📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৪) নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়া

📄 ১৪) নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়া


সহীহ হাদীসে এসেছে যে, নবী করীম (সা) কয়েক সময়ে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। সে সময়গুলো হচ্ছে: সূর্যোদয়ের সময় যে পর্যন্ত না সূর্য এক তীর পরিমাণ উপরে উঠে, ঠিক দুপুরে সূর্য যখন মাথার উপর আসে এবং যে পর্যন্ত না হেলে যায়, সন্ধ্যার সময় যখন পশ্চিমাকাশে হলুদ বর্ণ দেখা দেয়, যে পর্যন্ত না সূর্য ডুবে যায়, ফজরের নামাযের পর সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত এবং আসরের নামাযের পর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু এই হুকুম থেকে হারামে মক্কাকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করা হয়েছে। আবু দাউদ শরীফে হযরত যোবায়ের বিন মোতায়েম থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : يَابَنِي عَبْدِ مَنَّافٍ لَا تَمْنَعُوا أَحَدًا طَافَ بِهَذَا الْبَيْتِ وَصَلَّى أَيَّةَ سَاعَةٍ شَاءَ مِنْ لَيْلٍ أَوْنَهَارٍ . অর্থ: 'হে আবদে মনাফের সন্তানরা, কা'বা শরীফের তওয়াফকারী কোন ব্যক্তিকে, দিন ও রাত্রের যে কোন সময় নামায আদায় করতে চাইলে, বাধা দিওনা।' হাকেম এই হাদীসটি তাঁর মোসতাদরাকে বর্ণনা করে বলেছেন, বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এটি সহীহ হাদীস।
অন্য আরেকটি হাদীসে এসেছে: لأَصْلَاةَ بَعْدَ الصُّبْحِ الأَبِمَكَّةَ
অর্থ: 'ফজরের নামাযের পর মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও নামায পড়া জায়েয নেই।' যারাকশী বলেছেন, এখানে মক্কা বলতে পুরো হারাম শরীফকে বুঝানো হয়েছে। পুরো হারামের মর্যাদার কারণেই এই হুকুম দেয়া হয়েছে।
আবুল হাসান আলী বিন আলজা'দ সুফিয়ান বিন সাঈদ থেকে, তিনি আবু জুরাইজ থেকে এবং তিনি ইবনে আবি মোলায়কা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সা) আসরের পরে তওয়াফ করেছেন এবং দুই রাকাত নামায পড়েছেন। ইবনে আমি শায়বা তাঁর গ্রন্থে, ইমাম আবু হানীফার মতের বিরুদ্ধে কয়েকটি আচার উল্লেখ করেছেন।
আ'তা বর্ণনা করেছেন, 'আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) কে ফজরের পর কাবা শরীফের তওয়াফ করতে এবং সূর্যোদয়ের আগে দু'রাকাত নামায পড়তে দেখেছি।' আ'তা আরেকটি বর্ণনায় বলেছেন, 'আমি আবনে উমর এবং ইবনে উমর এবং ইবনে আব্বাসকে আসরের পরে তওয়াফ এবং নামায পড়তে দেখেছি।
লাইস আবু সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হযরত হাসান এবং হোসাইন (রা) কে মক্কায় আসতে এবং আসরের পর তাদেরকে তওয়াফ এবং নামায পড়তে দেখেছেন।
ওয়ালিদ বিন জুমাই আবুত তোফাইল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবুত তোফাইল আসরের পর তওয়াফ করেছেন এবং সূর্য হলুদ রং ধারণ করার আগ পর্যন্ত নামায পড়েছেন।
আ'তা আরো বর্ণনা করেছেন, আমি ইবনে উমর ও ইবনে যোবায়ের কে ফজরের নামাজের আগে তওয়াফ করতে এবং সূর্যোদয়ের আগে দু'রাকাত নামায পড়তে দেখেছি।
