📄 ১১) হারাম এলাকার মাটি স্থানান্তর
যারাকশী বলেছেন, মক্কার মাটি-পাথর সরিয়ে অন্যত্র নেয়া নাজায়েয। এক্ষেত্রে মসজিদে হারামের মাটি কিংবা মক্কার হারাম এলাকার মাটির একই হুকুম। ইমাম নওয়ী শরহুল মুহাজ্জিব গ্রন্থে এটাকেই বেশী সহীহ মত বলে উল্লেখ করেছেন। রাফেয়ী' এটাকে মাকরূহ বলেছেন। হানাফী মাজহাবে, পাথর ও মাটি সরানোকে জায়েয বলা হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী' 'আল-উম' কিতাবে ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর এই বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এটাই হযরত উমর এবং ইবনে আব্বাসেরও মত। তবে তাঁরা এটাকে মাকরূহ বলেছেন। ইমাম আহমদ (রহ) বলেছেন, কেউ যদি রোগমুক্তির জন্য হারামের মাটি ব্যবহার করতে চায়, সে যেন ঐ মাটি না নেয়। বরং ঐ মাটির উপর অন্য মাটি মিলিয়ে তা ব্যবহার করে। আসলে এ ব্যাপারে মূলকথা হল, এর মাটি অন্যত্র সরানো হলে এর স্থায়ী মর্যাদা নষ্ট হয়। কেননা, আল্লাহ এর প্রতিটি বালুকণার জন্য নির্দিষ্ট মর্যাদা ও সম্মান নির্ধারণ করেছেন।
📄 ১২) মক্কায় মল-মূত্র ত্যাগ করা
কিছুসংখ্যক লোক হারামে মক্কীতে মল-মূত্র ত্যাগ করার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাঁরা হারামকে মসজিদে হারামের মতই সম্মানজনক মনে করেন। যারাকশী বলেছেন, এই ব্যাখ্যা সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। স্বয়ং নবী করীম (সা), সাহাবায়ে কেরাম এবং অতীতের বুজুর্গানে দীন সবাই মক্কায় মল-মূত্র ত্যাগ করেছেন। সম্ভবতঃ কিছু লোক নিজেদের বিশেষ রুচির ভিত্তিতে হারামে মক্কীতে পেশাব-পায়খানা না করাকে ভাল মনে করেছেন। কাজেই তাঁদের এই মতকে অনুসরণ করা জরুরী নয়। তবে এটাকে পসন্দ করতেও আপত্তি নেই। এ প্রসঙ্গে হাফেজ আবু আলী বিন সাকান তাঁর 'সুনানে সেহহা' গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) এর বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, 'রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কায় থাকতেন তখন মল-মূত্র ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে মোগাম্মাসে যেতেন এবং সেখানে মল-মূত্র ত্যাগ করতেন।' মোগাম্মাস হচ্ছে সেই জায়গা, যেখানে বাদশাহ আবরাহা কাবা ধ্বংস অভিযানে হাতী থামিয়েছিলেন এবং সে হাতীগুলো সেখান থেকে আর সামনে এগুতে চায়নি। তারপর আল্লাহ ছোট পাখির ঝাঁক পাঠিয়েছে পাথর নিক্ষেপ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। তাহজীবুল আসার গ্রন্থে আবু জাফর আততাহাওয়ী বলেছেন, মোগাম্মাস মক্কা থেকে ২ মাইল দূরে অবস্থিত। তাবরানী আওসাত গ্রন্থে, নাফে' বিন আমর বিন দীনার থেকে তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَذْهَبُ بِحَاجَتِهِ إِلَى الْمُغَمِّسِ .
