📄 ৩১) হারাম এলাকার অধিবাসীদের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
মাওয়ারদী তাঁর الاحكام السلطانية 'গ্রন্থে লিখেছেন, 'তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে না যদি তারা হক ও ইনসাফপন্থীদের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করে, তবুও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত নয়।' কিছু সংখ্যক ফিকাহবিদ বলেছেন, 'তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জায়েয নেই; তবে তাদেরকে এমনভাবে কোনঠাসা করা যাবে, যেন তারা আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং হক ও ইনসাফের গণ্ডীতে প্রবেশ করে।' বেশীর ভাগ ফেকাহবিদরা বলেছেন, তাদের বিদ্রোহ দমনে যদি লড়াই ছাড়া বিকল্প উপায় না থাকে, তাহলে, অবশ্যই লড়াই করতে হবে। কেননা, বিদ্রোহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আল্লাহর অধিকার। তাই এই অধিকারকে নষ্ট করা যাবে না। হারাম এলাকায় এই অধিকার নষ্ট হওয়ার চাইতে হেফাজত করা বেশী জরুরী। মতভেদের কারণ হল রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস। সেটি হচ্ছে:
فَلَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِانْ يُسْفِكَ بِهَادَمًا .
অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে, তার জন্য হারাম এলাকায় খুন-খারাবী জায়েয নেই।' এই হাদীস দ্বারা যুদ্ধের সকল কারণকে নিষেধ করা হয়েছে এবং মাত্র এক ঘন্টার জন্য, রাসূলুল্লহর উদ্দেশ্যে এখানে যুদ্ধকে হালাল করার কারণও বর্ণনা করা হয়েছে।
এছাড়া আরেকটি হাদীসও এক্ষেত্রে মতভেদের কারণ। সেটি হচ্ছে-
فَإِنْ أَحَدٌ تَرَخَّصَ بِقِتَالِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُولُوا : إِنَّ اللَّهَ أَذِنَ لِرَسُولِهِ وَلَمْ يَأْذَنُ لَكُمْ .
'কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে এখানে যুদ্ধকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে বল, আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছেন, তোমাদেরকে অনুমতি দেননি।'
এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য মক্কায় যুদ্ধকে বৈধ এবং অন্যদের জন্য অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর সমর্থনে মুসনাদে বাজ্জারে, হযরত জাবের নবী করীম (সা) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, হাদীসটি হচ্ছে:
إِنَّ قَوْمَ صَالِحٍ لَمَّا عَقَرُوا النَّاقَةَ أَهْلَكَ اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مِنْهُمْ إِلَّا رَجُلاً كَانَ فِي حَرَمِ اللَّهِ فَمَنَعَهُ مِنْ عَذَابِ اللَّهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ هُوَ ؟ قَالَ أَبُورَ غَالَ .
