📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১০) মোশরেকের মক্কায় প্রবেশ

📄 ১০) মোশরেকের মক্কায় প্রবেশ


আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ )সূরা তওবা-২৮( - عامِهِمْ هُدًا
অর্থ: 'নিঃসন্দেহে মোশরেকরা অপবিত্র। এই বছরের পর থেকে তারা যেন আর মসজিদে হারামের নিকটবর্তী না হয়।' এই আয়াতটি হিজরী ৯ সালে নাযিল হয়েছে। এখানে বর্ণিত 'মসজিদে হারাম' শব্দ দ্বারা গোটা হারাম এলাকাকে বুঝানো হয়েছে। সূরা ইসরার ১ম আয়াতেও 'মসজিদে হারাম' শব্দ দ্বারা হারাম এলাকাকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأقصى الخ - (الاسراء : ١)
অর্থ: 'পবিত্রতা সেই সত্তার জন্য যিনি তাঁর বান্দাহকে রাতে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় সফর করিয়েছেন।' মাওয়ারদী এবং বাগাওয়ী বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মেরাজের রাতে উম্মেহানী কিংবা হযরত খাদীজার ঘরে ছিলেন। তাঁকে সেখান থেকেই রাত্রে মসজিদে আকসায় মেরাজের উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে। অথচ ঐ ঘর দু'টোর প্রত্যেকটিই মসজিদে হারামের বাইরে।
এই আয়াতের মূল কথা হল, কাফের-মোশরেকরা মক্কার মসজিদ কিংবা হারামে-মক্কীতে প্রবেশ করতে পারবে না।
ইমাম শাফেয়ী (রা) তাঁর 'আল-উম' কিতাবে লিখেছেন, মুসলিম শাসক কোন অমুসলমানকে, চাই সে ডাক্তার কিংবা অন্য কোন পেশাদার হউকনা কেন, মক্কায় প্রবেশ করতে দিতে পারেন না।
আল্লাহ কুরআনে হযরত ইবরাহীম (আ) এর একটি দোয়া উল্লেখ করেছেন। সেটি হচ্ছে-
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَداً آمنا - (سورة البقرة : ١٢٦)
অর্থ: 'যখন ইবরাহীম (আ) দোয়া করল, হে আমার রব! এই শহরকে নিরাপদ বানিয়ে দিন।' এর জবাবে আল্লাহ বলেছিলেন:
وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتَّعُهُ قَلِيلاً
অর্থ: 'যে কুফরী করে আমি তাকে যৎসামান্য সুখভোগের সুযোগ দেই।' এটি হচ্ছে মক্কা বিজয়ের আগের কথা।
মক্কা বিজয়ের পরও কাফেরদের মক্কায় প্রবেশ পুরোমাত্রায় নিষিদ্ধ। ইমাম শাফেয়ী (রা) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন:
لَا يَجْتَمِعُ مُسْلِمٌ وَمُشْرِكُ فِي الْحَرَمِ অর্থ: 'হারামে মুসলমান ও মোশরেক একত্র হতে পারে না।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেছেন, এহরাম পরার যোগ্যতা ছাড়া কেউ মক্কায় প্রবেশ করে না। কাফেররা এহরাম পরেনা বলে তাদের মক্কায় প্রবেশ নিষেধ।
যারাকশী বিভিন্ন ফেকাহবিদদের বরাত দিয়ে বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে কোন কাফের গোপনে মক্কায় প্রবেশ করে অসুস্থ হয়ে মারা গেলে, দাফন হয়ে যাওয়ার পরেও লাশ অবিকৃত থাকলে তা উঠিয়ে ফেলতে হবে এবং হারাম এলাকার বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। তবে ফেকাহবিদরা জিম্মী এবং আহলে কিতাবের লোকদের ব্যাপারে কিছু মতভেদ পোষণ করেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১১) হারাম এলাকার মাটি স্থানান্তর

📄 ১১) হারাম এলাকার মাটি স্থানান্তর


যারাকশী বলেছেন, মক্কার মাটি-পাথর সরিয়ে অন্যত্র নেয়া নাজায়েয। এক্ষেত্রে মসজিদে হারামের মাটি কিংবা মক্কার হারাম এলাকার মাটির একই হুকুম। ইমাম নওয়ী শরহুল মুহাজ্জিব গ্রন্থে এটাকেই বেশী সহীহ মত বলে উল্লেখ করেছেন। রাফেয়ী' এটাকে মাকরূহ বলেছেন। হানাফী মাজহাবে, পাথর ও মাটি সরানোকে জায়েয বলা হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী' 'আল-উম' কিতাবে ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর এই বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এটাই হযরত উমর এবং ইবনে আব্বাসেরও মত। তবে তাঁরা এটাকে মাকরূহ বলেছেন। ইমাম আহমদ (রহ) বলেছেন, কেউ যদি রোগমুক্তির জন্য হারামের মাটি ব্যবহার করতে চায়, সে যেন ঐ মাটি না নেয়। বরং ঐ মাটির উপর অন্য মাটি মিলিয়ে তা ব্যবহার করে। আসলে এ ব্যাপারে মূলকথা হল, এর মাটি অন্যত্র সরানো হলে এর স্থায়ী মর্যাদা নষ্ট হয়। কেননা, আল্লাহ এর প্রতিটি বালুকণার জন্য নির্দিষ্ট মর্যাদা ও সম্মান নির্ধারণ করেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১২) মক্কায় মল-মূত্র ত্যাগ করা