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) মোগাম্মাসে মল-মূত্র ত্যাগ করতে যেতেন। নাফে' বলেছেন, ঐ স্থানটি মক্কা থেকে দু'মাইল দূরে। মোগাম্মাস, মীনা ও মোযদালাফার মাঝখানের সামান্য কিছু জায়গা। মীনার শেষ সীমানা পর্যন্তই হারাম শরীফের সীমানা। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) হারাম সীমানার বাইরে গিয়ে মল-মূত্র ত্যাগ করেছেন।
📄 ১৩) হারাম এলাকার মাটি ও পাথর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা
যারাকশী বলেছেন, মাওয়ারদী উল্লেখ করেছেন যে, মল-মূত্র ত্যাগ করার পর হারাম এলাকার পাথর দিয়ে এস্তেঞ্জা করা এবং পবিত্রতা অর্জন করার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের দুটো মত আছে। প্রথম মতটি হচ্ছে, এর দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হবে এবং ফরজ আদায় হবে, তবে গুনাহ হবে। আসল ব্যাপার হল, হাদীস এটাকে নিষিদ্ধ করাতো দূরে থাক, মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারেও কিছু বলেনি। দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে: এর পাথর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা জায়েয আছে।
যে আলেমরা এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন এবং হারামের মাটি ও পাথর দিয়ে এস্তেঞ্জা করা গুনাহ বলেছেন, এটা তাদের বিশেষ রুচির ব্যাপার। কেউ এই মত অনুসরণ করলে করতে পারে তবে তা জরুরী নয় এবং উলামায়ে কেরামের এটা কোন সর্বসম্মত মতও নয়।
ইমাম মালেক সম্পর্কে একথা প্রচলিত আছে যে, তিনি মল-মূত্র ত্যাগ করার জন্য মদীনার হারাম শরীফের বাইরে যেতেন। তবে এই ব্যাপারে তাঁকে অনুসরণ করার জন্য তিনি কিছু বলেননি। তিনি কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাই হাদীস ও কুরআনের বাইরে কোন মতামত দেননি। তিনি বেদআতের ব্যাপারেও সতর্ক ছিলেন। তাই তাঁর ইচ্ছা ছিল যে, যা জায়েয মানুষ তাই করুক। এটা জায়েয এবং সাধারণ হুকুম। তবে তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে হারাম শরীফের আদব রক্ষার নিয়তে হারামের বাইরে গিয়ে মল-মূত্র ত্যাগ করেছেন। কাজেই এটা তাঁর ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার।
📄 ১৪) নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়া
সহীহ হাদীসে এসেছে যে, নবী করীম (সা) কয়েক সময়ে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। সে সময়গুলো হচ্ছে: সূর্যোদয়ের সময় যে পর্যন্ত না সূর্য এক তীর পরিমাণ উপরে উঠে, ঠিক দুপুরে সূর্য যখন মাথার উপর আসে এবং যে পর্যন্ত না হেলে যায়, সন্ধ্যার সময় যখন পশ্চিমাকাশে হলুদ বর্ণ দেখা দেয়, যে পর্যন্ত না সূর্য ডুবে যায়, ফজরের নামাযের পর সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত এবং আসরের নামাযের পর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু এই হুকুম থেকে হারামে মক্কাকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করা হয়েছে। আবু দাউদ শরীফে হযরত যোবায়ের বিন মোতায়েম থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : يَابَنِي عَبْدِ مَنَّافٍ لَا تَمْنَعُوا أَحَدًا طَافَ بِهَذَا الْبَيْتِ وَصَلَّى أَيَّةَ سَاعَةٍ شَاءَ مِنْ لَيْلٍ أَوْنَهَارٍ . অর্থ: 'হে আবদে মনাফের সন্তানরা, কা'বা শরীফের তওয়াফকারী কোন ব্যক্তিকে, দিন ও রাত্রের যে কোন সময় নামায আদায় করতে চাইলে, বাধা দিওনা।' হাকেম এই হাদীসটি তাঁর মোসতাদরাকে বর্ণনা করে বলেছেন, বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এটি সহীহ হাদীস।
অন্য আরেকটি হাদীসে এসেছে: لأَصْلَاةَ بَعْدَ الصُّبْحِ الأَبِمَكَّةَ
অর্থ: 'ফজরের নামাযের পর মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও নামায পড়া জায়েয নেই।' যারাকশী বলেছেন, এখানে মক্কা বলতে পুরো হারাম শরীফকে বুঝানো হয়েছে। পুরো হারামের মর্যাদার কারণেই এই হুকুম দেয়া হয়েছে।
