📄 ২২) মক্কায় খুনী ও চোগলখোরের বাস করার অধিকার নেই
হাফেজ আবুল কাসেম ইসপাহানী তাঁর الترغيب গ্রন্থে সুফিয়ান বিন ওয়াকি- মুসা বিন ঈসা আল্লায়সী-যায়েদা-সুফিয়ান-মুহাম্মদ বিন আল মোকান্দার- হযরত জাবের (রা) এই সূত্রপরম্পরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, لَا يَسْكُنْ مَكَّةَ سَافِكُ دَمٍ وَلَا مَشَاءُ بِنَمِيمٍ .
অর্থঃ "মক্কায় কোন খুনী কিংবা চোগলখোর বাস করতে পারে না।” তিনি আরো লিখেছেন যে, لا يسكن এটি হচ্ছে আদেশবাচক শব্দ। এর দ্বারা নিষেধ করা হচ্ছে যে, "মক্কায় বাস করা হারাম শরীফের সম্মান ও মর্যাদার বিরোধী।
📄 ২৩) এহরাম ব্যতীত মক্কায় প্রবেশের হুকুম
মক্কায় এহরাম ব্যতীত প্রবেশ নিষেধ। অবশ্য এই মাসয়ালায় উলামায়ে কেরামের মতভেদ রয়েছে। তাদের মতপার্থক্যের মূল বিষয় হল, প্রবেশকারী যদি মক্কায়, হজ্জ কিংবা উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে আসে, তাহলে এহরাম ছাড়া মক্কায় প্রবেশ করা জায়েয নেই। আর যদি প্রবেশকারী উমরাহ বা হজ্জ ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তাহলে মক্কায় প্রবেশের জন্য তার এহরামের প্রয়োজন নেই। মক্কায় যদি কারুর কোন কাজ কিংবা প্রয়োজন থাকে, তাহলে সে কাজ সেরে নেয়ার উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করলে এহরাম বাঁধা জরুরী নয়।
📄 ২৪) কুরআনে মক্কার নামে আল্লাহর শপথ
কুরআন মজীদের দুই জায়গায় আল্লাহ তায়ালা পবিত্র মক্কার নামে দুই দুইবার শপথ করেছেন।
(১) সূরা তীনে আল্লাহ বলেছেন : وَهُذَا الْبَلَدِ الْآمِينِ
(২) সূরা বালাদে আল্লাহ বলেছেন : لا أُقْسِمُ بهذا البلد
এই দুই জায়গায় 'বালাদ' বলতে পবিত্র মক্কাকে বুঝানো হয়েছে। এটা এই স্থানের বিশেষ মর্যাদার প্রতীক। স্বয়ং আল্লাহও একে সম্মান দেন এবং এর নামে শপথ করেন।
📄 ২৫) হারামে মক্কীতে দোয়া কবুল হয়
মসজিদে হারাম এবং হারামে মক্কীতে দোয়া করলে সে দোয়া কবুল হয়। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবুদল্লাহ বিন মাসউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কোরাইশদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদ দোয়া করেছিলেন, তখন তা কবুল হয়েছিল এবং এতে কোরাইশরা বহু কষ্ট পেয়েছে। তারা পূর্ব থেকেই জানত যে, এই শহরে দোয়া কবুল হয়।
হযরত হাসান বসরী (র) বলেছেন, মক্কার ১৫টি স্থান ও সময়ে দোয়া কবুল হয়। সেগুলো হচ্ছে: ১. মাতাফ, ২. মোলতাযাম, ৩. মীযাবের নীচে, ৪. কা'বা শরীফের ভেতর, ৫. সাফা-মারওয়া পাহাড় দ্বয়ে, ৬. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে, ৭. সা'য়ীর সময়, ৮. মাকামে ইবরাহীমের পেছনে, ৯. রোকনে ইয়ামানীর কাছে, ১০. রোকনে ইয়ামানী ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝে, ১১. মসজিদে হারামে, ১২. আরাফাত, ১৩. মোযদালাফা এবং ১৪. মীনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের স্থানে। ১৫. হাজারে আসওয়াদের কাছেও দোয়া কবুল হয়। কাজী সাজদুদ্দীন সিরাজী, কিতাবুল ওয়ান্নি (kitabul uanni) বইতে লিখেছেন, মক্কা ও হারাম সীমান্তের ভেতর আরো কিছু জায়গা আছে, যেখানে দোয়া কবুল হয়। সেগুলো হচ্ছে: 'সাবীর' যা মানারাতুল ফাতহ এর পাদদেশে অবস্থিত, মসজিদে কাবস, মসজিদে খায়ফ এবং মিনার মসজিদে আন-নামর।
ইবনুন জাওযী দোয়া কবুলের আরো কয়েকটি স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে: মিনার মসজিদে বায়আ'হ, হেরাগুহা এবং হোদায়বিয়া। শেফাউল গারাম বইতে আরো কয়েক স্থানে দোয়া কবুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় এ সকল স্থানের কিছু কিছু ধ্বংস হয়েছে এবং কতগুলো এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সবগুলো স্থান সুরক্ষিত হয়নি। হাদীস শরীফে এসেছে যে, নবী করীম (সা) মক্কার বিভিন্ন জায়গায় দোয়া করেছেন এবং অন্যদেরকেও সে সকল জায়গায় দোয়া করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
