📄 মাকামে ইবরাহীমের অবস্থান
কা'বা শরীফ ও মাকামে ইবরাহীমের মধ্যকার দূরত্ব সম্পর্কে আযরাকীসহ আরো অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন, হাজারে আসওয়াদ থেকে মাকামে ইবরাহীমের দূরত্ব হচ্ছে ২৯ হাত ৯ আঙ্গুল। কা'বা শরীফের ভিত্তি (প্লিন্থ লেবেল) থেকে মাকামে ইবরাহীমের দূরত্ব হচ্ছে সাড়ে ২৬ হাত। রোকনে শামী থেকে মাকামের দূরত্ব হল ২৮ হাত ১৭ আঙ্গুল। যমযমের পাশ থেকে মাকামের দূরত্ব হচ্ছে ২৪ হাত ২০ আঙ্গুল।
ইবনে আবদুর রব আন্দালুসী তাঁর আল-ফরিদ আল-আকদ বইতে লিখেছেন। মাকামে ইবরাহীম কা'বা শরীফের পূর্বদিকে ২৭ হাত দূরে। মুসল্লীরা এর পেছনে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে কিবলামুখী হয়ে নামায পড়ে। তখন তার ডানে থাকে রোকনে ইরাকী এবং বামে থাকে রোকনে হাজারে আসওয়াদ। মাকামে ইবরাহীমের পাথরটিকে একটি মিম্বারের উপর তুলে রাখা হয়েছে যেন, বন্যার পানি এর উপর দিয়ে গড়াতে না পারে। হজ্জের সময় এটিকে একটি লোহার সিন্ধুকে রাখা হয় যেন মানুষ হাত দিয়ে তা স্পর্শ করতে না পারে।
আযরাকী বিশুদ্ধ সনদসহকারে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর (রা) এর সময় মাকামে ইবরাহীম বর্তমানে যে জায়গায় অবস্থান করছে, সেখানেই ছিল। তবে হযরত উমর (রা) এর খেলাফতের সময় বন্যায় পাথরটি মক্কার নিম্নাঞ্চলে ভেসে যাওয়ায় তাকে এনে পুনরায় কাবার গেলাফের সাথে বেঁধে রাখা হয়। হযরত উমর (রা) খবর পেয়ে মদীনা থেকে ছুটে আসেন, মাকামে ইবরাহীমকে বর্তমান স্থানে রাখেন এবং মাকামে ইবরাহীমের চারদিকে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন যেন পানি একে ভাসিয়ে নিতে না পারে। তাছাড়াও তিনি মক্কায় উঁচু অংশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য আরেকটি বাঁধ নির্মাণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময়েও মাকামে ইবরাহীম বর্তমান স্থানে অবস্থিত ছিল। বন্যার পর হযরত উমর (রা) একে শুধু সাবেক স্থানে পুনর্বহাল করেন।
আল্লামা মুহিব আত্ তাবারী ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেন, মাকামে ইবরাহীম বর্তমানে যে জায়গায় আছে, হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময়ও একই জায়গায় ছিল। কিন্তু জাহেলিয়াতের যুগে, লোকেরা বন্যার ভয়ে ঐটিকে কাবা শরীফের সাথে লাগিয়ে রাখে। ফলে তা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এর সময়ও কাবা শরীফের সাথেই লাগা ছিল।
ইমাম বায়হাকী হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবু বকর (রা) এর সময় মাকামে ইবরাহীম কাবা শরীফের সাথে লাগানো ছিল। হযরত উমর (রা) একে দূরে সরিয়ে বর্তমান স্থানে বসিয়েছেন।
আযরাকী ইবনে আবি মোলায়কা থেকে বর্ণনা করেন, মাকামে ইবরাহীম বর্তমানে যে জায়গায় আছে, জাহেলিয়াতের সময়ও একই জায়গায় ছিল এবং তা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকরের সময়ও একই স্থানে অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু হযরত উমরের সময় বন্যায় তা স্থানচ্যুত হয়ে যাওয়ার পর হযরত উমর তা সাবেক জায়গায় পুনর্বহাল করেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ফতহুল বারীতে লিখেছেন, হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় মাকামে ইবরাহীম কাবার সাথে লাগানো ছিল। কিন্তু হযরত উমর (রা) একে পিছিয়ে দিয়েছেন।
হাফেজ এমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে লিখেছেন, মাকামে ইবরাহীম আগে কাবা শরীফের দেয়ালের সাথে লাগানো ছিল। সেই জায়গাটি আজও পরিচিত। সেটি হচ্ছে, কাবার দরজা থেকে বের হওয়ার সময় ডানে হাজারে আসওয়াদের দিকে, কাবার দরজা সংলগ্ন একটি পৃথক জায়গায়। হযরত ইবরাহীম (আ) কাবা নির্মাণ শেষে ঐ পাথরটি সেখানে কাবার দেয়ালের সাথে রেখে দেন কিংবা পাথরটি সেখানেই থেমে যায় এবং তিনি সেটাকে সেখানেই রেখে দেন। তওয়াফ শেষে, সেখানেই নামায পড়ার জন্য আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। যুক্তির দাবীও তাই যে, যেখানে কাবার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে, মাকামে ইবরাহীম সেখানেই থাকবে। হযরত উমর (রা) একে সেখান থেকে পেছনে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ২য় খলীফা ছিলেন এবং তাঁর পছন্দ অনুযায়ী কুরআন নাযিল হয়েছে। তাই সাহাবায়ে কেরামের কেউ তাঁর এই কাজের বিরোধিতা করেননি।
