📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 তওয়াফের তাৎপর্য ও ফজীলেত

📄 তওয়াফের তাৎপর্য ও ফজীলেত


হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি:
مَنْ طَافَ بِهذا البَيْتِ أَسْبُوعًا فَأَحْصَاهُ كَانَ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ ، وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ : لَا يَرْفَعُ قَدَمًا وَلَا يَضَعُ أُخْرِى الْأَحَطَّ اللَّهُ بِهَا عَنْهُ خَطِيئَةً وَكُتِبَتْ لَهُ بِها حَسَنَةً - اخرجه الترمذى بهذا اللفظ وقال حديث حسن -
অর্থ: 'যে ব্যক্তি হিসেব করে, এক সপ্তাহব্যাপী কাবা শরীফ তওয়াফ করে সে একটি গোলাম আযাদ করার সমান সওয়াব পাবে।' আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে আরো বলতে শুনেছি, "সেই ব্যক্তির প্রতি কদমে আল্লাহ তাঁর অপরাধ ক্ষমা করেন এবং তাঁর নেক লেখা হয়।" তিরমিজী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আবু হাতেম আরো একটু বাড়িয়ে বর্ণনা করেছেন : وَرَفَعَ لَهُ بِهَا دَرَجَةً অর্থাৎ এর মাধ্যমে আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।

হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত রয়েছে, সেটি হল:
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : مَنْ طَافَ بِالْبَيْتِ وَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ .
অর্থ: 'আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, যে কাবার তওয়াফ করবে এবং দু'রাকাত নামায পড়বে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাবে।' ইবনে হিব্বান ও আবু সাঈদ আল-জুনদী এই হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে জুনদী আরো একটু যোগ করেন, كَعِتْقِ رَقَبَةٍ نَفِيْسَةٍ مِّنَ الْرَقَابِ অর্থ : উত্তম গোলাম আযাদ করার সমান সওয়াব পাবে।'

নাসায়ী শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হল :
مَنْ طَافَ سَبْعًا فَهُوَ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ -
অর্থ : 'যে সাত চক্কর তওয়াফ শেষ করবে সে একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাবে।' হাফেজ আবুল ফারাজ মুসীরুল গারামে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং এর সাথে অতিরিক্ত আরো যোগ করেছেন, وَصَلَّى خَلْفَ الْمَقَامِ رَكْعَتَيْنِ فَهُوَ عَدْلٌ مُحَرَّرٌ .
অর্থ : 'এর পর মাকামে ইবরাহীমের পেছনে ২ রাকাত নামায পড়ে, সে একটি গোলাম মুক্ত করার সমান সওয়াব পাবে।'

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে মক্কায় আসার পর সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল বাইতুল্লাহ শরীফের তওয়াফ করা। সম্ভবতঃ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সব কাজের আগে কাবা শরীফের তওয়াফ করতেন।

হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) বলেন,
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ طَافَ بِالْبَيتِ سَبْعًا وَصَلَّى خَلْفَ الْمَقَامِ رَكْعَتَيْنِ وَشَرِبَ مِنْ مَّاءِ زَمْزَمَ غُفِرَ لَهُ ذُنُوبُهُ كُلُّهَا بَالِغَةً مَّا بَلَغَتْ - اخرجه ابوسعيد الجندى -
অর্থ : 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে বাইতুল্লাহ শরীফের সাত চক্কর তওয়াফ করবে, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়বে এবং যমযমের পানি পান করবে তার গুনাহ যত বেশীই হউক না কেন, তা মাফ করে দেয়া হবে।'

আমর তাঁর পিতা শোয়াইব থেকে এবং শোয়াইব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, কোন ব্যক্তি তওয়াফের নিয়তে ঘর থেকে বের হলে সে আল্লাহর রহমত পাওয়ার নিকটবর্তী হয়। সে যখন তওয়াফে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে ফেলে। তারপর প্রতি কদমের উঠা-নামার সাথে সাথে আল্লাহ তার জন্য পাঁচশ' নেক লেখেন, পাঁচশ পাপ মোচন করেন এবং পাঁচশ মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। তওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়লে সে সদ্যপ্রসূত নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়, আওলাদে ইসমাঈলের ১০টি গোলাম আযাদ করার বিনিময় পায় এবং হাজারে আসওয়াদের একজন ফেরেশতা তাকে স্বাগত জানায় এবং বলে : যেই কাজে তোমাকে স্বাগত জানানো হয়, সে কাজ পুনরায় কর; তবে যা করেছ তা অতীতের গুনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট এবং তার পরিবারের সত্তর জনের জন্য সুপারিশ করা হবে।'

আমর তাঁর পিতা শোয়াইব থেকে এবং শোয়াইব নিজ পিতা আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণনা করেছেন: 'যে ভাল করে অজু করে হাজারে আসওয়াদে চুমু দেয়ার উদ্দেশ্যে আসবে সে আল্লাহর রহমতে প্রবেশ করল। তারপর যখন চুমু দিল এবং নিম্নের দোয়াটি পড়ল তখন রহমত তাকে ঢেকে ফেলল। দোয়াটি হচ্ছে-
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَأَشْرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ .
তারপর বাইতুল্লাহর তওয়াফ করলে, তার প্রতি কদমে আল্লাহ সত্তর হাজার নেক লিখবেন, সত্তর হাজার গুনাহ মাফ করবেন, সত্তর হাজার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তার বংশের সত্তর হাজার লোকের জন্য সুপারিশ করা হবে। তারপর মাকামে ইবরাহীমের পেছনে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে দু'রাকাত নামায পড়লে আল্লাহ তার জন্য আওলাদে ইসমাঈলের ১৪ জন গোলাম আযাদ করার সওয়াব লিখবেন এবং সে সদ্যপ্রসূত নিষ্পাপ শিশুর মত গুনাহমুক্ত হয়ে যাবে।

অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে যে, একজন ফেরেশতা এসে বলবে, তুমি তোমার ভবিষ্যতের জন্য আমল কর, যা করেছ তা অতীতের অপরাধের ক্ষমার জন্য যথেষ্ট।'

উপরোক্ত বর্ণনাগুলো, আমর তাঁর দাদার দিকে সম্বোধন করেছেন, সেগুলোকে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেননি। আযরাকী উপরের ৪টি বক্তব্য বর্ণনা করেছেন।

হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يُبَاهِي بِالطَّائِفِينَ مَلَائِكَتَهُ .
অর্থঃ 'আল্লাহ ফেরেশতাদের নিকট তওয়াফকারীদের ব্যাপারে গর্ব করে থাকেন।' আবুযর এবং আবুল ফারাজ এটি মুসীরুল গারামে বর্ণনা করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে।
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ طَافَ بِالبَيْتِ خَمْسِيْنَ مَرَّةً خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ .
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি ৫০ বার বাইতুল্লাহর তওয়াফ করে সে সদ্য ভূমিষ্ঠ নিষ্পাপ শিশুর মত পাপমুক্ত হয়ে যায়। তিরমিজী এই হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন, এটি 'গরীব হাদীস।'

ইমাম বুখারী বলেছেন, এই হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে তবে, আল্লাহই ভাল জানেন, এতে ৫০ সপ্তাহের কথা উল্লেখ আছে। কেননা ইবনে আব্বাস থেকে সাঈদ বিন যোবায়ের কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে:
مَنْ حَجَّ الْبَيْتَ فَطَافَ خَمْسِينَ أَسْبُوعًا قَبْلَ أَنْ يُرْجِعَ كَانَ كَمَا وَلَدَتْهُ أُمُّهُ .
- অর্থ: 'যে বাইতুল্লাহর হজ্জ করে এবং ফিরে যাওয়ার আগে ৫০ সপ্তাহ তওয়াফ করে সে নিষ্পাপ শিশুর মত পাপমুক্ত হয়ে যায়।'

উলামায়ে কেরাম বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে, ৫০ সপ্তাহ একাধারে কিংবা পর্যায়ক্রমে তওয়াফ করতে হবে। বরং এর অর্থ হল, তার গোটা জিন্দেগীর আমলনামায় মোট ৫০ সপ্তাহ তওয়াফের রেকর্ড থাকলেই চলবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রতিটি দিন ও রাতে, এই বাইতুল্লাহর প্রতি ১২০টি রহমত নাযিল হয়। এর মধ্যে ৬০টি হচ্ছে তওয়াফকারীদের জন্য, ৪০টি হচ্ছে এই ঘরের নামাযীদের জন্য এবং ২০টি হচ্ছে এই ঘরের প্রতি নজরকারীদের জন্য।

