📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৮) মক্কায় পাপ কাজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও শাস্তি হবে

📄 ১৮) মক্কায় পাপ কাজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও শাস্তি হবে


একদল আলেম বলেছেন, কেউ মক্কার হারামে পাপ কাজ করার নিয়ত করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। সেই পাপ কাজটি না করলেও তার শাস্তি হবে। এ ব্যাপারে তাঁরা সূরা হজ্জের ২৫ নং আয়াতটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন। আয়াতটি হচ্ছে: مَنْ يُرِدْ فِيْهِ بِالْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقَهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ .
অর্থ : 'কেউ যদি এই হারামে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যায়ভাবে কুফরী ও শিরক করার ইচ্ছা করে, আমরা তাকে কষ্টদায়ক আযাব দেবো।' যারাকশী বলেছেন, আই আয়াতে, يُرد 'এরাদা' শব্দের পর بِالْحَاد এর মধ্যে (ب) ব্যবহৃত হয়েছে। যখন اَرَادَة শব্দ দ্বারা هُمّ বা কোন 'কাজ করার ইচ্ছা' বুঝানো হয় তখন (ب) ব্যবহার করে এটাকে مُتَعَدّی বানানো হয়। সাধারণতঃ أَرَدْتُ بِكَذَا এরকম বলা হয় না। কিন্তু যখন 'কোন কাজ করার ইচ্ছা' বুঝানো হয় তখন (ب) ব্যবহার করে এরকম বলতে হয়। যেমন বলা হয় هَمَمْتُ بِكَذَا 'আমি কাজ করার ইচ্ছা করেছি।'
দাহ্হাক ও ইবনে যায়েদ এই মত ব্যক্ত করেছেন। আল্লামা কুরতবী তাঁর তাফসীরে এবং ইবনে কাসীর ও তাঁর তাফসীরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ এবং আবদুল্লাহ বিন উমরেরও এই একই মত। তাঁরা বলেছেন, "(দক্ষিণ ইয়েমেনের) এডেনে বসবাসকারী কোন লোক যদি মক্কায় কোন লোককে হত্যা করার নিয়ত করে, তাহলেও আল্লাহ তাকে এ কারণে শাস্তি দিবেন।"
এর একজন বর্ণনাকারী শো'বা বলেছেন, এটি সহীহ এবং ইবনে মাসউদ একথা বলেছেন। কিন্তু ইমাম আহমদ ইয়াজিদ বিন হারুন থেকে এই হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ইবনে কাসীর বলেছেন, ইমাম বুখারীর শর্তানুযায়ী এটি সহীহ, তবে এটিকে রাসূলুল্লাহর হাদীস না বলে সাহাবীদের বর্ণনা বলাই উত্তম।
আল্লামা কুরতবী, এ প্রসঙ্গে সূরা 'কালাম' এ বাগানওয়ালাদের কাহিনীতে বর্ণিত একটি আয়াত উল্লেখ করেছেন।
আয়াতটি হচ্ছে: إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَابَلُونَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ إِذْ أَقْسَمُوا لَيُصْرِمُنَّهَا مُصْبِحِيْنَ .
অর্থঃ "আমরা তাদেরকে সেই বাগান ওয়ালাদের মত পরীক্ষা করেছি যারা অতি ভোরে ফসল কাটার শপথ করেছিল"।
