📄 মোলতাযামের তাৎপর্য
মোলতাযাম হচ্ছে হাজারে আসওয়াদ এবং কা'বার দরজার মধ্যবর্তী দেয়ালের স্থানটুকুর নাম। এটাই হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এর মত। এর অপর নাম হচ্ছে اَلْمُدَّعًا দোয়ার জায়গা এবং الْمُتَعَوَّذ আশ্রয় প্রার্থনার স্থান। (আযরাকী, শেফাউল গারাম এবং আল-জামে' আল-লতীফ)। মোলতাযাম শব্দের অর্থ হচ্ছে 'আঁকড়ে ধরার স্থান।' লোকেরা এটাকে আঁকড়ে ধরে দোয়া করে বলে এর নাম হচ্ছে মোলতাযাম এর ফজীলত অনেক বেশী। যে সকল জায়গায় দোয়া কবুল হয় এটি তার অন্যতম।
হাদীস দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের চেহারা, বুক, দুই হাত ও দুই কজা দিয়ে এটিকে আঁকড়ে ধরে দোয়া করেছেন।
হযরত আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কা বিজয়ের দিন আমি বললাম যে, আমি আমার পোশাক পরবো। আমার ঘরও ছিল রাস্তার উপর। তারপর আমি চললাম। তখন দেখলাম নবী করীম (সা) এবং সাহাবায়ে কেরাম কা'বা শরীফ থেকে বের হন এবং কা'বার দরজা থেকে হাতীম পর্যন্ত দেয়াল স্পর্শ করেন। তারা কা'বার দরজায় নিজেদের গাল বিছিয়ে দেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) সবার মাঝে অবস্থান করছিলেন। (আবু দাউদ) এই হাদীসের সনদে ইয়াজিদ বিন আবি জিয়াদ নির্ভরযোগ্য এবং প্রমাণযোগ্য রাবী নন।
বজলুল মাজহুদ কিতাবে উল্লেখ আছে যে, মুসনাদে আহমদ বর্ণিত হাদীসে, হযরত আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে হাজারে আসওয়াদ এবং বাবুল কা'বার মাঝখানে দেয়াল আঁকড়ে থাকতে এবং অন্যান্যদেরকে বাইতুল্লাহর বিভিন্ন অংশ আঁকড়ে ধরতে দেখেছি।
ইবনে মাজাহ হযরত আমর বিন আ'স থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আমর বিন আস মোলতাযাম আঁকড়ে ধরে দোয়া করেছেন এবং বলেছেন, আল্লাহর কসম, এটি সেই জায়গা যেখানে আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে আঁকড়ে ধরে দোয়া করতে দেখেছি।
আবু দাউদের এক বর্ণনায় এসেছে যে, আবদুল্লাহ কা'বার তওয়াফ করেন, হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করেন, পরে হাজারে আসওয়াদ এবং কা'বার দরজার মাঝখানে দাঁড়ান এবং নিজের বুক, কপাল, দুই হাত ও কবজি এইরূপ করেন। এই বলে তিনি নিজে এগুলো বিছিয়ে দেন এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুরূপ করতে দেখেছি।
হযরত ইবনে উমর নিজের বুক ও কপাল মোলতাযামে লাগিয়ে দোয়া করতেন। বাবুল কা'বা এবং হাজারে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানটুকুই হচ্ছে মোলতাযাম।
তবে, হযরত আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরামকে হাতীম পর্যন্ত বাইতুল্লাহকে আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে যা বলেছেন, তার জবাব হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোলতাযামে দাঁড়িয়েই দোয়া করেছেন। তবে সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা বেশী হওয়ায় এবং মোলতাযামে সবাইর সংকুলান না হওয়ায় কিছু সংখ্যক তো মোলতাযামেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আর অবশিষ্টরা হাতীম পর্যন্ত বাইতুল্লাহকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মোলতাযাম দোয়া কবুলের একটি পরীক্ষিত জায়গা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ يَقُولُ الْمُلْتَزَمُ مَوْضَعُ يَسْتَجَابُ فِيْهِ الدُّعَاءُ - مَا دَعَا اللَّهِ فِيْهِ عَبْدٌ دَعْوَةً إِلا اسْتَجَابَهَا
অর্থ: 'মোলতাযাম হচ্ছে দোয়া কবুলের জায়গা। কোন বান্দাহ এখানে দোয়া করলে, তা অবশ্যই কবুল হয়।'
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহর কসম এই হাদীস শুনার পর যখনই আমি মোলতাযামে দোয়া করেছি তখনই আমার দোয়া কবুল হয়েছে। হযরত আমর বিন আস (রা) বলেন, যখন ইবনে আব্বাস থেকে এই হাদীস শুনেছি তখন থেকেই কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে মোলতাযামে গিয়ে দোয়া করার পর আল্লাহ সে সকল দোয়া কবুল করেছেন এবং সমস্যাগুলো দূর করে দিয়েছেন। এই হাদীসের সনদের রাবী সুফিয়ান এবং হোমাইদীও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। এ ছাড়াও এখন পর্যন্ত বহু লোক মোলতাযামে দাঁড়িয়ে দোয়া করার পর তাদের দোয়া কবুল হতে দেখেছেন।
কাজী আ'য়াদ তাঁর শাফা গ্রন্থে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বইতে বর্ণিত হাদীসের ভাষা হল- سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا دَعَا أَحَدٌ بِشَنِّي فِي هُذَا الْمُلْتَزَمَ إِلا اسْتُجِيبَ لَهُ .