আল্লামা ইবনুল জাযারী আশ-শাফেঈ (রা) মাকামে ইবরাহীমের ব্যাপারে ৫টি মতামতের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হচ্ছেঃ (১) হযরত উমর (রা) সর্বপ্রথম মাকামে ইবরাহীমকে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করার আদেশ দেন। (২) হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাকামে ইবরাহীম বর্তমান স্থানেই আছে। কিন্তু জাহিলিয়াতের সময় এটাকে কাবার সাথে লাগানো হয় যা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকরের সময় পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। হযরত উমর (রা) সেটিকে সাবেক স্থানেই পুনর্বহাল করেন। (৩) রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই বাইতুল্লাহর কাছ থেকে এটিকে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তর করেন। (৪) হযরত উমর (রা) নিজেই সর্বপ্রথম ঐ পাথরটি বর্তমান স্থানে সরিয়ে আনেন। বন্যার পরে লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি তা সাবেক জায়গায় পুনর্বহাল করেন। (৫) হযরত ইবরাহীম (আ) এর যুগ থেকেই পাথরটি বর্তমান জায়গায় ছিল। উম্মে নহশল বন্যার সময় তিনি এটাকে সাবেক জায়গায় পুনর্বহাল করেন মাত্র।
ইবনে সোরাকা বলেন, কাবার দরজা এবং মোসাল্লা আদম এর মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ৯ হাতের একটু বেশী। হযরত আদম (আ) তওয়াফ শেষে সেখানে নামায পড়েন এবং আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেন। সেখানেই মাকামে ইবরাহীম অবস্থিত। তওয়াফ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে দু'রাকাত নামায পড়েন এবং সেখানেই তাঁর উপর এই আয়াতটি নাযিল হয়:
وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمُ مُصَلَّى .
তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) সেটিকে এর বর্তমান স্থানে সরিয়ে আনেন এবং বর্তমান স্থানটি কাবা শরীফ থেকে ২০ হাত দূরে অবস্থিত। যাতে করে তওয়াফকারীদের তওয়াফে কোন অসুবিধা না হয়। বন্যার পর হযরত উমর (রা) সেটিকে এর সাবেক স্থানেই বহাল করেন মাত্র। (১০)
উম্মে নহশল নামক বন্যার ব্যাপারে মুহিব আত-তাবারী সাহাবী আবদুল মুত্তালিব বিন আবু ওয়াদাআ কর্তৃক বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতের উল্লেখ করেছেন। আবদুল মুত্তালিব মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমান হয়েছেন। তিনি বলেন, মসজিদে হারামের বড় দরজা- বাবে বনি শায়বা দিয়ে ভেতরে বন্যার পানি প্রবেশ করে। হযরত উমর (রা) এর খেলাফতের সময় (হিজরী ১৭ সালে), উম্মে নহশল নামক বন্যার পানিতে মাকামে ইবরাহীম ভেসে যায় এবং তা মক্কার নিম্নাঞ্চলে নিয়ে যায়। সেটিকে লোকেরা কুড়িয়ে এনে কাবার দরজার সামনে গেলাফে কাবার সাথে বেঁধে রাখে। এই ঘটনা উমরকে জানানোর পর তিনি রমযানে মদীনা থেকে উমরাহর এহরাম পরে মক্কায় রওনা হন। বন্যার পানিতে মাকামে ইবরাহীমের নির্দিষ্ট স্থানের চিহ্ন মুছে যায়। ফলে, তিনি লোকদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, কে মাকামের ইবরাহীমের নির্দিষ্ট স্থান সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিফহাল আছে। তখন আবদুল মুত্তালিব বিন আবু ওয়াদাআ বলেন, আমি ঐ সম্পর্কে জানি। আমি অনুরূপ আশংকার ভিত্তিতে, হাজারে আসওয়াদ থেকে মাকামে ইবরাহীম, বাবে কাবা থেকে মাকামে ইবরাহীম এবং যমযম থেকে মাকামে ইবরাহীমের দূরত্ব মেপে রাখি। আমি একটি পাকানো মজবুত রশি দিয়ে তা মাপি এবং রশিটি ঘরে রেখে দেই।
হযরত উমর বলেন, আপনি আমার কাছে বসুন এবং একজন লোককে তা আনার জন্য পাঠিয়ে দিন। একজন লোক পাঠিয়ে রশিটি আনা হল। রশি দিয়ে মেপে দেখা হল, বর্তমান স্থানটি এর যথার্থ সাবেক স্থান। তিনি অন্যান্য লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেন এবং তাদের পরামর্শ নেন। সবাই এই জায়গার ব্যাপারেই রায় প্রকাশ করেন। হযরত উমরের কাছে বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়ার পর তিনি বর্তমান স্থানে, মাকামে ইবরাহীমের নীচে ও চতুষ্পার্শ্বে মজবুত ভিত্তি তৈরি করেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত মাকামে ইবরাহীম ঐ জায়গাতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত উমর মাকামে ইবরাহীমের চতুর্দিকে উঁচু বাঁধ নির্মাণ করেন (১১)