এই আয়াত দ্বারা যে কথার প্রমাণ পেশ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে, বাগানওয়ালাদের ফসল কাটার কাজটি বাস্তবে সংঘটিত হয়নি। তবে তাদের অতি ভোরে ফকির মিসকীনদের বের হওয়ার পূর্বে ফসল তোলার ইচ্ছাটি ব্যক্ত হয়েছিল যেন গরীবদেরকে দান করা না লাগে। আল্লাহ তাদেরকে এই ব্যক্ত ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাস্তি দিয়েছেন এবং তারা ঘুমে থাকা অবস্থায়- তাদের ফসল ধ্বংস করে দিয়েছেন। তারা ভোরে গিয়ে দেখল যে, তাদের ফসল জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাদের ফসল তোলার আগেই তাদেরকে শাস্তি দেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসও এই মতের সমর্থন করে। হাদীসটি হচ্ছেঃ إِذا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ هُذَا الْقَاتِلُ فَمَابَالُ الْمَقْتُولِ ؟ قَالَ إِنَّهُ كَانَ حَرِيضًا عَلَى قَتْلِ صَاحِبِهِ ۔ (বুখারী)
অর্থঃ 'দুই মুসলমান, যখন তাদের তলোয়ার নিয়ে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন হত্যাকরী ও নিহত ব্যক্তি দু'জনই জাহান্নামী হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) কে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর হুকুম তো ঠিক আছে, কিন্তু নিহত ব্যক্তির হুকুম এরকম কেন? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কেননা, সে তার সাথীকে হত্যা করতে আগ্রহী ও ইচ্ছুক ছিল।' এই হাদীসেও নিহত ব্যক্তির হত্যার 'আগ্রহ বা ইচ্ছার' বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদীসও এই মতের সমর্থনে পেশ করা হয়। সেটি হচ্ছে:
إِنَّمَا الدُّنْيَا لِأَرْبَعَةِ نَفَرٍ : رَجُلٌ أَعْطَاهُ اللَّهُ مَالاً وَعِلْمًا فَهُوَ يَتَّقِى فِيْهِ رَبَّهُ وَيَصِلُ فِيْهِ رَحِمَهُ وَيَعْلَمُ لِلَّهِ فِيْهِ حَقًّا فَهُذَا بِأَفْضَلِ الْمَنَازِلِ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ عِلْمًا وَلَمْ يُؤْتِهِ مَالاً فَهُوَ صَادِقُ النِّيَّةِ يَقُولُ : لَوْ أَنَّ لِي مَالاً لَعَمِلْتُ فِيْهِ بِعَمَلٍ فُلانٍ فَهُو بِنِيَّتِهِ فَأَجْرُهُمَا سَوَاءٌ - وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مالاً وَلَمْ يُؤْتِهِ عِلْمًا فَهُوَ يَخْبَطُ فِي مَالِهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ لَا يَتَّقِي فِيهِ رَبَّهُ وَلَا يَصِلُ بِهِ رَحِمَهُ وَلَا يَعْلَمُ لِلَّهِ فِيهِ حَقًّا فَهُذَا بِأَخْبَتْ الْمَنَازِلِ وَرَجُلٌ لَمْ يُؤْتِهِ اللَّهُ مَالاً وَلَا عِلْمًا فَهُوَ يَقُولُ : لَوَأَنَّ لِي مَالاً لَعَمِلْتُ فِيْهِ بِعَمَلٍ فُلانٍ فَهُوَ بَنِيَّتِهِ - (الترمذي)
অর্থ : 'দুনিয়ায় চার ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক হল, আল্লাহ যাকে সম্পদ ও জ্ঞান দান করেছেন, সে এগুলোর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, আত্মীয়তার হক আদায় করে এবং একথাও জানে যে, এতে আল্লাহর অধিকার রয়েছে; সেই ব্যক্তির মর্যাদা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ। আরেক ধরনের লোক হল, আল্লাহ তাকে জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু সম্পদ দেননি, অথচ তার রয়েছে সঠিক নিয়ত। সে বলেঃ যদি আমার কাছে সম্পদ থাকত, তাহলে আমি উমুক কাজ করতাম এবং সে এই নিয়তের উপর