আবুল হাসান আলী বিন আলজা'দ সুফিয়ান বিন সাঈদ থেকে, তিনি আবু জুরাইজ থেকে এবং তিনি ইবনে আবি মোলায়কা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সা) আসরের পরে তওয়াফ করেছেন এবং দুই রাকাত নামায পড়েছেন। ইবনে আমি শায়বা তাঁর গ্রন্থে, ইমাম আবু হানীফার মতের বিরুদ্ধে কয়েকটি আচার উল্লেখ করেছেন।
আ'তা বর্ণনা করেছেন, 'আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) কে ফজরের পর কাবা শরীফের তওয়াফ করতে এবং সূর্যোদয়ের আগে দু'রাকাত নামায পড়তে দেখেছি।' আ'তা আরেকটি বর্ণনায় বলেছেন, 'আমি আবনে উমর এবং ইবনে উমর এবং ইবনে আব্বাসকে আসরের পরে তওয়াফ এবং নামায পড়তে দেখেছি।
লাইস আবু সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হযরত হাসান এবং হোসাইন (রা) কে মক্কায় আসতে এবং আসরের পর তাদেরকে তওয়াফ এবং নামায পড়তে দেখেছেন।
ওয়ালিদ বিন জুমাই আবুত তোফাইল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবুত তোফাইল আসরের পর তওয়াফ করেছেন এবং সূর্য হলুদ রং ধারণ করার আগ পর্যন্ত নামায পড়েছেন।
আ'তা আরো বর্ণনা করেছেন, আমি ইবনে উমর ও ইবনে যোবায়ের কে ফজরের নামাজের আগে তওয়াফ করতে এবং সূর্যোদয়ের আগে দু'রাকাত নামায পড়তে দেখেছি।
এই অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীসগুলোর কারণে, আলেমরা এই মাসআলায় মতভেদ পোষণ করেন। কেউ বলেছেন, এটা শুধু তওয়াফের দু'রাকাত নামাযের জন্য বিশেষ অনুমতি। এগুলোর ভিত্তিতে নিষিদ্ধ সময়েও তওয়াফ শেষে এই দুই রাকাত নামায পড়া যাবে। তবে অন্যান্য নামাযের হুকুম অভিন্ন এবং এতে মতভেদ নেই। তাদের দলীল হচ্ছে, নিষিদ্ধ সময়ে নামায থেকে বিরত থাকার জন্য বর্ণিত হাদীসগুলো। যদিও তওয়াফের নামাযের ব্যাপারে বিশেষ অনুমতি দানকারী হাদীসও রয়েছে। তাঁরা দুটো হাদীসের জবাবও দিয়েছেন। হাদীস দু'টো হচ্ছে- لَا تَمْنَعُوا أَحَداً طَافَ بِهَذَا الْبَيْتِ وَصَلَّى - (3) অর্থঃ 'কেউ এই ঘরের তওয়াফ করলে কিংবা এখানে নামায পড়লে তাকে নিষেধ করো না।'
لَا صَلَاةَ بَعْدَ الصُّبْحِ إِلَّا بِمَكَّةَ . (2) অর্থ: 'ফজরের পর মক্কা ছাড়া আর কোথাও নামায পড়া জায়েয নেই।'
এই হাদীস দুটোর জবাবে তাঁরা বলেছেন, এটা হচ্ছে তওয়াফের দু'রাকাত নামাযের জন্য বিশেষ ও ব্যতিক্রমধর্মী অনুমতি। বিশেষ কোন দিক ছাড়া কোন হাদীসকে অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না। যারাকশী বলেছেন, ইমাম বায়হাকীর মতও তাই। তিনি বলেছেন, এই হাদীসগুলোর দ্বারা তওয়াফের দুই রাকাত নামায বুঝানো হয়েছে।
কেউ বলেছেন, এই অনুমতি বিশেষ করে মসজিদে হারামের জন্য, দেয়া হয়েছে। অন্য কোন শহর বা দেশে সাধারণভাবে এই অনুমতি প্রযোজ্য নয়।
কেউ বলেছেন, এই অনুমতি হচ্ছে মক্কার বাইর থেকে আগত লোকদের জন্য, মক্কায় বসবাসকারী লোকদের জন্য নয়।
আলেমরা প্রত্যেকেই ঐ সকল হাদীসে বর্ণিত আদেশ-নিষেধ গুলোর কারণ বের করার চেষ্টা করেছেন এবং সে অনুযায়ী মাসআলা দান করেছেন।
কেউ বলেছেন, নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়ার হুকুম হচ্ছে এই পবিত্র স্থানের মর্যাদার কারণে। ফলে তাদের কাছে এ ব্যাপারে মক্কায় বসবাসকারীও বহিরাগত লোকদের বিষয়টি সমান বিবেচনার দাবী রাখে।
কেউ বলেছেন, পবিত্র স্থানের বিভিন্ন অংশের মর্যাদার মধ্যে এ পার্থক্য আছে। এজন্য তারা মসজিদে হারাম ছাড়া মক্কা শহরের অন্য কোথাও কিংবা অন্য কোন শহরে এই বিশেষ অনুমতি প্রযোজ্য নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন।
কেউ বলেছেন, মক্কাই হচ্ছে মূল কারণ। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এবাদত করার জন্য এখানে আসে। তাদেরকে নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়তে নিষেধ করলে তাদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এজন্য বহিরাগত লোকদের জন্য নিষিদ্ধ সময় নামাজ পড়ার অনুমতি রয়েছে। তাই মক্কায় বসবাসকারী লোকেরা এই হুকুমের ব্যতিক্রম।
কেউ বলেছেন, নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়ার ব্যাপারে মক্কায় কোন বিশেষ অনুমতি থাকতে পারে না। তাদের দৃষ্টিতে মক্কাসহ সকল জায়গায় একই হুকুম।