📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 বর্তমান গেলাফের বর্ণনা

📄 বর্তমান গেলাফের বর্ণনা


খাঁটি প্রাকৃতিক সিল্ক দিয়ে কা'বার গেলাফ তৈরি করা হয়। সিল্ককে কাল রং দিয়ে রঞ্জীন করা হয়। পরে গেলাফে কা'বায়, জাকা পদ্ধতিতে, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, আল্লাহু জাল্লা-জালালুহু, সোবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী, সোবহানাল্লাহিল আজীম- এইরূপ বাণীসমূহের নকশা আঁকা হয়। গেলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। এর উপরের তৃতীয়াংশে, ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া নির্মিত বেল্টে, (বন্ধনীতে) সংযুক্ত ত্রৈ-আক্ষরিকভাবে কুরআনের আয়াত লেখা হয়। বন্ধনীতে ইসলামী কারুকার্য খচিত একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেয়া রূপালী তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারী করা হয়। এই বন্ধনীটা কা'বা শরীফের চতুর্দিকেই পরিবেষ্টিত থাকে। বন্ধনীর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৪৭ মিটার এবং তা ১৬টি টুকরায় বিভক্ত। বন্ধনীটির নীচে প্রতি কোনায় সূরা ইখলাসকে গোলাকার চতুর্ভূজ বৃত্তের মধ্যে ইসলামী ডিজাইনের প্রতিফলন ঘটিয়ে লেখা হয়।

বন্ধনীর নীচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে ৬টি কুরআনের আয়াত লেখা হয়। ঐগুলোর মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টির জন্য মাঝখানে মোমবাতির আকারে 'ইয়া হাইউ-ইয়া কাইউমু' অথবা 'ইয়া রাহমানু-ইয়া রাহীমু' কিংবা 'আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন' কথাগুলো লেখা থাকে। বন্ধনীর নীচের সবগুলো লেখা সংযুক্ত ত্রি-আক্ষরিকভাবে অংকিত। এতে উপযুক্ত এমব্রয়ডারী করা হয় এবং এর উপর সোনা ও রূপার চিকন তার লাগানো হয়। সৌদী শাসনামল থেকেই গেলাফে কাবার কারুকার্যে স্বর্ণের ব্যবহার শুরু হয়। এছাড়াও গেলাফে ১১টি নকশা করা মোমবাতির প্রতিকৃতি আছে। এগুলো কাবার ৪ কোণে লাগানো আছে।

খানায়ে কাবার দরজার পর্দাটিকে বোরকা বলা হয়। তাও কাল রং-এর সিল্ক দিয়ে তৈরী। এর উচ্চতা সাড়ে সাত মিটার এবং প্রস্থ ৪ মিটার। এতেও ইসলামী নকশা ও কারুকার্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে কুরআনের আয়াত লেখা হয়। এই লেখাগুলোও সোনা ও রূপার চিকন তার দিয়ে এমব্রয়ডারী করা হয়।

কাবা শরীফের দরজা ও বাইরের গেলাফ দুটোই মজবুত সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি। গেলাফের মোট ৫টি টুকরা বানানো হয়। ৪টি টুকরা ৪ দিকে এবং পঞ্চম টুকরাটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরোগুলো পরস্পর সেলাইযুক্ত। প্রতিবছরই নতুন গেলাফ পরানোর সময় পুরাতন গেলাফটি সরিয়ে ফেলা হয়।

বর্তমান গেলাফ তৈরীতে, ৬৭০ কেজি সিল্ক ও ১৫০ কেজি সোনা ও রূপার চিকন তার দরকার হয়। গেলাফটির আয়তন ৬৫৮ বর্গমিটার এবং তা মোট ৪৭ থান সিল্কের কাপড় দ্বারা তৈরি। প্রতিটি থান ১ মিটার লম্বা এবং ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া। একটাকৈ আরেকটার সাথে সেলাই করে দেয়া হয়। ৪ বছর আগে প্রত্যেক বছর ২টি করে (১টি সতর্কতামূলক) গেলাফ তৈরির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একটি হাতে তৈরি করা হয় এবং এতে ৮-৯ মাস সময় লাগে। অন্যটি মেশিনে তৈরি করা হয় এবং এতে মাত্র ১ মাস সময় লাগে। এই কারখানায় হুজরায়ে নববীর জন্য একটি এবং উপহার দেয়ার জন্য একখণ্ড গেলাফও তৈরি করা হয়। গেলাফের আভ্যন্তরীণ পর্দাটির দৈর্ঘ্য ৭ মিটার এবং প্রস্থ ৪ মিটার। তাতেও সোনা এবং রূপার সরু তার দিয়ে কোরআনের আয়াত অংকন করা হয়েছে। গোটা গেলাফ, বেল্ট ও আভ্যন্তরীণ পর্দার ১৬টি টুকরায়, সোনা দ্বারা আয়াত খচিত করা হয়েছে। সে ১৬টি টুকরার দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৪৭ মিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে ৯৫ সেন্টিমিটার।

প্রত্যেক বছর জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে কা'বা শরীফের গায়ে নতুন গেলাফ পরানো হয়। সেইদিন হজ্জের দিন। হাজীরা সব আরাফাতের ময়দানে থাকে এবং মসজিদে হারামে মুসল্লীর সংখ্যা থাকে খুবই কম। বর্তমানকালে হজ্জ উপলক্ষে এবং স্বয়ং হজ্জের দিনই ঐ গেলাফ লাগানো হয়। হাজীরা আরাফাত থেকে ফিরে এসে কাবা শরীফের গায়ে নতুন গেলাফ দেখতে পায়।

