📄 হুদুদে হারামের (হারাম সীমানার) বর্ণনা
শাসক মুজাফফর নির্মাণ করেন এবং ৬৮৩ হিজরীতে ইয়েমেনের শাসক মুজাফফর নতুন করে ঐ দুটো পিলার পুনরায় নির্মাণ করেন। ইবনে হাজার তাঁর 'আল-ঈদাহ' কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, মুজাফফর আরাফাতের সীমানা নির্ধারণ করে তিনটি পিলার নির্মাণ করেন। এর আগে তিনি আরাফাতের সঠিক সীমানা চিহ্নিত করার জন্য আলেমদের একটি দলের মতামত নেন এবং তার ভিত্তিতে পিলার বসান। বর্তমান যুগে ঐ তিনটি পিলারের দুটো অবশিষ্ট আছে এবং মসজিদে নামেরা সংলগ্ন পিলারটি নেই। কবে এবং কারা ঐ পিলারটি ধ্বংস করল তারও কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আরাফাতের পশ্চিম সীমান্তে উরানা উপত্যকা রয়েছে। মসজিদে নামেরা উরানা উপত্যকা এবং আরাফাতের মাঝে অবস্থিত। সৌদী শাসনামলে, বাদশাহ সউদ বিন আবদুল আযিয এবং বাদশাহ খালেদ বিন আবদুল আযীযের সময়, আরাফাহ, শারায়ে' এবং শোমাইসীর হারাম এলাকার সীমানার পিলারগুলো পুনঃনির্মাণ করা হয়। বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীযের আমলে তানঈমের হারাম সীমান্তে একটি নতুন পিলার নির্মাণ করা হয় এবং পুরাতন পিলারটির সংস্কার করা হয়।
এখন আমরা হারাম সীমান্তের পিলার নির্মাণকারীদের একটি তালিকা পেশ করছি।
১. হযরত ইবরাহীম (আ) - প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। মন্তব্য: এখানে হযরত আদম (আ) এর কথা উল্লেখ করা হয়নি।
২. কুসাই বিন কিলাব - মন্তব্য: তিনি কোরাইশদের আগে একবার কা'বা সংস্কার করেছিলেন।
৩. কোরাইশ - হিজরতের আগে। মন্তব্য: কোরাইশরা পিলার পুনঃনির্মাণ করেছিল।
৪. রাসূলুল্লাহ (সা) - মক্কা বিজয়ের সময়। মন্তব্য: পিলার নির্মাণের আদেশ দেন।
৫. উমর বিন খাত্তাব (রা) - হিঃ ১৭ সনে।
৬. উসমান বিন আফফান - ২৬ হিজরী সনে।
৭. মুয়াওবিয়া (রা) - তারিখ জানা নেই।
৮. আবদুল মালেক বিন মারওয়ান।
৯. আল-মাহদী - ১৫৯ হিঃ (আব্বাসী খলীফা)।
১০. আররাদী বিল্লাহ - ৩২৫ হিঃ (আব্বাসী খলীফা)।
১১. আল-মোক্তাদির বিল্লাহ (আব্বাসী খলীফা)।
১২. মুজাফফর - ৬১৬ হিঃ অথবা আরবলের শাসক ৬২৯ হিঃ।
১৩. মুজাফফর - ৬৮৩ হিঃ (ইয়েমেনের শাসক)।
১৪. ১ম সুলতান আহমদ বিন মুহাম্মদ আল্ উসমানী - ১০২৩ হিঃ।
১৫. বাদশাহ সউদ বিন আঃ আযীয - ১৩৮৬ হিঃ। মন্তব্য: শোমাইসীতে জেদ্দাগামী পথে, ১৯ কিঃ মিঃ দূরত্বে দু'টো পিলার নির্মাণ করেন এবং একই বছর শারায়ে'তে অবস্থিত পিলারটিও পুনঃনির্মাণ করেন।
১৬. বাদশাহ খালেদ বিন আঃ আযীয - ১৩৯৯ হিঃ। মন্তব্য: তিনি আরাফার পিলারও নির্মাণ করেন এবং জেদ্দার পুরাতন রাস্তায়, শোমাইসীর দুটো পিলার নির্মাণ করেন।
১৭. বাদশাহ ফাহাদ বিন আঃ আযীয - ১৪০৬ হিঃ। মন্তব্য: তানঈমে নতুন পিলার নির্মাণ করেন এবং পুরাতনটির সংস্কার করেন।
আল্লামা তকী ফাসী বলেন, ঐতিহাসিকদের কাছে মসজিদে হারাম থেকে হারাম সীমান্তের পিলারসমূহের দূরত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট মতভেদ আছে। মসজিদে হারাম থেকে-
(ক) আরাফাতের পিলারের দূরত্ব সম্পর্কে ৪টি বক্তব্য আছে। সেগুলো হচ্ছে: ১৮ মাইল, ১১ মাইল, ৯ মাইল এবং ৭ মাইল।
