📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 সুলতান সেলিমের নির্মাণ কাজ

📄 সুলতান সেলিমের নির্মাণ কাজ


আব্বাসী খলীফা মাহদী কর্তৃক ১৬৯ হিজরীতে মসজিদে হারামের যে নির্মাণ ও সম্প্রসারণ হয় তা ৯৭৯ হিজরী পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৮১০ বছর বহাল থাকে। তাঁর নির্মিত ভিত্তিতে কোন দুর্বলতা দেখা দেয়নি এবং গোটা মসজিদে হারাম ৮০২ হিজরীর অগ্নিকাণ্ড ব্যতিরেকে, বন্যার মোকাবিলা, তাপ থেকে মুসল্লীদেরকে রক্ষা, বৃষ্টি ও ঝড় তুফান থেকে তাদেরকে সুষ্ঠুভাবে হেফাজত করে যাচ্ছিল।

কিন্তু ৯৭৯ হিজরীতে, পূর্বদিকের ছায়াদার গম্বুজ কাবা শরীফের দিকে ঝুঁকে পড়ার উপক্রম হয় এবং মসজিদের দেয়ালের উপর ছাদের কাঠ বেরিয়ে পড়ে। বাবুল আব্বাস এবং বাবুন নবীর মাঝে অবস্থিত, মসজিদের পূর্বাংশে নির্মিত সুলতান কায়েতবায়ের মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসায়ে আফদালিয়ার দেয়ালের বাইরে ছাদ বিছিন্ন হয়ে যায়। ফলে, ছায়াদার গম্বুজের মাথা মসজিদের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তা সংস্কারের সকল চেষ্টা নিরর্থক হয়ে পড়ে।

৯৭৯ হিজরীতে, এই ঘটনা সুলতান সেলিম বিন সোলায়মানের কাছে পৌছানোর পর সুলতানকে বলা হয় যে, কায়েতবায়ের নির্মিত মাদ্রাসার দেয়ালের কারণেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মাহদীর নির্মিত মজবুত দেয়াল অক্ষুণ্ণ আছে এবং এর কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। ঐ ঘটনা না ঘটলে, আজ পর্যন্ত হয়তো, মসজিদে হারামে খলীফা মাহদীর নির্মিত ছাদ, দেয়াল ও অন্যান্য কার্যক্রম অক্ষুণ্ণ থাকত।

যাই হোক, সুলতান সেলিম ঐ খবর পেয়ে পুরো মসজিদে হারাম অত্যন্ত মজবুতি ও দক্ষতার সাথে নির্মাণের আদেশ দেন এবং কাঠের নির্মিত ছাদের পরিবর্তে গোলাকার গম্বুজ তৈরি করেন। এই গম্বুজ তাপ থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে পূর্বের ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম। সুলতান সেলিম মিসরের গভর্নর সানান পাশার কাছে মসজিদে হারাম নির্মাণের জন্য অত্যন্ত ধার্মিক, আমানতদার, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন লোক নির্বাচনের নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক, মিসরের সাবেক গভর্নর আহমদ বেগকে ঐ কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তাঁকে মসজিদে হারাম নির্মাণের দায়িত্ব অর্পনের সাথে সাথে জেদ্দার গভর্নর বানিয়ে পাঠানো হয়। তিনি ৯৭৯ হিজরীতে, মক্কায় পৌঁছেন এবং মসজিদে হারামের তত্ত্বাবধায়ক বদরুদ্দিন হোসাইনীর সাথে যথেষ্ট আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি ৯৮০ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের মাঝামাঝি সময়ে, বাবুস সালামের অংশে, মাহদীর নির্মিত ইমারত ভাঙ্গা শুরু করেন। ৯৮০ হিজরীর ৬ই জুমাদাল উলায় বাবুস সালামের দিক থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আহমদ বেগ নিরলসভাবে মসজিদে হারামের পূর্ব ও উত্তর দিকের নতুন ইমারত তৈরি সম্পন্ন করেন। ঠিক সেই সময়ে সুলতান সেলিমের ইন্তেকাল হয়।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 সুলতান মুরাদ কর্তৃক সুলতান সেলিমের অসমাপ্ত নির্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ

📄 সুলতান মুরাদ কর্তৃক সুলতান সেলিমের অসমাপ্ত নির্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ


সুলতান সেলিমের মৃত্যুতে উদ্যমী আহমদ বেগ মোটেও বিচলিত হননি এবং হারাম শরীফের নির্মাণ কাজের উৎসাহেও তাঁর কোন ভাটা পড়েনি। তিনি কাজ অব্যাহত রাখেন।

সুলতান মুরাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর আহমদ বেগের কাছে নির্দেশ পাঠান, তিনি যেন সুলতান সেলিমের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন। ফলে, ৯৮৪ হিজরী মোতাবেক ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে, মসজিদে হারামের অবশিষ্ট দুটো দিক- দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। দীর্ঘ ৪ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর মসজিদে হারামের নতুন ইমারত গড়ে উঠে যা আজ পর্যন্ত বহাল আছে। বর্তমান মসজিদে হারাম, সৌদী বাদশাহ আবদুল আযীয এবং সুলতান সেলিমের নির্মিত।

