📄 সুলতান মুরাদ কর্তৃক সুলতান সেলিমের অসমাপ্ত নির্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ
সুলতান সেলিমের মৃত্যুতে উদ্যমী আহমদ বেগ মোটেও বিচলিত হননি এবং হারাম শরীফের নির্মাণ কাজের উৎসাহেও তাঁর কোন ভাটা পড়েনি। তিনি কাজ অব্যাহত রাখেন।
সুলতান মুরাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর আহমদ বেগের কাছে নির্দেশ পাঠান, তিনি যেন সুলতান সেলিমের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন। ফলে, ৯৮৪ হিজরী মোতাবেক ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে, মসজিদে হারামের অবশিষ্ট দুটো দিক- দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। দীর্ঘ ৪ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর মসজিদে হারামের নতুন ইমারত গড়ে উঠে যা আজ পর্যন্ত বহাল আছে। বর্তমান মসজিদে হারাম, সৌদী বাদশাহ আবদুল আযীয এবং সুলতান সেলিমের নির্মিত।
আল্লামা কুতুবুদ্দিন হানাফী তাঁর الإعلام বইতে এ সকল তথ্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন। তিনি সেই যুগের সমসাময়িক বলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য অন্যান্য ঐতিহাসিকদের বক্তব্যের চেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন যে, আহমদ বেগ আমাকে জানিয়েছেন, এই বিরাট নির্মাণ কাজে সরকারের ১ লাখ সোনার দীনার ব্যয় হয়েছে। মিশর থেকে মক্কায় নিয়ে আসা বিভিন্ন উপকরণ ও সরঞ্জামাদি এই হিসেবেরে অতিরিক্ত।
📄 মসজিদে হারামের স্তম্ভ, গম্বুজ এবং দরজার সংখ্যা
সুলতান সেলিম এবং সুলতান মুরাদ খান কর্তৃক ৯৮৪ হিজরীতে, মসজিদে হারাম নির্মাণের আগ পর্যন্ত, এতে মোট ৪৯৬টি স্তম্ভ ছিল। পূর্বদিকে ৮৮টি ও উত্তরে ১০৪টি, দক্ষিণে ১৪০টি এবং পশ্চিমে ৮৭টি স্তম্ভ ছিল। তবে ৯৮৪ হিজরীর নির্মাণের পর, স্তম্ভের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১১টি। পূর্বদিকের ছাদে ৬২টি, উত্তর দিকে ৮১টি, পশ্চিম দিকে ৫৮টি এবং দক্ষিণ দিকে ৯০টি। দারুন নাদওয়ার সম্প্রসারিত অংশে ১৪টি এবং বাবে ইবরাহীমের সম্প্রসারিত দিকে ৬টি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এই মিলে স্তম্ভ বা ছাদের খুঁটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১১।
৯৮৪ হিজরীর নির্মাণের পর মসজিদে হারামের গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫২ টিতে। এর মধ্যে পূর্বদিকে ২৪টি, উত্তরে ৩৬টি, হাযওয়ারার মিনারা সংলগ্ন ১টি এবং দারুন নাদওয়ার সম্প্রসারিত অংশে ১৬টি। কুতুবুদ্দিন হানাফী তাঁর الاعلام বইতে এই সংখ্যা উল্লেখ করেন। কিন্তু হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ তাঁর تاريخ عِمَارَةُ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ বইতে লিখেন যে, আমি গুণে দেখেছি, পশ্চিমে ২৪টি, বাবে ইবরাহীমের সম্প্রসারিত অংশে ১৫টি এবং দক্ষিণ দিকে ৩৬টি গম্বুজ রয়েছে।
খলীফা মাহদী নির্মিত মসজিদে হারামের দরজা সংখ্যা ১৯ এবং জানালা সংখ্যা ছিল ৩৮। এতে অবশ্য পূর্বের নির্মিত কিছু দরজা-জানালাও ছিল। প্রত্যেক দরজার মধ্যে কুরআনের আয়াত ও তা নির্মাণের সন তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ ছিল। অবশ্য পরবর্তীতে ঐ সকল দরজা-জানালার বহু পরিবর্তন হয়েছে।
📄 সুলতান রাসাদের নির্মাণ কাজ
তুর্কী সুলতান মুহাম্মদ রাসাদ খান বিন সুলতান আবদুল মজীদ খানের আমলে, ২৩শে জিলহজ্জ ১৩২৭ হিজরীতে, মসজিদে হারামে এক বন্যা হয়। সেই বন্যাকে 'খাদইউ' বন্যা বলে। কেননা, সেই বছর মিসরের সাবেক খাদিউ আব্বাস হেলমী পাশা হজ্জ করতে আসেন। বন্যার পানিতে কাবার দরজার চৌকাঠ, হাজারে আসওয়াদ এবং হিজরে ইসমাঈল ডুবে যায় এবং মসজিদে হারাম একটি দীঘির রূপ ধারণ করে। একদিন ও একরাত পর্যন্ত পানি বিদ্যমান থাকে।
