📄 ৭ম সম্প্রসারণ : মো’তাদেদ বিল্লাহ
২৮১ হিজরীতে, খলীফা মো'তাদেদ বিল্লাহ মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেন। খলীফা মাহদী কর্তৃক বর্গাকৃতির মসজিদে হারামের সম্প্রসারণের বাইরে মাত্র আর দু'টো সম্প্রসারণ হয়। একটি হচ্ছে পশ্চিম দিকের বাবে ইবরাহীম বরাবর আর ২য়টি হচ্ছে উত্তর দিকের দারুন নাদওয়াহ। দারুন নাদওয়ার উপর দিয়ে প্রবাহিত পানির প্রবল স্রোতের কারণে সেখানে প্রায়ই ময়লা-আবর্জনা জমে থাকত এবং সর্বদা তা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হত। দারুন নাদওয়াহ উঁচু থাকায়, কাবা শরীফের ভিটি ও দেয়ালের উপর পানির চাপ বেশী পড়ত। খলীফা মোতাদেদ দারুন নাদওয়াকে খুঁড়ে এর সংলগ্ন দক্ষিণাংশের নিম্নভূমির সমান করে তাকে মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থও পাঠান। যাতে করে কাবার উপর বন্যার পানির চাপ কমে এবং দারুন নাদওয়ায়ও কোন ময়লা আবর্জনা না জমে। এ ছাড়াও এতে নামাযের জায়গার প্রশস্ততা বাড়বে। ৩ বছর যাবত এই সম্প্রসারণ কাজ চলে এবং ২৮৪ হিজরীতে তা সমাপ্ত হয়। ফলে বন্যার পানি পশ্চিমের নিম্নভূমির দিকে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কাবা শরীফ নিরাপদ হয়ে উঠে।
খলীফা মোতাদেদের আমলে এই সম্প্রসারণ ছাড়াও মসজিদে হারামের সার্বিক মেরামত এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ করা হয়। দারুন নাদওয়ার মাটি কেটে মক্কার বাইরে ফেলা হয়। এইভাবে, কুসাই বিন কিলাবের প্রতিষ্ঠিত দারুন নাদওয়া মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় যা ইসলামী যুগেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত টিকে ছিল।
📄 ৮ম সম্প্রসারণ : মোকতাদের বিল্লাহ
আব্বাসী খলীফা মোকতাদের বিল্লাহ বাবে ইবরাহীম সংলগ্ন অংশকে মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। ৩০৬ হিজরীর ঐ সম্প্রসারণ মসজিদে হারামে সর্বশেষ আব্বাসী সম্প্রসারণ। এরপর আব্বাসী আমলে আর কোন সম্প্রসারণ হয়নি।
📄 শারাকেসা শাসকের নির্মাণ কাজ
আব্বাসী খলীফা মাহদী কর্তৃক মসজিদে হারাম সম্প্রসারণের পর সুদীর্ঘ ৬৩৮ বছরের মধ্যে, সামান্য কিছু সংস্কার ও নির্মাণ কাজ ব্যতীত, মসজিদে হারামের ব্যাপক কোন উল্লেখযোগ্য নির্মাণ ও সংস্কার কাজ হয়নি। এই দীর্ঘ সময়টুকুকে মসজিদে হারামের ইতিহাসে একটি মহান যুগ বললে অত্যুক্তি হয় না।
৮০২ হিজরীর ২৮শে শাওয়াল, শনিবার রাতে, মসজিদে হারামের পশ্চিমাংশে বাবুল অদা এবং বাবে ইবরাহীমের মাঝে অবস্থিত রামাস্ত মুসাফিরখানায় আগুন ধরে। শেখ আবুল কাসেম ইবরাহীম বিন হোসাইন ফার্সী, ৫২৯ হিজরীতে, দরবেশদের উদ্দেশ্যে ঐ মুসাফিরখানাটি ওয়াকফ করেন। মুসাফিরখানার একজন লোক বাতি জ্বালিয়ে বাইরে গেলে, ইঁদুর এসে বাতির শলিতা (সুতার গোছা) টেনে কামরার বাইরে নিয়ে যায়। ফলে মুসাফিরখানায় আগুন ধরে এবং সেই আগুন মসজিদে হারামের ছাদে লাগে। ছাদ উঁচু হওয়ায়, লোকেরা কিছুতেই ছাদের আগুন নিভাবার ব্যবস্থা করতে পারল না। ছাদের পশ্চিমাংশ জ্বলে, আগুন এবার ছাদের উত্তরাংশেও ছড়িয়ে পড়ে। বাবুল আজালা পর্যন্ত পৌঁছে আগুন নিভে যায়। আল্লাহর কুদরতের ফলে, সেই বছর এক ভয়াবহ বন্যায় মসজিদে হারামের দুটো স্তম্ভ আগেই ধসে পড়ে। ফলে, ঐ বিধ্বস্ত ছাদে গিয়ে আগুন আর সামনে সম্প্রসারিত না হয়ে নিভে যায়। অগ্নিকাণ্ডের ফলে মসজিদে হারামে বিরাট ধ্বংসস্তূপের সৃষ্টি হয়।
