📄 মসজিদে হারামের ১ম সম্প্রসারণ : হযরত উমার (রা)
হিজরী ১৭ সালে, হযরত উমর (রা) সর্বপ্রথম মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পর থেকে হযরত উমর (রা)-এর আগ পর্যন্ত আর কেউ মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেননি।
মক্কার উচ্চভূমিতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে মসজিদে হারামের নিম্নভূমিতে 'উম্মে নহশল' নামক এক ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় এবং বন্যার পানি মসজিদে হারামে প্রবেশ করে মাকামে ইবরাহীমকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং পানি শুকানোর পর তা মক্কার নিম্নভূমিতে পাওয়া যায়। পরে তা সেখান থেকে এনে কাবা শরীফের সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়। এই বন্যাকে 'উম্মে নহশল বন্যা' নামকরণের কারণ হল, এতে উম্মে নহশল বিনত ওবায়দা বিন সাঈদ বিন আল-আস বিন উমাইয়া বিন আবদে শামস মারা যায়। (১)
এই বন্যায় মাকামে ইবরাহীম স্থানচ্যুত হওয়ার খবর খলীফা উমরের কাছে পৌঁছার পর তিনি এটাকে ভয়াবহ সমস্যা বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি ১৭ হিজরীর রমযান মাসে উমরাহর নিয়তে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং মসজিদে হারামে ঢুকে মাকামে ইবরাহীমের কাছে দাঁড়ান। তিনি আল্লাহর কসম দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তির কাছে মাকামে ইবরাহীমের স্থানের সঠিক জ্ঞান আছে সে যেন তা প্রকাশ করে। তখন আবদুল মুত্তালিব বিন আবি ওদায়া' আস-সাহমী (রা) বলেন, 'হে আমীরুল মোমেনিন! এ বিষয়ে আমি সঠিক ওয়াকিফহাল। আমার একবার এরকম আশংকা হয়েছিল যে, কোন সময় যদি এরকম দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে তার সঠিক পরিমাপ হেফাজত করা দরকার হবে, তাই আমি মাকামে ইবরাহীমের অবস্থান থেকে বাবুল কাবা এবং যমযমের দূরত্ব একটি রশি দ্বারা মেপে রাখি। সেই রশিটি আমার ঘরে মওজুদ আছে।' হযরত উমর বলেন, তুমি আমার কাছে বস এবং একজনকে রশিটি আনার জন্য পাঠিয়ে দাও। তিনি বসলেন এবং একজনকে পাঠিয়ে রশি আনালেন। পরে রশি দিয়ে মেপে তা পূর্বের যথার্থ স্থানে রাখলেন। আজকে আমরা যেখানে তা দেখছি এইটিই সেই স্থান। পরে মাকামে ইবরাহীমকে মজবুতভাবে সেখানে বসানো হয়।
আযরাকী এবং মাওয়ারদীসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকরা এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। তবে সুয়ূতী তাঁর 'আওয়ায়েল কিতাবে' লিখেন যে, মাকামে ইবরাহীমকে পুনর্বহাল করার পর এর পেছনে সর্বপ্রথম হযরত উমর (রা) নামায পড়েন।
মাকামে ইবরাহীমের পুনর্বহাল কাজ শেষ করার পর হযরত উমর মসজিদে হারাম তথা তওয়াফের নির্দিষ্ট স্থানে মুসল্লীদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করেন। তাই তিনি মসজিদে হারামের নিকটবর্তী ঘরগুলো কিনে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলেন এবং সেই সকল জায়গাকে মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে, মসজিদে হারাম পূর্বের চেয়ে বড় ও সম্প্রসারিত হয়। কিছু সংখ্যক ঘরের মালিক ঘর বিক্রি করতে এবং মূল্য নিতে অস্বীকার করায় হযরত উমর (রা) সেই সকল ঘরের মূল্য নির্ধারণ করে সেই অর্থ কাবার অর্থভাণ্ডারে রেখে দেন এবং বলেন: "তোমরা কাবার আঙ্গিনায় এসেছ এবং ঘর বেঁধেছ, তোমরা এর মালিক নও; কিন্তু কাবা তোমাদের আঙ্গিনায় আসেনি।” তারা হযরত উমরের দৃঢ় সংকল্প দেখে পরে মূল্য গ্রহণ করে। এরপর হযরত উমর (রা) মসজিদে হারামের চার পার্শ্বে মাথা থেকে নীচু দেয়াল নির্মাণ করেন এবং পূর্বের ঘরগুলোর কাবামুখী দরজাসমূহ বরাবর দেয়ালের দরজা রাখেন। ঐ দেয়ালের উপর বাতি জ্বালানো হত। হযরত উমর ফারুক (রা) সর্বপ্রথম মসজিদে হারামের চারদিকে দেয়াল নির্মাণ করেন। তবে ঐতিহাসিকগণ হযরত উমর (রা) কি সংখ্যক ঘর কিনে ভেঙ্গেছিলেন তার সংখ্যা উল্লেখ করেননি।
