📄 রাসূলুল্লাহর (সা) জন্মস্থান
মক্কার সোকুল লাইলের (নৈশ বাজার) উপরিভাগে এক ঘরে রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। আবরাহা বাদশাহর ধ্বংসের বছরকে عام الفیل বা 'হস্তিবাহিনীর বছর' বলা হয়। সেই বছর রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার দিন ভোরে রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম তারিখের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ২য়, ৩য়, ৯ম ও ১২ই রবিউল আউয়ালে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। ১২ই রবিউল আউয়াল বেশী প্রচলিত। তবে ৯ই রবিউল আউয়াল বেশী সঠিক। কেননা দিবসের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন। ইমাম আহমদ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন। সোমবারকে ঠিক রাখার জন্য বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখেছেন, ৯ই রবিউল আউয়াল ছিল সোমবার। পক্ষান্তরে, ১২ই রবিউল আউয়াল ছিল বৃহস্পতিবার। এই হিসেবে ৯ তারিখ বেশী যুক্তিসংগত।
তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন, সোমবারে নবুওয়ত লাভ করেন, মক্কা থেকে সোমবারে মদীনায় হিজরত করেন, মদীনায় এসে সোমবারে পৌঁছেন, সোমবারে হাজারে আসওয়াদকে তার যথাস্থানে উঠান এবং সোমবারে ইন্তিকাল করেন।
কারো কারো মতে, তিনি খতনা করা এবং নাভীর আঁত কাটা অবস্থায়, দুই হাত যমীনে বিছিয়ে আকাশের দিকে মাথা উঁচু অবস্থায় ভূমিষ্ট হন। তাঁর শরীরে প্রসবকালীন কোন ময়লা আবর্জনা ছিল না।
নবী করীম (সা) এর প্রসব কাজে নিয়োজিত দাই আবদুর রহমান বিন আওফের মা শেফা বলেন, নবী (সা) যখন আমার হাতে এসে পড়লেন এবং কেঁদে উঠলেন তখন আমি একজন লোকের এই শব্দ শুনতে পাই, رَحْمَكَ اللهُ আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন।' তারপর আমার সামনে, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত সব আলোকিত হয়ে গেল। এমনকি তখন আমি রোমের ইমারত ও রাজ প্রাসাদসমূহ পর্যন্ত দেখতে পাই।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্মের রাতে বহু আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, বহুসংখ্যক মূর্তি স্থানচ্যুত হল এবং তাদের মুখের উপর উপুড় হয়ে পড়ে রইল। অন্যটি হচ্ছে, তাঁর জন্মের সাথে সাথে এমন আলো উদ্ভাসিত হল যে, সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ পর্যন্ত দেখা গেল। আরেকটি ঘটনা হল, পারস্য সম্রাট কেসরার রাজ দরবার কেঁপে উঠল, ছায়াদার নির্মিত ছাতাগুলো ভেঙ্গে পড়ল, একহাজার বছর যাবত প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড নিভে গেল এবং তা একটি পুকুরে পরিণত হয়ে গেল।
📄 জন্মস্থানের ইতিহাস
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরত করার পর আকীল বিন আবি তালেব ঐ ঘরটির মালিক হন। দীর্ঘদিন যাবত ঘরটি তাঁর ও তাঁর সন্তানদের মালিকানায় থাকে। অবশেষে তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে একজন ঐ ঘরটি মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আস-সাকাফীর কাছে বিক্রি করেন। পরে উম্মুল খলীফাতাইন খাইযুরান হজ্জ করতে এসে ঐ ঘরটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন।
কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ (সা) বর্তমানে তাঁর জন্মস্থান বলে পরিচিত জায়গায় জন্মগ্রহণ করেননি। কিন্তু বেশীর ভাগ লোকের রায় হচ্ছে, তিনি এই জন্মস্থানেই জন্মলাভ করেছেন। ইবনে জোহাইরাও এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্মস্থান সোকুল লাইলের (নৈশ বাজার) পার্শ্বে অবস্থিত এবং এ ব্যাপারে মক্কাবাসীদের কোন মতভেদ নেই। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত এটিই তাঁর জন্মস্থান বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
জন্মঘরের বর্ণনা:
