📄 নহরে যোবায়দা
মক্কায় যমযম ছাড়া আর পান করার মত কোন পানি ছিল না। পরে খলীফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী যোবায়দা মক্কার অদূরে অবস্থিত নোমান ও হোনাইন উপত্যকার কূপের মিষ্টি পানি মক্কায় সরবরাহের জন্য একটা সরু নালা প্রবাহিত করেন ও পানি সরবরাহ করেন। এর পেছনে একটি ঘটনা কাজ করে।
একদিন যোবায়দা এক ভয়াবহ স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন, তার সাথে অজস্র লোক সঙ্গম করছে। তিনি এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চান। তিনি নিজ দাসীকে পাঠিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চান এভাবে যে, দাসী নিজেই ঐ স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু ব্যাখ্যাকারী শুনে বলেন, 'এ স্বপ্ন কে দেখেছে ঠিক করে বল, এটা অবশ্যই তুমি দেখনি'। তখন দাসী সত্য প্রকাশ করে বলে, 'যোবেদাই তা দেখেছে।' একজন স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন, 'যোবায়দা এমন এক মহান কাজ করবেন যার দ্বারা অজস্র লোক উপকৃত হবে'। কিন্তু সেটি কি কাজ ছিল তা বুঝা যাচ্ছিল না।
৮১০ খৃষ্টাব্দে তিনি মক্কায় হজ্জে আসেন এবং মক্কাবাসীর পানির সমস্যা দেখতে পান। তখন তিনি ঐ নালা খনন করার পরিল্পনা আঞ্জাম দিয়ে স্বপ্নের সার্থক বাস্তবায়ন করেন।
একদিকে, মক্কায় বহিরাগত হাজী ও যিয়ারতকারীদের ভীড় অপরদিকে, সেখানে রয়েছে পানির স্বল্পতা। নদী-নালা ও পুকুর না থাকায় পানির ক্রমবর্ধমান সমস্যা লেগেই আছে। তদুপরি কূপভিত্তিক পানি সরবরাহ পদ্ধতি ছিল সংকটজনক। কূপের পানি ভারী ও লবণাক্ত ছিল। তাই মক্কার স্থানীয় অধিবাসীরা প্রথম থেকেই উটের পিঠে বোঝাই করে ওয়াদী ফাতেমা (বর্তমান জুমুম) থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করত। কিন্তু এটা ছিল ব্যয়বহুল।
আল্লামা আযরাকীর 'আখবারে মক্কা' বই এর টীকা লেখক রুশদী সালেহ মালহাস ১৩৫৭ হিজরীর মুদ্রিত সংখ্যায় নহরে যোবায়দা সম্পর্কে একটি পরিশিষ্ট যোগ করেন। তিনি বলেন, হোনাইন ঝর্ণা কিংবা নহরে যোবায়দা তাদ পাহাড় থেকে উৎসারিত হয়েছে। এই পাহাড়টি পুরাতন মক্কা-তায়েফ রোডের নিকট বর্তমান শারায়ে' কৃষি খামারের নিকটবর্তী। তাদ পাহাড়ের পানি হোনাইনে এসে পড়ত। যোবায়দা হোনাইনের সেই পানির ধারাটি কিনে তা থেকে সরু খালের মাধ্যমে মক্কায় পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। আযরাকী নহরে যোবায়দা বলতে শুধু এটাকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু যোবায়দা ওয়াদী নোমান থেকে আরাফাতের উপর দিয়ে আরেকটি নালা প্রবাহিত করেছিলেন, আযরাকী সেটার কথা উল্লেখ করেননি। তিনি শুধু হোনাইনের নালার কথা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হয়েছেন।
ওয়াদী নোমানের শেষ প্রান্তে অবস্থিত কারা পাহাড় থেকে নোমান ঝর্ণাধারাটি প্রবাহিত করা হয়। সেখান থেকে ওয়াদী নোমানের আওহার নামক জায়গায় উক্ত পানি এসে জমা হত। সেখান থেকে পানি দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে আরাফাতে এসে কূপে মিলিত হয়। আরাফাতের ঐ পানিই হাজীরা পান করত। সেখান থেকে মোযদালেফা হয়ে মিনার পেছনে যোবায়দা কূপে এসে পানি পড়ত। এতে তার ১৭ লাখ দীনার খরচ হয়। যোবায়দা এই নহরটি মিনা পর্যন্ত নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হন।
৯৬৯ হিজরীতে মক্কায় বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং ঝর্ণা ও কূপগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পানির তীব্র অভাব দেখা দেয়। শুধু আরাফাতের নহরের পানি বিদ্যমান থাকে। এতেও আবার পানি সরবরাহ কমে গিয়েছিল। তখন উসমানী খলীফা সুলতান সোলায়মানের কাছে মক্কার খরা ও কূপগুলো শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা পেশ করা হয়। এই সমস্যার কথা শুনে সুলতান সোলায়মানের মেয়ে ফাতেমা খানম নিজস্ব তহবিল থেকে উক্ত নহর সংস্কারের প্রস্তাব করেন। সুলতান তাতে রাজী হন। শাহজাদী ফাতেমা খানম উক্ত খাল সংস্কার করেন। এতে ১০ বছর সময় লেগে যায়। ৯৭৯ হিজরীতে উক্ত সংস্কার কাজ শেষ হয়। তিনি মিনা পর্যন্ত সংস্কার করে পরে তাকে মক্কা পর্যন্ত যোবায়দার নির্মিত হোনাইন ঝর্ণাধারার সাথে সংযুক্ত করেন। তখন দুটো ধারা একসাথে মক্কা পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং এর ফলে মক্কার পানি সমস্যার সমাধান করা হয়। মক্কা অঞ্চলের ৬০টি এবং মিনা, মোযদালেফা ও আরাফাতের ৩০টি কূপে এসে এই পানি জমা হত।
২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নহরে যোবায়দা, একটি সরু ও সংকীর্ণ নালা বা খালের নাম, যার মাধ্যমে হোনাইন এবং ওয়াদী নোমানের পানি মক্কায় সরবরাহ করা হয়। এই নালাটি উপর নীচসহ চতুর্দিক থেকে পাথর দ্বারা তৈরি এবং এতে চুন দ্বারা প্লাস্টার করা হয়েছে। ফলে, ঝর্ণার পানি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। নহরে যোবায়দাকে উপর থেকে দেখলে বুঝা যায় না যে, এটি একটি সরু নালা। ঢেকে রাখার কারণে এটাকে সরু সুড়ঙ্গের সাথে তুলনা করা যায়। এটি আরাফাত, মোযদালেফা ও মিনার মধ্য দিয়ে মোয়াল্লা পর্যন্ত এসে শেষ হয়। বিভিন্ন সময় এই নালার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়।
১৫০০ খৃষ্টাব্দে, এক পানি বন্টন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মক্কায় নহরে যোবায়দার পানি সরবরাহ করা হয়। মোয়াল্লা থেকে সাফা পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে এর একটি সরবরাহ লাইন নির্মাণ করা হয় এবং পূর্বদিকের পাহাড়ে সরবরাহ করা হয়। এর সর্বশেষ সংস্কার করা হয় ১৯৬৭ সালে।
অন্যান্য উৎস থেকে মক্কায় ক্রমবর্ধমান পানি সরবরাহের কারণে বর্তমানে নহরে যোবায়দার পানি অব্যবহৃত। তাই ভবিষ্যতে এই পানিকে কি কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। সম্ভবতঃ কৃষি কাজ, পশুর পানীয় ও গাছ উৎপাদনের কাজে তা ব্যবহার করা হতে পারে।
বর্তমানে, আযিযিয়া থেকে মোযদালেফা পর্যন্ত মক্কা শহর সম্প্রসারণের কারণে নহরে যোবায়দা হুমকীর সম্মুখীন। এটি উপত্যকার এক পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মিনার উন্নয়ন তৎপরতার জন্য বিভিন্ন সময় উপত্যকায় বহু খননকার্য চালানো হয়েছে। এ পর্যন্ত তা অক্ষত থাকলেও ভবিষ্যতে তা আশংকামুক্ত নয়।
📄 শোয়াইবিয়া লবণমুক্ত পানি প্রকল্প
বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয মক্কা থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগরের শোআইবিয়া উপকূলে ১৯৮৮ সালের ২২শে জুন নতুন একটি লবণমুক্ত পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। এতে দৈনিক ৪০ মিলিয়ন গ্যালন পানি লবণমুক্ত করে পান করার উপযোগী করা হয়। ২৫ মিলিয়ন গ্যালন পানি মক্কায় এবং ১৫ মিলিয়ন গ্যালন পানি তায়েফে সরবরাহ করা হচ্ছে। সাগর থেকে মক্কা পর্যন্ত দু'টো স্থানে পাম্প কেন্দ্র স্থাপন করে নীচ থেকে পাম্পিং এর মাধ্যমে উপরে পানি উঠানো হচ্ছে। এ পানি মক্কায় সরবরাহ করা হচ্ছে এবং মক্কার লোকেরা তা ব্যবহার করছে।
মক্কায় ১২০ কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হলে এক বিশাল পাইপ লাইনের প্রয়োজন। শোয়াইবিয়া থেকে তায়েফ পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার এবং সেখান থেকে আরাফাত পর্যন্ত আরো ৬৬ কিলোমিটার পর্যন্ত পাইপলাইন বসানো হয়েছে। শোয়াইবিয়া থেকে তায়েফে পানি নিতে ১৩ কিলোমিটার পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করা হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে বড় সুড়ঙ্গপথ।
তায়েফ সমুদ্রের স্তর থেকে ১৭৪৫ মিটার উঁচু। সেখানে পানি তুলতে ৪টি পাম্প স্টেশন কায়েম করা হয়েছে। ৫ বিলিয়ন সৌদী রিয়াল ব্যয়ে নির্মিত উক্ত বিশাল প্রকল্পে পানি উৎপাদনের সাথে সাথে ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদিত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এমন একটি বিশাল প্রকল্পের আয়ু সর্বোচ্চ ২০ বছর। তারপর তা নষ্ট হয়ে যায় এবং বিকল্প আরেকটি নতুন প্রকল্প দাঁড় করাতে হয়।
সাধারণ মওসুমে মক্কায়, দৈনিক ৬০-৭২ হাজার ঘনমিটার পানি এবং হজ্জ মওসুমে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পানির প্রয়োজন পড়ে। ১৪০৯ হিজরীর হজ্জ মওসুমে মক্কায় মোট ৩২ লাখ ঘনমিটার পানি এবং মিনা-মোযদালেফা ও আরাফাতে ৭৭৭ হাজার ঘনমিটার পানি ব্যবহৃত হয়।
মক্কার পানি চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। সেজন্য মক্কার অদূরে ওয়াদী মালাকানে 'মালাকান উপত্যকা প্রকল্প' নামে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেই প্রকল্পের আওতায় ২২টি কূপ খনন করা হয়েছে এবং সেখান থেকে মক্কায় পানি সরবরাহ লাইন ও রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে। এই উপত্যকার পানি মক্কার প্রধান রিজার্ভার কাওয়াশেকে সংরক্ষণ করা হয় এবং সেখান থেকে মক্কার অধিকাংশ এলাকায় পানি সরবরাহ করা হয়। এই রিজার্ভার থেকে দৈনিক ৩৩ হাজার ঘনমিটার পানি সরবরাহ করা হয় যা মক্কার বর্তমান পানি চাহিদার অর্ধেক পূরণ করে।
তাছাড়াও পশ্চিমাঞ্চলীয় পানি সরবরাহ বিভাগ ওয়াদী ফাতেমার পানি হাদ্দার মধ্য দিয়ে কাওয়াশেক রিজার্ভারে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করেছে। হজ্জের সময় পানি সরবরাহ বিভাগ পাহাড়ের উপর অবস্থিত মোট ১৭টি রিজার্ভার চালু করে এবং সেগুলোতে পানি উত্তোলনের জন্য মোট ৩২টি পাম্পিং স্টেশন কায়েম করে। পানি সরবরাহ বিভাগ মক্কায় পানি সরবাহের মাধ্যমে মসজিদে হারাম এবং হাজীদের পানি সেবার নিশ্চয়তা বিধান করার চেষ্টা চালায়। ওয়াদী ফাতেমায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে, ২ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এই পানি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি ও কৃষি কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