মসজিদে হারামের সম্প্রসারণের পর হযরত উমর ফারুক (রা) মসজিদে হারামের উপর দিয়ে প্রবাহিত সর্বনাশা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম হাতে নেন। তিনি কাবা শরীফ থেকে আধা মাইল দূরে 'মোদ্দাআ' নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। সেটি বনি জোমাহ গোত্রের এলাকায় ছিল বলে সেটাকে 'বনি জোমাহ বাঁধ' বলা হয়। সেই স্থানটি বেশ উঁচু ছিল এবং সেখান থেকে কা'বা শরীফ দেখা যেত। বাঁধ নির্মাণের আগে মোদ্দাআ' থেকে পানি মাসআর রাস্তার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাবুস সালাম দরজা দিয়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করত। বাঁধ নির্মাণের ফলে, লা'লা' পাহাড় এবং মোদ্দাআ'র নিকটবর্তী অন্যান্য পাহাড়ের পানি সোকুল লাইলের উপর দিয়ে ইবরাহীম উপত্যকার পানির নালার সাথে গিয়ে মিশে এবং উভয় স্রোত মসজিদে হারামের দক্ষিণ দিয়ে মেসফালার দিকে প্রবাহিত হয়। যার ফলে, মসজিদে হারাম বন্যার কবল থেকে মুক্ত হয়ে যায়। বড় বড় পাথর ও হাড় দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং এর উপর মাটি ফেলা হয়। পরে বন্যায় কোন সময় এই বাঁধের ক্ষতি সাধন করতে পারেনি। তবে ২০২ হিজরীর বিরাট বন্যা সেই বাঁধের কিছু বড় বড় পাথর খসিয়ে ফেলে। ঐটি মক্কার বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রথম বাঁধ ছিল। (২)
📄 ২য় সম্প্রসারণ : হযরত উসমান (রা)
আল্লামা ফাসী তাঁর 'শিফাউল গারামে' হাফেজ নাজমুদ্দিন উমর বিন ফাহাদ কোরাশী তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে, ইবনে জারীর, ইবনুল আসীর এবং ইয়াকুত হামাওয়ী তাঁর 'নগর অভিধানে' ২৬ হিজরীতে হযরত উসমান (রা) কর্তৃক মসজিদে হারামের সম্প্রসারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর আমলে মক্কার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদে হারামে নামাযীদের স্থান সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তখন হযরত উসমান (রা) পার্শ্ববর্তী ঘরগুলো ক্রয় করে তা ভেঙ্গে ফেলেন এবং সেই স্থানকে মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু তিনি কি পরিমাণ ঘর মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন এর কোন সংখ্যা কোথাও উল্লেখ নেই। ঘরের মালিকরা তাঁর কাছ থেকেও মূল্য নিতে অস্বীকার করে। তখন তিনি বলেন, 'আমার ধৈর্য্য শক্তির কারণেই তোমরা এই দুঃসাহস দেখাচ্ছ নচেৎ হযরত উমরের সময় তো কেউ কোন উচ্চ-বাচ্চ করনি।' তারপর তিনি তাদেরকে আটক করার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরে আবদুল্লাহ বিন খালেদ বিন উসাইদের সুফারিশক্রমে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়। হযরত উসমান (রা) সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে ছায়াদার ছাতা নির্মাণ করেন। কেননা, তখন এতে কোন ছাদ কিংবা ছায়াদার অন্য কিছু ছিল না। (৩)
📄 ৩য় সম্প্রসারণ : আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা)