এই অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীসগুলোর কারণে, আলেমরা এই মাসআলায় মতভেদ পোষণ করেন। কেউ বলেছেন, এটা শুধু তওয়াফের দু'রাকাত নামাযের জন্য বিশেষ অনুমতি। এগুলোর ভিত্তিতে নিষিদ্ধ সময়েও তওয়াফ শেষে এই দুই রাকাত নামায পড়া যাবে। তবে অন্যান্য নামাযের হুকুম অভিন্ন এবং এতে মতভেদ নেই। তাদের দলীল হচ্ছে, নিষিদ্ধ সময়ে নামায থেকে বিরত থাকার জন্য বর্ণিত হাদীসগুলো। যদিও তওয়াফের নামাযের ব্যাপারে বিশেষ অনুমতি দানকারী হাদীসও রয়েছে। তাঁরা দুটো হাদীসের জবাবও দিয়েছেন। হাদীস দু'টো হচ্ছে- لَا تَمْنَعُوا أَحَداً طَافَ بِهَذَا الْبَيْتِ وَصَلَّى - (3) অর্থঃ 'কেউ এই ঘরের তওয়াফ করলে কিংবা এখানে নামায পড়লে তাকে নিষেধ করো না।'
لَا صَلَاةَ بَعْدَ الصُّبْحِ إِلَّا بِمَكَّةَ . (2) অর্থ: 'ফজরের পর মক্কা ছাড়া আর কোথাও নামায পড়া জায়েয নেই।'
এই হাদীস দুটোর জবাবে তাঁরা বলেছেন, এটা হচ্ছে তওয়াফের দু'রাকাত নামাযের জন্য বিশেষ ও ব্যতিক্রমধর্মী অনুমতি। বিশেষ কোন দিক ছাড়া কোন হাদীসকে অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না। যারাকশী বলেছেন, ইমাম বায়হাকীর মতও তাই। তিনি বলেছেন, এই হাদীসগুলোর দ্বারা তওয়াফের দুই রাকাত নামায বুঝানো হয়েছে।
কেউ বলেছেন, এই অনুমতি বিশেষ করে মসজিদে হারামের জন্য, দেয়া হয়েছে। অন্য কোন শহর বা দেশে সাধারণভাবে এই অনুমতি প্রযোজ্য নয়।
কেউ বলেছেন, এই অনুমতি হচ্ছে মক্কার বাইর থেকে আগত লোকদের জন্য, মক্কায় বসবাসকারী লোকদের জন্য নয়।
আলেমরা প্রত্যেকেই ঐ সকল হাদীসে বর্ণিত আদেশ-নিষেধ গুলোর কারণ বের করার চেষ্টা করেছেন এবং সে অনুযায়ী মাসআলা দান করেছেন।
কেউ বলেছেন, নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়ার হুকুম হচ্ছে এই পবিত্র স্থানের মর্যাদার কারণে। ফলে তাদের কাছে এ ব্যাপারে মক্কায় বসবাসকারীও বহিরাগত লোকদের বিষয়টি সমান বিবেচনার দাবী রাখে।
কেউ বলেছেন, পবিত্র স্থানের বিভিন্ন অংশের মর্যাদার মধ্যে এ পার্থক্য আছে। এজন্য তারা মসজিদে হারাম ছাড়া মক্কা শহরের অন্য কোথাও কিংবা অন্য কোন শহরে এই বিশেষ অনুমতি প্রযোজ্য নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন।
কেউ বলেছেন, মক্কাই হচ্ছে মূল কারণ। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এবাদত করার জন্য এখানে আসে। তাদেরকে নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়তে নিষেধ করলে তাদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এজন্য বহিরাগত লোকদের জন্য নিষিদ্ধ সময় নামাজ পড়ার অনুমতি রয়েছে। তাই মক্কায় বসবাসকারী লোকেরা এই হুকুমের ব্যতিক্রম।
কেউ বলেছেন, নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়ার ব্যাপারে মক্কায় কোন বিশেষ অনুমতি থাকতে পারে না। তাদের দৃষ্টিতে মক্কাসহ সকল জায়গায় একই হুকুম।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৫) মক্কায় নামাযের অতিরিক্ত সওয়াব

📄 ১৫) মক্কায় নামাযের অতিরিক্ত সওয়াব


মক্কায় নামায পড়লে অন্য জায়গার তুলনায় ১ লাখ গুণ সওয়াব বেশী হয়। এ প্রসঙ্গে বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হাদীসটি হচ্ছে এরূপঃ
إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِيي خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ صَلَاةٍ فِيمَا سِوَاهُ مِنَ الْمَسَاجِدِ إِلَّا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ -
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমার মসজিদে (নববীতে) নামায পড়া অন্য মসজিদের তুলনায় এক হাজার গুণ সওয়াব বেশী, তবে মসজিদে হারাম এর চাইতে ব্যতিক্রম।' আহমদ এবং বাজ্জার তাঁদের মুসনাদে, মসজিদে নববীর চাইতে মসজিদে হারামে নামায পড়াকে অনুরূপ বেশী সওয়াবের কারণ বলেছেন।
ইবনে হিববান তাঁর হাদীস গ্রন্থে হাম্মাদ বিন যায়েদ-হাবিব আল-মোয়াল্লেম-আতা বিন আবি রেবাহ-আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের সূত্র থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
قَالَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا أَفْضَلُ مِّنْ أَلْفِ صَلَاةٍ فِي غَيْرِهِ مِنَ الْمَسَاجِدِ إِلَّا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ وَصَلَاةٌ فِي المسجدِ الْحَرَامِ أَفْضَلُ مِنَ الصَّلاة في مسجدي هذا بمائة صلاة .
অর্থ: "নবী করীম (সা) বলেছেন: আমার মসজিদের নামায অন্য মসজিদের চাইতে ১ হাজার গুণ উত্তম। তবে মসজিদে হারাম এর ব্যতিক্রম। মসজিদে হারামের নামায আমার মসজিদের চাইতে ১০০ গুণ উত্তম।” এর অর্থ দাঁড়ায় মসজিদে হারামের নামায, অন্য মসজিদের চাইতে ১ লাখ গুণ এবং মসজিদে নববীর চাইতে ১০০ গুণ উত্তম।
ইবনে মাজা, ইসমাঈল বিন রাশেদ-যাকারিয়া বিন আদী-আবদুল্লাহ বিন আমর আবদুল করীম-আতা-জাবের এই সূত্র থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِى هَذَا أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ صَلَاةِ فِيمَا سِوَاهُ إِلَّا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ وَصَلَاةٌ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَفْضَلُ مِنْ مَّائَةِ أَلْفِ فِيمَا سِوَاهُ -
অর্থ: 'আমার মসজিদের নামায, মসজিদে হারাম ব্যতীত, অন্য যে কোন মসজিদের নামাযের চাইতে এক হাজার গুণ উত্তম, আর মসজিদে হারামের নামায অন্য মসজিদের চাইতে ১ লাখ গুণ বেশী উত্তম।' এর ফলে মসজিদে হারামের এক ওয়াক্ত নামায এক ব্যক্তির ৫৫ বছর ৬ মাস ২০ রাতের নামাযের সমান হয় এবং মসজিদে হারামের একদিন ও রাত্রের নামায তথা ৫ ওয়াক্ত নামায এক ব্যক্তির ২৭৭ বছর ৯ মাস ১০ রাত্রির নামাযের সমান।
বাযযার তাঁর মুসনাদে ইবরাহীম বিন হোমাইদ-মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ বিন শাদ্দাদ-সাঈ বিন সালেহ আল কাদ্দাহ-সাঈদ বিন বশির-ইসমাঈল বিন ওবায়দুল্লাহ-উন্মুদ দারদা-আবুদ দারদার সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন-
فَضْلُ الصَّلاةِ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ عَلَى غَيْرِهِ بِمَائَةِ أَلْفِ صَلَاةٍ ، وَفِي مَسْجِدِى أَلْفُ صَلاةٍ - وَفِي مَسْجِدِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ خَمْسُمِائَةِ صَلَاةٍ .
