📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কা’বার ভেতরে প্রবেশের ফজীলেত

📄 কা’বার ভেতরে প্রবেশের ফজীলেত


হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে,
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ دَخَلَ الْبَيْتَ دَخَلَ فِي حَسَنَةٍ وَخَرَجَ مِنْ سَيِّئَةٍ مُغْفُورًا
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে সে নেক ও কল্যাণের মধ্যে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে যখন বের হয় তখন গুনাহ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে বের হয়।

মুহিব আত-তাবারী বলেছেন, তাম্মাম আর-রাযী এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি আতা বিন আবি রেবাহ থেকে বর্ণিত হওয়ায় এটিকে হাসান ও গরীব বলে অভিহিত করা হয়।

আল-ইরাকী বলেছেন, বায়হাকীও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর বর্ণনা সূত্রে, রাবী আবদুল্লাহ বিন মোয়াম্মাল দুর্বল বলে পরিচিত। (طَرحُ التَّشْرِيب)

হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা শরীফে প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর সাথে ছিলেন উসামা বিন যায়েদ, উসমান বিন তালহা এবং বিলাল বিন রাবাহ। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ী)

এই দুই হাদীসে, বাইতুল্লাহ শরীফের ভেতর প্রবেশ করা যে উত্তম তা প্রমাণিত হয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসরণ ও আনুগত্যই এই মর্যাদার ভিত্তি।

আল-ইরাকী বলেছেন, কাবা শরীফের ভেতরে প্রবেশ করা যে উত্তম এ ব্যাপারে সবাই একমত। (طَرحُ التَّشْرِيب) এই সওয়াব অর্জনের আগ্রহ সবার মধ্যে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়াও আল্লাহর এই পবিত্র ঘরের ভেতর দেখার আগ্রহ কার নেই?

ইমাম শাফেয়ী (রা) বলেছেন, কাউকে কষ্ট না দিয়ে কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করা মোস্তাহাব।

ইরাকী বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের দিন কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করেছেন বলে বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আবী আওফা থেকে বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সা) ওমরাহ আদায়ের সময় কা'বা শরীফের ভেতর প্রবেশ করেননি। তিনি বিদায় হজ্জের সময়ও কাবা শরীফের ভেতর ঢুকার কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবতঃ উমরাহ ও হজ্জের সময় তিনি এই আশংকায় কাবার ভেতরে ঢুকেননি, না জানি তা আবশ্যক কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু মূল বিষয়টি তা নয়। ইতিপূর্বে উল্লেখিত হাদীসের মর্ম অনুযায়ী বুঝা যায় যে, কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করা একটি স্বতন্ত্র সুন্নত। এছাড়া, ইমাম বায়হাকী বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (কাবা) শরীফের ভেতর প্রবেশ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাই বায়হাকীর বর্ণনা উমরাহর সময় কাবায় না ঢুকা সংক্রান্ত আবি আওফার বর্ণনার বিপরীত নয়।

কারো কারো মতে বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাবা শরীফে প্রবেশের তথ্যটি সঠিক নয়। তাঁদের মতে তিনি শুধু মক্কা বিজয়ের দিনই কাবা শরীফে প্রবেশ করেছেন। ইমাম নওয়ী মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যার মধ্যে বলেছেন, মক্কা বিজয়ের দিন কাবার ভেতরে রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রবেশের ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। আলেমগণ উমরার সময় রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাবার ভেতর না ঢুকার কারণ হিসাবে বলেন যে, এর ভেতর তখন মূর্তি ও প্রতিকৃতি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন ভেতরে ঢুকার আগে মূর্তিগুলোকে বের করা হয় এবং পরে তিনি ঢোকেন।