যে সকল বর্ণনায় এসেছে যে মাকামে ইবরাহীম হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় থেকেই কাবা সংলগ্ন ছিল এবং হযরত উমর (রা) তাকে পিছিয়ে এনে বর্তমান স্থানে বসান, এই সকল বর্ণনা বেশী যুক্তিযুক্ত নয়। বরং তা প্রথম থেকেই বর্তমান স্থানে ছিল এবং বন্যার পর হযরত উমর তাকে সাবেক স্থানে বহাল করেন মাত্র।
এই বক্তব্যের সমর্থনে অনেকগুলো বর্ণনা রয়েছে এবং এই মতটিই বেশী জোরদার। এই বক্তব্যের সমর্থনে অনেকগুলো যুক্তি রয়েছে। আমরা এখন সেগুলো আলোচনা করবো।
হযরত উমর (রা) কখনও কোন ব্যাপারে নিজে একাকী কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। বরং সব ব্যাপারে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুসরণ করতেন এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন। বড় বড় সাহাবায়ে কেরামের সাথে তিনি পরামর্শ করাকে জরুরী মনে করতেন। তারীখুল কাবা বইতে উল্লেখ আছে যে, খলীফা হওয়ার পর একবার তিনি কা'বায় ঢুকলেন এবং কা'বার অর্থ-ভাণ্ডারের সম্পদ মুসলমানদের বাইতুলমালে জমা দেয়া কিংবা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার ইচ্ছে পোষণ করলেন। তখন কা'বার সেবক শায়বা বিন উসমান হাজাবী তাঁকে বললেন, আপনার দুই সাথী রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবু বকর (রা) তো তা নেননি। তখন উমর বললেন, আমি তো তাদেরই অনুসরণ করি। তারপর তিনি ঐ সম্পদ নেয়া ছেড়ে দিলেন। এই ঘটনা সামনে রেখে কিভাবে চিন্তা করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় মাকামে ইবরাহীম যেখানে ছিল, সেখান থেকে তিনি তা পিছিয়ে দিয়েছেন? অথচ সেখানেই নামায পড়ার জন্য কুরআনের আয়াতও নাযিল হয়েছে। তদুপরি, হযরত উমরের ইচ্ছা অনুযায়ীই আল্লাহ সেখানে নামায পড়ারও আদেশ দিয়েছেন। তাহলে, উমর কি করে সেই পবিত্র জায়গাটি পরিবর্তন করতে পারেন? সেখান থেকে প্রাথর্ সরানোর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করা যেখানে তিনি নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঐ আয়াত নাযিলের পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)ও সেখানে নামায পড়েন। উমর তা পরিবর্তন করে থাকলে কুরআন ও নবীর বিরোধিতা করেছেন। নাউজুবিল্লাহ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে থেকে সবকিছু নিজ চোখে দেখেছেন। তারপরও, অধিকতর নিশ্চয়তা হাসিলের জন্য সাহাবায়ে কেরামকে মাকামে ইবরাহীমের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন। তখন, মক্কায় বড় বড় সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কেউ হযরত উমরের এই কাজের বিরোধিতা করেননি।
উমর অন্যায় করলে, অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম চুপ করে না থেকে এর বিরোধিতা করতেন। তাঁর খেলাফতের সময় যখন একজন সাহাবী তলোয়ার দেখিয়ে বলেছিলেন, তুমি ভুল পথে চললে, এই তলোয়ার দিয়ে তোমাকে সোজা করে দেব। সেখানে এত বেশী সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম কি করে চুপ করে থাকতে পারেন? এছাড়াও হযরত উমর (রা) অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে মাকামে ইবরাহীমের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার পেছনে তাঁর যে আগ্রহ ছিল, সেটি হচ্ছে, যে স্থানটি সম্পর্কে কুরআন নাযিল হয়েছে এবং যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) নামায পড়েছেন তা ভাল করে জানা। ইবনে হাজার আসকালানী ফতহুল বারীতে এই মতটিকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বলেছেন, এই সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোই সহীহ। আযরাকীও সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকরের যুগে মাকামে ইবরাহীম বর্তমান জায়গাতেই বিদ্যমান ছিল।
আহমদ ও তিরমিজী উকবা বিন আমের থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
لوكَانَ نَبِيُّ بَعْدِي لَكَانَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ .
অর্থ: 'আমার পরে কোন নবী আসলে, উমরই নবী হতেন।' এমন উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী এবং ইসলামের ২য় খলীফা হযরত উমর কি করে নিজের ইচ্ছায় মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর যথার্থ স্থান থেকে সরিয়ে আনতে পারেন? এটা কখনও সম্ভব নয়।
টিকাঃ
১০. প্রাগুক্ত
১১. প্রাগুক্ত
📄 মোসাল্লা আদম ও জিবরাঈল
হযরত আদম (আ) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আসার পর কা'বাকে কেন্দ্র করে আল্লাহর এবাদত করতেন। তখন দুনিয়ায় তাঁর স্ত্রী হাওয়া ছাড়া আর কোন মানুষ ছিল না। পরে ক্রমান্বয়ে তাঁর বংশ বিস্তার হয়। তখন তিনি কা'বার চারদিকে তওয়াফ করতেন। কিন্তু বিশেষ কোন্ জায়গায় নামায পড়তেন সে সম্পর্কে বেশী কিছু জানা যায় না।
'তারীখ এমারতুল মসজিদিল হারাম' বই এর লেখক লিখেছেন যে, ইবনে সোরাকা উল্লেখ করেছেন, কা'বার দরজার সামনে, দরজা বরাবর ৯ হাতের সামান্য বেশী দূরত্বে মোসাল্লা আদম অবস্থিত। তিনি এই জায়গায় নামায পড়েছেন। বর্তমানে, এই জায়গায় তওয়াফের ভিড়ের কারণে নামায পড়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। (১২)
কা'বার দরজা থেকে রোকনে ইরাকীর মাঝে মোসাল্লা জিবরাইল অবস্থিত। হযরত জিবরাইল (আ) এই জায়গায় নামায পড়েছেন।
টিকাঃ
১২. প্রাগুক্ত।
📄 মসজিদে হারামে নামাযের বর্ণনা
মসজিদে হারামের এক রাকাত নামায, অন্য জায়গায় ১ লাখ রাকাতের সমান। অন্যান্য এবাদতের সওয়াবও ১ লাখ গুণ বেশী। তাই মসজিদে হারামে নামায পড়ার জন্য বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আগ্রহ। এই জন্যই দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা ছুটে আসে এই পবিত্র মসজিদে নামায পড়ার জন্য।
বর্তমানে, মসজিদে হারামের ৫ জন ইমাম ও খতীব আছেন। তারা ৫ ওয়াক্ত নামায, জুমআ ও ঈদের নামায পড়ান। একজন প্রধান ইমাম থাকেন। তিনি সাধারণত: দুই ঈদের নামায পড়ান ও খোতবা দেন।
মসজিদে হারামের ৫ ওয়াক্ত নামাযের জামাতে, এক-একজন ইমাম সাহেব নামায পড়ান। নামায আউয়াল ওয়াক্তেই পড়া হয়। নামাযের সময় মসজিদে হারামের বিভিন্ন কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকেন। ইমাম সাহেবদের অনেকেই নামাযের আগে তওয়াফ করেন, তারপর ইমামতী করেন। ইমাম সাহেবদের নামায পড়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বর্তব্যরত পুলিশরা ইমাম সাহেবের নিরাপত্তার জন্য ব্যস্ত থাকে।
নামাযের জামাতের সময় ইমাম সাহেব মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দাঁড়ান এবং সেই দিকে, ইমাম সাহেবের পেছনে প্রথম কাতার দাঁড়ায়। অবশিষ্ট তিনদিকে, কাবা শরীফের গা ঘেঁষে ১ম কাতার অনুষ্ঠিত হয়। ১ম কাতারে দাঁড়ানোর জন্য মুসল্লীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এজন্য অনেকেই আগে জায়নামায বিছিয়ে স্থান দখল করে রাখে। যদিও আলেমদের দৃষ্টিতে এটা ঠিক নয়। কেননা, যে আগে আসবে সে-ই প্রথম কাতারে শামিল হবে এবং প্রয়োজনে সে বসে অপেক্ষা করবে। জায়নামায বিছিয়ে জায়গা দখল করে চলে গিয়ে পরে নিজে এসে সেই জায়গায় দাঁড়ালে অন্য জনের অগ্রাধিকার নষ্ট হয়।
