📄 ১৯) মক্কায় বসবাস করা
অতীতের বুজুর্গদের একটি দল মক্কায় বাস করা অপসন্দ করতেন। ইমাম আবু হানীফাসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, তিন কারণে মক্কার অধিবাসী হওয়াকে মাকরূহ বলেছেন।
১. মক্কার সম্মানের ব্যাপারে ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্ভাবনা, পবিত্র স্থানটি আবাসিক স্থানে পরিণত হওয়ার আশংকা এবং এর প্রতি ভালবাসা হ্রাস পাওয়ার ভয়ে এখানে বাস করে আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী হওয়াকে অপসন্দ করেছেন। এই জন্য হযরত উমর (রা) হজ্জ শেষে হাজীদেরকে স্বদেশের উদ্দেশে তাড়াতাড়ি প্রত্যাবর্তন এবং কা'বা শরীফের বেশী বেশী তওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, আমি এই ঘরের সম্মান ও মর্যাদা লংঘনের আশংকা করছি। তবে যারা দূর থেকে যিয়ারত করতে আসে এবং যিয়ারত শেষে চলে যায় তাদের ব্যাপারে তিনি এই আশংকা প্রকাশ করেননি। একটি হাদীসে আছে: زُرْ غِبًا تَرْدَدْحًبًا অর্থ: 'মাঝে মাঝে সাক্ষাত কর, তাহলে ভালবাসা বাড়বে।'
২. পুনরায় মক্কায় ফিরে আসার উদ্দেশ্যে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য তাড়াতাড়ি মক্কা ত্যাগের ব্যাপারে উৎসাহিত করা। আল্লাহ বলেছেন: وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَامْنًا - (بقر : ١٢٥) অর্থ: 'স্মরণ কর, যখন আল্লাহ এই ঘরকে মানুষের সওয়াবের জন্য তাদের বার বার ফিরে আসার জায়গা ও নিরাপত্তার স্থান হিসাবে তৈরি করেছেন।' কেউ কেউ বলেছেন, অন্য কোন শহরে বাস করে মন যদি মক্কার জন্য পাগলপারা থাকে এবং অন্তর যদি আল্লাহর ঘরের সাথে লেগে থাকে, তা মক্কায় বাস করার চাইতে উত্তম। মূলকথা হল, মক্কায় থাকলে মক্কার প্রতি ভালবাসা কমে যাওয়ার আশংকা থাকে।
৩. হারামে মক্কায় পাপ ও ভুল-ত্রুটির আশংকা আছে এবং তা খুব বেশী নিন্দিত ও নিষিদ্ধ। এই পবিত্র জায়গায় পাপ করলে তা আল্লাহর অসন্তোষের বিরাট কারণ হবে। ওহাইব বিন আল-ওয়ারদী আল মক্কী বর্ণনা করেছেন যে, এক রাত আমি হাতীমে কা'বায় নামাজ পড়া অবস্থায় কা'বা শরীফ ও গেলাফে কা'বার মাঝখানে কাউকে বলতে শুনেছিঃ "আমি আল্লাহর কাছেই আমার সকল অভিযোগ পেশ করছি, তারপর হে, জিবরাইল তোমার কাছেও পেশ করছিঃ আমার চতুষ্পার্শ্বে তওয়াফ করা অবস্থায় যারা কথা-বার্তা বলে ও অর্থহীন আলোচনা করে, তারা যদি এ সকল গর্হিত কাজ থেকে বিরত না হয়, তাহলে আমি এমনভাবে নড়ে উঠবো, যাতে আমার গায়ের সকল পাথরগুলো সে পাহাড়ে ফিরে যায়, যেখান থেকে ঐগুলোকে আনা হয়েছিল।" তাই দেখা যায়, মক্কায় বহিরাগত কিছু লোক, হারামে মক্কার সীমানার ভেতর, মলমূত্র ত্যাগ করেন নি, তাঁরা হারাম এলাকার বাইরে গিয়েছেন এবং সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করেছেন। এজন্য কিছুসংখ্যক আলেম, মক্কার ঘরবাড়ি ভাড়া দেয়াকে অপসন্দ করেছেন।
ইমাম গাজ্জালী তাঁর 'এহইয়াউল উলুম' গ্রন্থে লিখেছেন, মক্কায় স্থায়ীভাবে বাস করা অপসন্দনীয় বলে কেউ যেন এর দ্বারা একথা না বুঝেন যে, এটা কা'বা শরীফের ফজীলত ও মর্যাদা বিরোধী। কেননা এই অপসন্দ হওয়ার কারণ হচ্ছে, আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে বান্দাহদের দুর্বলতা। ইবনুস সালাহ সাঈদ বিন আল মুসাইয়াব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মদীনা থেকে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্যে আগত এক ব্যক্তিকে বলেছেন, 'মদীনা ফিরে যাও, কেননা আমরা শুনতে পেয়েছি যে, মক্কার অধিবাসীদের কাছে, হারামের মর্যাদা 'হাল' অর্থাৎ হারাম বহির্ভূত এলাকার সমান না হওয়া পর্যন্ত, তারা মৃত্যুবরণ করে না।'