তাবাকাতে ইবনে সা'দ হযরত উসমান বিন তালহা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরতের আগে, মক্কায় বাস করার সময় কা'বার ভেতরে প্রবেশ করেছেন। তবে, মক্কা বিজয়ের দিন তিনি কা'বার ভেতরে দু'বার প্রবেশ করেছেন বলে জানা যায়। দার কুতনী হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবায় প্রবেশ করেছেন এবং বিলাল পেছনে ছিলেন। আমি বিলাল (রা) কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) কি ভেতরে নামায পড়েছেন? তিনি জবাব দিলেন, 'না'। পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) আবারও কা'বা শরীফে ঢুকেন। (طرح التثريب) মালেকী মাজহাবের মুফতী শেখ মুহাম্মদ আবেদ বলেন, কা'বা শরীফের ভেতরে ঢুকা মুস্তাহাব, যদি তা রাত্রেও হউক না কেন। আল্লামা আমীর তাঁর মানাসেক গ্রন্থে লিখেছেন যে, কা'বা শরীফের ভেতর বহু ভিড় লক্ষ্য করা যায়, যারা ভেতরে ঢুকতে অপারগ তারা হিজরে ইসমাঈলে ঢুকে সেখানে নামায পড়লেই চলে। কেননা, তাতে কা'বা শরীফেরই অংশ রয়েছে।

আস্সাওয়ী 'তাওদিহুল মানাসেক' গ্রন্থে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আয়িশা (রা) কে বলেছেন, তুমি কা'বার ভেতর ঢুকতে চাইলে হিজরে ইসমাঈলে নামায পড়। কেননা, এটি কা'বা শরীফেরই অংশ। তোমার কওম, কা'বা নির্মাণের সময় কা'বাকে সংকুচিত করে এটিকে বাইরে রেখে দিয়েছে।

কিছু সংখ্যক উলামায়ে কেরাম কা'বার ভেতর ঢুকাকে মাকরূহ বলেছেন। তাদের দলীল হচ্ছে হযরত আয়িশা (রা) কর্তৃক নিম্নোক্ত হাদীসটি।
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ عِنْدِي وَهُوَ قَرِيرُ الْعَيْنِ طَيِّبُ النَّفْسِ - ثُمَّ رَجَعَ إِلَى وَهُوَ حَزِينٌ فَقُلْتُ لَهُ - فَقَالَ دَخَلْتُ الكَعْبَةَ وَوَدَدْتُ أَنَّى لَمْ أَكُنْ فَعَلْتُ أَنِّي أَخَافُ أَنْ أَكُونَ أَنْعَبْتُ أُمَّتِي مِنْ بعدي - اخرجه احمد والترمذي وصححة ابوداؤد
অর্থ : হযরত আয়িশা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা) আমার কাছ থেকে শীতল চোখ ও প্রশান্ত চিত্তে বের হয়ে গেলেন। তারপর পেরেশান হয়ে ফিরে আসেন। আমি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তর দিলেন, আমি কাবা শরীফে প্রবেশ করেছি। যদি আমি এটা না করতাম! (তাহলে কতইনা ভাল হত) আমার ভয় হয় যে, আমি আমার পরের উম্মতদেরকে কষ্টের মধ্যে ফেলেছি নাকি। (আহমদ, তিরমিজী ও আবু দাউদ)

মুহিব আত্তাবারী বলেছেন, এই হাদীসটি কা'বায় প্রবেশ না করার প্রমাণ বহন করে না। আমাদের মতে, কাবায় প্রবেশ যে মুস্তাহাব এর জন্য কাবায় রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রবেশই উত্তম প্রমাণ। তবে উম্মতের কষ্টের আশংকায় তাঁর কা'বায় ঢুকার বিরুদ্ধে আফসোসের ফলে মুস্তাহাবের হুকুম বাতিল হয়নি।

আল্লামা ফাসী তাঁর 'শেফাউল গারাম' বইতে লিখেছেন, ৪ মাজহাবের ইমামগণ প্রত্যেকেই একমত যে, কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করা মুস্তাহাব বা উত্তম। বরং ইমাম মালেক (রা) বেশী বেশী প্রবেশ করাকে আরো উত্তম বলেছেন। ইবনুল হাজ্জ 'মানাসেক' বইতে লিখেছেন, ইমাম মালেককে যখন জিজ্ঞাসা করা হল যে, যতবার সুযোগ মিলে ততবারই কি কা'বা শরীফে প্রবেশ করা যায়? তিনি উত্তর দেন, তা তো বেশী উত্তম। আল্লামা ফাসী হাসান বসরীর প্রখ্যাত 'রেসালা' বইয়ের বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে কাবায় প্রবেশ করে সে আল্লাহর রহমতের মধ্যে প্রবেশ করে এবং আল্লাহর বিশেষ হেফাজত ও নিরাপত্তা লাভ করে, আর যখন বের হয় তখন গুনাহমুক্ত হয়ে বের হয়।

ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, মুজাহিদ হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে কা'বা শরীফে প্রবেশ করা প্রসঙ্গে বলেছেন: 'এতে প্রবেশ করার মানে, সওয়াব ও নেকীর মধ্যে প্রবেশ করা আর সেখান থেকে বের হওয়ার অর্থ হচ্ছে, গুনাহ থেকে বের হওয়া এবং ক্ষমা লাভ করা।'

কিছু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ীনে কেরাম কা'বা শরীফে বেশী বেশী প্রবেশ করাকে উত্তম বলেছেন। আল্লামা আযরাকী তাঁর দাদা থেকে, তিনি মক্কার একজন ফেকাহবিদ মুসলিম বিন খালেদ যানজী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যানজী বলেন, আমি সদাকা বিন ইয়াসার কে প্রতিবারই কা'বা শরীফ খোলার সময় ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি কেন এত বেশী কা'বায় প্রবেশ করেন? তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহর কসম, আমি কা'বা শরীফকে খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে নামায না পড়লে আমার কাছে খারাপ লাগে।

আযরাকী উল্লেখ করেছেন, মুসা বিন আকাবা বলেন, আমি সালেম বিন আবদুল্লাহ বিন উমর বিন খাত্তাব (রা) এর সাথে ৭ সপ্তাহ তওয়াফ করেছি। তিনি প্রখ্যাত ৭ জন ফেকাহবিদের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেক বারই আমরা সাত চক্কর তওয়াফ শেষে কা'বা শরীফে প্রবেশ করেছি এবং দু'রাকাত করে নামায পড়েছি।

আযরাকী তাঁর দাদা থেকে, তিনি দাউদ বিন আবদুর রহমান আল-আত্তার থেকে, তিনি ইবনে জুরাইজ থেকে, তিনি ইবনে উমরের গোলাম নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে উমর যখন মক্কায় হজ্জ কিংবা উমরাহ করার জন্য আসতেন এবং কা'বা খোলা পেতেন, তখন অন্য কোন কাজ করার আগে, প্রথমে কা'বা শরীফে প্রবেশ করতেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কা’বার ভেতরে প্রবেশের আদব

📄 কা’বার ভেতরে প্রবেশের আদব


কা'বা শরীফের ভেতর ঢুকার আগে অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র হতে হবে। অন্তরে বিনয়, এবং ভয় ও শ্রদ্ধার ভাব থাকতে হবে। ভেতরে ঢুকে চতুর্দিকে দেখাদেখি শুরু করে দেয়া ঠিক নয়। এতে লক্ষ্য অর্জনে মনে দুর্বলতা ও অবহেলা সৃষ্টি হতে পারে। বিনা প্রয়োজনে কারো সাথে আলাপ করা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে,
الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْي عَنِ الْمُنْكَرِ .
অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য কথা বলা যাবে। অন্তরে আল্লাহর ভয়-ভীতি বাড়ানো এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশায় চোখের পানি ফেলার চেষ্টা করা উচিত।

হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা) বলেন, আশ্চর্য লাগে, একজন মুসলমান কা'বার ভেতরে ঢুকে কি করে, নিজ চোখ কা'বা শরীফের ছাদের দিকে উঠায় এবং আল্লাহর সম্মান ও ইজ্জতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তা থেকে বিরত থাকে না? রাসূলুল্লাহ (সা) কা'বার ভেতরে ঢুকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত সেজদার জায়গা ছাড়া তাঁর চোখ অন্য কোন দিকে যায়নি। আবুজর ও ইবনুস সালাহ এটি তাঁদের মানসাকে উল্লেখ করেছেন।

দাউদ বিন আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমাকে আবদুল করীম বিন আবুল মাখারেখ উপদেশ দিয়েছেন, আমি যেন শুক্রবারে দু'রাকাত নামায পড়ার আগে ঘর থেকে বের না হই এবং গোসল করা ব্যতীত কা'বা শরীফে প্রবেশ না করি। (আযরাকী)

সাঈদ বিন যোবায়ের থেকে বর্ণিত আছে, তিনি কা'বা শরীফ কিংবা হিজরে ইসমাঈলে প্রবেশের আগে পায়ের জুতা খুলে নিতেন।

আতা, তাউস এবং মুজাহিদ থেকে বর্ণিত আছে, তাঁরা বলতেন, জুতা ও চামড়ার মোজা পরে কেউ যেন, কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ না করে। সাঈদ বিন মনসুর থেকে এই দুটো বক্তব্য বর্ণিত।

কেউ যদি কাবা শরীফের ভেতর ঢুকতে চায় সে যেন রাসূলুল্লাহ (সা) যা করেছেন, তাই করে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ যখন কাবা শরীফে ঢুকেন, তখন তিনি তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাসবীহ (সোবহানাল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ), আল্লাহর প্রশংসা, দোয়া এবং ইস্তেগফারে (গুনাহ মাফ চাওয়া) ব্যস্ত ছিলেন।

বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কা'বার সকল দিকে গিয়ে দোয়া করেছেন। নাসায়ী শরীফে 'তিনি তাসবীহ ও তাকবীর বলেছেন' এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে।

নাসায়ী শরীফে উসামা বিন যায়েদের সূত্রে বর্ণিত অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কা'বায় (প্রথমে) বসলেন তারপর হামদ, সানা ও ইস্তেগফার আদায় করলেন। তারপর দাঁড়ালেন, এবং কা'বার পেছনের দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দেয়ালে নিজের গাল ও চেহারা রাখলেন। তারপর আল্লাহর হামদ ও সানা আদায় করে ইস্তেগফার করেন। তারপর কা'বার প্রতিটি কোণে যান এবং তাকবীর, তাহলীল, তাসবীহ, সানা, ও প্রার্থনা করেন। তারপর কা'বা শরীফ থেকে বের হন। ইমাম আহমদও অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কা'বায় প্রবেশ করেছেন। এতে ৬টি খুঁটি ছিল। তিনি প্রত্যেকটি খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করেছেন।

বর্ণিত আলোচনায়, রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাজের অনুরূপ কাজ করা যে উত্তম, এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের কারো মধ্যে দ্বিমত নেই। তবে উলামায়ে কেরাম দু'টি বিষয়ে মতভেদ পোষণ করেন যে, এই দুটো কাজ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত কিনা।

প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, কা'বার দেয়াল ও খুঁটির সাথে তিনি নিজ পেট ও পিঠ লাগিয়েছিলেন কিনা। এ ব্যাপারে এক রেওয়ায়েতে তিনি এরূপ করেছেন বলে বর্ণিত আছে।

আল্লামা ফাসী নাফে' থেকে, তিনি শায়বা বিন উসমান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, শায়বা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) দুই খুঁটির মাঝখানে দু'রাকাত নামায পড়েছেন, তারপর কা'বার সাথে নিজের পেট ও পিঠ লাগিয়েছেন। ফাসী আরো বলেন, আমাদের শেখ হাফেজ ইরাকী কা'বা শরীফে অনুরূপ করাকে উত্তম বলেছেন।

ইমাম শাফেয়ী' তাঁর মুসনাদে, উরওয়া বিন যোবায়ের থেকে এর সমর্থনে অনুরূপ আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। উরওয়া বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বাইতুল্লাহ শরীফের তওয়াফ শেষে সকল কোণ স্পর্শ করেছেন এবং নিজের পেট, পিঠ ও পার্শ্বদেশ বাইতুল্লাহ শরীফের সাথে লাগান। ফাসী বলেছেন, আমি একাধিক আলেমকে দেখেছি তারা এটাকে উত্তম মনে করেন না।

ফাসী যা দেখেছেন তাতে, অনুরূপ কাজ করা নিষিদ্ধ বলে প্রমাণিত হয় না। তবে বিভিন্ন উলামায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে তিনি এটা উত্তম না হওয়ার কথাটাই বুঝেছেন।

২য় বিষয়টি হচ্ছে, ভেতরে প্রবেশের সময় সেজদা দেয়া। কেউ কেউ এটাকে সেজদায়ে শোকর বলেছেন। এই সেজদা দান উত্তম কিনা এ ব্যাপারে আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সা) সেজদা করেছেন।

ফদল বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবায় প্রবেশ করার পর দুই খুঁটির মাঝখানে সেজদায় পড়ে যান। তারপর বসেন এবং দোয়া করেন, তবে নামায পড়েননি। আত্তাবারানী তাঁর আল-কবীর গ্রন্থে এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। তবে এটি বিশেষ নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নয় বলে জানা গেছে।

ইমাম মালেকের মতে, কাবার খুঁটিকে গলার সাথে আঁকড়ে ধরা মাকরূহ।

যাই হোক, উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা একথা বুঝা যায়না যে, কাবার সাথে পেট ও পিঠ লাগানো নিষিদ্ধ। কেননা কাবার খুঁটির সাথে গলা না লাগিয়ে এবং দেয়ালের সাথে ভর না দিয়ে কিংবা পিঠ দ্বারা ঠেস না লাগিয়েও ঐ কাজ করা সম্ভব।

মূলকথা হলো, এ সকল হাদীস দুর্বল হলেও, এ জাতীয় হাদীস দ্বারা কোন কিছুর ফজীলত বর্ণনা করা সর্বসম্মত ব্যাপার। সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কা’বার ভেতরে নামায পড়ার ফজীলেত

📄 কা’বার ভেতরে নামায পড়ার ফজীলেত


কাবা ঘরের ভেতরে নামায পড়া সুন্নত। স্বয়ং হযরত মুহাম্মাদ (সা) নিজেই কাবা ঘরের ভেতর নামায পড়েছেন। কেউ নবী করীম (সা) এর অনুসরণে সওয়াবের নিয়তে কাবা শরীফের ভেতর নামায পড়লে, অনেক বেশী সওয়াব ও কল্যাণ লাভ করবে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। তাঁর সাথে ছিলেন উসামা, বিলাল এবং উসমান বিন তালহা আল-হাজাবী (রা)। তারপর তিনি (সা) কাবা শরীফের দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং ভেতরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। ইবনে উমর বলেন, বিলাল বের হলে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ভেতরে কি করলেন? জবাবে বিলাল বললেন যে, তিনি (সা) ভেতরে নামায পড়েছেন। তাঁর বামে দুটি, ডানে একটি এবং পেছনে ছিল ৩টি খুঁটি। তখন কাবা শরীফে ৬টি খুঁটি ছিল। (বুখারী ও মুসলিম) ইবনে উমরের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, তাঁরা নবী করীম (সা) এর সাথে কাবা শরীফের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং ভেতরে দীর্ঘ সময় কাটালেন। (বুখারী ও মুসলিম)

শেষ হাদীসটি দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, এবাদতের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কাবা শরীফের ভেতর অবস্থান করা যায়, তবে সেই অবস্থান অবশ্যই গল্প-গুজবের উদ্দেশ্যে নয়।

বহুসংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম এই সুন্নতটি পালন করেছেন। সাহাবী হযরত আবুশ শাশা বলেন, 'আমি হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলাম। মক্কায় এলাম এবং কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করলাম। তখন ইবনে উমরও (রা) আসলেন। তিনিও আমার পাশে নামায পড়লেন। পরের বছরও আমি হজ্জে আসলাম। আমি কাবার ভেতরে ইবনে উমরের জায়গায় দাঁড়িয়ে নামায পড়তে লাগলাম। তখন ইবনে যোবায়েরও ঢুকলেন। তিনি আমার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি সেখান থেকে আমাকে বের করা পর্যন্ত ভিড় করতে লাগলেন। তারপর তিনি ৪ রাকাত নামায আদায় করলেন। (আহমদ)

আল্লামা আযরাকী শায়বা বিন যোবায়ের বিন শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মুয়াবিয়া (রা) হজ্জ করেছেন এবং কাবার ভেতরে প্রবেশ করেছেন। আল্লামা আল-ফাকেহী আতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আতা বলেছেন, আমি মসজিদে হারামে ৪ রাকাত নামায পড়ার চেয়ে কাবা শরীফের ভেতর দু'রাকাত নামায পড়াকে বেশী পছন্দ করি। আল্লামা আল-ফাকেহী হাসান বসরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, কাবা শরীফের ভেতরের নামায অন্য জায়গায় ১ লাখ নামাযের সমান। ইবনে উমরের বর্ণিত প্রথম হাদীসটিতে, নবী করীম (সা) কাবা শরীফের ভেতর নামায পড়েছেন বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ঐ হাদীসটি বুখারী শরীফসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণিত সহীহ হাদীসের বিপরীত। ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, "নবী করীম (সা) কাবাঘরের ভেতর প্রবেশ করে চতুর্দিকে তাকবীর বলেছেন, তবে তিনি নামায পড়েননি।" হাদীসটি হচ্ছে এই:
إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ الْبَيْتَ فَكَبَّرَ فِي نَوَاحِيْهِ وَلَمْ يُصَلِّ فِيهِ -
মুসলিম শরীফে হাদীসটির শেষাংশে বলা হয়েছে دعا ولم يصل অর্থাৎ 'তিনি দোয়া করেছেন, নামায পড়েননি।' আল্লামা হাফেজ আল-ইরাকী বলেছেন, ইবনে আব্বাস ঐ হাদীসটি উসামা বিন যায়েদ থেকে শুনেছেন এবং শিখেছেন। সহীস মুসলিমে ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদীসটি হচ্ছে এইরূপ:
أَخْبَرَنِي أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا دَخَلَ الْبَيْتَ دَعَا فِي نَوَاحِيْهِ كُلَّهَا وَلَمْ يُصِلَّ فِيهِ .
অর্থ: উসামা বিন যায়েদ আমাকে বলেছেন যে, নবী করীম (সা) কাবাঘরে ঢুকলেন এবং এর চতুর্দিকে দোয়া করলেন, তবে তিনি নামায পড়েননি।

ইবনে বাত্তাল বলেছেন, নবী (সা)-এর নামায না পড়ার নেতিবাচক হাদীসটির চেয়ে পড়ার ইতিবাচক হাদীসটিকেই গ্রহণ করা উচিত। আল্লামা তাহাওয়ী তাঁর شَرْحُ مَعَانِي الْآثَارِ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, নবী করীম (সা) কাবার ভেতর নামায পড়েছেন, তবে বিলাল নামায পড়েননি। এছাড়া উমর, জাবের, শায়াবা বিন উসমান এবং উসমান বিন তালহাও (রা) কাবার ভেতর নামায পড়েছেন।

ইমাম নবওয়ী শরহে মুসলিম শরীফে বলেছেন যে, হাদীস বিশারদগণ বিলাল (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটিকে গ্রহণ করেছেন। কেননা সেটি হল ইতিবাচক। তিনি এ বিষয়ে বেশী জানতেন বলে, তাঁর বর্ণিত হাদীসটিকে অগ্রাধিকার দেয়া কর্তব্য।

আল্লামা হাফেজ আল-ইরাকী প্রশ্ন তুলেছেন যে, বিলাল ও উসামা (রা) উভয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে একই সময়ে কাবা শরীফে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু তাদের একজনের ইতিবাচক ও অন্যজনের বর্ণিত নেতিবাচক হাদীসের মধ্যে কিভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব? এই প্রশ্নের কয়েকটি জবাব হতে পারে:

প্রথম জবাবটি হচ্ছে এই যে, ইমাম নবওয়ী শরহে মুসলিম শরীফে বলেছেন, উসামার নেতিবাচক বর্ণনার কারণ হল, যখন তাঁরা কাবা শরীফে প্রবেশ করলেন, তখন কাবার দরজা বন্ধ করা হল এবং সবাই দোয়ায় মশগুল হয়ে পড়লেন। উসামা রাসূলুল্লাহ (সা) কে দোয়া করতে দেখলেন। তখন তিনি নিজেও দোয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি ছিলেন একদিকে আর রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন অন্যদিকে। তবে বিলাল (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে ছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) নামায পড়েন এবং বিলাল (রা) নিকটে থাকার কারণে তা দেখেন। তবে উসামা (রা) তা দেখেননি। কেননা তিনি দূরে ছিলেন এবং দোয়ায় ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা) সংক্ষিপ্তাকারে নামায আদায় করেছেন। সেজন্য উসামা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর নামায পড়া দেখতে পাননি। তাই তিনি নিজ ধারণা থেকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নামায পড়েননি। অপরদিকে, বিলাল (রা) নিজে দেখে নামায পড়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ইতিবাচক বর্ণনা দিয়েছেন।

দ্বিতীয় জবাবটি হচ্ছে, সম্ভবত উসামা (রা) কাবা শরীফে ঢুকার পর বিশেষ কোন প্রয়োজনে বের হয়েছিলেন। তাই তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নামায দেখতে পাননি। আল্লামা হাফেজ ইরাকী বলেছেন যে, আমার শ্রদ্ধেয় পিতা শরহে তিরমিজী শরীফে এ বিষয়ে যা উল্লেখ করেছেন তা আবু বকর বিন মুনজের কর্তৃক উসামা (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের সাথে পুরো মিলে যায়। উসামা (রা) এর বর্ণিত হাদীসটি হচ্ছে:
إِنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى صُورًا فِي الْكَعْبَةِ - فَكُنْتُ آتيه بماء فِي الدَّلو يَضْرِبُ بِهَا الصُّوَرَ .
অর্থঃ "মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (রা) কাবা ঘরের ভেতর কয়েকটি প্রতিকৃতি দেখতে পেলেন। আমি তখন বালতি ভরে পানি আনি এবং তিনি সেই পানি প্রতিকৃতির উপর মারেন।" এই হাদীসে উসামা (রা) নিজে, কাবা ঘর থেকে পানির জন্য বেরিয়ে যাওয়ার খবর দিয়েছেন।

তৃতীয় জবাবটি হচ্ছে صحيح ابن حبان নামক হাদীস গ্রন্থে ইবনে হিব্বান এই দুটো বর্ণনার বৈপরিত্য দূর করার উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, সম্ভবতঃ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁরা দু'বার কাবা শরীফে ঢুকেছিলেন। প্রথমবার হচ্ছে মক্কা বিজয়ের দিন। সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা শরীফের ভেতর নামায পড়েন। দ্বিতীয়বার ছিল বিদায় হজ্জের দিন এবং সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা শরীফের ভেতর কোন নামায পড়েননি। এই সমাধানের ভিত্তিতে উভয় হাদীসের বৈপরিত্য দূর হয়ে যায়।

বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকারী আল্লামা মাহলাবও অনুরূপ সমাধানের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (সা) দু'বার কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করেছেন। একবার ভেতরে নামায পড়েছেন এবং দ্বিতীয়বার পড়েননি। মুহিব আততাবারী বলেছেন যে, বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইসমাঈল বিন আবু খালেদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীসও এই কথার সমর্থন দেয়। হাদীসটি হচ্ছে:
قُلْتُ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى آدَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْبَيْتَ فِي عُمْرَتِهِ؟ قَالَ لَا قَالَ - فَتَعَيَّنَ الدُّخُولُ فِي الْحَجِّ والفتح .
অর্থঃ 'আমি আবদুল্লাহ বিন আবি আওফাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) কি উমরাহ আদায়ের সময় কাবাঘরের ভেতর ঢুকেছিলেন? তিনি বললেন, না। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি বিদায় হজ্জ ও মক্কা বিজয়ের দিন ব্যতীত কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করেননি।' তিনি বলেন যে, আমার পিতা شرح الترمذى গ্রন্থে বলেছেন যে, ইবনে হিব্বান তাঁর গ্রন্থে যা উল্লেখ করেছেন তা সহীহ হাদীসের বিপরীত। কেননা, সহীহ হাদীসে, মক্কা বিজয়ের দিন কাবার ভেতরে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নামায পড়ার ব্যাপারেই শুধু বিলাল ও উসামা (রা) মতভেদ প্রকাশ করেছেন এবং সেটা ছিল ঐ একই দিনের প্রবেশের ব্যাপার।

অবশ্য এই প্রশ্নের জবাবে একথা বলা যায় যে, উসামা (রা) এর বর্ণনাটি কাবা শরীফে অন্য সময় প্রবেশের ব্যাপারে প্রযোজ্য এবং সেটা একই সফর কিংবা দুই সফরেও হতে পারে। তাই ইবনে হিব্বানের বর্ণনাকে সহীহ হাদীসের বিপরীত বলা যেতে পারে না।

৪র্থ জবাবটি হচ্ছে, বিলাল (রা) এর বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সালাত (নামায) আদায় করেছেন বলে যে বর্ণনা এসেছে তা আনুষ্ঠানিক সালাত নয়। বরং তিনি সালাতের আভিধানিক অর্থ প্রকাশ করে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) দোয়া করেছেন, নামায পড়েননি। কেননা, অভিধানে 'সালাত' মানে দোআ।

মূলত এই জবাবটি ঠিক নয়। কেননা হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, وَنَسَيْتُ أَنْ أَسْأَلَهُ كَمْ صَلَّى আমি জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি যে রাসূলুল্লাহ (সা) মোট কত রাকাত নামায পড়েছেন। বুখারী শরীফের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি মোট দু'রাকাত নামায পড়েন।

এই আলোচনার দ্বারা দুটো উপকারী বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। প্রথমটি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা শরীফের ভেতর যে জায়গায় নামায পড়েছেন তা জানা। রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে, কাবা শরীফের ভেতর ৬টি খুঁটি ছিল। বুখারী শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সা) নামাযে এমনভাবে দাঁড়ান যে তাঁর বামে একটি খুঁটি, ডানে ২টি খুঁটি এবং পেছনে ছিল ৩টি খুঁটি। অন্য এক বর্ণনা মতে তাঁর বামদিকে একটিও ডানদিকে একটি খুঁটি ছিল। মুসলিম শরীফের এক বর্ণনা মতে, বামে ২টি খুঁটি ও ডানে একটি খুঁটি ছিল। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবার ভেতরে ঢুকে দরজাকে পেছনে রাখলেন এবং সামনের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তখন তাঁর ও দেয়ালের মাঝে মাত্র ৩ গজ ব্যবধান ছিল। যেন তিনি রোকনে ইয়ামানীকে সামনে রেখে দাঁড়িয়েছেন। অর্থাৎ দরজাকে পেছনে রেখে রোকনে ইয়ামানীর দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে তিনি নামায পড়েন। তাঁর ও সামনের দেয়ালের ব্যবধান ছিল ৩ গজ এবং বামদিকের দেয়ালের ব্যবধান ছিল ১ গজ।

দ্বিতীয় উপকারিতা হল, তিনি কয় রাকাত নামায পড়েছেন তা জানা। বুখারী শরীফের নামায অধ্যায়ের শুরুতে ইমাম বুখারী এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হচ্ছে:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّهُ سَأَلَ بِلاَ َلا عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ لَهُ بِلَالٌ : نَعَمْ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ .
অর্থঃ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি এ ব্যাপারে বিলালকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন। বিলাল উত্তরে বললেন, হ্যাঁ রাসূলুল্লাহ (সা) দু'রাকাত নামায পড়েছেন।

এই হাদীসটি নাসায়ী শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। আবু দাউদ শরীফে দুর্বল সূত্র পরম্পরায় আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি উমর বিন খাত্তাব (রা) কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবার ভেতরে ঢুকে কিভাবে কি করেছেন? তিনি উত্তরে বলেন যে, তিনি দুই রাকাত নামায পড়েছেন। একই সূত্র পরম্পরায় ইবনে আবী শায়বাও হাদীসটি বর্ণনা করেন। মুসনাদে আহমদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল-কোরা কিতাবে সাফওয়ানের এই বর্ণনাটি হযরত উমরের নামের উল্লেখ ব্যতীতই বর্ণিত হয়েছে। আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হাদীসটি হচ্ছে:
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ صَفْوَانَ قَالَ : قُلْتُ لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ : كَيْفَ صَنَعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِيْنَ دَخَلَ الْكَعْبَةَ قَالَ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00