📄 হাজারে আসওয়াদের আকৃতি ও অবস্থান
হাজারে আসওয়াদ কাবা শরীফের পূর্বকোণে মাতাফ থেকে দেড় মিটার উপরে অবস্থিত। আজকে আমরা যে হাজারে আসওয়াদকে চুমু দিচ্ছি কিংবা হাতে স্পর্শ করছি তা তার আগের আকৃতি ও অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। হাজারে আসওয়াদের বর্তমানে আটটি টুকরো দৃশ্যমান। বাকী অংশগুলো দেখা যায় না। প্রতিটি টুকরো বিভিন্ন আকারের। বড় টুকরাটি খেজুরের সমান। হাজারে আসওয়াদের উপর পূর্বের জালেম শাসকদের আগ্রাসনের কারণে তা ভেঙ্গে গেছে। আগে তা একটি মাত্র পাথরই ছিল।
ঐতিহাসিক কুর্দী তাঁর আল কাওয়ীম গ্রন্থে লিখেছেন যে, হিজরী চৌদ্দ শতকের শুরুতে হাজারে আসওয়াদের মোট ১৫টি টুকরা দৃশ্যমান ছিল। হাজারে আসওয়াদের ফ্রেম সংস্কারের সময় ভেতরের চুনার ভেতর এর কয়েকটি টুকরো ঢুকে গেছে। কেননা, ঐ চুনার মাধ্যমে হাজারে আসওয়াদের টুকরোগুলোকে বসানো হয়েছে। সর্বদা এর উপর আতর ও অন্যান্য সুগন্ধি মাখার কারণে এর কাল রং আরো বেড়ে গেছে। ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই হাজারে আসওয়াদের অবশিষ্টাংশ কাবা শরীফের দেয়ালের ভেতরে ছিল। এর সামান্য কয়েকটি টুকরোই বর্তমানে গোচরীভূত হয়। সেই টুকরোগুলোও চুনার ভেতরে বসানো। সেই দৃশ্যমান টুকরোগুলো রূপার গোলাকার মোটা ফ্রেমের ভেতরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে পাথরে চুমু দিতে হয়।
হাজারে আসওয়াদ পাথরটি কত বড় তা জানার আগ্রহ সবার। এ ব্যাপারে - الأشاعة لاشراط الساعة عند الكلام على القرامطة বইতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হিজরী ৩১৭ সালে, মুহাম্মদ বিন নাফে' আল-খোযায়ী হাজারে আসওয়াদকে দেয়াল থেকে খোলা অবস্থায় দেখেছেন। তিনি বলেছেন, হাজারে আসওয়াদের মাথায় শুধু কাল রং এবং অবশিষ্টাংশের রং হচ্ছে সাদা। পাথরটির দৈর্ঘ্য এক গজ।
হোসাইন বিন আবদুল্লাহ বা সালামাহ তাঁর 'তারীখে কাবা' গ্রন্থে লিখেছেন যে, হিজরী ১০৪০ সালে সুলতান মুরাদের কাবা সংস্কারের সময় ইবনে আলান নিজ চোখে হাজারে আসওয়াদকে দেখেছেন। তিনি হাজারে আসওয়াদের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে বলেছেন যে, তা 'কর্মগজে আধাগজ' এবং প্রস্থ হচ্ছে একগজের তিনভাগের এক ভাগ। কোন কোন দিকে এর কিছু অংশ এক কীরাত পরিমাণ ক্ষয় হয়েছে। এটি ৪ কীরাত পরিমাণ পুরো বা মোটা। এর উপর রূপার কয়েকটি বেষ্টনী রয়েছে। একটি গোলাকার বেষ্টনী হচ্ছে কাবার দরজার দিক থেকে। এর ফলে হাজারে আসওয়াদের উপরিভাগ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় ঐ অংশ আর দেখা যায় না। এ বেষ্টনীটি রোকনে ইয়ামানীর দিকে হাজারে আসওয়াদের মাঝামাঝি পর্যন্ত শেষ হয়েছে। এর উপর আবার রূপার দুটো বেষ্টনী আছে। বিপরীত দিক থেকে এগুলো প্রস্থকে বেষ্টন করে আছে। কিন্তু ১২৬৮ হিজরীতে সুলতান আবদুল হামিদ হাজারে আসওয়াদকে স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে দেন। এরপর ১২৮১ হিজরীতে সুলতান আব্দুল আযীয খান রূপা দিয়ে তা মুড়িয়ে দেন। সবশেষে ১৩৬৬ হিজরীতে হাজারে আসওয়াদের ফ্রেমের সংস্কার করা হয় এবং তা এখন পর্যন্ত বহাল আছে।
হাজারে আসওয়াদের উপর বর্তমানে রূপার তৈরি গোলাকার একটি মোটা বেষ্টনী আছে। পাথরটির চতুর্দিকে ঐ বেষ্টনীটি পাথরকে হেফাজত করছে। এর ভেতর হাজারে আসওয়াদের টুকরোগুলো বিদ্যমান। বেষ্টনীর কারণে পাথরটি একটু ভেতরে। অর্থাৎ বেষ্টনী মোটা হওয়ার কারণে পাথর কিছুটা ভেতরে। পুরো মুখমণ্ডল ভেতরে ঢুকিয়ে চুমু দিতে হয়। পাথরের টুকরোগুলো চুনার মাধ্যমে বসানো হয়েছে। বর্তমানে পাথর ও চুনার রং সম্পূর্ণ কাল।
📄 হাজারে আসওয়াদের রং
বহু সংখ্যক হাদীস ও ইসলামের ইতিহাসসমূহে হাজারে আসওয়াদের রং সাদা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। "হাজারে আসওয়াদ" শব্দের অভিধানিক অর্থ হল কালপাথর কিন্তু তা প্রথমে কাল ছিল না। পরে কাল হয়েছে। এ প্রসঙ্গে, মুসনাদে আহমদে বলা হয়েছে أَبْيَضُ مِنَ الثَّلْجِ অর্থ : 'পাথরটি বরফ থেকেও সাদা। আল্লামা আযরাকীর 'আখবারে মক্কা' বইতে বলা হয়েছে: أَبْيَضُ كَانُهُ الْفَضْةُ : 'রূপার মত সাদা'। তিরমিযী শরীফে বলা হয়েছে: أَشَدُّ بَيَاضًا مِّنَ اللَّبَنِ . 'দুধের চেয়েও সাদা'। আল্লামা ফাকেহীর اخبار مكة বইতে বলা হয়েছে: أَشَدُّ بَيَاضًا مِّنَ الثَّلْجِ অর্থ : বরফের চেয়েও বেশী সাদা এবং ধবধবে।'
পাথর যদি সাদা হয়ে থাকে তাহলে, তাকে 'হাজারে আবইয়াদ' না বলে 'হাজারে আসওয়াদ' বলা হয় কেন? আবইয়াদ শব্দের অর্থ হচ্ছে সাদা। এর জবাব স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই দিয়েছেন। তিরমিযী শরীফের বর্ণিত এক হাদীসে তিনি বলেছেন:
وَهُوَ انَّ خَطَايَا بَنِي أَدَمَ هِيَ الَّتِي سَوْدَتْهُ .
তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হাদীসটির অর্থ হচ্ছে 'আদম সন্তানের গুনাহই পাথরটিকে কাল করে দিয়েছে।' বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাতা আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, এই হাদীসের সমর্থনে দ্বিতীয় কোন রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না। আল্লামা ফাকেহী ইবনে আব্বাসের সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
الْحَجَرُ الأَسْوَدُ مِنَ الْجَنَّةِ وَكَانَ أَشَدَّ بَيَاضًا مِّنَ الثَّلْجِ حَتَّى سَوَّدَتْهُ خَطَايَا أَهْلِ الشِّرْكِ
অর্থ: 'হাজারে আসওয়াদ বেহেশতের একটি পাথর। এটি বরফের চেয়েও সাদা ধবধবে ছিল। কিন্তু মোশরেকদের গুনাহ একে কাল করে দিয়েছে।' নাসাঈ এবং ইবনে খোযায়মাও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিরমিযী শরীফেও এটিকে বর্ণনা করে হাসান বলা হয়েছে। এই সাদা পাথরটির কাল হওয়া সম্পর্কে আরো অনেক বক্তব্য পেশ করা হয়। কিন্তু সহীহ হাদীসে এর যে কারণ বর্ণিত হয়েছে তাই বেশী গ্রহণযোগ্য।
কিছু ঐতিহাসিক আগের কিছু সংখ্যক উলামার বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, তাঁরা নিজ চোখে হাজারে আসওয়াদের মধ্যে সাদা রং দেখেছেন। আল্লামা ইযযুদ্দিন বিন জামাআহ ৭০৮ হিজরীতে বলেছেন যে, আমি হাজারে আসওয়াদের মধ্যে একটি সাদা ফোটা দেখতে পেয়েছি এবং তা সকলেরই দেখার কথা। তারপর সেই সাদা ফোটাটি ক্রমান্বয়ে এবং পরিষ্কারভাবে হ্রাস পেতে থাকে। আল্লামা ইবনে খলীল তাঁর المنسك الكبير বইতে লিখেছেন যে, তিনি হাজারে আসওয়াদের মাথার মধ্যে কাবার দরজা সংলগ্ন দিকে পরিষ্কার তিনটি সাদা জায়গা দেখেছেন। এর মধ্যে বড়টি হচ্ছে বড় ভূট্টার দানার মত। তিনি বলেন, তারপর আমি ঐ সাদা অংশগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখি এবং দেখি যে, সেগুলো সর্বদা হ্রাস পাচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, পাথরের মাথা তথা উপরিভাগের রংটুকুই কাল। গোটা পাথরের ঐ মাথাটুকুই লোকদের জন্য দৃশ্যমান। অবশিষ্টাংশ তো দেয়ালের ভেতরেই ঢুকে আছে। কিন্তু সেই অংশটুকু যে সাদা সে ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ রয়েছে। মুহাম্মদ বিন নাফে আল খোযায়ী' স্বচক্ষে হাজারে আসওয়াদকে দেয়াল থেকে খোলা অবস্থায় দেখেছেন। তিনি ভাল করে লক্ষ্য করেছেন এবং বলেছেন যে, এর উপরিভাগ তথা মাথাটুকুই কাল এবং বাকী অংশ সাদা।
আমরা আগেও উল্লেখ করেছি যে, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হাসান আবদুল্লাহ বাসালামাহ তাঁর 'তারীখুল কা'বা' বইতে লিখেছেন যে, ১০৪০ হিজরীতে সুলতান মুরাদ খানের কাবা সংস্কারের সময় আল্লামা মুহাম্মদ বিন আলী বিন আলান আল মক্কী উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি নিজ চোখে খোলা হাজারে আসওয়াদকে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, হাজারে আসওয়াদের যে অংশ দেয়ালের ভেতর রয়েছে তার সবটুকুই সাদা।
হাজারে আসওয়াদের রং সম্পর্কে একথা পরিষ্কার হয়েছে যে, প্রথমে এর রং সম্পূর্ণ সাদা ছিল। ক্রমান্বয়ে এর মাথার রংটুকু কাল হয়ে গেছে। তাও হঠাৎ করে নয়। বরং আস্তে আস্তে, দীর্ঘদিন পর কাল হয়েছে। আদম সন্তানদের গুনাহর, কারণেই তা কাল হয়েছে। এর মাথার মধ্যেই চুমু দেয়া হয়। অবশিষ্টাংশ ভেতরে রয়েছে এবং সে অংশের রং এখন পর্যন্ত সাদাই রয়েছে। আল্লাহই ভাল জানেন, কতদিন পর্যন্ত ভেতরের অংশটুকু সাদা থাকে।
টিকাঃ
৬. প্রাগুক্ত।
📄 হাজারে আসওয়াদের ১১টি বৈশিষ্ট্য
হাজারে আসওয়াদের বৈশিষ্ট্য ও মহত্ব সম্পর্কে সহীহ হাদীসসমূহে রাসূলুল্লাহ (সা) এর অনেক বক্তব্য এসেছে। তিনি হাজারে আসওয়াদের ফজীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন।
১। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
إِنَّ رَسُولَ اللهِ قَالَ لِأَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ، إِنَّ عَلَى الرُّكْنِ الْأَسْوَدِ لَسَبْعِيْنَ مَلَكًا - يَسْتَغْفِرُونَ لِلْمُسْلِمِينَ وَالْمُؤْ مِنِينَ بِأَيْدِيهِمْ - وَالرَّاكِعِيْنَ وَالسَّاجِدِينَ وَالطَّائِفِينَ : واسناده ضعيف (الفاكهي)