অর্থ : 'কাওমে সালেহ যখন উটকে হত্যা করেছিল, তখন যমীনে তাদের যত লোক ছিল আল্লাহ তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিলেন এবং আল্লাহর হারামে অবস্থিত তাদের এক ব্যক্তিকে শান্তি থেকে রেহাই দিলেন। সাহাবারা প্রশ্ন করলেন, হে রাসূলুল্লাহ, সে ব্যক্তিটি কে? তিনি বললেন, সে ছিল আবু রেগাল।'
মক্কার অধিবাসীদের আরেকটি বৈশিষ্ট হল, তাদের থেকে বর্ণিত হাদীস অন্যদের বর্ণিত হাদীস অপেক্ষা বেশী অগ্রগণ্য। যারাকশী, আবুল ফতহ বিন বোরহান অসুলীর কিতাব 'আল-আওসাত' থেকে উল্লেখ করেছেন : 'হারামের অধিবাসীদের রেওয়ায়েত অন্যদের রেওয়ায়েত থেকে বেশী গ্রহণযোগ্য। কেননা, তারা অন্যদের চাইতে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর অবস্থা বেশী জানতেন। এ জন্যই কোন কোন মোহাদ্দেসীন বলেছেন, 'হারাম এলাকা অতিক্রম করে গেলে সে রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য নয়।'
হারামের অধিবাসীদের পক্ষে অনুরূপ বক্তব্য বেশী বাড়াবাড়ি। অথচ, অন্যান্য শহরের লোকদের দ্বারা বর্ণিত অনেকগুলো সহীহ হাদীস রয়েছে যার উপর আমল করা হচ্ছে। মক্কার বাসিন্দাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানে যারা বাস করে, তারা যেন জেহাদের কোন ঘাঁটিতে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছেন। এক হাদীসে মক্কার অপর নাম হচ্ছে رباط বা ঘাঁটি"। আল্লামা ফাসী, আল্লামা ফাকেহী থেকে একটি মরফু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর নামকরণ করেছেন রিবাত বা 'ঘাঁটি'। ঘাঁটি থেকে, জেহাদের ময়দানে, শত্রুদের প্রতিহত করার জন্য মুজাহিদদেরকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হয়। একজন মোমেন, যখন মক্কায় বাস করেন, তিনিও সওয়াবের নিয়তেই এখানে ঘাঁটিতে পাহারারত মুজাহিদের মত এবাদতে মশগুল থাকেন। তিনি কঠোর শ্রম ও সাধনা করেন এবং নামাযকে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করার ব্যাপারে যত্নবান থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন এবং তাঁর কাছে মর্যাদাবান হন। মূলত: সময়ের সদ্ব্যবহার করে আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম মর্যাদা ও সম্মান লাভ করাই হচ্ছে জিহাদেরও উদ্দেশ্য।
আহলে মক্কার আরেকটি বৈশিষ্ট হল, হজ্জের এহরাম বাঁধার জন্য তাদেরকে মিকাতে যেতে হয় না। মক্কাই হচ্ছে তাদের মিকাত। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের জন্য উত্তম হচ্ছে, মসজিদে হারামের নিকটবর্তী কোন মসজিদ থেকে এহরাম বাঁধা। হাদীসে এসেছে, وَأَهْلُ مَكَّةَ يُهِلُونَ مِنْهَا অর্থ : 'আহলে মক্কা মক্কা থেকেই এহরাম বাঁধবে।' তাদের মিকাতই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ মিকাত। এখানে প্রবেশ করার জন্যই বাইরে মিকাত নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং বহিরাগত লোকেরা সেখান থেকেই এহরাম বাঁধবে।
আহলে মক্কার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, কেরান ও তামাতু হজ্জের কারণে, তাদের উপর কোরবানী ওয়াজিব হয় না। ইমাম মালেক ও শাফেয়ীসহ অধিকাংশ আলেমের মত এটাই। মসজিদে হারামে উপস্থিত হওয়ার কারণেই তাদের এই বিশেষ সুবিধা। অন্যদের জন্য কেরাণ ও তামাতু হজ্জে কোরবানী ওয়াজিব। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে,
ذَلِكَ لِمَنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ - (بقره : ١٩٦)