ইমাম শাফেয়ী' ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বলসহ অন্যরা বলেছেন, মক্কায় বাস করে আল্লাহর ঘরে প্রতিবেশীর মর্যাদা লাভ করা উত্তম। তাদের যুক্তি হল, এখানে তওয়াফ, উমরাহ এবং অতিরিক্ত সওয়াবের যে সুযোগ আছে, তা অন্য কোথাও নেই। আলগায়াহ' কিতাবের লেখক আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মদ বিন আল হাসানেরও একই মত বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওযী মুসীরুল গারামে মক্কায় বসবাসকারী ৫৪ জন সাহাবী এবং বিরাট সংখ্যক তাবেয়ীর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর এবং যাবের বিন আবদুল্লাহও মক্কায় বাস করেছেন।
ইমাম নওয়ী বলেছেন, মক্কায় বসবাস করা মুস্তাহাব। হ্যাঁ, যদি অন্যায় কাজে জড়িত হওয়ার আশংকা বেশী অনুভব করে, তাহলে তার জন্য মক্কায় বাস করা ঠিক নয়। বরং তার জন্য হযরত উমর বিন খাত্তাবের একটি বক্তব্য স্মরণ রাখা দরকার। সেটি হচ্ছে: 'মক্কায় একটি অন্যায় করার চাইতে অন্য জায়গায় ৭০টি অন্যায় করা ভাল।'
হাম্বলী মাজহাবের উপর লেখা এক কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল যখন মক্কা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখন খলীফা মোতাওয়াককিল মক্কায় বাস করার অনুমতি চেয়েছিল। মোতাওয়াককিলকে বলা হয় "প্রচণ্ড গরম, এখানেই অবস্থান করুন।" ইমাম আহমদ বললেন "মক্কায় বাস করার মধ্যে কোন দোষ নেই, তবে হযরত উমর (রা) মক্কা থেকে হিজরতকারী লোকদের পুনরায় মক্কায় বাস করাকে অপসন্দ করতেন।"
📄 ২০) মক্কায় দাজ্জালের প্রবেশাধিকার নেই
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আনাস থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: لَيْسَ مِنْ بَلَدٍ إِلَّا سَيَطَؤُهُ الدَّجَّالُ إِلَّا مَكَّةَ وَالْمَدِينَةَ لَيْسَ نَقَبٌ مِّنْ أَنْقَابِهَا إِلَّا عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَافِّيْنَ يَحْرِسُونَهَا -
অর্থ: 'মক্কা এবং মদীনা শরীফ ব্যতীত আর সকল শহরেই দাজ্জালের পদচারণা হবে। ফেরেশতারা মক্কার প্রতিটি এলাকা ঘিরে পাহারা দিচ্ছে।' এই স্থানের মর্যাদার কারণেই আল্লাহ এই বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন।
📄 ২১) মক্কায় খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করা
আবুল কাসেম আত্মাবরাণী তাঁর 'আওসাত' গ্রন্থে আবদুল্লাহ বিন মোয়াম্মাল-আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান বিন মাহবাচান-আ'তা বিন আবি রেবাহ-আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) এই সূত্র পরম্পরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : اِحْتَكَارُ الطَّعَامِ بِمَكَّةَ الْحَادُ অর্থ : মক্কায় খাদ্য মওজুত করা কুফরী।' পবিত্র জায়গার সম্মানার্থেই এই বিশেষ হুকুম ঘোষণা করা হয়েছে।
📄 ২২) মক্কায় খুনী ও চোগলখোরের বাস করার অধিকার নেই
হাফেজ আবুল কাসেম ইসপাহানী তাঁর الترغيب গ্রন্থে সুফিয়ান বিন ওয়াকি- মুসা বিন ঈসা আল্লায়সী-যায়েদা-সুফিয়ান-মুহাম্মদ বিন আল মোকান্দার- হযরত জাবের (রা) এই সূত্রপরম্পরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, لَا يَسْكُنْ مَكَّةَ سَافِكُ دَمٍ وَلَا مَشَاءُ بِنَمِيمٍ .
অর্থঃ "মক্কায় কোন খুনী কিংবা চোগলখোর বাস করতে পারে না।” তিনি আরো লিখেছেন যে, لا يسكن এটি হচ্ছে আদেশবাচক শব্দ। এর দ্বারা নিষেধ করা হচ্ছে যে, "মক্কায় বাস করা হারাম শরীফের সম্মান ও মর্যাদার বিরোধী।