আবু দাউদ, নাসাঈ এবং ইবনে মাজা হযরত জাবের (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সা) সাফা পাহাড়ে উঠেন, সেখানে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করেন, তাকবীর-তাহলীল উচ্চারণ করেন এবং এর মাঝামাঝি দোয়া করেন। মারওয়া পাহাড়েও তিনি সাফার অনুরূপ করেন।
মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের একাংশে বলা হয় যে, "রাসূলুল্লাহ (সা) সাফা পাহাড়ে আসলেন, নামাজ পড়লেন, তারপর কা'বা শরীফের দিকে নজর করলেন, এরপর দু'হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং যতক্ষণ ইচ্ছা দোয়া করলেন।"
তাবরানী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের সূত্র থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হচ্ছে:
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَا تُرْفَعُ الْأَيْدِي الْأَفِي سَبْعَةِ مَوَاطِنَ : حِينَ تُفْتَحُ الصَّلَاةُ وَحِينَ تَدْخُلُ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ فَتَنْظُرُ إِلَى الْبَيْتِ وَحِينَ تَقُومُ عَلَى الصَّفَا ، وَحِينَ تَقُومُ عَلَى الْمَرْوَةِ ، وَحِينَ تَقُومُ مَعَ النَّاسِ عَشِيَّةَ عَرَفَةَ وَتَجْمَعُ العِشَائِيْنَ ، وَحِينَ تَرْمِي الْجَمْرَةَ ،
অর্থ : 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 'সাত জায়গা ব্যতীত দোয়ার উদ্দেশ্যে আর কোথাও হাত উঠাতে হয় না। সেগুলো হচ্ছে : তাকবীরে তাহরীমা, যখন তুমি মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে এবং কা'বা শরীফকে দেখতে পাবে, যখন সাফা পাহাড়ে উঠবে, যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠবে, আরাফাতের দিনে অপরাহ্নে যখন অন্যান্য হাজীদের সাথে সেখানে অবস্থান করবে ও এশার সময়ে মাগরিব-এশাকে এক সাথে মিলিয়ে পড়বে এবং যখন মিনায় জামরায় পাথর নিক্ষেপ করবে।' এই সাত সময় দোয়ার উদ্দেশ্যে হাত উঠাতে হয়। مجمع الزوائد গ্রন্থে আল্-হায়সমী লিখেছেন যে, এই হাদীসের সনদের মধ্যে, মুহাম্মাদ বিন আবিলায়লা নামক রাবী দুর্বল স্মরণ শক্তির অধিকারী এবং তার হাদীসকে 'হাসান' বলে বিবেচনা করা হয়।
আল্লামা আযরাকী তাঁর 'তারিখে মক্কা' বইতে লিখেছেন যে, আবুল ওলীদ-মাহাম্মাদ বিন সোলাইম, যানজি মোসলেম বিন কালেদ-ইবনে জোরাইজ-এই সূত্র পরম্পরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আ'তা বলেছেন: 'যে ব্যক্তি মীযাবে কা'বার নীচে দাঁড়িয়ে দোয়া করে তাঁর দোয়া কবুল হয় এবং সে মায়ের পেট থেকে সদ্য প্রসূত নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়।'
আবুল ওলীদ বলেছেন, আমার দাদা সাঈদ বিন সালেম-উসমান বিন সেরাজ-জা'ফর বিন মাহাম্মাদ এই সূত্র পরম্পরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, 'তওয়াফের সময় নবী করীম (সা) যখন মীযাবে কা'বার নীচে আসতেন তখন তিনি এই দোয়া করতেনঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الرَّاحَةَ عِنْدَ الْمَوْتِ وَالْعَفْوَ عِنْدَ الْحِسَابِ .
'হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে মৃত্যুর সময় আরাম চাই এবং হাশরের দিন হিসাব-নিকাশের সময় ক্ষমা প্রার্থনা করি।'
এছাড়াও আরো যে সকল স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা) দোয়া করেছেন এবং সেগুলোর মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলো যথাস্থানে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।