অর্থ: 'এই হুকুম তাদের জন্য, যারা মসজিদে হারামের উপস্থিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নয়।' অর্থাৎ যারা মক্কার অধিবাসী নয়, তাদের উপরই কেরান ও তামাতু হজ্জে কোরবানী ওয়াজিব।
ইমাম মালেক আহলে মক্কার জন্য কেরান হজ্জকে মাকরূহ মনে করেন। ইমাম আবু হানীফার মতে, মক্কার অধিবাসীদের জন্য কেরান হজ্জ জায়েয নেই।
নবী করীম (সা) এবং কিছু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী বলেছেন, মক্কার অধিবাসীরা হচ্ছে 'আহলুল্লাহ' বা আল্লাহর পরিবারভুক্ত। দুনিয়ার আর কোন শহরের অধিবাসীদের ব্যাপারে এরকম সম্মান ও মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়নি।
ওহাব বিন মোনাব্বেহ বর্ণনা করেছেন যে, 'আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি হারামের অধিবাসীদেরকে নিরাপত্তা দেয়, তার জন্য আমার নিরাপত্তা ওয়াজিব হয়ে যায় এবং যে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে, সে আমায় দায়িত্বে হস্তক্ষেপ করে। প্রত্যেক বাদশাহর চতুষ্পার্শ্বে নিজস্ব মালিকানাধীন সম্পত্তি থাকে; মক্কা আমার নিজস্ব মালিকানাধীন সম্পত্তি। মক্কাবাসীরা তারই অধিবাসী এবং আমার প্রতিবেশী; তারা আমার ঘর ও এই ঘরের আবাদকারীদেরও প্রতিবেশী। এই শহরের যিয়ারতকারীরা আমার প্রতিনিধি ও মেহমান। তারা আমারই নিরাপত্তায় থাকে এবং তারা আমারই প্রতিবেশী।' (আযরাকী)
মক্কাবাসীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, আনুগত্য ও এবাদতে মশগুল লোকদের উপর যে ধরনের রহমত নাজিল হয়, আল্লাহ তাদের উপর সে ধরনের রহমত বর্ষণ করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে একটি প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يُنَزِّلُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ وَيَوْمٍ عِشْرِينَ وَمِائَةَ رَحْمَةٍ - يَنْزِلُ عَلَى هذَا الْبَيْتِ سَتُونَ لِلطَّائِفِينَ - وَأَرْبَعُوْنَ لِلْمُصَلَّيْنَ ، وَعِشْرُونَ لِلنَّاظِرِينَ وفى رواية - عَلَى هَذَا الْمَسْجِدِ مَسْجِدِ مَكَّةَ ـ وفي رواية تَنْزِلُ عَلَى أَهْلِ هَذَا الْبَيْتِ .
অর্থ: '(মসজিদে হারামে) আল্লাহ প্রত্যেক রাত ও দিনে ১২০টি রহমত বর্ষণ করেন। এই ঘরের তওয়াফকারীদের উপর ৬০টি, মুসল্লীদের উপর ৪০টি এবং কা'বা শরীফের প্রতি দৃষ্টিদানকারীদের প্রতি ২০টি রহমত বর্ষণ করেন।' এক রেওয়ায়েতে এসেছে: 'মক্কার এই মসজিদের উপর রহমত নাজিল হয়।' অন্য আরেক রেওয়ায়েতে এসেছে যে, 'মক্কীবাসীদের উপর রহমত নাজিল হয়।'
মক্কাবাসীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, কা'বা শরীফের নিকটে বাস করার কারণে, তাঁরা কা'বা শরীফকে ঘন ঘন দেখতে পায়। কা'বা শরীফকে দেখাও একটি সম্মানিত এবাদত।
মক্কাবাসীদের অন্য বৈশিষ্ট্য হল, তাঁরা যমযমের পবিত্র পানির নিকটবর্তী। তাঁরা বেশী বেশী করে এই পানি পান করতে পারে এবং তৃপ্তি সহকারে, ইচ্ছামত পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে।
মক্কাবাসীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, তাঁরা হাজরে আসওয়াদের নিকটবর্তী। ফলে তাদের পক্ষে সহজে এই পাথরকে স্পর্শ করা এবং চুমু দেয়া সম্ভব। এই কাজটিকে আল্লাহর সাথে শপথ অনুষ্ঠান বলা হয়। এর ফলে গুনাহ মাফ হয়।
