিল এবং সেই কবরস্থানের বিশেষ কোন চিহ্ন বর্তমানে অবশিষ্ট নেই।
মোয়াল্লাহ কবরস্থানে দাফনকৃত লোকদের সৌভাগ্য বেশী। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত হাজী ও উমরাহ আদায়কারী লোকেরা এখানে কবর যিয়ারত করে এবং মুর্দাদের জন্য দোয়া করে। দোয়াকারীদের মধ্যে কত না নেককার লোক রয়েছেন, যাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন! এছাড়াও মোয়াল্লাহ কবরস্থানের বেশীর ভাগ মুর্দার নামাযে জানাযা মসজিদে হারামে অনুষ্ঠিত হয়। এই দিক থেকেও এখানকার কবরবাসীরা ধন্য।
মোয়াল্লাহ কবরস্থানের উপর দিয়ে বর্তমানে হুজুন ওভার ব্রীজ তৈরি করাতে বাহ্যতঃ কবরস্থানটি দুইভাগে বিভক্ত দেখা যায়। অবশ্য ওভারব্রীজের নীচ দিয়ে দুই দিকে পারাপারের ব্যবস্থা আছে।
📄 জু-তওয়া : রাসূলুল্লাহর (সা) মক্কা প্রবেশের অবতরণস্থল
জু-তওয়া মক্কার প্রসিদ্ধ কূপসমূহের অন্যতম। এটি জারওয়ালের বর্তমান ম্যাটারনিটি ও চিলড্রেন হসপিটালের সামনে অবস্থিত। হাদীসে এ কূপের আলোচনা এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে অবতরণ করে গোসল করেছেন এবং রাত্রি যাপন করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে মক্কায় আসার সময় প্রথমে জু-তওয়ায় অবতরণ করেন এবং সেখানে ফজরের নামায পড়া পর্যন্ত রাত কাটান। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নামাযের স্থান হচ্ছে বর্তমান মসজিদের আরো পরে এবং নীচে। হযরত ইবনে উমরের বর্ণনায় আরো এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) জু-তওয়ায় রাত্রিযাপন, ফজরের নামায পড়া এবং সেখানে থেকে গোসল করা ব্যতীত দিনে ছাড়া কখনো মক্কায় প্রবেশ করতেন না। (আবু দাউদ ও নাসাঈ) আবুজর আরো একটু অতিরিক্ত যোগ করে বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা) রাত্রে মক্কায় প্রবেশ করা অপছন্দ করতেন।
উরওয়া থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) জু-তওয়ায় রাত্রি যাপন করেন ও ফজরের নামায পড়েন। তারপর গোসল করেন এবং মক্কায় প্রবেশ করেন। (মোআত্তা মালেক)
হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি মসজিদে হারামে প্রবেশের আগে, মক্কার নিজ বাড়ীতে গোসল করতেন। হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি মক্কায় প্রবেশের আগে, জু-তওয়ায় গোসল করতেন। )اخرجه الشافعی
ইমাম মালেক উল্লেখ করেছেন, ইবনে উমর হজ্জ ও উমরাহ করার উদ্দেশ্যে বের হলে নিজে গোসল করা এবং সাথীদেরকে গোসলের আদেশ ব্যতীত মক্কায় প্রবেশ করতেন না। হযরত ইবনে উমর থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় প্রবেশের আগে ফাখ নামক জায়গায় গোসল করেছেন। (দারে কুতনী) হাফেজ মুহিববুদ্দিন তাবারী বলেছেন, উলামায়ে কেরামের মতে, মক্কায় প্রবেশের আগে গোসল করা মোস্তাহাব।
জু-তওয়া হচ্ছে, উত্তর দিক থেকে আগত যাত্রীদের মক্কায় প্রবেশের সাবেক প্রবেশ পথ। এটি মসজিদে হারাম থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বর্তমানে মক্কা শহর সম্প্রসারিত হয়ে অনেক বড় হয়েছে এবং জু-তওয়া শহরের মাঝখানে অবস্থান করছে। অথচ আগে মক্কা শহর ঐ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।
অপরদিকে, ফাখ হচ্ছে বর্তমানে যাহের, শোহাদা ও উম্মুল জুদ নামে পরিচিত এলাকার নাম। ফাখ হচ্ছে, মক্কার ২য় বৃহত্তম উপত্যকা। এটি মূলতঃ সানিয়াতুল বায়দা পাহাড়ের ঢালু থেকে শুরু হয়েছে। এটি জেদ্দাগামী লোকদের জন্য জু-তওয়ার বামে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জের সময় যখন মক্কায় আসেন তখন জু-তওয়ায় অবতরণ করে গোসল করেন। তবে বিদায় হজ্জ ছাড়া অন্য কোন সফরে তিনি ফাখ এলাকায় অবতরণ করেন এবং গোসল করেন। বর্তমানে এর কাছে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে।