📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 রোকনে ইয়ামানীর তাৎপর্য

📄 রোকনে ইয়ামানীর তাৎপর্য


রোকনে ইয়ামানী কা'বা শীফের একটি সম্মানিত কোণ। এই কোণের অনেক ফজীলত ও মর্যাদা আছে। এর সবচেয়ে বড় মর্যাদা হচ্ছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ হাতে তা স্পর্শ করেছেন। আবু দাউদ শরীফে হযরত উমর থেকে বর্ণিত আছে
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَدَعُ أَنْ يَسْتَلِمَ الرُّكْنَ الْيَمَانِي وَالْحَجَرَ فِي كُلِّ طَوَافِهِ وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ يَفْعَلُهُ . (ابوداؤد والنسائي)
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেক তওয়াফে রোকনে ইয়ামানী এবং হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করা ত্যাগ করতেন না, হযরত ইবনে উমর (রা)ও তাই করতেন।'

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
لَمْ أَرَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَلِمُ غَيْرَ الرُّكْنَيْنِ الْيَمَانَيْنِ .
অর্থ: 'আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে হাজারে আসওয়াদ এবং রোকনে ইয়ামনী ব্যতীত অন্যকিছুকে স্পর্শ কিংবা চুমু দিতে দেখিনি।'

উমাইর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি ইবনে উমরকে বললাম, আপনি হাজারে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করা কিংবা চুমু দেয়ার জন্য কেন ভিড় করেন? আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবীদের মধ্যে কাউকে ভিড়ের মধ্যে এদুটোতে গিয়ে চুমু কিংবা স্পর্শ করতে দেখিনি। ইবনে উমর উত্তর দেন যে, আমি তা এইজন্য করি যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-
إِنَّ اسْتِلَا مَهُمَا يَحُطُ الْخَطَايَا
অর্থ: 'এ দুটোকে স্পর্শ করা বা চুমু দেয়া হলে গুনাহ মাফ হয়।' উমাইরের অপর এক বর্ণনায় এসেছে যে, আবদুল্লাহ বিন উমর ভিড়ের মধ্যে নিজের চেহারাকে রক্তাক্ত করে ফেলেছিলেন। তারপর তিনি উপরোক্ত জবাব দেন।

এইসব হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) রোকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করেছেন এবং এটাই সহীহ সুন্নত। তবে মতভেদ হচ্ছে একে চুমু দেয়ার ব্যাপারে এবং একে চুমু দেয়াটা মশহুর রেওয়ায়েতের খেলাফ। তবে ইবনে হাজার বুখারী শরীফের শরহ-ফতহুল বারীতে উল্লেখ করছেন যে, কারো কারো মতে, এতে চুমু দেয়া মোস্তাহাব।

ইবনে জোহাইরা উল্লেখ করেছেন যে, কারমানী ইমাম আহমদের মত উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি এতে চুমু দিতেন। ( الجامع اللطيف )

এ ব্যাপারে কিছু সহায়ক হাদীস আছে।
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا اسْتَلَمَ الرُّكْنَ الْيَمَانِيُّ قَبْلَهُ - ( رواه البخاري في تاريخه )
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন রোকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করতেন, তখন তিনি এতে চুমু দিতেন।' ইবনুল কাইয়ুম হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের অনুরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সেটি হচ্ছে:
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُ الرُّكْنَ الْيَمَانِيُّ وَيَضَعُ خَدَّهُ علَيْه .
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) রোকনে ইয়ামানীকে চুমু দিতেন এবং এর উপর নিজের গাল রাখতেন।'

হাকেম তাঁর মোসতাদরাকে এই হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন, এখানে 'রোকনে ইয়ামানী' অর্থ হচ্ছে, 'হাজারে আসওয়াদ।' কেননা, হাদীসের পরিভাষায় উভয় রোকনকে এক সাথে, الرُّكْنَانِ الْيَمَانِيَانِ বলা হয়, অর্থাৎ দুই রোকনে ইয়ামানী। অথচ রোকনে ইয়ামানী দুটো নয়, একটি। অপরটি হচ্ছে হাজারে আসওয়াদ। হযরত উমর কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) শুধুমাত্র হাজারে আসওয়াদকেই চুমু দিয়েছেন। এই হাদীসের কারণেই এই ব্যাখ্যা করা হল।

আল্লামা ফাসী শেফাউল গারামে লিখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক রোকনে ইয়ামানীকে চুমু দেয়ার বিষয়টি সহীহভাবে প্রমাণিত নয়।