গেলাফ নির্মাণ কারখানায় গেলাফ তৈরির পর কাবা শরীফের গায়ে পরানোর আগে কারখানার পক্ষ থেকে তা কাবা শরীফের চাবির রক্ষক তথা বনি শায়বা গোত্রের মনোনীত কাবা শরীফের সেবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাঁর অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় গেলাফ লাগানো হয়।

হজ্জের কয়েকদিন আগ থেকেই কাবার গেলাফের নীচু অংশ উপরের দিকে তুলে দেয়া হয় এবং এতে কাবা শরীফের দেয়ালের বাইরের অংশ দেখা ও ধরা যায়।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কা’বার প্রতি দৃষ্টির ফজীলেত

📄 কা’বার প্রতি দৃষ্টির ফজীলেত


বাইতুল্লাহর প্রতি নজর করা একটি এবাদত। যাঁরা বাইতুল্লাহকে দেখে এবং এর প্রতি নজর দেয় তাঁরা সওয়াব পাবেন। হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন عِبَادَةُ اَلنَّظُرُ إِلَى الْكَعْبَةِ অর্থ : কাবা শরীফ দেখা একটি এবাদত। (আবুশ শেখ) আযীযি তাঁর السَّرَاجُ الْمُنِيرُ গ্রন্থে এই হাদীসের সনদকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এই ঘরের বিভিন্ন প্রকার এবাদতের ব্যাপারে আল্লাহর রহমতের যে বন্টনের কথা উল্লেখ করেছেন তাতে আল্লাহর ঘরের প্রতি দৃষ্টিদানকারীদের জন্য ২০টি রহমত নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হাদীসটি হচ্ছে এই :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَنْزِلُ عَلَى هُذَا الْبَيْتِ كُلَّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ عِشْرُونَ وَمَائِةُ رَحْمَةٍ سِتُّونَ مِنْهَا لِلطَّائِفِينَ بِالْبَيْتِ وَأَرْبَعُونَ لِلْعَاكِفِينَ حَوْلَ الْبَيْتِ وَعِشْرُونَ لِلنَّاظِرِينَ إِلَى الْبَيْتِ . وفي رواية - وَارْبُعُونَ لِلْمُصَلَّيْنَ وَفِيهَا يُنَزِّلُ اللَّهُ عَلَى أَهْلِ الْمَسْجِد مَسْجِد مَكَّةَ عِشْرِينَ وَمِائَةُ رَحْمَةٍ اخرجهما ابوذر وازرقى - كذا في القرى)
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন, এই কাবা ঘরের উপর প্রত্যেক দিন ও রাত্রে ১২০টি রহমত নাযিল হয়। এর মধ্যে তওয়াফকারীদের জন্য ৬০টি, মসজিদে হারামে এতেকাফকারীদের জন্য ৪০টি এবং কাবার প্রতি দৃষ্টিকারীদের জন্য ২০টি রহমত নাযিল হয়। অন্য এক বর্ণনায় নামাযীদের জন্য ৪০টি রহমত নাযিলের কথা এসেছে। ঐ রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ মক্কার মসজিদের লোকদের জন্য ১২০টি রহমত নাযিল করেন। আবুজর ও আযরাকী এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।

সাখাওয়ী তাঁর মাকাসেদ হাসানা গ্রন্থে, তাবারানী তাঁর মায়াযেম গ্রন্থে, আযরাকী, বায়হাকী এবং হারেস তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এই হাদীসটির উল্লেখ করেছেন। তাঁদের কারো কারো বর্ণিত শব্দগুলো হচ্ছে এইরূপ:
مِائَةُ رَحْمَةٍ فَسَتُونَ لِلطَّائِفِينَ وَعِشْرُونَ لِأَهْلِ مَكَّةَ وَمِثْلُهَا لِسَائِرِ النَّاسِ .
অর্থ: ১ শত রহমতের ৬০টি তওয়াফকারীদের জন্য, ২০টি মক্কাবাসীদের জন্য এবং অনুরূপ (বিশটি) অন্যান্য সকল মানুষের উদ্দেশ্যে বর্ষিত হয়। (১৬)

আল-মোনজেরী ইবনে আব্বাসের উপরোল্লিখিত হাদীসটি উল্লেখ করে বলেছেন, বায়হাকী এই হাদীসটি ভাল সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন।

হাফেজ আত তাবারী এই রহমত বন্টনের পদ্ধতি এবং যাদের উপর রহমত নাযিল হবে তাদের সম্পর্কে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তাঁর ঐ আলোচনার সার সংক্ষেপ হচ্ছেঃ ঐ রহমত নাযিলের দুটো ব্যখ্যা আছেঃ (১৭)

প্রথমটি হচ্ছে, ঐ রহমত বর্ণিত তিন দলের প্রত্যেকের উপর সমানভাবে নাযিল হবে, তা তাদের কম বা বেশী আমলের সাথে সম্পর্কুক্ত নয়। এই আলোকে প্রত্যেক তওয়াফকারী ৬০টি, প্রত্যেক কাবা দর্শনকারী ২০টি এবং প্রত্যেক নামাযী ৪০টি রহমত পাবে।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এই রহমত আমলের পরিমাণ, (কম-বেশ আমল) এবং আমলের গুণগত মানের উপর নির্ভর করে নাযিল হবে। এই ব্যখ্যাটিই বেশী প্রসিদ্ধ। এই ব্যাখ্যার আলোকে, সকল তওয়াফকারী ৬০টি, সকল কাবা দর্শনকারী ২০টি এবং সকল মুসল্লী ৪০টি রহমত পাবে। এতে করে উপরোল্লিখিত তিনদলের প্রত্যেক দলের বহুসংখ্যক লোক আল্লাহর ঐ রহমতের সুশীতল ছায়া পাবে এবং একজন লোক বহুসংখ্যক রহমতের অধিকারী হবে।