মহিলারা মসজিদে হারামের ভেতরে পেছনের অংশে নামায পড়ে। কিন্তু বর্তমানে যমযমের সামনে থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, সাফা পাহাড়ের আগ পর্যন্ত সবটুকু অংশেই মহিলারা নামায পড়ে। আযানের কিছু আগ থেকেই মহিলাদেরকে তওয়াফ থেকে বের করার চেষ্টা চলে। কিন্তু আযানের সাথে আর কোন মহিলাকে তওয়াফ করতে দেয়া হয় না। তারা পরে তাদের অসম্পূর্ণ তওয়াফ সম্পূর্ণ করে।
মহিলাদেরকে তওয়াফ থেকে সরানোর জন্য বেশ কয়েকজন হিজড়া নিয়োগ করা হয়েছে। এরা নপুংশক। আরবীতে তাদেরকে 'খুনসা' বলে। যে সমস্ত মহিলা আযানের পর তওয়াফ বন্ধ রাখার অনুরোধ মানে না, তারা তাদেরকে শক্তি প্রয়োগ করে মাতাফ থেকে বের করে দেয় এবং তারা মহিলাদের শরীর স্পর্শ করতে পারে। এতে কোন দোষ নেই। কারণ তারা তো আর পূর্ণাঙ্গ পুরুষ নয়।
মসজিদে হারামে তারাবীহর নামাযের দৃশ্য বড়ই মনোরম। এতে দুইজন ইমামের ইমামতিতে ১০, ১০ রাকাত করে বিশ রাকাত নামায পড়া হয় এবং খতমে কুরআন করা হয়। রমযানে, সেহরী খাওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই জেগে থাকে এবং হাট বাজার ও দোকান-পাটসমূহ খোলা থাকে। রমযান মাসের রাতকে দিনের মত মনে হয়। সেহরীর পর ফজরের নামায শেষে সবাই ঘুমায় এবং দিনের প্রথম প্রহর পর্যন্ত গোটা সৌদী আরব ঘুমিয়ে থাকে। তারপর অফিস আদালতের কাজ চলে। ২১শে রমযান থেকে শেষ ১০ দিন তারাবীহ শেষে প্রায় ২ ঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর শুরু হয় জামাতে তাহাজ্জুদের ১০ রাকাত নামায। এই নামাযের কেরাত, রুকু ও সেজদা অতি দীর্ঘ হয়ে থাকে। তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের নামায দুটো শুরুর আগে মুয়াজ্জিন উভয় নামাযের জন্য 'সালাতুল কেয়াম' পড়ার ঘোষণা দেয়। হাদীসের পরিভাষায় এই দুটো নামাযকেই সালাতুল কেয়াম বলে। হাম্বলী মাজহাব অনুযায়ী বিতরের তিন রাকাত নামায ২ নিয়ত ও দুই সালামে পড়া হয়। ইফতারের সময় সোলাইমানিয়া, শিশশা, যাহের ও যমুমে তোপধ্বনি করা হয়।
রমযানের অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়ার উদ্দেশ্যে মসজিদে হারামে ভীষণ ভিড় হয় বিশেষ করে কদরের রাত্রের মর্যাদা লাভের জন্য শেষ ১০ রাত প্রচণ্ড ভীড় হয় এবং ২৭শে রমযান এই ভিড় চূড়ান্তে পৌছে। ২৯ শে রমযান তারাবীর খতমে কুরআন অনুষ্ঠিত হয়। অগণিত লোক শেষ দশকের দিনগুলোতে এতেকাফ করে। রমযানে মসজিদে হারামের দৃশ্য বড়ই মনোরম।
বিভিন্ন নামাযের জামাত শেষে প্রায়ই জানাযার নামাযের ঘোষণা আসে। মুয়াজ্জিন আরবীতে বলেন, الصَّلاةُ عَلَى الأموات অথবা الصَّلاةُ عَلى الميت يَرْحَمْكُمُ اللَّهُ অর্থাৎ এখন মৃত ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমূহের জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে, আল্লাহ আপনাদের উপর রহম করুন। লাশ মহিলা হলে মুআজ্জিন বলেন যে, الصَّلَاةُ عَلَى الْمَيِّتَةِ يَرْحَمْكُمُ اللَّهُ
কোন কোন সময়, জুমআর নামাযের পর, অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে মসজিদে হারামের বাবে আবদুল আযীযের সামনের রাস্তায়, শরীয়াহ কোর্টের রায় অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লোকদের কেসাস বা গর্দান কাটা হয়। শরীয়তের এই বিধানটি মানুষ বড় ঔৎসুক্যের সাথে অবলোকন করে।
