📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ৩) হারাম এলাকায় গাছ কাটা

📄 ৩) হারাম এলাকায় গাছ কাটা


হারাম এলাকার গাছ কাটা নিষিদ্ধ। নবী করীম (সা) বলেছেন, وَلَا يُعْضَدُ شجرها অর্থাৎ হারাম এলাকার গাছ কাটা যাবে না। কোরাইশদের কাছে হারাম এলাকার সম্মানের বিষয়টি জানা ছিল। তারা এই হারামের সম্মান রক্ষা করে চলত। কোরাইশরা যখন নির্মাণ কাজের ইচ্ছা করল তখন তারা কুসাইকে জিজ্ঞাসা করল, আমরা হারাম এলাকার গাছ দিয়ে কিভাবে নির্মাণ কাজ করবো? সর্বপ্রথম হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের হারাম এলাকার গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি মক্কার কুয়াইকাআন পাহাড়ে ঘর তৈরির সময় প্রতিটি কাটা গাছের বিনিময়ে একটি গরু দান করেছেন। হযরত উমর (রা) আসাদ বিন আবদুল ওজ্জার ঘরে অবস্থিত একটি গাছ কেটেছেন বলে এক বর্ণনায় এসেছে। গাছটি কা'বা শরীফের নিকটবর্তী ছিল এবং তওয়াফকারীদের কাপড় এতে আটকে যেত। তখনও মসজিদে হারামকে সম্প্রসারিত করা হয়নি। হযরত উমর সেই গাছটি কেটে ফেলেন এবং এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি গরু সদকা করেন।
ইমাম মালেক (র) এর মাজহাবে, দুই হারাম শরীফের গাছ কাটলে কোন ফিদইয়া দেয়া জরুরী নয়। ইমাম মালেককে তাঁর এই রায় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি তা জানিনা। যারা আমার সম্পর্কে এ রকম বলেছে, তারা ঠিক করেনি। তবে আমি একথা বলি যে, যারা গাছ কাটবে তারা যেন আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করে বা গুনাহ মাফ চায়। ইবনুল মোনজেরের কথা থেকেও একথার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি কুরআন, হাদীস ও ইজমা থেকে গাছ কাটার বিনিময়ে কোন ফিদইয়া নেয়াকে ফরজ কিংবা ওয়াজিব হিসেবে দেখতে পাইনি। তবে এক্ষেত্রে, ইমাম মালেক (র) যা বলেছেন, আমিও তাই বলবো। সেটা হচ্ছে: এজন্য আমরা আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাবো।
ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আবু হানীফা (র) মক্কার হারাম এলাকার গাছ কাটার বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়াকে ফরজ বলেছেন। ইমাম শাফেয়ীর মতে, বড় গাছ কাটলে গরু এবং ছোট গাছ কাটলে ছাগল বা ভেড়া ফিদইয়া দিতে হবে। ইমাম আবু হানীফা (র) এর মতে, গাছের মূল্য পরিমাণ ফিদইয়া দিতে হবে।
ইবনুল মোনজের বলেছেন, তিনি যে আলেমদের নাম জানেন, তারা সবাই হারাম সীমান্তের ভেতরের সবজি, তরি-তরকারি ও ফুল তোলাকে জায়েয বলেছেন।
সোহায়লী বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা (র) হারাম এলাকায় বিনা চাষে উৎপাদিত গাছ এবং চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত গাছের হুকুমের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বিনা চাষে উৎপাদিত গাছে ফিদইয়া লাগবে এবং চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত গাছের ফিদইয়া লাগবে না।
তবে হারাম এলাকার নিষিদ্ধ গাছগুলো থেকে যেগুলো ব্যতিক্রম এবং যেগুলো কাটার হুকুম রয়েছে সেগুলো হচ্ছে:
(ক) ইজখের: এটা মক্কার বহুল পরিচিত গাছ।
(খ) কাঁটাযুক্ত গাছ। কিন্তু একটি মশহুর হাদীসে কাঁটাযুক্ত গাছ না কাটারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেটি হচ্ছে "لا يعضد شوكه" উলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, ঐ হাদীসে কাঁটা বলতে, উট যে সকল কাঁটাযুক্ত গাছ খায় সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে। তবে কষ্টদায়ক জিনিস যেমন কাঁটাযুক্ত গাছকাটা ও ক্ষতিকর পশু-পাখি মারার হুকুম অন্য হাদীসে রয়েছে।
যারাকশী বলেছেন, বেশীর ভাগ উলামায়ে কেরাম কাঁটাকে কষ্টদায়ক জিনিসের অন্তর্ভুক্ত ধরে নিয়ে বলেছেন, কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা নিষিদ্ধ নয়। তাঁরা কষ্টদায়ক পশু হত্যার হাদীসের উপর কেয়াস করে, এটাকে এর থেকে পৃথক মনে করেন। কিন্তু ইমাম নবওয়ী 'কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা হারাম'-এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্ণিত হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করাই উত্তম। শেখ আইনী এই কেয়াসকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং হারাম এলাকার গাছ কাটাকে নিষিদ্ধ বলেছেন।
(গ) হারাম এলাকার ভেতরের কৃষিজাত ফল-ফুল এবং সবজি ও তরকারি কাটা ও উঠানো নিষিদ্ধ নয়। ইবনুল মোনজের বলেছেন, আমি যে সকল উলামার কথা জানি, তারা সবাই এটাকে হালাল ও বৈধ বলেছেন। ইমাম খাত্তাবী তার معالم السنن বইতে লিখেছেন, সোহায়লী, ইমাম আবু হানিফা (র) এর বরাত দিয়ে বলেছেন যে, চাষের ফলে ও বিনা চাষে উৎপন্ন উদ্ভিদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিনা চাষে উৎপাদিত ফসলের যা মূল্য আসে, তা হিসেব করে ফিদইয়া দিতে হবে এবং মানুষের উৎপাদিত ফসলাদি কাটলে, তার বিনিময়ে কিছু দিতে হবে না। ইমাম নবওয়ীও একই মতের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, আলেমরা বিনা চাষে উৎপাদিত ফল ও ফসল এবং গাছ-পালা কাটাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
(ঘ) গৃহপালিত পশুর খাবারের জন্য ঘাস ও গাছ-পালা কাটা জায়েয আছে। এটাই বিশুদ্ধ মত। যারাকশী বলেছেন, মূলতঃ পশুর খাদ্যের প্রয়োজনেই হারাম এলাকার ঘাস কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি তা পশুর খাবারের জন্য কাটা হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ হবে না। তাঁর মতে, সাহাবায়ে কেরাম হারাম সীমান্তের ভেতর উট প্রবেশ করিয়েছিলেন। সেই উটগুলো এর ঘাসে চরেছে। ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্যই ইজখেরের মত এটাকেও হালাল করা হয়েছে। ইমাম খাত্তাবী معالم السنن বইতে লিখেছেন যে, ইবনুল মোনজের, ইমাম শাফেয়ী (র) থেকে বর্ণনা করেছেন, হারাম সীমানার ভেতর পশুচারণ নিষিদ্ধ নয়।
(ঙ) হারাম এলাকার যে সকল গাছ-পালা ওষুধের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় বিশুদ্ধ মতে, সেগুলো কাটা হারাম নয়। কেননা, ইজখেরের প্রয়োজনের চেয়ে এগুলোর প্রয়োজন আরো বেশী। অথচ শরীয়ত ইজখেরের অনুমতি দিয়েছে। তাই ঐগুলোও জায়েয হবে। ইবনুল মোনজের উল্লেখ করেছেন, শেখ আতা তাঁর বাগান থেকে سنا নামক গাছের পাতা তোলার অনুমতি দিয়েছিলেন।
এ সকল অনুমতির পাশাপাশি এর বিরোধী মতের প্রতিও দৃষ্টি দেয়া দরকার। এক মতে বলা হয়েছে যে, ইজখেরের সাথে অন্য কোন কিছুকে তুলনা করা যাবে না। যদিও সে সকল জিনিসের প্রয়োজন রয়েছে। ঘরের ছাদে ব্যবহার করার গাছ-পালার ব্যাপারে মতভেদ অনেক তীব্র। প্রয়োজনের জন্যই ইজখের কাটার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলোও সে রকম প্রয়োজনীয়। তাই দুটো মতকেই সামনে রেখে চিন্তা করা দরকার।
গাছের ডাল কেটে মেসওয়াক বানানোর ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। ইবনুল মোনজের বলেছেন, হারামের গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক বানানোর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। মুজাহিদ, আতা এবং আমর বিন দীনার এটাকে জায়েয বলেছেন। আবু সাত্তার ইমাম শাফেয়ী (র) থেকেও অনুরূপ একটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনুল মোনজের বলেন, হারাম এলাকার গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক বানানোর পক্ষে সরাসরি কোন দলিল প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোন জিনিসকে হারাম করা হলে, সেই জিনিসের অল্প-বেশী সকল অংশই হারাম হয়ে যায়। ইবনে আবি শায়বা, তাঁর বইতে লাইস এর বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে, আতা মেসওয়াক বানানো এবং سِنَا নামক গাছ কাটাকে জায়েয বলেছেন এবং মুজাহিদ সেটাকে মাকরুহ বলেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ৪) মক্কায় যুদ্ধ-বিগ্রহ

