📄 ৫) মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা
হত্যার কারণে কেসাসের শাস্তি হিসাবে হত্যা, জ্বেনার কারণে পাথর নিক্ষেপ করে মারা অথবা অন্য কোন অপরাধের কারণে শরীয়তের ফয়সালা মোতাবেক মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি যদি হারামে আশ্রয় নেয়, তাহলে, সে ব্যক্তির ঐ শাস্তি কার্যকর করার ব্যাপারে আলেমদের তিনটি মত রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেঃ
(ক) হারামে অবস্থান করা পর্যন্ত সেই ব্যক্তি নিরাপদ। কেননা কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেছেন (আলে ইমরান ৯৬) مَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا 'যে ব্যক্তি হারামে ঢুকে সে নিরাপদ।' এ ছাড়াও হাদীসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে তার জন্য হারামে রক্ত প্রবাহিত করা জায়েয নেই।' তবে সেই ব্যক্তিকে কোনঠাসা করে রাখতে হবে, তার সাথে কথা বলা যাবে না। খাবার দেয়া যাবে না এবং কোন প্রকার লেনদেনও করা যাবে না। যেন সে হারাম থেকে বের হতে বাধ্য হয় এবং তার বিরুদ্ধে কেসাস, হদ বা অন্যান্য শাস্তি কার্যকর করা যায়। ইমাম আবু হানীফা (র)ও এই একই মত পোষণ করেন বলে এক বর্ণনায় এসেছে। আমর বিন আব্বাস, সাঈদ বিন যোবায়ের, হাকাম বিন আতিয়্যা এবং জাহেরিয়াদেরও এই মত। ইমাম আহমদও এই মতের অনুসারী বলে অপর এক বর্ণনায় জানা যায়। আবু যোবায়ের আলমক্কী বলেছেন, যদি আমি হারামে আমার পিতার হত্যাকারীকেও পাই, তথাপি তার সাথে কোন কথা বলবো না।
(খ) হত্যাকারী ব্যক্তিও যদি হারামে প্রবেশ করে, বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কেসাস বা মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যাবে না। কিন্তু কেসাস ব্যতীত অন্য যে কোন দণ্ড প্রদান করা যাবে। ইমাম আহমদ এবং ইমাম আবু হানীফা থেকে এ মর্মে একটি বর্ণনা রয়েছে।
(গ) হারামে মৃত্যুদণ্ড সহ অন্যান্য দণ্ড কার্যকর করা জায়েয। ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ীর এই মত। তাঁদের প্রমাণ হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত وَلَا تَقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ - (البقره : ۱۹۱) অর্থ: 'তোমাদের সাথে লড়াই না করলে, মসজিদে হারামে তোমরাও তাদের সাথে লড়াই করো না। এখানে লড়াই করলে তার মোকাবিলায় লড়াই বা হত্যা করা যাবে বলে বলা হয়েছে। যারাকশী ইবনুল মোনজের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, 'কাবা শরীফের গেলাফ ধরে থাকা অবস্থায় ইবনে খাতালকে হত্যা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) নির্দেশ দিয়েছেন' এর উপর ভিত্তি করে ইমাম মালেকও হারামে কেসাস এং হদ কায়েম করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়াও এই মতের পক্ষে বুখারী শরীফে হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত হাদীসটিও সহায়ক।
عَنْ عَائِشَةَ رَض أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ قَالَ : خَمْسٌ مِّنَ الدَّوابِ كُلُّهُنَّ فَاسِقٌ يُقْتَلْنَ فِي الْحَرَمِ الْغُرَابُ وَالْحِداةُ والْعَقْرَبُ وَالفَارَّةُ وَالْكَلْبُ الْعَقُورُ .
অর্থঃ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ৫টি প্রাণী ফাসেক বা বিদ্রোহী। হারাম এলাকায় এগুলোকে যেন হত্যা করা হয়। সেগুলো হচ্ছে কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও ক্ষতিকর কুকুর।
কিন্তু আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী বলেছেন যে, فسق অর্থ হচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া। হারামে নিষিদ্ধ প্রাণীগুলো থেকে এগুলোর হুকুম ব্যতিক্রম এবং এগুলোকে হত্যা করা যাবে। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীকে হত্যা করা যাবে না। আল্লামা যারাকশী বলেছেন, এই পাঁচটি প্রাণী কষ্টদায়ক বলে এদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ এগুলো ছোট ক্ষতিকারক প্রাণী। কিন্তু হত্যাকারী ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত আরো বেশী ক্ষতিকারক। তাই বড় ক্ষতিকারক প্রাণীকে হত্যা করতে কোন বাধা নেই।
হযরত আবু শোরাইহর হাদীসে এসেছে যে, হারাম কোন হত্যাকারীকে অথবা খুনের দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেয় না। তাঁর বর্ণিত হাদীসে لا يَسْفَكُ دَمًا কে এক্ষেত্রে এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। কেননা, এর অর্থ হচ্ছে 'অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহিত করা। কুরআন মজীদেও অনুরূপ অর্থে سَفَك শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন: আল্লাহ বলেছেন, أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ ( البقره : ٣٠) অর্থঃ (ফেরেশতারা আল্লাহকে বলল) 'হে আল্লাহ, আপনি কি যমীনে এমন লোকদেরকে তৈরি করবেন যারা এখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহিত করবে?' আল্লাহর এই বাণীর وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ امَنًا (আলে ইমরান) 'যে হারামে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ' তাৎপর্য হচ্ছে: আল্লাহ খবর দিচ্ছেন যে, জাহেলিয়াতের যুগ থেকে হারামের এই নিরাপত্তা মক্কাবাসীদের জন্য এক বিরাট নেয়ামত।
যদি কেউ মসজিদে হারাম অথবা অন্য কোন মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করে তাহলে তাকে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে বের করতে হবে এবং হত্যা করতে হবে।
এই সকল আলোচনা দ্বারা একটা কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কোন ব্যক্তি যদি হারাম এলাকায় অপরাধ করে, তাহলে, তা এই মতভেদের আওতায় পড়ে না। বরং ইবনুল জাওযী বলেছেন, এর উপরই ইজমা হয়েছে। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি দুঃসাহস এবং আল্লাহর ঘরের বেইজ্জত ও আল্লাহর প্রতি কুফরী করা হয়। আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ يُرِدْ فِيْهِ بِالْحَادِ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ - (الحج : ٢٥)
অর্থ: কেউ যদি এতে জুলুমের মাধ্যমে কুফরী করে তাকে আমরা কষ্টদায়ক আযাবের স্বাদ গ্রহণ করাবো'
📄 ৬) হারামে মক্কায় দিয়াহ বা কঠোর রক্তপণ
কেউ হারাম এলাকায় কাউকে হত্যা করলে তার উপর রক্তপণ বা দিয়াহ ফরয হবে। তবে তা হবে অন্য দিয়াহ থেকে অপেক্ষাকৃত কঠোর। কেননা হারাম এলাকায় পশু শিকার করলেও কঠোর কাফফারা দিতে হয়। তাই মানুষকে হত্যা করা হলে সে ক্ষেত্রে দিয়াহ আরো কঠিন হবে এটাই স্বাভাবিক। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং শাস্তির কঠোরতার ব্যাপারে হারাম শরীফের প্রভাব ক্রিয়াশীল। কেউ যদি ভুলবশতঃ হত্যা করে তারপরও দিয়াহ কঠোর হবে। চাই হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তিদ্বয়ের দু'জনই হারাম এলাকার অধিবাসী হউক, অথবা দু'জনের একজন হারাম এলাকার আর অন্যজন বাইরের, তাতে কোন পার্থক্য সৃষ্টি হবে না। হারাম এলাকায় হত্যা সংঘটিত হলেই তাকে কঠোরভাবে গ্রহণ করতে হবে।
কঠোরতার পরিমাণের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। ইবনুল মোনজের বলেছেন, হযরত উমর ফারুক (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন : যে ব্যক্তি হারাম এলাকায় কিংবা হারাম মাসগুলোতে কাউকে হত্যা করে, তার উপর একটি পুরো দিয়াহ এবং আরেক দিয়াহর ভাগ প্রদানের কঠোর হুকুম কার্যকর হবে। সাঈদ বিন আল মুসাইয়েব, আতা বিন আবি রেবাহ, সোলায়মান বিন ইয়াসার এবং আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ উলামায়ে কেরাম এই মতই পোষণ করেন। তবে, আরেক দল আলেমের মতে, হারাম এলাকায় সংঘটিত হত্যার জন্য কঠোরতর দিয়াহ প্রযোজ্য হবে না। হাসান বসরী, ইমাম শা'বী এবং নাখয়ী এই দলের অন্তর্ভুক্ত। ইবনুল মোনজের বলেছেন, আমাদের মতও তাই। বিশ্বের সর্বত্র সকল মানুষের উপর আল্লাহর আইন একই ধরনের প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
📄 ৭) মক্কায় অস্ত্রশস্ত্র বহন করা
মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে এসেছে যে নবী করীম (সা) এরশাদ করেছেন: لَا يَحِلُّ لِأَحَدٍ أَنْ يَحْمِلَ السَّلَاحَ بِمَكَّةَ . অর্থ: মক্কায় অস্ত্র বহন করা কারো পক্ষেই জায়েয নেই। এই হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতেই হযরত হাসান বসরী (র) বলেছেন, মক্কায় অস্ত্র বহন করা বৈধ নয়। কেননা সেখানে হত্যা ও রক্তপাত নিষিদ্ধ। তাই যে অস্ত্রের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয় তাও নিষিদ্ধ। কিন্তু কাজী ইয়াদ বলেছেন, বিনা প্রয়োজনে হারামে মক্কীতে অস্ত্র বহন করা জায়েয নেই। হ্যাঁ, তবে যদি প্রয়োজন থাকে তাহলে তা জায়েয আছে। ইমাম মালেক, শাফেয়ী এবং আতা (র) এই মতই পোষণ করেন। তাদের প্রমাণ হচ্ছে, হোদায়বিয়ার সন্ধির পরবর্তী বছর কাজা উমরা আদায়ের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) খাপবদ্ধ অস্ত্র ও তলোয়ার নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। তাছাড়াও তিনি মক্কা বিজয়ের সময় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে সশস্ত্রভাবে মক্কায় এসেছিলেন। কোরায়েশরা প্রতিরোধ করেনি বলে যুদ্ধ হয়নি। অন্যথায় অবশ্যই যুদ্ধ সংঘটিত হত। কিন্তু ইকরামা সম্পূর্ণ পৃথক মত পোষণ করেন। তার মতে প্রয়োজন হলে অস্ত্র বহন করবে সত্য, কিন্তু তাকে ফিদইয়া দিতে হবে। অন্যান্য আলেমদের বক্তব্যের সাথে খাপ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে বলা যেতে পারে যে, এহরাম পরিধানকারী ব্যক্তি যদি লৌহবর্ম বা শিরস্ত্রাণ পরে, তাহলে তিনি হয়তো তার জন্যই ফিদইয়া দানের কথা বলেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) মক্কায় অস্ত্র বহনের পক্ষে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের আদেশের বিরোধিতা করেছিলেন। কেননা, হজ্জ ও বিভিন্ন মওসুমে এই নগরীতে বহু লোকের ভিড় হয়। তাঁর আশংকা যে, এর দ্বারা কেউ আহত হতে পারে। বুখারী শরীফে এ মর্মে নবী করীম (সা) এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে-
مَنْ مَّشَى فِي مَسَاجِدِنَا أَوْ أَسْوَاقِنَا بِنُبُلٍ فَلْيَأْخُذْ عَلَى نِضَالِهَا لِئَلَّا يُصِيبَ مُسْلِمًا .
অর্থ: তীর বহনকারী কোন ব্যক্তি যদি আমাদের মসজিদ কিংবা বাজারসমূহে চলাফেরা করে সে যেন তীরের মাথা ধরে রাখে। তা না হলে কোন মুসলমান আহত হতে পারে। এক্ষেত্রে সতর্কতা পালনের জন্যই এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
📄 ৮) মক্কায় বাড়ী-ঘর বিক্রি কিংবা ভাড়া প্রদান করা
উলামায়ে কেরাম মক্কার বাড়ী-ঘর বিক্রি, ভাড়া ও বন্ধক প্রদান সম্পর্কে মতভেদ পোষণ করেন। ইমাম শাফেয়ী (র) এটাকে জায়েয বলেছেন। ইমাম আহমদ ও ইমাম মালেক (র)ও এটাকে জায়েয বলেছেন বলে এক বর্ণনায় জানা যায়। হযরত উমর (রা) সহ এক দল সাহাবারও এই মত। ইমাম আবু ইউসুফও একই মত পোষণ করেন। ইমাম আবু হানিফা (র) এর মতে, তা নাজায়েয। এটাই ইমাম মালেকের প্রসিদ্ধ মাজহাব।