রমযান ও হজ্জ মওসুম, উমরাহ এবং হজ্জ আদায়কারীদের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু সংখ্যক নারী ও পুরুষ পর্যবেক্ষক, বক্তা এবং উপদেশদানকারী নিযুক্ত করা হয়।
তারা মসজিদে হারামে বক্তৃতা করেন এবং লোকদের কাছে হজ্জের মাসলা-মাসায়েল বর্ণনা করেন। হিজরে ইসমাঈল, মসজিদে হারামের বিভিন্ন দরজা, মোলতাযাম, বাবে কা'বা এবং যমযম ও সাফা মারওয়া পাহাড়ে তারা অবস্থান করে। মহিলা গাইডগণ নারীদের পথ প্রদর্শন করে।
এ ছাড়াও সারা বছর মসজিদে হারামের ভেতর আসর থেকে এশা পর্যন্ত কিছু ওয়ায-নসীহত এবং বক্তৃতার ব্যবস্থা রয়েছে।
এশার নামাযের পর মসজিদে হারামের বড় তিনটি দরজা ব্যতীত বাকী দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
বছরের খরা মওসুমে, বৃষ্টিপাতের অভাবের সময়, সৌদী বাদশাহর আহ্বানক্রমে, এস্তেঙ্কার নামায তথা 'বৃষ্টি প্রার্থনা'র নামায অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও চন্দ্রগ্রহণের সময় কিংবা সূর্য গ্রহণের সময়ও বিশেষ নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়াও মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা বিশেষ কোন ইসলামী ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে, লাশবিহীন গায়েবানা জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়।
জুমআর নামায পালাক্রমে, বিভিন্ন ইমাম সাহেবরা পড়ান। জুমআর খোতবায় সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের সমস্যা, মুসলমানদের ঈমান আকীদা, আমল, ইসলামের বিশেষ পর্বসমূহের উপর আলোকপাত করা হয় এবং বেদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বক্তব্য পেশ করা হয়। মসজিদে হারামের সকল নামায ও আযান রেডিও এবং টিভিতে প্রচারিত হয়। রাষ্ট্রীয় মেহমানদের জন্য আযানের স্থানে কিংবা এর নীচে নামাযের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। এ আযানের স্থানে একটি রেডিও ষ্টুডিও আছে।
মসজিদে হারামের নামাযের সালাম ফিরনোর পর ইমাম সাহেব সবাইকে নিয়ে একসাথে দু'হাত তুলে দোয়া করেন না। কেননা নামাযের অধিকাংশ অংশই দোয়া। এ ছাড়াও নামাযের সালাম ফিরানোর পর সবাইকে নিয়ে দু'হাত তুলে নিয়মিত দোয়া করার পক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কোন হাদীস এবং আমল বর্ণিত নেই।
📄 মসজিদে হারামে খোতবা দানের পদ্ধতি
হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে মসজিদে হারামের ইমাম জুমআর নামাযের খোতবা দেয়ার উদ্দেশ্যে কাল জামা ও পাগড়ী পরে আসতেন। মিসরের বাদশাহ নাসের এই সকল পোশাক ইমাম সাহেবের জন্য পাঠাতেন। ইমাম সাহেব দুটো ঝাণ্ডার মাঝখানে ধীরে ধীরে চলতেন এবং দু'জন মুয়াজ্জিন ঐ ঝাণ্ডা দুটো আঁকড়ে ধরতেন। সামনে একজন হাতে ফটকা নিয়ে এগিয়ে যেতেন। তিনি তা বাতাসে ফুটিয়ে আওয়ায দিলে, মুসল্লীরা বুঝতে পারত যে ইমাম সাহেব আসছেন। তিনি মিম্বারের কাছে আসার আগ পর্যন্ত এইভাবেই চলত। ইমাম সাহেব প্রথমে হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতেন, সেখানে দোয়া করতেন এবং পরে মিম্বারের দিকে এগুতেন। প্রধান মোয়াজ্জিনও কাল পোশাক পরে কাঁধে তলোয়ার নিয়ে তা হাতে ধরে থাকতেন। তারপর ঝাণ্ডা দুটো মিম্বারের দুই