📄 মাকামে ইবরাহীমের অর্থ ও তাৎপর্য
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنَا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مصلى - (البقرة : ١٢٥)
অর্থ: 'স্মরণ কর, আমরা যখন বাইতুল্লাহকে লোকদের জন্য কেন্দ্র, শান্তি ও নিরাপত্তার স্থান হিসেবে তৈরি করেছি এবং নির্দেশ দিয়েছি, তোমরা মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়।' আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মাকামে ইবরাহীমের কাছে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে, মাকামে ইবরাহীমের মর্যাদা অনেক বেশী।
হাজারে আসওয়াদ এবং মাকামে ইবরাহীম আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে ইসলামিয়ার জন্য দুটো অতি প্রাচীন নিদর্শন। মুসলিম উম্মাহ ছাড়া এ জাতীয় প্রাচীন নিদর্শন অন্য কোন জাতির নেই। এর একটিকে তওয়াফ শুরুর জায়গায় স্থাপন এবং অপরটির কাছে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়ে এগুলোকে চির স্মরণীয় করে দেয়া হয়েছে। তিরমিযী শরীফে আমর বিন আস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ
إِنَّ الرُّكْنَ وَالْمَقَامَ يَاقُوتَتَانِ مِنْ يَاقُوْتِ الْجَنَّةِ - طَمَسَ اللَّهُ نُورَهُمَا وَلَوْ لَمْ يَطْمَسُ نُورَهُمَا لأَضَاءَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ -
অর্থ: 'নিশ্চয়ই হাজারে আসওয়াদ এবং মাকামে ইবরাহীম বেহেশতের দুটো ইয়াকুত পাথর। আল্লাহ এই দুটো পাথরের নূর মিটিয়ে দিয়েছেন। নূর না মিটালে, এগুলোর আলোতে পূর্ব থেকে পশ্চিম ভূখণ্ড পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল হয়ে যেত।' ফাকেহী উল্লেখ করেছেন, জিবরাঈল (আ) মাকামে ইবরাহীমকে নিয়ে এসে হযরত ইবরাহীম (আ) এর পায়ের নীচে রেখে দেন।
মাকামে ইবরাহীম বলতে কি বুঝায় সে বিষয়ে উলামায়ে কেরাম এবং মুফাসসেরীনদের মধ্যে মতভেদ আছে। বেশী নির্ভরযোগ্য বক্তব্য হচ্ছে, কুরআনে মাকামে ইবরাহীম বলতে সেই ঐতিহাসিক পাথরকে বুঝানো হয়েছে, যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আ) কাবা শরীফ নির্মাণ করেন। তিনি যখন উপরে উঠতেন, পাথরটিও আল্লাহর কুদরতে উপরে উঠত। কেননা, দেয়ালের উঁচু অংশ তৈরির সময় তাকে উপরে উঠতে হয়েছিল। হযরত ইসমাঈল (আ) ইবরাহীম (আ) এর কাজে পাথর যোগান দিতেন এবং ইবরাহীম (আ) নিজ হাতে সেই পাথর দেয়ালের উপর বসিয়ে ক্রমান্বয়ে উঁচু দেয়াল তৈরি করেন। একদিক শেষ হলে, অন্যদিকে যেতেন এবং বাকী দিকগুলোর দেয়াল নির্মাণ করার আগ পর্যন্ত পাথরটি ইবরাহীম (আ) কে নিয়ে কাবার চারপাশে চক্কর লাগাত। এটি ছিল হযরত ইবরাহীম (আ) এর প্রকাশ্য মো'জেযা। এই পাথরটি যেখানে রাখা হয়েছে তার কাছে নামায পড়ার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। ইবনে জারীর তাবারী মুজাহিদ থেকে তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, কুরআনে বর্ণিত 'মাকামে ইবরাহীম' বলতে 'গোটা হারাম এলাকাকে বুঝায়। তাবারী ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, আতা বিন আবি রেবাহ এবং শাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁদের মতে এর অর্থ হচ্ছে 'হজ্জের স্থানসমূহ।' হযরত উমর বিন খাত্তাব, জাবের বিন আবদুল্লাহ এবং ইবনে আব্বাসের অন্য এক রেওয়ায়েতে, কাতাদাহ ও সুদ্দীর মতে এই আয়াতে বর্ণিত মাকামে ইবরাহীম বলতে, কাবা নির্মাণের সময় ব্যবহৃত পাথরটাকেই বুঝানো হয়েছে।
এই কথার সমর্থনে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হজ্জের ব্যাপারে জাবের বিন আবদুল্লাহর বর্ণিত হাদীসটি প্রমাণ বহন করে। হাদীসটির অর্থ হচ্ছে, যখন রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফ শেষ করেন, তখন উমর (রা) জিজ্ঞেস করেন, এটা কি আমাদের পিতার (ইবরাহীমের) মাকাম? তিনি জবাবে বলেন, হ্যাঁ। তারপর উমর (রা) আবারও জিজ্ঞেস করেন, আমরা কি এখানে নামায পড়বো না? তখন কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল হয়ঃ وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمُ مُصَلَّى অর্থ : 'তোমরা মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়।' (বাকারা : ১২৫) এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মাকামে ইবরাহীম বলতে, সেই ঐতিহাসিক পাথরটিকেই বুঝানো হয়েছে, যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আ) কাবা শরীফ নির্মাণ করেন। অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা) মাকামে ইবরাহীমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন হযরত উমর (রা)। তিনি প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কি আমাদের পিতা ইবরাহীমের মাকাম নয়? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ। উমর আবারও প্রশ্ন করেন, আমরা কি এখানে নামায পড়বো না? রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, এ ব্যাপারে আমাকে কোন আদেশ দেয়া হয়নি। কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই তখন উপরাক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হাজারে আসওয়াদে চুমু দিলেন। তারপর তওয়াফের প্রথম তিন চক্করের রমল করলেন এবং অবশিষ্ট ৪ চক্করে স্বাভাবিকভাবে চললেন। পরে মাকামে ইবরাহীমের কাছে এসে পড়লেন وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمُ مُصَلَّى । তারপর তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর ও কাবার মাঝখানে রেখে দু'রাকাত নামায পড়লেন।
বুখারী শরীফে হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমর বলেন, আমি তিন বিষয়ে আমার রবের সাথে কিংবা আমার রব তিন বিষয়ে আমার সাথে একমত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আপনি যদি মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়তেন! তখন ঐ আয়াতটি নাযিল হয় যে তোমরা মাকামে ইবরাহীমের কাছে নামায পড়। এইটি একটা লম্বা হাদীসের অংশবিশেষ।
উপরোক্ত ৪টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মাকামে ইবরাহীম বলতে সেই ঐতিহাসিক পাথরটিকেই বুঝানো হয়েছে। এ ছাড়াও ৫ম প্রমাণ হচ্ছে, আইয়ামে জাহেলিয়াত থেকে ইসলামী যুগ পর্যন্ত এবং আজ পর্যন্তও মাকামে ইবরাহীম বলতে মক্কার লোকেরা ঐ পাথরটিকেই বুঝে থাকেন। ৬ষ্ঠ প্রমাণ হচ্ছে, মাকামে ইবরাহীমের কাছে নামায পড়ার ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশের সাথে গোটা হারাম এলাকায় নামায পড়ার বিশেষ কোন তাৎপর্য নেই। বরং এই পাথরের কাছে নামায পড়াই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
৭ম প্রমাণ হচ্ছে, তখনকার এই নরম পাথরটিতে হযরত ইবরাহীম (আ) এর পায়ের ছাপ লেগেছে। এজন্য এ পাথরটি হযরত ইবরাহীম (আ) এর দিকে সম্বোধন করে মাকামে ইবরাহীম বলাটা বেশী যুক্তিযুক্ত।
৮ম প্রমাণ হচ্ছে, হযরত ইবরাহীম (আ) এর উপর দাঁড়িয়ে গোসল করেছেন বলে এক হাদীসে এসেছে। তাই এটিকে ইবরাহীম (আ) এর দাঁড়াবার স্থান বা মাকাম বলা হয়। কেননা, মাকাম শব্দের অর্থ হচ্ছে দাঁড়াবার স্থান।
হযরত ইবরাহীম (আ) এই পাথরকে কি কাজে ব্যবহার করেছিলেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, তিনি এর উপর নিজ মাথা ধুয়েছেন। কারুর মতে, তিনি এর উপর নিজ পা ধুয়েছেন। এইসব তথ্যের ভিত্তিতেও একে মাকামে ইবরাহীম বলা যায়। তবে তিনি এর উপর দাঁড়িয়ে যে কাবা নির্মাণ করেছেন এটিই বেশী নির্ভরযোগ্য। মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়ার নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য তাওয়াফ শেষে দু'রাকাত নামায, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে পড়তে হবে। সুন্নত হচ্ছে, মাকামে ইবরাহীম ও কাবা শরীফকে সামনে রেখে নামায পড়া। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) এইভাবেই মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়েছেন। তবে হুবহু মাকামে ইবরাহীমকে সামনে রাখতে হবে কিংবা সেই সোজা বরাবর পেছনে দাঁড়াতে হবে এটা জরুরী নয়। কেননা, মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি এত ছোট যে, একজন মুসল্লীও এর পেছনে হুবহু দাঁড়াতে পারেনা। তাই এর নিকটবর্তী জায়গায় নামায পড়লেই চলে। ভিড় থাকলে মসজিদে হারামের যে কোন জায়গায় তওয়াফ শেষে দু'রাকাত নামায পড়লেই চলে। এ ছাড়াও ৫ ওয়াক্ত নামাযের জামাতের সময় ইমাম সাহেবের মাকামে ইবরাহীমের পেছনেই দাঁড়ানো উত্তম। অবশ্য প্রয়োজনে, যেমন ভিড়ের কারণে, নামাযের জায়গা বৃদ্ধির জন্য মাকামে ইবরাহীমের সামনে অর্থাৎ কাবার দেয়ালের সাথে লেগে দাঁড়ালেও কোন আপত্তি নেই।
হযরত ইবরাহীম (আ) এর মো'জেযার কারণে, তাঁর পায়ের নীচের পাথরটি ভিজে এতে তাঁর পায়ের দাগ বসে যায়। কাবা তৈরির পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর পায়ের ছাপ এতে লেগে আছে। যদিও মানুষের মসেহ অর্থাৎ হাতের স্পর্শে যুগ যুগ ধরে এর আসল রূপ বা ছাপ অবশিষ্ট নেই। দীর্ঘ ৪ হাজার বছর পর্যন্ত কোন জিনিসকে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাতে স্পর্শ করলে, সেই জিনিসটি তার আসল রূপ বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে থাকা মুশকিল। তামা ও আয়নার তৈরি বাক্সে রাখার আগ পর্যন্ত, মানুষ তা হাতে ধরে দেখত এবং তাতে হাত মুছে বরকত হাসিল করার চেষ্টা করত, যদিও এতে মসেহ করার হুকুম দেয়া হয়নি। বরং আদেশ দেয়া হয়েছিল এর পার্শ্বে বা পেছনে নামায পড়ার জন্য।
পূর্বের সকল দর্শকরাই এই পাথরের উপর হযরত ইবরাহীম (আ) এর পায়ের দাগ বা চিহ্ন দেখতে পেয়েছে। আবদুল্লাহ বিন ওহাব হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, আনাস বলেন, আমি মাকামে ইবরাহীমে হযরত ইবরাহীম (আ) এর আঙ্গুল ও তাঁর পায়ের পাতার মর্ধবর্তী অংশের দাগ দেখেছি। কিন্তু মানুষের হাতের স্পর্শে ক্রমান্বয়ে তার চিহ্ন লোপ পেতে থাকে।
আইয়ামে জাহেলিয়াতের মূর্তি ও পাথর পূজার সময়ে লোকেরা হাজারে আসওয়াদ এবং মাকামে ইবরাহীমের পূজা করেনি। হারাম সীমানার ভেতরের পাথরের মর্যাদা তাদের কাছে অনেক বেশী ছিল। তারপরও তারা এই দুটো পাথরের পূজা না করায় বুঝা যায় যে, এগুলোর শাশ্বত ও চিরন্তন মর্যাদা অক্ষুণ্ণ আছে এবং পাথর ও মূর্তিপূজার প্রভাব থেকে এ দুটো পাথর সম্পূর্ণ মুক্ত আছে। তাই, যারা অভিযোগ করে যে, এই দুটো পাথরের মর্যাদা দিয়ে ইসলাম পাথর ও মূর্তিপূজার সাথে কিছুটা আপোস করেছে, তাদের ঐ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা, স্বয়ং মূর্তিপূজার সময়ও এগুলোর পূজা না করে, প্রাচীনকাল থেকেই যখন এগুলোকে সম্মান করে আসা হচ্ছে, তখন ইসলাম তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে মূর্তিপূজার সাথে তার আপোস করার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না।
ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, আবু সাঈদ খুদরী (রা) হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রা) কে মাকামে ইবরাহীমের নিদর্শন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে আবদুল্লাহ বিন সালাম বলেন, মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি বর্তমানে যা আছে তাই ছিল। কিন্তু আল্লাহ এটাকে বিশেষ নিদর্শন বানাতে চেয়েছেন। আল্লাহ যখন ইবরাহীম (আ) কে লোকদের প্রতি হজ্জের আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন তখন তিনি এই পাথরের উপর দাঁড়ান। পাথরটি তাকে নিয়ে সর্বোচ্চ পাহাড়ের সমান উঁচুতে উঠে। তিনি বলেন, হে লোকেরা, তোমরা তোমাদের রবের ডাকে সাড়া দাও। লোকেরা সাড়া দিয়ে বলল لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ অর্থ : 'আমরা হাজির। হে আল্লাহ! আমরা হাজির।' তখন পাথরটির উপর তাঁর পায়ের দাগ পড়ে যায়। তিনি ঐ কাজ থেকে অবসর হওয়ার পর পাথরটিকে তাঁর সামনে রাখার জন্য নির্দেশ দেন এবং পাথরটিকে সামনে রেখে তিনি বাবুল কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়েন। (৫)
ইবনে জরীর হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ইবরাহীম (আ) কাবা নির্মাণ শেষ করার পর আল্লাহ তাঁকে মানুষের প্রতি হজ্জে আসার আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন। তখন তিনি উঁচুতে উঠেন এবং বলেন, 'হে লোকেরা। তোমাদের রব তোমাদের উদ্দেশ্যে একটি ঘর তৈরি করে দিয়েছেন, তোমরা সেই ঘরের হজ্জ কর এবং আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও।' মানুষ তখন বাপের পৃষ্ঠদেশ এবং মায়ের পেট থেকে সাড়া দিয়ে বলেছে, 'আমরা তোমার ডাকে সাড়া দিলাম। হে আল্লাহ, আমরা হাজির।' তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আজ যারা হজ্জ করে তারা সবাই হযরত ইবরাহীম (আ) এর ডাকে কম বেশী সাড়া প্রদানকারী।
ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, বোরাইদা বলেন, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর ৪২ জন সাহাবীর সাথে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামায পড়ছিলেন এবং সাহাবায়ে কেরাম তাঁর পেছনে বসা ছিলেন। নামায শেষে তিনি নিজের ও কা'বার মাঝে অবস্থিত স্থান থেকে কিছু একটা ধরার উদ্দেশ্যে ঝুঁকে পড়লেন। তারপর সাহাবায়ে কেরামের দিকে ফিরে আসলেন, তাঁরা সবাই উঠে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে হাতের ইশারায় বললেন, তোমরা সবাই বস। তাঁরা সবাই বসলেন। নবী করীম (সা) প্রশ্ন করেন, আমি নামায শেষে আমার ও কাবার মাঝখানের স্থান থেকে কিছু একটা ধরার জন্য ঝুঁকেছিলাম, তা কি তোমরা দেখেছ? তারা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমার সামনে বেহেশত পেশ করা হয়েছিল। আমি এতে এমন কল্যাণ, সৌন্দর্য্য ও আশ্চর্যজনক জিনিসসমূহ দেখেছি, যা আর কোথাও দেখিনি। আমার পাশ দিয়ে এমন একটি সুন্দর আঙ্গুরের ছড়া অতিক্রম করেছে যা আমাকে অবাক করে দিয়েছে। আমি তা ধরার জন্য চেষ্টা করি, কিন্তু তা আমাকে অতিক্রম করে চলে গেল। যদি আমি তা ধরতে পারতাম তাহলে তোমাদের সামনে আমি তা মাটিতে পুতে চাষ করতাম এবং তোমরা বেহেশতের ফল খেতে পারতে।(৬)
উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে মাকামে ইবরাহীমের মর্যাদা ও গুরুত্ব কত বেশী তা ফুটে উঠেছে।
টিকাঃ
৫. আখবারে মক্কা।
৬. প্রাগুক্ত
📄 মাকামে ইবরাহীমের পাথরের বর্ণনা
মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি নরম এবং জলীয় পদার্থপূর্ণ পাথরশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তা কঠিন পাথরশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়, যাতে লোহা দিয়ে আঘাত দিলে আগুন বের হয়। পাথরটি বর্গাকৃতির এবং দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা প্রায় একহাত।
মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হোসাইন বা সালামাহ বলেন, 'আমি ১৩৩২ হিজরীতে কাবা শরীফের চাবিরক্ষক মুহাম্মাদ সালেহ বিন আহমদ বিন মুহাম্মাদ শায়বীর বিশেষ অনুমতিক্রমে তাঁর সাথে মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি দেখি। সেটি রূপার তৈরি বিশেষ কেসের মধ্যে রাখা হয়েছে। পাথরটি বর্গাকৃতির, এর রং সাদা-কাল ও হলুদ রং মিশ্রিত। আমি এতে হযরত ইবরাহীম (আ) এর পায়ের চিহ্ন দেখতে পাই।' (৭)
পাথরের মাঝখানে হযরত ইবরাহীম (আ) এর দুই পায়ের চিহ্ন রয়েছে। এতে ডিম্বাকৃতির গর্ত আছে। মানুষের হাতের স্পর্শে এবং যমযমের পানি দিয়ে ধোয়াতে ঐ গর্তটি সৃষ্টি হয়। অধিক পরিমাণে মানুষের হাতের স্পর্শে পায়ের চিহ্নের জায়গাটি গর্তে রূপান্তরিত হয়।
মক্কার আরেকজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শেখ তাহের কুর্দী সর্বশেষ নিজ চোখে ঐ পাথরটি দেখেন। তাঁর উদ্দেশ্যে মাকামে ইবরাহীমের কেস খোলা হয়। তিনি ভেতরে যা দেখতে পান তা হচ্ছে এই :
মাকামে ইবরাহীমের পাথরটিকে মার্বেল পাথরের তৈরি একটি ছোট পাকা ভিত্তির উপর রাখা হয়েছে। মার্বেল নির্মিত পাকা ভিত্তিটির আয়তন, পাথরের আয়তনের সমান। এর উচ্চতা হচ্ছে ১৩ সেন্টিমিটার। পাথরটিকে রুপা দিয়ে পাকা ভিত্তির সাথে মজবুত করে বসানো হয়েছে।
ছোট পাকা মজবুত ভিত্তিটুকু আবার চতুর্দিকে মার্বেল পাথর নির্মিত বড় পাকা ভিত্তির মাঝে অবস্থিত। বড় ভিত্তিটির চারদিকের দৈর্ঘ্য এক মিটার। যমীন থেকে এর উচ্চতা হচ্ছে ৩৬ সেন্টিমিটার। এর মারবেল পাথর দু'টোর রং হচ্ছে সাদা। ঐ বড় ভিত্তিটির চতুর্দিকে, মাথা সমান উঁচু চার কোণ বিশিষ্ট পিরামিড আকৃতির একটি বাক্স ছিল। কোন জানালা ছিল না। তবে এর রং হলুদ ও লালের মাঝামাঝি এবং কিছুটা সাদা রং মুখী।
মাকামে ইবরাহীমের পাথরের আকৃতি ঘনত্বপূর্ণ। এর উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার। উপরের দিক থেকে তিন বাহুর প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩৬ সেন্টিমিটার এবং ৪র্থ বাহুটির দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩৮ সেন্টিমিটার। উপরের দিক থেকে এর আয়তন ১৪৬ সেন্টিমিটার এবং নীচের দিকটা উপরের দিকের চাইতে কিছুটা চেপ্টা। ফলে, নীচের দিকের আয়তন হচ্ছে ১৫০ সেন্টিমিটার। এটি শক্ত পাথর নয়। যে কোন দুর্বল লোকও পাথরটি বহন করতে পারবে। এর ওজন কম।
পাথরটিতে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পায়ের দাগের গভীরতা, পাথরটির উচ্চতার অর্ধেক পরিমাণ। একটি পায়ের দাগের গভীরতা হচ্ছে ৯ সেন্টিমিটার। আমরা এতে আঙ্গুলের কোন চিহ্ন দেখিনি। দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হওয়ায় এবং এর উপর মানুষের হাতের স্পর্শে পায়ের আঙ্গুলের চিহ্নগুলো মুছে গেছে। পায়ের গোড়ালীর চিহ্ন তেমন একটা বুঝা যায় না। তবে ভাল করে লক্ষ্য করলে তা বুঝা যায়।
পাথর ও রূপার উপর দিয়ে প্রতিটি পায়ের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২৭ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে ১৪ সেন্টিমিটার। পাথরের নীচের অংশে রূপাসহ প্রতিটি পায়ের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২২ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে ১১ সেন্টিমিটার। দুই পায়ের মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে প্রায় এক সেন্টিমিটার। বরকতের উদ্দেশ্যে লোকদের হাতের অধিক স্পর্শে এ ব্যবধান সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। হাতের স্পর্শের কারণে উপর থেকে পায়ের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ দীর্ঘায়িত হয়েছে। দীর্ঘ ৪ হাজার বছর অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও মাকামে ইবরাহীমে এখন পর্যন্ত পায়ের চিহ্ন অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কেননা, আল্লাহ একে স্থায়ী নিদর্শন হিসেবে কুরআনে উল্লেখ করেছেন। সেই আয়াতটি হচ্ছে:
فِيْهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتُ مَقَامُ إِبْرَاهِيمَ -
অর্থ: 'এতে মাকামে ইবরাহীমের সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে।'
মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি রূপা দ্বারা মোড়ানো। প্রকৃত পাথরটির সব অংশ দেখা যায় না। শুধু ভেতরে পায়ের গর্ত এবং দুই পায়ের পাশ দেখা যায়। তবে দুই পায়ের নীচ সমতল নয়। এতে কিছু ছোট ছোট উঁচু অংশ আছে।
এই পাথরটি তামার তৈরি একটি বর্গাকৃতির বেষ্টনীর মধ্যে, ৪ খুটির উপর নির্মিত একটি গম্বুজের নীচে ছিল। ঐটির আয়তন ছিল ৩০৬ মিটার।” (৮)
তাহের কুর্দীর ঐ বর্ণনা বেশ দীর্ঘ। ৫৭৮ হিজরীতে, স্পেনের ইবনে যোবায়ের মক্কায় হজ্জ করতে এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে যে, মাকামে ইবরাহীমের পাথরে হযরত ইবরাহীম (আ) এর আঙ্গুল ও পায়ের চিহ্ন সুস্পষ্ট। তিনি আরো বলেন, পাথরটি রূপা দ্বারা মোড়ানো এবং পাথরের উপরের অংশ নীচের অংশের চেয়ে চওড়া। (৯)
টিকাঃ
৭. তারিখ এমরাতুল মাসজিদিল হারাম, হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ।
৮. প্রাগুক্ত
৯. প্রাগুক্ত
📄 মাকামে ইবরাহীমের সংরক্ষণ
১৬০ হিজরীতে, খলীফা মুহাম্মাদ মাহদী হজ্জে আসেন। তিনি যখন দারুন নাদওয়ায় অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর কাছে দুপুরে নিরিবিলি সময়ে ওবায়দুল্লাহ বিন ইবরাহীম হাজাবী উপস্থিত হন এবং তাঁকে মাকামে ইবরহীমের পাথরটি দেখান। মাহদী এতে খুশী হন। তিনি এতে চুমু দেন, মসেহ করেন, পানি ঢালেন, সেই পানি পান করেন, নিজের পরিবার-পরিজনদেরকে দিয়েও তা স্পর্শ করান এবং সবাই ঐ পানি পান করে। তারপর সেই পাথরটি পুনরায় মাকামে ইবরাহীমের স্থানে ফেরত পাঠান। মাহদী ওবায়দুল্লাহকে বিরাট পুরস্কার এবং নাখলা উপত্যকায় অনেক যমীন দেন। পরে ঐ যমীন বিক্রি করে তিনি ৭ হাজার দীনার লাভ করেন।
১৬১ হিজরীতে, কাবার খাদেম খলীফা মাহদীকে লেখেন যে, আমরা মাকামে ইবরাহীমের পাথরটি ভেঙ্গে গিয়ে নষ্ট হওয়ার আশংকা করছি। খলীফা মাহদী ১ হাজার দীনার পাঠান। তখন পাথরটি উপর থেকে নীচ পর্যন্ত রূপা দিয়ে মজবুত করে মোড়ানো হয়। খলীফা মাহদীই সর্বপ্রথম মাকামে ইবরাহীমের পাথরটিকে রূপা দিয়ে মজবুত করে মুড়িয়ে দেন। এর আগে পাথরটি প্রয়োজনে স্থানান্তরিত হত।
খলীফা হারুনুর রশীদের আমলে, ১৭৯ হিজরীতে দেখা গেল যে, মাকামে ইবরাহীমের পাথরে বাঁধানো রূপা নড়বড়ে হয়ে গেছে। তখন পুনরায় মজবুত করে রূপা দিয়ে পাথরটি মোড়ানো হয়। তারপর ২৩৬ হিজরীতে, খলীফা মোতাওয়াক্কেল আব্বাসী রূপার উপর পুনরায় ৮ হাজার মেসকাল সোনা এবং রূপার ৭০ হাজার দেরহাম দিয়ে তা মোড়ান ও মজবুত করে বসিয়ে দেন। তারপর, মক্কার গভর্নর জাফর বিন ফদল এবং মুহাম্মাদ বিন হাতেম, মোতাওয়াক্কেলের মোড়ানো ও লাগানো সোনা-রূপাগুলো ২৫১ হিজরীতে খুলে মক্কায় ফেতনা সৃষ্টিকারী ইসমাঈল বিন ইউসুফ আলাওয়ীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যয় করে। ২৫৬ হিজরী পর্যন্ত খলীফা মাহদী কর্তৃক মোড়ানো রূপা দ্বারা মাকামে ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিল।
২৫৬ হিজরীতে, কাবার সেবক, মক্কার গভর্নর আলী বিন হাসান আব্বাসীকে বলেন, মাকামে ইবরাহীমের অবস্থানের মজবুতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং পাথরটি নষ্ট হওয়ার সমূহ আশংকা দেখা দিয়েছে। তাই একে মজবুত করে মুড়িয়ে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা দরকার। গভর্নর ঐ আহ্বানে সাড়া দেন এবং ১৯৯২ মেসকাল সোনা দিয়ে একটি বেষ্টনী ও আরেকটি রূপার বেষ্টনী তৈরি করেন। তারপর পাথরটিকে মজবুত করে লাগান ও মাকামে ইবরাহীমে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ফাসী বলেন, এখন মাকামে ইবরাহীম পাথর খোদাইকৃত সরু ৪ খুঁটির উপর নির্মিত কাঠের তৈরি উঁচু একটি গম্বুজের নীচে অবস্থিত। এতে লোহার তৈরি ৪টি জানালা ছিল। এবং প্রতি দুটো খুঁটির মাঝে একটি করে জানালা অবস্থিত ছিল। পূর্বদিকে ছিল ভেতরে প্রবেশ করার দরজা। গম্বুজটির ভেতরে সোনা এবং উপরে অন্যান্য কারুকার্য করা ছিল। উপরে সাদা রং এর প্রলেপ ছিল।
৮১০ হিজরীতে, মিসরের বাদশাহ নাসের ফারাজ মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামাযের স্থানে একটি ৪ পা বিশিষ্ট ছায়াদার গম্বুজ তৈরি করেন। এর নীচে সোনা এবং উপরে সাদা প্রলেপ দেন। মাকামে ইবরাহীমের জন্য দুটো গম্বুজ ছিল। একটি কাঠের এবং অন্যটি লোহার তৈরি। হজ্জের ভিড়ের সময় লোহার তৈরি গম্বুজটি ব্যবহার করা হত। কেননা, ভিড়ের সময় লোহার তৈরি গম্বুজটি মাকামে ইবরাহীমের হেফাজতের জন্য বেশী উপযোগী।
৫৭৯ হিজরীতে, স্পেনের ইবনে যোবায়ের মক্কায় হজ্জ শেষে তাঁর বইতে লেখেন যে, মাকামে ইবরাহীম সর্বদা তার নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না। এক সময় মাকামে ইবরাহীম তার সুনির্দিষ্ট স্থানে থাকে, অন্য সময় কাবার ভেতরে ছাদে উঠার সিঁড়ির গোড়ায় নিয়ে রাখা হয়। আজকাল, এর উপর কাঠের তৈরি একটি গম্বুজ আছে। হজ্জ মওসুমে কাঠের গম্বুজটি খুলে ফেলা হয় এবং লোহার গম্বুজটি লাগানো হয়। ফাসী বলেন, কবে মাকামে ইবরাহীমকে তার নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ীভাবে বসানো হয় তা জানা যায় না।
৯০০ হিজরী এবং ৯১৫ হিজরীতে, খাজা মুহাম্মদ বিন এবাদুল্লাহ রূমী মাকামে ইবরাহীমের গম্বুজ পুনর্নির্মাণ করেন এবং গম্বুজে অনেক সোনা লাগান। এছাড়াও গম্বুজের খুঁটি এবং কাঠের মধ্যেও সোনা লাগান।
হিজরী ১,০০০ সালে, শরীফ সুলতানের নির্দেশক্রমে, শেখ আলী আল-খালাওতী মাকামে ইবরাহীমের ছাদ নষ্ট হতে দেখেন। তিনি ১০০১ হিজরীতে ছাদের সকল কাঠ পরিবর্তন করে এর সংস্কার করেন।
সানজারী উল্লেখ করেছেন যে, সুলতান মুরাদ বিন আহমদ খানের নির্দেশক্রমে, ১০৪৯ হিজরীতে, মাকামে ইবরাহীম পুনর্নির্মাণ করা হয়, এতে সোনার নকশা এবং বিভিন্ন রং এর প্রলেপ দেয়া হয়। মক্কা ও জেদ্দার গভর্নর সোলায়মান বেগ, আগা মুহাম্মদ কুলারের খরচে ঐটি নির্মাণ করেন।
১০৭২ হিজরীতে, সুলতান মুহম্মাদ বিন ইবরাহীম খানের নির্দেশক্রমে, মাকামে ইবরাহীমের পুনরায় সংস্কার করা হয়। ১০৯৯ হিজরীতে, মুহাম্মদ বেগ মাকামে ইবরাহীমের উপরিভাগ সংস্কার করেন। ১১১২ হিজরীতে, ইবরাহীম বেগ মাকামে ইবরাহীমের সকল নির্মাণ কাজ ভেঙ্গে ফেলেন এবং মাকামে ইবরাহীমের স্থানটি মার্বেল পাথর দ্বারা তৈরি করেন। তিনি রূপা ও পাথরের মাঝখানে শীশা ঢেলে, রূপাকে আরো মজবুত করেন এবং পাথরটিকে মজবুত করে আটকিয়ে দেন। কাঠের তৈরি গম্বুজ পরিবর্তন করেন, রূপা সরিয়ে ফেলেন এবং সোনালী পাত ও রং দিয়ে তা পুনঃনির্মাণ করেন।
১১৩৩ হিজরীতে, মুহাম্মাদ আফেন্দী, মাকামে ইবরাহীমের পাথরের বাক্সটি নতুন কাঠ দিয়ে তৈরি করেন এবং পুরাতন রূপা সরিয়ে নতুন রূপা দিয়ে তা মুড়িয়ে দেন। উল্লেখ আছে যে, সুলতান আবদুল আযীয উসমানী মাকামে ইবরাহীমের গম্বুজ দেড় হাত উঁচু করেন।
উসমানী শাসকদের আমলে কাবায় গেলাফ লাগানোর সময়, তারা মাকামে ইবরাহীমেও কাল গেলাফ লাগায়। কাবার গেলাফের অনুসরণে, এতে দরজার গেলাফ এবং বেষ্টনী দেয়। গেলাফে সোনালী মিশ্রণযুক্ত রূপার তার দেয়া হয় এবং তা কাঠের বাক্সের উপর পরানো হয়। বাক্সটি লোহার জানালার ভেতরে পাথরের উপর অবস্থিত ছিল।
মাকামে ইবরাহীমের উপর যে সকল গম্বুজ ও ঘেরাও ছিল, সেগুলো হাজী ও তওয়াফকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মাতাফে সংকীর্ণতা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেন। পরে ১৩৮৪ হিজরীতে, রাবেতা আলমে ইসলামীর এক প্রস্তাব মোতাবেক, মাকামে ইবরাহীমের বর্তমান সকল অতিরিক্ত জিনিস ও নির্মাণ কাজ সরিয়ে তার পরিবর্তে সেখানে পরিমাণমত মোটা ও শক্তিশালী ক্রিস্টাল গ্লাসের একটি বাক্স যাতে তওয়াফকারীদের গায়ে ধাক্কা না লাগে এবং দেখতেও সুন্দর দেখা যায় এমনটি নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আযীয উৎকৃষ্ট ক্রিস্টাল পাথরের বাক্স তৈরী এবং তা চতুর্দিক থেকে লোহা দ্বারা বেষ্টন করার নির্দেশ দেন। ভেতরে, মার্বেল পাথরের একটি ভিত্তি তৈরি করে তার উপর পাথরটি রাখা হয়। ভিত্তিটির আয়তন ১৮০×১৩০, এবং উচ্চতা ৭৫ সেন্টিমিটারের বেশী নয়। হিজরী ১৩৮৭ সালে তা সম্পন্ন হয়। এর ফলে, মাতাফের প্রশস্ততা বৃদ্ধি পায় এবং তওয়াফকারীরা আরামের সাথে তওয়াফ করতে সক্ষম হন।
📄 মাকামে ইবরাহীমের অবস্থান
কা'বা শরীফ ও মাকামে ইবরাহীমের মধ্যকার দূরত্ব সম্পর্কে আযরাকীসহ আরো অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন, হাজারে আসওয়াদ থেকে মাকামে ইবরাহীমের দূরত্ব হচ্ছে ২৯ হাত ৯ আঙ্গুল। কা'বা শরীফের ভিত্তি (প্লিন্থ লেবেল) থেকে মাকামে ইবরাহীমের দূরত্ব হচ্ছে সাড়ে ২৬ হাত। রোকনে শামী থেকে মাকামের দূরত্ব হল ২৮ হাত ১৭ আঙ্গুল। যমযমের পাশ থেকে মাকামের দূরত্ব হচ্ছে ২৪ হাত ২০ আঙ্গুল।
ইবনে আবদুর রব আন্দালুসী তাঁর আল-ফরিদ আল-আকদ বইতে লিখেছেন। মাকামে ইবরাহীম কা'বা শরীফের পূর্বদিকে ২৭ হাত দূরে। মুসল্লীরা এর পেছনে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে কিবলামুখী হয়ে নামায পড়ে। তখন তার ডানে থাকে রোকনে ইরাকী এবং বামে থাকে রোকনে হাজারে আসওয়াদ। মাকামে ইবরাহীমের পাথরটিকে একটি মিম্বারের উপর তুলে রাখা হয়েছে যেন, বন্যার পানি এর উপর দিয়ে গড়াতে না পারে। হজ্জের সময় এটিকে একটি লোহার সিন্ধুকে রাখা হয় যেন মানুষ হাত দিয়ে তা স্পর্শ করতে না পারে।
আযরাকী বিশুদ্ধ সনদসহকারে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবু বকর এবং হযরত উমর (রা) এর সময় মাকামে ইবরাহীম বর্তমানে যে জায়গায় অবস্থান করছে, সেখানেই ছিল। তবে হযরত উমর (রা) এর খেলাফতের সময় বন্যায় পাথরটি মক্কার নিম্নাঞ্চলে ভেসে যাওয়ায় তাকে এনে পুনরায় কাবার গেলাফের সাথে বেঁধে রাখা হয়। হযরত উমর (রা) খবর পেয়ে মদীনা থেকে ছুটে আসেন, মাকামে ইবরাহীমকে বর্তমান স্থানে রাখেন এবং মাকামে ইবরাহীমের চারদিকে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন যেন পানি একে ভাসিয়ে নিতে না পারে। তাছাড়াও তিনি মক্কায় উঁচু অংশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য আরেকটি বাঁধ নির্মাণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময়েও মাকামে ইবরাহীম বর্তমান স্থানে অবস্থিত ছিল। বন্যার পর হযরত উমর (রা) একে শুধু সাবেক স্থানে পুনর্বহাল করেন।
আল্লামা মুহিব আত্ তাবারী ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেন, মাকামে ইবরাহীম বর্তমানে যে জায়গায় আছে, হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময়ও একই জায়গায় ছিল। কিন্তু জাহেলিয়াতের যুগে, লোকেরা বন্যার ভয়ে ঐটিকে কাবা শরীফের সাথে লাগিয়ে রাখে। ফলে তা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এর সময়ও কাবা শরীফের সাথেই লাগা ছিল।
ইমাম বায়হাকী হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবু বকর (রা) এর সময় মাকামে ইবরাহীম কাবা শরীফের সাথে লাগানো ছিল। হযরত উমর (রা) একে দূরে সরিয়ে বর্তমান স্থানে বসিয়েছেন।
আযরাকী ইবনে আবি মোলায়কা থেকে বর্ণনা করেন, মাকামে ইবরাহীম বর্তমানে যে জায়গায় আছে, জাহেলিয়াতের সময়ও একই জায়গায় ছিল এবং তা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকরের সময়ও একই স্থানে অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু হযরত উমরের সময় বন্যায় তা স্থানচ্যুত হয়ে যাওয়ার পর হযরত উমর তা সাবেক জায়গায় পুনর্বহাল করেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ফতহুল বারীতে লিখেছেন, হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় মাকামে ইবরাহীম কাবার সাথে লাগানো ছিল। কিন্তু হযরত উমর (রা) একে পিছিয়ে দিয়েছেন।
হাফেজ এমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে লিখেছেন, মাকামে ইবরাহীম আগে কাবা শরীফের দেয়ালের সাথে লাগানো ছিল। সেই জায়গাটি আজও পরিচিত। সেটি হচ্ছে, কাবার দরজা থেকে বের হওয়ার সময় ডানে হাজারে আসওয়াদের দিকে, কাবার দরজা সংলগ্ন একটি পৃথক জায়গায়। হযরত ইবরাহীম (আ) কাবা নির্মাণ শেষে ঐ পাথরটি সেখানে কাবার দেয়ালের সাথে রেখে দেন কিংবা পাথরটি সেখানেই থেমে যায় এবং তিনি সেটাকে সেখানেই রেখে দেন। তওয়াফ শেষে, সেখানেই নামায পড়ার জন্য আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। যুক্তির দাবীও তাই যে, যেখানে কাবার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে, মাকামে ইবরাহীম সেখানেই থাকবে। হযরত উমর (রা) একে সেখান থেকে পেছনে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ২য় খলীফা ছিলেন এবং তাঁর পছন্দ অনুযায়ী কুরআন নাযিল হয়েছে। তাই সাহাবায়ে কেরামের কেউ তাঁর এই কাজের বিরোধিতা করেননি।
আল্লামা ইবনুল জাযারী আশ-শাফেঈ (রা) মাকামে ইবরাহীমের ব্যাপারে ৫টি মতামতের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হচ্ছেঃ (১) হযরত উমর (রা) সর্বপ্রথম মাকামে ইবরাহীমকে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করার আদেশ দেন। (২) হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাকামে ইবরাহীম বর্তমান স্থানেই আছে। কিন্তু জাহিলিয়াতের সময় এটাকে কাবার সাথে লাগানো হয় যা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকরের সময় পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। হযরত উমর (রা) সেটিকে সাবেক স্থানেই পুনর্বহাল করেন। (৩) রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই বাইতুল্লাহর কাছ থেকে এটিকে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তর করেন। (৪) হযরত উমর (রা) নিজেই সর্বপ্রথম ঐ পাথরটি বর্তমান স্থানে সরিয়ে আনেন। বন্যার পরে লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি তা সাবেক জায়গায় পুনর্বহাল করেন। (৫) হযরত ইবরাহীম (আ) এর যুগ থেকেই পাথরটি বর্তমান জায়গায় ছিল। উম্মে নহশল বন্যার সময় তিনি এটাকে সাবেক জায়গায় পুনর্বহাল করেন মাত্র।
ইবনে সোরাকা বলেন, কাবার দরজা এবং মোসাল্লা আদম এর মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ৯ হাতের একটু বেশী। হযরত আদম (আ) তওয়াফ শেষে সেখানে নামায পড়েন এবং আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেন। সেখানেই মাকামে ইবরাহীম অবস্থিত। তওয়াফ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে দু'রাকাত নামায পড়েন এবং সেখানেই তাঁর উপর এই আয়াতটি নাযিল হয়:
وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمُ مُصَلَّى .
তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) সেটিকে এর বর্তমান স্থানে সরিয়ে আনেন এবং বর্তমান স্থানটি কাবা শরীফ থেকে ২০ হাত দূরে অবস্থিত। যাতে করে তওয়াফকারীদের তওয়াফে কোন অসুবিধা না হয়। বন্যার পর হযরত উমর (রা) সেটিকে এর সাবেক স্থানেই বহাল করেন মাত্র। (১০)
উম্মে নহশল নামক বন্যার ব্যাপারে মুহিব আত-তাবারী সাহাবী আবদুল মুত্তালিব বিন আবু ওয়াদাআ কর্তৃক বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতের উল্লেখ করেছেন। আবদুল মুত্তালিব মক্কা বিজয়ের দিন মুসলমান হয়েছেন। তিনি বলেন, মসজিদে হারামের বড় দরজা- বাবে বনি শায়বা দিয়ে ভেতরে বন্যার পানি প্রবেশ করে। হযরত উমর (রা) এর খেলাফতের সময় (হিজরী ১৭ সালে), উম্মে নহশল নামক বন্যার পানিতে মাকামে ইবরাহীম ভেসে যায় এবং তা মক্কার নিম্নাঞ্চলে নিয়ে যায়। সেটিকে লোকেরা কুড়িয়ে এনে কাবার দরজার সামনে গেলাফে কাবার সাথে বেঁধে রাখে। এই ঘটনা উমরকে জানানোর পর তিনি রমযানে মদীনা থেকে উমরাহর এহরাম পরে মক্কায় রওনা হন। বন্যার পানিতে মাকামে ইবরাহীমের নির্দিষ্ট স্থানের চিহ্ন মুছে যায়। ফলে, তিনি লোকদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, কে মাকামের ইবরাহীমের নির্দিষ্ট স্থান সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিফহাল আছে। তখন আবদুল মুত্তালিব বিন আবু ওয়াদাআ বলেন, আমি ঐ সম্পর্কে জানি। আমি অনুরূপ আশংকার ভিত্তিতে, হাজারে আসওয়াদ থেকে মাকামে ইবরাহীম, বাবে কাবা থেকে মাকামে ইবরাহীম এবং যমযম থেকে মাকামে ইবরাহীমের দূরত্ব মেপে রাখি। আমি একটি পাকানো মজবুত রশি দিয়ে তা মাপি এবং রশিটি ঘরে রেখে দেই।
হযরত উমর বলেন, আপনি আমার কাছে বসুন এবং একজন লোককে তা আনার জন্য পাঠিয়ে দিন। একজন লোক পাঠিয়ে রশিটি আনা হল। রশি দিয়ে মেপে দেখা হল, বর্তমান স্থানটি এর যথার্থ সাবেক স্থান। তিনি অন্যান্য লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেন এবং তাদের পরামর্শ নেন। সবাই এই জায়গার ব্যাপারেই রায় প্রকাশ করেন। হযরত উমরের কাছে বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়ার পর তিনি বর্তমান স্থানে, মাকামে ইবরাহীমের নীচে ও চতুষ্পার্শ্বে মজবুত ভিত্তি তৈরি করেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত মাকামে ইবরাহীম ঐ জায়গাতেই বিদ্যমান রয়েছে। হযরত উমর মাকামে ইবরাহীমের চতুর্দিকে উঁচু বাঁধ নির্মাণ করেন (১১)
যে সকল বর্ণনায় এসেছে যে মাকামে ইবরাহীম হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় থেকেই কাবা সংলগ্ন ছিল এবং হযরত উমর (রা) তাকে পিছিয়ে এনে বর্তমান স্থানে বসান, এই সকল বর্ণনা বেশী যুক্তিযুক্ত নয়। বরং তা প্রথম থেকেই বর্তমান স্থানে ছিল এবং বন্যার পর হযরত উমর তাকে সাবেক স্থানে বহাল করেন মাত্র।
এই বক্তব্যের সমর্থনে অনেকগুলো বর্ণনা রয়েছে এবং এই মতটিই বেশী জোরদার। এই বক্তব্যের সমর্থনে অনেকগুলো যুক্তি রয়েছে। আমরা এখন সেগুলো আলোচনা করবো।
হযরত উমর (রা) কখনও কোন ব্যাপারে নিজে একাকী কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। বরং সব ব্যাপারে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনুসরণ করতেন এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন। বড় বড় সাহাবায়ে কেরামের সাথে তিনি পরামর্শ করাকে জরুরী মনে করতেন। তারীখুল কাবা বইতে উল্লেখ আছে যে, খলীফা হওয়ার পর একবার তিনি কা'বায় ঢুকলেন এবং কা'বার অর্থ-ভাণ্ডারের সম্পদ মুসলমানদের বাইতুলমালে জমা দেয়া কিংবা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার ইচ্ছে পোষণ করলেন। তখন কা'বার সেবক শায়বা বিন উসমান হাজাবী তাঁকে বললেন, আপনার দুই সাথী রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবু বকর (রা) তো তা নেননি। তখন উমর বললেন, আমি তো তাদেরই অনুসরণ করি। তারপর তিনি ঐ সম্পদ নেয়া ছেড়ে দিলেন। এই ঘটনা সামনে রেখে কিভাবে চিন্তা করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় মাকামে ইবরাহীম যেখানে ছিল, সেখান থেকে তিনি তা পিছিয়ে দিয়েছেন? অথচ সেখানেই নামায পড়ার জন্য কুরআনের আয়াতও নাযিল হয়েছে। তদুপরি, হযরত উমরের ইচ্ছা অনুযায়ীই আল্লাহ সেখানে নামায পড়ারও আদেশ দিয়েছেন। তাহলে, উমর কি করে সেই পবিত্র জায়গাটি পরিবর্তন করতে পারেন? সেখান থেকে প্রাথর্ সরানোর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করা যেখানে তিনি নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঐ আয়াত নাযিলের পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)ও সেখানে নামায পড়েন। উমর তা পরিবর্তন করে থাকলে কুরআন ও নবীর বিরোধিতা করেছেন। নাউজুবিল্লাহ! তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে থেকে সবকিছু নিজ চোখে দেখেছেন। তারপরও, অধিকতর নিশ্চয়তা হাসিলের জন্য সাহাবায়ে কেরামকে মাকামে ইবরাহীমের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন। তখন, মক্কায় বড় বড় সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা কেউ হযরত উমরের এই কাজের বিরোধিতা করেননি।
উমর অন্যায় করলে, অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম চুপ করে না থেকে এর বিরোধিতা করতেন। তাঁর খেলাফতের সময় যখন একজন সাহাবী তলোয়ার দেখিয়ে বলেছিলেন, তুমি ভুল পথে চললে, এই তলোয়ার দিয়ে তোমাকে সোজা করে দেব। সেখানে এত বেশী সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম কি করে চুপ করে থাকতে পারেন? এছাড়াও হযরত উমর (রা) অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে মাকামে ইবরাহীমের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার পেছনে তাঁর যে আগ্রহ ছিল, সেটি হচ্ছে, যে স্থানটি সম্পর্কে কুরআন নাযিল হয়েছে এবং যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) নামায পড়েছেন তা ভাল করে জানা। ইবনে হাজার আসকালানী ফতহুল বারীতে এই মতটিকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বলেছেন, এই সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোই সহীহ। আযরাকীও সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং হযরত আবু বকরের যুগে মাকামে ইবরাহীম বর্তমান জায়গাতেই বিদ্যমান ছিল।
আহমদ ও তিরমিজী উকবা বিন আমের থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
لوكَانَ نَبِيُّ بَعْدِي لَكَانَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ .
অর্থ: 'আমার পরে কোন নবী আসলে, উমরই নবী হতেন।' এমন উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী এবং ইসলামের ২য় খলীফা হযরত উমর কি করে নিজের ইচ্ছায় মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর যথার্থ স্থান থেকে সরিয়ে আনতে পারেন? এটা কখনও সম্ভব নয়।
টিকাঃ
১০. প্রাগুক্ত
১১. প্রাগুক্ত