আল-কোরা কিতাবে রহমতের হাদীসটির দুটো বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম বর্ণনায় বলা হয়েছে, ঐ রহমত 'এই ঘরের অধিবাসী'দের উপর নাযিল হয়। দ্বিতীয় বর্ণনায় বলা হয়েছে ঐ রহমত, 'মসজিদের অধিবাসী'দের উপর নাযিল হয়।' হাফেজ তাবারী বলেছেন, ঐ দুই বর্ণনায় কোন বৈপরীত্য নেই। তাঁর মতে, 'মসজিদে মক্কা' এই শব্দ দ্বারা কাবা শরীফ বুঝানো হয়ে থাকে। কাবা বা আল্লাহর এই ঘরকে কুরআনে 'মসজিদ' বলা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ বলেছেন: )আল বাকারাহ-১৪৩( - فَوَلٌ ، وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ
অর্থ: 'তোমার চেহারা মসজিদে হারামের দিকে ফিরাও।' এখানে মসজিদে হারাম অর্থ হচ্ছে কাবা শরীফ। অর্থাৎ কাবার দিকে মুখ ফিরাও।

আল-কোরা কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'মুসীরুল গারাম' এর লেখক জাফর বিন মুহাম্মদ, তাঁর বাপ থেকে এবং তার বাপ তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
عَنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّظُرُ إِلَى الْبَيْتِ الْحَرَامِ عِبَادَةُ .
অর্থঃ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 'কাবা শরীফ দেখা এবাদত।' এর সমর্থনে হযরত আয়িশার বর্ণিত হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য।

আমাদের অতীতের বুজুর্গদের অনেকেই এই এবাদতটির ফজীলতের ব্যাপারে নিজেদের রুচি, জ্ঞান এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলেছেন। আযরাকী এ বিষয়ে ৪টি বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ১. হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন:
النَّظُرُ إِلَى الْكَعْبَةِ مَحْضُ الْإِيْمَانِ .
অর্থ: কাবার দিকে নজর করা খালেস ঈমানের পরিচয়। মুজাহিদ বলেছেন, কাবার দিকে নজর করা এবাদত। ২. সাঈদ বিন মুসাইয়েব বলেছেন, যে ঈমান ও সত্য বিশ্বাসের সাথে কাবা শরীফের দিকে তাকায়, সে গুনাহ থেকে নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়।

৩. আতা বলেছেন, কাবার দিকে নজর করা এক বছরের নামায তথা কেয়াম, রুকু ও সেজদা থেকে উত্তম।

৪. ইবনুস সায়েব আল-মদনী বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সত্য বিশ্বাস সহকারে কাবার দিকে তাকায়, গাছ থেকে যেমন পাতা ঝরে পড়ে, তেমনি তার গুনাহও ঝড়ে পড়বে। (মুসীরুল গারাম) তাঁর থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, কাবার দিকে নজর করা এবাদত। কাবার প্রতি নজরকারী ব্যক্তির মর্যাদা হচ্ছে, সার্বক্ষণিক রোযাদার এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুজাহিদের সমান। (১৮)

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 বায়তুল্লাহর ৯টি বৈশিষ্ট্য

📄 বায়তুল্লাহর ৯টি বৈশিষ্ট্য


বাইতুল্লাহ শরীফের অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো।

১. পেশাব-পায়খানা করার সময় বাইতুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে কিংবা পিঠ দিয়ে বসা হারাম। বেশী সংখ্যক আলেমের মতে, ঘর কিংবা মাঠ সর্বত্র এই হুকুম প্রযোজ্য। ইমাম শাফেয়ী (রা) এর মতে এই হুকুম শুধু মাঠের জন্য প্রযোজ্য। ঘরের জন্য নয়। মানুষ দুনিয়ার যেখানেই থাকুক না কেন, সর্বত্রই এই হুকুম মেনে চলা জরুরী।
এর কারণ সম্পর্কে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, কাবার সম্মান ও মর্যাদাকে সামনে রেখেই এই হুকুম দেয়া হয়েছে। হযরত সারাকা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন,
إِذا أَتَى أَحَدُ كُمُ الْبَرَازَ (بِفَتْحِ الْبَاءِ اسْمٌ لِلْفَضَاءِ الْوَاسِعِ مِنَ الْأَرْضِ وَيُكَنَّى بِهِ عَنِ الْحَاجَةِ) فَلْيُكْرِمْ قِبْلَةَ اللَّهِ وَلَا يَسْتَقْبِلُ القبلة .
অর্থ : 'তোমাদের কেউ যদি পেশাব পায়খানার জন্য উন্মুক্ত মাঠে যায়, সে যেন আল্লাহর কিবলার সম্মান করে এবং কিবলামুখি হয়ে না বসে।' এটাই হচ্ছে বেশীর ভাগ আলেমের মত। কোন কোন আলেম এর ভিন্ন কারণ বলেছেন যা সমালোচনামুক্ত নয়। বর্ণিত হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গিই বেশী সঠিক বলে মনে হয়। (১৯)

২. কা'বা শরীফে সিল্কের পর্দা বা গেলাফ ব্যবহার করা জায়েয। ইমাম গাযালী (র) তাঁর ফতোয়ায় বলেছেন, কুরআন শরীফকে সোনা দিয়ে এবং কা'বা শরীফকে সিল্ক দিয়ে সাজানো জায়েয আছে। কা'বা ব্যতীত অন্য কিছুতে তা জায়েয নেই। কেননা, পুরুষের জন্যই শুধু সিল্ক ব্যবহার নিষিদ্ধ। বায়হাকী বলেছেন, উসমান থেকে বর্ণিত আছে তিনি এটাকে অপচয় মনে করতেন। ইমাম গাযালী এহইয়াউল উলুম বইতে লিখেছেন, কা'বার দেয়াল সাজানো নিষিদ্ধ নয়। সিল্ক শুধু পুরুষের জন্য হারাম। কা'বার জন্য সিল্ক ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ হচ্ছে কা'বা সাজানো নিষিদ্ধ। অথচ কা'বা সাজানো উত্তম। আল্লাহ বলেছেন, قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِيْنَةَ الله
অর্থ: 'বল আল্লাহর সৌন্দর্যকে কে হারাম করেছে? বিশেষ করে অহংকার ও গর্ব প্রকাশের জন্য না হলে, স্বাভাবিক সৌন্দর্য প্রকাশের বেলায় তা অবশ্যই জায়েয। (২০)

৩. কা'বায় খোশবু বা সুগন্ধি লাগানো
হযরত আয়িশা (রা) বলেছেন, আমার নিকট কা'বা শরীফে সোনা-রূপা উপহার দেয়ার চেয়ে কা'বা শরীফে সুগন্ধি লাগানো অপেক্ষাকৃত বেশী উত্তম। তিনি বলেছেন, তোমরা কা'বা ঘরে সুগন্ধি লাগাও, এটি কা'বাকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার অন্তর্ভুক্ত। এই বলে তিনি কুরআনের একটি নির্দেশের দিকে ইঙ্গিত দেন। সেটি হচ্ছে : وَطَهِّرْ بَيْتِيَ 'আমার ঘরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কর'। হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা) কা'বা শরীফের ভিতরের সকল অংশে সুগন্ধি মেখেছেন।
এছাড়াও বিভিন্ন যুগে কা'বার বাইরে, তওয়াফের ভেতর সুঘ্রাণযুক্ত ধোঁয়া দেয়ার প্রথা চালু আছে। ভেতরেও সুঘ্রাণযুক্ত ধোঁয়া দেয়া হত। এতে করে তওয়াফের লোকদের জন্য বেশ ভালই হত। দেহ ও মনে খুশীর সঞ্চার হত।