📄 ১২) মক্কায় মল-মূত্র ত্যাগ করা


কিছুসংখ্যক লোক হারামে মক্কীতে মল-মূত্র ত্যাগ করার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাঁরা হারামকে মসজিদে হারামের মতই সম্মানজনক মনে করেন। যারাকশী বলেছেন, এই ব্যাখ্যা সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। স্বয়ং নবী করীম (সা), সাহাবায়ে কেরাম এবং অতীতের বুজুর্গানে দীন সবাই মক্কায় মল-মূত্র ত্যাগ করেছেন। সম্ভবতঃ কিছু লোক নিজেদের বিশেষ রুচির ভিত্তিতে হারামে মক্কীতে পেশাব-পায়খানা না করাকে ভাল মনে করেছেন। কাজেই তাঁদের এই মতকে অনুসরণ করা জরুরী নয়। তবে এটাকে পসন্দ করতেও আপত্তি নেই। এ প্রসঙ্গে হাফেজ আবু আলী বিন সাকান তাঁর 'সুনানে সেহহা' গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) এর বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, 'রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কায় থাকতেন তখন মল-মূত্র ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে মোগাম্মাসে যেতেন এবং সেখানে মল-মূত্র ত্যাগ করতেন।' মোগাম্মাস হচ্ছে সেই জায়গা, যেখানে বাদশাহ আবরাহা কাবা ধ্বংস অভিযানে হাতী থামিয়েছিলেন এবং সে হাতীগুলো সেখান থেকে আর সামনে এগুতে চায়নি। তারপর আল্লাহ ছোট পাখির ঝাঁক পাঠিয়েছে পাথর নিক্ষেপ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। তাহজীবুল আসার গ্রন্থে আবু জাফর আততাহাওয়ী বলেছেন, মোগাম্মাস মক্কা থেকে ২ মাইল দূরে অবস্থিত। তাবরানী আওসাত গ্রন্থে, নাফে' বিন আমর বিন দীনার থেকে তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَذْهَبُ بِحَاجَتِهِ إِلَى الْمُغَمِّسِ .
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) মোগাম্মাসে মল-মূত্র ত্যাগ করতে যেতেন। নাফে' বলেছেন, ঐ স্থানটি মক্কা থেকে দু'মাইল দূরে। মোগাম্মাস, মীনা ও মোযদালাফার মাঝখানের সামান্য কিছু জায়গা। মীনার শেষ সীমানা পর্যন্তই হারাম শরীফের সীমানা। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) হারাম সীমানার বাইরে গিয়ে মল-মূত্র ত্যাগ করেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১৩) হারাম এলাকার মাটি ও পাথর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা

📄 ১৩) হারাম এলাকার মাটি ও পাথর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা


যারাকশী বলেছেন, মাওয়ারদী উল্লেখ করেছেন যে, মল-মূত্র ত্যাগ করার পর হারাম এলাকার পাথর দিয়ে এস্তেঞ্জা করা এবং পবিত্রতা অর্জন করার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের দুটো মত আছে। প্রথম মতটি হচ্ছে, এর দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হবে এবং ফরজ আদায় হবে, তবে গুনাহ হবে। আসল ব্যাপার হল, হাদীস এটাকে নিষিদ্ধ করাতো দূরে থাক, মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারেও কিছু বলেনি। দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে: এর পাথর দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা জায়েয আছে।
যে আলেমরা এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন এবং হারামের মাটি ও পাথর দিয়ে এস্তেঞ্জা করা গুনাহ বলেছেন, এটা তাদের বিশেষ রুচির ব্যাপার। কেউ এই মত অনুসরণ করলে করতে পারে তবে তা জরুরী নয় এবং উলামায়ে কেরামের এটা কোন সর্বসম্মত মতও নয়।
ইমাম মালেক সম্পর্কে একথা প্রচলিত আছে যে, তিনি মল-মূত্র ত্যাগ করার জন্য মদীনার হারাম শরীফের বাইরে যেতেন। তবে এই ব্যাপারে তাঁকে অনুসরণ করার জন্য তিনি কিছু বলেননি। তিনি কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাই হাদীস ও কুরআনের বাইরে কোন মতামত দেননি। তিনি বেদআতের ব্যাপারেও সতর্ক ছিলেন। তাই তাঁর ইচ্ছা ছিল যে, যা জায়েয মানুষ তাই করুক। এটা জায়েয এবং সাধারণ হুকুম। তবে তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে হারাম শরীফের আদব রক্ষার নিয়তে হারামের বাইরে গিয়ে মল-মূত্র ত্যাগ করেছেন। কাজেই এটা তাঁর ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00