৬৫ হিজরীতে (৬৮৪ খৃঃ) হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের নিজ খেলাফতের সময় প্রথমে কাবা শরীফ নির্মাণ করেন। তারপর তিনি মসজিদে হারামও নির্মাণ করেন। তিনি পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে মসজিদে হারাম সম্প্রসারণ করেন এবং 'আখবারে মক্কার' লেখক আবুল ওয়ালীদের দাদার কয়েকটি ঘর ১৩ হাজারেরও বেশী দীনার দিয়ে ক্রয় করে তা মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি মসজিদে হারামের ছাদ নির্মাণ করেন। তবে তিনি সম্পূর্ণ মসজিদে হারামের ছাদ করেছেন, না আংশিক ছাদ করেছেন তা জানা যায় না।
উমরী 'মাসালেকুল আবসার' বইতে লিখেছেন, আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের হারাম শরীফে মার্বেল পাথর দিয়ে স্তম্ভ তৈরি করেছিলেন। উমরী খুবই নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক। আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে যোবায়েরের সময় মসজিদে হারামের আয়তন ছিল ৯ জারীব। মাওয়ারদী, নবওয়ী এবং কালঈ বলেন, এক জারীব হচ্ছে ১০ বর্গ কাসবার সমান এবং এক কাসবা হচ্ছে ৬ গজ। এতে করে এক জারীব হচ্ছে ৩,৬০০ বর্গহাত। ফলে, ইবনে যোবায়ের নির্মিত মসজিদে হারামের আয়তন দাঁড়ায় ৩২,৪০০ বর্গহাত। এই আয়তন বর্তমান মসজিদে হারামের আয়তনের এক চতুর্থাংশ কিংবা সামান্য কিছু বেশী। তবে মসজিদে হারাম ঠিক কোন সালে তিনি নির্মাণ করেন, এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকরা কোন কিছু উল্লেখ করেননি। ধারণা করা হয় যে, ৬৪ হিজরীতে কাবা শরীফ নির্মাণের পরের বছরই ৬৫ হিজরীতে সম্ভবতঃ তিনি মসজিদে হারাম নির্মাণ করেন। কেননা, কাবা ও মসজিদে হারাম মেনজানিক দ্বারা একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল。
📄 আবদুল মালেক বিন মারওয়ানের নির্মাণ কাজ
আবদুল মালেক বিন মারওয়ান, ৭৫ হিজরীতে, মসজিদে হারামের দেয়াল উঁচু করেন। টিন দ্বারা এর ছাদ দেন এবং প্রত্যেক খুঁটির মাথায় ৫০ মেসকাল সোনা লাগান। মজবুত ও সুন্দর কাঠ ছাদে লাগান। এ ছাড়া তিনি ইবনে যোবায়েরের সম্প্রসারণের বাইরে আর কিছু করেননি।
উমাইয়া খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ানের সময় মক্কার গভর্নর খালেদ বিন আবদুল্লাহ আল-কাসরী একই ইমামের পেছনে একই জামাতে কাবা শরীফের চতুর্দিকে ফরজ ও তারাবীহর নামায পড়ার পদ্ধতি চালু করেন। ইমাম নবওয়ী তাঁর হজ্জের উপর লেখা 'আল-ঈদাহ' গ্রন্থে এই কথা উল্লেখ করেন। কেননা, খালেদ লক্ষ্য করলেন যে, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে শুধু একদিকে অর্থাৎ পূর্বদিকে নামাযীদের সংকুলান সম্ভবপর হচ্ছিল না। আতা বিন আবি রেবাহ এবং আমর বিন দীনারের মত অন্যান্য বড় বড় আলেমরা এটাকে অস্বীকার করেননি। এর আগে কাবার অবশিষ্ট তিন অংশে নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হত না, সেই দিকগুলো জামাতের সময় মুসল্লীশূন্য থাকত। খালেদ কাবার চতুর্দিকে নামাযের জামাতের কাতারবন্দীর যে ব্যবস্থা করলেন তা অত্যন্ত সুন্দর ব্যবস্থা। তাবেঈদের মধ্যে বড় বড় আলেমরা সবাই এটাকে সমর্থন করেছেন। যদি এই কাজ ইসলাম বিরোধী হত, তাহলে উলামায়ে কেরাম অবশ্যই এর বিরোধিতা করতেন। সুয়ূতী এক বর্ণনায় বলেছেন, খালেদই প্রথম এই পদ্ধতি চালু করেন। কিন্তু সুয়ূতীর অপর এক বর্ণনায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে এই পদ্ধতির প্রবর্তক বলা হয়েছে। প্রথম মতটিই বেশী বিশুদ্ধ。