📄 আবদুল মালেক বিন মারওয়ানের নির্মাণ কাজ
আবদুল মালেক বিন মারওয়ান, ৭৫ হিজরীতে, মসজিদে হারামের দেয়াল উঁচু করেন। টিন দ্বারা এর ছাদ দেন এবং প্রত্যেক খুঁটির মাথায় ৫০ মেসকাল সোনা লাগান। মজবুত ও সুন্দর কাঠ ছাদে লাগান। এ ছাড়া তিনি ইবনে যোবায়েরের সম্প্রসারণের বাইরে আর কিছু করেননি।
উমাইয়া খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ানের সময় মক্কার গভর্নর খালেদ বিন আবদুল্লাহ আল-কাসরী একই ইমামের পেছনে একই জামাতে কাবা শরীফের চতুর্দিকে ফরজ ও তারাবীহর নামায পড়ার পদ্ধতি চালু করেন। ইমাম নবওয়ী তাঁর হজ্জের উপর লেখা 'আল-ঈদাহ' গ্রন্থে এই কথা উল্লেখ করেন। কেননা, খালেদ লক্ষ্য করলেন যে, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে শুধু একদিকে অর্থাৎ পূর্বদিকে নামাযীদের সংকুলান সম্ভবপর হচ্ছিল না। আতা বিন আবি রেবাহ এবং আমর বিন দীনারের মত অন্যান্য বড় বড় আলেমরা এটাকে অস্বীকার করেননি। এর আগে কাবার অবশিষ্ট তিন অংশে নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হত না, সেই দিকগুলো জামাতের সময় মুসল্লীশূন্য থাকত। খালেদ কাবার চতুর্দিকে নামাযের জামাতের কাতারবন্দীর যে ব্যবস্থা করলেন তা অত্যন্ত সুন্দর ব্যবস্থা। তাবেঈদের মধ্যে বড় বড় আলেমরা সবাই এটাকে সমর্থন করেছেন। যদি এই কাজ ইসলাম বিরোধী হত, তাহলে উলামায়ে কেরাম অবশ্যই এর বিরোধিতা করতেন। সুয়ূতী এক বর্ণনায় বলেছেন, খালেদই প্রথম এই পদ্ধতি চালু করেন। কিন্তু সুয়ূতীর অপর এক বর্ণনায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে এই পদ্ধতির প্রবর্তক বলা হয়েছে। প্রথম মতটিই বেশী বিশুদ্ধ。
📄 ৪র্থ সম্প্রসারণ : ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক
হিজরী ৯১ সালে উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক বিন মারওয়ান মসজিদে হারামের সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন এবং নিজের বাপের সংস্কারকর্মকে ভেঙ্গে ফেলেন। তিনি মসজিদে হারামের মজবুত ইমারত নির্মাণ করেন এবং মিসর ও সিরিয়া থেকে মার্বেল পাথরের নির্মিত খুঁটি আনেন। কারুকার্য খচিত কাঠ দ্বারা তিনি মসজিদে হারামের ছাদ নির্মাণ করেন। প্রত্যেক স্তম্ভের মাথায় সোনার চওড়া পাত লাগান, মসজিদে হারামের ভেতর মার্বেল পাথর লাগান, সৌন্দর্যের জন্য মাঝে মাঝে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করেন এবং দেয়ালের মধ্যে নকশা অংকন করেন। উঁচু দেয়ালের মাধ্যমে কিছুটা ছায়ার ব্যবস্থা হত, এ ছাড়াও ছায়াদানের জন্য উঁচু ছাতা নির্মাণ করেন। তিনি মসজিদে হারামের শুধু পূর্বদিকেই সম্প্রসারণ করেছিলেন。
📄 ৫ম সম্প্রসারণ : আবু জাফর মনসুর আব্বাসী
১৩৭ হিজরীতে, আবু জাফর মনসুর আব্বাসী মসজিদে হারাম সম্প্রসারণ করার জন্য মক্কার শাসককে আদেশ দেন। তিনি দারুন-নাদওয়া এবং বাবে ইবরাহীম থেকে বাবুল উমরার দিকে মসজিদে হারাম সম্প্রসারণ করেন। দক্ষিণ দিকে, ইবরাহীম উপত্যকার পানির নালা থাকায় সেদিকে মসজিদ সম্প্রসারণ করেননি এবং পূর্বদিকেও মসজিদ বাড়াননি। (৪) আবু জাফর মনসুর উত্তর ও পশ্চিম দিকের ঘর-বাড়ীগুলো কিনে, সে যমীনগুলো মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। আবু জাফর মনসুরের পক্ষে যিয়াদ বিন ওবায়দুল্লাহ হারেসী মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেন। মনসুর উত্তর-পশ্চিম সম্প্রসারিত কোণে মিনারা তৈরির নির্দেশ দেন এবং সেখানে একটি মিনারা নির্মাণ করা হয়। তিনি পূর্বদিকে একটি ছায়াদার ছাতা নির্মাণ করেন। তিনি এই ছাতাটিকে কারুকার্য খচিত করেন এবং হিজরে ইসমাঈলে মার্বেল পাথর লাগান। তিনিই সর্বপ্রথম এর বাইর, ভেতর এবং উপরে মার্বেল পাথর বসান। এই সম্প্রসারণ কাজে তিন বছর সময় লেগেছিল। যে বছর সম্প্রসারণ কাজ শেষ হয় সে বছর মনসুর হজ্জে আসেন। তাঁর আমলে মসজিদে হারাম পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ বড় করা হয়।
টিকাঃ
৪. তারিখ এমরাতুল মসজিদিল হারাম, হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ।