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) আবু হুরায়রা (রা)-কে বলেছেন, হাজারে আসওয়াদে ৭০ জন ফেরেশতা আছে। তাঁরা হাত তুলে মুসলমান, মোমেন, রুকু-সেজদা দানকারী এবং তওয়াফকারীদের জন্য গুনাহ মাফ চায়। হাদীসটির সনদ দুর্বল।
২। হাজারে আসওয়াদকে মুখে চুমু দেয়া হয় কিংবা হাতে স্পর্শ করা হয়। বহু সংখ্যক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) একে চুমু দিয়েছেন। বিশেষ করে বুখারী ও মুসলিম শরীফে এ ব্যাপারে রেওয়ায়েত রয়েছে।
৩। হাজারে আসওয়াদটি বাইতুল্লাহ শরীফের সবচাইতে মর্যাদাবান জায়গায় তথা পূর্বকোণে অবস্থিত। এটি হযরত ইবরাহীম (আ) এর তৈরি মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
৪। এটি তওয়াফ শুরুর স্থানে অবস্থিত। প্রথমে এখান থেকেই তওয়াফ শুরু করতে হয়।
৫। যে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে সে যেন আল্লাহর হাতের সাথে হাত মিলায় এবং মোসাফাহা করে। এছাড়াও সে যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স) কাছে বাইআত গ্রহণ করে (ইবনে মাজাহ ও সাঈদ বিন মনসুরের সুন্নাহ এবং আখবারে মক্কা, আযরাকী)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَض أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : مَنْ فَاوَضَهُ فَإِنَّمَا يُفَاوِضُ يَدَ الرَّحْمَنِ
অর্থ: 'আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, যে হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করে, সে যেন আল্লাহর হাত স্পর্শ করে।
৬। প্রথমে হাজারে আসওয়াদের প্রকট আলো ছিল। পরে আল্লাহ ঐ আলো নিভিয়ে দিয়েছেন। আহমদ, তিরমিযী, এবং ইবনে হিব্বান এ ব্যাপারে পৃথক পৃথক হাদীস উল্লেখ করেছেন।
৭। হাশরের দিন, হাজারে আসওয়াদ, তাকে চুমুদানকারী ব্যক্তিদের পক্ষে আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দেবে। তিরমিযী ও তাবরানীতে এ মর্মে হাদীসের উল্লেখ করা হয়েছে। আল-ফাকেহী হযরত ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে,
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَأْتِي هَذَا الْحَجَرُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَلَهُ عَيْنَانِ يَبْصُرُ بِهِمَا - وَلِسَانٌ يَنْطِقُ بِهِ يَشْهَدُ لِمَنِ اسْتَلَمَهُ بِحَقِّ .
অর্থ : 'কিয়ামতের দিন এই পাথরটি এমনভাবে আসবে যে, সে তার দু'চোখে দেখবে, জিহ্বা দ্বারা কথা বলবে এবং যারা তাকে যথার্থভাবে চুমু দিয়েছে, তাদের সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।'
৮। তবারানী একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। তবে হাদীসের সনদটি দুর্বল। সেই হাদীসে বলা হয়েছে যে, হাজারে আসওয়াদ সুপারিশ করবে এবং তাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হবে।
৯। হাদীসে এসেছে: وَالْحَجَرُ يَمِينُ اللَّهِ فِي أَرْضِهِ .
অর্থ : 'হাজারে আসওয়াদ যমীনে আল্লাহর ডান হাত।' বিভিন্ন সনদে এ মর্মে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হওয়ায় হাদীসটিকে হাসান বলা হয়।
১০। আল ফাকেহী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করে বলেছেন যে, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেছেন : 'কোন ব্যক্তি যদি ঘর থেকে ভাল করে অজু করে মসজিদে হারামে গিয়ে হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়, তারপর তাকবীর, তাশাহহুদ ও দরুদ পড়ে, মোমেন-মুসলমান নর-নারীর জন্য দোয়া করে, আল্লাহর জেকের করে এবং দুনিয়ার কোন বিষয়ে স্মরণ না করে, তাহলে, আল্লাহ তাঁর প্রতি কদমের জন্য ৭০ হাজার নেক লিখবেন, ৭০ হাজার গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং তার মর্যাদা ৭০ হাজার গুণ বাড়িয়ে দেবেন। তারপর রোকনে ইয়ামানী ও হাজারে আসওয়াদের মাঝখানে পৌঁছলে, বেহেশতের বাগানসমূহের একটি বাগানের মধ্যে অবস্থান করবে এবং নিজ পরিবারের লোকদের জন্য কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) নিজ পরিবারের ৭০ জন লোকের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হবে। তারপর দু'রাকাত নামায পড়লে এবং ভাল করে রুকু সেজদা আদায় করলে, আল্লাহ তাঁর জন্য আওলাদে ইসমাঈলের ৬০টি গোলাম আযাদ করার সমান সওয়াব দান করবেন।' এই বর্ণনাটির সনদ হাসান।
১১। আল্লাহ ঈমান ও ইসলামকে সব মুসলমানের কাছে আমানত রেখেছেন এবং এই দায়িত্ব পালন করার জন্য তাদের কাছ থেকে বাইআত নিয়েছেন। মানুষ এই নৈতিক অনুভূতির স্মারক কোন প্রতীকী জিনিস দেখতে চায়। আল্লাহ তাই, এই পাথরটিকে বাইতুল্লাহ শরীফের কোণে প্রতীকী স্মারক হিসাবে স্থান দিলেন। এইটি দেখে এবং এতে চুমু দিয়ে মুসলমানরা অনুভব করবে যে, তারা আল্লাহর বাইআত গ্রহণ করছে এবং স্বীয় দায়িত্ব ও আমানত পালনের জন্য আল্লাহর সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হচ্ছে।
অবশ্য এই হেকমতটি চিন্তা করলে বুঝা যায়। তবে এর মূল রহস্য হচ্ছে, জ্ঞান ও বিবেকের পরীক্ষা নেয়া; এর প্রতি মানব মনের সাড়ার প্রকৃতি জানা এবং আল্লাহর হুকুমের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা অনুষ্ঠান। বান্দাহ, এর মূল কারণ জানুক বা না জানুক, উভয় অবস্থায়ই আল্লাহর ইবাদত ও হুকুম মানা জরুরী। তাই হাজারে আসওয়াদের অস্তিত্ব আল্লাহর সার্বিক আনুগত্য এবং এবাদতের অংশবিশেষ।
টিকাঃ
৭. প্রাগুক্ত।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. প্রাগুক্ত।
📄 হাজারে আসওয়াদে চুমু বা স্পর্শ করার দোয়া
ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফের প্রথম তিন চক্করে হাজারে আসওয়াদ থেকে হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত রমল করেছেন অর্থাৎ দ্রুতবেগে হেঁটেছেন। তারপর যখন হাজারে আসওয়াদে চুমু দেন বা স্পর্শ করেন কখন এই দোয়াটি পড়েন:
بِسْمِ اللهِ وَاللَّهُ أَكْبَرْ ، إِيْمَانًا بِاللَّهِ ، وَتَصْدِيقًا بِمَا جَاءَ بِهِ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .
অর্থ : 'আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং মুহাম্মদ (সা) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি বিশ্বাস করি।'
তারপর তিনি রোকনে ইয়ামানী এবং হাজারে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছে পড়েছেন,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارَ .
অর্থ: 'হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়া এবং আখেরাতে নেক ও কল্যাণ দাও এবং দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও। (সূরা বাকারা- ২০১)
ফাকেহী আরো উল্লেখ করেছেন, হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) হাজারে আসওয়াদকে চুমু বা স্পর্শ করার সময় বলতেন,
امَنْتُ بِاللَّهِ وَكَفَرْتُ بِالطَّاغُوتِ .
অর্থ: 'আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম এবং তাগুতের প্রতি অবিশ্বাস করলাম'।
হযরত আলী বিন আবু তালিব (রা) হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করার সময় বলতেন:
اللَّهُمَّ تَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَسُنَّةَ نَبِيِّكَ .
অর্থ : 'হে আল্লাহ তোমার কিতাব ও নবীর সুন্নতের প্রতি বিশ্বাস সহকারে (শুরু করছি)।'
হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ বলতেন:
ربَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارَ . (البقرة : ۲۰۱)
হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, হাজারে আসওয়াদে ভিড় থাকলে কাউকে কষ্ট দেবে না, নিজেও কষ্ট পাবে না এবং এমনিতেই চলে যাও।
ফাকেহী উল্লেখ করেছেন যে, হযরত উমরের প্রখ্যাত বক্তব্যের মত হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)ও বলেছিলেন:
إِنِّي لَأَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ وَلَوْلَا أَنِّي ، رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَبَّلَكَ مَا قَبَّلْتُكَ .
অর্থঃ "আমি জানি যে, তুমি একটি পাথর। তুমি কারো উপকার ও অপকার করতে পারনা। আমি যদি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তোমাকে চুমু দিতে না দেখতাম, তাহলে আমিও তোমাকে চুমু দিতাম না।"
ফাকেহী আরো উল্লেখ করেছেন যে, আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা) হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করার পর নিজের হাত চেহারার উপর মসেহ করতেন। হযরত ওমর বিন আবদুল আযীযও (রা) নিজের চেহারা এবং দাড়ির উপর হাত মুছতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত উমর (রা) কে বলেছেন: 'হে উমর, তুমি একজন শক্তিশালী ব্যক্তি, দুর্বলকে কষ্ট দিও না। যখন হাজারে আসওয়াদকে ভিড়মুক্ত পাবে তখন স্পর্শ করবে এবং হাতে চুমু খাবে। অন্যথায় তাকবীর বলে অতিক্রম করে চলে যাবে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 'হাজারে আসওয়াদের কাছে, আসমান যমীন সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে একজন ফেরেশতা আমীন, আমীন বলছে। তাই তোমরা-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابُ النَّارِ .
বল।' অর্থাৎ ফেরেশতার আমীন বলার সাথে এই দোয়া একাকার হয়ে গেলে, তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী।
রাসূলুল্লাহ (সা) হাজারে আসওয়াদে চুমু দিয়েছেন এবং এর উপর দু'হাত বিছিয়ে দিয়েছিলেন। এক বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফের প্রত্যেক চক্করে হাজারে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানীকে হাতে স্পর্শ করতেন এবং পরে সেই হাতে চুমু খেতেন।
হাজারে আসওয়াদে চুমু দেয়া কিংবা স্পর্শ করার সময় যে কোন দোয়াই করা যেতে পারে। দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণ যত বেশী পাওয়া যায় সেই উদ্দেশ্যেই ততবেশী দোয়া করা উচিত। এর জন্য বিশেষ কোন দোয়া নেই। আজকাল, অবশ্য অনেক দোয়ার বই বেরিয়েছে এবং সেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের দোয়ার উল্লেখ রয়েছে। সেগুলো পড়া তেমন কোন জরুরী নয়। দোয়া যে কোন ভাষায় হতে পারে। তবে উত্তম হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে তাদের কাছ থেকে বর্ণিত দোয়াসমূহ পাঠ করা। হাজারে আসওয়াদে স্পর্শ কিংবা চুমু দেয়ার সময় যে সকল দোয়া পড়া সুন্নত ও মোস্তাহাব সেগুলো হচ্ছে:
ইমাম শাফেঈ তাঁর اَلْقرى কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, কিছু সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ কিংবা চুমু দেয়ার সময় কি দোয়া পড়া যায়? রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তোমরা তখন এই দোয়াটি পড়বে:
بيسمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ إِيْمَانَا بِاللهِ وَتَصْدِيقًا لِإِجَابَةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .
আরেকজন সাহাবী হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ কিংবা চুমু দেয়ার সময় এই দোয়াটি পড়তেন:
اللَّهُمَّ ايْمَانَابِكَ وَوَفَاءَ بِعَهْدِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَسُنَّة نَبِيِّكَ .
তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর দরুদ পাঠ করতেন।
হযরত আলী (রা) অনুরূপ দোয়া পড়তেন। তবে তিনি আরো একটু বাড়িয়ে বলতেনঃ
وَاتَّبَاعًا لِسُنَّتِكَ وَسُنَّةِ نَبِيِّكَ .
হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) এই দোয়া পড়তেন:
بسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ عَلى مَا هَدَانَا اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا أَشْرِيْكَ لَهُ امَنْتُ بِاللَّهِ وَكَفَرْتُ بالطَّاغُوتِ وَاللَّاتِ وَالْعُزَّى وَمَا يُدْعَى مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْ وَلِيُّ اللَّهُ الَّذِي نَزَّلَ الْكِتَابَ وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ .
আযরাকী তাঁর আখবারে মক্কা বইতে এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।
টিকাঃ
১০. প্রাগুক্ত।
১১. প্রাগুক্ত।
১২. প্রাগুক্ত।