তাছাড়াও, মক্কার অদূরে ওসফান, জোরানা এবং নাখলাসহ অন্যান্য উপত্যকায় প্রচুর মিষ্টি পানির কূপ আছে। পানির অভাব দেখা দিলে মক্কার পানি ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে পানির পাত্র ভর্তি করে মক্কায় পানি বিক্রী করে। গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেগুলো থেকে পানি উঠানো হয় এবং সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাচুর্যের কারণে গভীর নলকূপ দ্বারা পানি সেচ করে কৃষিকাজ করা হয়।
📄 পানি কল্যাণ প্রকল্প
বাদশাহ ফাহাদ পানি কল্যাণ প্রকল্প
১৪০৪ হিজরীতে বাদশাহ ফাহাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে মক্কার অদূরে রাহজান উপত্যকায় বাদশাহ ফাহাদ পানি কল্যাণ প্রকল্প চালু হয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল হাজী ও মসজিদে হারামের যিয়ারতকারীদের মধ্যে বিশুদ্ধ ঠাণ্ডা পানি সরবরাহ করা। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সুবিধেজনক স্থানে ১২০টি কুলার বসানো হয়েছে। এই প্রকল্পের ৩টি বিভাগ রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, ১. উৎপাদন ২. সংরক্ষণ ও ৩. সুষ্ঠু বিতরণ।
বিভিন্ন কূপ থেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাম্পিং করে পানি তুলে তা মূল প্লান্টে নেয়া হয়। তারপর অতিবেগুনি আলো দ্বারা পানি পরিশুদ্ধ করা হয়। ৪টি মেশিনের সাহায্যে এতে ঘন্টায় ১ লিটার বিশিষ্ট ১৪ হাজার ৪শ' প্যাকেট তৈরি করা হয়। জমুম উপত্যকার ৪টি বিশাল রিজার্ভারে এবং মিনায় ৬৪টি রিজার্ভারে উক্ত পানি সংরক্ষণ করা হয়।
পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের পানি সরবরাহ বিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব হাতে নিয়ে রমযান ও হজ্জ মওসুমে হাজীদেরকে ঠাণ্ডা পানি সরবরাহ করছে। ১৪১০ হিজরীতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৭০ মিলিয়ন লিটার ঠাণ্ডা পানির প্যাকেট বিতরণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি শুরুর পর থেকে ক্রমান্বয়ে প্রতিবছর এর উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। মসজিদে হারামের চারপার্শ্বে মিনা, মোযদালেফা, আরাফাত, এবং মক্কার বিভিন্ন প্রবেশ পথে এই ঠান্ডা পানি বিতরণ করা হয়। এজন্য শতশত এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়ী ব্যবহার করা হয় যেন পানি ঠাণ্ডা থাকে।
📄 মসজিদে হারামের প্রশাসন
আগে, মক্কার গভর্নর ও শাসকরাই মসজিদে হারামের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। খেলাফতে রাশেদা, উমাইয়া, আব্বাসী এবং সারাকেশা শাসনামলে মক্কার গভর্ণর এবং শাসকরাই সরাসরি মসজিদে হারামের সেবার ত্রুটির জন্য খলীফা, বাদশাহ ও সুলতানদের কাছে জবাবদিহী করতেন।
