📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 সাঈর হেকমত

📄 সাঈর হেকমত


সাঈর অর্থ হচ্ছে, সাফা পাহাড় থেকে মারওয়া পাহাড় পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া। সাফা থেকে মারওয়ায় গেলে ১ সাঈ এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে আসলে ২য় সাঈ সমাপ্ত হয়। এভারে ৭ বার সাঈ করতে হয়। উমরাহ এবং হজ্জের জন্য এই সাঈ জরুরী।

ইসমাঈলের মা হাজেরা সাফা-মারওয়ায় পানির সন্ধানে দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করেন। তারপর আল্লাহ তাঁকে যমযমের পানি দান করেন। হযরত ইবরাহীম (আ) বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাঈলকে এক মশক পানি এবং এক প্যাকেট খেজুর দিয়ে মসজিদে হারামের পূর্বদিকে একটি বড় গাছের নীচে রেখে চলে যান। পানি শেষ হয়ে গেলে মা ও শিশু ছটফট করতে থাকে। তখন হাজেরা নিকটবর্তী সাফা পাহাড়ে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায় কিনা দেখতে থাকেন। তারপর নীচের উপত্যকায় নেমে কাপড়ের এক কোণা উপরের দিকে তুলে, ক্লান্ত মানুষের মত ছুটতে থাকেন। তারপর মারওয়ায় আসেন। কিন্তু কাউকে পাওয়া গেল না। এভাবে তিনি ৭ বার ছুটাছুটি করেন।

হযরত হাজারের অনুসরণে সাফা-মারওয়ায় ৭ বার সাঈ করার আদেশের পেছনে যে হেকমত রয়েছে তা হচ্ছে, এর মধ্যে যে শিক্ষা, আনুগত্য, নবীদের সুন্নতকে জীবিতকরণ এবং আল্লাহর পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়সমূহ রয়েছে সেগুলোকে আত্মস্থ করা, অনুশীলন করা এবং বাস্তব জীবনকে সেই আলোকে গড়ে তোলা। এ মর্মে হযরত আয়িশা (রা) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنَّمَا جُعِلَ الطَّوَافُ بِالْبَيْتِ وَبَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ وَرَمْعُ الْحِمَارِ لاقامة ذكر الله رواه احمد وابوداؤد والدارمي والترمذي .
অর্থ: 'বাইতুল্লাহর তওয়াফ, সাফা-মারওয়ায় সাঈ এবং শয়তানকে কংকর মারার মধ্যে আল্লাহর জিকর ও স্মরণ প্রতিষ্ঠা করাই মূল উদ্দেশ্য।' তবে সাঈর মধ্যে অপেক্ষাকৃত জোরে হাঁটতে হয়। তওয়াফের ১ম তিন চক্করেও জোরে হাঁটতে হয়। এই জোরে হাঁটা অর্থাৎ রমল করা এই উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম মদীনায় জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে মক্কায় উমরাহ করতে আসেন।

তখন মক্কার মোশরেকরা বলল, মুসলমানরা মদীনার জ্বরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা এখন তোমাদের কাছে মক্কায় আসছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এই ঘটনা শুনে নির্দেশ দেন, সাহাবায়ে কেরাম যেন তওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করে অর্থাৎ জোরে হাঁটে। মোশরেকরা হাজারে আসওয়াদ বরাবর, একটু দূরে বসে সব লক্ষ্য করছে। এবার তারা বলাবলি শুরু করছে যে, যাদেরকে তোমরা জ্বরাক্রান্ত দুর্বল লোক বলে মন্তব্য করেছিলে, আজকে তারা আমাদের চাইতেও বেশী শক্তিশালী মনে হচ্ছে। ইবনে আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেক চক্করেই রমল করার নির্দেশ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু পরে তা স্থায়ী হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি এ নির্দেশ থেকে বিরত থাকেন। (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, বায়হাকী)।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 সাঈর দোয়া