📄 ৬ষ্ঠ সম্প্রসারণ : মুহাম্মদ আল মাহদী আব্বাসী
আব্বাসী খলীফা মুহাম্মদ আল-মাহদী বিন আবু জাফর মনসুর ১৬০ হিজরীতে হজ্জে আসেন। তিনি মসজিদে হারামে মুসল্লীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় তা সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। হযরত উমর (রা) এর আমল থেকে আবু জাফর মনসুরের আমল পর্যন্ত যতটুকু সম্প্রসারণ হয়েছে, মুহাম্মদ মাহদীর আমলে একাই সেই পরিমাণ সম্প্রসারণ হয়েছে এবং তা ৯৭৯ হিজরী পর্যন্ত ৮১০ বছরব্যাপী বিদ্যমান ছিল।
মাহদী তিন কোটি ৫ লাখ দীনার হারামের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে ব্যয় করেন। তিনি মক্কার কাজী মুহাম্মাদ আওকাস বিন মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান মাখযুমীকে মসজিদে হারামের উঁচু দিকের ঘরগুলো ক্রয় করে তা ধ্বংস করে দিতে এবং সেই যমীনগুলো মসজিদে হারামে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়ার নির্দেশ দেন। কাজী সে অনুযায়ী মসজিদে হারাম এবং মাসআর মাঝের সবগুলো ঘর কিনেন এবং বিভিন্ন হেবা ও ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর পরিবর্তে অন্যত্র জায়গা দিয়ে দেন। প্রতিগজ হুকুম-দখলকৃত যমীনের ক্ষতিপূরণ দেন ২৫ দীনার করে। পশ্চিম দিকেও সম্প্রসারণ করেন এবং নিম্নদিকের ঘরগুলো কিনে তা মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। প্রথমে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম দিকে সম্প্রসারণ করেন এবং পরবর্তীতে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণ করেন। ১৬০ হিজরীতে প্রথম সম্প্রসারণ হয়। মাহদী ১৬৪ হিজরীতে ২য় বার হজ্জে আসেন এবং মুসল্লীদের স্থান সংকুলান না হওযায় তিনি পুনরায় মসজিদে হারাম সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। হিজরী ১৬৭ সালে ২য় সম্প্রসারণ শুরু হয়। কাবা শরীফকে মসজিদে হারামের মাঝামাঝি করার জন্য ২য় দফা মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু ১৬৯ হিজরীতে মাহদীর মৃত্যুতে তাঁর জীবদ্দশায়, সম্প্রসারণ কাজ সমাপ্ত হয়নি। তাঁর ছেলে খলীফা হাদী বিন মুহাম্মাদ মাহদী খলীফা হওয়ার পর সর্বপ্রথম তাঁর বাপের অসমাপ্ত কাজ কিছু সমাপ্ত করেন। পরে মুসা আল হাদীর আমলে মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ কর্মসূচী সমাপ্ত হয়।
মাহদীর সম্প্রসারণের পর মসজিদে হারামের আয়তন দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গহাত। মাহদী প্রথম দফা সম্প্রসারণের সময় মসজিদে হারামের পূর্ব ও পশ্চিমের ৪০৭ হাত দৈর্ঘ্য এবং ২য় দফা সম্প্রসারণের সময় দক্ষিণ দিকে ৯০ হাত প্রস্থ বাড়ান। দৈর্ঘ্য ৪০৭ হাতকে প্রস্থ ৯০ হাত দিয়ে পূরণ দিলে, মাহদীর সম্প্রসারণের আয়তন দাঁড়ায় ৩৬,৬৩০ বর্গহাত। প্রতি বর্গহাতের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫ দীনার মূল্য দান করলে, মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯,১৫,৭৫০ দীনার। এই পরিমাণ অর্থ, তিনি ঘরের মালিকদেরকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি হারামের উন্নয়নে বিরাট অংক ব্যয় করেন।
মাহদী সিরিয়া এবং অন্যান্য দেশ থেকে মসজিদে হারামের খুঁটির জন্য মার্বেলের তৈরি স্তম্ভ আনেন। তিনি নকশা করা কাঠ দিয়ে মসজিদে হারামের ছাদ নির্মাণ করেন। তিনি কাঠের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর ডিজাইন করান। এতেও তার বহু অর্থ ব্যয় হয়।
ইতিপূর্বে আবু জাফর মনসুর বাবুল উমরায় একটি মিনারা তৈরি করেন। পরবর্তীতে মাহদী বাবুস সালাম, বাবে আলী এবং বাবুল অদা' তথা হাযওয়ারায় তিনটি মিনারা নির্মাণ করেন। ফাসী গুরুত্বসহকারে মাহদীর মিনারা তৈরির তথ্য উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কাজী বিন জোহাইরা কোন প্রমাণ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন যে, এই মিনারাগুলো পূর্বের নির্মিত। মাহদী শুধু সেগুলোর সংস্কার ও মেরামত করেন।