আল্লামা ফাসী শেফাউল গারাম বইতে লিখেছেন, এটি খুঁটির উপর একটি বর্গাকৃতির ঘর। এর উপর দুটো ছোট মিনারা আছে। এর পশ্চিম কোণ বড় এবং এতে ১০টি জানালা আছে এবং একটি মেহরাব আছে। মেহরাবের কাছে একটি গর্তে কাঠের একটি খুঁটি আছে। এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, ঘরের এই স্থানেই রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেছেন। ৫৭৬ হিজরীতে নাসের আব্বাসী এবং ৬৬৬ হিজরীতে বাদশাহ মুজাফফর এই ঘরটি পুনঃনির্মাণ করেন। ইবনে যোবায়ের তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে এই ঘরের যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তা পূর্বের বর্ণনার বিপরীত। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, এই ঘরটি সবসময় একই অবস্থায় ছিল না। বিভিন্ন সময় এর পূনঃনির্মাণ হয়েছে।
বাদশাহ আবদুল আযীযের আমলে, এই ঘরের পুরাতন কাঠামো ভেঙ্গে তা নতুন করে নির্মাণ করা হয় এবং এতে বড় এক পাবলিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। লাইব্রেরীর নাম হচ্ছে 'মক্কা লাইব্রেরী'। এতে বহু ইসলামী বই-পুস্তকের সমাহার ঘটানো হয়েছে। লোকদের লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে এই লাইব্রেরী খোলা থাকে।
📄 হযরত খাদীজার ঘর
জন্ম ও বংশ: খাদীজা বিনতে খোয়াইলাদ বিন আসাদ বিন আবদুল ওয্যা বিন কুসাই আল-আসাদীয়ার বংশ রাসূলুল্লাহ (সা) এর পূর্ব পুরুষ কুসাই এর সাথে গিয়ে মিশেছে। হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) র জন্মের ১৫ বছর আগে, 'বাইতে খাদীজা' নামক মশহুর ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন।
📄 খাদীজার বৈশিষ্ট্য
হযরত খাদীজার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য আছে।
১। তিনিই রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান এবং তিনিই হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রথম স্ত্রী। হযরত খাদীজার সাথেই তিনি ২৪ বছর ঘর সংসার করেন এবং তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য কোন বিয়ে করেননি। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁকে মক্কায় দাফন করা হয় এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কবরে নামেন। তাঁকে মোয়াল্লাহ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
২। তিনিই প্রথম মোমেন। নারী-পুরুষের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই রাসূলুল্লাহ (সা) এর রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন, সাহায্য করেন এবং তাঁকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন। তাঁর উছিলায় আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াত ও প্রচার কাজের সকল দুঃখ কষ্ট লাঘব করেন।
৩। তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসে এসেছে: سَيِّدَةُ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ مَرْيَمُ ثُمَّ فَاطِمَةُ ثُمَّ خَدِيجَةُ ثُمَّ آسِيَةٌ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ . অর্থ: 'মহিলাদের সর্দার (সেরা) হচ্ছে মরিয়ম, তারপর ফাতিমা, তারপর খাদীজা এবং পরে হচ্ছে ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া।'
হযরত আনাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, حَسْبُكَ مِنْ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَخَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلَدَ وَفَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ وَاسِيَةٌ - احمد والترمذى . অর্থ: 'জগতের মহিলাদের মধ্যে মরিয়ম বিনতে ইমরান, খাদীজা বিনতে খুয়াইলাদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ এবং আসিয়াই তোমার জন্য যথেষ্ট।' (আহমদ-তিরমিযী)
৪। হযরত খাদীজা (রা) থেকেই রাসূলুল্লাহর সকল সন্তান জন্মলাভ করেছে। একমাত্র ইবরাহীমের জন্ম হয়েছে মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে।
৫। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
لَقَدْ رُزِقْتُ حُبَّهَا فَأَنَا أُحِبُّ مَنْ يُحِبُّهَا
অর্থ: 'আমি তাঁকে (খাদীজাকে) ভালবাসার সুযোগ পেয়েছি। তাঁকে যারা ভালবাসবে, আমি তাদেরকে ভালবাসবো।'
