📄 শারাকেসা শাসকের নির্মাণ কাজ
আব্বাসী খলীফা মাহদী কর্তৃক মসজিদে হারাম সম্প্রসারণের পর সুদীর্ঘ ৬৩৮ বছরের মধ্যে, সামান্য কিছু সংস্কার ও নির্মাণ কাজ ব্যতীত, মসজিদে হারামের ব্যাপক কোন উল্লেখযোগ্য নির্মাণ ও সংস্কার কাজ হয়নি। এই দীর্ঘ সময়টুকুকে মসজিদে হারামের ইতিহাসে একটি মহান যুগ বললে অত্যুক্তি হয় না।
৮০২ হিজরীর ২৮শে শাওয়াল, শনিবার রাতে, মসজিদে হারামের পশ্চিমাংশে বাবুল অদা এবং বাবে ইবরাহীমের মাঝে অবস্থিত রামাস্ত মুসাফিরখানায় আগুন ধরে। শেখ আবুল কাসেম ইবরাহীম বিন হোসাইন ফার্সী, ৫২৯ হিজরীতে, দরবেশদের উদ্দেশ্যে ঐ মুসাফিরখানাটি ওয়াকফ করেন। মুসাফিরখানার একজন লোক বাতি জ্বালিয়ে বাইরে গেলে, ইঁদুর এসে বাতির শলিতা (সুতার গোছা) টেনে কামরার বাইরে নিয়ে যায়। ফলে মুসাফিরখানায় আগুন ধরে এবং সেই আগুন মসজিদে হারামের ছাদে লাগে। ছাদ উঁচু হওয়ায়, লোকেরা কিছুতেই ছাদের আগুন নিভাবার ব্যবস্থা করতে পারল না। ছাদের পশ্চিমাংশ জ্বলে, আগুন এবার ছাদের উত্তরাংশেও ছড়িয়ে পড়ে। বাবুল আজালা পর্যন্ত পৌঁছে আগুন নিভে যায়। আল্লাহর কুদরতের ফলে, সেই বছর এক ভয়াবহ বন্যায় মসজিদে হারামের দুটো স্তম্ভ আগেই ধসে পড়ে। ফলে, ঐ বিধ্বস্ত ছাদে গিয়ে আগুন আর সামনে সম্প্রসারিত না হয়ে নিভে যায়। অগ্নিকাণ্ডের ফলে মসজিদে হারামে বিরাট ধ্বংসস্তূপের সৃষ্টি হয়।
৮০৩ হিজরীতে মিসরের আমীরে হজ্জ ইয়াসাক জাহেরী হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আসেন। হজ্জ শেষে তিনি থেকে যান এবং মসজিদে হারামের ময়লা আবর্জনা ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার অভিযান চালান। এরপর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত স্তম্ভদ্বয় ও দেয়াল নির্মাণ করেন। তিনি প্রাথমিক নির্মাণ কাজ সেরে ৮০৫ হিজরীতে মিসর ফিরে যান।
সেই সময় মিসরে সারাকেশা শাসক নাসের যয়নুদ্দিন আবুস সায়াদাত ফারাজ বারকুকের শাসন বিদ্যমান ছিল। ইয়াসাক জাহেরী, নাসের যয়নুদ্দিনের অনুমোদনক্রমে, মসজিদে হারামের পশ্চিমাংশের পুড়ে যাওয়া ছাদ পুনঃনির্মাণের উদ্দেশ্যে ৮০৭ হিজরীতে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। তিনি মিসর থেকে প্রয়োজনীয় কাঠ এবং অন্যান্য সরঞ্জামও সাথে আনেন। তিনি ঐ বছরই অবশিষ্ট কাজ সমাপ্ত করেন এবং মসজিদে হারামের উন্নয়নের জন্য আরো বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
মসজিদে হারামে উল্লেখিত অগ্নিকাণ্ডের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে তা পরিষ্কার করা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশের পুনঃনির্মাণ করার কারণে লোকেরা ইয়াসাক জাহেরীর প্রশংসা করেন।
📄 সুলতান কায়েতবায়ের নির্মাণ কাজ
মিসরের সুলতান সারাকেশা শাসক কায়েতবায় ৮৮২ হিজরীতে (১৪৭৭ খৃঃ) খাজা শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন উমর শাহীর বাবন যামানকে নির্দেশ দিয়ে পাঠান, তিনি যেন সংগর জামালী বিল্ডিংকে মজবুত করে নির্মাণ, সুলতানের জন্য মসজিদে হারামে একটা স্থান উন্নত করে নির্মাণ, চার মাজহাবের আলেমদের ফেকাহ শাস্ত্র শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ, ফকীর-মিসকীনদের বাস করার জন্য একটি রাবাত বা বোর্ডিং নির্মাণ, গরীব ছাত্রদের মধ্যে আয় বণ্টনের জন্য লাভজনক মুসাফিরখানা তৈরি এবং মিসকীনদের জন্য একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠাসহ আরো কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন।
খাজা শামসুদ্দিন সুলতানের নির্দেশমত উপরোক্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করেন। পরে সুলতান ছাত্রদের জন্য বহু কিতাবপত্র পাঠান এবং ৪ মাজহাবের ৪ জন শিক্ষক নিয়োগ করেন। ৮৭৪ হিজরীতে, সুলতান কায়েতবায় মিনার মসজিদে খায়ফ খুব মজবুত করে নির্মাণ করেন। তিনি মসজিদে হারামের খেদমতের জন্য যথেষ্ট অবদান রেখে গেছেন।
📄 তুর্কী সুলতান সোলায়মানের নির্মাণ কাজ
৯৭২ হিজরী মোতাবেক ১৫৬৪ খৃষ্টাব্দে, তুরস্কের উসমানী খলীফাদের মধ্যে প্রথম যিনি মসজিদে হারামের সংস্কার করেন তিনি হচ্ছেন সুলতান সোলায়মান। তিনি নতুন করে কা'বা শরীফের ছাদ তৈরি করেন এবং মাতাফের বিছানা পরিবর্তন করেন। তিনি মসজিদে হারামের কিছু দরজার সংস্কার করেন, বাবুল কা'বার উন্নয়ন ও মীযাবেরও সংস্কার করেন। তিনিই সর্বপ্রথম মার্বেলের তৈরি মিম্বার আনেন। ইতিপূর্বের মিম্বারগুলো কাঠের নির্মিত ছিল। তিনি হানাফী ইমামের নামাযের জায়গা নির্মাণ করেন এবং পূর্বে বাবুস সালাম ও পশ্চিমে দারুন নাদওয়া বরাবর উত্তর পার্শ্বে, ৪ গম্বুজ বিশিষ্ট ৪টি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। এ মাদ্রাসাগুলোর মাঝে তিনি সর্বোচ্চ মিনারা তৈরী করেন এবং কিছু মসজিদের পার্শ্বে কিছুসংখ্যক মুসাফিরখানা তৈরি করেন। ৪ মাদ্রাসায় ৪ মাজহাবের মক্কী আলেমরা শিক্ষা দান করতেন। মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদেরকে ভাতা দেয়া হত। সুলতান সোলায়মানের আমলে ঐ ৪টি মাদ্রাসার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর ছেলে সুলতান সেলিমের আমলে মাদ্রাসার কাজ সমাপ্ত হয়।
📄 সুলতান সেলিমের নির্মাণ কাজ
আব্বাসী খলীফা মাহদী কর্তৃক ১৬৯ হিজরীতে মসজিদে হারামের যে নির্মাণ ও সম্প্রসারণ হয় তা ৯৭৯ হিজরী পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৮১০ বছর বহাল থাকে। তাঁর নির্মিত ভিত্তিতে কোন দুর্বলতা দেখা দেয়নি এবং গোটা মসজিদে হারাম ৮০২ হিজরীর অগ্নিকাণ্ড ব্যতিরেকে, বন্যার মোকাবিলা, তাপ থেকে মুসল্লীদেরকে রক্ষা, বৃষ্টি ও ঝড় তুফান থেকে তাদেরকে সুষ্ঠুভাবে হেফাজত করে যাচ্ছিল।
কিন্তু ৯৭৯ হিজরীতে, পূর্বদিকের ছায়াদার গম্বুজ কাবা শরীফের দিকে ঝুঁকে পড়ার উপক্রম হয় এবং মসজিদের দেয়ালের উপর ছাদের কাঠ বেরিয়ে পড়ে। বাবুল আব্বাস এবং বাবুন নবীর মাঝে অবস্থিত, মসজিদের পূর্বাংশে নির্মিত সুলতান কায়েতবায়ের মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসায়ে আফদালিয়ার দেয়ালের বাইরে ছাদ বিছিন্ন হয়ে যায়। ফলে, ছায়াদার গম্বুজের মাথা মসজিদের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তা সংস্কারের সকল চেষ্টা নিরর্থক হয়ে পড়ে।
৯৭৯ হিজরীতে, এই ঘটনা সুলতান সেলিম বিন সোলায়মানের কাছে পৌছানোর পর সুলতানকে বলা হয় যে, কায়েতবায়ের নির্মিত মাদ্রাসার দেয়ালের কারণেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মাহদীর নির্মিত মজবুত দেয়াল অক্ষুণ্ণ আছে এবং এর কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। ঐ ঘটনা না ঘটলে, আজ পর্যন্ত হয়তো, মসজিদে হারামে খলীফা মাহদীর নির্মিত ছাদ, দেয়াল ও অন্যান্য কার্যক্রম অক্ষুণ্ণ থাকত।
যাই হোক, সুলতান সেলিম ঐ খবর পেয়ে পুরো মসজিদে হারাম অত্যন্ত মজবুতি ও দক্ষতার সাথে নির্মাণের আদেশ দেন এবং কাঠের নির্মিত ছাদের পরিবর্তে গোলাকার গম্বুজ তৈরি করেন। এই গম্বুজ তাপ থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে পূর্বের ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম। সুলতান সেলিম মিসরের গভর্নর সানান পাশার কাছে মসজিদে হারাম নির্মাণের জন্য অত্যন্ত ধার্মিক, আমানতদার, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন লোক নির্বাচনের নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক, মিসরের সাবেক গভর্নর আহমদ বেগকে ঐ কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তাঁকে মসজিদে হারাম নির্মাণের দায়িত্ব অর্পনের সাথে সাথে জেদ্দার গভর্নর বানিয়ে পাঠানো হয়। তিনি ৯৭৯ হিজরীতে, মক্কায় পৌঁছেন এবং মসজিদে হারামের তত্ত্বাবধায়ক বদরুদ্দিন হোসাইনীর সাথে যথেষ্ট আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি ৯৮০ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের মাঝামাঝি সময়ে, বাবুস সালামের অংশে, মাহদীর নির্মিত ইমারত ভাঙ্গা শুরু করেন। ৯৮০ হিজরীর ৬ই জুমাদাল উলায় বাবুস সালামের দিক থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আহমদ বেগ নিরলসভাবে মসজিদে হারামের পূর্ব ও উত্তর দিকের নতুন ইমারত তৈরি সম্পন্ন করেন। ঠিক সেই সময়ে সুলতান সেলিমের ইন্তেকাল হয়।