স্থির আছে। এই দুই ব্যক্তির মর্যাদা সমান এবং শেষোক্ত ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির মতই শ্রেষ্ঠ। অপর ধরনের লোক হল, আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন, জ্ঞান দেননি, সে জ্ঞান ব্যতীত শুধু সম্পদের মধ্যেই বিভ্রান্তভাবে ডুবে আছে, এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়ের হক আদায় করে না এবং এতে আল্লাহর অধিকার সম্পর্কে জানে না, সেই ব্যক্তি হচ্ছে সর্বাধিক নিকৃষ্ট। অন্য এক ধরনের লোক হচ্ছে, আল্লাহ যাকে সম্পদ ও জ্ঞান কোনটাই দেননি। সে বলেঃ যদি আমার সম্পদ থাকত, তাহলে আমি উমুক কাজ করতাম। সে তার নিয়তের মধ্যেই থাকবে।' এই হাদীসে সঠিক নিয়তের ভিত্তিতে সওয়াব ও মর্যাদা লাভের কথা উল্লেখ রয়েছে।
কারুর মতে, আল্লামা কুরতুবী এ ক্ষেত্রে যে সকল যুক্তিপ্রমাণ পেশ করেছেন, তা মূল বিষয় বস্তুর বাইরে। কেননা, শুধুমাত্র গুনাহর কল্পনা করলেই মানুষকে শাস্তি দেয়া হবে না। যদি প্রমাণগুলো দ্বারা এটা বুঝায়ও তবুও তাকে হারামে মক্কীর সাথে সীমিত করার কোন কারণ নেই। কেননা, এটা সাধারণভাবে সব জায়গার জন্যই প্রযোজ্য।
আসল কথা হল, কোন পাপ কাজের ইচ্ছা যদি বারবার করা হয় এবং পাপ কাজটি করার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, শেষ পর্যন্ত পাপ কাজটি না করলেও তার গুনাহ হবে। এই কথাটিই নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে। আল্লাহ সূরা আলে ইমরানের ১৩৫নং আয়াতে বলেছেন,
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهَ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ .
অর্থ: 'যারা অশ্লীল কাজ করে এবং নিজের উপর যুলুম করে, তারপর আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহ মাফ চায়; আল্লাহ ছাড়া তাদের গুনাহ কে মাফ করতে পারে? তারা জেনে শুনে, বার বার গুনাহর কাজ করে না।' এই আয়াতে لم يصروا 'বারবার না করা' এই শব্দটি এই কথার প্রকাশ্য প্রমাণ যে, মানুষকে পাপ কর্মের ব্যাপারে নেয়া 'দৃঢ় সিদ্ধান্তের' বিরুদ্ধেই পাকড়াও করা হবে। এটাই অতীতের ফেকাহবিদ', মোহাদ্দেস এবং মুসলিম মনীষীদের মত। আল্লামা কুরতবী তাঁর তাফসীরে এই মতের কথা উল্লেখ করেছেন।
পাপের ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্তের উপর শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে কারুর দ্বিমত নেই। চাই সেটা মক্কাতেই হউক বা মক্কার বাইরে অন্য জায়গায়ই হউক।
যদি তা বারবার চিন্তার মাধ্যমে মজবুত সিদ্ধান্তে পৌছার স্তর পর্যন্ত না পৌছে তাহলে আল্লাহ শাস্তি দেবেন না। কেননা এ প্রসঙ্গে বুখারী শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিম্নোক্ত প্রকাশ্য বক্তব্য রয়েছে। তিনি বলেছেন:
مَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا لَمْ تُكْتَبْ عَلَيْهِ فَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ سَيِّئَةٌ وَاحِدَةٌ . (بخاری)
