📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মসজিদে হারামে খোতবা দানের পদ্ধতি

📄 মসজিদে হারামে খোতবা দানের পদ্ধতি


হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে মসজিদে হারামের ইমাম জুমআর নামাযের খোতবা দেয়ার উদ্দেশ্যে কাল জামা ও পাগড়ী পরে আসতেন। মিসরের বাদশাহ নাসের এই সকল পোশাক ইমাম সাহেবের জন্য পাঠাতেন। ইমাম সাহেব দুটো ঝাণ্ডার মাঝখানে ধীরে ধীরে চলতেন এবং দু'জন মুয়াজ্জিন ঐ ঝাণ্ডা দুটো আঁকড়ে ধরতেন। সামনে একজন হাতে ফটকা নিয়ে এগিয়ে যেতেন। তিনি তা বাতাসে ফুটিয়ে আওয়ায দিলে, মুসল্লীরা বুঝতে পারত যে ইমাম সাহেব আসছেন। তিনি মিম্বারের কাছে আসার আগ পর্যন্ত এইভাবেই চলত। ইমাম সাহেব প্রথমে হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতেন, সেখানে দোয়া করতেন এবং পরে মিম্বারের দিকে এগুতেন। প্রধান মোয়াজ্জিনও কাল পোশাক পরে কাঁধে তলোয়ার নিয়ে তা হাতে ধরে থাকতেন। তারপর ঝাণ্ডা দুটো মিম্বারের দুই পার্শ্বে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। ইমাম সাহেব, মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে উঠার পর মুয়াজ্জিন তাঁর কাঁধে তলোয়ার ঝুলিয়ে দিতেন। ইমাম সাহেব তলোয়ারের গোড়া দিয়ে মিম্বারের সিঁড়িতে আওয়ায দিতে দিতে মিম্বারের উপরে গিয়ে বসতেন এবং সবাইকে সালাম জানাতেন। ইমাম সাহেব বসার পর মুয়াজ্জিন যমযমের গম্বুজ থেকে আযান দিতেন। খোতবা শেষে, তিনি আগের মত আওয়ায দিয়ে দিয়ে নীচে নেমে আসতেন। এরপর মিম্বারটি সরিয়ে ফেলা হত। কিন্তু ৯৬৬ হিজরীতে, সুলতান সোলায়মান খানের মিম্বারটি মাকামে ইবরাহীমের উত্তর পার্শ্বে স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করার পর প্রায় ৫শ' বছর পর্যন্ত এইভাবে মিম্বার অনড় থাকে এবং ইমাম সেখানে বসেই খোতবা দেন। বর্তমান সৌদী আমলে শুধু এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।

হেজাযে, তুরস্কের উসমানী সুলতানের আমলে, ইমাম সাহেব বাবে বাযান এবং বাবে আলীর মাঝখানে অবস্থিত মাদ্রাসায় প্রবেশ করে প্রথমে দু'রাকাত নামায পড়ে নিতেন। তখন, সেখানে সময় নির্ধারণের জন্য দুটো বড় ঘড়ি ছিল। তখনকার অভ্যাস অনুযায়ী, ইমাম সাহেব ফরজিয়া নামক প্রশস্ত ঢিলা জুব্বা পরিধান করতেন এবং ভারতীয় পদ্ধতিতে সুতা ও সিল্ক মিশ্রিত সাদা পাগড়ী পেঁচিয়ে মাথায় বাঁধতেন। তারপর হাতে লাঠি নিয়ে মোবাল্লেগদের জন্য নির্ধারিত 'মোরাক্কায়' এসে পাগড়ীর উপর তাইলাসান নামক একটি টুপি পরতেন। হাতের লাঠির মাথা তীরের দাঁতের মত ধারাল ছিল। এটাকে গাদ্দারা বলা হত। তারপর সামনের দিকে রওনা হলে, অপেক্ষমান ৪ জন ব্যক্তি তাঁকে মিম্বারের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন এবং একজন ইমাম সাহেবের লাঠি বহন করতেন। তারপর মিম্বারের উপর থেকে সোনার প্রলেপযুক্ত রূপালী তারের নেট সরানো হত এবং ইমাম গিয়ে মিম্বারের উপর বসতেন। তারপর দ্বিতীয় আযান দেয়া হত। একজন মোবাল্লেগ, আযানের মুহাম্মদ শব্দ শুনলে জোরে দরুদ পড়তেন, খোতবায় সাহাবাদের নাম শুনলে তাদের উদ্দেশ্যে রাদিয়াল্লাহ আনহুম বলতেন এবং ইমাম কোন খলীফার নাম উচ্চারণ করলে তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন। তখন খলীফাদের নাম উল্লেখ করে খোতবায় তাদের জন্য দোয়া করা হত। এই অবস্থা বাদশাহ শরীফ হোসাইন বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল মুঈন বিন আ'ওন পর্যন্ত বর্তমান ছিল। মসজিদে হারামের ইমামগণ বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। সুনির্দিষ্ট কোন মাজহাবের ইমাম নিতে হবে এমন কোন ব্যাপার ছিল না। মসজিদে হারামের সব ইমাম খতীব নয়। অর্থাৎ সবাই জুমআর নামায পড়ান না। ফলে, তাদের খোতবাও দিতে হয় না।