৪. আল্লাহ কা'বা শরীফকে কুচক্রী ও ধ্বংসাত্মক লোকদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং কা'বা ধ্বংসকারীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সূরা ফীলে, আবরাহা বাদশাহর হস্তীবাহিনীকে তিনি ধ্বংস করার ঘটনা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়াও যারা কা'বা শরীফে খারাপ আশা আকাঙ্খা পূরণ করতে চেয়েছে তাদের অনেক ঘটনা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। উম্মুল মোমেনীন হযরত উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যারা এই ঘরের ক্ষতি করতে চাইবে আল্লাহ তাদেরকে উন্মুক্ত ময়দানে ধ্বংস করে দেবেন।'
হযরত আয়িশা (রা) বলেন, আমরা শুনে আসছিলাম যে, আসাফ ও নায়েলা জোরহুম গোত্রের দুইজন নারী ও পুরুষ ছিল। তারা কা'বার অঙ্গনে অন্যায় কাজ করায় আল্লাহ তাদেরকে দুটো পাথরে পরিণত করে দিয়েছেন। আরেক ঘটনা। জাহেলিয়াতের যুগে একজন মেয়েলোক কা'বায় এসে স্বামীর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় কামনা করছিল। এক ব্যক্তি তাঁর দিকে খারাপ নিয়তে হাত বাড়ালে তার হাত অবশ হয়ে যায়। আয্যাওয়ী বলেছেন, সে ব্যক্তিটি ছিল হুয়াইতাব। আমি তাকে ইসলামী যুগেও অবশ দেখেছি। কেননা সে, কা'বার সম্মান রক্ষা করেনি।
অন্য একটি ঘটনা হচ্ছে, এক ব্যক্তি কাবার তওয়াফ করছিল। তখন তওয়াফে এক সুন্দরী রমণীর খোলা হাত বিদ্যুতের মত চমকাতে দেখে তার হাতের উপর নিজের হাত রেখে যৌনাকর্ষণ উপভোগ করতে লাগলো। এতে দু'জনের হাত এমনভাবে লেগে গেল যে আর খোলা যাচ্ছিল না। ঐ দু'জন অন্য এক নেককার ব্যক্তির কাছে গিয়ে তাদের হাত খোলার জন্য দোয়ার অনুরোধ জানালো। তিনি দু'জনকে তাদের হাত আটকে যাওয়ার ঘটনাটি জিজ্ঞেস করায় তারা তা খুলে বলল। তিনি দু'জনকে উপদেশ দিলেন, তোমরা যে জায়গায় ঐ পাপ কাজটি করেছ সেই জায়গায় ফিরে যাও এবং আল্লাহর কাছে তওবা ও অঙ্গীকার কর যে, তোমরা আর কখনও অনুরূপ কাজ করবে না। তারা ঐ রকম তওবা করার পর শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেল।
আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে এমন যা বাদশাহ আবরাহার ঘটনার কাছাকাছি। সেটি হচ্ছে, ইয়েমেনের বাদশাহ তুব্বা'র ঘটনা। তার আসল নাম ছিল আসআদ। তিনি প্রাচ্যের কোন দেশে গিয়েছিলেন। মক্কা ও মদীনার পথে স্বদেশে রওনা হন। মদীনা থেকে বিরাট সেনাবাহিনী সহকারে মক্কার দিকে রওনা হলে পথে হোজাইল গোত্রের একটি দলের সাথে তাঁর দেখা হয়। তারা তাঁকে মক্কার কাবা ধ্বংস করে এর পরিবর্তে ইয়েমেনে অনুরূপ একটি কাবা তৈরির জন্য উৎসাহিত করে এবং বলে যে, এখন থেকে যদি ইয়েমেনে হজ্জের ব্যবস্থা করা হয়, এতে বাদশাহর আয় ও মর্যাদা বাড়বে এবং তাঁর দেশ পূর্ণ আবাদ হবে। একথা শুনে, বাদশাহ রাজী হল এবং কাবা শরীফ ভাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হল। মক্কার দিকে রওনা হওয়ার জন্য সওয়ারী পশুগুলোকে হাঁকানো হল। কিন্তু একটি পশুও চলে না। ঘোর অন্ধকার নেমে আসল এবং প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। বাদশাহ বিভিন্ন রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ল এবং তীব্র মাথাব্যথা শুরু হল। বাদশাহর দু'চোখ থেকে পানি বের হল এবং গালের উপর দিয়ে বইতে শুরু করল। তার মাথায় এমন এক বীভৎস রোগ শুরু হল যে, তা থেকে পঁচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হতে লাগল। দুর্গন্ধের কারণে তার কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। তাঁর সাথে যে সকল পাদ্রী ও ডাক্তার ছিল তিনি তাদের কাছে এই অকস্মাৎ মাথাব্যথা ও রোগের কারণ জানতে চান। তারা বাদশাহর রোগ ও বীভৎস দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। মৃত গাধার পঁচা দুর্বিসহ দুর্গন্ধের মতই বাদশাহের মাথার পুঁজের দুর্গন্ধ বের হতে থাকল। তারা জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বাইতুল্লাহর ব্যাপারে কোন খারাপ পরিকল্পনা চিন্তা করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তারপর তিনি তার পরিকল্পনা তাদের কাছে প্রকাশ করলেন এবং হোজাইল গোত্রের একদল লোকের পরামর্শ সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করলেন। এসব শুনে তারা বলল, হোজাইল গোত্র আপনাকে, আপনার সেনাবাহিনীকে এবং আপনার সাথে আরো যারা আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করার পরামর্শ দিয়েছে। এটি হচ্ছে আল্লাহর ঘর। কেউ এই ঘরের ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেই ছাড়েন। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন এখন উপায় কি? তারা জবাবে বলল, এখন আপনি এই ঘরের কল্যাণ কামনা করুন, এর সম্মান করুন, এতে গোলাফ পরান, এই ঘরের কাছে কোরবানী করুন এবং এই ঘরের অধিবাসীদের সাথে ভাল ব্যবহার করুন। বাদশাহ তাই করলেন। ফলে অন্ধকার চলে গেল, ঝড় বন্ধ হয়ে গেল, সওয়ারী পশুগুলো চলা শুরু করল, চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে এল, তার মাথা সুস্থ হয়ে উঠল। বাদশাহ খারাপ নিয়ত থেকে তওবা করলেন এবং সেনাবাহিনীকে ইয়েমেনের দিকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নিজে মক্কায় কিছুদিন থাকলেন এবং প্রত্যেক দিন একশত উট কোরবানী করে মক্কার বাসিন্দাদেরকে খাওয়ান। তিনি কাবা শরীফে গেলাফ পরান। ইসলাম আসার সাতশত বছর আগে ঐ ঘটনা ঘটে।
আল্লাহ তাঁর ঘরকে যে কোন জালেমের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং একে সর্বাবস্থায় সুরক্ষিত রাখেন। এজন্য এই ঘরের অপর নাম হচ্ছে 'আতীক'। কেউ এই ঘর ধ্বংস করতে চাইলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেছেন,
وَمَنْ يُرِدْ فِيْهِ بِالْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ اليْمِ (সূরা হাজ্জ-২৫)
অর্থ : 'কেউ অন্যায়ভাবে এতে কুফরী করলে, আমরা তাদেরকে কষ্টদায়ক আযাবের স্বাদ গ্রহণ করাবো।'

৫. যে ব্যক্তি কাবা শরীফকে স্বপ্নে দেখবে, তার সেই স্বপ্ন সঠিক বলে তাবারানী তাঁর মোজাম কিতাবে উল্লেখ করেছেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
مَنْ رَآنِي فِي مَنَامِهِ فَقَدْ رَآنِي ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُ بِي وَلَا بِالْكَعْبَةِ.
অর্থঃ 'যে আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে আমাকে ঠিকই দেখে কেননা, শয়তান আমার এবং কাবার ছবি ধারণ করতে পারে না।' অর্থাৎ শয়তান এ দুটো জিনিসের রূপ ধরতে পারে না। তাবারানী বলেছেন, আবদুর রাজ্জাক মুহাম্মদ বিন আবিস সেররী আল-আসকালানী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং এতে ছাড়া অন্য কোন বর্ণনায় وَلَا الْكَعْبَة 'কাবার রূপ ধারণ করতে পারে না' এই বক্তব্য আসেনি।

৬. কাবা শরীফ একটি আবাদকৃত ঘর। মানুষ তওয়াফের মাধ্যমে সর্বদা একে আবাদ করে। মুহাম্মদ বিন আব্বাদ বিন জাফর কিবলার দিকে মুখ করে বলতেন, 'আমার রব এর একটি মাত্র ঘর, কি সুন্দর, কি মনোরম! আল্লাহর শপথ, এটি আবাদকৃত ঘর।'
কেউ কেউ বলেছেন, বাইতুল মামুর হচ্ছে সেই ঘর যা হযরত আদম (আ) প্রথমেই দুনিয়ায় এসে নির্মাণ করেন। হযরত নূহ (আ) এর প্লাবনের সময় সেই ঘরটিকে আল্লাহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা এর তওয়াফ করে।
আরবীতে, مَلائِكَةُ (ফেরেশতা) শব্দের একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে ضراح বা দূরে অবস্থানকারী। ফেরেশতাদের তওয়াফের ঘর যমীন থেকে আসমানে সরিয়ে দেয়ার কারণে, ফেরেশতারাই যেন দূরে সরে গেল। তাই 'তাদেরকে দূরে অবস্থানকারী' বলা হয়।
আবুত তোফায়েল বলেন, হযরত আলীকে 'বাইতুল মামুর' সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, সেটাতো কাবা শরীফ বরাবর বহুদূরে অবস্থিত। এতে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে এবং তারা এতে কিয়ামত পর্যন্ত ২য় বার আর প্রবেশ করবে না।
বাইতুল মামুর কোন্ আসমানে অবস্থিত তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, প্রথম আসমানে, কারো মতে ৪র্থ আসমানে, কারো মতে ৬ষ্ঠ আসমানে কারো মতে ৭ম আসমানে এবং কেউ কেউ অন্যমত পোষণ করেন।
আবু নায়ীম আল-হাফেজ বুখারী শরীফের বাছাইকৃত হাদীস সংকলনে উল্লেখ করেছেন যে, আমর বিন হামদান হাসান বিন সুফিয়ান থেকে, তিনি হাদবাহ থেকে তিনি হাম্মাম বিন ইয়াহইয়া থেকে, তিনি কাতাদাহ থেকে, তিনি হাসান থেকে এবং তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন,
عَنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ رَأَى الْبَيْتَ الْمَعْمُورَ يَدْخُلُهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكَ فَلَا يَعُودُونَ إِلَيْهِ .
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তিনি বাইতুল মামুরে ৭০ হাজার ফেরেশতাকে প্রবেশ করতে দেখেছেন এবং তাঁরা এতে আর দ্বিতীয়বার ফিরে আসবে না।' এইভাবে প্রত্যেক দিন ৭০ হাজার ফেরেশতা এইঘরে আসে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহর কত অগণিত ও সীমাসংখ্যাহীন ফেরেশতাকুল রয়েছে।

৭. ইবনে হিশাম তাঁর সীরাতুন্নবী বইতে লিখেছেন, হযরত নূহ (আ) এর সময়ের বন্যার পানিতে কা'বা শরীফের আশে-পাশে পানিতে ডুবে গেলে কা'বা শরীফ আসমানের নীচে বাতাসের শূন্য রাজ্যে বিরাজ করতে থাকে। তখন হযরত নূহ (আ) এর নৌকা কা'বা শরীফের চার দিকে তওয়াফ করতে থাকে। নূহ (আ) নৌকার যাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, "তোমরা আল্লাহর হারামে এবং আল্লাহর ঘরের পার্শ্বে আছ, সুতরাং তোমরা আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশের জন্য এহরাম কর এবং কেউ যেন কোন মেয়েলোক স্পর্শ না করে। তিনি পুরুষ ও মেয়েলোকের মাঝখানে পর্দা করে দিলেন। যেন, মেয়েলোকেরা একপাশে এবং পুরুষরা অন্যপাশে থাকতে পারে। কিন্তু বনু হাম গোত্র সীমালংঘন করে। এতে নূহ (আ) তাদের শরীরের রং কাল করার জন্য বদদোয়া করেন। অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, হাম গোত্রের বিরুদ্ধে নূহ (আ) এর বদ দোয়ার কারণ অন্য কিছু।

৮. হাশরের দিন কা'বা শরীফকে বিবাহিতা সুসজ্জিতা কনের মত উঠানো হবে। যে হজ্জ করেছে সে এর গেলাফ ধরে থাকবে যে পর্যন্ত না কা'বা শরীফ তাদেরকে বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দেয়। ইমাম গাযালী এহইয়াউল উলুম গ্রন্থে এই হাদীসটিকে 'বাইতুল্লাহ ও মক্কার ফজীলত' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি তা 'আসরারুল হজ্জ' নামক বই থেকে উদ্ধৃত করেছেন। হাদীসটির ভাষা হচ্ছে এইরূপ:
إِنَّ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ قَدْوَعَدَ هَذَا الْبَيْتَ أَنْ يَحُجَّهُ فِي كُلِّ سَنَةٍ سِتُّمِائَةٌ الف - فَإِنْ نَقَصُوا أَكْمَلَهُمُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الْمَلَائِكَةِ - وَأَنَّ الْكَعْبَةَ تُحْشَرُ كَالْعَرُوسِ الْمَرْفُوفَةِ وَكُلُّ مَنْ حَجَّهَا يَتَعَلَّقُ بِأَسْتَارِهَا يَسْعَوْنَ حَوْلَهَا حَتَّى تَدْخُلَ الْجَنَّةَ فَيَدْخُلُونَ مَعَهَا
অর্থ: 'আল্লাহ এই ঘরের সাথে ওয়াদা করেছেন যে, প্রতিবছর ৬ লাখ লোক এই ঘরের হজ্জ করবে। যদি এই সংখ্যা থেকে লোক কম হয় তাহলে, আল্লাহ ফেরেশতা দ্বারা তা পূরণ করে দেবেন। হাশরের দিন কাবা শরীফকে বিবাহিতা সুসজ্জিতা কনের মত উঠানো হবে। যত লোক হজ্জ করেছে তারা এর গেলাফ ধরে থাকবে এবং এর চতুষ্পার্শ্বে চলতে থাকবে যে পর্যন্ত না কাবা শরীফ বেহেশতে প্রবেশ করে। তখন তারাও সবাই একই সাথে বেহেশতে প্রবেশ করবে। আল্লামা হাফেজ ইরাকী বলেন, আমি এই হাদীসের কোন ভিত্তি খুঁজে পাইনি।
(تخريج على الاحياء للعراقي)

