📄 সাফা-মারওয়ার অতীত থেকে বর্তমান
আল্লামা উমরী তাঁর মাসালিক আল আবসার কিতাবে লিখেছেন, সাফা পাহাড় নীল পাথর বিশিষ্ট এবং জাবালে আবু কোবায়েসের মূল থেকে উৎসারিত। পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠার জন্য পাথর কেটে ১২টি সিঁড়ি বানানো হয়েছে। সাঈকারীরা ইচ্ছা করলে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে পারতেন। মারওয়া কুআইকাআন পাহাড়ের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ। দুটোর মধ্যে একটু খালি জায়গা আছে। এখানেও পাহাড়ের চূড়ায় উঠার জন্য অনেকগুলি সিঁড়ি আছে।
রাদি বিন খলীল আল মালেকী বলেন, সাফা পাহাড়ের উপর উঠার জন্য ১২টি সিঁড়ি এবং মারওয়ায় উঠার জন্য ১৫টি সিঁড়ি আছে।
ইবনে বতুতা তাঁর সফর অভিজ্ঞতায় লিখেন, সাফা পাহাড়ের উপর উঠার জন্য ১৪টি সিঁড়ি এবং মারওয়া পাহাড়ে উঠার জন্য ১৫টি সিঁড়ি আছে।
আযরাকী উল্লেখ করেছেন, আব্বাসী খলিফা আবু জাফর মনসুরের সময় মক্কার গভর্ণর আবদুস সামাদ বিন আলী সাফা পাহাড়ে ১২টি এবং মারওয়ায় ১৫টি সিঁড়ি নির্মাণ করেন। তারপর খলীফা মামুনের সময় সেগুলোতে সাদা চুনার প্রলেপ দেয়া হয়। লোকেরা ইচ্ছামত উপর পর্যন্ত উঠানামা করতে পারত। কিন্তু বিগত ১৩০০ বছর পর্যন্ত কোন শাসক কিংবা ধনী ব্যক্তি সাফা-মারওয়ার মাসআকে পাকা করা কিংবা রোদের তাপ থেকে সাঈকারীদেরকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে কোন ছায়াদার ছাতা নির্মাণ করেননি এবং এর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেননি। শুধু সাফা-মারওয়ায় সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে এবং এই দুটো পাহাড়ে উকুদ বা সৌন্দর্যের প্রতীক ছোট মিনারা তৈরি করা হয়েছে।
১৩৩৯ হিজরীতে, বাদশাহ শরীফ হোসাইন বিন আলীই সর্বপ্রথম মাসআয় ছায়াদার ছাতা নির্মাণ করেন। এতে নীচে লোহার খুঁটি দিয়ে উপরে কাঠের ছাদ তৈরি করা হয়।
১৩৪৫ হিজরীতে, বাদশাহ আবদুল আযীযের নির্দেশক্রমে মাসআ'কে পাকা করা হয়। এতে সাঈকারীদের সাঈ করতে যথেষ্ট আরাম হয়। হজ্জ ফরজ হওয়ার পর থেকে এই প্রথম এই রাস্তা বা মাসআ পাকা করা হল। এতে মূল্যবান মার্বেল পাথর বসানো হয়েছে।
সৌদী শাসনামলে ১৩৭৫ হিজরীতে, যখন মসজিদে হারামের বৃহত্তর সম্প্রসারণ করা হয় এবং তিন তলা বিশিষ্ট মসজিদে হারাম নির্মাণ করা হয়, তখন সাফা-মারওয়ার উপর দোতলা বিল্ডিং তৈরি করা হয়। ফলে, নীচতলা এবং দোতলার উপর দিয়ে মাসআয় সাঈ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। হজ্জের মওসুমে ভিড়ের সময় এই দোতলা মাসআর কারণে সাঈকারীদের খুব বেশী উপকার হয়।
মাসআর নীচতলার দেয়ালে ২৮টি এয়ারকুলার বসানো হয়েছে এবং এগুলোর মাধ্যমে গরমের সময় আবহাওয়া ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করা হয়। এছাড়াও মাসআর উপর দিয়ে ৬টি ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ভিড়ের সময় লোকেরা ওভারব্রিজ দিয়ে মসজিদে যাতায়াত করে এবং ঐদিকে পারাপারকারী লোকদের কারণে, সাঈকারীদের সাঈতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় না। ওভারব্রিজ নির্মাণের পূর্বে ঐ দিকের মুসল্লীরা, সাঈকারীদের সাঈতে বাধা সৃষ্টি করে মসজিদে যাতায়াত করত।
সৌদী আমলে, সাফা-মারওয়ার মাঝের যে অংশে একটু জোরে হাঁটতে হয় সেই অংশটুকুর দুই প্রান্ত সীমানায় সবুজ বৈদ্যুতিক বাতি লাগানো হয়েছে। এগুলো ২৪ ঘন্টা আলো দিচ্ছে। সাঈকারীরা সেই আলোর কাছে এসেজোরে হাঁটা শুরু করে এবং অন্য বাতিটির কাছে গিয়ে জোরে হাঁটা বন্ধ করে।
মাসআর রাস্তার মাঝখানে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অসুস্থ ও বয়স্ক লোকদের হুইল গাড়ীতে বসে সাঈ করার জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এক-দেড় হাত উঁচু তিনটি দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে এবং এগুলোতে মার্বেল পাথর লাগানো হয়েছে। অসুস্থ ও বয়স্ক লোকেরা পয়সার বিনিময়ে ঐ সব গাড়ীতে করে সাঈ করে। আবার নিজের সাহায্যকারী লোক থাকলে বিনা পয়সায় হুইল গাড়ী এনে সাঈ করা যায়। হারাম প্রশাসনের পক্ষ থেকে, লোক মারফত সাঈ করলে, তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে এবং যারা হুইল গাড়ী বিনা পয়সায় নিতে চায় তাদেরকে তা সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে ১ হাজার হুইল গাড়ী মওজুদ ও কর্মরত আছে।
সাফা-মারওয়াকে আজকাল মসজিদে হারামের বিল্ডিং এর সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ফলে, ভেতরে না আসলে এটি যে মসজিদে হারাম থেকে ভিন্ন জিনিস তা বুঝা যায় না। তবে মসজিদে হারামের ঐ অংশের দৈর্ঘ্য সাফা-মারওয়ার দৈর্ঘের চেয়ে কম।
📄 সাঈর হেকমত
সাঈর অর্থ হচ্ছে, সাফা পাহাড় থেকে মারওয়া পাহাড় পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া। সাফা থেকে মারওয়ায় গেলে ১ সাঈ এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে আসলে ২য় সাঈ সমাপ্ত হয়। এভারে ৭ বার সাঈ করতে হয়। উমরাহ এবং হজ্জের জন্য এই সাঈ জরুরী।
ইসমাঈলের মা হাজেরা সাফা-মারওয়ায় পানির সন্ধানে দৌড়াদৌড়ি ও ছুটাছুটি করেন। তারপর আল্লাহ তাঁকে যমযমের পানি দান করেন। হযরত ইবরাহীম (আ) বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাঈলকে এক মশক পানি এবং এক প্যাকেট খেজুর দিয়ে মসজিদে হারামের পূর্বদিকে একটি বড় গাছের নীচে রেখে চলে যান। পানি শেষ হয়ে গেলে মা ও শিশু ছটফট করতে থাকে। তখন হাজেরা নিকটবর্তী সাফা পাহাড়ে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায় কিনা দেখতে থাকেন। তারপর নীচের উপত্যকায় নেমে কাপড়ের এক কোণা উপরের দিকে তুলে, ক্লান্ত মানুষের মত ছুটতে থাকেন। তারপর মারওয়ায় আসেন। কিন্তু কাউকে পাওয়া গেল না। এভাবে তিনি ৭ বার ছুটাছুটি করেন।
হযরত হাজারের অনুসরণে সাফা-মারওয়ায় ৭ বার সাঈ করার আদেশের পেছনে যে হেকমত রয়েছে তা হচ্ছে, এর মধ্যে যে শিক্ষা, আনুগত্য, নবীদের সুন্নতকে জীবিতকরণ এবং আল্লাহর পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়সমূহ রয়েছে সেগুলোকে আত্মস্থ করা, অনুশীলন করা এবং বাস্তব জীবনকে সেই আলোকে গড়ে তোলা। এ মর্মে হযরত আয়িশা (রা) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنَّمَا جُعِلَ الطَّوَافُ بِالْبَيْتِ وَبَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ وَرَمْعُ الْحِمَارِ لاقامة ذكر الله رواه احمد وابوداؤد والدارمي والترمذي .