মক্কাবাসীদের অপর মর্যাদা হল, তারা ঘন ঘন উমরাহ করতে পারে। উমরাহর জন্য তাদের নির্ধারিত মিকাত তানয়ীমে অবস্থিত মসজিদে আয়িশা এবং জো'রানা খুবই নিকটবর্তী। ফলে, বেশী বেশী উমরাহর মাধ্যমে তারা নেক ও কল্যাণ বৃদ্ধির এক অপূর্ব সুযোগ লাভ করছে।
ইমাম মালেক বলেছেন, 'হে মক্কাবাসীরা, তোমাদের উপর উমরাহ ওয়াজিব নয়, তোমাদের উমরাহ হচ্ছে তওয়াফ।' কেউ কেউ মনে করেছেন যে, এর দ্বারা ইমাম মালেক মক্কাবাসীদের উমরাহকে মাকরূহ বলেছেন, আসলে তা ঠিক নয়। তিনি শুধু একথা বুঝিয়েছেন যে, তোমাদের উপর উমরাহ ওয়াজিব নয়। তবে তা অবশ্যই জায়েয।
আহমদ বলেছেন, মক্কাবাসীদের জন্য উমরাহ জায়েয নেই। তবে ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমদ বিন হাম্বলসহ অন্যদের মতে, বেশী বেশী উমরাহ করা মোস্তাহাব। ইবনে হাজম, হযরত আলী, আবদুল্লাহ বিন উমর, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, আনাস, আয়িশা এবং তাবেয়ীদের মধ্য থেকে একরামা ও আ'তার সূত্রে বর্ণিত অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে, সেগুলোতে অধিক উমরাহ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে সে সকল হাদীসে, মক্কাবাসীদেরকে উমরাহ করা থেকে বাদ দেয়া হয়নি কিংবা তাদেরকে নিরুৎসাহিতও করা হয়নি। তাই তাদের উমরাহ না করার কোন কারণ নেই। মক্কাবাসীদের জন্যেও বেশী বেশী উমরাহ করা উত্তম। এমনটি হতে পারে না যে, আল্লাহ এই শহরের লোকদেরকে এমন একটি রহমত থেকে বঞ্চিত করবেন এবং অন্যান্য জায়গা থেকে সেই শহরে আগত লোকদের উপর তা বন্টন করবেন। বরং হাদীসে এসেছে যে,
تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَوَ الْهَوْنَ كَمَا يَنْفِي الْكَيْرُ خُبْثَ الْحَدِيدِ وَالْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ .
অর্থ: তোমরা একসাথে হজ্জ ও উমরাহ আদায় কর, এ দুটো দারিদ্র ও অবহেলাকে এমনভাবে দূর করে যেমন আগুন সোনা-রূপা ও লোহা থেকে মরিচা দূর করে।' হযরত আলী (রা) প্রতি মাসে একবার উমরাহ করতেন এবং আয়িশা (রা) এক বছরে তিনবার উমরাহ আদায় করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বছরে একাধিকবার উমরাহ করেছেন।
হযরত আনাস (রা) মক্কায় বাস করা অবস্থায় যখনই মাথার চুল বড় হত, তখনই একবার উমরাহ করে চুল কাটতেন। উমরাহ কম হলে তাওয়াফের পরিমাণও কমে যাবে। তাই যারা বলেন, মক্কাবাসীদের জন্য অধিক সংখ্যক উমরাহ জায়েয নেই, তা ঠিক নয়। অবশ্য, এ ব্যাপারে আলেমদের মত পার্থক্য রয়েছে। একাধিকবার উমরাহ করা সুন্নাত যা স্বয়ং নবী করীম (সা) নিজেই করেছেন। তবে বারবার তওয়াফ করা আরো বেশী উত্তম।
📄 ৩২) মক্কার কবরস্থানের ফজীলেত ও ৪৫ জন সাহাবায়ে কেরামের কবর
মক্কার কবরস্থানের মর্যাদার ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, نِعْمَ الْمَقْبَرَةُ هذه অর্থ : 'এটি কতইনা উত্তম কবরস্থান।' (আলবাজ্জার) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন সানিয়ায়, সানিয়া গোরস্থানের সামনে দাঁড়িয়েছেন, তখন এতে কোন কবর ছিলনা। তারপর তিনি বললেন: يَبْعَثُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْبُقْعَةِ أَوْ مِنْ هَذَا الْحَرَامِ كُلِّهِ سَبْعِينَ الْفًا - يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ يَشْفَعُ كُلُّ وَاحِدٍ مِّنْهُمْ فِي سَبْعِينَ أَلْفًا - وُجُوهُهُمْ كَالْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ - قَالَ أَبُو بَكْرٍ : مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ هُمُ الْغُرَبَاءُ .