📄 সাঈর দোয়া


পবিত্র স্থানসমূহের যে সকল জায়গায় দোয়া কবুল হয়, সাফা-মারওয়া তার অন্যতম। এই জন্য এই দুই স্থানে দোয়া করা উচিত।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফ শেষে সাফা পাহাড়ের উপর উঠেন এবং বাইতুল্লাহর দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করেন।

হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সাফা পাহাড়ের কাছে এসে এই আয়াতটি পড়লেন:
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ .
তারপর বললেন, আল্লাহ যেভাবে আয়াতে শুরু করেছেন আমিও সেইভাবেই শুরু করবো। তারপর তিনি সাফা পাহাড়ে উঠলেন, বাইতুল্লাহ দেখে কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে এই দোয়াটি পড়লেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ - أَنْجَزَوَعْدَهُ - وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই, বাদশাহী ও প্রশংসা শুধু তাঁরই, তিনি সকল জিনিসের উপর শক্তিবান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তিনি তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন, তাঁর বান্দাহকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সকল দল ও গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছেন।' এই দোয়াটি তিনি তিনবার পড়েন এবং আরো দোয়া করেন। তারপর তিনি মারওয়ায় আসেন এবং সাফা পাহাড়ের অনুরূপ করেন।

হযরত ইবনে উমর (রা) সাফা পাহাড়ে উঠে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে তাকবীর বলতেন। তারপর এই দোয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي بِدِينِكَ وَطَوَاعِيَتِكَ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولِكَ - اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِمَّنْ يُحِبُّكَ وَيُحِبُّ مَلَائِكَتِكَ وَعِبَادَكَ الصَّالِحِينَ - اللَّهُمَّ يَسْرْنِي لِلْيُسْرَى وَجَنَّبْنِي لِلْعُسْرَى وَاغْفِرْ لِي فِي الْآخِرَةِ وَالْأُولَى وَاجْعَلْنِي مِنْ أَئِمَّةِ الْمُتَّقِينَ وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ وَاغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ - اللَّهُمَّ إِنَّكَ قُلْتَ " ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ - وَأَنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ - اللَّهُمَّ إِذْهَدَيْتَنِي لِلإِسْلَامِ فَلَا تَنْزِعْنِي مِنْهُ وَلَا تَنْزِعُهُ مِنِّى حَتَّى تَتَوَفَّانِي وَأَنَا عَلَى الْإِسْلَامِ - اللَّهُمَّ لا تُقَدِّمْنِي لِلْعَذَابِ وَلَا تُؤَخِّرْنِي لِسُوءِ الْفِتَنِ .
অর্থ: 'হে আল্লাহ! তোমার দীন এবং তোমার ও তোমার রাসূলের আনুগত্য দ্বারা আমাকে হেফাজত কর। হে আল্লাহ! আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর যারা তোমাকে, তোমার ফেরেশতা ও নেক বান্দাহদেরকে ভালোবাসে। হে আল্লাহ! নেক ও সহজ কাজকে আমার জন্য সহজ করে দাও এবং কঠিন কাজ থেকে আমাকে দূরে রাখ। পরকাল ও দুনিয়ায় আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে মোত্তাকীদের ইমাম এবং বেহেশতের ওয়ারিশ বানাও। শেষ বিচারের দিন আমার গুনাহ মাফ করে দিও। হে আল্লাহ! তুমি বলেছ, 'আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।' তুমি নিশ্চয়ই ওয়াদা খেলাফ করবেনা। হে আল্লাহ! আমাকে যেহেতু ইসলামের হেদায়াত দান করেছ সেহেতু ইসলামকে আমার থেকে এবং ইসলাম থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিওনা যে পর্যন্ত না ইসলামের উপর আমার মৃত্যু হয়। হে আল্লাহ! আমাকে আজাবে নিপতিত করো না এবং ফেতনার জন্য আয়ু বৃদ্ধি করো না।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00