৮০৩ হিজরীতে মিসরের আমীরে হজ্জ ইয়াসাক জাহেরী হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আসেন। হজ্জ শেষে তিনি থেকে যান এবং মসজিদে হারামের ময়লা আবর্জনা ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার অভিযান চালান। এরপর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত স্তম্ভদ্বয় ও দেয়াল নির্মাণ করেন। তিনি প্রাথমিক নির্মাণ কাজ সেরে ৮০৫ হিজরীতে মিসর ফিরে যান।
সেই সময় মিসরে সারাকেশা শাসক নাসের যয়নুদ্দিন আবুস সায়াদাত ফারাজ বারকুকের শাসন বিদ্যমান ছিল। ইয়াসাক জাহেরী, নাসের যয়নুদ্দিনের অনুমোদনক্রমে, মসজিদে হারামের পশ্চিমাংশের পুড়ে যাওয়া ছাদ পুনঃনির্মাণের উদ্দেশ্যে ৮০৭ হিজরীতে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। তিনি মিসর থেকে প্রয়োজনীয় কাঠ এবং অন্যান্য সরঞ্জামও সাথে আনেন। তিনি ঐ বছরই অবশিষ্ট কাজ সমাপ্ত করেন এবং মসজিদে হারামের উন্নয়নের জন্য আরো বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
মসজিদে হারামে উল্লেখিত অগ্নিকাণ্ডের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে তা পরিষ্কার করা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশের পুনঃনির্মাণ করার কারণে লোকেরা ইয়াসাক জাহেরীর প্রশংসা করেন।
📄 সুলতান কায়েতবায়ের নির্মাণ কাজ
মিসরের সুলতান সারাকেশা শাসক কায়েতবায় ৮৮২ হিজরীতে (১৪৭৭ খৃঃ) খাজা শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন উমর শাহীর বাবন যামানকে নির্দেশ দিয়ে পাঠান, তিনি যেন সংগর জামালী বিল্ডিংকে মজবুত করে নির্মাণ, সুলতানের জন্য মসজিদে হারামে একটা স্থান উন্নত করে নির্মাণ, চার মাজহাবের আলেমদের ফেকাহ শাস্ত্র শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ, ফকীর-মিসকীনদের বাস করার জন্য একটি রাবাত বা বোর্ডিং নির্মাণ, গরীব ছাত্রদের মধ্যে আয় বণ্টনের জন্য লাভজনক মুসাফিরখানা তৈরি এবং মিসকীনদের জন্য একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠাসহ আরো কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন।
খাজা শামসুদ্দিন সুলতানের নির্দেশমত উপরোক্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করেন। পরে সুলতান ছাত্রদের জন্য বহু কিতাবপত্র পাঠান এবং ৪ মাজহাবের ৪ জন শিক্ষক নিয়োগ করেন। ৮৭৪ হিজরীতে, সুলতান কায়েতবায় মিনার মসজিদে খায়ফ খুব মজবুত করে নির্মাণ করেন। তিনি মসজিদে হারামের খেদমতের জন্য যথেষ্ট অবদান রেখে গেছেন।