(খ) নজদের দিকের সীমান্ত (সায়েল-তায়েফ সড়ক পথে) সম্পর্কে ৪টি বক্তব্য আছে। সেগুলো হল: ৬ মাইল, ৭ মাইল, ৮ মাইল এবং ১০ মাইল।
(গ) জো'রানার দিকের সীমান্তের ব্যাপারে ২টি বক্তব্য আছে। সেগুলো হচ্ছে, ৯ মাইল এবং ১২ মাইল।
(ঘ) তানঈমের দিকের সীমান্তের ব্যাপারে ৪টি বক্তব্য আছে। সেগুলো হচ্ছে: ৩ মাইল, পৌনে ৪ মাইল, ৪ মাইল এবং ৫ মাইল।
(ঙ) জেদ্দার পুরাতন রাস্তায় হোদায়বিয়ার দিকের সীমানা সম্পর্কে ২টি বক্তব্য আছে। সেগুলো হচ্ছে: ১০ মাইল এবং ১৮ মাইল।
(চ) ইয়েমেনের দিকের সীমানা সম্পর্কেও ২টি বক্তব্য আছে। সেগুলো হচ্ছেঃ ৬ মাইল এবং ৭ মাইল।
মসজিদে হারাম থেকে হারাম এলাকার দূরত্ব সম্পর্কে যে মতপার্থক্য দেখা যায় তা সীমানার পিলারের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয়নি। পিলারগুলো, সুনির্দিষ্ট জায়গাতে প্রথম দিন থেকেই বহাল রয়েছে এবং সে স্থানগুলোও সবার কাছে পরিচিত। তবে এই মতভেদের কারণ হচ্ছে দু'টো:
১মটি হচ্ছে পরিমাপের উৎসস্থল। কেউ মসজিদে হারামের দরজাগুলো থেকে দূরত্ব মেপেছেন, কেউ মক্কার প্রাচীন ঘেরাওকারী দেয়াল থেকে মাপ শুরু করেছেন। যেমন কেউ শোবায়কা থেকে দূরত্ব মেপেছেন যা হাররাতুল বাব নামে খ্যাত। আবার কেউ হুজুনের নিকটবর্তী মোয়াল্লার গেট থেকে দূরত্ব মাপেন।
২য় কারণটি হচ্ছে: মাইলের পরিমাণ সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মতপার্থক্য। কারো কারো মতে, ৬ হাজার হাতে এক মাইল, কারো মতে, ৪ হাজার হাতে এক মাইল। কারো মতে, সাড়ে ৩ হাজার হাতে এক মাইল এবং আরেক দলের মতে, ২ হাজার হাতে এক মাইল।
এছাড়াও হাতের পরিমাণের মধ্যেও পার্থক্য আছে। মানুষের আকার আকৃতির পার্থক্যের কারণে হাতের পরিমাপেরও পার্থক্য হয়। সাধারণতঃ মানুষের হাতের পরিমাপ ৪৬ সেঃ মিঃ থেকে ৫২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, মাইলও আপেক্ষিক। বর্তমান যুগে, স্থলপথের মাইল নৌপথের মাইল থেকে ভিন্ন এবং অনুরূপভাবে, ভৌগোলিক মাইলও স্থল এবং নৌপথের মাইল থেকে ভিন্ন ধরনের।
এইসব মতভেদ সত্ত্বেও ঐতিহাসিকরা সবাই বিভিন্ন দিকে সুনির্দিষ্ট স্থান থেকে এহরাম বাঁধার ব্যাপারে একমত। তাঁদের মতে, মদীনার পথে তানঈমের আগে বনি গিফারের বাড়ি, ইয়েমেনের পথে সানিয়াতু লাবানের এদায়াতুলাবান, জেদ্দার পথে মোনাকাতে আ'সাস, তায়েফের পথে আরাফাতের আগে নামেরা উপত্যকা, ইরাকের পথে মোকাত্তা এর সানিয়াতু খাল এবং জো'রানার পথে শে'বে আল-আবদাল্লাহ বিন খালেদ বিন উসাইদ এর বাসস্থান হচ্ছে পুরো হারাম এলাকার সীমানা। এটাই সেই হারাম এলাকা যার মর্যাদা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন। এই এলাকার হুকুম পৃথিবীর আর সকল জায়গা থেকে ভিন্ন।
মক্কার উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক প্রখ্যাত ভূগোলবিদ জনাব মে'রাজ মির্জা বলেন, বর্তমান যুগে মক্কার বসতি অনেক বেড়ে গেছে এবং অনেক জায়গায় তা হারাম এলাকার সীমানাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাই এ মুহূর্তে খুবই সূক্ষ্মভাবে হারাম এলাকার সীমানা চিহ্নিত করা জরুরী। চতুর্দিক থেকে এই সীমানা এখন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা না হলে পরে তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। মক্কা শহর ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে এবং চতুর্দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। যে সকল নির্দিষ্ট স্থানে হারাম সীমানার চিহ্ন ও পিলার রয়েছে সে সকল স্থান ছাড়া অন্য স্থানের সীমানা সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তে পৌছা কঠিন ব্যাপার। অথচ এখন সকল স্থানেই বসতি বেড়ে চলেছে এবং নতুন নতুন পথ ও রাস্তাঘাট তৈরি হচ্ছে। সেগুলোতেও হারামের সীমানা চিহ্নিত করা দরকার। তাঁর মতে, এজন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা কমিটি গঠিত হওয়া প্রয়োজন। ঐ কমিটিতে আলেম, হারাম সীমান্ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক সংস্থার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা সদস্য থাকবেন। তাঁরা পুরো হারাম এলাকার নিখুঁত সীমানা চিহ্নিত করার ব্যাপারে সুপারিশ করবেন। তিনি আরো বলেন, হারাম সীমানার পিলারগুলোর সঠিক দূরত্ব পরিমাপ করা এই যুগে আর কোন কঠিন ব্যাপার নয়। তিনি ঐগুলোর সঠিক দূরত্ব সম্পর্কে নিম্নোক্ত তথ্য পেশ করেছেন।
📄 আরাফার পিলার
(১) মসজিদে হারাম থেকে আরাফার পথে, হারাম এলাকার সীমানা হচ্ছে ১৮.৪ কিলোমিটার। সেখানে মসজিদে নামেরার কাছে আরাফাহ উপত্যকার পাশ ঘেঁষে দুই পাহাড়ের ঢালু অংশের পানি প্রবাহ আরাফার যে স্থানে এসে মিলিত হয়েছে, সেখানে হারাম সীমানার পিলার রয়েছে। সেটা ৪ ও ৫ নং আরাফাগামী রাস্তার নিকটে অবস্থিত।
(২) শারায়ে' এবং জোরানার পিলার: এটা এখন পর্যন্ত নজদের পিলার বলে পরিচিত। কেননা, এই রাস্তাটি সায়েল ও তায়েফ হয়ে নজদ গিয়েছে। মসজিদে হারাম থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫.২ কিলোমিটার। এটি তায়েফ যাওয়ার সময় হাতের ডানে একটি আবাদী এলাকা ১ নং শারায়ে হাউজিং এ অবস্থিত।
(৩) তানঈমের পিলার: এটি মসজিদে আয়িশার কাছে এবং বর্তমানে মক্কার বিদ্যুৎ কোম্পানীর অফিসের অদূরে অবস্থিত। মসজিদে হারাম থেকে এটিই সবচেয়ে কম দূরত্বে অবস্থিত। মসজিদে হারাম থেকে এর দূরত্ব হল মাত্র ৬.৫ কিলোমিটার।
(৪) শোমাইসীর পিলার: হোদায়বিয়ার বর্তমান নাম হচ্ছে শোমাইসী। এখানকার পিলারটি হোদায়বিয়ার মসজিদের আগে এবং মসজিদে হারাম থেমে ২১ কিলোমিটার দূরে পুরাতন মক্কা-জেদ্দা সড়কে অবস্থিত।
(৫) ইয়েমেন পিলার: এটি পুরাতন ইয়েমেন সড়কে অবস্থিত এবং মসজিদে হারাম থেকে এর দূরত্ব হচ্ছে ১৩ কিলোমিটার। এটি লাবান পাহাড়ের পার্শ্বে অবস্থিত। তবে বর্তমানে সেখানে উল্লেখযোগ্য কোন পিলার নেই এবং সেই রাস্তাটিও প্রায় মৃত। এখন নতুন সড়ক দিয়েই লোকেরা যাতায়াত করে।
বর্তমানে তায়েফ-হাদা রোড, মক্কা-জেদ্দা এক্সপ্রেস রোড এবং নতুন ইয়েমেন এক্সপ্রেস রোডে হারাম এলাকার সীমানার কোন চিহ্ন নেই। এগুলো নতুন রোড। অথচ এসব রাস্তা দিয়ে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন হারাম এলাকায় প্রবেশ করছে। এগুলোতে পিলার থাকা জরুরী। সৌদী সরকার মোট ৪শ' পিলার নির্মাণ করেছে।