অর্থ : এই মোলতাযামে দাঁড়িয়ে কেউ আল্লাহর কাছে দোয়া করলে, তাঁর দোয়া অবশ্যই কবুল হবে।' তারপর কাজী আ'য়াদ বলেন, আমি এবং এই হাদীসের সকল রাবী এই হাদীসটি শুনার পর মোলতাযামে গিয়ে দোয়া করায় আমাদের সবার দোয়া কবুল হয়েছে।
আযরাকী মোলতাযামের ফজীলত বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, হযরত আদম (আ) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আসার পর সাতবার বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেন এবং বাবুল কা'বার সামনে দু' রাকাত নামায পড়েন। পরে মোলতাযামে এসে এই প্রার্থনা করেন: اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ سَرِيرَتِي وَعَلَا نِيَتِي فَاقْبَلْ مَعْذِرَتِي وَتَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَمَا عِنْدِى فَاغْفِرْ لِي ذُنُونِي وَتَعْلَمُ حَاجَتِي فَأَعْطِنِي سُؤْلِي . اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيْمَانًا يُبَاشِرُ قَلْبِي وَيَقِينَا صَادِقًا حَتَّى أَعَلَّمَ أَنَّهُ لَنْ يُصِيبَنِي إِلا مَا كُتِبَتْ لِي وَالرِّضَاءُ بِمَا قَضَيْتَ عَلَى .
অর্থ : 'হে আল্লাহ তুমি আমার প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জান। আমার ওজর আপত্তি কবুল কর, তুমি আমার দেহ ও অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সুতরাং আমার গুনাহ মাফ কর। তুমি আমার প্রয়োজন জান, তাই আমার প্রার্থনা পূরণ কর। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে অন্তর আবাদকারী ঈমান এবং সত্য ও মজবুত বিশ্বাস কামনা করি, যেন এর ফলে আমি বুঝতে পারি যে, তুমি আমার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছ এবং যে পরিমাণ সন্তুষ্টি নির্ধারিত করেছ তা ছাড়া এর বাইরে অন্য কিছু আমাকে স্পর্শ করবে না।' তখন আল্লাহ হযরত আদম (আ) এর কাছে ওহী পাঠান এবং বলেন, হে আদম, তুমি আমার কাছে যে প্রার্থনা করেছ আমি তা কবুল করলাম। তোমার সন্তানদের মধ্যেও যদি কেউ আমার কাছে দোয়া করে, আমি তার দুঃখ-পেরেশানী দূর করে দেব। তাকে হারিয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করে, তার অন্তর থেকে অভাব-দারিদ্র্য দূর করে দেব। তার সামনে ধন ও প্রাচুর্যের ফোয়ারা সৃষ্টি করে দেব, প্রত্যেক ব্যবসায়ীর ব্যবসা থেকে তাকে দান করবো এবং সে দুনিয়া না চাইলেও দুনিয়া তার কাছে আসবে। হযরত আদম (আ) এর তওয়াফের পর থেকেই কা'বার তওয়াফের সুন্নাত চালু হয়।'
এই লম্বা হাদীসটির সনদ উত্তম। তবে এটি বনি মাখযুমের গোলাম আবদুল্লাহ বিন আবু সোলায়মান থেকে বর্ণিত মাওকুফ হাদীস। এটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত হাদীস নয়। তবে আল্লামা আযরাকী অন্য সনদের মাধ্যমে এই হাদীসটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন। এই সনদের মধ্যে হাফস বিন সোলায়মান পরিত্যক্ত, এছাড়া অন্য সকল রাবী নির্ভরযোগ্য।
আল ফাকেহী বর্ণনা করেছেন যে, সাঈদ বিন জোবায়ের বলেন, আমি বসরাবাসীদের চেয়ে অন্য কাউকে এই ঘরের প্রতি এত বেশী আসক্ত দেখিনি। তিনি বলেন, বসরা থেকে আগত এক মহিলা কা'বা শরীফে এসে মোলতাযামে দাঁড়ায়, সে দোয়া করে এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে করতে শেষ পর্যন্ত মারা যায়। (১৪)