অর্থ: 'অন্য মসজিদের নামাযের চাইতে মসজিদে হারামের নামাযের মর্যাদা হচ্ছে ১ লাখ, আমার মসজিদের নামায এক হাজার এবং বায়তুল মাকদেসের মসজিদের নামায পাঁচশতগুণ বেশী।'
ইবনে মাজা হযরত আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
صلاةَ الرَّجُلِ فِي بَيْتِهِ بِصَلَاةِ - وَصَلَاتُهُ فِي مَسْجِدِ الْقَبَائِلِ بِخَمْسِ وعِشْرِينَ صَلَاةً ، وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الَّذِي يَجْمَعُ فِيهِ بَخَمْسِمِائَةِ صلاة - وَصَلَاةٌ فِي الْمَسْجِدِ الْأَقْطَى وَمَسْجِدِ الْمَدِينَةِ بِخَمْسِينَ أَلْفَ صَلَاةِ - وَصَلَاةٌ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ بِمِائَةِ أَلْفِ صَلَاةٍ .
অর্থ: 'কেউ ঘরে নামায পড়লে ১ গুণ, মহল্লার মসজিদে পড়লে ২৫ গুণ, জামে মসজিদে পড়লে ৫শ' গুণ, মসজিদে আকসা ও মদীনার মসজিদে (নববীতে) পড়লে ৫০ হাজার গুণ এবং মসজিদে হারামে পড়লে ১ লাখ গুণ বেশী সওয়াব পাবে।'
ইবনে ওয়াদ্দাহ-হামেদ বিন ইয়াহইয়া আলবালখী-ইবনে উয়াইনা-যিয়াদ-সোলায়মান বিন আতীক-আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের সূত্র থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের হযরত উমর বিন খাত্তাবকে বলতে শুনেছেন: صَلاةٌ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَفْضَلُ مِنْ مَّائَةِ أَلْفِ صَلَاةٍ فِي مَسْجِدِ النَّبِيِّ صَلَّ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .
অর্থ: 'মসজিদে হারামের নামায, মসজিদে নববীর নামাযের চাইতে ১ লাখ গুণ বেশী উত্তম।' ইবনে হাযম বলেছেন, এর বর্ণনাকারীদের সূত্র সূর্যের মত পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ। সাহাবায়ে কেরামদের এই ব্যাপারে ইজমা ছিল যে, মসজিদে নববীর নামাযের চাইতে মসজিদে হারামের নামাযের মর্যাদা ১ লাখ গুণ বেশী। কোন সাহাবী এই মতের বিরোধিতা করেননি।
যাই হোক, তিন মসজিদে অতিরিক্ত ফজীলতের যে বর্ণনা এসেছে তা শুধু ফরজ নামাযের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সকল নফল ও সুন্নাত নামায এবং অন্য সকল এবাদতের বেলায়ও প্রযোজ্য।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৬) অতিরিক্ত সওয়াব শুধু নামাযের মধ্যেই সীমিত নয়

📄 ১৬) অতিরিক্ত সওয়াব শুধু নামাযের মধ্যেই সীমিত নয়


অতিরিক্ত সওয়াব শুধু নামাযের মধ্যেই সীমিত নয়, বরং অন্যান্য সকল এবাদতের বেলায়ও প্রযোজ্য। নামাযের ফজীলত এবং কা'বা শরীফের দিকে নজর করার সওয়াবের উপর কেয়াস করে অন্যান্য সকল এবাদতেও এই অতিরিক্ত সওয়াব প্রযোজ্য বলে হুকুম দেয়া হয়েছে।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেছেন: মক্কার একদিনের রোযা, ১ লাখ রোযা এক দেরহাম সদকা এক লাখ দেরহাম এবং সকল নেক কাজ ১ লাখ গুণ বেশী। ইবনে মাজা হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: مَنْ أَدْرَكَ شَهْرَ رَمَضَانَ بِمَكَّةَ فَصَامَهُ وَقَامَ مِنْهُ مَا تَيَسَّرَ كُتِبَ لَهُ مِائَةُ الْفِ شَهْرَ رَمَضَانَ فِيْمَا سِوَاهُ وَكُتِبَ بِكُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ عِشْقُ رَقَبَةٍ وَفِي كُلُّ يَوْمٍ حَمْلُ فَرَسَيْنِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَفِي كُلِّ لَيْلَةٍ حَسَنَةٌ .