পানি সরে যাওয়ার পর তদানীন্তন মক্কার গভর্নর শরীফ হোসাইন বিন আলী, অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমভিব্যহারে, মসজিদে হারামে ঢুকেন এবং বন্যার সাথে আসা স্তূপীকৃত ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করেন।
এই বন্যার ফলে, মসজিদে হারামের দেয়াল, মার্বেল পাথরের তৈরি স্তম্ভ ও ভিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় ২২টি স্তম্ভের ক্ষতি হয়। ১৩৩৪ হিজরীতে, সুলতান মুহাম্মদ রাসাদ খান হেজাযের গভর্নর এবং মসজিদে হারামের তদারককারী গালেব পাশাকে মসজিদে হারামের ক্ষতিগ্রস্ত অংশসমূহের সংস্কারের নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক ক্ষতিগ্রস্ত অংশসমূহের সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ শুরু হয়।
শরীফ হোসাইন, ১৩৩৪ হিজরীর ৮ই শাবান (১১ জুন, ১৯১৬) হেজাযের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ফলে তাঁর সাথে হেজাযে অবস্থানকারী তুর্কীদের লড়াই হয় এবং লড়াইর কারণে হারামের সংস্কার বন্ধ থাকে। ১৩৩৮ হিজরীতে, বাদশাহ শরীফ হোসাইন পুনরায় মসজিদে হারামের সংস্কারের নির্দেশ দেন। পরে অবশিষ্ট সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।
📄 ৯ম সম্প্রসারণ : বাদশাহ আবদুল আযীয আল সৌদ
আজ আমরা যে মসজিদে হারাম দেখছি, তা বহু পরিবর্তন ও সংস্কারের সিঁড়ি অতিক্রম করে বর্তমান পর্যায়ে পৌছেছে। বর্তমান হারাম শরীফে তুর্কী সুলতান সেলিমের নির্মাণ কাজ ব্যতীত অতীতের অন্য কারো কর্ম ও স্মৃতি অবশিষ্ট নেই।
মসজিদে হারামের বর্তমান ইমারতে, মাতাফ সংলগ্ন গম্বুজ বিশিষ্ট ৪ দিকের এক তলা বিল্ডিংটিই সুলতান সেলিম খানের নির্মাণস্মৃতি বহন করছে। পরবর্তী তিন তলা মসজিদ বাদশাহ আবদুল আযীযের সংস্কার ও সম্প্রসারণ।
১৩৪৪ হিজরীতে, হেজাযের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর বাদশাহ আবদুল আযীয মসজিদে হারামের প্রয়োজনীয় সংস্কার করেন। দেয়াল ও স্তম্ভের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো দূর করেন। ১৩৪৬ হিজরীতে, তিনি নিজের ব্যক্তিগত অর্থে, মসজিদে হারামের অবশিষ্ট সংস্কার কাজও সম্পন্ন করেন। ঐ সময় হাজীদের ছায়াতে নামায পড়ার জন্য কিছু ছায়াদার ছাতা নির্মাণ করেন। এতে ১০ হাজার লোকের নামায পড়ার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান হাজীদের প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি নগণ্য ব্যাপার। মসজিদে হারামে তখন মোট ৫০ হাজারের বেশী লোকের নামায পড়ার সংকুলান হত না। সবকিছু মিলিয়ে মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন অনুভূত হয়।
তাই ১৩৬৮ হিজরীতে, বাদশাহ আবদুল আযীয মুসলিম বিশ্বের প্রতি মসজিদে হারাম সম্প্রসারণ করার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ প্রকাশ করেন। সে অনুযায়ী কাজ অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু, সম্প্রসারণের কাজ শুরুর আগেই, ১৩৭৩ হিঃ মোতাবেক ১৯৫৩ সালে, বাদশাহ আবদুল আযীয ইন্তেকাল করেন। তাঁর ছেলে সউদ বিন আবদুল আযীয সৌদী আরবের বাদশাহ নিযুক্ত হন এবং তাঁর পিতা কর্তৃক মসজিদে হারামের প্রস্তাবিত সম্প্রসারণের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান।
১৩৭৫ হিজরী মোতাবেক ১৯৫৫ খৃষ্টাব্দে, মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ ও নির্মাণ কাজ তদারক করার উদ্দেশ্যে একটি উচ্চ কমিটি গঠন করা হয়। বাদশাহ সউদ নিজে সেই কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থিত হন। বৈঠকে সম্প্রসারণ কাজ শুরুর বিস্তারিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৩৭৫ হিজরীতেই সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়।
মসজিদে হারামের পবিত্রতার উপযোগী ডিজাইন এবং ইসলামী আর্কিটেকচারের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এই নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সৌদী আরবের বিন লাদিন কোম্পানী এই দায়িত্ব গ্রহণ করে, এবং অন্যান্য কোম্পানী ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সম্প্রসারণ কাজ সমাপ্ত করে। পাকিস্তানী কনসালটেন্ট ইনিঞ্জনিয়ারিং ইউনিয়ন এই নির্মাণ কাজের প্রকৌশলগত দিক দেখাশুনা করে।