হযরত আদম (আ) সাত সপ্তাহ রাত্রে এবং পাঁচ সপ্তাহ যাবত দিনে তওয়াফ করেছেন। তিনি তওয়াফের সময় এই দোয়া করেছেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার বংশধরদের মধ্য থেকে এই ঘরের আবাদকারী লোক তৈরী কর। তখন আল্লাহ তাঁর কাছে ওহী পাঠান এবং বলেন, 'আমি তোমার বংশধরদের মধ্য থেকে এই ঘরের আবাদকারী একজন নবী পাঠাবো; তাঁর নাম হবে ইবরাহীম। তাঁর হাতে আমি এই ঘর নির্মাণ করাবো, এর পানি পান করানোর সেবা আঞ্জাম দেব, তাঁকে এর হারাম ও হালাল এলাকা (হুদুদে হারাম) এবং এই ঘরের যথার্থ স্থান দেখাবো; তাঁকে এখানকার পবিত্র স্থানসমূহ এবং এর এবাদতের বিধি বিধান শিখিয়ে দেবো।

আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, আমর বিন দিনার বলেছেন, আল্লাহ দুনিয়াতে কোন কাজের জন্য কোন ফেরেশতা পাঠাতে চাইলে, সেই ফেরেশতা আল্লাহর কাছে প্রথমে বাইতুল্লাহর তওয়াফের অনুমতি চায়। পরে সে ফেরেশতা নেমে আসে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেছেন,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : اسْتَمْتَعُوا مِنْ هَذَا الْبَيْتِ فَإِنَّهُ هُدِّمَ مَرَّتَيْنِ وَيُرْفَعُ فِي الثَّالِثَةِ - اخرجه ابن حبان -
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: এই ঘর থেকে উপকৃত হও, এই ঘর দু'বার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তৃতীয়বারে তা তুলে নেয়া হবে।' (ইবনে হিব্বান)

হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, এই ঘর উঠিয়ে নেয়ার আগে এবং এই ঘরের অবস্থান সম্পর্কে মানুষের ভুলে যাওয়ার পূর্বে, তোমরা এই ঘরের বেশী বেশী যিয়ারত কর; কুরআন উঠিয়ে নেয়ার আগে বেশী করে কুরআন তেলাওয়াত কর। তাঁকে লোকেরা প্রশ্ন করল, কাগজে লিখিত কুরআন তুলে নেয়া সম্ভব হলেও মানুষের মন থেকে কিভাবে তা তুলে নেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেন, মানুষ রাত্রে অন্তরে কুরআন সহকারে থাকবে সকাল বেলায় তাদের অন্তর থেকে কুরআন মুছে যাবে, এমনকি তারা তখন 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই কালেমাটিও ভুলে যাবে। তখন মানুষ আবার জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে যাবে এবং বিভিন্ন জাহেলী জিনিসের অনুসরণ করবে। (আযরাকী)

হযরত আলী (রা) বলেন, কাবা শরীফ ও তোমাদের মাঝখানে বাধা সৃষ্টি হওয়ার আগে বেশী বেশী করে তওয়াফ কর। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন ইথিওপিয়ার ছোট কান বিশিষ্ট মাথায় টাকপড়া ও সরু পা বিশিষ্ট এক ব্যক্তিকে কাবার উপর বসে একে ধ্বংস করতে দেখতে পাচ্ছি।

ফাকেহী হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে তওয়াফ করছিলাম। হঠাৎ করে তিনি থেমে গেলেন এবং মৃদু হাসতে লাগলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি থেমে গেলেন এবং মৃদু হাসলেন! তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আমার সাথে ঈসা বিন মরিয়মের দেখা হল, তিনি তওয়াফ করছেন এবং তাঁর সাথে দু'জন ফেরেশতা রয়েছে। তিনি আমাকে সালাম দিলেন এবং আমি সালামের জবাব দিলাম।' এই ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় যে, পবিত্র কা'বার তওয়াফের জন্য সবাই আগ্রহী।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ
الطَّوَافُ بالبَيْتِ صَلاةٌ إِلَّا أَنَّ اللهَ عَزَّوَجَلَّ قَدْ أَحَلَّ لَكُمْ فِيهِ الْمَنْطِقَ - فَمَنْ نَطَقَ فَلَا يَنْطِقُ إِلَّا بِخَيْرٍ .
অর্থ: 'বাইতুল্লাহর তওয়াফ নামাযের সমতুল্য। সাবধান! এতে ব্যতিক্রম হচ্ছে এই যে, এতে আল্লাহ কথা বলা জায়েয করেছেন, কেউ কথা বললে সে যেন ভাল কথা ছাড়া খারাপ কথা না বলে।'

ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, হাজ্জাজ বিন আবি রোকাইয়া বলেন, আমি কা'বা শরীফের তওয়াফ করছিলাম। তখন আমি ইবনে উমর (রা) কে দেখি। ইবনে উমর বলেন, হে ইবনে আবি রোকাইয়া, বেশী বেশী তওয়াফ কর, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, যে এই ঘরের তওয়াফ করতে করতে পা ব্যথা করে ফেলেছে, বেহেশতে তার পা'কে আরাম দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়।

ফাকেহী কা'আব থেকে উল্লেখ করেছেন যে, তিনশত রাসূল এই বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেছেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা) হচ্ছেন তাদের সর্বশেষ রাসূল। এ ছাড়াও ১২ হাজার বুজুর্গ লোক এই ঘরের তওয়াফ করেছেন; মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়ার আগে তাঁরা হিজরে ইসমাঈলে নামায পড়েছেন। তাঁদের কেউ তওয়াফে আল্লাহর জিকির ব্যতীত অন্য কোন কথা-বার্তা বলেননি। তাঁদের কেউ আসরের নামাযের পর এবং মাগরিবের আগে নামায পড়েননি।

হযরত আলী (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে হযরত আবু হুরাইরার প্রতি বলতে শুনেছি, হে আবু হুরাইরা! তুমি হয়তো তওয়াফে উদাসীন একটি দলকে দেখতে পাবে, তাদের সেই তওয়াফ কবুল হবে না এবং তাদের সেই আমলও উপরে যাবে না। হে আবু হুরাইরা! তুমি যদি তাদেরকে দলবদ্ধ দেখতে পাও, তাহলে, তাদের সেই দলকে বিচ্ছিন্ন করে দিও এবং তাদেরকে বলে দিও এই তওয়াফ গ্রহণযোগ্য নয় এবং এই আমল উপরে উঠবে না। (ফাকেহী)

মুসাফে' বিন আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আল-হাজাবী বলেছেন, আমার ভাই বলেছেন যে, একবার আমি মাকামে ইবরাহীমের পেছনে ঘুমিয়েছিলাম। স্বপ্নে আমি একটি সোনার পাখী দেখলাম। পাখীটির মাথা সবুজ যমরদ পাথরের তৈরি। সেটি যমযম কূপের বাতির উপর কা'বার দিকে মুখ করে বসেছে। সে বলল, হে আল্লাহর কা'বা! আমি তোমাকে কেন রাগান্বিত দেখতে পাচ্ছি? কা'বা উত্তর দিল, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি কিন্তু আমি আমার চারপার্শ্বে যা দেখছি যদি নারী-পুরুষ তওয়াফকারী না থাকত তাহলে, আমি এমন জোরে নাড়া দিতাম যে আমার পাথরগুলো সংগৃহীত স্থানে পুনরায় ফিরে যেত। (ফাকেহী)

তওয়াফে ভাল কথা বলা এবং দোয়া করা কিংবা দোয়া শিখানো এগুলো জায়েয আছে। মুজাহিদ বলেন, আমি তওয়াফ করার সময়, ইবনে উমর (রা) আমার হাত ধরেন এবং আমাকে তাশাহহুদ শিক্ষা দেন।

ফাকেহী হযরত আয়িশা (রা) থেকে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় আসেন, কা'বা শরীফের ৭ চক্কর তওয়াফ করেন এবং পরে দু'রাকাত নামায পড়েন। এর ফলে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) থেকে তওয়াফ করা এবং দু' রাকা'ত নামায পড়ার সুন্নত চালু হয়।

হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنَّمَا جُعِلَ الطَّوَافُ بِالْبَيْتِ لِإِقَامَةِ ذِكْرِ اللهِ .
অর্থ : 'আল্লাহর জিকর কায়েমের জন্যই বাইতুল্লাহর তওয়াফের বিধান চালু করা হয়েছে। (ফাকেহী)

হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফকারী মানুষের দিকে তাকালেন এবং বললেন, হে মানুষেরা! আল্লাহর হামদ ও তাকবীর বল। তওয়াফকারীরা ঐ কথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্বের গুণ-গান করলেন। (ফাকেহী)

টিকাঃ
২১. প্রাগুক্ত।
২২. প্রাগুক্ত।
২৩. প্রাগুক্ত।
২৪. প্রাগুক্ত।
২৫. প্রাগুক্ত।
২৬. প্রাগুক্ত।
২৭. প্রাগুক্ত।
২৮. তারীখু মামলাকাতিল আরাবিয়া আস-সাউদিয়া, সালাউদ্দীন আল-মোখতার।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 তওয়াফের দোয়া

📄 তওয়াফের দোয়া


হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) তওয়াফের সময় এই দোয়াটি পড়তেনঃ
اللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً و قِنَا عَذَابَ النَّارِ .

হযরত উমর (রা) থেকে তওয়াফের সময় ভিন্ন দোয়া পড়ার প্রমাণও রয়েছে।

তওয়াফের সময় দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। কেউ কেউ এটাকে তওয়াফের বেদআত বলেছেন। তবে হাজারে আসওয়াদে চুমু দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অন্যায় নয়।

আ'তা বলেন, একবার হযরত আবদুর রহমান বিন আ'ওফ (রা) তওয়াফ করেন এবং তওয়াফ থেকে অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত কারো সাথে কোন কথা বলেননি। এক ব্যক্তি, তিনি তওয়াফে কি পড়েন তা জানার জন্য তাঁকে অনুসরণ করেন, তিনি তওয়াফে শুধু এই দোয়াটি পড়েন: رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
অনুসরণকারী ব্যক্তিটি বলল, আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করুন। আমি আপনাকে অনুসরণ করছিলাম, কিন্তু আপনি উপরোক্ত দোয়াটি ছাড়া তওয়াফে আর কিছুই পড়েননি। তখন তিনি উত্তর দিলেন, এই দোয়াটি কি সকল কল্যাণের উৎস নয়? (ফাকেহী)

তওয়াফের চক্করগুলো হিসাব রাখা দরকার। একবার হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে তওয়াফ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কত চক্কর হয়েছে? তারপর তিনি বললেন, আমি তোমাকে কেন সংখ্যা জিজ্ঞেস করেছি তা কি তুমি জান? আমার জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্য হল তুমি যেন তার হিসেব রাখ। (ফাকেহী)

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছেন, যে কা'বা শরীফের ৭ চক্কর তওয়াফ করবে এবং-
سُبْحَانَ الله وَالْحَمْدُ للهِ وَلَا اله الا اللهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا حَولَ وَلَا قُوَّةَ الا بالله .
-এই দোয়াটি পড়া ছাড়া অন্য কোন কথা না বলবে, তার ১০টি গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, ১০টি নেক লেখা হবে এবং তার ১০টি মর্যাদা বাড়ানো হবে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি তওয়াফ করার সময় কথা বলবে সে ব্যক্তির উদাহরণ হল, সে রহমতকে পা দিয়ে এমনভাবে ঠেলে ফেলে দেয় যেমন করে পা দিয়ে পানি ঠেলে সরিয়ে দেয়া হয়। (ফাকেহী)

ফাকেহী আবি ইয়াযিদ বিন আজলান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আদম (আ) এর তওয়াফের সময় ফেরেশতারা এসে তাঁকে বলল, হে আদম! আমরা আপনার দু'হাজার বছর আগে এই ঘরের তওয়াফ করতাম। হযরত আদম (আ) জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা তওয়াফে কি পড়তেন? তাঁরা বললেন, আমরা তওয়াফে এই দোয়াটি পড়তাম:
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ .
তখন আদম (আ) বললেন, এর সাথে لاَحَولَ وَلَا قُوَّةَ الا بالله এইটুকুও যোগ করুন। তারপর হযরত ইবরাহীম (আ) এর কা'বা নির্মাণের সময় ফেরেশতারা আসলেন এবং বললেন, হে ইবরাহীম! আমরা আপনার পিতা আদম (আ) কে বললাম যে, আমরা আপনার দু'হাজার বছর আগে কা'বার তওয়াফ করতাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি দোয়া পড়তেন? আমরা উপরোক্ত দোয়ার কথা উল্লেখ করলে তিনি আরো কিছু যোগ করার কথা বলেন। ইবরাহীম (আ) আরো সামান্য যোগ করে বললেন,
لا حَوْلاً وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ .
এতটুকু পড়া দরকার। তখন থেকে তওয়াফে এই পূর্ণাঙ্গ দোয়াটি পড়ার সুন্নত চালু হয়ঃ
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ للهِ وَلَا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ - وَلَا حَولَ وَلَا قُوَّةَ إِلا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ .

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেছেন যে, তওয়াফ শেষে ফরজ নামায কায়েমের একামত হয়ে গেলে, তওয়াফের অতিরিক্ত দু'রাকাত নামায পড়ার দরকার নেই। ফরজ নামাযই সেই দু'রাকাতের বিকল্প এবং যথেষ্ট। আতা,

টিকাঃ
২৯. প্রাগুক্ত।
৩০. প্রাগুক্ত।
৩১. সাকার আল-জাযীরাহ, আহমদ আবদুল গফুর আত্তার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00