রোকনে ইয়ামানীর অনেক ফজীলত আছে। এর প্রথম ফজীলত হচ্ছে, এটি হযরত ইবরাহীম (আ) এর প্রতিষ্ঠিত ভিত্তির উপর যথার্থভাবে মওজুদ আছে। রোকনে শামী ও রোকনে ইরাকী হযরত ইবরাহীম (আ) এর ভিত্তির উপর নেই। সে অংশে কাবাকে সংকুচিত করে তৈরি করা হয়েছে।

ফাকেহী হযরত আলীর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন (১৩)
إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِأَبِي هُرَيْرَةَ رَض يَا أَبَا هُرَيْرَةَ إِنَّ عَلَى الرُّكْنِ الْيَمَانِي لَمِلِكًا مُنْذُ خَلَقَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الدُّنْيَا إِلَى يَوْمِ يَرْفَعُ الْبَيْتَ يَقُولُ لِمَنِ اسْتَلَمَ وَأَوْمَا بِيَدِهِ : فَقَالَ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ، قَالَ الْمَلَكُ أَمِينُ - وَتَأْمِينُ الْمَلَائِكَةِ إِجَابَةُ - اسناده ضعيف .
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) আবু হুরায়রা (রা) কে বলেন 'হে আবু হুরায়রা, আল্লাহ যেদিন থেকে দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন সেই দিন থেকে যেদিন এই ঘরকে উঠিয়ে নেবেন, সেই দিন পর্যন্ত রোকনে ইয়ামানীতে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত আছে এবং থাকবে। যে ব্যক্তি এই পাথর স্পর্শ করবে কিংবা এর প্রতি হাত দিয়ে ইশারা করবে এবং বলবে رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ - সেই ফেরেশতাটি আমীন বলবে। ফেরেশতার দোয়া কবুল হয়।

আরেক হাদীসে বলা হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَض أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : وَكَّلَ بِهِ سَبْعُونَ مَلَكًا ، مَنْ قَالَ : اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ، رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وقِنَا عَذَابَ النَّارِ ، قَالَ : امين - رواه ابن ماجة في المناسك واسناده ضعيف .
অর্থ: 'আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, রোকনে ইয়ামানীতে ৭০ জন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়েছে। যে ঐ দোয়াটি পড়বে: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ، رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ -
'ফেরেশতারা আমীন বলবে।'

ইবনে আবিদ দুনিয়া শাবী থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। শাবী বলেছেন, একদিন আমি, আবদুল্লাহ বিন উমর, আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের, মুসআব বিন যোবায়ের এবং আবদুল মালেক বিন মারওয়ান কাবা শরীফের পাশে বসা ছিলাম। আলোচনা শেষে সবাই বলল যে, এখন একজন একজন করে সবাই রোকনে ইয়ামানী স্পর্শ করে নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য দোয়া করবে। আল্লাহ নিজের কুদরত থেকে দান করেন। বলা হল, হে আবদুল্লাহ বিন যোবয়ের! প্রথমে আপনি উঠুন। আপনি হিজরতের পর প্রথম ভূমিষ্ঠ সন্তান। তিনি উঠলেন এবং রোকনে ইয়ামানী স্পর্শ করে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ আপনি মহান, মহান কিছুই আপনার কাছে চাওয়া হয়, আমি আপনার চেহারা, আরশ এবং কা'বার সম্মানের উছিলায় প্রার্থনা করছি, আমাকে হেজাযের ক্ষমতা এবং খেলাফত না দিয়ে মৃত্যু দেবেন না।

তিনি এসে বসলেন তারপর লোকেরা বলল, হে মুস'আব বিন যোবায়ের! এবার আপনি উঠুন। তিনি উঠলেন এবং রোকনে ইয়ামানী ধরে দোয়া করলেন: হে আল্লাহ সবকিছুর প্রতিপালক, সবকিছু আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী, সবকিছুর উপর আপনার বিদ্যমান কুদরতের দোহাই দিয়ে প্রার্থনা জানাই, আমাকে ইরাকের ক্ষমতা দান এবং সোকাইনা বিনত হোসাইনকে বিয়ের আগ পর্যন্ত মৃত্যু দেবেন না।

তিনি এসে বসলেন। তারপর লোকেরা বলল, হে আবদুল মালেক বিন মারওয়ান, এবার আপনি যান। তিনি উঠলেন এবং রোকনে ইয়ামানী স্পর্শ করে দোয়া করলেনঃ হে আল্লাহ, আপনি সাত আসমান ও যমীনের প্রতিপালক, আপনার আদেশের অনুগত লোকেরা যা দোয়া করে আমিও তাই চাচ্ছি, আমি আপনার চেহারার সম্মান, সমস্ত সৃষ্টির উপর আপনার অধিকার এবং বাইতুল্লাহর তওয়াফকারীদের অধিকারের দোহাই দিয়ে প্রার্থনা করি; আমাকে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের ক্ষমতাদানের আগে মৃত্যু দেবেন না। কেউ এর বিরোধিতা করলে শিরচ্ছেদের পর তার মাথা যেন আমার কাছে হাজির করা হয়। তিনি আসলেন এবং বসলেন।

লোকেরা বলল, হে আবদুল্লাহ বিন উমর, আপনি উঠুন। তিনি উঠলেন এবং রোকনে ইয়ামানী স্পর্শ করে দোয়া করলেন: হে আল্লাহ, আপনি মেহেরবান, দয়ালু। আমি আপনার গযবের উপর বিজয়ী রহমত কামনা করি; সমস্ত সৃষ্টির উপর আপনার অধিকারের দোহাই দিয়ে প্রার্থনা করি, বেহেশত ওয়াজিব করার আগে আমাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করবেন না। শা'বী বলেছেন, আমি দুনিয়াতে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আগে দেখেছি, উপরোক্ত ব্যক্তিরা যে যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। এমন কি, আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) কে বেহেশতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এবং তাঁকে বেহেশতও দেখানো হয়েছে। শা'বী বলেছেন, এটি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। )شفاء الْغَرام(

আযরাকী তাঁর 'আখবারে মক্কা' বইতে লিখেছেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা) যখনই রোকনে ইয়ামানীর কাছ দিয়ে অতিক্রম করেছেন, তখনই একজন ফেরেশতা তাঁকে ডেকে বলেছে: 'হে মুহাম্মদ, স্পর্শ কর।' হাদীসটির সনদ দুর্বল। আযরাকী আরেকটি দুর্বল আছার উল্লেখ করে বলেছেন যে, হোসাইন মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, 'যে ব্যক্তি রোকনে ইয়ামনীতে হাত রেখে দোয়া করে তার দোয়া কবুল হয়। হোসাইন প্রস্তাব করল, হে আবুল হাজ্জাজ (মুজাহিদ), আমাদেরকে নিয়ে সেখানে দোয়া করুন; পরে আমরা সকলে দোয়া করলাম।' মুজাহিদ ছিলেন প্রখ্যাত তাবেয়ী' এবং সুযোগ্য জ্ঞান ও মর্যাদার অধিকারী। এই একই সনদে মুজাহিদের আরেকটি বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: আমি জানতে পেরেছি যে, রোকনে ইয়ামানী এবং হাজারে আসওয়াদের মাঝখানে ৭০ হাজার ফেরেশতা মওজুদ রয়েছে। কা'বা শরীফ সৃষ্টির পর থেকে এযাবত ঐ ফেরেশতারা কখনও ঐ জায়গা ত্যাগ করে না।' কিন্তু এর সমর্থনে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের আগে বর্ণিত হাদীসটিও সহায়ক।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেছেন:
عَلَى الرُّكْنِ الْيَمَانِي مُؤَكَلَانِ يُؤَمِّنَانِ عَلَى دُعَاءِ مَنْ يَمُرُّ بِهِمَا وَأَنَّ عَلَى الأَسْوَدَ مَالاً يُحصى - ) رواه الازرقي وسنده جيد)
অর্থ: 'রোকনে ইয়ামানীতে দু'জন ফেরেশতা আছেন। তাঁরা দোয়াকারীদের জন্য আমীন বলেন এবং হাজারে আসওয়াদে আছে অগণিত ফেরেশতা।'

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, দু' রোকন অর্থাৎ হাজারে আসওয়াদ এবং রোকনে ইয়ামানীর মাঝখানে একটি কূপ আছে এবং এর উপর ৭০ হাজার ফেরেশতা আছে। দোয়াকারীদের জন্য তারা আমীন বলে। কেউ দোয়া করতে ভুলে গেলে তারা বলে, 'হে আল্লাহ এই ব্যক্তিকে মাফ কর।'
) رواه عبد الرزاق في مصنفه وسنده ضعيف )

উপরোক্ত হাদীসগুলোর সনদ দুর্বল হলেও সেগুলো মিথ্যা হাদীস নয়। মোটকথা, অনেকগুলো সহীহ ও দুর্বল হাদীস দ্বারা বর্ণিত রোকনে ইয়ামানীর ফজীলত এর মর্যাদার প্রমাণ। তবে এই সকল হাদীসে যেসব বৈপরীত্য আছে সেগুলো অনুধাবন করা দরকার। একবার এক ফেরেশতা, একবার ২ ফেরেশতা, একবার ৭০ ফেরেশতা, আরেকবার ৭০ হাজার ফেরেশতা মওজুদের বর্ণনায় বৈপিরীত্য রয়েছে। বহু আলেম ঐ বৈপিরীত্য দূর করার চেষ্টা করে গেছেন। এ প্রসঙ্গে শেখ মুহাম্মদ বিন আলান সিদ্দিকী তাঁর মুশীর সুওকুল আনাম ইলা হাজ্জে বাইতুল্লাহ আল হারাম বইতে যা লিখেছেন তার সার-সংক্ষেপ হল, দুই ফেরেশতা সাধারণভাবে সকল দোয়া, ৭০ জন ফেরেশতা-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَة ....... الخ .
এই দোয়া এবং একজন ফেরেশতা শুধু رَبَّنَا اتَنَا...الخ এই দোয়ার আমীন বলে। সম্ভবতঃ ৭০ হাজার ফেরেশতাও বিশেষ দোয়ায় অংশ নেয়।

রোকনে ইয়ামানীর আরেকটা বিশেষ ফজীলত আছে। তবে এটি বেশী মশহুর নয়। সেটি হচ্ছে, রোকনে ইয়ামানী কিয়ামতের দিন, তাকে যারা স্পর্শ করছে তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। কিছু সংখ্যক বর্ণনায় এর সমর্থন পাওয়া যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, আল্লাহ কিয়ামতের দিন হাজারে আসওয়াদ এবং রোকনে ইয়ামানীকে দুই চোখ, দুই জিহ্বা ও দুই ঠোঁট সহকারে উঠাবেন তারা তাদের গায়ে চুমুদানকারী ও স্পর্শকারীদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। (رواه الطبراني في الكبير)

হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আ'স থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
يَأْتِي الرُّكْنُ الْيَمَانِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْظَمَ مِنْ أَبِي قُبَيْسَ لَهُ لِسَانَانِ وَشَفَتَانِ - ) رواه أحمد باسناد حسن والطبراني في الاوسط )
অর্থঃ 'কিয়ামতের দিন রোকনে ইয়ামানী আবু কোবাইস পাহাড়ের চেয়েও আরো বড় আকৃতিতে উপস্থিত হবে; এর দু'টো জিহ্বা ও ঠোঁট থাকবে।'

ইবনে জোহাইরা শা'বী থেকে উপরে বর্ণিত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের, তাঁর ভাই মুসআব, আবদুল মালেক বিন মাওয়ান এবং আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) এর কা'বার পাশে বসা সংক্রান্ত ঘটনাটি সামান্য পার্থক্য সহকারে বর্ণনা করেছেন। তিনি সবশেষে, হযরত আবদুল্লাহ বিন উমরের বেহেশতের সুসংবাদের প্রশ্নের ব্যাপারে সুন্দর ২টি জবাব দিয়েছেন। ১ম জবাবটি হচ্ছে: তিনি বুখারী শরীফের একটি হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন যে, ইবনে উমর শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অপরদিকে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, مَنِ ابْتُلِىَ بِذلِكَ بِالْجَنَّةِ এইটা দ্বারা পরীক্ষিত লোকেরা জান্নাতে যাবে।'

২য় জবাবটি হচ্ছে: বাকী তিনজনের দোয়া যখন কবুল হয়েছে তখন আবদুল্লাহ বিন উমরের দোয়া কবুল হওয়া আরো বেশী প্রণিধানযোগ্য। কেননা, তিনি আল্লাহর দান ও রহমত পাওয়ার বেশী যোগ্য ছিলেন। তিনি আমল ও তাকওয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ ছিলেন। তাঁর বেহেশতের সুসংবাদ লাভের ব্যাপারে এ দু'টো প্রমাণই যথেষ্ট।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রোকনে শামী ও রোকনে ইরাকীকে স্পর্শ করা বা চুমু দেয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম ঐ দু'টো রোকনকেও স্পর্শ করতেন। বুখারী শরীফে এসেছে যে, হযরত মুয়াওয়িয়া (রা) রোকনে শামী ও রোকনে ইরাকীকে স্পর্শ করতেন। ফাকেহী আবুত্ তোফায়েল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হযরত মুয়াওয়িয়া (রা) কে সব রোকন বা কোণ স্পর্শ করতে দেখেছেন।

আবি শা'বা বর্ণনা করেছেন যে, আমি হাসান এবং হোসাইন (রা) কে কাবা শরীফের সকল কোণে চুমু দিতে বা স্পর্শ করতে দেখেছি। হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) তওয়াফের সময় সকল কোণ স্পর্শ করতেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরও (রা) সকল কোণ স্পর্শ করতেন।

তবে রাসূলুল্লাহ (সা) রোকনে শামী এবং রোকনে ইরাকীকে স্পর্শ করেননি কিংবা চুমুও দেননি। সম্ভবতঃ এর প্রধান কারণ হচ্ছে এই কোণ দু'টি হযরত ইবরাহীম (আ) এর মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কোরাইশরা ঐ অংশে কাবা শরীফকে সংকুচিত করে তৈরি করেছে। এ ছাড়াও সে কোণগুলোর কোন ফজীলত পৃথকভাবে বর্ণিত হয়নি। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর সঠিক আনুগত্য ও অনুসরণ করার করণেই এ কোণ দু'টি স্পর্শ করা কিংবা চুমু দেয়া ঠিক নয়।

এ প্রসঙ্গে ইয়ালী বিন উমাইয়া তাঁর বাপের এক ঘটনা উল্লেখ করেন। উমাইয়া বলেন, আমি হযরত উমর বিন খাত্তাবের সাথে তওয়াফ করেছি। তিনি হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করেন। তারপর তওয়াফের সময় রোকনে ইরাকীর কাছে গেলে আমি একে স্পর্শ করতে চাইলাম। তখন উমর (রা) বললেন, তুমি কি করতে চাও? আমি বললাম, আপনি কি একে স্পর্শ করবেন না? তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে তওয়াফ করনি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি প্রশ্ন করলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কি ঐ কোণ দু'টিকে স্পর্শ করেছেন কিংবা চুমু দিয়েছেন? আমি বললাম, না। তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহর জীবনে কি তোমার জন্য উত্তম আদর্শ নিহিত নেই? আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সেই আদর্শকেই বাস্তবায়ন কর।

হযরত ইবনে উমর রোকনে শামীকে স্পর্শ করেছেন মর্মে যে বর্ণনা এসেছে সে প্রসঙ্গে নাফে'কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, আমরা তাঁকে মাত্র ১ বারই দেখেছি যে তিনি একে স্পর্শ করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরে আবার হাত গুটিয়ে আনেন। তারপর বলেন, আস্তাগফিরুল্লাহ, আমি ভুল করেছি। (ফাকেহী; আখবারে মক্কা)

আবুত্ তোফায়েল বলেন যে, একবার আমি ইবনে আব্বাস এবং মুয়াওয়িয়া (রা) এর সাথে ছিলাম। মুয়াওয়িয়া (রা) তওয়াফের সময় যখনই কোন কোণে যেতেন তখনই সেটাকে স্পর্শ করতেন। তখন ইবনে আব্বাস (রা) তাঁকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) রোকনে ইয়ামানী এবং হাজারে আসওয়াদ ব্যতীত আর কোন রোকনকে স্পর্শ করেননি কিংবা চুমুও দেননি।

তখন মুয়াওয়িয়া (রা) বলেন, আল্লাহর ঘরের কোন অংশই পরিত্যজ্য নয়। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস এক ব্যক্তিকে রোকনে শামী এবং ইরাকীকে স্পর্শ করতে দেখে বলেন, তুমি কেন এই রোকন দু'টিকে স্পর্শ করছ? সেই ব্যক্তি জবাবে বলল, আল্লাহর ঘরের কোন অংশ পরিত্যজ্য নয়। তখন ইবনে আব্বাস (রা) বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
'রাসূলুল্লাহ (সা) এর জীবনে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও ঐ রোকন দু'টোকে স্পর্শ করেননি। তখন ঐ ব্যক্তি ঐ রোকন দু'টি স্পর্শ করা থেকে বিরত হল।

ইমাম শাফেয়ী (রা) 'আল্লাহর ঘরের কোন অংশ পরিত্যজ্য নয়'- এই প্রসঙ্গে বলেন, আমরা আল্লাহর ঘরকে পরিত্যজ্য করার উদ্দেশ্যে ঐ রোকন দু'টো স্পর্শ থেকে বিরত হইনি। আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করলে কোন অংশকে ত্যাগ করা হয় না, এবং তা পরিত্যজ্যও হয় না। আমরা সুন্নাহর অনুসরণ করার উদ্দেশ্যেই ঐ দুটো রোকনের স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকি। যদি ঐ দু'টো রোকনকে স্পর্শ না করার নাম পরিত্যাগ হয় তাহলে, দুই রাকনের মধ্যবর্তী স্থানগুলোও পরিত্যজ্য বলে বিবেচিত হবে? কেননা, সেগুলোকেও তো স্পর্শ করা হয় না। অথচ এটা কারোর প্রশ্ন বা বক্তব্যের বিষয় নয়।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মোলতাযামের তাৎপর্য

📄 মোলতাযামের তাৎপর্য


মোলতাযাম হচ্ছে হাজারে আসওয়াদ এবং কা'বার দরজার মধ্যবর্তী দেয়ালের স্থানটুকুর নাম। এটাই হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এর মত। এর অপর নাম হচ্ছে اَلْمُدَّعًا দোয়ার জায়গা এবং الْمُتَعَوَّذ আশ্রয় প্রার্থনার স্থান। (আযরাকী, শেফাউল গারাম এবং আল-জামে' আল-লতীফ)। মোলতাযাম শব্দের অর্থ হচ্ছে 'আঁকড়ে ধরার স্থান।' লোকেরা এটাকে আঁকড়ে ধরে দোয়া করে বলে এর নাম হচ্ছে মোলতাযাম এর ফজীলত অনেক বেশী। যে সকল জায়গায় দোয়া কবুল হয় এটি তার অন্যতম।

হাদীস দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের চেহারা, বুক, দুই হাত ও দুই কজা দিয়ে এটিকে আঁকড়ে ধরে দোয়া করেছেন।

হযরত আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কা বিজয়ের দিন আমি বললাম যে, আমি আমার পোশাক পরবো। আমার ঘরও ছিল রাস্তার উপর। তারপর আমি চললাম। তখন দেখলাম নবী করীম (সা) এবং সাহাবায়ে কেরাম কা'বা শরীফ থেকে বের হন এবং কা'বার দরজা থেকে হাতীম পর্যন্ত দেয়াল স্পর্শ করেন। তারা কা'বার দরজায় নিজেদের গাল বিছিয়ে দেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) সবার মাঝে অবস্থান করছিলেন। (আবু দাউদ) এই হাদীসের সনদে ইয়াজিদ বিন আবি জিয়াদ নির্ভরযোগ্য এবং প্রমাণযোগ্য রাবী নন।

বজলুল মাজহুদ কিতাবে উল্লেখ আছে যে, মুসনাদে আহমদ বর্ণিত হাদীসে, হযরত আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে হাজারে আসওয়াদ এবং বাবুল কা'বার মাঝখানে দেয়াল আঁকড়ে থাকতে এবং অন্যান্যদেরকে বাইতুল্লাহর বিভিন্ন অংশ আঁকড়ে ধরতে দেখেছি।

ইবনে মাজাহ হযরত আমর বিন আ'স থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আমর বিন আস মোলতাযাম আঁকড়ে ধরে দোয়া করেছেন এবং বলেছেন, আল্লাহর কসম, এটি সেই জায়গা যেখানে আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে আঁকড়ে ধরে দোয়া করতে দেখেছি।

আবু দাউদের এক বর্ণনায় এসেছে যে, আবদুল্লাহ কা'বার তওয়াফ করেন, হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করেন, পরে হাজারে আসওয়াদ এবং কা'বার দরজার মাঝখানে দাঁড়ান এবং নিজের বুক, কপাল, দুই হাত ও কবজি এইরূপ করেন। এই বলে তিনি নিজে এগুলো বিছিয়ে দেন এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুরূপ করতে দেখেছি।

হযরত ইবনে উমর নিজের বুক ও কপাল মোলতাযামে লাগিয়ে দোয়া করতেন। বাবুল কা'বা এবং হাজারে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানটুকুই হচ্ছে মোলতাযাম।

তবে, হযরত আবদুর রহমান বিন সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরামকে হাতীম পর্যন্ত বাইতুল্লাহকে আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে যা বলেছেন, তার জবাব হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মোলতাযামে দাঁড়িয়েই দোয়া করেছেন। তবে সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা বেশী হওয়ায় এবং মোলতাযামে সবাইর সংকুলান না হওয়ায় কিছু সংখ্যক তো মোলতাযামেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আর অবশিষ্টরা হাতীম পর্যন্ত বাইতুল্লাহকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মোলতাযাম দোয়া কবুলের একটি পরীক্ষিত জায়গা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ يَقُولُ الْمُلْتَزَمُ مَوْضَعُ يَسْتَجَابُ فِيْهِ الدُّعَاءُ - مَا دَعَا اللَّهِ فِيْهِ عَبْدٌ دَعْوَةً إِلا اسْتَجَابَهَا
অর্থ: 'মোলতাযাম হচ্ছে দোয়া কবুলের জায়গা। কোন বান্দাহ এখানে দোয়া করলে, তা অবশ্যই কবুল হয়।'

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহর কসম এই হাদীস শুনার পর যখনই আমি মোলতাযামে দোয়া করেছি তখনই আমার দোয়া কবুল হয়েছে। হযরত আমর বিন আস (রা) বলেন, যখন ইবনে আব্বাস থেকে এই হাদীস শুনেছি তখন থেকেই কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে মোলতাযামে গিয়ে দোয়া করার পর আল্লাহ সে সকল দোয়া কবুল করেছেন এবং সমস্যাগুলো দূর করে দিয়েছেন। এই হাদীসের সনদের রাবী সুফিয়ান এবং হোমাইদীও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। এ ছাড়াও এখন পর্যন্ত বহু লোক মোলতাযামে দাঁড়িয়ে দোয়া করার পর তাদের দোয়া কবুল হতে দেখেছেন।

কাজী আ'য়াদ তাঁর শাফা গ্রন্থে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বইতে বর্ণিত হাদীসের ভাষা হল- سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا دَعَا أَحَدٌ بِشَنِّي فِي هُذَا الْمُلْتَزَمَ إِلا اسْتُجِيبَ لَهُ .
অর্থ : এই মোলতাযামে দাঁড়িয়ে কেউ আল্লাহর কাছে দোয়া করলে, তাঁর দোয়া অবশ্যই কবুল হবে।' তারপর কাজী আ'য়াদ বলেন, আমি এবং এই হাদীসের সকল রাবী এই হাদীসটি শুনার পর মোলতাযামে গিয়ে দোয়া করায় আমাদের সবার দোয়া কবুল হয়েছে।

আযরাকী মোলতাযামের ফজীলত বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, হযরত আদম (আ) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আসার পর সাতবার বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেন এবং বাবুল কা'বার সামনে দু' রাকাত নামায পড়েন। পরে মোলতাযামে এসে এই প্রার্থনা করেন: اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ سَرِيرَتِي وَعَلَا نِيَتِي فَاقْبَلْ مَعْذِرَتِي وَتَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَمَا عِنْدِى فَاغْفِرْ لِي ذُنُونِي وَتَعْلَمُ حَاجَتِي فَأَعْطِنِي سُؤْلِي . اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيْمَانًا يُبَاشِرُ قَلْبِي وَيَقِينَا صَادِقًا حَتَّى أَعَلَّمَ أَنَّهُ لَنْ يُصِيبَنِي إِلا مَا كُتِبَتْ لِي وَالرِّضَاءُ بِمَا قَضَيْتَ عَلَى .
অর্থ : 'হে আল্লাহ তুমি আমার প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জান। আমার ওজর আপত্তি কবুল কর, তুমি আমার দেহ ও অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সুতরাং আমার গুনাহ মাফ কর। তুমি আমার প্রয়োজন জান, তাই আমার প্রার্থনা পূরণ কর। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে অন্তর আবাদকারী ঈমান এবং সত্য ও মজবুত বিশ্বাস কামনা করি, যেন এর ফলে আমি বুঝতে পারি যে, তুমি আমার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছ এবং যে পরিমাণ সন্তুষ্টি নির্ধারিত করেছ তা ছাড়া এর বাইরে অন্য কিছু আমাকে স্পর্শ করবে না।' তখন আল্লাহ হযরত আদম (আ) এর কাছে ওহী পাঠান এবং বলেন, হে আদম, তুমি আমার কাছে যে প্রার্থনা করেছ আমি তা কবুল করলাম। তোমার সন্তানদের মধ্যেও যদি কেউ আমার কাছে দোয়া করে, আমি তার দুঃখ-পেরেশানী দূর করে দেব। তাকে হারিয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করে, তার অন্তর থেকে অভাব-দারিদ্র্য দূর করে দেব। তার সামনে ধন ও প্রাচুর্যের ফোয়ারা সৃষ্টি করে দেব, প্রত্যেক ব্যবসায়ীর ব্যবসা থেকে তাকে দান করবো এবং সে দুনিয়া না চাইলেও দুনিয়া তার কাছে আসবে। হযরত আদম (আ) এর তওয়াফের পর থেকেই কা'বার তওয়াফের সুন্নাত চালু হয়।'

এই লম্বা হাদীসটির সনদ উত্তম। তবে এটি বনি মাখযুমের গোলাম আবদুল্লাহ বিন আবু সোলায়মান থেকে বর্ণিত মাওকুফ হাদীস। এটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত হাদীস নয়। তবে আল্লামা আযরাকী অন্য সনদের মাধ্যমে এই হাদীসটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন। এই সনদের মধ্যে হাফস বিন সোলায়মান পরিত্যক্ত, এছাড়া অন্য সকল রাবী নির্ভরযোগ্য।

আল ফাকেহী বর্ণনা করেছেন যে, সাঈদ বিন জোবায়ের বলেন, আমি বসরাবাসীদের চেয়ে অন্য কাউকে এই ঘরের প্রতি এত বেশী আসক্ত দেখিনি। তিনি বলেন, বসরা থেকে আগত এক মহিলা কা'বা শরীফে এসে মোলতাযামে দাঁড়ায়, সে দোয়া করে এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে করতে শেষ পর্যন্ত মারা যায়। (১৪)

ফাকেহী আরো উল্লেখ করেছেন যে, মুজাহিদ এক ব্যক্তিকে বাবুল কা'বা এবং হাজারে আসওয়াদের মাঝে দেখে তার কাঁধ কিংবা পিঠের উপর হাত রেখে বলেন, মোলতাযামকে আঁকড়ে ধর। মুজাহিদ আরো বলেন, মোলতাযামে দোয়া করা হয়। এমন মানুষ কমই আছে যে, মোলতাযামে দোয়া ও আশ্রয় চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সবাই পেয়েছে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মীযাবে কা’বা ও এর নীচে দোয়ার ফজীলেত

📄 মীযাবে কা’বা ও এর নীচে দোয়ার ফজীলেত


নবী করীম (সা) এর জন্মের ৩৫ বছর পর, কোরাইশরা যখন কা'বা শরীফ নির্মাণ করে, তখন তারা কা'বার ছাদ দেয় এবং ছাদের পানি সরার জন্য একটি নল লাগায়। এই নলকেই মীযাব বলা হয়। এর আগে কা'বার ছাদ ছিল না এবং মীযাবও ছিল না। তারপর হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা) কা'বা নির্মাণের সময় ছাদে একটি মীযাব লাগান এবং কোরাইশদের মত তিনিও মীযাবের পানি হিজরে ইসমাঈলে পড়ার ব্যবস্থা করেন। তারপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফও অনুরূপ মীযাব লাগান।

দুই কারণে মীযাবের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। (১) যখন এটি নষ্ট হয়ে যায় তখনই আরেকটি মীযাব লাগানো হয়। (২) বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ও ধনী ব্যক্তিরা কা'বার জন্য মীযাব উপহার পাঠায়। তখন পুরাতনটি খুলে নতুন মীযাব লাগানো হয়। নতুন মীযাবগুলো পূর্বের মীযাবের নকশা এবং ডিজাইন থেকে উন্নত হত এবং অনেকগুলোতে সোনা ও রূপার কারুকার্য করা হত।

১২৭৬ হিজরীতে তুর্কী সুলতান আবদুল মজিদ খান, কনস্টান্টিনোপলে একটি সোনার মীযাব তৈরি করেন এবং সেই বছরই তা কা'বায় লাগান। এতে প্রায় ৫০ রতল সোনা লাগানো হয়েছে। সেটিই সর্বশেষ মীযাব। বর্তমান কাবায় মওজুদ মীযাবটিই সেই মীযাব। এরপরে আজ পর্যন্ত ঐ মীযাবের কোন পরিবর্তন করা হয়নি।

মীযাবের নীচে দোয়া করার ফজীলত সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনদের পক্ষ থেকে অনেক বর্ণনা রয়েছে। আমরা এখানে সে সকল বর্ণনা সম্পর্কে আলোকপাত করবো: আল্লামা আযরাকী আতা থেকে এবং আতা হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, "তোমরা নেক লোকদের নামাযের জায়গায় নামায পড় এবং নেককারদের পানীয় পান কর।" ইবনে আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞেস করা হল, নেক লোকদের নামাযের জায়গা বলতে কোনটাকে বুঝায়? তিনি জবাবে বলেন, 'সেটি হচ্ছে মীযাবের নীচে।' তারপর জিজ্ঞেস করা হল নেককারদের পানীয় কি? তিনি বলেন, 'সেটি হচ্ছে যমযম'।

আযরাকী আ'তার বরাত দিয়ে বলেছেন, মীযাবের নীচে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে সেই দোয়া কবুল হয় এবং দোয়াকারী ব্যক্তি মায়ের পেট থেকে সদ্যপ্রসূত নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়।

সহীহ হাদীসগুলোতে তওয়াফের ফজীলত সম্পর্কে অনেক বর্ণনা এসেছে। মীযাব তওয়াফের বৃহত্তর পরিসরের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, তওয়াফের ফজীলতগুলোও এই বিশেষ জায়গার জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00