ঈদুল ফিতরের খোতবার পদ্ধতি একটু ভিন্ন ধরনের ছিল। ঈদের খোতবা দেয়ার পালা যার উপর আসত, তিনি নিজ ঘরে ফজরের নামাযের পর, তাঁর কাছে আগত মেহমানদের জন্য মিষ্টান্ন এবং পানীয় তৈরি করতেন। সকাল বেলা ফর্সা হয়ে গেলে তাঁর কাছে প্রথমে মসজিদে হারামের প্রধান খতীবসহ অন্যান্য খতীব, পরে প্রধান মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য মোয়াজ্জিন, তারপর হারাম শরীফের খাদেমগণসহ সবাই আসতেন এবং তারা সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে খতীবের সাথে একসাথে রওনা হতেন। তিনি কাল পোশাক, পাগড়ী এবং তাইলাসান টুপী পরে জায়নামাযে আসা পর্যন্ত সবাই তাঁকে এগিয়ে দিতেন। মোসাল্লা জিবরাঈলেই সাধারণতঃ ইমাম দাঁড়াতেন। মোসাল্লা জিবরাঈল হচ্ছে, বাবুল কাবা এবং রোকনে ইরাকীর মধ্যে।

খতীব নামাযে দাঁড়ালে, যমযমের গম্বুজের উপর থেকে মুয়াজ্জিন ৩ বার বলতেন آثَابَكُمُ اللَّهُ এবং পরে বলতেন الصَّلَاةُ ، رَحِمْكُمُ اللَّهُ ইमाम नामায পড়ে খোতবা দিতেন।

সৌদী শাসনামলে, ইমাম সাহেবদের চালচলন অত্যন্ত সাদা-সিধে। ইমামগণ হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী। যেহেতু হাম্বলী মাজহাব রাষ্ট্রীয় মাজহাব হিসেবে স্বীকৃত। তাঁরা মিম্বারে উঠার পর সালাম দেন। তারপর ২য় আযান দেয়া হয়। আযানের পর খোতবার আগে আর কোন সুন্নাত নামায পড়ার সুযোগ দেয়া হয় না।

ইমাম সাহেব খোতবা শুরু করেন। ইমাম সাহেবরা সাধারণভাবে, মুসলিম বিশ্বের সকল শাসকদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেন। তবে, সৌদী শাসকদের নামে খোতবা দেয়া হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীন নিজেদের নামে খোতবা দিতেন না। কিন্তু আব্বাসী শাসনামল থেকে খলীফাদের নামে খোতবা দেয়ার পদ্ধতি চালু হয় এবং তা প্রায় সৌদী শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত বহাল থাকে।

বর্তমানে মসজিদে হারামের জুমআর নামাযে দুই আযান এবং এক একামত দেয়া হয়। জুমআর নামাযে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকর ও উমরের সময় এক আযানের পদ্ধতিই চালু ছিল। কিন্তু ৩য় খলীফা হযরত উসমানের শাসনামলে, লোকদেরকে তাকিদ দেয়ার উদ্দেশ্যে, সূর্য হেলে যাওয়ার সাথে সাথে, সোকে মদীনার পার্শ্বে যাওরায় অবস্থিত তাঁর বাড়ীতে, আরেকটি আযান প্রবর্তন করেন। এই মিলে মোট আযান সংখ্যা দুই এবং একামত সংখ্যা ১-এ দাঁড়ায়। এটাই পরে সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত হিসেবে গৃহীত হয়। হযরত উসমানের সময় মুসল্লী বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ঐ আযানের ব্যবস্থা করা হয়। ইমাম শাফেঈ (রঃ) তাঁর الام। বইতে সায়েব বিন ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবু বকর এবং উমর (রা) এর সময় ইমাম মিম্বারে বসার পর প্রথম আযান দেয়া হত। তারপর হযরত উসমান (রা) এর সময় মানুষ বেড়ে যাওয়ায়, হযরত উসমান দুই আযানের নির্দেশ দেন। তারপর থেকে দুই আযানের নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইমাম শাফেঈ (রঃ) তাঁর الام বইতে আরো উল্লেখ করেছেন যে, জুমআর দুই আযান হযরত উসমান প্রবর্তন করেছেন বলে আতা স্বীকার করেন না। তাঁর মতে, মুয়াওবিয়াই (রা) ঐ পদ্ধতি চালু করেন।

জুমআর খোতবায় লাঠির উপর ভর দিয়ে খোতবা দেয়া সুন্নত। ইবনে মাজাহ আম্মারাহ বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন যে,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا خَطَبَ فِي الْحَرْبِ خَطَبَ عَلَى قَوْسٍ وَإِذَا خَطَبَ فِي الْجُمْعَةِ خَطَبَ عَلَى عَصَاهُ .
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধের ময়দানে খোতবা দেয়ার সময় ধনুকের উপর এবং জুমআর খোতবা দেয়ার সময় তাঁর লাঠির উপর ভর দিতেন।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00