পার্শ্বে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। ইমাম সাহেব, মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে উঠার পর মুয়াজ্জিন তাঁর কাঁধে তলোয়ার ঝুলিয়ে দিতেন। ইমাম সাহেব তলোয়ারের গোড়া দিয়ে মিম্বারের সিঁড়িতে আওয়ায দিতে দিতে মিম্বারের উপরে গিয়ে বসতেন এবং সবাইকে সালাম জানাতেন। ইমাম সাহেব বসার পর মুয়াজ্জিন যমযমের গম্বুজ থেকে আযান দিতেন। খোতবা শেষে, তিনি আগের মত আওয়ায দিয়ে দিয়ে নীচে নেমে আসতেন। এরপর মিম্বারটি সরিয়ে ফেলা হত। কিন্তু ৯৬৬ হিজরীতে, সুলতান সোলায়মান খানের মিম্বারটি মাকামে ইবরাহীমের উত্তর পার্শ্বে স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করার পর প্রায় ৫শ' বছর পর্যন্ত এইভাবে মিম্বার অনড় থাকে এবং ইমাম সেখানে বসেই খোতবা দেন। বর্তমান সৌদী আমলে শুধু এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।
হেজাযে, তুরস্কের উসমানী সুলতানের আমলে, ইমাম সাহেব বাবে বাযান এবং বাবে আলীর মাঝখানে অবস্থিত মাদ্রাসায় প্রবেশ করে প্রথমে দু'রাকাত নামায পড়ে নিতেন। তখন, সেখানে সময় নির্ধারণের জন্য দুটো বড় ঘড়ি ছিল। তখনকার অভ্যাস অনুযায়ী, ইমাম সাহেব ফরজিয়া নামক প্রশস্ত ঢিলা জুব্বা পরিধান করতেন এবং ভারতীয় পদ্ধতিতে সুতা ও সিল্ক মিশ্রিত সাদা পাগড়ী পেঁচিয়ে মাথায় বাঁধতেন। তারপর হাতে লাঠি নিয়ে মোবাল্লেগদের জন্য নির্ধারিত 'মোরাক্কায়' এসে পাগড়ীর উপর তাইলাসান নামক একটি টুপি পরতেন। হাতের লাঠির মাথা তীরের দাঁতের মত ধারাল ছিল। এটাকে গাদ্দারা বলা হত। তারপর সামনের দিকে রওনা হলে, অপেক্ষমান ৪ জন ব্যক্তি তাঁকে মিম্বারের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন এবং একজন ইমাম সাহেবের লাঠি বহন করতেন। তারপর মিম্বারের উপর থেকে সোনার প্রলেপযুক্ত রূপালী তারের নেট সরানো হত এবং ইমাম গিয়ে মিম্বারের উপর বসতেন। তারপর দ্বিতীয় আযান দেয়া হত। একজন মোবাল্লেগ, আযানের মুহাম্মদ শব্দ শুনলে জোরে দরুদ পড়তেন, খোতবায় সাহাবাদের নাম শুনলে তাদের উদ্দেশ্যে রাদিয়াল্লাহ আনহুম বলতেন এবং ইমাম কোন খলীফার নাম উচ্চারণ করলে তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন। তখন খলীফাদের নাম উল্লেখ করে খোতবায় তাদের জন্য দোয়া করা হত। এই অবস্থা বাদশাহ শরীফ হোসাইন বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল মুঈন বিন আ'ওন পর্যন্ত বর্তমান ছিল। মসজিদে হারামের ইমামগণ বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। সুনির্দিষ্ট কোন মাজহাবের ইমাম নিতে হবে এমন কোন ব্যাপার ছিল না। মসজিদে হারামের সব ইমাম খতীব নয়। অর্থাৎ সবাই জুমআর নামায পড়ান না। ফলে, তাদের খোতবাও দিতে হয় না।
ঈদুল ফিতরের খোতবার পদ্ধতি একটু ভিন্ন ধরনের ছিল। ঈদের খোতবা দেয়ার পালা যার উপর আসত, তিনি নিজ ঘরে ফজরের নামাযের পর, তাঁর কাছে আগত মেহমানদের জন্য মিষ্টান্ন এবং পানীয় তৈরি করতেন। সকাল বেলা ফর্সা হয়ে গেলে তাঁর কাছে প্রথমে মসজিদে হারামের প্রধান খতীবসহ অন্যান্য খতীব, পরে প্রধান মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য মোয়াজ্জিন, তারপর হারাম শরীফের খাদেমগণসহ সবাই আসতেন এবং তারা সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে খতীবের সাথে একসাথে রওনা হতেন। তিনি কাল পোশাক, পাগড়ী এবং তাইলাসান টুপী পরে জায়নামাযে আসা পর্যন্ত সবাই তাঁকে এগিয়ে দিতেন। মোসাল্লা জিবরাঈলেই সাধারণতঃ ইমাম দাঁড়াতেন। মোসাল্লা জিবরাঈল হচ্ছে, বাবুল কাবা এবং রোকনে ইরাকীর মধ্যে।