৯. এই ঘর সৃষ্টির পর থেকে এযাবত এর তওয়াফ এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ নেই। মানুষ, জ্বিন কিংবা ফেরেশতাদের কেউনা কেউ এর তওয়াফ করেই যাচ্ছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কা’বার ভেতরে প্রবেশের ফজীলেত

📄 কা’বার ভেতরে প্রবেশের ফজীলেত


হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে,
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ دَخَلَ الْبَيْتَ دَخَلَ فِي حَسَنَةٍ وَخَرَجَ مِنْ سَيِّئَةٍ مُغْفُورًا
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে সে নেক ও কল্যাণের মধ্যে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে যখন বের হয় তখন গুনাহ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে বের হয়।

মুহিব আত-তাবারী বলেছেন, তাম্মাম আর-রাযী এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি আতা বিন আবি রেবাহ থেকে বর্ণিত হওয়ায় এটিকে হাসান ও গরীব বলে অভিহিত করা হয়।

আল-ইরাকী বলেছেন, বায়হাকীও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর বর্ণনা সূত্রে, রাবী আবদুল্লাহ বিন মোয়াম্মাল দুর্বল বলে পরিচিত। (طَرحُ التَّشْرِيب)

হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা শরীফে প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর সাথে ছিলেন উসামা বিন যায়েদ, উসমান বিন তালহা এবং বিলাল বিন রাবাহ। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ী)

এই দুই হাদীসে, বাইতুল্লাহ শরীফের ভেতর প্রবেশ করা যে উত্তম তা প্রমাণিত হয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসরণ ও আনুগত্যই এই মর্যাদার ভিত্তি।

আল-ইরাকী বলেছেন, কাবা শরীফের ভেতরে প্রবেশ করা যে উত্তম এ ব্যাপারে সবাই একমত। (طَرحُ التَّشْرِيب) এই সওয়াব অর্জনের আগ্রহ সবার মধ্যে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়াও আল্লাহর এই পবিত্র ঘরের ভেতর দেখার আগ্রহ কার নেই?

ইমাম শাফেয়ী (রা) বলেছেন, কাউকে কষ্ট না দিয়ে কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করা মোস্তাহাব।

ইরাকী বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের দিন কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করেছেন বলে বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আবী আওফা থেকে বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সা) ওমরাহ আদায়ের সময় কা'বা শরীফের ভেতর প্রবেশ করেননি। তিনি বিদায় হজ্জের সময়ও কাবা শরীফের ভেতর ঢুকার কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবতঃ উমরাহ ও হজ্জের সময় তিনি এই আশংকায় কাবার ভেতরে ঢুকেননি, না জানি তা আবশ্যক কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু মূল বিষয়টি তা নয়। ইতিপূর্বে উল্লেখিত হাদীসের মর্ম অনুযায়ী বুঝা যায় যে, কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করা একটি স্বতন্ত্র সুন্নত। এছাড়া, ইমাম বায়হাকী বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (কাবা) শরীফের ভেতর প্রবেশ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাই বায়হাকীর বর্ণনা উমরাহর সময় কাবায় না ঢুকা সংক্রান্ত আবি আওফার বর্ণনার বিপরীত নয়।

কারো কারো মতে বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাবা শরীফে প্রবেশের তথ্যটি সঠিক নয়। তাঁদের মতে তিনি শুধু মক্কা বিজয়ের দিনই কাবা শরীফে প্রবেশ করেছেন। ইমাম নওয়ী মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যার মধ্যে বলেছেন, মক্কা বিজয়ের দিন কাবার ভেতরে রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রবেশের ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। আলেমগণ উমরার সময় রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাবার ভেতর না ঢুকার কারণ হিসাবে বলেন যে, এর ভেতর তখন মূর্তি ও প্রতিকৃতি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন ভেতরে ঢুকার আগে মূর্তিগুলোকে বের করা হয় এবং পরে তিনি ঢোকেন।

তাবাকাতে ইবনে সা'দ হযরত উসমান বিন তালহা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরতের আগে, মক্কায় বাস করার সময় কা'বার ভেতরে প্রবেশ করেছেন। তবে, মক্কা বিজয়ের দিন তিনি কা'বার ভেতরে দু'বার প্রবেশ করেছেন বলে জানা যায়। দার কুতনী হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবায় প্রবেশ করেছেন এবং বিলাল পেছনে ছিলেন। আমি বিলাল (রা) কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) কি ভেতরে নামায পড়েছেন? তিনি জবাব দিলেন, 'না'। পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) আবারও কা'বা শরীফে ঢুকেন। (طرح التثريب) মালেকী মাজহাবের মুফতী শেখ মুহাম্মদ আবেদ বলেন, কা'বা শরীফের ভেতরে ঢুকা মুস্তাহাব, যদি তা রাত্রেও হউক না কেন। আল্লামা আমীর তাঁর মানাসেক গ্রন্থে লিখেছেন যে, কা'বা শরীফের ভেতর বহু ভিড় লক্ষ্য করা যায়, যারা ভেতরে ঢুকতে অপারগ তারা হিজরে ইসমাঈলে ঢুকে সেখানে নামায পড়লেই চলে। কেননা, তাতে কা'বা শরীফেরই অংশ রয়েছে।

