📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ১) হারাম এলাকায় শিকার করা

📄 ১) হারাম এলাকায় শিকার করা


মোহরেম ব্যক্তি কিংবা অমোহরেম ব্যক্তি নির্বিশেষে, সকলের জন্য হারাম এলাকার ভেতরে শিকার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : وَلَا يُنْفَرُصَيدَهَا এর শিকারকে তাড়ানো যাবে না। শিকারকে তাড়ানো না গেলে, সেখানে শিকার করার কোন প্রশ্নই উঠে না। সকল আলেম এই মাসআলার ব্যাপারে একমত। হারাম এলাকার সম্মানের কারণেই শিকার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেউ কেউ এখানে শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার ভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। তবে তাদের ঐ ভিন্ন কারণের পেছনে কোন প্রমাণ নেই। আল্লামা যারাকশী তাঁর اعلام المساجد বইতে লিখেছেন, নবী করীম (সা) যখন হিজরতের সময় সাওর পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিলেন, তখন মাকড়সা গর্তের মুখে জাল বুনল। আল্লাহ এক কবুতরীকে সে জালের উপর ডিম পাড়ার নির্দেশ দিলেন। কবুতরীটি ডিম দেয়ার পর ডিমের উপর শুয়ে রইল। কাফেররা তা দেখে ফিরে গেল এবং গর্তের ভেতরে লক্ষ্য করল না। এক বর্ণনায় এসেছে যে, হারাম এলাকার কবুতরগুলো এ কবুতরীর বংশধর। বাজ্জার কর্তৃক লিখিত مسند কিতাবের বরাত দিয়ে সোহায়লী তাঁর الروض الانف নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ গর্তের জালের উপর ডিম দেয়ার জন্য দুটো বন্য কবুতরীকে নির্দেশ দেন। এর ফলে কাফেররা গর্তের ভেতর নজর না করে ফিরে আসে। মক্কার কবুতরগুলো সেই দুটো কবুতরের বংশধর। এজন্য হারাম এলাকার কবুতরগুলোর সম্মানার্থে ঐ কবুতরগুলো শিকার করা হারাম করা হয়েছে। হালাল এলাকার বাইরে থেকে শিকার করে, হারাম এলাকায় ঢুকানোর ব্যাপারে, ইবনুল মোনজের বলেছেন যে, ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, আয়িশা, আ'তা, তাউস, আহমদ, ইসহাক ও অন্যান্য চিন্তাবিদরা এটাকে মাকরূহ বলেছেন। তবে জাবের বিন আবদুল্লাহ, সাঈদ বিন যোবায়ের, মুজাহিদ, মালেক, শাফেঈ ও আবু সাওর এটাকে জায়েয বলেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ২) মক্কায় পড়ে থাকা জিনিসের হুকুম

📄 ২) মক্কায় পড়ে থাকা জিনিসের হুকুম


মক্কা শহরের হারাম এলাকায় পড়ে থাকা কোন জিনিসের মালিকানা অর্জন করা জায়েয নেই। তবে পড়ে থাকা জিনিসের হেফাজত কিংবা সে সম্পর্কে ঘোষণা ও প্রচারের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে, পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে। পৃথিবীর অন্যান্য এলাকা ও শহরে পড়ে থাকা জিনিসের হুকুম এর চেয়ে ভিন্ন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন নবী করীম (সা) বলেছেন:
اِنَّ هَذَا الْبَلَدَ حَرَّمَهُ اللهُ لاَ يُعْضَلُ شَوْكُهُ وَلَا يُنْفَرُ صَيْدُهُ وَلَا تُلْتَقَطُ لُقْطَتُهُ إِلَّا مَنْ عَرَّفَهَا -
অর্থ: আল্লাহ এই শহরকে সম্মানিত করেছেন; ফলে এই শহরের কাঁটাগাছ পর্যন্ত কাটা যাবে না, এখানকার শিকারকে শিকারের উদ্দেশ্যে তাড়ানো যাবে না এবং প্রচার ও ঘোষণার উদ্দেশ্য ব্যতীত এই শহরের পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে না। (মুসনাদে আহমদ) আবদুর রহমান বিন উসমান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হাজীদের পড়ে থাকা ও হারানো জিনিস কুড়াতে নিষেধ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (র) বলেছেন, হারাম এলাকার পতিত জিনিসের মালিক হওয়া যাবে না। তবে ঘোষণা কিংবা প্রচারের উদ্দেশ্যে তা উঠানো যাবে। অন্য তিন ইমামের মতে, হারাম এলাকার পড়ে থাকা জিনিসের হুকুম, অন্যান্য এলাকার পড়ে থাকা জিনিসের হুকুমেরই অনুরূপ।
মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুর রহমান বিন উসমান থেকে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, "রাসূলুল্লাহ (সা) হাজীদের পড়ে থাকা জিনিস উঠাতে নিষেধ করেছেন।” মক্কা যেহেতু বিশেষ সওয়াব ও এবাদতের জায়গা, সেহেতু লোকেরা হয়তো আবার এখানে ফিরে আসতে পারে। বিচিত্র নয় যে, পড়ে থাকা জিনিসের মালিকই স্বয়ং আসতে পারে কিংবা কারুর মাধ্যমে সে তার হারিয়ে যাওয়া জিনিসের খোঁজ নিতে পারে। মসজিদে হারাম বিশ্ব মুসলিমের মিলনকেন্দ্র হওয়ায় এই ব্যাপারে হারানো বা পড়ে থাকা জিনিসের হুকুম অন্য জায়গায় পড়ে থাকা জিনিসের হুকুমের চেয়ে বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখাটা স্বাভাবিক।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ৩) হারাম এলাকায় গাছ কাটা

📄 ৩) হারাম এলাকায় গাছ কাটা


হারাম এলাকার গাছ কাটা নিষিদ্ধ। নবী করীম (সা) বলেছেন, وَلَا يُعْضَدُ شجرها অর্থাৎ হারাম এলাকার গাছ কাটা যাবে না। কোরাইশদের কাছে হারাম এলাকার সম্মানের বিষয়টি জানা ছিল। তারা এই হারামের সম্মান রক্ষা করে চলত। কোরাইশরা যখন নির্মাণ কাজের ইচ্ছা করল তখন তারা কুসাইকে জিজ্ঞাসা করল, আমরা হারাম এলাকার গাছ দিয়ে কিভাবে নির্মাণ কাজ করবো? সর্বপ্রথম হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের হারাম এলাকার গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি মক্কার কুয়াইকাআন পাহাড়ে ঘর তৈরির সময় প্রতিটি কাটা গাছের বিনিময়ে একটি গরু দান করেছেন। হযরত উমর (রা) আসাদ বিন আবদুল ওজ্জার ঘরে অবস্থিত একটি গাছ কেটেছেন বলে এক বর্ণনায় এসেছে। গাছটি কা'বা শরীফের নিকটবর্তী ছিল এবং তওয়াফকারীদের কাপড় এতে আটকে যেত। তখনও মসজিদে হারামকে সম্প্রসারিত করা হয়নি। হযরত উমর সেই গাছটি কেটে ফেলেন এবং এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি গরু সদকা করেন।
ইমাম মালেক (র) এর মাজহাবে, দুই হারাম শরীফের গাছ কাটলে কোন ফিদইয়া দেয়া জরুরী নয়। ইমাম মালেককে তাঁর এই রায় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি তা জানিনা। যারা আমার সম্পর্কে এ রকম বলেছে, তারা ঠিক করেনি। তবে আমি একথা বলি যে, যারা গাছ কাটবে তারা যেন আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করে বা গুনাহ মাফ চায়। ইবনুল মোনজেরের কথা থেকেও একথার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি কুরআন, হাদীস ও ইজমা থেকে গাছ কাটার বিনিময়ে কোন ফিদইয়া নেয়াকে ফরজ কিংবা ওয়াজিব হিসেবে দেখতে পাইনি। তবে এক্ষেত্রে, ইমাম মালেক (র) যা বলেছেন, আমিও তাই বলবো। সেটা হচ্ছে: এজন্য আমরা আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাবো।
ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আবু হানীফা (র) মক্কার হারাম এলাকার গাছ কাটার বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়াকে ফরজ বলেছেন। ইমাম শাফেয়ীর মতে, বড় গাছ কাটলে গরু এবং ছোট গাছ কাটলে ছাগল বা ভেড়া ফিদইয়া দিতে হবে। ইমাম আবু হানীফা (র) এর মতে, গাছের মূল্য পরিমাণ ফিদইয়া দিতে হবে।
ইবনুল মোনজের বলেছেন, তিনি যে আলেমদের নাম জানেন, তারা সবাই হারাম সীমান্তের ভেতরের সবজি, তরি-তরকারি ও ফুল তোলাকে জায়েয বলেছেন।
সোহায়লী বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা (র) হারাম এলাকায় বিনা চাষে উৎপাদিত গাছ এবং চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত গাছের হুকুমের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বিনা চাষে উৎপাদিত গাছে ফিদইয়া লাগবে এবং চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত গাছের ফিদইয়া লাগবে না।
তবে হারাম এলাকার নিষিদ্ধ গাছগুলো থেকে যেগুলো ব্যতিক্রম এবং যেগুলো কাটার হুকুম রয়েছে সেগুলো হচ্ছে:
(ক) ইজখের: এটা মক্কার বহুল পরিচিত গাছ।
(খ) কাঁটাযুক্ত গাছ। কিন্তু একটি মশহুর হাদীসে কাঁটাযুক্ত গাছ না কাটারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেটি হচ্ছে "لا يعضد شوكه" উলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, ঐ হাদীসে কাঁটা বলতে, উট যে সকল কাঁটাযুক্ত গাছ খায় সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে। তবে কষ্টদায়ক জিনিস যেমন কাঁটাযুক্ত গাছকাটা ও ক্ষতিকর পশু-পাখি মারার হুকুম অন্য হাদীসে রয়েছে।
যারাকশী বলেছেন, বেশীর ভাগ উলামায়ে কেরাম কাঁটাকে কষ্টদায়ক জিনিসের অন্তর্ভুক্ত ধরে নিয়ে বলেছেন, কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা নিষিদ্ধ নয়। তাঁরা কষ্টদায়ক পশু হত্যার হাদীসের উপর কেয়াস করে, এটাকে এর থেকে পৃথক মনে করেন। কিন্তু ইমাম নবওয়ী 'কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা হারাম'-এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্ণিত হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করাই উত্তম। শেখ আইনী এই কেয়াসকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং হারাম এলাকার গাছ কাটাকে নিষিদ্ধ বলেছেন।
(গ) হারাম এলাকার ভেতরের কৃষিজাত ফল-ফুল এবং সবজি ও তরকারি কাটা ও উঠানো নিষিদ্ধ নয়। ইবনুল মোনজের বলেছেন, আমি যে সকল উলামার কথা জানি, তারা সবাই এটাকে হালাল ও বৈধ বলেছেন। ইমাম খাত্তাবী তার معالم السنن বইতে লিখেছেন, সোহায়লী, ইমাম আবু হানিফা (র) এর বরাত দিয়ে বলেছেন যে, চাষের ফলে ও বিনা চাষে উৎপন্ন উদ্ভিদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিনা চাষে উৎপাদিত ফসলের যা মূল্য আসে, তা হিসেব করে ফিদইয়া দিতে হবে এবং মানুষের উৎপাদিত ফসলাদি কাটলে, তার বিনিময়ে কিছু দিতে হবে না। ইমাম নবওয়ীও একই মতের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, আলেমরা বিনা চাষে উৎপাদিত ফল ও ফসল এবং গাছ-পালা কাটাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
(ঘ) গৃহপালিত পশুর খাবারের জন্য ঘাস ও গাছ-পালা কাটা জায়েয আছে। এটাই বিশুদ্ধ মত। যারাকশী বলেছেন, মূলতঃ পশুর খাদ্যের প্রয়োজনেই হারাম এলাকার ঘাস কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি তা পশুর খাবারের জন্য কাটা হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ হবে না। তাঁর মতে, সাহাবায়ে কেরাম হারাম সীমান্তের ভেতর উট প্রবেশ করিয়েছিলেন। সেই উটগুলো এর ঘাসে চরেছে। ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্যই ইজখেরের মত এটাকেও হালাল করা হয়েছে। ইমাম খাত্তাবী معالم السنن বইতে লিখেছেন যে, ইবনুল মোনজের, ইমাম শাফেয়ী (র) থেকে বর্ণনা করেছেন, হারাম সীমানার ভেতর পশুচারণ নিষিদ্ধ নয়।
(ঙ) হারাম এলাকার যে সকল গাছ-পালা ওষুধের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় বিশুদ্ধ মতে, সেগুলো কাটা হারাম নয়। কেননা, ইজখেরের প্রয়োজনের চেয়ে এগুলোর প্রয়োজন আরো বেশী। অথচ শরীয়ত ইজখেরের অনুমতি দিয়েছে। তাই ঐগুলোও জায়েয হবে। ইবনুল মোনজের উল্লেখ করেছেন, শেখ আতা তাঁর বাগান থেকে سنا নামক গাছের পাতা তোলার অনুমতি দিয়েছিলেন।
এ সকল অনুমতির পাশাপাশি এর বিরোধী মতের প্রতিও দৃষ্টি দেয়া দরকার। এক মতে বলা হয়েছে যে, ইজখেরের সাথে অন্য কোন কিছুকে তুলনা করা যাবে না। যদিও সে সকল জিনিসের প্রয়োজন রয়েছে। ঘরের ছাদে ব্যবহার করার গাছ-পালার ব্যাপারে মতভেদ অনেক তীব্র। প্রয়োজনের জন্যই ইজখের কাটার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলোও সে রকম প্রয়োজনীয়। তাই দুটো মতকেই সামনে রেখে চিন্তা করা দরকার।
গাছের ডাল কেটে মেসওয়াক বানানোর ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। ইবনুল মোনজের বলেছেন, হারামের গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক বানানোর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। মুজাহিদ, আতা এবং আমর বিন দীনার এটাকে জায়েয বলেছেন। আবু সাত্তার ইমাম শাফেয়ী (র) থেকেও অনুরূপ একটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনুল মোনজের বলেন, হারাম এলাকার গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক বানানোর পক্ষে সরাসরি কোন দলিল প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোন জিনিসকে হারাম করা হলে, সেই জিনিসের অল্প-বেশী সকল অংশই হারাম হয়ে যায়। ইবনে আবি শায়বা, তাঁর বইতে লাইস এর বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে, আতা মেসওয়াক বানানো এবং سِنَا নামক গাছ কাটাকে জায়েয বলেছেন এবং মুজাহিদ সেটাকে মাকরুহ বলেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ৪) মক্কায় যুদ্ধ-বিগ্রহ

📄 ৪) মক্কায় যুদ্ধ-বিগ্রহ


মক্কায় যুদ্ধ করা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, إِنَّهَا لَمْ تُحَلُّ لِي الْأَسَاعَةَ -مِنْ نَهَارٍ মক্কায় আমার জন্য দিনের ১টি ঘন্টা যুদ্ধের উদ্দেশ্যে হালাল করা হয়েছিল। মক্কায় হত্যা ও রক্তপাত করা যাবে কিনা এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার গভর্ণর আমর বিন সাঈদ, মক্কায় আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্ধেশ্যে যখন সেনাবাহিনী পাঠাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন আবু শোরাইহ বললেন, হে গভর্নর, আমি আমার দুই কানে এমন একটি হাদীস শুনেছি যা আমার পুরো স্মরণ রয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, إِنَّ مَكَّةَ حَرَّمَهَا اللَّهُ وَلَمْ يُحَرِّمْهَا النَّاسُ فَلَا يَحِلُّ لِامْرِيءِ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِانْ يُسْفِكَ بِهَادَمَا وَلَا يَعْضُدُ بِهَا شَجَرَةً فَإِنْ أَحَدُ تَرَخَّصَ بِقِتَالِ رَسُولِ اللَّهِ فِيهَا فَقُولُوا : إِنَّ اللَّهَ عَزَّوجَلٌ أَذِنَ لِرَسُولِهِ وَلَمْ يَأْذَنْ لَكُمْ وَإِنَّمَا أَذِنَ لِي فِيْهَا سَاعَةً مِّنْ نَهَارٍ ثُمَّ عَادَتْ حُرْمَتُهَا الْيَوْمَ كَحُرْمَتِهَا بِالْأَمْسِ فَلْيُبَلِّغ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ فَقَالَ عَمَرُوبْنُ سَعِيدٍ أَنَا أَعْلَمُ مِنْكَ يَا أَبَا شُرَيْحٍ لَا تُعِيْدُ عَاصِيًّا وَلَا فَارًا بِدَمٍ وَلَا فَارًا بِخَرِبَةٍ الخ . অর্থ: নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তায়ালাই মক্কাকে সম্মানিত করেছেন, কোন মানুষ তা করেনি। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য এই হারাম সীমানার ভেতর রক্তপাত করা এবং এখানকার গাছ-পালা কাটা জায়েয নেই। কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুদ্ধের বরাত দিয়ে এখানে যুদ্ধ ও রক্তপাত করাকে বৈধ বলে মনে করে, তাহলে তোমরা বলবে যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্যই এটাকে বৈধ করেছিলেন, তোমাদের জন্য বৈধ করেননি। তাও আমার উদ্দেশ্যে দিনের ১ ঘন্টার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন এবং পুনরায় গতকালকের মতই তার মর্যাদা ও সম্মান আজ ফিরে এসেছে। তোমাদের উপস্থিত লোকেরা অনুপস্থিত ও অনাগত লোকদের নিকট এই বাণী পৌছাবে।" এর জবাবে আমর বিন সাঈদ বলেন, হে আবু শোরাইহ! এ ব্যাপারে আমি তোমার চাইতে বেশী জানি। তবে মক্কা কোন অপরাধীকে কিংবা খুনী ব্যক্তিকে অথবা ভাগুড়ে দুষ্কৃতিকারীকে আশ্রয় দেয় না।
যারাকশী বলেন, আবু শোরাইহ এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করে বলেছেন, মক্কায় হত্যা-লড়াই নিষিদ্ধ, যেন এর সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়। পক্ষান্তরে আমর বিন সাঈদ এই হাদীসকে বিশেষ অর্থে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমর এ প্রসঙ্গে আবু শোরাইহকে যা বলেছেন, তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেননা, আবু শোরাইহ হারামে মক্কীতে, বহিরাগত কোন ভাগুড়ে খুনী ব্যক্তির শাস্তির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেননি। তিনি বিরোধিতা করেছিলেন শুধুমাত্র আমরের মক্কায় অশ্বারোহী অভিযানের এবং মক্কার সম্মান ও মর্যাদাকে নষ্ট করে সেখানে তাঁর যুদ্ধের পরিকল্পনার। এক্ষেত্রে আবু শোরাইহ উত্তম প্রমাণ পেশ করেছেন এবং আমরকে সংশোধন করার চেষ্টা করেছেন।
যদি প্রশ্ন হয় যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পর, মক্কায় মোশরেক এবং খোদাদ্রোহী শক্তির ক্ষমতা লাভ অথবা অধিকতর বাধাপ্রাপ্ত হলে এর বিরুদ্ধে লড়াই করা জায়েয আছে, তাহলে মক্কার লড়াই-হত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মধ্যে ফায়দা কি? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে মক্কার সম্মানের প্রতি বিশেষ তাকিদ দেয়া হয়েছে এবং অন্যান্য স্থানের তুলনায় এর ফজীলত ও মর্যাদাকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এখানে যুদ্ধ করার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এর পরও অধিকাংশ ফেকাহবিদ তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে জায়েয বলেছেন।