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেকের যুক্তি হল: ১। হযরত আবদুল্লাহ বিন আবিয যিনাদ ইবনে আবি নাজিহ থেকে এবং তিনি আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, مَكَةُ حَرَامٌ وَحَرَامٌ بَيْعُ رِبَاعِهَا وَحَرَامٌ أَجْرُبُيُوتِهَا অর্থঃ মক্কা সম্মানিত, এর ঘর বিক্রি করা কিংবা ভাড়া দেয়া হারাম। ২। হাকেম মোসতাদরাকে, ইসমাঈল বিন ইবরাহীম বিন মোহাজের থেকে এবং তিনি আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, مَكَّةُ مُبَاحٌ لَا تُبَاعُ رِبَاعُهَا وَلَا تُؤْجَرُبُيُوتُهَا অর্থ: মক্কা হচ্ছে মোবাহ। এর ঘর-বাড়ী বিক্রি করা কিংবা ভাড়া দেয়া যাবে না। ৩। হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী করীম (সা) কে বলেছেন, হে রাসূলুল্লাহ! রোদ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে আপনার জন্য কি একটি ঘর নির্মাণ করবো? উত্তরে তিনি বলেন, যে আগে আসে, তার জন্যই এটা বৈধ। (তিরমিযী) ৪। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, مِنِى مُبَاحٌ لِّمَنْ سَبق যে আগে আসে, মিনা তার জন্যই বৈধ। ইমাম নওয়ী বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ হাদীস। অন্য একটি বর্ণনায় মিনার পরিবর্তে 'মক্কা' শব্দের উল্লেখ আছে। তখন এর অর্থ হবে; যে আগে আসে, মক্কা তার জন্যই বৈধ।'
তাঁরা আরো বলেছেন, মক্কা হারামেরই ভূখণ্ড। মসজিদে হারামের মতই এর ভূখন্ড বেচাকেনা কিংবা ভাড়া দেয়া জায়েয নেই।
৫। মক্কা মসজিদে হারামের মতই সম্মানিত। মসজিদে হারামের কোন অংশ যেমন বিক্রি করা যায় না ঠিক তেমনি মক্কার ঘর-বাড়ীও বেচা-কেনা করা যাবে না।
৬। হযরত উসমান বিন আবি সোলায়মান হযরত আলকামা বিন নাদলা আল-কানানী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, মক্কার ঘর-বাড়ী হচ্ছে মান্নত করা ছাড়া-পশুর মত। রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবুবকর ও হযরত উসমানের যুগে সেখানকার কোন ঘরবাড়ী বেচাকেনা হত না। যার থাকার দরকার হত, সে সেখানে বাস করত এবং যে কাউকে ইচ্ছা বাস করতে দিত। (বায়হাকী)
৭। দারকুতনী ইবনে আবি নাজীহ থেকে এবং তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন مَنْ أَكَلَ كراء بيوت - مَكَّةَ أَكَلَ نَارًا অর্থ : যে মক্কায় অবস্থিত ঘর-বাড়ীর ভাড়া খায় সে মূলতঃ আগুন খায়।
৮। মুজাহিদ বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন, مَكَّةُ حَرَامٌ حَرَّمَهَا اللَّهُ لَا يَحِلُّ بَيْعُ رِبَاعِهَا وَلَا إِجَارَةُ رِبَاعِهَا . অর্থ: মক্কা সম্মানিত, আল্লাহ একে সম্মানিত করেছেন। এর ঘরবাড়ী বেচাকেনা করা বা ভাড়া দেয়া জায়েয নেই।
ইমাম নবওয়ী বলেছেন: ইমাম শাফেয়ীসহ আরো যারা মক্কার ঘরবাড়ী বেচাকেনা ও ভাড়া দেয়া জায়েয বলেছেন, তাঁদের দলীলগুলো হচ্ছে-
১। আল্লাহ এরশাদ করেছেন : لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ (ديارهم - (الحشر: ٥٩ অর্থ: 'ঐ সকল গরীব মোহাজেরদের জন্য যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ী থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।' এই আয়াতে 'ঘর-বাড়ী'কে তাদের দিকে সম্বোধন করা হয়েছে। মালিকানা থাকলেই এই সম্বোধন করা হয়। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, তাদের ঘর-বাড়ীর মালিকানা ছিল। মালিকানা বিক্রি করতে কোন আপত্তি নেই। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, কোন কোন সময় শুধু দখলী স্বত্ব ও বসবাসের কারণেও অনুরূপ সম্বোধন করা হয়, যাতে মালিকানা থাকার দরকার হয় না। কুরআনে, এই অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে স্ত্রীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন (وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ )আহযাব-৩৩ 'তোমরা তোমাদের ঘরেই থাক, (বাইরে যেয়ো না) এখানে স্ত্রীদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে তারা যেন তাদের ঘরেই থাকে। এটা জানা কথা যে, তারা স্বামীর ঘরে থাকে। তারপরও 'তাদের ঘর' এইকথা বলে তাদের বাসস্থানের দিকে সম্বোধন করাই উদ্দেশ্য। এই প্রশ্নের উত্তর হল, মূলতঃ কোন কিছুর মালিকানা বুঝানোর জন্যই সম্বোধন করা হয়ে থাকে। এজন্যই 'এটি যায়েদের ঘর' একথা বলে ঘরের উপর যায়েদের মালিকানা বুঝানো হয়। কিন্তু কেউ যদি বলে যে, একথা দ্বারা ঘরের উপর যায়েদের বসবাস ও দখলী স্বত্ব বুঝানো হয়েছে তাহলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