অর্থ: 'বাইতুল্লাহর তওয়াফ, সাফা-মারওয়ায় সাঈ এবং শয়তানকে কংকর মারার মধ্যে আল্লাহর জিকর ও স্মরণ প্রতিষ্ঠা করাই মূল উদ্দেশ্য।' তবে সাঈর মধ্যে অপেক্ষাকৃত জোরে হাঁটতে হয়। তওয়াফের ১ম তিন চক্করেও জোরে হাঁটতে হয়। এই জোরে হাঁটা অর্থাৎ রমল করা এই উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম মদীনায় জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে মক্কায় উমরাহ করতে আসেন।
তখন মক্কার মোশরেকরা বলল, মুসলমানরা মদীনার জ্বরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা এখন তোমাদের কাছে মক্কায় আসছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এই ঘটনা শুনে নির্দেশ দেন, সাহাবায়ে কেরাম যেন তওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করে অর্থাৎ জোরে হাঁটে। মোশরেকরা হাজারে আসওয়াদ বরাবর, একটু দূরে বসে সব লক্ষ্য করছে। এবার তারা বলাবলি শুরু করছে যে, যাদেরকে তোমরা জ্বরাক্রান্ত দুর্বল লোক বলে মন্তব্য করেছিলে, আজকে তারা আমাদের চাইতেও বেশী শক্তিশালী মনে হচ্ছে। ইবনে আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেক চক্করেই রমল করার নির্দেশ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু পরে তা স্থায়ী হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি এ নির্দেশ থেকে বিরত থাকেন। (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, বায়হাকী)।
📄 সাঈর দোয়া
পবিত্র স্থানসমূহের যে সকল জায়গায় দোয়া কবুল হয়, সাফা-মারওয়া তার অন্যতম। এই জন্য এই দুই স্থানে দোয়া করা উচিত।
হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফ শেষে সাফা পাহাড়ের উপর উঠেন এবং বাইতুল্লাহর দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করেন।
হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সাফা পাহাড়ের কাছে এসে এই আয়াতটি পড়লেন:
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ .
তারপর বললেন, আল্লাহ যেভাবে আয়াতে শুরু করেছেন আমিও সেইভাবেই শুরু করবো। তারপর তিনি সাফা পাহাড়ে উঠলেন, বাইতুল্লাহ দেখে কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে এই দোয়াটি পড়লেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ - أَنْجَزَوَعْدَهُ - وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই, বাদশাহী ও প্রশংসা শুধু তাঁরই, তিনি সকল জিনিসের উপর শক্তিবান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তিনি তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন, তাঁর বান্দাহকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সকল দল ও গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছেন।' এই দোয়াটি তিনি তিনবার পড়েন এবং আরো দোয়া করেন। তারপর তিনি মারওয়ায় আসেন এবং সাফা পাহাড়ের অনুরূপ করেন।
হযরত ইবনে উমর (রা) সাফা পাহাড়ে উঠে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে তাকবীর বলতেন। তারপর এই দোয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي بِدِينِكَ وَطَوَاعِيَتِكَ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولِكَ - اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِمَّنْ يُحِبُّكَ وَيُحِبُّ مَلَائِكَتِكَ وَعِبَادَكَ الصَّالِحِينَ - اللَّهُمَّ يَسْرْنِي لِلْيُسْرَى وَجَنَّبْنِي لِلْعُسْرَى وَاغْفِرْ لِي فِي الْآخِرَةِ وَالْأُولَى وَاجْعَلْنِي مِنْ أَئِمَّةِ الْمُتَّقِينَ وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ وَاغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ - اللَّهُمَّ إِنَّكَ قُلْتَ " ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ - وَأَنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ - اللَّهُمَّ إِذْهَدَيْتَنِي لِلإِسْلَامِ فَلَا تَنْزِعْنِي مِنْهُ وَلَا تَنْزِعُهُ مِنِّى حَتَّى تَتَوَفَّانِي وَأَنَا عَلَى الْإِسْلَامِ - اللَّهُمَّ لا تُقَدِّمْنِي لِلْعَذَابِ وَلَا تُؤَخِّرْنِي لِسُوءِ الْفِتَنِ .
অর্থ: 'হে আল্লাহ! তোমার দীন এবং তোমার ও তোমার রাসূলের আনুগত্য দ্বারা আমাকে হেফাজত কর। হে আল্লাহ! আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর যারা তোমাকে, তোমার ফেরেশতা ও নেক বান্দাহদেরকে ভালোবাসে। হে আল্লাহ! নেক ও সহজ কাজকে আমার জন্য সহজ করে দাও এবং কঠিন কাজ থেকে আমাকে দূরে রাখ। পরকাল ও দুনিয়ায় আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে মোত্তাকীদের ইমাম এবং বেহেশতের ওয়ারিশ বানাও। শেষ বিচারের দিন আমার গুনাহ মাফ করে দিও। হে আল্লাহ! তুমি বলেছ, 'আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।' তুমি নিশ্চয়ই ওয়াদা খেলাফ করবেনা। হে আল্লাহ! আমাকে যেহেতু ইসলামের হেদায়াত দান করেছ সেহেতু ইসলামকে আমার থেকে এবং ইসলাম থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিওনা যে পর্যন্ত না ইসলামের উপর আমার মৃত্যু হয়। হে আল্লাহ! আমাকে আজাবে নিপতিত করো না এবং ফেতনার জন্য আয়ু বৃদ্ধি করো না।'