আল্লামা কুতুবুদ্দিন হানাফী তাঁর الإعلام বইতে এ সকল তথ্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন। তিনি সেই যুগের সমসাময়িক বলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য অন্যান্য ঐতিহাসিকদের বক্তব্যের চেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন যে, আহমদ বেগ আমাকে জানিয়েছেন, এই বিরাট নির্মাণ কাজে সরকারের ১ লাখ সোনার দীনার ব্যয় হয়েছে। মিশর থেকে মক্কায় নিয়ে আসা বিভিন্ন উপকরণ ও সরঞ্জামাদি এই হিসেবেরে অতিরিক্ত।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মসজিদে হারামের স্তম্ভ, গম্বুজ এবং দরজার সংখ্যা

📄 মসজিদে হারামের স্তম্ভ, গম্বুজ এবং দরজার সংখ্যা


সুলতান সেলিম এবং সুলতান মুরাদ খান কর্তৃক ৯৮৪ হিজরীতে, মসজিদে হারাম নির্মাণের আগ পর্যন্ত, এতে মোট ৪৯৬টি স্তম্ভ ছিল। পূর্বদিকে ৮৮টি ও উত্তরে ১০৪টি, দক্ষিণে ১৪০টি এবং পশ্চিমে ৮৭টি স্তম্ভ ছিল। তবে ৯৮৪ হিজরীর নির্মাণের পর, স্তম্ভের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১১টি। পূর্বদিকের ছাদে ৬২টি, উত্তর দিকে ৮১টি, পশ্চিম দিকে ৫৮টি এবং দক্ষিণ দিকে ৯০টি। দারুন নাদওয়ার সম্প্রসারিত অংশে ১৪টি এবং বাবে ইবরাহীমের সম্প্রসারিত দিকে ৬টি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এই মিলে স্তম্ভ বা ছাদের খুঁটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১১।

৯৮৪ হিজরীর নির্মাণের পর মসজিদে হারামের গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫২ টিতে। এর মধ্যে পূর্বদিকে ২৪টি, উত্তরে ৩৬টি, হাযওয়ারার মিনারা সংলগ্ন ১টি এবং দারুন নাদওয়ার সম্প্রসারিত অংশে ১৬টি। কুতুবুদ্দিন হানাফী তাঁর الاعلام বইতে এই সংখ্যা উল্লেখ করেন। কিন্তু হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ তাঁর تاريخ عِمَارَةُ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ বইতে লিখেন যে, আমি গুণে দেখেছি, পশ্চিমে ২৪টি, বাবে ইবরাহীমের সম্প্রসারিত অংশে ১৫টি এবং দক্ষিণ দিকে ৩৬টি গম্বুজ রয়েছে।

খলীফা মাহদী নির্মিত মসজিদে হারামের দরজা সংখ্যা ১৯ এবং জানালা সংখ্যা ছিল ৩৮। এতে অবশ্য পূর্বের নির্মিত কিছু দরজা-জানালাও ছিল। প্রত্যেক দরজার মধ্যে কুরআনের আয়াত ও তা নির্মাণের সন তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ ছিল। অবশ্য পরবর্তীতে ঐ সকল দরজা-জানালার বহু পরিবর্তন হয়েছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 সুলতান রাসাদের নির্মাণ কাজ

📄 সুলতান রাসাদের নির্মাণ কাজ


তুর্কী সুলতান মুহাম্মদ রাসাদ খান বিন সুলতান আবদুল মজীদ খানের আমলে, ২৩শে জিলহজ্জ ১৩২৭ হিজরীতে, মসজিদে হারামে এক বন্যা হয়। সেই বন্যাকে 'খাদইউ' বন্যা বলে। কেননা, সেই বছর মিসরের সাবেক খাদিউ আব্বাস হেলমী পাশা হজ্জ করতে আসেন। বন্যার পানিতে কাবার দরজার চৌকাঠ, হাজারে আসওয়াদ এবং হিজরে ইসমাঈল ডুবে যায় এবং মসজিদে হারাম একটি দীঘির রূপ ধারণ করে। একদিন ও একরাত পর্যন্ত পানি বিদ্যমান থাকে।

পানি সরে যাওয়ার পর তদানীন্তন মক্কার গভর্নর শরীফ হোসাইন বিন আলী, অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমভিব্যহারে, মসজিদে হারামে ঢুকেন এবং বন্যার সাথে আসা স্তূপীকৃত ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করেন।

এই বন্যার ফলে, মসজিদে হারামের দেয়াল, মার্বেল পাথরের তৈরি স্তম্ভ ও ভিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় ২২টি স্তম্ভের ক্ষতি হয়। ১৩৩৪ হিজরীতে, সুলতান মুহাম্মদ রাসাদ খান হেজাযের গভর্নর এবং মসজিদে হারামের তদারককারী গালেব পাশাকে মসজিদে হারামের ক্ষতিগ্রস্ত অংশসমূহের সংস্কারের নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক ক্ষতিগ্রস্ত অংশসমূহের সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ শুরু হয়।

শরীফ হোসাইন, ১৩৩৪ হিজরীর ৮ই শাবান (১১ জুন, ১৯১৬) হেজাযের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ফলে তাঁর সাথে হেজাযে অবস্থানকারী তুর্কীদের লড়াই হয় এবং লড়াইর কারণে হারামের সংস্কার বন্ধ থাকে। ১৩৩৮ হিজরীতে, বাদশাহ শরীফ হোসাইন পুনরায় মসজিদে হারামের সংস্কারের নির্দেশ দেন। পরে অবশিষ্ট সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00