২। ইমাম নওয়ী বলেছেন, তাঁদের আরেকটি দলীল হল উসামা বিন যায়েদের বর্ণিত হাদীস। হাদীসটি হল রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কায় পৌঁছলেন তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল। আপনি মক্কায় আপনার কোন ঘরে অবতরণ করবেন? রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: আকীল কি আমাদের জন্য কোন ঘর-বাড়ী রেখেছে? আকীল এবং তালেব আবু তালেবের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েছিল। মুসলমান হওয়ার কারণে জাফর এবং আলী আবু তালেবের ওয়ারিশ হননি। অপরদিকে আকীল ও তালেব ছিল কাফের। (বুখারী ও মুসলিম) এই হাদীস দ্বারা মক্কার ঘর-বাড়ীর উত্তরাধিকার এবং এতে সকল প্রকার হস্তক্ষেপ ও লেন-দেন জায়েয বলে প্রমাণিত হয়।
৩। তাঁরা হযরত আবু হুরাইরা (রা) কর্তৃক মক্কা বিজয়ের ঘটনা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস থেকেও প্রমাণ পেশ করে থাকেন। হাদীসটিতে আছে যে, আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে আসলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজ থেকে কোরাইশদের সব গর্ব অহংকার শেষ এবং আজকের পরে আর কোন কোরাইশও নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন 'আবু সুফিয়ানের ঘরে যে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে অস্ত্র সমর্পণ করবে সে নিরাপদ এবং নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সে।' (মুসলিম) এখানে আবু সুফিয়ানের ঘর ও নিজ ঘরের কথা বলা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আবু সুফিয়ান সহ অন্যান্যদের ঘর-বাড়ীর মালিকানা ছিল।
৪। তাদের আরেকটি দলীল হল বায়হাকী ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত একটি আচার। সেই আচারে বলা হয়েছে যে, হযরত নাফে বিন আবদুল হারেস, সাফওয়ান বিন উমাইয়া থেকে হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) এর জন্য ৪ শত, কিংবা ৪ হাজারের বিনিময়ে دار السجن 'দারুস সিজন' খরিদ করেছিলেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, হারামে মক্কীর বাড়ীঘর বেচাকেনা করা জায়েয।
৫। তাঁদের আরো একটি প্রমাণ হলো, যোবায়ের বিন বাক্কার ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন যে, হাকীম বিন হেযাম হযরত মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে মক্কার দারুন নাদওয়াকে ১ লাখের বিনিময়ে ক্রয় করেছেন। তখন আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের বললেন, হে আবু খালেদ, আপনি মক্কার কোরাইশদের সবচাইতে সেরা জায়গাটি খরিদ করলেন। তিনি উত্তরে বললেন: সকল সম্মান ও মর্যাদ বিলুপ্তি হয়ে গেছে। আজ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুর সম্মান ও মর্যাদা নেই। তারপর তিনি বললেন, আপনারা সবাই সাক্ষী থাকুন, এই অর্থ সবটুকুটই আল্লাহর রাস্তায় দান করা হল।
৬। ইমাম তাহাওয়ী ইমাম আবু ইউসুফ (র) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, অন্যান্য শহরের মত মক্কা শরীফের ঘরবাড়ী ভাড়া দেয়া ও বেচা কেনা করা জায়েয আছে। ইমাম তাহাওয়ী বলেছেন যে, আমাদের মতে, মসজিদে হারামের জন্যই এই বিধি নিষেধ প্রযোজ্য। এখানে কেউ ঘর তৈরি করতে পারবে না এবং এর কোন অংশ আটক রাখতে পারবে না। এটা ঠিক অন্যান্য ঐ সকল স্থানের মত, যেখানে সব মানুষ জমায়েত হয় সেখানে কারুর কোন মালিকানা চলে না। এতে সকল মানুষের অধিকার সমান। তোমরা কি দেখনা, আরাফাতের ময়দান, মানুষের অবস্থান বা 'ওয়াকফ' করার স্থানে কেউ যদি ঘর বানাতে চায় তাহলে সেটা জায়েয নেই? মিনার হুকুমও অনুরূপ। হযরত আয়িশা রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করেন 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মিনায় রোদ থেকে বাঁচার জন্য এবং ছায়া পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোন কিছু তৈরি করবেন না? রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হে আয়িশা, যে আগে আসে, সেই মিনায় থাকার অধিকার লাভ করবে। তিরমিযী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হাকেম বলেছেন, 'ইমাম বুখারীর শর্তের ভিত্তিতে এই হাদীসটিকে সহীহ বলা যায়।' ইমাম তাহাওয়ী আরো বলেছেন, আল্লাহ অন্যান্য স্থানের উপর মক্কাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তাতে ঘর বাড়ী নির্মাণেরও অনুমতি দিয়েছেন। 'যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ এবং যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সেও নিরাপদ' রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই হাদীস দ্বারা ব্যক্তি মালিকানা বৈধ বলে প্রমাণিত হয়।
মক্কার ঘর বাড়ী ভাড়া ও বেচাকেনার বিরুদ্ধে যারা মত প্রকাশ করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে জবাব হচ্ছে নিম্নরূপ:
ক) ইমাম আবু হানিফা (র) আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর যে হাদীস বর্ণনা করেছেন তা মূলতঃ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস নয়। ঐটি হচ্ছে হাদীসে মাওকুফ বা কোন সাহাবীর বর্ণনা। যারাকশী বলেছেন যে, ইমাম দারু কুতনী সহ অন্যান্য হাফেজে হাদীসরা এটাকে হাদীসে মাওকুফ বলেছেন। এছাড়াও এই হাদীসের সনদের মধ্যে আবু যিয়াদ নামক রাবী হচ্ছে দুর্বল। ইমাম নওয়ী শরহুল মুহাজ্জাব গ্রন্থে এই কথা বলেছেন।
খ) হাকেম, ইসমাইল বিন ইবরাহীম বিন মোহাজের এবং মোহাজের তাঁর বাপ থেকে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, সে হাদীসটি মোহাদ্দেসদের কাছে দুর্বল এবং তাঁরা সবাই এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইসমাইলকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম নাসায়ী, ইবনে হিব্বান এবং ইয়াহইয়া বলেছেন যে সে খুব প্রকাশ্য ভুলকারী ব্যক্তি। আবু হাতেম বলেছেন, এই হাদীস বর্জনীয়।
গ) হযরত আয়িশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত যে হাদীসটিকে ইমাম নওয়ী সহীহ বলেছেন, সেটি দ্বারা হারামের অনাবাদী বালুকাময় পতিত এলাকা বুঝানো হয়েছে।
ঘ) ইমাম নওয়ী (র) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) 'মিনায় যে আগে আসবে তার অগ্রাধিকার রয়েছে' মর্মে যে হাদীস বলেছেন সেটি দ্বারাও মিনায় অনাবাদী বালুকাময় পতিত জায়গা এবং হাজীদের অবতরণের জায়গা বুঝানো হয়েছে। মূলতঃ এটি এমন জায়গা যেটি কারুর জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হতে পারে না। ইমাম তীবি বলেছেন, নবী করীম (সা) মিনায় তার জন্য ঘর বানানো এই জন্য নিষেধ করেছেন যে, মিনা হচ্ছে কোরবানী, পাথর নিক্ষেপ এবং মাথার চুল কাটার স্থান। এই কাজে বহু লোক সেখানে জড়ো হবে। যদি সেখানে ঘর বানানোর অনুমতি দেয়া হয় তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুকরণে অসংখ্য ঘরবাড়ী তৈরী হয়ে যাবে। এতে করে মিনা সংকীর্ণ হয়ে আসবে এবং হাজীদের হজ্জ সংক্রান্ত হুকুম আহকাম পালন কারা কষ্টকর হবে। যে কোন রাস্তাঘাট ও বাজারের মজলিশ সমূহেও অনুরূপ ঘরবাড়ী তৈরী করা নিষিদ্ধ। কেননা এতেও লোকদের সমস্যা সৃষ্টি হবে। ইমাম খাত্তাবী বলেছেন, মিনায় নিজের ও মুহাজিরদের জন্য ঘর তৈরীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) এজন্যই অনুমতি দেননি যে, তাঁরা নিজেরাই স্বয়ং এখান থেকে হিযরত করে চলে গেছেন এবং তারাই পুনরায় এখানে ফিরে এসে ঘরবাড়ী তৈরী করা পছন্দ করেননি। আল্লামা কারী বলেছেন, এই ব্যাখ্যা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যার বিপরীত। কেননা মিনা থেকে তো আর তাঁরা হিযরত করেননি।
ঙ) মক্কাকে মসজিদে হারামের মতই অবিকল মনে করা ঠিক নয়। কেননা মসজিদ সর্বদাই সম্মানিত ও মুক্ত। তাই এর সাথে বাসোপযোগী ঘরবাড়ী বিক্রিকে একরকম মনে করে সেগুলোর বেচাকেনা নিষিদ্ধ করা যায়না। এজন্যই দুনিয়ার সকল দেশে ঘরবাড়ী বিক্রি হয়। মসজিদ বিক্রি হয় না।
চ) ইমাম নওয়ী বলেছেন, উসমান বিন আবু সালমান কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটির দুটো জবাব আছে। (১) ইমাম বায়হাকী বলেছেন যে, হাদীসটি মুনকাতি' বা মাঝখানে রাবীচ্যুত।
(২) ইমাম বায়হাকী সহ অন্যরা বলেছেন যে, এই হাদীসে আরবদের একটি অভ্যাসের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে যে, যে সকল ঘর-বাড়ী তাদের দরকার ছিল না, নেক ও সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে তারা সেগুলোকে ধার হিসেবে বাস করতে দিত। মক্কা সম্পর্কে অভিজ্ঞ লোকেরা জানিয়েছেন যে, ঘরবাড়ীগুলোতে উত্তরাধিকার প্রথা চালু ছিল।
ছ) আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে ইবনে আবী নাজিহ কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি মাঝে রাবীচ্যুত। কেননা, ইবনে নাজিহ আবদুল্লাহ বিন উমরের যুগের লোক নন। তাঁর আসল নাম হচ্ছে আবদুল্লাহ বিন ইয়াসার।
জ) মুজাহিদের বক্তব্যটি হচ্ছে মাঝপথে সাহাবী বিচ্যুত। এটি মুরসাল। এটাকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা যায়না। এটা হচ্ছে, ইমাম আবু হানিফা (র) কর্তৃক ইবনে উমর থেকে বর্ণিত মারফু হাদীসের অনুরূপ। আসলে, ঐটি হচ্ছে মাওকুফ বা সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) তা বলেননি।
ইমাম শাফেয়ীর সাথে ইসহাক বিন রাহওয়াইর বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ইমাম বায়হাকী ইবরাহীম বিন মুহাম্মদ আল কুফীর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, আমি ইমাম শাফেয়ী (র)-কে লোকদের উদ্দেশ্যে মাসআলা বর্ণনা করতে দেখলাম এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও ইসহাককেও উপস্থিত দেখতে পেলাম। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ইসহাককে বললেন, হে আবু ইয়াকুব! আসুন, আমি আপনাকে এমন এক লোক দেখাবো, যার মত লোক আপনার দু'চোখের নীচে কখনও পড়েনি। ইসহাক জবাবে বললেন, কি বলেন, আমার দু'চোখ এমন লোক দেখেনি? তারপর তিনি তাকে ইমাম শাফেয়ীর কাছে নিয়ে আসলেন। ইসহাক ইমাম শাফেয়ীর মজলিসে বসলেন। তখন ইমাম শাফেয়ী (র) নিজের বিশেষ শাগরেদদের নিয়ে বসা ছিলেন। ইসহাক প্রশ্ন করলেন যে, মক্কার ঘর বাড়ী ভাড়া দেয়া জায়েয আছে কি? ইমাম শাফেয়ী বললেন, আমার মতে তা জায়েয। তিনি এ প্রসঙ্গে প্রমাণ উল্লেখ করে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন আকীল কি আমাদের জন্য কোন ঘর রেখেছে? তখন ইসহাক বললেন, আমি কি কথা বলতে পারি?
ইমাম শাফেয়ী তাঁকে কথা বলার অনুমতি দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, বলুন। তখন ইসহাক বললেন, ইয়াজিদ হিশাম থেকে এবং হিশাম হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হাসান বসরী এটাকে জায়েয মনে করেন না। অনুরূপভাবে, আবুল কাসেমসহ অন্যান্যরা সুফিয়ান থেকে, তিনি মনসুর থেকে এবং তিনি ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইবরাহীম এটাকে জায়েয মনে করেন না। আতা এবং তাউসেরও এই একই মত। তখন ইমাম শাফেয়ী ইসহাককে চিনে এমন লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, লোকটি কে? তাঁরা তাঁর পরিচয় দিয়ে বললেন, যে তিনি হলেন ইসহাক বিন রাহওয়াই। তখন ইমাম শাফেয়ী' জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি সে ব্যক্তি যাকে খোরাসান বাসীরা নিজেদের ফকীহ মনে করে? ইসহাক বললেন, হ্যাঁ, তারা এরকম মনে করে। তখন শাফেয়ী' বললেন, আপনার স্থানে অন্য কেউ হলে আমি তার উটের কান ছিদ্র করে দিতে বলতাম। কেননা, আমি বললাম যে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, আর আপনি তাঁর মোকাবিলায় বলেন যে, আতা, তাউস, ইবরাহীম ও হাসান এটাকে না জায়েয বলেছেন। তাদের কারুর বক্তব্য বা উক্তি কি রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসের সমান? তিনি এই বিতর্ক পুরো বর্ণনা করে বলেন যে, তারপর ইমাম শাফেয়ী প্রশ্ন করেন: আল্লাহ এরশাদ করেছেন:
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ .
এই আয়াতে দিয়ার ‘ঘরের’ সম্বোধন তার মালিকের প্রতি না অন্য কারুর প্রতি করা হয়েছে? ইসহাক উত্তরে বলেন, ‘মালিকের প্রতি।’ তখন ইমাম শাফেয়ী' বলেন, আল্লাহর কথাই হচ্ছে সবচাইতে বেশী সত্য। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ”। ইমাম শাফেয়ী প্রশ্ন করেন, এই হাদীসে ‘আবু সুফিয়ানের ঘর’ বলে সম্বোধন এর মালিকের প্রতি করা হয়েছে না কি অ-মালিকের প্রতি? ইসহাক বলেন, মালিকের প্রতি।’ তখন ইমাম শাফেয়ী বলেন, হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) ক্ষৌরকারদের ঘর কিনে তাতে সাহাবায়ে কেরামসহ অন্যান্যদেরকে বাস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তারপর ইসহাক বললেন, আমি সূরা হজ্জ এর একটি আয়াত পড়ি।
سَوَاءٌ الْعَاكِفُ فِيْهِ وَالْبَادُ (الحج : ٢٥) :
অর্থ: ‘সেখানকার অধিবাসী ও বহিরাগত লোকদের সবার জন্য এটি সমান।’ তখন ইমাম শাফেয়ী (র) বললেন, আপনি যে রকম বলছেন যদি অবস্থা তাই হয় তাহলে সেখানকার হারানো জিনিস সম্পর্কে প্রচার করা যাবে না, সেখানে কোরবানীর পশু জবেহ করা যাবে না এবং সেখানে মল-মূত্র ফেলাও নিষিদ্ধ হবে। আসলে সেটা শুধু সমজিদে হারাম সম্পর্কে বলা হয়েছে, হারাম এলাকা সম্পর্কে নয়। তখন ইসহাক চুপ করে গেলেন এবং ইমাম শাফেয়ী'ও আর কোন কথা বললেন না।
যাই হোক, বর্ণিত আয়াতের অর্থ হল, মসজিদে হারামে মক্কা ও মক্কার বাইরের লোক সবাই সমান। মক্কার অধিবাসীগণ মসজিদে হারামের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে মসজিদে হারামে অন্যদের উপর তাদের কোন পৃথক মর্যাদা নেই। বরং এক্ষেত্রে সবাই সমান। কেননা, কুরআনের আয়াতটি হচ্ছে এরকম:
وَالمَسْجِدُ الْحَرَامُ الَّذِي جَعَلْنَاهُ لِلنَّاسِ سَوَاءٌ الْعَاكِفُ فِيْهِ وَالْبَادُ .
(سورة الحج : ٧٥)
অর্থ: ‘আমরা মসজিদে হারামকে মক্কার অধিবাসী ও বহিরাগত লোকদের জন্য সমান করে দিয়েছি।’ ইসহাক "" 'হু' সর্বনামকে মক্কা শহর বুঝেছেন। আর ইমাম শফেয়ী তাকে মসজিদে হারাম বুঝেছেন। মসজিদে হারাম হওয়াটাই এখানে বেশী যুক্তিযুক্ত। আলেমদের মধ্যে মতভেদের এটি হচ্ছে প্রথম কারণ। [দ্বিতীয় কারণ হলো, মক্কা বিজয় কি সন্ধির ভিত্তিতে হয়েছে না যুদ্ধের ভিত্তিতে? ইমাম শাফেয়ীর মতে মক্কা বিজয় সন্ধির ভিত্তিতে হয়েছে। ইমাম আবু হানীফার মতে যুদ্ধের ভিত্তিতে হয়েছে। যারা বিজয়কে সন্ধির ভিত্তিতে হয়েছে বলে মনে করেন, তাদের যুক্তি হল, আবু সুফিয়ান মক্কাবাসীদের সবার জন্য এবং তাদের ঘর-বাড়ী ও সহায়-সম্পত্তি সবকিছুর জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে মক্কা বিজয়ের দিন নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন:
الْيَوْمَ يَوْمُ الْمَرْحَمَةِ لَا الْمَلْحَمَةِ .
'আজ রহমত ও দয়া প্রদর্শনের দিন, আজ যুদ্ধ-বিগ্রহের দিন নয়।'
এই মতের ভিত্তিতে মক্কার ঘর-বাড়ী ও সহায়-সম্পত্তির মালিকানা, সেগুলোর ভাড়া প্রদানসহ যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার বহাল রয়েছে। এগুলোর মালিকেরা সেগুলোকে ভাড়া প্রদানসহ বেচা-কেনা করতে পারবে।
আর যারা বলে যে, যুদ্ধের ভিত্তিতে মক্কা বিজয় হয়েছে তাদের যুক্তি হল: মক্কা বিজয়ের দিন খালেদ বিন ওয়ালিদের সাথে কয়েকজন কাফের সর্দারের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তারা পরাজিত হয়। তাদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসাবে রশি দিয়ে বেঁধে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে হাজির করা হলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের ব্যাপারে একটি দয়াপূর্ণ ফয়সালা দান করেন। এই মতের ভিত্তিতে বলা হয় যে, মক্কা বিজয় যুদ্ধ-বিগ্রহের ভিত্তিতে হয়েছে এবং এর সকল সম্পত্তি গনিমতের মাল বা যুদ্ধলব্ধ মাল হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাই মক্কার ঘর-বাড়ী বেচাকেনা ও ভাড়া দেয়া যাবে না।
তবে প্রথম মতটিই বেশি সহীহ এবং এর সমর্থনে ঐ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিভিন্ন কার্যক্রম এবং সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন ভূমিকা সহ বহু বর্ণনা রয়েছে।