৬। হযরত আয়েশা (রা) খাদীজা (রা) এর ব্যাপারে যখন কথা বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর শানে বলেন, আল্লাহ খাদীজার চাইতে উত্তম কোন স্ত্রী আমাকে দেননি; যখন লোকেরা কুফরী করেছে তখন সে আমার রিসালতের উপর ঈমান এনেছে, যখন অন্যরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তখন সে আমার কথা বিশ্বাস করেছে, যখন লোকেরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে আমাকে আশ্রয় দিয়েছে; যখন তারা আমাকে বঞ্চিত করেছে তখন সে আমাকে সমবেদনা জানিয়েছে এবং অন্য স্ত্রীদের সন্তান থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি, কিন্তু তাঁর থেকে আমার সন্তান হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)
৭। বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, হযরত খাদীজার প্রতি স্বয়ং আল্লাহ এবং জিবরাইল (আ) সালাম পাঠিয়েছেন। জিবরাইল (আ) বললেন, হে মুহাম্মাদ! খাদীজা আপনার জন্য একটি পাত্রে তরকারি ও খাবার নিয়ে এসেছিল। পুনরায় আসলে তাঁকে তাঁর রব এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম দেবেন। হযরত খাদীজাকে ঐ সালাম পৌঁছানোর পর তিনি সালামের জবাবে বলেন:
اللهُ السَّلَامُ وَمِنْهُ السَّلَامُ عَلَى جِبْرِيلَ (বুখারী ও মুসলিম)
অর্থ: 'আল্লাহ নিজেই শান্তি এবং জিবরাইলের উপর তার শান্তি বর্ষিত হোক।'
৮। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, হযরত জিবরাইল খাদীজা (রা) কে বেহেশতের এমন একটি ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন যাতে কোন চিৎকার নেই এবং নেই কোন কষ্ট ক্লেশ। (বুখারী ও মুসলিম)
তিনি হিজরতের আগে ১১ই রমযান ইন্তিকাল করেন। কারো কারো মতে, তিনি অন্য তারিখে মারা যান।
ঘরের বর্ণনা:
হযরত খাদীজার ঘরেই, তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিয়ে হয় এবং একই ঘরে হযরত ফাতিমাসহ তাঁর অন্যান্য সকল সন্তান জন্মগ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরত করার আগ পর্যন্ত ঐ ঘরেই বাস করতেন। তারপর, আকীল বিন আবু তালেব ঘরটি নিয়ে নেন। পরবর্তীতে, হযরত মুয়াওবিয়াহ (রা) তাঁর থেকে ঘরটি কিনে এটিকে মসজিদ বানান এবং লোকেরা এতে নামায পড়া শুরু করে।
ইবনে জোহাইরাহ বলেন, লোকেরা প্রত্যেক মঙ্গলবার রাত্রে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত এই মসজিদে আল্লাহর জেকর ও এবাদত করত। কয়েকটি কারণে এই ঘরটি মসজিদে হারামের পর, মক্কার অন্যান্য সকল স্থান থেকে উত্তম বলে বিবেচিত। কারণগুলো হচ্ছে, এতে রাসূলুল্লাহ (সা) বাস করেছেন, অনেক ওহী এই ঘরেই নাযিল হয়েছে এবং হযরত ফাতিমা এই ঘরেই জন্মগ্রহণ করেছেন। ঘরটির দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৫ হাতের কিছু কম।
ঘরের ভেতর কূপের মত প্রশস্ত মুখ বিশিষ্ট গোলাকৃতির একটি জায়গা আছে। এর দৈর্ঘ্য এক হাত এবং প্রস্থও এক হাত। এর মধ্যভাগে একটি কালপাথর আছে। এই পাথরটির উপর হযরত ফাতিমার মাথা প্রসবিত হয়েছিল বলে বলা হয়। তবে, একথা ঠিক যে, এই ঘরেই হযরত ফাতিমা (রা) জন্মগ্রহণ করেছেন। পাথরটির উপর প্রসবকালীন সময়ে হযরত ফাতিমার মাথা এসে পড়েছিল কিনা তা প্রমাণ সাপেক্ষ ব্যাপার। এর সপক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বাদশাহ আশরাফের আমলে, নাসের আব্বাসী ঐ ঘরটি নির্মাণ করেন। এই ঘরের সাথে قُبَةُ الْوَحِى বা 'ওহী গম্বুজ' নামক একটি জায়গা অবস্থিত ছিল। সাথে আরো একটি জায়গা সংযুক্ত ছিল। সেটির নাম ছিল الْمُخْتَبَى বা 'লুকানোর জায়গা'। মক্কার মোশরেকদের ইট পাথর বর্ষণের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) এই জায়গায় আত্মগোপন করে থাকতেন। ইয়েমেনের বাদশাহ মুজাফফর 'কুব্বাতুল ওহী' নির্মাণ করেন।
অবশেষে, বাদশাহ আবদুল আযীযের আমলে মক্কা পৌরসভার মেয়র শেখ আব্বাস কাত্তান ঘরটি পুনঃনির্মাণ করেন এবং এতে হাফেজী মাদ্রাসা চালু করেন। মসজিদে হারামের পবিত্রতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এতে হাফেজী মাদ্রাসা চালু করা হয়। এই ঘরটি গায্যা বাজারের স্বর্ণের মার্কেটের ভেতর অবস্থিত। কিন্তু, বর্তমানে তাও ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।