খতীব নামাযে দাঁড়ালে, যমযমের গম্বুজের উপর থেকে মুয়াজ্জিন ৩ বার বলতেন آثَابَكُمُ اللَّهُ এবং পরে বলতেন الصَّلَاةُ ، رَحِمْكُمُ اللَّهُ ইमाम नामায পড়ে খোতবা দিতেন।
সৌদী শাসনামলে, ইমাম সাহেবদের চালচলন অত্যন্ত সাদা-সিধে। ইমামগণ হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী। যেহেতু হাম্বলী মাজহাব রাষ্ট্রীয় মাজহাব হিসেবে স্বীকৃত। তাঁরা মিম্বারে উঠার পর সালাম দেন। তারপর ২য় আযান দেয়া হয়। আযানের পর খোতবার আগে আর কোন সুন্নাত নামায পড়ার সুযোগ দেয়া হয় না।
ইমাম সাহেব খোতবা শুরু করেন। ইমাম সাহেবরা সাধারণভাবে, মুসলিম বিশ্বের সকল শাসকদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেন। তবে, সৌদী শাসকদের নামে খোতবা দেয়া হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীন নিজেদের নামে খোতবা দিতেন না। কিন্তু আব্বাসী শাসনামল থেকে খলীফাদের নামে খোতবা দেয়ার পদ্ধতি চালু হয় এবং তা প্রায় সৌদী শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত বহাল থাকে।
বর্তমানে মসজিদে হারামের জুমআর নামাযে দুই আযান এবং এক একামত দেয়া হয়। জুমআর নামাযে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকর ও উমরের সময় এক আযানের পদ্ধতিই চালু ছিল। কিন্তু ৩য় খলীফা হযরত উসমানের শাসনামলে, লোকদেরকে তাকিদ দেয়ার উদ্দেশ্যে, সূর্য হেলে যাওয়ার সাথে সাথে, সোকে মদীনার পার্শ্বে যাওরায় অবস্থিত তাঁর বাড়ীতে, আরেকটি আযান প্রবর্তন করেন। এই মিলে মোট আযান সংখ্যা দুই এবং একামত সংখ্যা ১-এ দাঁড়ায়। এটাই পরে সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত হিসেবে গৃহীত হয়। হযরত উসমানের সময় মুসল্লী বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ঐ আযানের ব্যবস্থা করা হয়। ইমাম শাফেঈ (রঃ) তাঁর الام। বইতে সায়েব বিন ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবু বকর এবং উমর (রা) এর সময় ইমাম মিম্বারে বসার পর প্রথম আযান দেয়া হত। তারপর হযরত উসমান (রা) এর সময় মানুষ বেড়ে যাওয়ায়, হযরত উসমান দুই আযানের নির্দেশ দেন। তারপর থেকে দুই আযানের নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইমাম শাফেঈ (রঃ) তাঁর الام বইতে আরো উল্লেখ করেছেন যে, জুমআর দুই আযান হযরত উসমান প্রবর্তন করেছেন বলে আতা স্বীকার করেন না। তাঁর মতে, মুয়াওবিয়াই (রা) ঐ পদ্ধতি চালু করেন।
জুমআর খোতবায় লাঠির উপর ভর দিয়ে খোতবা দেয়া সুন্নত। ইবনে মাজাহ আম্মারাহ বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন যে,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا خَطَبَ فِي الْحَرْبِ خَطَبَ عَلَى قَوْسٍ وَإِذَا خَطَبَ فِي الْجُمْعَةِ خَطَبَ عَلَى عَصَاهُ .
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধের ময়দানে খোতবা দেয়ার সময় ধনুকের উপর এবং জুমআর খোতবা দেয়ার সময় তাঁর লাঠির উপর ভর দিতেন।'