কিন্তু তুরস্কের উসমানী খেলাফতের সময় থেকে মক্কার শাসক বা গভর্নরকে 'শেখুল হারাম' এই বিশেষ উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং তাঁর একজন সহকারী নিয়োগ করা হয়। মূলতঃ এই সহকারীই সরাসরি মুয়াজ্জিন, পিয়ন, ঝাড়ুদার, দারোয়ানসহ অন্যান্য সকল বিভাগের কাজের তদারক করতেন। তারপর তুর্কী সুলতানরা ওয়াকফ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে এবং এই বিভাগের প্রধানকে 'ওয়াকফ বিভাগের পরিচালক' উপাধিতে ভূষিত করে। এই বিভাগের কাজ হচ্ছে, মসজিদে হারামের নামে সকল ওয়াকফ সম্পত্তির দেখাশুনা ও তত্ত্বাবধান করা, মসজিদে হারামের সকল কর্মচারীর বেতন দেয়া এবং বিদেশ থেকে আগত সাহায্য সামগ্রী, পূর্ব নির্ধারিত শর্ত মোতাবেক বিলি-বন্টন করা। এই বিভাগ মসজিদে হারামের ইমাম ও মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে, সকল কর্মচারীর নাম একটি দফতরে লিপিবদ্ধ করে এবং কা'বার সেবক ও চাবি রক্ষকসহ অধীনস্থ কর্মচারীদের নামও লিপিবদ্ধ করে। কা'বার সেবককে কা'বা ধৌতকরণ এবং সুগন্ধিজাত দ্রব্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করে। ওয়াকফ বিভাগ 'শেখুল হারাম' তথা মক্কার গভর্নরের অধীন কাজ পরিচালনা এবং অর্থনৈতিক ব্যাপারে সরাসরি কনস্টান্টিনোপলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম পরিচালনা করে। তুর্কী সুলতান ১ম সেলিম খানের আমল পর্যন্ত এইভাবেই মসজিদে হারামের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
১৩৩৪ হিজরীর ৯ই শাবান, বাদশাহ শরীফ হোসাইন বিন আলী, হেজাযের স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজে যখন এর বাদশাহ হন, তখনও তিনি এই পদ্ধতিতেই মসজিদে হারামের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে তিনি একটি পুলিশ বিভাগ সৃষ্টি করেন। পুলিশ বিভাগের কাজ হল চোর ও ফেতনা সৃষ্টিকারীদের দমন করা এবং মসজিদে হারামে হারিয়ে যাওয়া জিনিস কুড়িয়ে তা প্রকৃত মালিকের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করা।
তারপর বাদশাহ আবদুল আযীয, হেজাজের ক্ষমতা লাভ করার পর 'হারাম প্রশাসনিক পরিষদ' গঠন করেন এবং এর উপর মসজিদে হারামের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও অন্যান্য সকল সেবার দায়িত্ব অর্পণ করেন। উসমানী খেলাফতের সময় মুসলিম বিশ্বের শাসকদের পক্ষ থেকে আসা উপহার, দান ও ওয়াকফ সম্পত্তির আয় থেকে মসজিদে হারামের কর্মচারীদের বেতন ভাতা দেয়া হত। কিন্তু পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সৌদী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে হারাম শরীফের সকল কর্মচারীদের বেতন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং তুর্কী আমলের চেয়ে কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয়।
পরবর্তীতে হারাম প্রশাসনিক পরিষদের নাম পরিবর্তন করে এর নামকরণ করা الرِّئَاسَةُ العَامَّةُ لِسُتُونِ الْحَرَمَيْنِ الشَّرِيفَيْنِ - অর্থাৎ হারামাইন শরীফাইন সংক্রান্ত সাধারণ প্রেসিডেন্সী। এই সংস্থার উপর মক্কার মসজিদে হারাম এবং মদীনার মসজিদে নববীর প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
হারামাইন প্রশাসনের বিল্ডিং
এতে একজন প্রেসিডেন্ট এবং দুই হারাম সম্পর্কে দু'জন ভাইস প্রেসিডেন্ট রয়েছে। সৌদী বাদশাহ সরাসরি প্রেসেডেন্ট নিযুক্ত করেন। এই সংস্থা মসজিদে হারাম এবং মসজিদে নববীর সকল সমস্যার সমাধান, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিভিন্নমুখী সেবা প্রদানের দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছে। মারওয়ার উত্তর-পশ্চিম দিকে সাধারণ প্রেসিডেন্সীর বহুতল বিশিষ্ট ভবনটি অবস্থিত। এতে মোট ১৪টি বিভাগ আছে।