দীর্ঘ বিশ বছর পর, ১৩৯৬ হিজরীতে এই সম্প্রসারণ শেষ হয়। বেজমেন্টসহ তিন তলা মসজিদের আয়তন হচ্ছে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৬৮ বর্গমিটার। এই সম্প্রসারণের আগে মসজিদে হারামের আয়তন ছিল ১৯ হাজার ১২৭ বর্গমিটার। এই সময় মসজিদে হারামের দেয়ালের ভেতর ও বাইরে মার্বেল পাথর লাগানো হয়। এতে ২ লাখ বর্গমিটার সাদা ও বিভিন্ন রং এর মার্বেল ও কৃত্রিম পাথর এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার বর্গমিটার টাইলস লাগানো হয়েছে। বিল্ডিং নির্মাণের সময় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের পূর্ণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই সম্প্রসারণে, মোট ৬২১ মিলিয়ন ৬ লাখ ৪২ হাজার রিয়াল ব্যয় হয়। সম্প্রসারণের পর এতে ৪ লাখ লোক একসাথে নামায পড়তে পারে। সাফা পাহাড়ের উপর ছোট একটি মিনারাসহ এতে ৯০ মিটার উঁচু ৭টি মিনারা তৈরি করা হয়েছে। মাতাফকে আগের চেয়ে ৩শ' গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং এতে তাপ নিয়ন্ত্রণকারী সাদা মার্বেল পাথর বসানো হয়েছে। ফলে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তওয়াফের সময়ও মাতাফের পাথরগুলো ঠাণ্ডা থাকে। পূর্বে মাতাফে একসাথে সাড়ে তিন হাজার লোক তাওয়াফ করতে পারত। এই সম্প্রসারণের পর ৭ হাজার লোক একসাথে মাতাফে তওয়াফ করতে পারে।
মসজিদে হারাম নির্মাণের সময় সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করার জায়গাকেও মসজিদের ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাকে দোতালা করা হয়। ফলে, এখন দুই তলাতেই সাঈ করা যায়। ভিড়ের সময় তা বেশী উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। দোতালায় উঠার জন্য দুটো সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। মসজিদে হারামের দোতালা দিয়েও এতে আসা যায়। মসজিদ ও মাসআকে একত্রীভূত করা হয়েছে। বর্তমানে ছাদের উপরও সাঈ' করা যায়।
মসজিদে হারামের দক্ষিণ পার্শ্বে, একতলার উপর এবং দোতলার নীচে আযানের স্থান নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে রেডিও-টেলিভিশনের যন্ত্রপাতিও বসানো হয়েছে। সেখান থেকেই রেডিও এবং টিভিতে হারাম শরীফের নামায প্রচার করা হয়।
মসজিদে হারামের উত্তর পার্শ্বেও দক্ষিণ পার্শ্বের আযান খানার মত আরেকটি স্থান বানানো হয়েছে। সেটিও নীচতলার উপর এবং দোতলার নীচে। মসজিদে হারামের নীচতলা থেকে দোতলার উচ্চতা অনেক বেশী যা সাধারণ বিল্ডিংগুলোর উচ্চতা থেকে ব্যতিক্রমধর্মী। লক্ষ লক্ষ মুসল্লীর স্বাস্থ্যগত দিক এবং হাওয়া পরিবর্তনের প্রয়োজনকে সামনে রেখে দোতলাকে এত উঁচু করা হয়েছে।
মসজিদে হারামে, কয়েক হাজার পাখা এবং ৪ হাজার মাইক্রোফোন আছে যেগুলো ৩৫ হাজার মিটার তার দ্বারা সংযুক্ত করা হয়েছে। মসজিদে বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে ৫৫ হাজার ৩২২টি বিদ্যুত বাতি আছে, এর প্রত্যেকটি ২৫০০ ওয়াট সম্পন্ন, ১৩৬৪টি ঝাড়বাতি এবং ২১ হাজার বাল্ব আছে। দৈনিক মসজিদে হারামে মোট ৮ মেগাওয়াট শক্তির প্রয়োজন হয়। কেননা, বিদ্যুতের মাধ্যমে, বাতি, পাখা, মাইক, স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিঁড়ি, যমযমের পানির হিমাগার এবং অন্যান্য কাজে এই পরিমাণ বিদ্যুত খরচ হয়। নিয়মিত বিদ্যুত সরবরাহের জন্য পৃথক বিদ্যুত জেনারেটর বসানো হয়েছে। মসজিদে হারামে সাধারণতঃ বিদ্যুত বিভ্রাট সংঘটিত হয় না। কচিৎ বিদ্যুত বিভ্রাট দেখা যায়। হজ্জ মওসুমে প্রচুর বিদ্যুত খরচ হয়। ১৪০৯ হিঃ মোতাবেক ১৯৮৮ খৃঃ থেকে প্রতিবছর মক্কায় প্রায় ৯ লাখ ৪৮ হাজার, মিনায় ৮৬ হাজার এবং আরাফাতে ১৯ হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুত খরচ হয়।