আস্সাওয়ী 'তাওদিহুল মানাসেক' গ্রন্থে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আয়িশা (রা) কে বলেছেন, তুমি কা'বার ভেতর ঢুকতে চাইলে হিজরে ইসমাঈলে নামায পড়। কেননা, এটি কা'বা শরীফেরই অংশ। তোমার কওম, কা'বা নির্মাণের সময় কা'বাকে সংকুচিত করে এটিকে বাইরে রেখে দিয়েছে।

কিছু সংখ্যক উলামায়ে কেরাম কা'বার ভেতর ঢুকাকে মাকরূহ বলেছেন। তাদের দলীল হচ্ছে হযরত আয়িশা (রা) কর্তৃক নিম্নোক্ত হাদীসটি।
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ عِنْدِي وَهُوَ قَرِيرُ الْعَيْنِ طَيِّبُ النَّفْسِ - ثُمَّ رَجَعَ إِلَى وَهُوَ حَزِينٌ فَقُلْتُ لَهُ - فَقَالَ دَخَلْتُ الكَعْبَةَ وَوَدَدْتُ أَنَّى لَمْ أَكُنْ فَعَلْتُ أَنِّي أَخَافُ أَنْ أَكُونَ أَنْعَبْتُ أُمَّتِي مِنْ بعدي - اخرجه احمد والترمذي وصححة ابوداؤد
অর্থ : হযরত আয়িশা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা) আমার কাছ থেকে শীতল চোখ ও প্রশান্ত চিত্তে বের হয়ে গেলেন। তারপর পেরেশান হয়ে ফিরে আসেন। আমি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তর দিলেন, আমি কাবা শরীফে প্রবেশ করেছি। যদি আমি এটা না করতাম! (তাহলে কতইনা ভাল হত) আমার ভয় হয় যে, আমি আমার পরের উম্মতদেরকে কষ্টের মধ্যে ফেলেছি নাকি। (আহমদ, তিরমিজী ও আবু দাউদ)

মুহিব আত্তাবারী বলেছেন, এই হাদীসটি কা'বায় প্রবেশ না করার প্রমাণ বহন করে না। আমাদের মতে, কাবায় প্রবেশ যে মুস্তাহাব এর জন্য কাবায় রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রবেশই উত্তম প্রমাণ। তবে উম্মতের কষ্টের আশংকায় তাঁর কা'বায় ঢুকার বিরুদ্ধে আফসোসের ফলে মুস্তাহাবের হুকুম বাতিল হয়নি।

আল্লামা ফাসী তাঁর 'শেফাউল গারাম' বইতে লিখেছেন, ৪ মাজহাবের ইমামগণ প্রত্যেকেই একমত যে, কাবা শরীফের ভেতর প্রবেশ করা মুস্তাহাব বা উত্তম। বরং ইমাম মালেক (রা) বেশী বেশী প্রবেশ করাকে আরো উত্তম বলেছেন। ইবনুল হাজ্জ 'মানাসেক' বইতে লিখেছেন, ইমাম মালেককে যখন জিজ্ঞাসা করা হল যে, যতবার সুযোগ মিলে ততবারই কি কা'বা শরীফে প্রবেশ করা যায়? তিনি উত্তর দেন, তা তো বেশী উত্তম। আল্লামা ফাসী হাসান বসরীর প্রখ্যাত 'রেসালা' বইয়ের বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে কাবায় প্রবেশ করে সে আল্লাহর রহমতের মধ্যে প্রবেশ করে এবং আল্লাহর বিশেষ হেফাজত ও নিরাপত্তা লাভ করে, আর যখন বের হয় তখন গুনাহমুক্ত হয়ে বের হয়।

ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, মুজাহিদ হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে কা'বা শরীফে প্রবেশ করা প্রসঙ্গে বলেছেন: 'এতে প্রবেশ করার মানে, সওয়াব ও নেকীর মধ্যে প্রবেশ করা আর সেখান থেকে বের হওয়ার অর্থ হচ্ছে, গুনাহ থেকে বের হওয়া এবং ক্ষমা লাভ করা।'

কিছু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ীনে কেরাম কা'বা শরীফে বেশী বেশী প্রবেশ করাকে উত্তম বলেছেন। আল্লামা আযরাকী তাঁর দাদা থেকে, তিনি মক্কার একজন ফেকাহবিদ মুসলিম বিন খালেদ যানজী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যানজী বলেন, আমি সদাকা বিন ইয়াসার কে প্রতিবারই কা'বা শরীফ খোলার সময় ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি কেন এত বেশী কা'বায় প্রবেশ করেন? তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহর কসম, আমি কা'বা শরীফকে খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে নামায না পড়লে আমার কাছে খারাপ লাগে।

আযরাকী উল্লেখ করেছেন, মুসা বিন আকাবা বলেন, আমি সালেম বিন আবদুল্লাহ বিন উমর বিন খাত্তাব (রা) এর সাথে ৭ সপ্তাহ তওয়াফ করেছি। তিনি প্রখ্যাত ৭ জন ফেকাহবিদের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেক বারই আমরা সাত চক্কর তওয়াফ শেষে কা'বা শরীফে প্রবেশ করেছি এবং দু'রাকাত করে নামায পড়েছি।

আযরাকী তাঁর দাদা থেকে, তিনি দাউদ বিন আবদুর রহমান আল-আত্তার থেকে, তিনি ইবনে জুরাইজ থেকে, তিনি ইবনে উমরের গোলাম নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে উমর যখন মক্কায় হজ্জ কিংবা উমরাহ করার জন্য আসতেন এবং কা'বা খোলা পেতেন, তখন অন্য কোন কাজ করার আগে, প্রথমে কা'বা শরীফে প্রবেশ করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00