📄 ৪) মক্কায় যুদ্ধ-বিগ্রহ


মক্কায় যুদ্ধ করা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, إِنَّهَا لَمْ تُحَلُّ لِي الْأَسَاعَةَ -مِنْ نَهَارٍ মক্কায় আমার জন্য দিনের ১টি ঘন্টা যুদ্ধের উদ্দেশ্যে হালাল করা হয়েছিল। মক্কায় হত্যা ও রক্তপাত করা যাবে কিনা এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার গভর্ণর আমর বিন সাঈদ, মক্কায় আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্ধেশ্যে যখন সেনাবাহিনী পাঠাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন আবু শোরাইহ বললেন, হে গভর্নর, আমি আমার দুই কানে এমন একটি হাদীস শুনেছি যা আমার পুরো স্মরণ রয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, إِنَّ مَكَّةَ حَرَّمَهَا اللَّهُ وَلَمْ يُحَرِّمْهَا النَّاسُ فَلَا يَحِلُّ لِامْرِيءِ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِانْ يُسْفِكَ بِهَادَمَا وَلَا يَعْضُدُ بِهَا شَجَرَةً فَإِنْ أَحَدُ تَرَخَّصَ بِقِتَالِ رَسُولِ اللَّهِ فِيهَا فَقُولُوا : إِنَّ اللَّهَ عَزَّوجَلٌ أَذِنَ لِرَسُولِهِ وَلَمْ يَأْذَنْ لَكُمْ وَإِنَّمَا أَذِنَ لِي فِيْهَا سَاعَةً مِّنْ نَهَارٍ ثُمَّ عَادَتْ حُرْمَتُهَا الْيَوْمَ كَحُرْمَتِهَا بِالْأَمْسِ فَلْيُبَلِّغ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ فَقَالَ عَمَرُوبْنُ سَعِيدٍ أَنَا أَعْلَمُ مِنْكَ يَا أَبَا شُرَيْحٍ لَا تُعِيْدُ عَاصِيًّا وَلَا فَارًا بِدَمٍ وَلَا فَارًا بِخَرِبَةٍ الخ . অর্থ: নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তায়ালাই মক্কাকে সম্মানিত করেছেন, কোন মানুষ তা করেনি। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য এই হারাম সীমানার ভেতর রক্তপাত করা এবং এখানকার গাছ-পালা কাটা জায়েয নেই। কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুদ্ধের বরাত দিয়ে এখানে যুদ্ধ ও রক্তপাত করাকে বৈধ বলে মনে করে, তাহলে তোমরা বলবে যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্যই এটাকে বৈধ করেছিলেন, তোমাদের জন্য বৈধ করেননি। তাও আমার উদ্দেশ্যে দিনের ১ ঘন্টার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন এবং পুনরায় গতকালকের মতই তার মর্যাদা ও সম্মান আজ ফিরে এসেছে। তোমাদের উপস্থিত লোকেরা অনুপস্থিত ও অনাগত লোকদের নিকট এই বাণী পৌছাবে।" এর জবাবে আমর বিন সাঈদ বলেন, হে আবু শোরাইহ! এ ব্যাপারে আমি তোমার চাইতে বেশী জানি। তবে মক্কা কোন অপরাধীকে কিংবা খুনী ব্যক্তিকে অথবা ভাগুড়ে দুষ্কৃতিকারীকে আশ্রয় দেয় না।
যারাকশী বলেন, আবু শোরাইহ এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করে বলেছেন, মক্কায় হত্যা-লড়াই নিষিদ্ধ, যেন এর সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়। পক্ষান্তরে আমর বিন সাঈদ এই হাদীসকে বিশেষ অর্থে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমর এ প্রসঙ্গে আবু শোরাইহকে যা বলেছেন, তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেননা, আবু শোরাইহ হারামে মক্কীতে, বহিরাগত কোন ভাগুড়ে খুনী ব্যক্তির শাস্তির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেননি। তিনি বিরোধিতা করেছিলেন শুধুমাত্র আমরের মক্কায় অশ্বারোহী অভিযানের এবং মক্কার সম্মান ও মর্যাদাকে নষ্ট করে সেখানে তাঁর যুদ্ধের পরিকল্পনার। এক্ষেত্রে আবু শোরাইহ উত্তম প্রমাণ পেশ করেছেন এবং আমরকে সংশোধন করার চেষ্টা করেছেন।
যদি প্রশ্ন হয় যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পর, মক্কায় মোশরেক এবং খোদাদ্রোহী শক্তির ক্ষমতা লাভ অথবা অধিকতর বাধাপ্রাপ্ত হলে এর বিরুদ্ধে লড়াই করা জায়েয আছে, তাহলে মক্কার লড়াই-হত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মধ্যে ফায়দা কি? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে মক্কার সম্মানের প্রতি বিশেষ তাকিদ দেয়া হয়েছে এবং অন্যান্য স্থানের তুলনায় এর ফজীলত ও মর্যাদাকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এখানে যুদ্ধ করার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এর পরও অধিকাংশ ফেকাহবিদ তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে জায়েয বলেছেন।
মুহিব তাবারী القرى বইতে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাণী 'আমার পরে আর কারো জন্য এই শহরকে বৈধ করা হবে না।' এর অর্থ হল যুদ্ধ ও হত্যা-লড়াইকে এখানে হারাম করা হয়েছে।
আল্লামা যারাকশী এই মাসয়ালার সমাধান দিয়েছেন এবং এ সম্পর্কিত সকল হাদীসগুলো একত্র করে বিপরীতমুখী হাদীসগুলোর উত্তর দিয়ে মক্কার জন্য লড়াই-যুদ্ধকে বিশেষভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়কে প্রমাণ করে দিয়েছেন।
মক্কার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যদি কাফের ও বিদ্রোহীরা মক্কার বাইরে ঘাঁটি তৈরি করে অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের অস্ত্র ও পদ্ধতি ব্যবহার করে যুদ্ধ করা যাবে। কিন্তু যদি মক্কার ভেতর ঘাঁটি তৈরি করে অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সকল অস্ত্র ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে যুদ্ধ করা যাবে না। ইমাম শাফেয়ী (র) তাঁর কিতাব ‘কিতাবুল உம்’ এর মধ্যেও একথা উল্লেখ করেছেন।
তবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে একদল আলেমের মত হচ্ছে, তা হারাম। তাঁরা বলেন, বিদ্রোহীদের উপর বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
যারাকশী আল মাওয়ারদীর বরাত দিয়ে লিখেছেন, অধিকাংশ ফেকাহবিদের মতে যুদ্ধ ছাড়া যদি বিদ্রোহীদেরকে তাড়ানো না যায়, তাহলে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে। কেননা, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার। হারাম এলাকায় সেই অধিকারকে রক্ষা করা অধিক উত্তম।
আবু শোরাইহ সহ অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীসসমূহে হারামে যুদ্ধ নিষেধের ব্যাপারে কেউ কেউ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, হারাম এলাকায় যুদ্ধ সংঘটিত করা এবং মেনজানিকসহ আধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করাকে এ সকল হাদীসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শর্ত হল, যদি অস্ত্র প্রয়োগ করা ছাড়া অন্যভাবে সংশোধন করা সম্ভব না হয়। হাঁ, তবে কাফেররা যদি অন্য শহরে দুর্গ গড়ে তোলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের সমরাস্ত্র দ্বারা যুদ্ধ করা যাবে।
শেখ আবুল ফতেহ আল কুশাইরী এই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আপত্তি করে বলেছেন, এটা বাহ্যিক অর্থের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, স্বয়ং নবী করীম (সা) এর জন্যই যেখানে এক ঘন্টা হালাল করে দেয়া হয়েছিল, অন্যদের জন্য সেখানে কি করে যুদ্ধ হালাল হয়? এবং রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধ বলতে যে কোন যুদ্ধকে হারাম ঘোষণা করেছেন। সে যুদ্ধে যে ধরনের অস্ত্রই ব্যবহার করা হউক না কেন। যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম করার উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কার সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা। মূলকথা হচ্ছে এ বিষয়টিতে বিভিন্ন প্রকার দলীল প্রমাণের কারণে মতভেদ রয়েছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ৫) মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা

📄 ৫) মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা


হত্যার কারণে কেসাসের শাস্তি হিসাবে হত্যা, জ্বেনার কারণে পাথর নিক্ষেপ করে মারা অথবা অন্য কোন অপরাধের কারণে শরীয়তের ফয়সালা মোতাবেক মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি যদি হারামে আশ্রয় নেয়, তাহলে, সে ব্যক্তির ঐ শাস্তি কার্যকর করার ব্যাপারে আলেমদের তিনটি মত রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেঃ
(ক) হারামে অবস্থান করা পর্যন্ত সেই ব্যক্তি নিরাপদ। কেননা কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেছেন (আলে ইমরান ৯৬) مَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا 'যে ব্যক্তি হারামে ঢুকে সে নিরাপদ।' এ ছাড়াও হাদীসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে তার জন্য হারামে রক্ত প্রবাহিত করা জায়েয নেই।' তবে সেই ব্যক্তিকে কোনঠাসা করে রাখতে হবে, তার সাথে কথা বলা যাবে না। খাবার দেয়া যাবে না এবং কোন প্রকার লেনদেনও করা যাবে না। যেন সে হারাম থেকে বের হতে বাধ্য হয় এবং তার বিরুদ্ধে কেসাস, হদ বা অন্যান্য শাস্তি কার্যকর করা যায়। ইমাম আবু হানীফা (র)ও এই একই মত পোষণ করেন বলে এক বর্ণনায় এসেছে। আমর বিন আব্বাস, সাঈদ বিন যোবায়ের, হাকাম বিন আতিয়‍্যা এবং জাহেরিয়াদেরও এই মত। ইমাম আহমদও এই মতের অনুসারী বলে অপর এক বর্ণনায় জানা যায়। আবু যোবায়ের আলমক্কী বলেছেন, যদি আমি হারামে আমার পিতার হত্যাকারীকেও পাই, তথাপি তার সাথে কোন কথা বলবো না।
(খ) হত্যাকারী ব্যক্তিও যদি হারামে প্রবেশ করে, বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কেসাস বা মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যাবে না। কিন্তু কেসাস ব্যতীত অন্য যে কোন দণ্ড প্রদান করা যাবে। ইমাম আহমদ এবং ইমাম আবু হানীফা থেকে এ মর্মে একটি বর্ণনা রয়েছে।
(গ) হারামে মৃত্যুদণ্ড সহ অন্যান্য দণ্ড কার্যকর করা জায়েয। ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ীর এই মত। তাঁদের প্রমাণ হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত وَلَا تَقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ - (البقره : ۱۹۱) অর্থ: 'তোমাদের সাথে লড়াই না করলে, মসজিদে হারামে তোমরাও তাদের সাথে লড়াই করো না। এখানে লড়াই করলে তার মোকাবিলায় লড়াই বা হত্যা করা যাবে বলে বলা হয়েছে। যারাকশী ইবনুল মোনজের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, 'কাবা শরীফের গেলাফ ধরে থাকা অবস্থায় ইবনে খাতালকে হত্যা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) নির্দেশ দিয়েছেন' এর উপর ভিত্তি করে ইমাম মালেকও হারামে কেসাস এং হদ কায়েম করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়াও এই মতের পক্ষে বুখারী শরীফে হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত হাদীসটিও সহায়ক।
عَنْ عَائِشَةَ رَض أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ قَالَ : خَمْسٌ مِّنَ الدَّوابِ كُلُّهُنَّ فَاسِقٌ يُقْتَلْنَ فِي الْحَرَمِ الْغُرَابُ وَالْحِداةُ والْعَقْرَبُ وَالفَارَّةُ وَالْكَلْبُ الْعَقُورُ .
অর্থঃ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ৫টি প্রাণী ফাসেক বা বিদ্রোহী। হারাম এলাকায় এগুলোকে যেন হত্যা করা হয়। সেগুলো হচ্ছে কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও ক্ষতিকর কুকুর।
কিন্তু আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী বলেছেন যে, فسق অর্থ হচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া। হারামে নিষিদ্ধ প্রাণীগুলো থেকে এগুলোর হুকুম ব্যতিক্রম এবং এগুলোকে হত্যা করা যাবে। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীকে হত্যা করা যাবে না। আল্লামা যারাকশী বলেছেন, এই পাঁচটি প্রাণী কষ্টদায়ক বলে এদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ এগুলো ছোট ক্ষতিকারক প্রাণী। কিন্তু হত্যাকারী ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত আরো বেশী ক্ষতিকারক। তাই বড় ক্ষতিকারক প্রাণীকে হত্যা করতে কোন বাধা নেই।
হযরত আবু শোরাইহর হাদীসে এসেছে যে, হারাম কোন হত্যাকারীকে অথবা খুনের দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেয় না। তাঁর বর্ণিত হাদীসে لا يَسْفَكُ دَمًا কে এক্ষেত্রে এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। কেননা, এর অর্থ হচ্ছে 'অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহিত করা। কুরআন মজীদেও অনুরূপ অর্থে سَفَك শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন: আল্লাহ বলেছেন, أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ ( البقره : ٣٠) অর্থঃ (ফেরেশতারা আল্লাহকে বলল) 'হে আল্লাহ, আপনি কি যমীনে এমন লোকদেরকে তৈরি করবেন যারা এখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং অন্যায়ভাবে রক্ত প্রবাহিত করবে?' আল্লাহর এই বাণীর وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ امَنًا (আলে ইমরান) 'যে হারামে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ' তাৎপর্য হচ্ছে: আল্লাহ খবর দিচ্ছেন যে, জাহেলিয়াতের যুগ থেকে হারামের এই নিরাপত্তা মক্কাবাসীদের জন্য এক বিরাট নেয়ামত।
যদি কেউ মসজিদে হারাম অথবা অন্য কোন মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করে তাহলে তাকে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে বের করতে হবে এবং হত্যা করতে হবে।
এই সকল আলোচনা দ্বারা একটা কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কোন ব্যক্তি যদি হারাম এলাকায় অপরাধ করে, তাহলে, তা এই মতভেদের আওতায় পড়ে না। বরং ইবনুল জাওযী বলেছেন, এর উপরই ইজমা হয়েছে। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি দুঃসাহস এবং আল্লাহর ঘরের বেইজ্জত ও আল্লাহর প্রতি কুফরী করা হয়। আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ يُرِدْ فِيْهِ بِالْحَادِ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ - (الحج : ٢٥)
অর্থ: কেউ যদি এতে জুলুমের মাধ্যমে কুফরী করে তাকে আমরা কষ্টদায়ক আযাবের স্বাদ গ্রহণ করাবো'

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ৬) হারামে মক্কায় দিয়াহ বা কঠোর রক্তপণ

📄 ৬) হারামে মক্কায় দিয়াহ বা কঠোর রক্তপণ


কেউ হারাম এলাকায় কাউকে হত্যা করলে তার উপর রক্তপণ বা দিয়াহ ফরয হবে। তবে তা হবে অন্য দিয়াহ থেকে অপেক্ষাকৃত কঠোর। কেননা হারাম এলাকায় পশু শিকার করলেও কঠোর কাফফারা দিতে হয়। তাই মানুষকে হত্যা করা হলে সে ক্ষেত্রে দিয়াহ আরো কঠিন হবে এটাই স্বাভাবিক। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং শাস্তির কঠোরতার ব্যাপারে হারাম শরীফের প্রভাব ক্রিয়াশীল। কেউ যদি ভুলবশতঃ হত্যা করে তারপরও দিয়াহ কঠোর হবে। চাই হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তিদ্বয়ের দু'জনই হারাম এলাকার অধিবাসী হউক, অথবা দু'জনের একজন হারাম এলাকার আর অন্যজন বাইরের, তাতে কোন পার্থক্য সৃষ্টি হবে না। হারাম এলাকায় হত্যা সংঘটিত হলেই তাকে কঠোরভাবে গ্রহণ করতে হবে।
কঠোরতার পরিমাণের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। ইবনুল মোনজের বলেছেন, হযরত উমর ফারুক (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন : যে ব্যক্তি হারাম এলাকায় কিংবা হারাম মাসগুলোতে কাউকে হত্যা করে, তার উপর একটি পুরো দিয়াহ এবং আরেক দিয়াহর ভাগ প্রদানের কঠোর হুকুম কার্যকর হবে। সাঈদ বিন আল মুসাইয়েব, আতা বিন আবি রেবাহ, সোলায়মান বিন ইয়াসার এবং আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ উলামায়ে কেরাম এই মতই পোষণ করেন। তবে, আরেক দল আলেমের মতে, হারাম এলাকায় সংঘটিত হত্যার জন্য কঠোরতর দিয়াহ প্রযোজ্য হবে না। হাসান বসরী, ইমাম শা'বী এবং নাখয়ী এই দলের অন্তর্ভুক্ত। ইবনুল মোনজের বলেছেন, আমাদের মতও তাই। বিশ্বের সর্বত্র সকল মানুষের উপর আল্লাহর আইন একই ধরনের প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00