অর্থ: 'কেউ মক্কায় রমযান মাস পেয়ে সেখানে রোযা রাখলে এবং সাধ্যমত তারাবীহর নামায পড়লে, অন্য জায়গার তুলনায় তাকে ১ লাখ রমযান মাসের সওয়াব দেয়া হবে। তদুপরি, প্রত্যেক দিন ও রাত্রের জন্য একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব, প্রত্যেক দিনের জন্য আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে দুটো ঘোড়া দানের সওয়াব এবং প্রত্যেক রাত্রির জন্য একটি করে নেক দান করা হবে। বাযযার তাঁর মুসনাদে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
رَمَضَانُ بِمَكَّةَ أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ رَمَضَانَ بِغَيْرِ مَكَّةَ
'অন্য জায়গার তুলনায় মক্কার রমযান এক হাজার গুণ উত্তম।' হাকেম মোসতাদরাকে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
مَنْ حَجَّ مِنْ مَكَّةَ مَاشِيَا حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْهَا كُتِبَ لَهُ بِكُلِّ خَطْوَةٍ سَبْعُمِائَةِ حَسَنَةٍ مِّنْ حَسَنَاتِ الْحَرَمِ - وَحَسَنَاتُ الْحَرَمِ - الْحَسَنَةُ بمائَةِ أَلْفِ حَسَنَةٍ -
অর্থঃ 'যে মক্কা থেকে পায়ে হেঁটে (মীনা-মোযদালাফা ও আরাফাতে) হজ্জ করে পুনরায় মক্কা ফিরে আসে, তার প্রতি কদমে হারামের ৭ শত নেক লেখা হয়, হারামের প্রতিটি নেক হচ্ছে ১ লাখ গুণ। হাকেম বলেছেন, এই হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৭) মক্কায় গুনাহ অতিরিক্ত

📄 ১৭) মক্কায় গুনাহ অতিরিক্ত


একদল আলেম বলেছেন, মক্কায় সওয়াব যেমন অতিরিক্ত হয়, ঠিক তেমনি গুনাহও অতিরিক্ত হয়। হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ, আহমদ বিন হাম্বল এবং মুজাহিদের এই মত।
যারাকশী বলেছেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসকে তাঁর মক্কার বাইরে বাস করার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাব দেন-
مَالِي وَلِبَلَدٍ تُضَاعَفُ فِيْهِ السَّيِّئَاتُ كَمَا تُضَاعَفُ فِيْهِ الْحَسَنَاتُ .
অর্থ: 'আমার ঐ শহর সম্পর্কে কিইবা বলার আছে যেখানে নেক কাজের মত পাপ কাজেরও অতিরিক্ত গুনাহ হয়।' )اعلام المساجد( )১২৮ পৃঃ(
মুজাহিদ বলেছেন, 'মক্কায় নেক কাজের মত পাপ কাজেরও অতিরিক্ত গুনাহ হয়।'
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, পাপ কি একাধিক গুণ হয়? তিনি জবাব দিয়েছেন, না, তবে মক্কার সম্মানের কারণে সেখানে পাপ বেশী হয়।
কিন্তু অপর একদল আলেম বলেছেন, মক্কায় পাপ বেশী হবে না, অন্য জায়গার মতই একটা পাপের একটাই গুনাহ হবে। তাঁরা বলেন, এ ক্ষেত্রে কুরআনে বর্ণিত আয়াতটিই সব জায়গার জন্য প্রযোজ্য। সেটি হচ্ছে:
وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلا مِثْلُهَا - (الانعام : ١٦)
অর্থ: 'যে গুনাহর কাজ করে তাকে সেই গুনাহর সমপরিমাণ শাস্তিই দান করা হবে।' অর্থাৎ একটা গুনাহ করলে একটি শাস্তিই দেয়া হবে, একাধিক নয়।
তাদের আরেকটি দলীল হচ্ছে মুসলিম শরীফে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস। তিনি এরশাদ করেছেন: مَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ وَعَمِلَهَا كُتِبَتْ لَهُ سَيِّئَةٌ وَاحِدَةٌ . অর্থ: 'যে একটি গুনাহর কাজ করার ইচ্ছা করে এবং পরে তা করে তার একটি গুনাহই লেখা হবে।'
মূলতঃ হারাম শরীফের মর্যাদার কারণে এখানকার গুনাহ ও কঠোরতর হওয়ার কথা। কেননা, আল্লাহ কুরআনে বলেছেন:
وَمَنْ يُرِدْ فِيْهِ بِالْحَادِ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ - (الحج : ٢٥)
অর্থ: 'কেউ যদি এই হারামে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যায়ভাবে কুফর করার ইচ্ছা করে আমরা তাকে কষ্টদায়ক আযাব দেব।' এই আয়াত দ্বারাও কঠোর শাস্তির প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
এই ব্যাপারে এই ব্যাখ্যাও প্রযোজ্য যে, হারামে গুনাহর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে না, তবে তা কঠোর ও ভয়াবহ গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে।
মুজাহিদ বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ বিন উমর বিন আল আসকে আরাফাতে দেখেছি; অথচ তার থাকার জায়গা হচ্ছে হারাম এলাকার বাইরে এবং জায়নামায হচ্ছে মসজিদে হারামে। তাঁকে এ রকম করার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, 'এখানে নেক আমল উত্তম, আর পাপ কাজ জঘন্য।
(مصنف عبد الرزاق)
আবদুর রাজ্জাক হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: 'আমি রাকবা নামক স্থানে ৭০ গুনাহ করাকে হারামে এক গুনাহ করার চাইতে উত্তম মনে করি।' রাকবা হচ্ছে তায়েফের একটি জায়গার নাম। উম্মে হানি বিনতে আমি তালেব কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা মক্কায় অতিরিক্ত গুনাহর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنْ أُمَّتِي لَمْ يَخْزُوا مَا أَقَامُوا شَهْرَ رَمَضَانَ - قِيْلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ وَمَا خِزْبُهُمْ فِي إِضَاعَةِ شَهْرِ رَمَضَانَ ؟ قَالَ : انْتِهَاكُ الْمَحَارِمِ فِيْهِ مَنْ زَنَافِيْهِ أَوْشَرِبَ خَمْرًا لَعَنَهُ اللَّهُ وَمَن في السَّمَوَاتِ إِلَى مِثْلِهِ مَنْ الْحَوْلَ - فَإِنْ مَاتَ قَبْلَ أَنْ يُدْرِكَهُ رَمَضَانُ فَلَيْسَتْ لَهُ عِنْدَ اللهَ حَسَنَنَةٌ يَتَّقِى بِهَا النَّارَ - فَاتَّقُوا شَهْرَ رَمَضَانَ فَإِنَّ الْحَسَنَةَ تُضَاعَفُ فِيْهِ مَا لَا تُضَاعَفُ فِيْمَا سِوَاهُ وَكَذَلِكَ السَّيِّئَةُ . (الصغير للطبراني وكذلك في الأوسط)
অর্থ : 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমার উম্মত যে পর্যন্ত রমযান মাসকে কায়েম রাখবে, সে পর্যন্ত তারা অপমানিত হবে না। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! রমযান মাসকে নষ্ট করার মধ্যো কি অপমান রয়েছে? তিনি জবাবে বলেন, নিষিদ্ধ কাজের লংঘন করা হলে, যেমন, কেউ যদি এ মাসে জ্বেনা করে কিংবা মদ পান করে, তাহলে আল্লাহ এবং আসমানের অধিবাসীরাসহ এর চতুষ্পার্শ্বের অন্যান্যরা সবাই লা'নত বা অভিশাপ দেয়। যদি রমযান আসার আগে সে ব্যক্তি মারা যায়, তাহলে দোজখ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে তার কোন নেক অবশিষ্ট থাকবে না। তোমরা রমযান মাসকে ভয় কর' এই মাসে, অন্য মাসের চাইতে নেক বেশী গুণ দেয়া হয়, অনুরূপভাবে গুনাহও বেশী দেয়া হয়।'
এই হাদীস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, বিশেষ সময় ও মাসে, যেমন রমযানে সওয়াব ও পাপ বেশী দেয়া হয়। তাহলে বিশেষ ও পবিত্র স্থানেও পাপ বেশী হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। পাপের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00