ফাকেহী আরো উল্লেখ করেছেন যে, মুজাহিদ এক ব্যক্তিকে বাবুল কা'বা এবং হাজারে আসওয়াদের মাঝে দেখে তার কাঁধ কিংবা পিঠের উপর হাত রেখে বলেন, মোলতাযামকে আঁকড়ে ধর। মুজাহিদ আরো বলেন, মোলতাযামে দোয়া করা হয়। এমন মানুষ কমই আছে যে, মোলতাযামে দোয়া ও আশ্রয় চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সবাই পেয়েছে।
📄 মীযাবে কা’বা ও এর নীচে দোয়ার ফজীলেত
নবী করীম (সা) এর জন্মের ৩৫ বছর পর, কোরাইশরা যখন কা'বা শরীফ নির্মাণ করে, তখন তারা কা'বার ছাদ দেয় এবং ছাদের পানি সরার জন্য একটি নল লাগায়। এই নলকেই মীযাব বলা হয়। এর আগে কা'বার ছাদ ছিল না এবং মীযাবও ছিল না। তারপর হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা) কা'বা নির্মাণের সময় ছাদে একটি মীযাব লাগান এবং কোরাইশদের মত তিনিও মীযাবের পানি হিজরে ইসমাঈলে পড়ার ব্যবস্থা করেন। তারপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফও অনুরূপ মীযাব লাগান।
দুই কারণে মীযাবের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। (১) যখন এটি নষ্ট হয়ে যায় তখনই আরেকটি মীযাব লাগানো হয়। (২) বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ও ধনী ব্যক্তিরা কা'বার জন্য মীযাব উপহার পাঠায়। তখন পুরাতনটি খুলে নতুন মীযাব লাগানো হয়। নতুন মীযাবগুলো পূর্বের মীযাবের নকশা এবং ডিজাইন থেকে উন্নত হত এবং অনেকগুলোতে সোনা ও রূপার কারুকার্য করা হত।
১২৭৬ হিজরীতে তুর্কী সুলতান আবদুল মজিদ খান, কনস্টান্টিনোপলে একটি সোনার মীযাব তৈরি করেন এবং সেই বছরই তা কা'বায় লাগান। এতে প্রায় ৫০ রতল সোনা লাগানো হয়েছে। সেটিই সর্বশেষ মীযাব। বর্তমান কাবায় মওজুদ মীযাবটিই সেই মীযাব। এরপরে আজ পর্যন্ত ঐ মীযাবের কোন পরিবর্তন করা হয়নি।
মীযাবের নীচে দোয়া করার ফজীলত সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনদের পক্ষ থেকে অনেক বর্ণনা রয়েছে। আমরা এখানে সে সকল বর্ণনা সম্পর্কে আলোকপাত করবো: আল্লামা আযরাকী আতা থেকে এবং আতা হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, "তোমরা নেক লোকদের নামাযের জায়গায় নামায পড় এবং নেককারদের পানীয় পান কর।" ইবনে আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞেস করা হল, নেক লোকদের নামাযের জায়গা বলতে কোনটাকে বুঝায়? তিনি জবাবে বলেন, 'সেটি হচ্ছে মীযাবের নীচে।' তারপর জিজ্ঞেস করা হল নেককারদের পানীয় কি? তিনি বলেন, 'সেটি হচ্ছে যমযম'।
আযরাকী আ'তার বরাত দিয়ে বলেছেন, মীযাবের নীচে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে সেই দোয়া কবুল হয় এবং দোয়াকারী ব্যক্তি মায়ের পেট থেকে সদ্যপ্রসূত নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়।
সহীহ হাদীসগুলোতে তওয়াফের ফজীলত সম্পর্কে অনেক বর্ণনা এসেছে। মীযাব তওয়াফের বৃহত্তর পরিসরের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, তওয়াফের ফজীলতগুলোও এই বিশেষ জায়গার জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা।