📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মসজিদে হারামের মিম্বার

📄 মসজিদে হারামের মিম্বার


জুমা ও ঈদের নামাযের খোতবা দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) মিম্বারে উঠেছেন মর্মে হাদীসের কিতাবে বর্ণিত আছে। কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদীন এবং মক্কার শাসকরা মক্কায় পায়ের উপর দাঁড়িয়ে খোতবা দিয়েছেন, তাঁরা মিম্বার ব্যবহার করেননি। তাঁরা কাবা শরীফের দরজার সামনে কিংবা হিজরে ইসমাঈলে দাঁড়িয়ে খোতবা দিতেন। আযরাকী বলেন, মসজিদে হারামে সর্বপ্রথম হযরত মুয়াওবিয়া (রা) মিম্বার আনেন। তাঁর ছোট মিম্বারটি তিন সিঁড়ি বিশিষ্ট ছিল। তিনি সিরিয়া থেকে হজ্জে আসার সময় ঐ মিম্বারটি সাথে আনেন।

এই মিম্বারটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর খলিফা হারুনুর রশীদ হজ্জে আসার সময় সাথে একটি মিম্বার নিয়ে আসেন। এটা তাঁকে তাঁর মিসরের গভর্নর মুসা বিন ঈসা উপহার দিয়েছিলেন। পুরাতন মিম্বারটি আরাফাতের মসজিদে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং নতুনটি মসজিদে হারামে ব্যবহার করা হয়। পরে আব্বাসী খলিফা ওয়াসেক মক্কা, মিনা এবং আরাফাতের জন্য তিনটি মিম্বার তৈরি করেন।

ফাকেহী আযরাকীর বর্ণনার সাথে আরো একটু যোগ করে বলেন, আব্বাসী খলিফা মোনতাসের তাঁর পিতা মোতাওয়াক্কেলের আমলে মক্কায় হজ্জ করতে আসার সময় এক বিরাট মিম্বার তৈরী করে আনেন এবং এর উপর দাঁড়িয়ে খোতবা দেন। পরে তা মসজিদে হারামের জন্য রেখে যান।

আল্লামা ফাসী বলেন, এরপর মসজিদে হারামের জন্য অনেকগুলো মিম্বার তৈরি করা হয়। আব্বাসী খলীফা মোকদীরের মন্ত্রী এক হাজার দীনার ব্যয়ে এক মূলবান মিম্বার মক্কায় পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল এর উপর খলীফা খুতবা দিবেন। কিন্তু মিসরীয়রা তা জ্বালিয়ে ফেলে এবং মিসরের শাসক মোস্তানসের ওবায়দীর নামে খুতবা পাঠ করে।

মিসরের শাসক আশরাফ শা'বানের আমলে ৭৬৬ হিজরীতে একটি মিম্বার তৈরি করে তা মক্কায় পাঠানো হয়। দীর্ঘ ৩১ বছর এর উপর দাঁড়িয়ে খোতবা দেয়া হয়। এরপর মিসরের বাদশাহ জাহের বারকুক ৭৯৭ হিজরীতে আরেকটি মিম্বার পাঠান। ৮১৮ হিজরীতে মিসরের বাদশাহ মোয়াইয়েদ একটি মিম্বার পাঠান। অপরদিকে ৮১৫ হিজরীতে মিসরের বাদশাহ শেখু আরেকটি মিম্বার পাঠান। মিনায় এর উপর দাঁড়িয়ে খোতবা দেয়া হয়। ৮৬৬ হিজরীতে মিসরের বাদশাহ খাসাকদম একটি মিম্বার পাঠান। অপরদিকে ৮৭৭ হিজরীতে বাদশাহ আশরাফ কায়েতবায় জাহেরী কাঠের তৈরি একটি মিম্বার পাঠান। এরপর ৮৭৯ হিজরীতে মক্কায় কাঠের তৈরি আরেকটি মিম্বার আসে। এটাই মসজিদে হারামের সর্বশেষ কাঠের মিম্বার ছিল।

এরপর তুর্কী সুলতান সোলায়মান খান বিন সুলতান প্রথম সেলিম খান একটি মিম্বার তৈরি করে পাঠান। ৯৬৬ হিজরীতে সুলতান সোলায়মান সাদা উজ্জ্বল মার্বেল পাথর দিয়ে মিম্বারটি তৈরি করেন। এটি ১৩ সিঁড়ি বিশিষ্ট এক বিরাট মিম্বার। এর উপরে ৪ খুঁটির উপর কাঠের তৈরি গম্বুজে সোনালী প্রলেপ দেয়া হত। দেখতে মনে হয় এটি সোনার তৈরি। প্রায় ৫শ' বছর যাবত এর সোনালী রং বিবর্তন হয়নি। মাতাফ থেকে এর গম্বুজ ২০ হাত উঁচু ছিল। এতে সূর্যের আলো পৌঁছতে পারত না। এটি হারাম শরীফের সবচাইতে শানদার ও সুনিপুণ পদ্ধতির তৈরি মিম্বার ছিল। এটি এত মজবুত ছিল যে, এতে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দেয়নি। হযরত মুয়াওবিয়া (রা) সর্বপ্রথম মিম্বার স্থাপন করেন। তারপর এটি ছিল সর্বশেষ মিম্বার। তবে সৌদী শাসনামলে, ঐ মিম্বারের পরিবর্তন করে অন্য মিম্বার দেয়া হয়। বর্তমানে মসজিদে হারামের মিম্বারটিও বড়। মিম্বারের নীচে চাকা লাগানো আছে। খোতবার সময় মিম্বারকে মাকামে ইবরাহীমের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং খোতবা শেষ হলে, যমযমের সাথে পানি পানের জায়গার পার্শ্বে রেখে দেয়া হয়। হজ্জ ও রমযানের ভিড়ের সময় বাবুল কাবার সাথে মিম্বার লাগানো হয় এবং ইমাম সেখান থেকেই খোতবা দেন।

বর্তমান যুগে, প্রচণ্ড গরমের মওসুমে যখন বেশী ভিড় থাকে না তখন কাবার পূর্ব-দক্ষিণে, মাতাফের উপর আযানের স্থানের নীচে ছায়ার মধ্যে মিম্বার বসানো হয় এবং ইমাম এখান থেকেই খোতবা দেন।

অপরদিকে, কাবা শরীফের ভিটি বেশী উঁচু হওয়ার কারণে সিঁড়ি ছাড়া কাবার ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। তাই কাবা শরীফের ভেতর উঠার উদ্দেশ্যে আরেকটি সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়। সেই সিঁড়িটি কয়েকটি স্তর বিশিষ্ট। দরজার সাথে মিল করে তা তৈরি করা হয়েছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 চার মাজহাবের নামাযের স্থান

📄 চার মাজহাবের নামাযের স্থান


মসজিদে হারামে ৪ মাজহাবের লোকদের পৃথক নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হত। হানাফী, শাফেঈ, মালেকী এবং হাম্বলী মাজহাবের আলাদা আলাদা নামাযের জামাত ছাড়াও শিয়া যায়েদীয়া সম্প্রদায়ের পৃথক নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হত। হিজরী ৪র্থ কিংবা ৫ম শতাব্দীতে মাজহাব ভিত্তিক পৃথক নামাযের জামাত পদ্ধতি চালু হয়। আবুল হোসাইন মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন যোবায়ের কানানী স্পেনী ৫৮৮ হিজরীতে তাঁর সফর-অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে পৃথক নামাযের জামাতের এই বর্ণনা দেন।

শাফেঈ মাজহাবের অনুসারীরা মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামায পড়তেন। মালেকী মাজহাবের অনুসারীরা রোকনে ইয়ামানী বরাবর নামায পড়তেন। হানাফী মাজহাবের অনুসারীরা মীযাব বরাবর হাতীমে কাবার দিকে নামায পড়তেন। এই মাজহাবের নামাযের জামাত সবচাইতে বড় এবং শানদার ছিল। কেননা, অনারব বিশ্বের বেশীর ভাগ দেশ হানাফী মাজহাবের অনুসারী। হাম্বলী মাজহাবের অনুসারীরা হাজারে আসওয়াদ এবং রোকনে ইয়ামানী বরাবর নামায পড়তেন। তারা মালেকী মাজহারের লোকদের সাথে একই সময় নামায শুরু করতেন। শিয়া যায়েদীয়া মাজহাবের অনুসারীরা আযানে 'হাইয়া আলাল ফালাহ'-এর পর 'হাইয়া আলা খাইরিল আমল' এই বাক্যটি যোগ করত। তারা জোহরের নামায ৪ রাকাত পড়ত এবং সব মাজহাবের নামায শেষ হয়ে গেলে মাগরেবের নামায পড়ত। বর্তমানে, একই জামাতে সবাই নামায পড়ে এবং মাজহাব ভিত্তিক পৃথক জামাত পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00