অর্থ: 'আল্লাহ এই যমীন থেকে কিংবা হারাম থেকে ৭০ হাজার লোককে হাশরের ময়দানে উঠাবেন, যারা বিনা হিসাবে বেহেশতে যাবে; তাঁরা প্রত্যেকেই ৭০ হাজার লোকের জন্য সুফারিশ করবেন, তাঁদের চেহারা পূর্ণিমার রাত্রের চাঁদের মত উজ্জ্বল হবে। আবু বকর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, 'হে, আল্লাহর রাসূল, তাঁরা কারা?' রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তাঁরা হচ্ছে 'অপরিচিত' আশ্চর্যজনক লোক।
মক্কার কবরস্থানের আরেকটি বিশেষ মর্যাদা হল, এতে অনেক সাহাবী, তাবেয়ী, উলামায়ে কেরাম এবং বুজুর্গানে দীন শায়িত আছেন। যে সকল সাহাবায়ে কেরামকে মক্কায় দাফন করা হয়েছে তাঁরা হলেন:
১। আল্ হারেস বিন লাহুফ, তিনি ইবনে আওফ নামেও পরিচিত। কেউ কেউ বলেছেন তিনি হচ্ছেন, আল্হারস বিন মালেক বিন আসাদ।
২। হাব্বা। কেউ বলেছেন, তাঁর নাম হচ্ছে আ'মর। তবে প্রথম নামটিই বেশী সহীহ। কেউ বলেছেন, তাঁর নাম হচ্ছে হান্না। আবার কেউ বলেছেন, তাঁর নাম হচ্ছে লবীদ বিন আবদে রাব্বিহ।
৩। হামনান বিন আওফ, যিনি আবদুর রহমান এবং আবদুল্লাহ বিন আওফের ভাই।
৪। খালেদ বিন উসাইদ বিন আবুল আস বিন উমাইয়া।
৫। খোবাইব বিন আদী। কেউ বলেছেন, তিনি হচ্ছেন, খোবাইব বিন মালেক বিন আদী বিন আমের আল্-আওসী এবং তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
৬। খোনাইস বিন খালেদ আল-আশয়া'রী বিন রবিয়াহ বিন আহরাম বিন খোনাইস বিন হাবশিয়া বিন কা'ব বিন উমর। তাঁর উপাধি ছিল, আবু সখর।
৭। খোয়াইলাদ বিন খালেদ আবু জুয়াইব আল্-হাজলী আশশায়ের। তাঁর উপাধি ছিল কোতাইল।
৮। যায়েদ বিন আদ্দাসিনাহ বিন মুয়াবিয়া বিন ওবায়েদ আলবায়াদী। তিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
৯। সা'দ বিন খোলি বিন আমের।
১০। সাঈদ বিন ইয়ারবু বিন আনকাসা বিন আমের বিন মাখযুম আলমাখযুমী।
১১। আস্সাকরান বিন আমর বিন আবদে শামস বিন আবদুদ। তিনি সোলাইত ও সোহাইলের ভাই।
১২। সালমা বিন আল মিলা আলজোহানী।
১৩। সামুরা বিন মুয়ীর বিন লুজান আঞ্জুমাহী।
১৪। শায়বা বিন উসমান বিন তালহা।
১৫। সাফওয়ান বিন উমাইয়া বিন খালাফ।
১৬। আমের বিন ওয়াসেলা বিন আবদুল্লাহ বিন আ'মীর।
১৭। আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ বিন উসমান।
১৮। আবদুর রহমান বিন উসমান বিন ওবায়দুল্লাহ আততাইমী।
১৯। আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের বিন আওয়াম।
২০। আবদুল্লাহ বিন আস্সায়েব বিন আবিস সায়েব।
২১। আবদুল্লাহ বিন শিহাব বিন আবদুল হারস বিন যাহরা।