মুহিব তাবারী القرى বইতে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাণী 'আমার পরে আর কারো জন্য এই শহরকে বৈধ করা হবে না।' এর অর্থ হল যুদ্ধ ও হত্যা-লড়াইকে এখানে হারাম করা হয়েছে।
আল্লামা যারাকশী এই মাসয়ালার সমাধান দিয়েছেন এবং এ সম্পর্কিত সকল হাদীসগুলো একত্র করে বিপরীতমুখী হাদীসগুলোর উত্তর দিয়ে মক্কার জন্য লড়াই-যুদ্ধকে বিশেষভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়কে প্রমাণ করে দিয়েছেন।
মক্কার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যদি কাফের ও বিদ্রোহীরা মক্কার বাইরে ঘাঁটি তৈরি করে অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের অস্ত্র ও পদ্ধতি ব্যবহার করে যুদ্ধ করা যাবে। কিন্তু যদি মক্কার ভেতর ঘাঁটি তৈরি করে অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সকল অস্ত্র ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে যুদ্ধ করা যাবে না। ইমাম শাফেয়ী (র) তাঁর কিতাব ‘কিতাবুল உம்’ এর মধ্যেও একথা উল্লেখ করেছেন।
তবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে একদল আলেমের মত হচ্ছে, তা হারাম। তাঁরা বলেন, বিদ্রোহীদের উপর বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
যারাকশী আল মাওয়ারদীর বরাত দিয়ে লিখেছেন, অধিকাংশ ফেকাহবিদের মতে যুদ্ধ ছাড়া যদি বিদ্রোহীদেরকে তাড়ানো না যায়, তাহলে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে। কেননা, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার। হারাম এলাকায় সেই অধিকারকে রক্ষা করা অধিক উত্তম।
আবু শোরাইহ সহ অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীসসমূহে হারামে যুদ্ধ নিষেধের ব্যাপারে কেউ কেউ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, হারাম এলাকায় যুদ্ধ সংঘটিত করা এবং মেনজানিকসহ আধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করাকে এ সকল হাদীসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শর্ত হল, যদি অস্ত্র প্রয়োগ করা ছাড়া অন্যভাবে সংশোধন করা সম্ভব না হয়। হাঁ, তবে কাফেররা যদি অন্য শহরে দুর্গ গড়ে তোলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের সমরাস্ত্র দ্বারা যুদ্ধ করা যাবে।
শেখ আবুল ফতেহ আল কুশাইরী এই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আপত্তি করে বলেছেন, এটা বাহ্যিক অর্থের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, স্বয়ং নবী করীম (সা) এর জন্যই যেখানে এক ঘন্টা হালাল করে দেয়া হয়েছিল, অন্যদের জন্য সেখানে কি করে যুদ্ধ হালাল হয়? এবং রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধ বলতে যে কোন যুদ্ধকে হারাম ঘোষণা করেছেন। সে যুদ্ধে যে ধরনের অস্ত্রই ব্যবহার করা হউক না কেন। যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম করার উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কার সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা। মূলকথা হচ্ছে এ বিষয়টিতে বিভিন্ন প্রকার দলীল প্রমাণের কারণে মতভেদ রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00