অর্থঃ 'যে অন্যায় করার ইচ্ছা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করেনি, তার গুনাহ লেখা হবে না। হাঁ, যদি গুনাহটি করেই ফেলে, তাহলে তার একটি গুনাহ লেখা হবে।'
মূলতঃ বেশী যুক্তসংগত কথা হল, যদি বারবার চিন্তা ও ইচ্ছার মাধ্যমে মক্কায় কোন পাপ কাজের মজবুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে তার শাস্তি অতিরিক্ত হবে যেমনটি ঐ পাপ কাজ সংঘটিত করলেও হওয়ার কথা। তবে যদি অনুরূপ মজবুত সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে শুধুমাত্র ধ্যান-ধারণা ও কল্পনার বিরুদ্ধে কোন গুনাহ বা শাস্তি হবে না। আসলে আলেমরা পাপের মজবুত সিদ্ধান্তকে 'সংঘটিত পাপের' সমমর্যাদা সম্পন্ন মনে করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে মক্কায় পাপ করলে যেমন অতিরিক্ত গুনাহ হয়, পাপের মজবুত সিদ্ধান্ত নিলেও সে রকম অতিরিক্ত গুনাহই হবে। শুধুমাত্র কল্পনার বিরুদ্ধে আল্লাহ শাস্তি দেবেন না।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারায় এরশাদ করেছেন-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۚ (بقره : ٢٨৬)
অর্থ: 'আল্লাহ মানুষের সাধ্যের বাইরে কাউকে কোন কাজের হুকুম দেননা, মানুষ যে নেক কাজ করে তার ফল সে পাবে, আর যদি পাপ কাজ করে তাহলে এর বোঝাও তাকে বহন করতে হবে।' গুনাহ সম্পর্কিত কল্পনা থেকে বিরত থাকা মানুষের সাধ্যের বাইরে। তাই এ ব্যাপারে আল্লাহর পাকড়াও না করারই কথা। কেননা, কল্পনার ঘোড়া বহু বিষয়ে এবং বহু সাম্রাজ্যে বিচরণ করে। কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়া না দেয়ার ব্যাপারে মানুষের দায়িত্বের প্রশ্ন জড়িত। এছাড়াও আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াতে বলেছেন: وَمَنْ يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ ۙ - (الحج : ٢٥)
'যে এই হারামে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে 'অন্যায়ভাবে' কুফরী ও শিরক করার ইচ্ছা করে, এতে بِظُلْم বা 'অন্যায়ভাবে' শব্দের উল্লেখ করেও পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন যে, শুধু কল্পনার উপর তিনি কোন শান্তি দেবেন না।
কেউ কেউ হারাম এলাকায় পাপের কল্পনা-ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাস্তি দান সম্পর্কিত বিভিন্ন ইমামদের বক্তব্যের এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, হারাম এলাকায় কোন অন্যায় ও পাপ না করার ব্যাপারে এটা হচ্ছে তাদের অতিমাত্রায় সতর্কীকরণের উপর গুরুত্ব প্রদান অথবা, এখানে তারা 'কল্পনা' বা (هم) বলতে (عزم) বা 'দৃঢ় সিদ্ধান্ত' বুঝিয়েছেন।
যা হোক, হারামে মক্কীতে কল্পনা ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাস্তি এবং অতিরিক্ত পাপের প্রশ্নে, অতীতের বুজুর্গদের একটি দল মক্কায় বাস করাকে অপসন্দ করেছেন। আমরা এখন এ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করবো, ইনশাআল্লাহ।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৯) মক্কায় বসবাস করা

📄 ১৯) মক্কায় বসবাস করা


অতীতের বুজুর্গদের একটি দল মক্কায় বাস করা অপসন্দ করতেন। ইমাম আবু হানীফাসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, তিন কারণে মক্কার অধিবাসী হওয়াকে মাকরূহ বলেছেন।
১. মক্কার সম্মানের ব্যাপারে ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্ভাবনা, পবিত্র স্থানটি আবাসিক স্থানে পরিণত হওয়ার আশংকা এবং এর প্রতি ভালবাসা হ্রাস পাওয়ার ভয়ে এখানে বাস করে আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী হওয়াকে অপসন্দ করেছেন। এই জন্য হযরত উমর (রা) হজ্জ শেষে হাজীদেরকে স্বদেশের উদ্দেশে তাড়াতাড়ি প্রত্যাবর্তন এবং কা'বা শরীফের বেশী বেশী তওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, আমি এই ঘরের সম্মান ও মর্যাদা লংঘনের আশংকা করছি। তবে যারা দূর থেকে যিয়ারত করতে আসে এবং যিয়ারত শেষে চলে যায় তাদের ব্যাপারে তিনি এই আশংকা প্রকাশ করেননি। একটি হাদীসে আছে: زُرْ غِبًا تَرْدَدْحًبًا অর্থ: 'মাঝে মাঝে সাক্ষাত কর, তাহলে ভালবাসা বাড়বে।'
২. পুনরায় মক্কায় ফিরে আসার উদ্দেশ্যে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য তাড়াতাড়ি মক্কা ত্যাগের ব্যাপারে উৎসাহিত করা। আল্লাহ বলেছেন: وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَامْنًا - (بقر : ١٢٥) অর্থ: 'স্মরণ কর, যখন আল্লাহ এই ঘরকে মানুষের সওয়াবের জন্য তাদের বার বার ফিরে আসার জায়গা ও নিরাপত্তার স্থান হিসাবে তৈরি করেছেন।' কেউ কেউ বলেছেন, অন্য কোন শহরে বাস করে মন যদি মক্কার জন্য পাগলপারা থাকে এবং অন্তর যদি আল্লাহর ঘরের সাথে লেগে থাকে, তা মক্কায় বাস করার চাইতে উত্তম। মূলকথা হল, মক্কায় থাকলে মক্কার প্রতি ভালবাসা কমে যাওয়ার আশংকা থাকে।
৩. হারামে মক্কায় পাপ ও ভুল-ত্রুটির আশংকা আছে এবং তা খুব বেশী নিন্দিত ও নিষিদ্ধ। এই পবিত্র জায়গায় পাপ করলে তা আল্লাহর অসন্তোষের বিরাট কারণ হবে। ওহাইব বিন আল-ওয়ারদী আল মক্কী বর্ণনা করেছেন যে, এক রাত আমি হাতীমে কা'বায় নামাজ পড়া অবস্থায় কা'বা শরীফ ও গেলাফে কা'বার মাঝখানে কাউকে বলতে শুনেছিঃ "আমি আল্লাহর কাছেই আমার সকল অভিযোগ পেশ করছি, তারপর হে, জিবরাইল তোমার কাছেও পেশ করছিঃ আমার চতুষ্পার্শ্বে তওয়াফ করা অবস্থায় যারা কথা-বার্তা বলে ও অর্থহীন আলোচনা করে, তারা যদি এ সকল গর্হিত কাজ থেকে বিরত না হয়, তাহলে আমি এমনভাবে নড়ে উঠবো, যাতে আমার গায়ের সকল পাথরগুলো সে পাহাড়ে ফিরে যায়, যেখান থেকে ঐগুলোকে আনা হয়েছিল।" তাই দেখা যায়, মক্কায় বহিরাগত কিছু লোক, হারামে মক্কার সীমানার ভেতর, মলমূত্র ত্যাগ করেন নি, তাঁরা হারাম এলাকার বাইরে গিয়েছেন এবং সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করেছেন। এজন্য কিছুসংখ্যক আলেম, মক্কার ঘরবাড়ি ভাড়া দেয়াকে অপসন্দ করেছেন।

ইমাম গাজ্জালী তাঁর 'এহইয়াউল উলুম' গ্রন্থে লিখেছেন, মক্কায় স্থায়ীভাবে বাস করা অপসন্দনীয় বলে কেউ যেন এর দ্বারা একথা না বুঝেন যে, এটা কা'বা শরীফের ফজীলত ও মর্যাদা বিরোধী। কেননা এই অপসন্দ হওয়ার কারণ হচ্ছে, আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে বান্দাহদের দুর্বলতা। ইবনুস সালাহ সাঈদ বিন আল মুসাইয়াব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মদীনা থেকে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্যে আগত এক ব্যক্তিকে বলেছেন, 'মদীনা ফিরে যাও, কেননা আমরা শুনতে পেয়েছি যে, মক্কার অধিবাসীদের কাছে, হারামের মর্যাদা 'হাল' অর্থাৎ হারাম বহির্ভূত এলাকার সমান না হওয়া পর্যন্ত, তারা মৃত্যুবরণ করে না।'

ইমাম শাফেয়ী' ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বলসহ অন্যরা বলেছেন, মক্কায় বাস করে আল্লাহর ঘরে প্রতিবেশীর মর্যাদা লাভ করা উত্তম। তাদের যুক্তি হল, এখানে তওয়াফ, উমরাহ এবং অতিরিক্ত সওয়াবের যে সুযোগ আছে, তা অন্য কোথাও নেই। আলগায়াহ' কিতাবের লেখক আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মদ বিন আল হাসানেরও একই মত বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওযী মুসীরুল গারামে মক্কায় বসবাসকারী ৫৪ জন সাহাবী এবং বিরাট সংখ্যক তাবেয়ীর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর এবং যাবের বিন আবদুল্লাহও মক্কায় বাস করেছেন।

ইমাম নওয়ী বলেছেন, মক্কায় বসবাস করা মুস্তাহাব। হ্যাঁ, যদি অন্যায় কাজে জড়িত হওয়ার আশংকা বেশী অনুভব করে, তাহলে তার জন্য মক্কায় বাস করা ঠিক নয়। বরং তার জন্য হযরত উমর বিন খাত্তাবের একটি বক্তব্য স্মরণ রাখা দরকার। সেটি হচ্ছে: 'মক্কায় একটি অন্যায় করার চাইতে অন্য জায়গায় ৭০টি অন্যায় করা ভাল।'
হাম্বলী মাজহাবের উপর লেখা এক কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল যখন মক্কা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখন খলীফা মোতাওয়াককিল মক্কায় বাস করার অনুমতি চেয়েছিল। মোতাওয়াককিলকে বলা হয় "প্রচণ্ড গরম, এখানেই অবস্থান করুন।" ইমাম আহমদ বললেন "মক্কায় বাস করার মধ্যে কোন দোষ নেই, তবে হযরত উমর (রা) মক্কা থেকে হিজরতকারী লোকদের পুনরায় মক্কায় বাস করাকে অপসন্দ করতেন।"

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ২০) মক্কায় দাজ্জালের প্রবেশাধিকার নেই

📄 ২০) মক্কায় দাজ্জালের প্রবেশাধিকার নেই


বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আনাস থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: لَيْسَ مِنْ بَلَدٍ إِلَّا سَيَطَؤُهُ الدَّجَّالُ إِلَّا مَكَّةَ وَالْمَدِينَةَ لَيْسَ نَقَبٌ مِّنْ أَنْقَابِهَا إِلَّا عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَافِّيْنَ يَحْرِسُونَهَا -
অর্থ: 'মক্কা এবং মদীনা শরীফ ব্যতীত আর সকল শহরেই দাজ্জালের পদচারণা হবে। ফেরেশতারা মক্কার প্রতিটি এলাকা ঘিরে পাহারা দিচ্ছে।' এই স্থানের মর্যাদার কারণেই আল্লাহ এই বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ২১) মক্কায় খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করা

📄 ২১) মক্কায় খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করা


আবুল কাসেম আত্মাবরাণী তাঁর 'আওসাত' গ্রন্থে আবদুল্লাহ বিন মোয়াম্মাল-আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান বিন মাহবাচান-আ'তা বিন আবি রেবাহ-আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) এই সূত্র পরম্পরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : اِحْتَكَارُ الطَّعَامِ بِمَكَّةَ الْحَادُ অর্থ : মক্কায় খাদ্য মওজুত করা কুফরী।' পবিত্র জায়গার সম্মানার্থেই এই বিশেষ হুকুম ঘোষণা করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00