২২। আবদুল্লাহ বিন আমের বিন কোরাইজ।
২৩। আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আল-আস বিন ওয়ায়েল।
২৪। আবদুল্লাহ বিন উমর বিন খাত্তাব।
২৫। আবদুল্লাহ বিন কায়েস বিন সোলাইম বিন হেসার।
২৬। আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। তিনি তাইয়্যেব ও তাহের নামেও পরিচিত ছিলেন।
২৭। আবদুল্লাহ বিন ইয়াসার আল-আনসী। তিনি আম্মার বিন ইয়াসারের ভাই।
২৮। উতাব বিন উসাইদ আলী যানা আমীর বিন আল ইস।
২৯। উসমান বিন তালহা বিন আবি তালহা।
৩০। উসমান বিন আমের বিন আমর আবু কোহাফা।
৩১। আল-আরস বিন কয়েস বিন সাঈদ বিন আল-আরকাম।
৩২। আইয়াস বিন আবি রবীয়াহ আল্ মাখযুমী।
৩৩। কাসেম বিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)।
৩৪। কালদাহ বিন হাম্বল বিন মোলাইল।
৩৫। মুহাম্মাদ বিন হাতেব বিন আল-হারেস।
৩৬। আল্-মেসওয়ার বিন মাখরামা বিন নওফাল।
৩৭। মোগাফফাল বিন গনম। কেউ বলেছেন, তিনি হচ্ছেন, আবদ নহম বিন আফীফ বিন আসহম।
৩৮। ইয়াসের বিন আম্মার বিন মালেক বিন কানানাহ।
৩৯। আবু সুবরাহ বিন আবি রহম বিন আবদুল ওজ্জা আল-আমেরী। এই হচ্ছে পুরুষ সাহাবায়ে কেরামের নাম।
মক্কার কবরস্থানে দাফনকৃত মহিলা সাহাবীদের নাম হচ্ছেঃ
১। আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক (রা)। তাঁর মায়ের নাম হচ্ছে কোতলা; কাতিলাও বলা হয়। তিনি যোবায়ের বিন আওয়ামকে বিয়ে করেছিলেন।
২। খাদ্দামা বিনতে খোলাইলাদ বিন আসাদ। তিনি উম্মুল মোমেনীন হযরত খাদীজার বোন ছিলেন।
৩। খাদীজা বিনতে খুয়াইলাদ বিন আসাদ বিন আবদুল ওজ্জা বিন কুসাই বিন কিলাব। তাঁর মায়ের নাম হচ্ছে যায়েদা বিন আসেম বিন আমের বিন লুই। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর স্ত্রী ছিলেন।
৪। যয়নব বিনতে মাজউ'ন বিন হাবীব বিন ওহাব। তিনি উসমান বিন মাজউ'নের বোন এবং হযরত উমর (রা) এর স্ত্রী ছিলেন।
৫। যয়নব আল-আসাদীয়া আল-মক্কীয়াহ।
৬। সুমাইয়াহ বিনতে খাব্বাত। তিনি আম্মার বিন ইয়াসেরের মা ছিলেন।
হাফেজ ফিরোজাবাদী মক্কার হুজুন কবরস্থানে দাফনকৃত সাহাবাদের নামের তালিকার উপর একটি বই লিখেছেন। এছাড়াও এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত বর্ণনা সহকারে মুহাম্মাদ বিন আলাওয়ী মালেকীরও একটি বই আছে। তাতে তিনি মক্কা বিজয়ের দিন সাহাবাদের মধ্যে কারা মক্কায় মারা গেছেন এবং অন্যান্য সময় মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইন্তিকাল করেছেন তাদের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।